অপু তানভীর

মাই ডিয়ার হোম মিনিস্টার (পর্ব ১৪)

5
(5)

দরজার আস্তে আস্তে ফাঁক হচ্ছে আমি সেদিকে তাকিয়ে আছি । বুকের ভেতরে একটা কাঁপন অনুভব করলাম । ধরা পরে যাওয়ার ভয় । নিকিতা যদি দেখতে পায় যে আমি ওর ল্যাপটপ থেকে কিছু জিনিস কপি করছে তাহলে কি হবে ?
এটা ওর ব্যক্তিগত ল্যাপটপ ! একটা দেশের হোম মিনিস্টারের ল্যাপটপে এভাবে অবৈধ ভাবে ঢুকে পড়াটা অন্যায়ের ভেতরে পড়ে । কত গুরুত্বপূর্ন জিনিস সেখানে থাকতে পারে যেগুলো বাইরে প্রকাশ পেলে অনেক বড় সমস্যা হয়ে যেতে পারে ।

আমি ল্যাপটপের ঢাকনাটা বন্ধ করে দিলাম । তবে এখনও সেটা চালু আছে । ডেক্সটপ হলে পাওয়ার সুইচ অফ করলেই ঝামেলা শেষ হয়ে যায় কিন্তু ল্যাপটপে সেটা করতে পারবো না । এখন এটা বন্ধ করবো কিভাবে ?
দরজাটা একটু খুলে গেছে । তবে নিকিতা বের হয়ে এল না । তার বদলে ওর মাথা বের হয়ে এল । ওর মুখে পানি লেগে আছে । আমার দিকে তাকিয়ে খানিকটা লজ্জিত কন্ঠে বলল, অপু তোয়ালেটা দাও দেখি ! নিতে ভুলে গেছি !

আমি উঠে দাড়ালম । ডান দিকের চেয়ারের উপর সেটা রাখা ছিল । তোয়ালেটা হাতে নিয়ে একেবারে দরজার সামনে এল । বুকের কাঁপনটা ততক্ষণে কমে গেছে । নিকিতার কেবল মাথা দেখা যাচ্ছে । আমি হঠাৎ বললাম
-তোয়ালে নিতে হলে বাইরে বের হয়ে আসতে হবে !
নিকিতার মুখে একটা বিস্ময় দেখতে পেলাম । আমার কাছ থেকে যেন এই ধরনের কথা সে আশাই করে নি । বলল
-দুষ্টামী করবা বলে দিলাম !
-উহু ! কোন দুষ্টামী না । আমি সিরিয়াস ! এটা নিতে হলে বাইরে বের হয়ে আসতে হবে ।
-দেখো ভাল হবে না বলছি ।
-না হোক !
-পুলিশ দিয়ে ধরিয়ে দিবো !
-দাও । তোমাকে ওখান থেকে বের করতে হলে আমার যদি ১০ বছরের জেল হয় তবুও আমি রাজি ! জীবনে তো অনেক ভাল প্রেমিক হয়ে থাকলাম এখন না হয় একটু দুষ্টামি করিই !

নিকিতা আমার দিকে তাকিয়ে রইলো কিছু সময় । আমিও ওর চেহারার দিকে তাকিয়ে রইলাম । আমি আসলে সময় নিতে চাচ্ছি । ও যত বেশি সময় নিবে আমার জন্য তত ভাল । ফাইল গুলো কপি হয়ে যাবে । তবে আমি নিশ্চিত যে ও বের হয়ে আসবে না । যতদুপর জানি ওর শরীরে এখন কোন কাপড় নেই । এই ভাবে বের হয়ে আসতে পারবে না কোন ভাবেই ।
কিন্তু আমাকে অবাক করে দিয়ে সত্যি সত্যিই দরজাটা খুলে গেল সম্পূর্ন । তারপর ওর নগ্ন পাটা আগের বের করলো ও । আমার পুরো শরীরে একটা বড় রকমের ধাক্কা মারলো । আমি সত্যিই ভাবি ও বের হয়ে আসবে ! আমার পুরো জীবনে এই রকম কোন ঘটনা ঘটে নি । আমি ঘরে দাড়ালাম । আমার পক্ষে নিকিতার দিকে তাকানো কোন ভাবেই সম্ভব না ।

আমি অনুভব করলাম নিকিতা একদম আমার পেছনে এসে দাড়িয়েছে । আমার কানের কাছে মুখ নিয়ে এসে নিকিতা বলল
-এই বীর পুরুষ । তাকাও আমার দিকে !
আমি কোন মতে বললাম
-সরি ! আমি আসলে পারবো না !
নিকিতার হাসির আওয়াজ পেলাম । নিকিতা বলল
-তোমার দৌড় আমার জানা আছে ।
-আমি সত্যিই ভাবি নি তুমি বের হয়ে আসবে !
নিকিতা আমার হাত থেকে তোয়ালেটা নিল । তারপর বলল,
-মেয়েরা যখন কাউকে ভালবাসে তখন তাদের জন্য সব কিছু করতে পারে । সব অন্যায় আবদারও মেনে নেয় । বুঝতে পেরেছো ?
-হুম !

আমি নিকিতার আবারও বাথরুমের ভেতরে চলে যাওয়াটা বুঝতে পারলাম । দরজা বন্ধ হতে আবার ঘরে দাড়ালাম । আমি সত্যিই বুঝতে পারছি না কি করবো ? নিকিতার আচরণ আবারও আমাকে খানিকটা দ্বিধায় ফেলে দিল । আমার মন বলছে এই মেয়েটা আমাকে ভালবাসে । সিড়ি ঘরে ঐদিন মেয়েটা যা বলেছে সেটা কোন ভাবেই সত্য হতে পারে না । একবার মনে হল পেন ড্রাইভটা বের করে ফেলি । আমার দরকার নেই এই সব প্রমানের । কিন্তু অন্য মনটার কারনে সেটা পারলাম না ।

ল্যাপটপের ঢাকনাটা আবারও খুলে দেখলাম সব ফাইল কপি করা হয়ে গেছে । আমি পেন ড্রাইভটা বের করে ল্যাপটপ টা বন্ধ করে দিলাম । এখন আমার কাজ হবে এই সব অডিও ফাইল গুলো চেক করে দেখা

সপ্তাহ খানেক লেগে গেল আমার সব ফাইল গুলো চেক করতে । নিকিতার তার ফোন কলের সব রেকর্ড রাখতো । কে কে তাকে ফোন করে এবং কারকার কাছে কি কি কথা হয় সে সবের একটা প্রমান নিকিতার কাছে রয়েছে । দেশের বেশ কিছু বড় বড় বিজনেস ম্যানের সাথে নিকিতার কথা হয়েছে । তাদের অন্যায় আবদার নিকিতা শুনেছে । কিছু কিছু শুনতে রাজি হয়েছে আবার কিছু না করে দিয়েছে । খানিকটা মন খারাপই হল আমার । বাইরে থেকে নিকিতাকে দেখে যতই স্বচ্ছ আর পরিস্কার মনে হোক না কেন আসলে ভেতরে সে একেবারে স্বচ্ছ না । হয়তো কোন রাজনীতিবীদই তা নন । সিস্টেমটাই হয়তো এই রকম । আমি সেটা নিয়ে আর ভাবলাম না ।
ফোন কলের সাথে সাথে সাথে নিকিতার কাছে কিছু মিটিংয়ের রেকোর্ডিংও আছে দেখতে পেলাম ।

সেটা সব চেক করতে গিয়েও আমি সব থেকে বড় ধাক্কাটা খেলাম । ঐদিন মেয়েটি যা বলেছে সেটা আসলে সত্য । নিকিতা আসলেই প্লান করেই আমার সাথে দেখা করেছে ।

রেকোডিংয়ের মোট তিন জনের কথা শোনা যাচ্ছে । একটা নিকিতা নিজে । অন্য জন্য ওর বাবা আজাহার আহমেদ । তৃতীয় ব্যক্তিটিকে আমি ঠিক চিনতে পারলাম না । মন দিয়ে শোনার চেষ্টা করলাম । সেই বেশি কথা বলছিলো । রেকোডিং টা চলছে-

নিকিতা তুমি আমাদের দলের সব থেকে বড় টার্মকার্ড । আমি চাই তোমার জনপ্রিয়তাই সবার আগে থাকুক । হ্যা তোমার কাজে একটু সমস্যা যে হচ্ছে সেটা বলবো না বিশেষ করে আমাদের দলের অনেকই তোমার উপর ঠিক পুরোপুরি সন্তুষ্ট না যেহেতু তুমি তাদেরকেও ছাড় দাও নি ।
নিকিতার হাসির আওয়াজ পেলাম । নিকিতা বলল, এই জন্যই আমার জনপ্রিয়তা বাড়ছে । একটু সমস্যা হবে তবে বৃহৎ স্বার্থে সেটা ত্যাগ করতে হবে । এখন আমার মাথায় আরো একটা বুদ্ধি এসেছে । আমি ঠিক করেছি আমি একটা রিলেশন করবো । প্রেম করবো । এবং সেটা সবাই জানবে সবাই দেখবে !
-মানে কি ?
-মানে টা খুব সহজ ! মনে করেন আপনি খুব ফুটবল খেলতে, ফুটবল খেলা দেখতে পছন্দ করেন, নিজেও খেলেন । এখন সামনে যদি এমন একটা মানুষ আপনি দেখেন যে নিজেও ফুটবল খেলে, খেলা দেখে ফটবল খুব ভাল বোঝে তাহলে আপনার মনভাব কি ? তার প্রতি আপনা আপনিই আপনার একটা পজেটিভ মনভাব চলে আসবে । এখন আরেকটা ব্যাপার লক্ষ্য করেন । আমাদের দেশের ইয়াং জেনারেশন, স্কুল থেকে কলেজ ভার্সিটি সবার ভেতরে একজা মনভাব খুব কমন । প্রেম । প্রায়ই সবাই এটা করে । যারা করে তারাও মনে মনে এইটার ব্যাপারে ফ্যান্টাসী পেষন করে । এখন কল্পনা করে দেখে তারা এমন একজন মানুষকে দেখতে পাবে সে তাদের মতই কারো প্রেমে পরেছে তাকে ঘুরে বেড়াচ্ছে তার হাত ধরে বৃষ্টিতে ভিজছে । আবার প্রেমে ব্যর্থ হয়ে কষ্ট পাচ্ছে । এটা আমাদের দেশের ইয়াং জেনারেশনদের একটা ট্রেড মার্ক । ওরা যখন আমাকে ঠিক তাদের মত করেই প্রেম করতে দেখতে ভালবাসতে দেখবে আমার প্রতি ওদের একটা পজেটিভ ভাব আপনা আপনিই চলে আসবে ।
এইবার নিকিতার বাবার কন্ঠস্বর শুনতে পেলাম
-কিন্তু বিরোধী পক্ষ যদি এটা নিয়ে কিছু বলে ?
-চিন্তা কর না তো ! এটা ফল পজেটিভ আসবেই । আই ক্যান এশিওর ইউ !

আমি সত্যিই নিজের কানকে ঠিক বিশ্বাস করতে পারছিলাম না । তাহলে সবই ছিল প্রিপ্লান ! এই আমাকে তুলে নিয়ে যাওয়া আমার, সাথে প্রেম করা, এমন কি ঐ বৃষ্টিতে ভেজার ছবি ভাইরাল হওয়াটাও !

আমি আর কিছু ভাবতে পারছিলাম না । কিছু না ।
হঠাৎ কিছু মনে হতেই আমি আবারও ফোন রেকোর্ডিং ফোল্ডার ওপেন করলাম । এখানকার ফাইল গুলো তারিখ আর সময় দিয়ে সেভ করা হয়েছে । সব ফোন রেকোডিংই এমন করেই সেভ হয় । আমি যেদিক গুলি খেয়েছিলাম সেদিনের তারিখ বের করলাম । সেদিন মোট ১১ টা ফোন কল এসেছিলো । একটার সাইজ একেবারে কম । মাত্র কয়েক কিলোবাইট ! আমি সেই ফাইলটা চালু করলাম । মোট ১৩ সেকেন্ডের কল রেকোডিং । ফোন রিসিভ হতেই কিছু সময় নিরবতা । তারপর কেউ বলল
-আজকেই সেই দিন !
নিকিতা বলল
-হ্যা !

লাইন কেটে গেল । আমি সময়টা দেখলাম দুপুর দুইটা ২৬ মিনিট । এটাই সেই কল । কেউ কিছু করার অনুমূতি চাইছে । নিকিতা সেটার অনুমূতি দিয়েছে । কোন কাজের অনুমূতি সেটা আমার বুঝতে কষ্ট হল না । আমার বুকের ভেতরটা হুহু করে উঠলো । এই প্রমানটা না পেলেই সম্ভবত ভাল হত ।

আইরিনও ঠিক একই কাজ করেছিলো । আমার সাথে ওর পরিচয়ের কারন ছিল আমার পড়াশুনা । আমি ওকে পড়াশুনায় সাহায্য করতাম অনেক । আমার তৈরি করা নোট গুলো ও নিতো । পরে বুঝেছিলাম যে কেবল সেগুলোর জন্যই সে আমার কাছে এসেছি । আর আজকে নিকিতাও তাই । নিজের রাজনৈতিক জনপ্রিয়তা বাড়ানোর জন্য, সবার কাছে নিজের গ্রহনযোগ্যতা বাড়ানোর জন্য সে আমাকে ব্যবহার করেছে । এমন কি আমাকে মেরে ফেলার অনুমূতি দিতেও তার বাঁধে নি ।
তীব্র একটা রাগ হল । মনটা প্রতি হিংসায় ভরে উঠলো । যে কাজের জন্য সে আমাকে ব্যবহার করেছে সেটাই আমি ধ্বংস করেদিবো । আমি পিসিটা অন করলাম । এ অডিও ফাইল আমি এখন নেটে ছেড়ে দিবো । দেশের মানুষ জানুক নিকিতার আসল চেহারা !!

###

আমি একভাবে তাকিয়ে রইলাম কম্পিউটারের মনিটের দিকে । প্রায় আপলোড হয়ে গেছে । আর মাত্র কয়েক সেকেন্ড পরেই আপলোড কমপ্লিট হয়ে যাবে । তখন কেবল একটা টাইটেল লিখে ওকে বাটনে চাপ দিলেই সেটা নেটে চলে যাবে ।
কয়েক সেকেন্ড বাকি তখনই আমার পিসি হ্যাঙ করলো । আমি অবাক হয়ে দেখলাম পিসিটা একা একাই রিস্টার্ট নিয়ে নিল । সেই ক্লিপটা গায়েব । আপলোড হয় নি । আমি আবারও যখন আপলোড করতে যাবো তখনই আমার ফোন বেজে উঠলো ।
নিকিতার ফোন !
আমার মনের ভেতরে কেমন কু ডেকে উঠলো ! এই মেয়ে এখন ফোন কেন দিল
তারপর ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখলাম । এই সময়েই সে ফোন দেয় সাধারনত । আমার মাথা কাজ করছিলো না । আমি কি করবো বুঝতে পারছি না । আমার মাথাট ভেতরে কেবল ঐ অডিও ক্লিপটার কথা কাজ করছিলো । একটা মানুষ এমন কাজ কিভাবে করতে পারে !

আমি ফোন রিসিভ করলাম । আমি কিছু বলতে যাবো তার আগেই নিকিতা বলল
-তুমি কি করছিলে ?
-মানে ?
একটু সময় নিয়ে নিকিতা বলল
-অপু তোমার কি মনে হয় না আমি সব জানতে পারবো ? দেশের পুরো নিরাপত্তা ব্যবস্থা আমি চালাই আমি জানবো না ? আমার ল্যাপটপ থেকে কেউ কিছু কপি করে নিবে আর আমি সেটা টের পাবো না ?

নিকিতার কন্ঠে একটা শান্তভাব আমি টের পেলাম । ওর এই দিকটা আমি খুব ভাল করে চিনি । বিশেষ করে ও যখন কোন ব্যাপার নিয়ে খুব বেশি ডিটারমাইন হয় তখন এমন শান্ত কন্ঠে কথা বলে ! আমি চুপ করে রইলাম কিছুটা সময় ! কি বলবো খুজে পেলাম না । আসলে নিকিতার কাছ থেকে এমন কিছু আমি আশা করি নি । নিকিতা আবার বলল
-আমি না চাইলে তুমি তোমার পিসি থেকে একটা কিছুও আপলোড করতে পারবে না । এমন কি একটা ফেসবুক স্টাটাসও দিতে পারবে না । বুঝেছো !
নিকিতা চাইলেই এই কাজটা করতে পারে । একটু আগে সেটা করেও দেখিয়েছে । আমি ক্লিপটা আপলোড দিতে পারি নি । নিকিতা আবার বলল
-আমি জানি তুমি কি জেনেছো ! আমি সেবসের কিছু ছাফাই দেবো না । তুমি সেটা বিশ্বাস করবে না আমি জানি !
আমি বললাম
-কিন্তু আমি তোমাকে বিশ্বাস করেছিলাম । আমার সব কিছু দিয়ে !
-হ্যা আমি জানি ! আমি সেটা ভঙ্গ করেছি । আমার স্বার্থেই । এই জন্য আমি সরি !
-কেবল সরি ! আর কিছু না ?
নিকিতা কোন কথা বলল না । নিকিতা এতো জখন্য একটা কাজ করেও কেবল একটা সরি দিয়েই কাজ শেষ করতে চাচ্ছে । ঠিক যেমনটা দেশের রাজনীতিবীদরা করে । আমি বললাম
-আসলে আমার মা ঠিকই বলেছিলো । একজন পলিটেশিয়ান সব সময়ই পলিটেশিয়ান । তারা সব কিছু করতে পারে । তাদের কোন দিন বিশ্বাস করা যায় না ।
নিকিতা যেন একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল । আমি সেটা শুনতে পেলাম ফোনে এপাশ থেকেও । নিকিতা বলল
-আমি জানি না তুমি কি করবে । তবে তোমার কাছে আমি অপরাধী । তুমি যদি এখন চাও অডিও ক্লিট টা আপলোড করতে পারো । আমি আর বাধা দিবো না তোমাকে !

এই বলে ও ফোন রেখে দিল । ফোন রাখার পরেও বেশ কিছুটা সময় আমি ফোনটা কানের কাছে ধরে রাখলাম । এখনও আবার বিশ্বাস করতে ইচ্ছে করছিলো যে নিকিতা আমাকে বলবে যে সে সেটা করেছে সেটাতে তার কোন ইচ্ছে ছিল না । বাধ্য হয়ে করেছে কিন্তু সেটা সে বলল না । কেবল নিজের কৃত কর্ম গুলো স্বীকার করে নিল ।

আরেক বার ইচ্ছে হল অডিও ক্লিপটা আপলোড করে দেই কিন্তু করতে পারলাম না । নিজের মনের কাছে সাই দিল না । শেষে নিজেই ডিলিট করে দিলাম । এমন হয় । আমরা যখন কারো প্রেমে পড়ি তখন তার শত অপরাধও ক্ষমা করে দেই । কত অযৌক্তিক কাজ করি ! আমিও এমন একটা অযৌক্তিক কাজ করে ফেললাম ।

তারপর থেকে নিকিতার সাথে আমার যোগাযোগ বন্ধ হয়ে গেল একেবারে । আমি ওকে ফোন দিতাম না, দেখা করতাম না । নিজের কাজ নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়লাম । ভাবার চেষ্টার করলাম যে নিকিতা নামের কেউ আমার জীবনে ছিল । কিন্তু এই দেশের মিডিয়া সেটা হতে দিল না । মাস খানেক পরে একটা নিউজ আমার চোখে পড়লো । আমাকে আর নিকিতাকে নিয়ে করেছে । সেখানে সাংবাদিক প্রশ্ন করেছে শিরোনাম করেছে যে তাহলে কি তাদের মাঝে বিরহ চলছে ?

আবারও সেই প্যারা শুরু হল । আমার পিছে সাংবাদিক ঘুরতে শুরু করলো । বারবার সেই একই প্রশ্ন করা শুরু করলো যে আমার আর নিকিতার মাঝে ঝামেলা কি ? কি হয়েছে? আমরা কি ব্রেক আপ করেছি কি না !

ব্যাপারটা আবারও একটু পালে হাওয়া পেল যখন নিকিতা তার ব্যক্তিগত ফেসবুক স্টাটাসে লিখলো “প্রিয় মানুষটা যখন দুরে চলে যায় পৃথিবীর সব কিছু অর্থহীন মনে হয়” । মানুষ জনের আর বুঝতে বাকি থাকলো না যে আমাদের মাঝে সত্যি ঝামেলা চলচে । এটা যেন নিকিতার জনপ্রিয়তা আরও বাড়িয়ে দিল । তাদের মতই একজন মানুষ নিকিতা যে প্রেম করছে প্রেমিকার সাথে ঘুরে বেড়াচ্ছে আবার প্রেমিকার সাথে মান অভিমানও চলছে । বিরহে সেও কষ্ট পাচ্ছে । সব বাঙালী মেয়ের মাঝই এই জিনিস দেখা যায় ! নিকিতাকে যেন তারা আরও আপন করে নিতে থাকলো ।

আমার মনটা আরও খারাপ হয়ে গেল । বুঝতে বাকি রইলো না এটাও আসলে নিকিতারই একটা চাল ! নিজের জনপ্রিয়তা বাড়ানোর আরও একটা কৌশল । আমার ইচ্ছে হল মনের দুঃখে দেশ ছেড়ে চলে যাই । কারন এই দেশে যত সময় থাকবো এই ব্যাপারটা আমার চোখে সামনে ঘটতে থাকবেই । প্রতিনিয়ত ! যেখানেই আমি যাই আমাকে এই ব্যাপারটা আমার সামনে আসবেই ।

একদিন আমি আমার অফিস রুমে বসে ছিলাম । তখনই আামর কয়েকজন ছাত্র ছাত্রী আমার রুমে এসে হাজির হল । আমার দিকে তাকিয়ে বলল
-স্যার আসবো ?
-হ্যা আসো !
রুমের ভেতরে ঢুকেও তারা যেন কিছু বলতে পারছিলো না । একটু যেন অস্বস্থিবোধ করছিলো বলতে । আমি বললাম
-কি বলবে বল ? কোন কাজে এসেছিলে ?
-স্যার আপনি নাকি বাইরে যাওয়ার কথা ভাবছেন ?
-হ্যা কাগজ পত্র তৈরি করা হয়ে গেছে প্রায় ।
-স্যার আমাদের ছেড়ে যাবেননা প্লিজ ! আর ম্যামকে একটা রেখে যাবেন না !
-ম্যাম ! মানে কোন ম্যাম !

ছাত্রছাত্রীরা এদিক ওদিক তাকালো । আমি যেন ওদের আরও বেশি অস্বস্থিতে ফেলে দিয়েছি । ম্যাম মানে ওরা নিকিতার কথা বলছে সেটা বুঝটে পারলাম সাথে সাথেই । এই ছেলে মেয়ে গুলো কি জানে তাদের প্রিয় নিকিতা ম্যাডাম কি করেছে আমার সাথে । খুব ইচ্ছে হল ওদের কে সব বলে দেই । কিন্তু কেন যে বলতে পারলাম না জানি না । আরেকজন বলল
-স্যার আমরা আপনাদের দুজেনর কাপলটাকে সব থেকে পার্ফেক্ট কাপল মনে করি । তাহসান মিথিলার যে কাপল ছিল এক সময় সেটার থেকেও বেশি পার্ফেক্ট মনে হয় ! কি চমৎকার একটা জটি আপনাদের । প্লিজ স্যার আমাদের কথা একটু ভাবেন !

আমি এবার সত্যিই রেগে গেলাম । এটাই হচ্ছে এই দেশের মানুষের সমস্যা । নিজেরা ঘটনার কিছু না জেনে না বুঝে এতো কিছু এমন ভাব করে বসে থাকবে যে তারা সব কিছু জানে ! আমি বললাম
-শোন এতো কিছু তোমাদের বুঝতে হবে না । তোমরা কাজে যাও । আমার জীবন নিয়ে আমি কি করবো সেটা আমি সিদ্ধান্ত নিবো !

আমি সত্যিই বুঝে গেলাম যে আমার আর এই দেশে থাকাটা চলবে না । এর চেয়ে বরং বাইরে চলে যাই । আরও সপ্তাহ খানেক এই ভাবেই কেটে গেল । আমার বাইরে যাওয়ার প্রস্তুতি খুব ভাল ভাবেই চলছে । বাসাতেও জানিয়েছি । মা আর বাবা বুঝতে পেরেছেন আমার আর নিকিতার মাঝে কোন ঝামেলা শুরু হয়েছে । কিন্তু সেটার ব্যাপারে তারা কিছু জানতে চান নি । এটা আমার জন্য ভালই হয়েছে এক দিক দিয়ে ! এভাবেই দিন কেটে যাচ্ছিলো । ধীরে ধীরে আমার নিকিতার ব্যাপারটা মিডিয়ার আড়ালে চলে এল ।

আমি খানিকটা স্বস্থিবোধ করতে লাগলাম । কিন্তু সেটা খুব বেশি সময়ের জন্য নয় ।
ক্যাম্পাসের কাজ শেষ করে বাসার দিকে যাচ্ছিলাম তখনই আমার এক ছাত্রের ফোন পেলাম । ফোন ধরার সাথে সাথেই ছেলেটা বলল
-স্যার আমরা খুব খুশি হয়েছি !
-মানে ? কেন ?
-এই যে স্যার আপনি আমাদের কথা ভেবেছেন !
-কি বলছো এই সব !
-স্যার আপনি এমন ভাব করছেন যেন কিছুই করেন নি । যাই হোক নিকিতা ম্যামের পেইজে গেলেই টের পাবেন । আর লুকানোর কিছু নেই !

আমি ফোন কেটে কিছু সময় বোকার মত তাকিয়ে রইলাম । কিছু বুঝতে পারছিলাম না । ফেসবুকে ঢুকে নিকিতার ব্যক্তগত ফেসবুক প্রোফাইলে ঢুকলাম । সেখানে কিছুই দেখতে পেলাম না । ওর একটা ভেরিফাইড পেইজও আছে সেটার ভেতরে ঢুকতেই চোখ কপালে উঠলো আমার !
সেখানে আমার আর নিকিতার একটা ছবি পোস্ট করা হয়েছে । মাস দুয়েক আগের ছবি । ঢাকার কাছেই একটা রিসোর্টে গিয়েছিলাম । দুজন এক সাথে বিকেলের চা খেতে খেতে গল্প করছিলাম । এটাই সম্ভবত আমাদের এক সাথে তোলা শেষ ছবি । আমি ক্যাপশনে দিকে তাকিয়ে রইলাম অবাক হয়ে । সেখানে লেখা “আপন মানুষ গুলোই আমার কাজ করার সব থেকে অনুপ্রেরণা । তুমি সাথে আছো বলেই আমি আরও নতুন উদ্যোমে এগিয়ে যাই সামনে”

আমি কিছু সময় কেবল অবাক হয়ে তাকিয়ে রইলাম । এটা নিকিতার আবার নতুন কি খেলা শুরু করেছে ! আমার মাথায় কিছু আসছিলো না । তবে কিছু যে তার মাথায় চলছে সেটা বুঝতে আমার মোটেই কষ্ট হল না । মানুষজন কে দেখানোর আবার কি দরকার ছিল যে আমি আবারও ওর জীবনে ফিরে এসেছি !

আমার মনের কথা মনেই রয়ে গেল । দেখলাম আমার উবার গাড়িটা হঠাৎ করে থেমে গেল । আমি বাইরে তাকিয়ে ড্রাইভারকে কিছু জিজ্ঞেস করতে যাবো তার আগেই দুপাশ থেকে কয়েকজন আমার মানুষ গাড়িটাকে ঘিরে ধরলো । আমি ওদের হাতে পিস্তল দেখতে পেলাম । কিছু বুঝে ওঠার আগেই আমাকে অস্ত্রের মুখে গাড়ি থেকে বের করে একটা মাইক্রোতে তুলে নিল । আমি কিছু বলার আগেই একজন আমার নাকে একটা রুমাল চেপে ধরলো ।
মিষ্টি একটা গন্ধ টের পেলাম !
ক্লোরোফর্ম !

চেতনা হারানোর আগে আমার কেবল এটাই মনে হল যে আমি সম্ভবত এবার সত্যি সত্যিই মারা যাচ্ছি । এবার নিকিতা আমাকে সত্যি সত্যিই মেরে ফেলবে !

পরের পর্ব

How useful was this post?

Click on a star to rate it!

Average rating 5 / 5. Vote count: 5

No votes so far! Be the first to rate this post.

Related Posts

2 thoughts on “মাই ডিয়ার হোম মিনিস্টার (পর্ব ১৪)

  1. অনেক excited হয়ে আছি পরবর্তী পর্বের জন্য। কখন দিবেন?

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *