তুমি কি ফিরে এসেছিলে ? (শেষ পর্ব)

oputanvir
4.5
(36)

কলিংবেল চাপ দেওয়ার আগেই নওরিনের আওয়াজ শুনতে পেল। মিয়াও মিয়াও ! 

নওরিন হাসল। এখনো ওর কাছে কেমন যেন অবাক লাগে। আবির ওর বেড়ালের নাম রেখেছে ওর নামে। এটা কি ও কখনও ভেবেছিল? কোন দিন ভেবেছিল আবারও আবিরের সাথে দেখা হবে। এই এতো দূর দেশে এসে সে আবার আবিরের দেখা যাবে সেটা কে জানতো ?

এতো দিনের এতো অপেক্ষা কি তাহলে সত্যিই ফল দিতে চলেছে?

নওরিন জানে এখনও কিছু ঠিক হয় নি । 

আবিরের মায়ের সেই কথা এখনও তার কানে বাজে । খুব ভাল করেই সে জানে যে সে কোন দিন তাকে মেনে নিবে না।

কিন্তু নওরিন তো নিজের কাছে অসহায় । নিজের মনের কাছে সে অসহায়! শত চেষ্টা করেও সে কোন দিন আবিরকে মনের ভেতর থেকে বের করতে পারে নি। এই সাড়ে নয় বছরে এমনে কটা দিনও সে কি আবিরকে ভুলে যেতে পারেছে? মনের ভেতরে কি অন্য কেউ কোন দিন বসতে পেরেছে? নাকি পারবে?

আমরা মানুষেরা নিজের মনেই কাছেই না কত অসহায় ! 

নওরিন জানতো আবির কোন দিন হয়ত আসবে না । তারপরেও দিনের পর দিন সে অপেক্ষা করেছে !

তুমি কি ফিরে এসেছিলে?

কাকে এই প্রশ্নটি বারবার করেছিল সে নিজেও জানে না । কতবার চোখের সামনে সে কতবার আবিরের চেহারারে ভেসে আস্তে দেখেছে? 

মিয়্যাও !

দরজা খুলে গেল !

আবির দাঁড়িয়ে রয়েছে নওরিনকে কোলে নিয়ে । দরজাটা খুলতেই নওরিন এক লাফ দিয়ে নওরিনের কোলে চলে এল । আবির সেটা দেখে বলল, দেখেছো এই কদিন ও যেন তোমার বেড়াল হয়ে গেছে । আমাকে যেন চেনেই না। 

নওরিন কেবল হাসল । 

আজকে শুক্রবার। সামনের দুইটা দিন ছুটি । সেদিনের পরে প্রাম মাস খানেক কেটে গেছে। নওরিন যদিও এখনও এখানকার জীবনে অভ্যস্ত হয়ে উঠতে পারে নি, তারপরেও একটু সামনে উঠেছে। বিশেষ করে ঠান্ডাটা এখনও ঠিক মত সহ্য হচ্ছে না। আবির বলেছে আরও কয়েকমাস লাগবে মানিয়ে উঠতে । অবশ্য নওরিন একেবারেই ফুলফান্ডে এসেছে এখানে। তাই বাইরে কাজ করার দরকার পড়ছে না। যদিও ঠিক করেছে ছুটির সময়ে সে ঠিকই একটা কাজ জুটিয়ে নিবে । মনের মত কিছু একটা পেলেই হল । 

সোফার উপর বসতে বসতে নওরিনকে নিচে নামিয়ে রাখল ও । তারপর আবিরের দিকে তাকিয়ে বলল, মা খুব রাগারাগি করেছে। 

-কবে?

-গতকাল রাতে। আমাকে বলেছে আমি যেন সব কিছু বাদ দিয়ে সামনের সপ্তাহেই ফিরে যাই। কোন ডিগ্রি নেওয়া লাগবে না।

-তুমি কী বলেছো?

-কিছু বলি নি। কিছুই তো বলার নেই। 

-নওরিন!

-হুম! 

-তোমার সেদিনের কথা মনে আছে?

-কোন দিন?

-আমাদের যেদিন শেষ বারের মত দেখা হয়েছিল, সেদিনের কথা মনে আছে তোমার?

-হুম আছে !

-ঐদিন আমি তোমাকে দেখেছিলাম আমার জন্য ঐভাবে ট্রেনের পেছন পেছন দৌড়াতে ! তুমি জানো তোমার ঐ চোখ ঐ কান্না ভেজা চোখ, আমার জন্য এই আকুলতা মিশ্রিত চোখ আমি এই আজকে পর্যন্ত একটা বারের জন্যও ভুলতে পারি নি । একটা বারের জন্যও না। 

কিছু সময় কেউ কোন কথা বলল না । নওরিন দেখতে পেল আবির সেই আগের চোখে ওর দিকে তাকিয়ে রয়েছে। নওরিন বলল, তোমার আম্মু আমাকে কোন দিন মেনে নিবে না । সে পরিস্কার ভাবেই জানিয়ে দিয়েছে ।

-আমি জানি সে কী বলেছে । তবে …… 

-তবে? 

-যদি কোন দিন তোমার সাথে বিয়ে না হয় তাহলে আমি আর কোন মেয়েকে বিয়ে করবো না। অন্য কোন মেয়েকে নিজের করে নেওয়ার ব্যাপারটা আমার পক্ষে সম্ভব না। তবে তুমি যদি আমাকে ছেড়ে চলে যেতে চাও, তোমার রাহাতের সাথে বিয়ে বসতে চাও তাহলে সেটা আমি নেমে নেব । তবে তুমি ছাড়া আর কেউ আসবে না আমার জীবনে এটা একেবারে শতভাগ নিশ্চিত ! 

নওরিনের আর কোন কিছু মনে হল না । কেবল মনে হল যে আবির যা বলছে সে একেবারে সত্যি বলছে । নওরিনের যেমন ওকে ছাড়া আর কোন ছেলেকে ভালবাসা সম্ভব না, ঠিক তেমনি ভাবে আবিরও আর কাউকে কোন দিন ভালবাসতে পারবে না। 

প্রথম বছরটা কিভাবে কেটে গেল নওরিন জানে না। আবির দেশে গিয়েছে। তবে নওরিন সামার ভ্যাকেশনে বাসায় গেল না । নওরিন খুব ভাল করেই জানে যে সে যদি দেশে ফিরে যায় তাহলে কোন ভাবেই আর ফিরে আসতে পারবে না । তাই কোন ভাবেই দেশে যাওয়া যাবে না। এর ফাকে কয়েকবার রাহাত ওর সাথে যোগাযোগ করেছে। ওকে ব্যাপারটা বুঝিয়ে বলেছে সে । কয়েকবার ক্ষমতাও চেয়েছে । 

নওরিন ঠিক করে নিয়েছে এভাবে এখানে কাটিয়ে দিবে সে । যদিও আবিরের সাথে বিয়ে নাও হয় তাহলেও । এখানে পাশাপাশি তো থাকা যাবে! ওকে দেখা যাবে। ওর সাথে প্রতিদিন কথা বলা যাবে । মন চাইলে আরও অনেক কিছু করা যাবে !

মন চাইলে আরও অনেক কিছু ! এই ব্যাপারটা মনে হতেই নওরিনের হাসি আসল ! একটু যেন লজ্জাও পেল । এখানে আসার পরে মাত্র একবার আবির ওকে জড়িয়ে ধরেছিল। এখনো চুমু পর্যন্ত খায় একটাও ! 

কবে খাবে কে জানে?

নওরিনের লজ্জা লাগে বেশ এখন ! খুব ইচ্ছে করে একেবারে পথে মাঝে ওকে জড়িয়ে ধরে চুমু খেতে । এখানে এটা খুবই স্বাভাবিক একটা ব্যাপার । তারপরেও করতে পারে না। নওরিন ঠিক করেছে, কদিন পরে দেশ থেকে ফেরার সময় ওকে এপারপোর্টে নিতে যাবে । তারপর সেখানেই চুমু খাবে। 

###

নওরিন মনে মনে একটু উত্তেজিত হয়ে আছে । একটু পরেই আবিরকে সে দেখতে পাবে । প্লেন ল্যান্ড করেই গেছে । এখন যে কোন সময় আবির গেট দিয়ে বের হয়ে আসতে পারে। আজকে যে নওরিন এখানে আসবে সেটা আবিরকে জানে না। আবিরকে বলেছিল যে ঘন্টা দুই পথ পাড়ি দিয়ে এতোদুর আসার দরকার নেই। ও বাসায় ফিরেই ওর সাথে দেখা করবে। তবে নওরিন সেটা শুনে নি। সে আবিরকে না জানিয়েই চলে এসেছে। 

নওরিন দেখতে পেল যে একে একে লোকজন দরজা দিয়ে বের হয়ে আসছে । এই তো আবির চলে আসবে। আরও মিনিট পাঁচেক অপেক্ষা করার পরে আবির বের হয়ে এল। নওরিনের বুকের ভেতরটা একটু একটু ধুক ধুক করতে লাগল । এখনও ও দৌড়ে যাবে এবং দৌড়ে গিয়ে ওকে জড়িয়ে ধরবে। চুমু না হয় নাই খেল কিন্তু দৌড়ে তো যেতেই পারে আর ওকে জড়িয়ে ধরতে পারে। ইস সাথে করে কাউকে নিয়ে এলে কাজ হত । তাকে বলত যে পুরো দৃশ্যটা ক্যামেরায় বন্দি করতে। 

আবিরকে দেখতে পাওয়ার সাথে সাথেই বলা চলে নওরিন একেবারে দৌড়ে চলে গেল । তারপর একেবারে কাছে গিয়ে ওকে জড়িয়ে ধরল । আবির নিজেও অবাক হয়েছে। 

-আরে তুমি এখানে? 

-হুম !

নওরিনের তখনই মনে হল যে আবিরের মুখের ভাব একটু যেন লাল হয়ে এসেছে । ও যেন একটু লজ্জা পাচ্ছে । কেন?

এভাবে ওকে জড়িয়ে ধরলো বলে? 

এটা তো এই দেশে খুবই স্বাভাবিক একটা ব্যাপার ! 

তখনই ওর মনের ভেতরে সেই সম্ভবনাটা দেখা দিল ।

এবং ওর মনের কথা মনেই রয়ে গেল । আবির বলল, আম্মু এসেছে সাথে।

নওরিন সাথে সাথে আবিরকে ছেড়ে দিল । তারপরই দেখতে পেল তাকে । ভীড়ের ভেতরে নওরিন কেবল আবিরকেই দেখেছে। অন্য কারো দিকে সে খেয়ালই দেয় নি । একজন যে সাথে করে আসতে পারে সেটাও ভাবতে পারে নি। 

নওরিনের মুখ লাল হয়ে গেল। ভেবেছিল হয়তো আবিরের মা তখনই ওকে কয়েকটা কথা শুনিয়ে দিবে তবে তিনি কিছুই বললেন না। নওরিনের দিকে তাকিয়ে স্বাভাবিক কন্ঠে বললেন, কেমন নওরিন?

-জ্বী ভাল আন্টি!

নওরিনের ইচ্ছে করলো যেন আবিরকে চিবিয়ে খেয়ে ফেলে । একবার তো ওকে বলবে যে আন্টি আসছে । তাহলে হয়তো আজকে এখানে আসতোই না। 

পুরো গাড়িতে নওরিন একটা কথাও বলল না। একটু মন খারাপ লাগল ওর । আবিরের মা এসেছে তার মানে হচ্ছে অন্তত মাস খানেক থাকবেই । আরও বেশিও থাকতে পারে। তার মানে এই কদিনে আবিরের সাথে ওর আর আগের মত দেখা হবে না। চাইলেই সে আবিরের বাসায় গিয়ে হাজির হতে পারবে না। 

নওরিনকে ক্যাম্পাসে নামিয়ে দিয়ে আবির ও মাকে নিয়ে নিজের বাসায় গিয়ে হাজির হল। নওরিন ভেবেছিল যে খুব জলদি আর ওদের দেখা হবে না। তবে সেটা ভুল প্রমাণিত হল । পরের দিনই আবির ওকে ফোন করে বাসায় যেতে বলল। 

নওরিন হাজির হল যথা সময়ে । নিজেকে যথা সম্ভব সাজিয়ে গুছিয়েই নিয়ে গেল। দুপুরে খাওয়া দাওয়ার পরে আবির নওরিনকে বাসায় রেখে কিছু সময়ের জন্য বাইরে বের হল । জানাল যে একটু কাজ শেষ করেই ফিরে আসবে। আসলে নওরিন বুঝতে পারছিল যে আবির চাচ্ছে ওর মায়ের সাথে যেন নওরিন কথা বলে। কিংবা আবিরের মা হয়তো ওর সাথে কথা বলতে চাইছে। আবারও সেই আগের মত বলবে ওকে ওর ছেলের জীবন থেকে চলে যেতে। 

নওরিন কিছু সময় বসার ঘরেই বসে রইলো । বেড়াল নওরিন ওর কোলের উপরে এসে বসল । তার কিছু সময়ে পরে আবিরের মা এল । নওরিন দেখতে পেল তার সাথে দুইটা কফির কাপ । উনি নওরিনের জন্য কফি বানিয়ে নিয়ে এসেছেন। 

-তুমি কতদিন এখানে?

প্রশ্নটা করলেন তিনি। তবে নওরিনের মনে হল যে উনি এই প্রশ্নের উত্তর জানেন। 

-এই বছর খানেক। 

-আবির আমাকে বলেছে কিভাবে আবার তোমাদের দেখা হয়েছে। 

নওরিন কোন কথা বলল না। এই প্রশ্নের কোন উত্তর হয় না। তিনি আবাবও বললেন, আমি এখনও তোমাকে পছন্দ করি না নওরিন। আমি এখনও চাই না তুমি আমার ছেলের জীবনে আসো । আর আমি এটাও জানি যে আমি মত না দিলে আবির কখনই তোমাকে বিয়ে করবে না।

নওরিন মাথা নিচু করে বলল, আমি জানি আন্টি ।

-তারপরেও আছো এখানে? আমি শুনলাম তুমি নাকি তোমার বিয়ে পর্যন্ত ভেঙ্গে দিয়েছো? 

নওরিন কেবল মাথা নাড়াল। 

-কেন ? কীসের আশায়?

নওরিন কোন উত্তর দিল না। 

ঘরে নেমে এল নিরবতা। এক সময়ে আবিরের মা আবারও বলল, তবে আমি জানি যে আবিরও অন্য কাউকে আর কখনো বিয়ে করবে না। আমি কয়েকবার ওকে বিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করেছি। কিন্তু কাজ হয় নি। হবেও না । সে আমাকে স্পষ্টই জানিয়ে দিয়েছে যে আমার মতে সে কাউকে বিয়ে করবে না ঠিকই সেই সাথে অন্য কোন মেয়েকেই সে কোন দিন বিয়ে করবে না। এখন মা হিসাবে আমার কী করা উচিৎ বল নওরিন? তুমি যদি আমার স্থানে থাকতে তাহলে তুমি কী করতে?

নওরিন কোন কথা খুজে পেল না । এমন প্রশ্নের জবাবে আসলে কোন কিছু বলা সম্ভব না। তারপর নওরিনকে অবাক করে দিয়েই বলল, তোমরা চাইলে বিয়ে করতে পার। আমার আপত্তি নেই। কেবল অনুরোধ করব যে বিয়ের পর তোমরা এখানেই থাকবে। দেশে ফিরে যাবে না। 

নওরিন বিস্ময় নিয়ে মুখ তুলে তাকাল । তার যেন বিশ্বাস হচ্ছে না। আবিরের মা ওকে নেমে নিচ্ছেন। তবে তিনি সেই সাথে এও বলেছেন যেন ওরা দেশে ফিরে না যান । তিনি এখনও নওরিনের পরিবারকে মেনে নিতে না-রাজি। 

সপ্তাহ খানেক পরেই নওরিন আর আবিরের বিয়ে হল । আবিরের মা কাছে থেকেই ওদের বিয়ে দিলেন। ছেলে যে অন্য কোন মেয়েকে বিয়ে করবে সেটা তিনি খুব ভাল করেই বুঝেছিলেন। সারা জীবন একা থাকার চেয়ে, বিয়ে তো করুক কাউকে । হোক সেটা তার অপছন্দের কাউকেই। তিনি নওরিনকে খুব বেশি অপছন্দ করতেন না তবে তার পরিবারকে সে মোটেই পছন্দ করেন নি। এই বিদেশের মাটিতে থাকলে হয়তো এই আত্মীয়তা নিয়ে তাকে খুব বেশি বিব্রত হতে হবে না কার কাছে ।

বাস্তবের গল্প গুলো কি এভাবে শেষ হয়? বেশির ভাগ গল্প গুলোই এভাবে শেষ হয় না। এভাবে দুজন ভালবাসার মানুষ দুজনের জন্যে এতো লম্বা সময়, এভাবে ভালবাসতে পারে না। এমন এমন ভাবে তাদের সমাপ্তি হয় না। তারপরেও আমরা ভালবাসি। আমরা স্বপ্ন দেখি। মনে মনে ভাবি যে আমাদের জীবনে এমন ভালবাসা এসে হাজির হবে। তারপর সব বাধা বিপত্তি অতিক্রম করে আমরা এক সাথে হবে একদিন । 

প্রথম পর্বদ্বিতীয় পর্ব

How useful was this post?

Click on a star to rate it!

Average rating 4.5 / 5. Vote count: 36

No votes so far! Be the first to rate this post.

About অপু তানভীর

আমি অতি ভাল একজন ছেলে।

View all posts by অপু তানভীর →

2 Comments on “তুমি কি ফিরে এসেছিলে ? (শেষ পর্ব)”

  1. বড়ো তাড়াহুড়া করে শেষ করলেন যেনো?!?!?!????

    1. নাহ, মনে এমন করেই ভেবে রেখেছিলাম আগে থেকেই। দুই পর্বে শেষ করার ইচ্ছে ছিল কিন্তু আরেকটা পর্ব যোগ হয়েছে বেশি।

Comments are closed.