4.4
(39)

দরজাটার সামনে এসে কিছু সময় থমকে দাড়ালো লিসা । কত বছর পরে আবার এই বাসায় আসছে!
সাত বছর!
সাত বছর পরে এসেছে ও।

আগে এমন একটা সময় ছিল লিসা বলতে গেলে সারাটা সময় এই বাড়িতে থাকতো। এই বাসায় ওর জন্য একটা ঘরও ঠিক করা ছিল। ঠিক একই ভাবে ওদের বাসায় মোনার জন্য একটা ঘর ছিল। দুজন দুই বাড়ির মেয়ে হলেও কোনটা যে কার বাড়ি, কার বাড়িতে কে কতদিন থাকছে সেটা কারোই মনে থাকতো না। আর আজকে সাত বছর পরে ও আবারও মোনাদের বাসায় এসে হাজির হয়েছে।

কলিংবেলটা টিপ দিতে গিয়ে হাতটা একটু যেন কেঁপে উঠলো ওর৷ সেই সাথে একটু একটু করে মনের ভেতরে অদ্ভুত বিষাদ ছেয়ে যেতে লাগলো। মোনা এই বাসায় নেই ভাবতেই চোখে পানি এল। দরজা খোলার আগেই লিসার চোখ দিয়ে পানি গড়াতে শুরু করলো।

দরজাটা খুলতেই লিসা ওর মীরু চাচীকে দেখতে পেল৷ এই সাত বছরে এই মানুষটাকে এই প্রথম দেখতে পেল। সম্পর্কে চাচী হলেও মীরু চাচী ওকে কোনদিন কম আদর করে নি। মোনাকে যতখানি ভালবাসতো ওকেও ততখানিই ভালবাসতো।
লিসা বলল, কেমন আছো আম্মু?

নিজের মাকে মা বলে ডাকলেও মীরু চাচীকে সে আম্মু বলেই ডাকতো সব সময়।
মীরু চাচী প্রথমে কিছু সময় নিজের চোখকে যেন বিশ্বাস করতে পারছিলেন না। এতো দিন পরে তার আরেক মেয়ে তার কাছে ফিরে এসেছে। তিনি এবার সজোরে লিসাকে জড়িয়ে ধরলেন। তারপর হাউমাউ করে কান্না জুড়ে দিলেন। কতদিন পরে তিনি লিসাকে দেখতে পেয়েছেন।

মোনা আর লিসার বাবারা দুজন আপন ভাই। দুজনের বয়সের পার্থক্য মাত্র দেড় বছর। দুই ভাইয়ের ভেতরে তাই মিল খুব ছিল সব সময়৷ সেই মিল টা প্রথমে তাদের বউদের মাঝে এবং পরবর্তীতে নিজেদের মেয়েদের মাঝেও প্রবাহিত হয়। দুই ভাইয়ের মাঝে এতোই মিল ছিল যে নিজেদের মেয়েদের নামও রাখলেন মিলিয়ে। মোনা আর লিসা। যদিও লিসার থেকে মোনা কয়েক মাসের বড় তবুও দুই বোন একই সাথে একই ভাবে মানুষ হয়েছে যেভাবে তার বাবারা হয়েছে।

মীরু চাচী অনেক সময় কান্না কাটি করে থামলেন। তারপর বললেন, তুই আসবি, কেউ বলে নি তো?
লিসা শুকনো হাসি হাসলো। তারপর বলল, কেউ জানে না৷
-কেউ জানে না?
-সবার আগে তোমাদের বাসায় এসেছি।
-মোনার খবর আমি গত সপ্তাহে জানতে পেরেছি।

আবারও লিসার চোখ দিয়ে পানি গড়িয়ে পড়লো৷ ওর এখনো ঠিক বিশ্বাস হচ্ছে না যে মোনা আর ওদের মাঝে নেই।
লিসা হুয়ের একটা প্রজেক্টে কাজ করছিল গত দুই বছর। ওর কাজের স্থানটা এতোই প্রত্যন্ত অঞ্চলে যে সেখানে যোগাযোগের কোন মাধ্যম নেই। পুরো টিম নিয়ে গভীর জঙ্গলে থাকতে হত। লিসা স্বইচ্ছেতেই এই নির্বাসনের জীবন বেঁছে নিয়েছিল। পরিচিত সবার কাছ থেকে পালিয়ে থাকতে চাইছিলো ও। কিন্তু এইভাবে মোনা যে ওদের ছেড়ে চলে যাবে সেটা ভাবেও নি কোনদিন।

আরেক দফা কান্নাকাটির পরে মীরু চাচী বলল, জানি না কার নজর লেগেছে আমার মেয়ের জীবনটাতে। এতো সুন্দর জীবন ছিল আমার মেয়ের, এতো সুখী ছিল কিন্তু সুখ বেশিদিন সইলো না আমার মেয়ের কপালে!
আরও কিছু বলতে যাচ্ছিলো তার আগেই একটা বাচ্চার কান্নার আওয়াজ ভেসে এল ঘরের ভেতর থেকে। সাথে সাথেই লিসার বুকের ভেতরটা মোচড় দিয়ে উঠলো। চাচীর দিকে তাকিয়ে বলল, অপু কি এখানে থাকে এখন?
মীরু চাচী বলল, হ্যা এখানেই থাকে এখন। তোর চাচাই বলেছে। এতুটুকু বাচ্চা তো আর একা একা মানুষ করতে পারবে না। আর আমাদেরই বা আর কে আছে বল, তুই তো সবাইকে ছেড়ে চলেই গেলি। এখন এই অপু আর ওদের মেয়েকে নিয়েই বেঁচে আছি আমরা।
কথা বলতে বলতেই ওরা পাশের ঘরে এসে হাজির হল। বিছানার পাশেই একটা ছোট্ট দোলনা। সেখানে একটা ফুটফুটে বাচ্চা শুয়ে আছে আর হাত পা ছুড়ছে। সেই সাথে চিৎকার করে চলেছে। চাচী কোলে নিলেন বটে তবে কান্না থামলো না। মীরু চাচী বলল, একেবারে মোনার মতই হয়েছে৷ ছোট বেলাতে ও যেমন একবার কান্না শুরু করলে আর থামতো না, টয়ারও তাই।

লিসা তখনও তাকিয়ে আছে টয়ার দিকে। তারপর চাচীর হাত থেকে টয়াকে কোলে নিল৷ আর সাথে সাথেই টয়ার কান্না থেমে গেল৷ টয়া চোক বড় বড় করে লিসাকে দেখতে লাগলো। তারপর ফিক করে হেসে দিল। হাসিটা দেখে লিসার মনের ভেতরে আবারও সেই মোচড় দিয়ে উঠলো। তবে সেটা অল্প সময় স্থায়ী হল কেবল। টয়াকে বুকের সাথে জড়িয়ে আদর করতে শুরু করলো । মনে হল যেন নিজের মেয়েই ।

মোনা আর লিসার ভেতরে সব কিছুতেই মিল যেন ছিল তেমনি কিছু অমিলও ছিল । লিসা সব সময়ই একটু হই হুল্লোড় করতে পছন্দ করতো অন্য দিকে মোনা একটু সুস্থির । দুনিয়ার সব ঝামেলা লিসা পাকিয়ে আসলে মোনার কাজই হচ্ছে সেই ঝামেলা থেকে লিসাকে রক্ষা করা । লিসার সব সময় বাইরের দিকটার প্রতি বেশি ঝোক ছিল । ওর কথা ছিল যে জিনিস দেখতে ভাল না সে জিনিসের কোন দাম নেই । কিন্তু মোনা বাইরের চাকচিক্য থেকেও ভেতরের পূর্ণতাকে পছন্দ করতো । একটা ব্যাপারে ওদের একদমই মিল ছিল না সেটা হচ্ছে সঙ্গী নির্বাচন । লিসার পছন্দ ছিল হ্যান্ডসাম সুপুরুষ অন্য দিকে মোনা ভেতরের মানুষটাকে পছন্দ করতো বেশি । বাইরে একটু কম হলেও চলবে । যখন ওদের পড়াশুনা শেষের দিকে তখনই দুজনের দুটো প্রেমিক জুটে গেল । একদিন গেট টুগেদারে দুই বোনের দুই প্রেমিক এক জায়গাতেও হল । লিসার প্রথম দর্শনেই অপুকে পছন্দ হল না । তার তুলনাতে ওর নিজের বয়ফ্রেন্ড আদনান কত এগিয়ে । দেশের নাম করা মডেল । সামনেই নিজের মুভির কাজ শুরু হবে । অন্য দিকে মোনার প্রেমিক একেবারে ছপোষা । পেশায় ব্যাংকার । দেখতে শুনতে খারাপ না তবে লিসার মনে হল মোনা এর থেকে ভালো কিছু ডিজার্ভ করে । রাতের বেলা এই কথাটাই মোনাকে বলল।
এই কথাটা শুনে মোনা এবার একটু রেগেই গেল । বলল, আমার পছন্দ টা আমাকে নিয়ে ভাবতে দে তুই । তোর পছন্দ আর আমার পছন্দ তো এক হবে না !
লিসা একটু অবাক হল । অপুর ব্যাপারে খারাপ কিছু বলেছে বলে মোনার সেটা পছন্দ হয় নি । মোনা বলল, শোন আমার পার্ফেক্ট ওয়ান দরকার নেই, আমার পার্মানেন্ট ওয়ান দরকার । তোর আদনান পারফেক্ট হতে পারে কিন্তু সে পার্মানেন্ট ওয়ান না ।

লিসা কিছু বলতে গিয়েও থেমে গেল। আদনানের ব্যাপারে মোনা যে কথাটা বলেছে সেটা একেবারে যে মিথ্যা সেটা কিন্তু না । আদনানের চরিত্রগত একটু সমস্যা আছে সে জানে । তবে লিসা এটা নিয়ে খুব একটা মাথা ঘামায় নি । তার কাছে মনে হয় সব পুরুষ মানুষেরই একটু আধটু চরিত্রগত সমস্যা আছে । সময় সুযোগ পেলে ঠিকই সেটা বের হয়ে আসে । লিসা বলল, তার মানে বলতে চাস তোর অপুর মাঝে কোন দোষ নেই?
-দোষ নেই বলছি । সে অনেক দিক দিয়েই পারফেক্ট না । কিন্তু শতভাগ লয়াল !
-রিয়্যালি?
-অবশ্যই ।
-শোন কোন পুরুষ মানুষ শতভাগ লয়্যাল না ।
-আমার টা শতভাগ !
-আচ্ছা যদি এই লয়্যালিটি আমি ভাঙ্গতে পারি?
-চেষ্টা করে দেখ । যদি ওকে সামান্যতম বিচ্চুতো করতে পারিস তাহলে ওকে ছেড়ে দিবো ।
-ওকে ডান । এক মাস সময় নিলাম । এর ভেতরে দেখবি ও তোকে রেখে আমাকে মেসেজ করা শুরু করেছে নয়তো আামর সাথে শুতে চেয়েছে ।
-এক মাস না ছয় মাস দিলাম ।
-এর ভেতর তুই আমার ওকে সাবধান করে দিও না ।
-সে চিন্তা নেই ।

এরপরই লিসা অপুর পেছনে লেগে গেল । একদিন দুইদিন তিনদিন ! প্রথম প্রথম অপু স্বাভাবিক ভাবেই লিসার সাথে কথা বলতো । মোনার বোন হিসাবে তার কথা বলাতে কোন সমস্যা নেই । কিন্তু লিসা যখন ঘনিষ্ঠ হওয়ার চেষ্টা করলো তখন অপু খানিকটা সামলে নিল । একদিন মোনাকে বলল, তোমার বোন লিসা !
-হুম । লিসা । কি হয়েছে?
-মানে কেমন সে?
-কেমন মানে কি? এটা কি ধরনের প্রশ্ন ?
-না মানে কদিন থেকে কেমন যেন অস্বাভাবিক আচরন করছে । তোমার বোন বলে কিছু বলছি না ।
মোনা মনে মনে হাসলো । সেই একটু খুশিও হল । লিসাকে সে খুব ভাল করেই চেনে । কোন ছেলেকে তার প্রেমে ফেলতে দুই তিন দিনের বেশি সময় লাগে না । সেখানে বাজি ধরার পর আজকে ২৭ দিন হয়ে গেছে । লিসা কিছু করতে পারে নি । মনে মনে নিজের উপর একটু গর্বই হল ।
এদিকে লিসার একটু মাথা গরম । স্কুল কলেজ থেকে যে কোন ছেলেকে নাকে দড়ি দিয়ে ঘোরাতে ওর খুব বেশি সময় লাগতো না । কিন্তু এই ২৭ দিনে সে সব রকম চেষ্টা করেছে কিন্তু লাভ হয় নি । অপু সব সময়ই একটা সুক্ষ দুরত্ব রেখে চলেছে ওর সাথে । গতদিন হাজির হয়েছিলো অপুর অফিসে । ওকে দেখে একটু অবাক হয়েছিলো সে । জানতে চাইলো, হঠাৎ এখানে?
লিসা বলল, তোমার নিচের ফ্লোরে এসেছিলাম । ভাবলাম দেখা করে যাই ।
-ও আচ্ছা । কিছু খাবে ?
-চল লাঞ্চ করিএক সাথে ।
একটু ইতস্তত করে রাজি হয়ে গেল । রুফটপ রেস্টুরেন্টে নিয়ে গেল । খাওয়া দাওয়ার ফাঁকে গল্প চলতে লাগলো । এক সময় লিসা হঠাৎ বলল, আমাকে তোমার কেমন লাগে?
-কেমন লাগে বলতে ? তুমি চমৎকার মেয়ে ! দেখতে শুনতে আচার আচরনে পড়াশুনাতে সব কিছুতেই পারফেক্ট ।
-মোনার থেকেও?
অপু একটু থামলো । তাকিয়ে রইলো লিসার দিকে । একটু যেন বুঝতে চেষ্টা করছে লিসা আসলে কি বলতে চাইছে । তারপর বলল, হয়তো ।
লিসার মনে হল এই তো লাইনে আসছে । সে এবার বলল, তোমার ইচ্ছে হয় না আমার সাথে সময় কাটাতে । আই মিন মোনার থেকে আমি যে বেশি সুন্দরী আর বেশি স্টাইলিস সেটা তো তুমি মানো । নাকি?

অপু এবার আরও লম্বা সময় তাকিয়ে রইলো লিসার দিকে । তারপর বলল, তুমি মোনার থেকে বেশি সুন্দরী, আবডেটে হতে পারো তবে এটা আমার মূল্যহীন । আমি মোনার সাথে কমিটেড এটা তুমি জানো !
-আরে রাখো । কমিটমেন্ট আজকে আছে কালকে নেই ।
-তোমার কাছে আমার কাছে না । শোন তুমি মোনার বোন বলে তোমার সাথে খারাপ ব্যবহার আমি করলাম না । কিন্তু এরপর থেকে আর কোন দিন আমার সামনে তুমি আসবে না । নয়তো এক থাপ্পড় দিয়ে দাঁত খুলে ফেলবো ।

লিসাকে ওখানে রেখেই অপু উঠে গেল । লিসা রাগ আর লজ্জায় লাল হয়ে বসে রইলো সেখানেই ।

ওর রাগটা আরও বেড়ে গেল যখন মোনা ওকে নিয়ে আরও হাসাহাসি করতে শুরু করলো । নিজেকে পরাজিত মনে হল । এতো তীব্র ভাবে অপমানিত আর নিজেকে মনে হয় নি কোন দিন ।

এরপর থেকে লিসা একটা ব্যাপার হঠাৎ আবিস্কার করলো । সেটা হচ্ছে সে নিজে অপুর প্রেমে পড়েছে এবং এটা কোন জেদ থেকে নয় সত্যিই সত্যিই । ওর মনে তখন অপু ছাড়া আর কিছু নেই । আদনানের সাথে ব্রেকআপ করে ফেলল । অন্য সব কিছু থেকে নিজেকে আলাদা করে নিল । ওর মনে তখন কেবল অপু ছাড়া আর কিছু নেই । ওর কেবল তখন একটাই চাওয়া যে কোন ভাবে ওর অপুকে চাই ই চাই ।

তারপর লিসা সব থেকে ভয়ংকর কাজটা করলো । সেদিন মোনার বাবার ম্যারেজএনেভার্সারি ছিল । অনেককেই দাওয়াত করা হয়েছিলো । অপুও এসেছিল । তবে অপুর এতো মানুষের ভীড় ভাল না লাগাতে মোনা ওকে নিজের ঘরে বসতে বলেছিলো । সেখানেই বসে ছিল সে । সুযোগ মত লিসা ঢুকে গেল ঘরে । এবং দরজা আটকে দিল ।

অপু ওকে ঘরে ঢুকতে আর দরজা আটকাতে দেখে বলল, কি লিসা দরজা আটকালে কেন?
লিসা সেই প্রশ্নের জবাব না দিয়ে বলল, আজকে তোমাকে আমার চাই ই চাই ।
-লিসা সামনে থেকে সর । তোমাকে আমার সামনে আসতে মানা করেছি ।
-সরবো না । কি করবে তুমি ? তোমার সামনে দুইটা পথ খোলা আছে । এক আমাকে কাছে টেনে নাও নয়তো এখনই আমি চিৎকার করবো । বলবো যে তুমি আমার উপরে জোর জবরদস্তি করছো। তখন মোনাকেও হারাবে তুমি !

এই বলে লিসা অপুকে জড়িয়ে ধরতে গেল । অপুর মুখটা লাল হয়ে গেসে ততক্ষনে । কষে একটা চড় মারলো লিসার গালে । খাটের উপরে পরে গিয়ে লিসা হিংস্র চোখে তাকালো অপুর দিকে । ঠিক সেই সময়েই দরজাতে কড়া নড়লো । লিসা দৌড়ে গিয়ে দরজা খুলে দেখতে পেল মোনা দাড়িয়ে । ওর হাতে নাস্তার ট্রে । মোনাকে দেখেই লিসা বলল, তোর প্রেমিক আমার উপর কি করছে দেখ ….

মোনা একবার লিসার দিকে তাকালো তারপর অপুর দিকে । খুব শান্ত ভাবে সে দরজা দিয়ে ভেতরে ঢুকলো । ট্রেটা টেবিলের উপরে রেখে লিসার দিকে ফিরে তাকালো । তারপর বলল, তুই আমার বোন এটা ভাবতে ঘেন্না লাগছে । এতো নিচে নামবি তুই ভাবি নি । ইউ ব্লাডি হোর ! সবাইকে নিজের মত কেন ভাবিস তুই ? কেন ভাবিস যে সবাই তোর সাথে শুতে চাইবে !
অপু মোনার কাধে হাত রাখলো । তারপর বলল, শান্ত হোও মোনা ।
-কি শান্ত হব আমি ! বল কি শান্ত হব ! নিজের বোন হয়ে এই কাজটা কিভাবে করতে পারলো ?
-বাদ দাও !
এবার মোনা আবারও লিসার দিকে তাকালো । তুই এখনই আমার বাসা থেকে চলে যাবি । তোর মুখ আমি আর কোনদিন দেখতে চাই না !

লিসা সেদিন আর একটা কথাও বলে নি । চুপ করে রুম থেকে বের হয়ে গেল । তারপর নিজের বাসায় চলে গেল ।

এরপর আরও মাস ছয়েক ছিল সে ঢাকাতে । হঠাৎ করেই হুয়ের একটা প্রজেক্টে কাজ পেয়ে যায় । প্রথমে বছর খানেক সে কক্সবাজারে কাজ করে এবং সেখানে থেকে আফ্রিকাতে চলে যায় । সবার সাথে যোগাযোগ একেবারে কমিয়ে দেয় । ওদের বাবা মা মোনার সাথে এই ঝামেলার কথা কিছুই জানতো না । তাই তারা কিছু টের পেল না । এরপর মোনার বিয়ে হল । বিয়ের খবর সে পেয়েছিলো । তবে আসে নি । সে জানে মোনার সাথে অপুর সুখের সংসার সে সহ্য করতে পারবে না। এর থেকে দুরেই থাকুক । এরপর দেখতে দেখতে আরও কয়েক বছর কেটে গেল । সপ্তাহ দুয়েক আগে খবর পেল যে মোনা বাচ্চা হতে গিয়ে মারা গিয়েছে । খবরটা জানার পরে আর কিছুতেই নিজেকে ধরে রাখতে পারে নি । ছুটে চলে এসেছে দেশে ।

বিকেল বেলা অপুর সাথে দেখা হল । অফিস থেকে বাসায় এসে লিসাকে দেখতে পেল । ওকে এখানে দেখে একটু অবাকই হল । লিসার কোলে তখনও টয়া রয়েছে । টয়াকে কোলে নিয়েই সে পুরোটা সময় রয়েছে । মনে হচ্ছে যেন নিজের মেয়েকেই কোলে নিয়েছে । মোনার সাথে শেষ সাতটা বছর দেখা না হলেও সে তো নিজের বোনই ছিল । লিসা একটা সময় ঠিকই বুঝতে পেরেছে মোনা যা করেছে সেটা মোটেই কোন ভুল আচরন ছিল না । বরং সব দোষ লিসারই ছিল । সে ঐ রকম আচরণ না করলেই পারতো ! ও যা করেছিলো সেই সময়ে সেটা কোন ভাবেই গ্রহনযোগ্য ছিল না । কিন্তু মোনা তো ওকে বুঝতে পারতো একটু ! মোনার উপরে রাগ ছিল ওর কিন্তু মোনা তো তার আপন মানুষই ছিল ।

-কেমন আছো অপু?
অপু কাছে এসে টয়াকে একটু আদর করলো । টয়া একবার চোখ তুলে তাকালো অপুর দিকে। তারপর আবারও চোখ বন্ধ করে ফেলল । লিসার কোলের যেন একটা শান্তিময় আশ্রয় খুজে পেয়েছে সে । অপু বলল, তুমি এতো দেরি করে আসলে!
-আমি জানতামই না ।

লিসার মনে একটা ভয় ছিল যে অপু বুঝি ওকে দেখে রেগে যাবে কিংবা ওর কাছ থেকে টয়াকে নিয়ে যাবে । কিন্তু এমন কিছুই অপু করলো না । বরং টয়া যেন ওর কাছেই থাকবে এটাই স্বাভাবিক একটা ব্যাপার এমন একটা ভাব করে অপু ভেতরে চলে গেল ।

পরের একটা মাস লিসার কেবল মনে হল যে টয়া সত্যিই সত্যিই তার মেয়ে । টয়াও লিসাকে ছাড়া কিছুই বুঝতে চায় না । একটু কাছ ছাড়া হলেই চিৎকার শুরু করে । আস্তে আস্তে পরিবারটা মোনার শোক কাটিয়ে উঠতে শুরু করলো । টয়ার বয়স যখন ছয় মাস তখন প্রথম টয়া লিসাকে মা বলে ডাকলো । মা মাম্মা ! লিসার বুকের ভেতরটা কেমন করে উঠলো লিসা বলতে পারলো না । সে নিজেও বাচ্চাদের মত সবাইকে ডেকে শোনাতে লাগলো যে টয়া ওকে মা বলে ডেকেছে ।

ঐদিন রাতেই কথাটা উঠলো । খাবার টেবিলে অপু খাচ্ছিলো চুপচাপ । লিসা টয়াকে নিয়ে ব্যস্ত । নিজে খাচ্ছে আর ওর সাথে খেলা করছে । মীরু চাচী প্রথম কথাটা তুলল । অপুর দিকে তাকিয়ে বলল, কিছু ভেবেছো বাবা?
-মা এসব নিয়ে আর কিছু ভাবতে চাই না ।
-এভাবে বললে তো হবে না । বাবা । জীবন এভাবে চলবে না ।
-আমার চলে যাবে।
-তাই বললে কি হয় । আর টয়ার কথাও একটু ভাবো ।
-ওর কথা ভেবেই আর কিছু করতে চাই না ।
মীরু চাচী একবার লিসার দিকে আরেকবার তার স্বামীর দিকে তাকালেন । তারপর অপুর দিকে তাকিয়ে বললেন, আমরা চাই তুমি আবারও বিয়ে কর !
-কি বিয়ে কর।
-বিয়ে ! মাথা খারাপ মা । আর বিয়ে না ।
এবার মোনার বাবা কথা বলল, শোন বাবা আমরা তোমাকে আমাদের ছেলের মত দেখি । তোমার বাবার সাথে আমার কথা হয়েছে । তিনিও মত দিয়েছেন। আমরা সবাই চাই তুমি আবার বিয়ে কর । এবং আমরা চাই তুমি লিসাকে বিয়ে কর !

লিসা চোখ একবার তাকালো অপুর দিকে । বিয়ের কথা সে নিজেই তার বাবাকে বলেছে । এবং পরে দুই ভাই এই বিষয়ে একমত হয়েছে । মোনার বাবা বললেন, তুমি আমার মেয়ে কে কেমন ভালোবাসতে আমরা জানি । কিন্তু এভাবে জীবন চলবে না । চলতে পারেনা । লিসার সাথে যদি বিয়ে হয় তাহলে তুমি আমাদের ছেলে হয়ে থাকবে এখন যেমন আছো এবং টয়ার জন্য সব থেকে ভাল হবে এটা ।

রাতে লিসা অপুর ঘরে গিয়ে হাজির হল । বেশ রাত হয়েছে তখন । দরজায় কড়া নাড়তেই দরজা খুলে দিলো অপু ।
এটা সেই ঘর যেখানে শেষ বারের মত ওদের দেখা হয়েছিলো । এখানেই মোনা ওকে বেরিয়ে যেতে বলেছিলো ।
লিসা কিছু বলার আগে অপু বলল, মোনা কিভাবে যেন টের পেয়ে গিয়েছিলো ও মারা যাবে । মানুষ মারা যাওয়ার আগে বুঝতে পারে । শেষে সময়ে ও কি বলেছিলো জানো?
-কি?
-বলেছিলো আমাদের মেয়ের জন্য সব চেয়ে ভাল মা হবে তুমি। বলেছিলো ওকে যেমন করে তুমি ভালবাসতে ওর মেয়েকেও তুমি তেমন করে ভালোবাসবে । ও যেন সব জানতো । তুমি আসবে, টয়াকে দেখবে, আমাদের বাসা থেকে বিয়ের জন্য বলবে । আমাকে শেষ অনুরোধ করে গিয়েছিলো যাতে রাজি হয়ে যাই ।
লিসা বলল, তুমি যদি রাজি না হও, আমি কিছু বলবো না । এমন কি দুঃখও পাবো না । কেবল টয়ার আম্মু হতে দাও আমাকে প্লিজ ! আর কিছু চাই না তোমার কাছে । প্লিজ ।
-টয়া তোমাকে এমনিতেই আম্মু ডাকে । আমি না চাইলেও তুমিই এখন ওর আম্মু !

এরপর লিসা একটা অদ্ভুত কাজা করলো । খানিকটা দৌড়ে আসার মত করেই অপুকে জড়িয়ে ধরলো । শেষবার এমন করতে গিয়ে অপু ওকে চড় মেরেছিলো তবে এইবার কিছু করলো না । একটু যে অবাক হয় নি সেটা না তবে একটু পরে লিসা অনুভব করলো অপুর হাত দুটো লিসাকে জড়িয়ে ধরেছে । লিসা কাঁদতে কাঁদতে বলল, আমি কোন দিন তোমাকে এভাবে পেতে চাই নি অপু । কোন দিন না । মোনা আমার সব থেকে কাছের মানুষ ছিল । সব থেকে আপন । আপন ছিল বলেই হয়তো অভিমানটা বেশি ছিল কিন্তু ওর কিছু হোক এমনটা কোন দিন চাই নি ।
-আমি জানি ।
-আমি কোন দিন তোমার উপর নিজের কর্তৃত্ব দাবী করবো না । মোনার থাকবে তুমি সারাটা জীবন । আমাকে কেবল একটু স্থান দিও তোমার কাছে আর কিছু না ।

পরিশিষ্ঠঃ

আরও তিন মাস পরে ওদের বিয়ে হল । ঠিক আগের মত করেই অনুষ্ঠান করে । লিসা বউ সাজলো টয়াকে নিয়ে। বিয়ের পুরোটা সময় টয়া ওর কাছেই ছিল একদম । টয়া এখনও লিসাকে ছাড়া কিছু বোঝে না । সকাল থেকে শুরু করে রাতের ঘুম পর্যন্ত টয়া একেবারে আঠার মত লেগে থাকে লিসার সাথে । বাইরে থেকে কেউ দেখলে কোন দিন বুঝতেই পারবে না যে টয়া লিসার মেয়ে না । আর কোনদিন কেউ বলবেও না ।

How useful was this post?

Click on a star to rate it!

Average rating 4.4 / 5. Vote count: 39

No votes so far! Be the first to rate this post.

Related Posts

3 thoughts on “মোনা-লিসা

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *