অপু তানভীর

মাই ডিয়ার হোম মিনিস্টার (শেষ পর্ব)

4.1
(10)

আমাকে ঠিক আটকে কিংবা বেঁধে রাখা হয় নি । আমাকে রাখা হয়েছে একটা পুরানো ফ্যাক্টরির ভেতরে । বিশাল বড় ছাদ । চারিপাশে পুরানো কিছু মেশিন পত্র পড়ে আছে । একটা চেয়ারে বসে আছি আমি । ঘুম ভাঙ্গার পর থেকে আমি নিজেকে এখানেই আবিস্কার করি । খানিকটা সময় লেগে যায় ধাতস্ত হতে । তারপর আস্তে আস্তে মনে পড়ে আমার সাথে কি হয়েছিলো । উবারের গাড়িটা থেকে আমাকে কয়েকজন মিলে তুলে নিয়ে এসেছিলো  । তারপর হয়তো আমাকে এখানে বসিয়ে রেখেছে । 

আমার থেকে একটু দুরে দুইজন মানুষ দাড়িয়ে আছে দুইদিকে । আমি যখন প্রথমে উঠতে যাচ্ছিলাম একজন আমাকে হাতের ইশারাতে বসে থাকতে বলেছে । কয়েকবার কথা বলার চেষ্টা করেছি কিন্তু খুব একটা লাভ হয় নি । তারা কোন কথা বলে নি । মাথার উপর একটা অল্প পাওয়ারের বাল্ব জ্বলছে । আর কোন আলো নেই । আমি চুপচাপ বসে রয়েছি । কিছু বুঝতে পারছি না কি আমার সাথে আসলে কি হতে চলেছে ! সত্যিই কি আমি মারা যাবো ! এবার সত্যিই কি নিকিতা আমাকে গুম করে দিবে ?

আমি আবারও আমার দুই পাশের মানুষ দুজনের দিকে তাকালাম । একবার মনে হল আমি উঠে গিয়ে একজনের উপর হামলা করে পালিয়ে যাওর চেষ্টা করি । কিন্তু পরে সেই সম্ভাবনা বাদ দিয়ে দিলাম । এই দুজনের সাথে আমি কোন ভাবেই পেরে উঠবো না । আর নিশ্চয়ই বাইরে আরও অনেকেই আছে । এরা কারো আসার জন্য অপেক্ষা করছে । নিকিতার নিশ্চয়ই । আমার সাথে হয়তো শেষ কয়েকটা কথা বলার দরজার !

হাতের ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখি সন্ধ্যা পার হয়ে গেছে অনেক আগেই । এখন বাইরে বেশ রাত । আমাকে ঠিক কোথায় নিয়ে এসেছে সেটা আমার জানা নেই । শহর থেকে দুরেই হবে । এমন কোন জায়গা যেখানে চিৎকারের আওয়াজ কারো কানে যাবে না । এমন কি গুলির আওয়াজও হয়তো কেউ শুনতে পাবে না ।

গাড়িতে যখন আমি চেতনা হারাতে শুরু করি তখনই আমার মাথায় সব কিছু পরিস্কার হয়ে গিয়েছিলো । বিশেষ করে ফেসবুকে আমাদের ঐ ছবি পোস্ট করার মধ্যে নিকিতা সবাইকে বুঝিয়েছে যে আমাদের মাঝে যে ঝামেলা চলছিলো সেটা শেষ হয়ে গিয়েছে । এমন সময় যদি আমাকে মৃত অবস্থায় পাওয়া যায় তাহলে পুরো দেশের সিম্প্যাথি যাবে নিকিতার দিকে । আমি গোবেচারা সাধারণ মানুষ । আমাকে মেরে ফেলার কোন কারন নেই কারো । যদি আমাকে কেউ মারতে চায় সেটা হবে আমি নিকিতার আপন মানুষ বলেই । আমি মারা গেলে বিরোধী দলের উপর পুরো নেগেটিভ মনভাব সৃষ্টি হবে । আমজনতা কোনটা সত্য আর কোনটা মিথ্যা এতো চিন্তা ভাবনা করবে না । যদি তখন আম জনতাকে ঠিক ভাবে বোঝানো যায় যে তাদের জন্য কাজ করতে গিয়েই নিকিতা আমাকে হারিয়েছে তাহলে নিকিতার প্রতি তাদের সমর্থন আরও বহুগুণে বেড়ে যাবে ! কারোই কিছু যাবে আসবে না ঠিক, মাঝ খান দিয়ে আমি হব বলির পাঠা !

তবে আমার মনে একটা ক্ষিণ আশা আছে যে হয়তো আজকেই আমাকে মেরে ফেলা হবে না । আমাকে এখানে আটকে রাখতে পারবে কিছু দিন । তারপর …

আমি আর ভাবতে চাইলাম না । আমার সাথে আসলে কি হবে সেটা আর এখন আমার হাতে নেই । আমার কিছু করারও নেই ।

চেয়ারে একভাবে বসেই রইলাম । কখন যে চোখ লেগে এল আমি টেরও পায় নি । ঘুমটা ভেঙ্গে গেল গাড়ির শব্দে । আমি চোখ মেলে তাকাতেই টের পেলাম যে আমার পাশের দুইজন মানুষের মধ্যেও চাঞ্চল্য দেখা দিয়েছে ।

আমি অপেক্ষা করতে থাকি ! এখনই নিশ্চয়ই নিকিতা এসে হাজির হবে !

আচ্ছা মেয়েটা কি আমার চোখের দিকে তাকিয়ে কথা বলতে পারবে ?

পারবে সম্ভবত !

আমি অপেক্ষা করতে থাকি ! কয়েকটা মুহুর্ত কেটে যায় এমনি ভাবে !

কিন্তু আমাকে অবাক করে দিয়ে ফ্যাক্টরিতে ঢুকে নিকিতার বাবা আজাহার আহমেদ । বাবা মেয়ের মিলিত কাজা । কিন্তু আরও কয়েক মূহুর্ত যাওয়ার পরে আমি আবিস্কার করলাম যে নিকিতা তার পেছনে নেই । সে একাই এসেছে । আমাকে পেছনে তাকিয়ে থাকতে দেখে আজাহার আহমেদ বলল, আর কেউ আসে নি । আমি একাই !

আমি কোন কথা না বলে তাকিয়ে রইলাম । আজাহার আহমেদ বলল

-তোমার মনে কৌতুহল হচ্ছে না যে কেন তোমাকে এখানে আনা হয়েছে ?

-কৌতুহল হয়ে লাভ কি ?

আজাহার আহমেদ হাসলো । তারপর বলল

-যে কারনটার জন্য মারা যাচ্ছো সেটা জানবে না ?

আমি কিছু সময় তার চেহারার দিকে তাকিয়ে রইলাম । তারপর বললাম

-নিকিতা এসবের কিছুই জানে না । তাই না ?

-হ্যা সে জানে না ! প্রথমবার তোমার উপর হামলা হওয়ার পর সে উঠে পড়ে লেগেছিলো এটার পেছনে কে সেটা খুজে বের করার জন্য । এখনও চেষ্টা করে চলেছে । কি বোকাই না আমার মেয়েটা ! দেশের এতো বড় পদে আছে কিন্তু সে বুঝতেও পারছে না সব কিছু চাইলেই সে করতে পারে না ।

আমি কেমন অবিশ্বাসের চোখেই তাকিয়ে রইলাম আজাহার সাহেবের দিকে । আমি নিজে কানে নিকিতার আওয়াজ শুনেছি । এই ভদ্রলোক এখন কি বোঝাতে চাইছে । আমার চেহারাতে হয়তো এমন কিছু ছিল যেটা সে বুঝতে পারলো । আমার দিকে তাকিয়ে বলল

-তোমাকে মিথ্যা বলে আমার কি লাভ ? কিছুক্ষণের মাঝেই তুমি মারা যাবে ।

তাও অবশ্য ঠিক । কিছু সময়ের মাঝেই আমি মারা যাবো । আমাকে মিথ্যা বলার কোন কারন নেই । আজাহার আহমেদ বলল

-হ্যা তোমার সাথে পরিচয় তোমার সাথে প্রেম মানুষজনকে জানানো এসব নিকিতার বুদ্ধি ছিল কিন্তু যখন ওর বুদ্ধিটা কাজে দিতে শুরু করলো তখনই আমার মাথায় আরও বড় কিছু এসে হাজির হল । আমি নিজের পরিকল্পনা সাজাতে শুরু করলাম। যদি নিকিতার কাছ থেকে আড়াল করে এসব করা খুব সহজ ছিল না । তবে সম্ভব হয়েছে ।

আজাহার আহমেদ চোখের ইশারা করতেই আমার বাম পাশের লোকটা তার কাছে এগিয়ে গেল । নিজের কোমর থেকে পিস্তলটা বের করে তার হাতে দিল । আমি তাকিয়েই রইলাম ।

আজাহার আহমেদ পিস্তলটা হাতে নিয়ে কিছু সময় নাড়াচাড়া করলো । তারপর বলল, মৃত্যর রাজনীতির মাঠে অনেক বড় একটা হাতিয়ার । এই এক হাতিয়ার ব্যাপার করে অনেক কিছু করা সম্ভব । শোক সেন্টিমেন্ট পাব্লিককে ম্যানুপুলেট করতে খুব সাহায্য করে ! জানোই তো ! অন্যেরা অনেক করেছে । কেবল এই এক কথা সেন্টিমেন্ট দিয়ে তারা নিজেদের কত অকাজকে জায়েজ করে নিয়েছে । পাব্লিক সেটা মেনেও নিয়েছে ।

 আজাহার সাহেব আমার দিকে পিস্তল তাক করলো । আমি সাথে সাথে চোখ বন্ধ করে ফেললাম । আর কিছু সময় পরেই গুলির আওয়াজ শুনতে পেলাম । আমার বুকের ভেতরটা কেঁপে উঠলো মুহুর্তেই । মায়ের মুখটা দেখতে ইচ্ছে হল । নিকিতারকেও দেখতে ইচ্ছে হল !

কিন্তু কয়েক মুহুর্ত কেটে যাওয়ার পরেও লক্ষ্য করলাম যে আমি কোন ব্যাথা অনুভব করছি না । এর আগেও আমি গুলি খেয়েছি । সেটার ব্যাথাটা কেমন সেই ব্যাপারে আমার পরিস্কার ধারনা আছে ।

চোখ মেলে তাকাতেই আমার চোখ গেল আজাহার আহমেদের দিকে । সে শান্ত চোখে পিস্তল তাক করে দাড়িয়ে আছে । তবে সেটা আমার দিকে নয় । যে লোকটা পিস্তল এগিয়ে দিয়েছিলো তার দিকে । লোকটার বিস্মিত চেহারা আমি দেখতে পাচ্ছিলাম পরিস্কার । আর আমার ডান দিকে যে মানুষটা ছিল সেই লোকটা মাটিয়ে পড়ে আছে । গুলিটা তাকে করা হয়েছে ।

আমি কিছু বলতে যাবো তার আগে আজাহার আহমেদ দ্বিতীয় গুলি করলো । বিন্দুমাত্র শব্দ না করে লোকটা মাটিতে পড়ে গেল । আমি চোখ বড় বড় করে তাকিয়ে রইলাম । আজাহার আহমেদ যেন আমার বিস্মিত হওয়াটা উপভোগ করলো কিছু সময় । তারপর বলল

-কি বুঝতে পারছো না কেন করলাম ?

আমি কিছু বললাম না । আসলে কিছু বলার মত ছিল না । আজাহার আহমেদ বলল

-আমি কোন কিছুরই সাক্ষি রাখি না । রাখা ঠিক না । তোমাকে যে গুলি করেছি তাকে বাঁচিয়ে রাখি নি । নয়তো নিকিতা আমার কাছে ঠিকই পৌছে যেত !

তখনই পেছন থেকে একটা আওয়াজ শুনতে পেলাম ।

-আমি ঠিকই পৌছে গেছি !

আমি এবং আজাহার আহমেদ দুজনের চোখেই সাথে সাথে সেদিকে ঘুরে গেল । আমি অবাক হয়ে দেখলাম নিকিতা এসে হাজির হয়েছে । আজাহার আহমেদও বিস্ময় নিয়ে তাকিয়ে আছে । নিকিতা আস্তে আস্তে এগিয়ে এল আমাদের দিকে । ওর চোখের শান্ত ভাব দেখে আমার কেন জানি ভয়টা চলে গেল মুহুর্তেই । জানি না কেন তবে মনে হল নিকিতা ঠিক সব সমলে নেবে ! নিকিতা ওর বাবার দিকে তাকিয়ে বলল

-ওকে যেতে দাও বাবা ।

-বোকা মেয়ে আমি এটা তোর ভালর জন্য করছি । বুঝতে কেন পারছিস না ?

-আমার এতো ভালর দরকার নেই । যা হয়েছে যথেষ্ঠ !

-না । এটা যথেষ্ঠ না । দলের জন্য সেক্রিফাইস করতেই হয় !

নিকিতা তখন অনেকটাই কাছে চলে এসেছে । আজাহার আহমেদ বলল

-আর এগোবি না ।

-বাবা আবারও বলছি যা করেছো এখনই থামো ! আমি কাউকে নিয়ে আসি নি । একেবারে একা এসেছি । প্লিজ অপুকে যেতে দাও । আমি বাকিটা সামলে নিবো !

-আজাহার আহমেদ যেন খুব মজা পেল । বলল

-সামলে নিবি ! ভুলে যাস না যে আমি তোর বাবা । তোকে কিছু সামলাতে হবে না ।

এই বলে সে আমার দিকে পিস্তল তাক করতে গেল । আমি তখনই নিকিতার নড়াচড়া দেখতে পেলাম । ওর বাবার আগেই নিকিতা গুলি চালালো । নিকিতার গুলি লেগে মাথার উপর জ্বলতে থাকা বাল্বটা নিভে গেল । পুরো ঘরটা অন্ধকার হয়ে গেল মুহুর্তেই । তারপর আরেকটা গুলির আওয়াজ শুতে পেলাম । এটার সাথে সাথেই নিকিতার বাবার আত্মচিৎকার শুনতে পেলাম !

আমি বোকার মত কেবল দাড়িয়ে ছিলাম কিছু সময় । তারপরই আমি অনুভব করলাম কেউ এসে আমার উপর ঝাপিয়ে পরেছে । তারপরই কয়েকটা গুলির আওয়াজ শুনতে পেলাম কেবল ।

নিকিতা বলল, ওঠো ওঠো জলদি ওঠো ! আরও লোকজন থাকতে পারে !

এই বলে আমার হাত ধরেই অন্ধকারের ভেতরে দৌড় দিল । কোন দিকে দৌড় দিল আমি জান না ।

যখন দরজা দিয়ে বের হয়ে এলাম তখন পেছন দিক দিয়ে নিকিতার বাবার চিৎকার শুনতে পাচ্ছিলাম । তিনি চিৎকার করে নিকিতাকে ডাকছেন । নিকিতা অবশ্য সেদিকে কান দিল না । আমার হাত ধরে দৌড় দিল । দরজা দিয়ে বের হতেই চোখে অন্ধকার খানিকটা সয়ে এল । চাঁদের আলো না থাকলেও আবছায়া আলোতে আমি দুটো গাড়ি দেখতে পেলাম । নিকিতা আমাকে নিয়েই সেদিকে দৌড় দিল ।

গাড়িটা যখন চলতে শুরু করলো তখন আমি একটু স্থির হতে পারলাম । নিকিতা যখন দেখি তখনই আমার কেন জানি মনে হয়েছিলো এবার হয়তো বেঁচেই যাবো । তবুও খোলা পিস্তলের সামনে নিজের মনকে শান্ত রাখা খুব সহজ কোন কাজ না । কিন্তু এখন খানিকটা নিরাপদ লাগছে ।

কিন্তু নিকিতার দিকে তাকাতেই দেখি ওর শার্টের এক পাশ পাশে লাল রক্তে মাখামাখি হয়ে গেছে । আমি বললাম

-তোমার গুলি লেগেছে !

নিকিতার মুখের দিকে তাকিয়ে দেখি ও দাঁতের সাথে দাঁত চেঁপে নিজের ব্যাথা সহ্য করে আছে । কোন মতে বলল, আমি ঠিক আছি ! তুমি গাড়ি চালাও !

-আমাদের হাসপাতালে যাওয়া দরজার !

-না ! এখনও তুমি নিরাপদ নাও । আমার কিছু হবে না । পেছন পেছন আসতে পারে !

-জাহান্নামানে যাক সব !

আমি গাড়ির এক্সেলেরেটরে চাপ দিলাম । আমার সামনে আর কিছু মনে হচ্ছে না । কে আমার পিছু নিয়েছে কিংবা কে নিবে কিংবা সামনে কি হবে সেসব কিছুই আমার মাথায় এল না । আমার কেবল মনে হল আগে নিকিতাকে হাসপাতালে নিতে হবে ।

আমি বারবার নিকিতার দিকে তাকাচ্ছিলাম । ওকে জাগিয়ে রাখার চেষ্টা করছিলাম ।

নিকিতার কথা একটু একটু করে গুলিয়ে যাচ্ছিলো । একটা পর্যায়ে নিকিতা বলল,

-বাবার উপর রাগ রেখো না, কেমন ! আমার কথা ভেবে এই খারাপ কাজ গুলো করেছে । আর যদি আমার কিছু হয়ে যায় আমাকে ক্ষমা করে দিও । তোমাকে অনেক কষ্ট দিয়েছি !

আমি বললাম, চুপ ! এখন এসব কিছু ভাবতে হবে না ! একদম চুপ !

আমি কিভাবে আর কত দ্রুত গাড়ি চালিয়েছি আমি নিজেই বলতে পারি না । যখন জিএমসির ইমারজেন্সি ওয়ার্ডে আমি এসে হাজির হলাম তখন মনে হচ্ছিলো আমি আর এই পৃথিবীতে নেই । বারবার নিকিতার দিকে তাকাচ্ছিলাম । মনে মনে ভয় হচ্ছিলো হয়তো এখনই নিকিতার কিছু হয়ে যাবে !

গাড়ি থেকে নেমে নিকিতাকে বের করলাম । তারপর ওকে কোলে তুলে নিয়ে দৌড় দিলাম ! নিকিতা ততক্ষনে ব্যাথার কারনে চেতনা হারিয়ে ফেলেছে !

রক্তাক্ত দেহ দেখে ডাক্তার প্রথমে ছুটে এল । নিকিতাকে পরীক্ষা করে বলল

-এখানে তো গুলি লেগেছে ! এটাতো পুলিশ কেস ! আগে পুলিশকে খবর দিতে হবে !

আমি কিছু বলতে যাবো তার আগেই পাশে দাড়িয়ে থাকা নার্স বলল, স্যার ইনি তো নিকিতা ম্যাডাম ! আমাদের হোম মিনিস্টার !

ডাক্তার সাহেব অবাক হয়ে তাকিয়ে রইলেন কিছুটা সময় ! তারপর পকেট থেকে মোবাইল বের করে কাকে যেন ডায়েল করলো ! কয়েক মুহুর্ত পরে ফোন কানে রেখে বলল জি স্যার । এখনই আসা লাগবে ! এখনই ….

আর কোন কথা না বলে ফোন কেটে দিল সে । তারপর চিৎকার করে ওটি রেডি করতে বলল ।

মাত্র এক ঘন্টার মধ্যে কিভাবে জানি সবাই জেনে গেল যে নিকিতা হাসপাতালে রয়েছে । তাকে কে বা কারা গুলি করেছে । পুরো হাসপাতালটা যেন জন সমুদ্রে পরিনত হল । পুলিশকে হিমসিম খেতে হচ্ছিলো ভীড় সামাল দিতে ।

আমি হাসপাতালের করিডোরে বসে ছিলাম চুপচাপ । আমার মাথায় কেবল নিকিতার কথা ভাসছে । অন্ধকারের ভেতরে নিকিতা যদি আমার উপর ঝাপিয়ে না পড়তো তাহলে এই গুলিটা হয়তো আমার শরীরে লাগতো !

-স্যার !

আমি মাথা নিচু করে বসে ছিলাম । ডাক শুনে ফিরে তাকালাম । দেখি নিকিতার পিএ দাড়িয়ে আছে ।

-স্যার বাইরে ভিড়ের অবস্থা খুব খারাপ হচ্ছে ।

-আমি কি করবো ?

-এখানে কেউ নেই । ভীড় ঠেলে কেউ আসতে পারছে না । ম্যামের বাবাকেও খুজে পাওয়া যাচ্ছে না ফোনে । এখন আপনি কিছু করুন প্লিজ !

-কি করবো আমি !

-আপনি কিছুটা বলুন যাতে শান্ত হয় মানুষ ।

-আমি !

-হ্যা ! পাবলিক আপনার কথা শুনবে ! তারা আপানকে চেনে । আর এখন ম্যাডামের সব থেকে কাছের মানুষও আপনিই ।

আমি একটা দীর্ঘ নিঃশ্বাস ফেলে উঠে দাড়ালাম । নিকিতার সাথে পরিচয় হওয়ার পর আমার জীবনটা আসলেই বদলে গেছে । আমি কি কোন দিন ভেবেছিলাম আমার জীবনে এসবের মুখোমুখি হতে হবে !

যাক অভ্যাস করে নিতে হবে ! সামনের জীবনে আরও কত কি করতে হবে কে জানে !

পরিশিষ্টঃ

নিকিতার জ্ঞান ফিরলো একদিন পরে । আমি তখন বাইরে ছিলাম । আমাকে অবাক করে দিয়ে আমার নিজের মা এসে হাজির হয়েছে হাসপাতালে । নিকিতার মা আর আমার মা কেবিনে ওর কাছে ছিল । মা আমাকে বলল যে আমি বাসায় গিয়ে একটু ফ্রেস হয়ে আসি । তাই গিয়েছিলাম । ফিরে এসে দেখি নিকিতা মায়ের সাথে কথা বলছে । ডাক্তার বলল যে আমি যাওয়ার পরপরই জ্ঞান ফিরেছে । অবস্থা উন্নতির দিকে !

ঘরে ঢুকতে নিকিতা আামর দিকে তাকালো । কিছু সময় পরে মা রুম ছেড়ে বাইরে চলে গেল । আমি নিকিতার বেডের পাশে গিয়ে বসলাম । নিকিতা আমার দিকে কিছু সময় তাকিয়ে থেকে বলল, থ্যাঙ্কিউ !

-কেন ?

-সব কিছু সামাল দেওয়ার জন্য । তুমি চাইলেই সব সত্য বলতে পারতে !

আমি হাসলাম । তারপর বললাম

-আমাকে শেষ পর্যন্ত লেকচারার থেকে পলেটিশিয়ান বানিয়েই দিলে !

নিকিতা বলল

-সঙ্গদোষে লোহা ভাসে !

দুজনেই হাসলাম কথাটা শুনে !

সত্যি চাইলে আমি সত্যি কথাটাই হয়তো সবাইকে বলতে পারতাম । বলতে পারতাম যে আমার সাথে যা হয়েছে তার জন্য নিকিতার বাবা দায়ী । রাতে তিনি আমাকে গুলি করেছিলেন । নিকিতা সেটা ঠেকিয়েছে নিজের শরীর দিয়ে । জানি না এসব বললে কি হত ! তবে নিকিতার জীবনটা আরও বেশি জটিল হয়ে যেত । এটা কেন জানি করতে ইচ্ছে হল না । তাই সাংবাদিকদের বলেছি যে আমরা ওদের ফার্ম হাউজে গিয়েছিলাম নিজেদের ভেতরে কিছু সময় কাটাতে । এই সময়ে খুব সিকিউরিটি নিয়ে যায় নি । কারন নিকিতা আমাকের মাঝে কেউ থাকুক এটা পছন্দ করতো না । এই সুযোগটা নিয়েছে সন্ত্রাসীরা । হামলা করেছে । এক পর্যায়ে নিকিতার শরীরে গুলি লাগে । আমি ওকে নিয়ে কোন মতে বের আসতে সক্ষম হই ! এই গল্প বানিয়েছি ! পাবলিক সেটা বিশ্বাসও করেছে ।

নিকিতার বাবা এখন কোথায় আছে সেটা এখনও জানা যায় নি । হয়তো আছে কোথায় । সময় মত বেরিয়ে আসবে । আগে বেরিয়ে আসুক তারপর কি করা যায় সেটা চিন্তা করা যাবে ! 

নিকিতা হাসি থামিয়ে আমার দিকে তাকিয়ে রইলো চুপ করে । সেই দৃষ্টিতে আমি কোন মিথ্যা দেখতে পেলাম না । হয়তো শুরুতে সে নিজের স্বার্থের জন্যই আমাকে ব্যবহার করেছিল । কিন্তু একটা পর্যায়ে গিয়ে সেই খেলাটাই সত্যিই হয়ে গেছে তার জন্য !

How useful was this post?

Click on a star to rate it!

Average rating 4.1 / 5. Vote count: 10

No votes so far! Be the first to rate this post.

Related Posts

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *