ডেলিভারি দিতে হবে (শেষ পর্ব)

4.8
(17)

সিমিন আমার দিকে শান্ত চোখে তাকিয়ে থেকে বলল, তোমার তো ভয়ের কোন কারণ নেই। আমি বুঝতে পারছি তুমি কী দেখেছ তবে তোমার সেটা নিয়ে চিন্তা করতে হবে না। তোমার কোন ক্ষতি হবে না।
আমি বললাম, কিছু ওগুলো! আমি পারব না আর যেতে!
সিমিনের চোখ দুটো যেন জ্বলে উঠল। তবে সেটা সে সামলে নিল মুহুর্তেই। সে আমার দিকে তাকিয়ে বলল, দেখ তুমি ব্যাপারটা বুঝতে পারছো না। যদি সময় মত খাবার না পৌছায় তবে ভয়ানক একটা ব্যাপার ঘটে যাবে।
এই বলে সিমিন নিজের মোবাইল বের করে কিছু একতা টাইপ করল। এবং একটা সংবাদের ক্লিপ আমার সামনে এনে ধরল। সংবাদটা মাস ছয়েক আগের। বন্যপশুর আঘাতে খামারির গরু লন্ডভন্ড।
আমি সংবাদ পড়ে দেখলাম যা বুঝলাম তার অর্থ হচ্ছে মধুর জঙ্গলের পাশের এক গ্রামের ঘটনা। একজন খামারীর চারটা গরুরকে কন জন্তু মেরে ফেলেছে এবং প্রায় অর্ধেক পরিমান মাংস খেয়ে ফেলেছে।
আমি চোখ তুলে তাকাতেই সিমিন বলল, সময় মত খাবার যদি না যায় তবে এই ঘটনা আবারও ঘটবে। আমাদের সেই সময়কার ড্রাইভার সেদিন যেতে পারে নি কারণ তার মা মারা গিয়েছিল। সে গ্রামে চলে গিয়েছিল কাউকে কিছু না জানিয়েই। আমি যখন জানতে পারি তখন অনেকটাই দেরি হয়ে গিয়েছিল। বুঝতে পেরেছ?
আমি এবার ভয়ে ভয়ে বললাম, ওরা কারা?
-সেটা কি তোমার জানতেই হবে?
-হ্যা জানতেই হবে। আমি যদি না জানি যে আমি কিসের মধ্যে পড়ছি বা কেন পড়ছি তাহলে আমি যাবো না কিছুইতেই। তুমি বলছ যে আমি বিপদে নেই, আমার কোন বিপদ হবে কিন্তু কী বিপদ হতে পারে সেটা আমাকে জানতেই হবে। তুমি যদি সত্যিই চাও যে আমি ডেলিভারি নিয়ে যাই তবে আমাকে সত্যটা বলতেই হবে।
সিমিন কিছু যেন বলতে গিয়েই বলল না। চুপচাপ কিছু সময় ভাবল। তারপর বলল, আমি যা বলব সেটা তোমার বিশ্বাস হবে না। এর থেকে ভাল যে আমি তোমাকে সরাসরি দেখাই। এসো আমার সাথে।

সিমিন আমাকে নিয়ে গাড়িতে উঠল তারপর গাড়িটা চলতে শুরু করল। সিমিনকে বেশ গম্ভীরই মনে হচ্ছিল। প্রায় আধা ঘন্টা চলার পরে গাড়িটা একটা বাড়ির সামনে এসে হাজির হল। বাড়িটা সিমিনদের সেটা বুঝতে আমার কষ্ট হল না। আমাকে সে নিচতলার গ্যারেজের পাশ দিয়ে নিয়ে গেল বেজমেন্টে। বাড়িতে ঢুকেই আমার কেবল একটা অদ্ভুত অনুভূতি হল। মনে হল যেন এই বাড়িতে একদমই লোকজন নেই। মানুষজন থাকে না। অথচ এতো বড় একটা বাড়ি।
আমাকে যে ঘরে সিমিন নিয়ে এল সেই ঘরটায় কোন জানাল নেই। কেবল একটা লোহার দরজা। দরজা বন্ধ করতেই সিমিন আমার দিকে ফিরে তাকাল। তারপরই আমার দিকে ভয়ংকর এক চোখে তাকাল। আমার বুকের ভেতরটা কেমন যেন করে উঠল। আর তারপরই আমি আমার জীবনের সব থেকে বিস্ময়কর ঘটনা চোখের সামনে ঘটতে দেখলাম। আমি দেখলাম সিমিনের দেহটা কেমন যেন বাঁঁকা হয়ে উঠছে। আমি তারপর সিমিনের শরীরের সেলোয়ার কামিজ ছেড়ার শব্দ পেলাম। কিছু একটা যেন সিমিনের শরীর পেয়ে বাইরে বের হয়ে আসছে। আমি নড়তে ভুলে গেছি। পুরো শরীর ভয়ে জমে গেল আমার!
পুরো রূপান্তর হতে মিনিট দুয়েক সময় লাগল। তারপরই আমি সিমিনকে দেখতে পেলাম। আরও ভাল করে বললে একটা বন্য পশুকে দেখতে পেলাম। সম্ভবত এটাকে নেকড়ে বলে! ধুসর রংয়ের পশুটা আমার দিকে তাকিয়ে রয়েছে। আমার মনে হল এখনই বুঝি ওটা আমার উপরে ঝাপিয়ে পড়বে। তবে সেটা এক ভাবেই আমার দিকে তাকিয়ে রইল। এভাবে কত সময় যে পার হল সেটা আমি জানি না। একটা সময় আমি দেখতে পেলাম পশুটার দেহ আবারও ছোট হয়ে আসছে এবং আস্তে আস্তে এক সময়ে সেটা আবারও মানুষের দেহে পরিণত হল। নগ্ন নারী দেহে!
আমার সামনে সিমিন নগ্ন দেহে দাঁড়িয়ে রইল কিছু সময়। তারপর আমার দিকে এক পা এগিয়ে বলল, দেখলে তো! আমি নিয়ন্ত্রণ করতে পারি, চাইলেই তবে পেটে যদি ক্ষুধা থাকে তবে সেই নিয়ন্ত্রণ কঠিন হয়ে পড়ে।
-তুমি কে?
সিমিন হাসল। তারপর বলল, প্রশ্ন করা উচিত তুমি কী?
আমার মুখ দিয়ে কোন কথা বের হল না। তবে সিমিন হাসল। সে বলল, আমি বা আমরা কোনো মানুষ না। আবার বলতে পারো মানুষই। এমন এক প্রজাতি যারা মানুষ এবং পশুর সংমিশ্রণ। আমাদের ভেতরে মানুষের গুণাবলি যেমন আছে ঠিক তেমনি আছে পশুর গুণাবলিও। বুঝেছো?
আমি মাথা নাড়লাম। সিমিন আবারও বলল, আমরা অনেক অনেক বছর ধরেই এই পৃথিবীতে বসবাস করছি। মানুষের মাঝেই। আগে টিকে থাকাটা আমাদের জন্য সহজ ছিল। সেই সময়ে আমরা মূলত বড় বন জঙ্গলের ভেতরেই থাকতাম। বনের পশু পাখি শিকার করেই আমরা বেঁচে থাকতাম। তবে দিনের পর দিন বন জঙ্গল এবং তাতে থাকা পরিমান জীব জন্তুর পরিমান কমে আসতে লাগল তখন আমরা বাধ্য হয়ে বনের বাইরে আসতে শুরু করলাম। পোশাক পরতে শুরু করলাম তারপর মানুষের মাঝে মিশে যেতে শুরু করলাম। তবে যখন আকাশে চাঁদ উঠত তখন আমরা কোন ভাবেই আর মানুষের বেশে থাকতে পারতাম না। আমাদের নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে যেত। আমাদের ভেতরেই খুব অল্প কয়েকজন আছে যারা নিজেদের উপর পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ রাখতে পারে। আমার বাবা একজন।
আমি বললাম, তুমিও কি তাই? তোমাকে তো চাঁদের আলোতেও রূপ বদলাতে দেখি নি।
সিমিন হাসল। তারপর বলল, আমি আসলে আমার বাবার মত নই। আমি চাঁদের আলোর ভেতরেও নিয়ন্ত্রণ হারাই না কারণ আমি পরিপূর্ণ ভাবে আমার বাবার মত নই। আমি মিক্স ব্লাড।
-মানে?
-মানে হচ্ছে আমার বাবা একজন পিওর ব্লাড হলেও সে একজন মানুষকে বিয়ে করেছিল। মানে আমার মাকে। এই কারণে আমার ভেতরে মানুষের গুণ রয়েছে প্রবল। আমি যদিও নিজেকে পরিবর্তন করতে পারি ঠিকই তবে আমি মানুষ হয়ে থাকতেই বেশি পছন্দ করি। এছাড়া আমি ওদের মাঝে থাকতে পছন্দ করি না। আমি এখানে মায়ের সাথে থাকি। বাবা মাঝে মাঝে আমাদের এখানে আসেন। তবে আমি মিক্সড ব্লাড বলে গোত্রের অনেকে আমাকে পছন্দ করে না।
সিমিন তখন আমার সামনে একই ভাবে দাঁড়িয়ে আছে। আগে যে ভয়টা ছিল সেটা কমে এল। এবং আমি তখনই সিমিনকে আরও ভাল করে খেয়াল করে দেখলাম। মেয়েটার পুরো শরীর যেন একেবারে নিখুঁত ভাবে তৈরি করা। পুরো শরীরের কোথাও কোন বাড়তি মেদ নেই। আমাকে এভাবে তাকিয়ে থাকতে দেখে এই প্রথম সিমিন যেন একটু লজ্জা পেল। তবে নিজেকে সে আড়াল করল না।
সে বলল, আমার ভেতরে মানুষের গুণাবলি থাকলেও পশুর সেই আদিম গুণাবলিও আছে। পশুরা যেমন পোশাক পরে না, আমারও ঠিক একই ভাবে থাকতে ভাল লাগে।

দুই
তারপর থেকেই সব কিছু একই রকম ভাবে চলতে লাগল। আমাকে ডেলিভারি করতেই হয়েছে। প্রতিমাসে দুইবার আমাকে সেখানে যেতে হয় মাংস নিয়ে। আমি প্রতিবারই ভয়ে ভয়ে সেখানে গিয়ে হাজির হই। প্রতিবারই একই রকম ঘটনা ঘটে। কোন ব্যতিক্রম হয় না। আমার উপরে কোন বিপদ আসে নি। তবে একটা ব্যাপার আমি খেয়াল করতে শুরু করেছি। যতই দিন যেতে লাগল আমার সামনে তাদের আসল চরিত্র ফুটে উঠতে শুরু করল। তারা প্রথম প্রথম লুকিয়ে থাকার চেষ্টা করত বটে তবে যতই দিন যেতে লাগল ততই তাদের ভেতরে রাকঢাকের ব্যাপারটা কমে আসতে লাগল।
প্রথম প্রথম মিস্টার জোসেফ অর্থ্যাৎ সিমিনের বাবা যখন এসে হাজির হত তখন তার সাথে আরও অনেকগুলো নেকড়ের মত প্রাণী এসে হাজির হত তার সাথে। শুরুর দিকে সেই প্রাণীগুলো চার পায়েই হেটে হেটে আসত কিন্তু যতই দিন যেতে লাগল তত তাদের ভেতরের লুকোছাপা ভাবটা কেটে যেতে লাগল। আমি দেখতে পেতাম আমি যখন গাড়ি নিয়ে হাজির হতাম তখন তারা দুই পায়ে হেটেই আসত। এবং যখন আমি গাড়ি নিয়ে চলে যেতাম তারা আমার পিছু নিত। আগে যেমন মনে হত যে বন জঙ্গলের ভেতরে তারা দৌড়ে যাচ্ছে এখন আমি তাদের দেখতে পেলাম। এদের ভেতরে একটা সাদা রংয়ের নেকড়ে প্রাণীকে আমি প্রতি সময় দেখতাম। সিমিনকে আমি দেখেছি। সিমিনের নেকড়ে রূপটা ঠিক সাদা না। তবে এই নেকড়েটার রূপটা একেবারে সাদা।
একদিন ঘটল আরেক ঘটনা। সেদিন আমি ডেলিভারি দিয়ে ফেরত চলে যাচ্ছি, কিছু দূর যেতেই আমি সেই সাদা নেকড়েটাকে দেখতে পেলাম। সে একেবারে আমার পথে মাঝে এসে দাঁড়িয়েছে। আমি গাড়ি থামাতে বাধ্য হলাম। কিছু সময় সেখানেই দাঁড়িয়ে রইলাম। কী করব ঠিক বুঝতে পারছিলাম না। আলোতেই আমি নেকড়েটাকে দেখতে পাচ্ছি। সে এক ভাবে আমার দিকে তাকিয়ে আছে।
এমন সময় আমি আবার সেই পরিবর্তনটা দেকতে পেলাম। সাদা নেকড়েটা মানুষে পরিবর্তন হচ্ছে। মিনিট দুয়েকের ভেতরে সেটা নগ্ন নারী মূর্তিতে পরিণত হল। তারপর ধীর পায়ে আমার গাড়ির জানালার কাছে এগিয়ে এল। আমার দিকে তাকিয়ে বলল, তোমাকে প্রতিদিন দেখি আমি।
আমার এখন কী বলা উচিত আমি ঠিক জানি না। আমি কেবল একটু মাথা নাড়লাম। আমার আর এটার থেকে বেশি কিছু বলার কী থাকতে পারে সেটা আমি জানি না। মেয়েটা আরও কিছু সময় আমার দিকে তাকিয়ে থেকে সরে দাঁড়াল একটু। আমাকে চলে যাওয়ার জন্য পথ করে দিল। গাড়ি আবার চলতে শুরু করল। আমি ব্যকমিররে মেয়েটাকে দেখলাম কয়েকবার। মেয়েটা অসম্ভব সুন্দরী।
এরপর থেকে এই ঘটনা ঘটনা বারবার ঘটতে লাগল। ডেলিভারি দিয়ে যাওয়ার সময়ে প্রতিদিন মেয়েটা ঠিক ঠিক আমার গাড়ির সামনে এসে থামত তারপর নারী দেহে রূপান্তরিত হত। আমার দিকে এগিয়ে এসে আমাকে দেখত, আমার সাথে টুকটাক কথা বলত। আমি জানতে পারলাম মেয়েটার আইরিন। এবং সে মিস্টার মিস্টার জোসেফের মেয়ে। অর্থ্যাৎ সে সিমিনের বোন। তবে সিমিনের মত সে মিক্সড ব্লাড নয়। মিস্টার জোসেফের গোত্রের ভেতরেও একটা বউ আছে। এই আইরিন সেই পক্ষের মেয়ে।
সব থেকে বড় ঘটনা ঘটল আরও কয়েকদিন পরে। আমি ক্লাস করে বের হয়ে দেখি সিমিন আমার জন্য দাঁড়িয়ে আছে। তার মুখ গম্ভীর এবং সে একা দাঁড়িয়ে নেই। তার পাশে দাঁড়িয়ে রয়েছে আইরন। মানুষ্য পোশাকে আইরিনকে অসম্ভব সুন্দর লাগছে। আইরিন আমার দিকে একভাবে তাকিয়ে আছে। ওর চোখের দৃষ্টি বুঝতে আমার মোটেই কষ্ট হল না।
আমাকে আর আইরিনকে নিয়ে সে বসল মাঠের ভেতরে। আমার দিকে তাকিয়ে বলল, তোমার সামনে কি এবার বিপদ ঘনিয়ে আসছে?
আইরিন যেন এই কথা শুনে বিরক্ত হল। সে বলল, এই কথা কেন বলছো ওকে!
সিমিন আইরিনের দিকে তাকিয়ে বলল, তুই বুঝতে পারছিস না কী বিপদে সে পড়তে যাচ্ছে। ব্যাপার জানাজানি হলে গোত্রের অন্যেরা কেমন ভাবে নিবে তুই জানিস না?
-বাহ! বাবা করতে পারলে আমি কেন পারব না?
-তখন কী হয়েছিল সেটা জানিস না? শোন তুই যদি সত্যিই ওর পিছু না ছাড়িস তাহলে আমাকে বাধ্য হয়ে অন্য ড্রাইভার দেখতে হবে। আমি ওকে বিপদে ফেলতে পারব না। তুই চাস এটা কে ও আর না যাক!
আইরিন মাথা নাড়ল।
-তাহলে আজকের পর থেকে ওর সামনে আসবি না মোটেও।
আইরিন রাজি হল বটে তবে আমি ওর চোখের দিকে তাকিয়েই বুঝলাম যে সে আমার পিছু ছাড়বে না। হলও তাই। পরের সপ্তাহে আইরিন না এলেও তার পরের বার আইরিন ঠিকই এল। এবং সে এবার আমার গাড়ির ভেতরে উঠে এল। আমি বুঝতে পারলাম যে কাজটা হতে চলেছে সেটা ঠিক হচ্ছে না। কিন্তু সত্যি বলতে কি আইরিনের মত অত্যন্ত সুন্দরী একটা মেয়ে যখন আপনার সামনে এসে হাজির হবে, তখন আপনার পক্ষে অনেক কিছুই করা সম্ভব না। বিশেষ করে আইরিনের সুন্দর দেহটা যখন উন্মুক্ত হয়ে আপনার জন্য অপেক্ষা করছে, আপনাকে আহবান করছে তখন সেই আহবান মানা করার ক্ষমতা আপনার নেই।

তিন
তবে আমি জানতাম যে বিপদ ঠিকই আসবে। এবং সেটা এলো বটে। সেদিন আমি ডেলিভারি দিয়ে জঙ্গল থেকে বের হয়ে মেন রাস্তায় উঠতে যাব ঠিক এই সময়ে আমার ডেলিভারি ভ্যানের চাকা পামচার হওয়ার আওয়াজ পেলাম। আমি তাকিয়ে দেখি তখনও আমি জঙ্গলের রাস্তা পুরোপুরি ভাবে পার হয় নি। নামব কিনা বুঝতে পারছি না। কিন্তু না নামলে আমি সামনে এগোবো কিভাবে? আর প্রায় প্রধান রাস্তায় আমি চলে এসেছি।
আমি গাড়ি থেকে নামলাম। পেছনের চাকাটা বদলাতে হবে। আমি কিছু সময় এদিক ওদিক তাকিয়ে তারপর গাড়ির ভেতরে থাকা চাকাটা নামিয়ে আমি চাকা বদলাতে শুরু করলাম। চারিদিকে কয়েকবার তাকালেও আমি কাউকে দেখতে পেলাম না বটে তবে মনের ভেতরে একটা চাপা অস্বস্তি কাজ করতে লাগল। মনে হল যেন কেউ আমাকে দেখছে, আমার দিকে তাকিয়ে আছে।
তারপরই সে হুংকার শুনতে পেলাম। ঝটকরে পেছনে ফিরে তাকাতেই দেখলাম যে একটা নেকড় দুই পায়ে দাঁড়িয়ে আছে পেছনে। আমার দিকে হিংস্র চোখে তাকিয়ে আছে। আমি বুঝতে পারলাম আমার দিকে এগিয়ে আসছে আমাকে হামলা করার জন্য। আমি কিছু বুঝে ওঠার আগেই সেটা আমার দিকে ঝাপ দিল। উড়ে আসতে লাগল সেটা। আমি সরে যাওয়ার চেষ্টা করলাম কিন্তু পারলাম না। প্রাণীটার থাবা আমার কাঁধে লাগল এবং আমি ছিটকে পড়লাম মাটিতে। পিঠে প্রচণ্ড ব্যথা অনুভব করলাম। মাথাটা ঘুরতে লাগল। চোখের সামনে সব কিছু যেন ঝাপসা হয়ে আসছে। নেকড়েটা আমার উপরে এসে দাঁড়িয়েছে। তার গরম নিঃশ্বাস আমার মুখে এসে পড়ছে। আমি চোখ বন্ধ করে ফেললাম।
তারপরই শুনলাম আরেকটা হুংকার। এবং প্রাণীটার ভার হঠাৎ আমার বুকের উপর থেকে সরে গেল। আমি চোখ খুলে দেখলাম দুটো নেকড়ে একে অপরের সাথে লড়াই করছে। একটা সেই আগেরটা — বড়, কালচে ধূসর রঙের। আরেকটা সাদা। বরফের মতো সাদা।
আইরিন।
আমি উঠে বসার চেষ্টা করলাম। কাঁধ থেকে রক্ত পড়ছে। তবে প্রাণঘাতী নয়। দুটো প্রাণী ভয়ংকর শব্দে একে অপরকে আঁচড়াচ্ছে, কামড়াচ্ছে। সাদা নেকড়েটা আকারে ছোট হলেও তার গতি অসাধারণ। সে প্রতিটা আঘাত এড়িয়ে পাল্টা আঘাত করছে। একটা সময় কালচে নেকড়েটা পিছু হটতে শুরু করল এবং জঙ্গলের অন্ধকারে মিলিয়ে গেল।
সাদা নেকড়েটা কিছুক্ষণ সেদিকে তাকিয়ে রইল। তারপর আমার দিকে ফিরল।
আমি বললাম, আইরিন।
রূপান্তর শুরু হল। মিনিট দুয়েকের ভেতরে আইরিন আমার সামনে দাঁড়িয়ে। তার হাতে একটা আঁচড়ের দাগ, রক্ত জমছে। কিন্তু সে সেদিকে কোনো ভ্রুক্ষেপ করল না।
আমার কাছে এসে হাঁটু মুড়ে বসল। আমার কাঁধটা একবার দেখল। তারপর আমার চোখের দিকে তাকিয়ে বলল, তুমি ঠিক আছ?
আমি হাসলাম। পরিস্থিতির কথা মাথায় রেখে সেটা ঠিক স্বাভাবিক হাসি হল না বটে, তবে হাসলাম।
-কে ছিল ওটা?
আইরিন মাথা নামিয়ে নিল। বলল, গোত্রের। আমাদের ব্যাপারটা সে জানে। আমাকে এক সময় পছন্দ করত। তাই তোমাকে আমার পাশে সহ্য করে নি। ওকে নিয়ে চিন্তা কর না। তবে তোমার আর এখানে আসা হবে না। বুঝেছো?
আমি চুপ করে রইলাম। দূরে জঙ্গলের ভেতর থেকে একটা পাখির ডাক ভেসে এল। রাত নামছে। আকাশে চাঁদ উঠতে শুরু করেছে।
আইরিন উঠে দাঁড়াল। বলল, তোমাকে এখনই চলে যেতে হবে। আজকের পর তুমি আর এখানে ডেলিভারি দিতে আসবে না।
আমি উঠে দাঁড়ালাম। চাকাটা লাগানোর তখনও কিছুটা বাকি ছিল। সেটা শেষ করলাম। গাড়িতে উঠতে উঠতে একবার পেছনে তাকালাম। আইরিন একই ভাবে দাঁড়িয়ে আছে। চাঁদের আলোতে তাকে দেখাচ্ছে অন্যরকম। মানবী না পশু — এই দুয়ের মাঝামাঝি কোথাও যেন সে দাঁড়িয়ে আছে।
আমি জিজ্ঞেস করলাম, তোমাকে আর দেখব না?
আইরিন কিছু বলল না। শুধু একটু হাসল।
গাড়ি চলতে শুরু করল। ব্যাকমিররে আইরিনকে দেখলাম। দেখতে দেখতে সে ছোট হয়ে আসছে। তারপর একটু বাঁক ঘুরতেই সে আর নেই।
সেদিনের পর থেকে আমি আর সেই জঙ্গলের পথে যাই নি। সিমিন আমাকে জানিয়েছে যে গোত্রে একটা বড় ঝামেলা হয়েছে। অনেকে নাকি গোত্র ছেড়ে চলে গেছে। তবে আমার কারণেই সেটা হয়েছে কিনা সেটা স্পষ্ট করে বলে নি। এখন আপাতত আমার আর যাওয়া লাগছে না। এতোগুলো টাকা আমার হাত ছাড়া গেল দেখে একটু খারাপই লাগছিল। তবে কী আর করার!

পরিশিষ্টঃ
আমি কাভার্টভ্যান থেকে নেমে এলাম। সূর্য তখন ঠিক গাছের মাথার পেছনে হেলে পড়েছে। কমলা আর সোনালি আলো গাছের ফাঁক দিয়ে লম্বা লম্বা রেখা টেনে মাটিতে এসে পড়ছে। জঙ্গলের ভেতর থেকে একটা ঠান্ডা বাতাস আসছে, সাথে মাটির গন্ধ। পাখির ডাক ধীরে ধীরে কমে আসছে। দিন শেষ হওয়ার আগের সেই নিস্তব্ধতা চারদিকে নেমে আসছে আস্তে আস্তে।
আমি রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে চুপচাপ দেখলাম।
ঠিক তখনই আওয়াজটা হল।
ডালপালা ভাঙার শব্দ না। পাতা সরার শব্দও না। অন্যরকম একটা শব্দ — যেন কেউ খুব সাবধানে, খুব পরিচিতভাবে মাটিতে পা রাখছে।
আমি ঘুরলাম। জঙ্গলের ভেতর থেকে সে বেরিয়ে এসেছে। গাছের শেষ আলো তার সাদা লোমে পড়ে তাকে যেন জ্বলজ্বল করাচ্ছে। সে রাস্তার উপরে দাঁড়িয়ে আছে। নড়ছে না। শুধু তাকিয়ে আছে আমার দিকে।

প্রথম পর্ব

ফেসবুকের অর্গানিক রিচ কমে যাওয়ার কারনে অনেক পোস্ট সবার হোম পেইজে যাচ্ছে না। সরাসরি গল্পের লিংক পেতে আমার হোয়াটসএপ বা টেলিগ্রামে যুক্ত হতে পারেন। এছাড়া যাদের এসব নেই তারা ফেসবুক ব্রডকাস্ট চ্যানেলেও জয়েন হতে পারেন।

অপু তানভীরের অনুবাদ গ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে

বইটি সংগ্রহ করতে পারেন ওয়েবসাইট বা রকমারী বা ফেসবুকে থেকে।

এছাড়া সকল গল্পের লিস্ট পাবেন সূচিপত্রে। পুরানো আগের গল্প পড়তে পারবেন সামহোয়্যারইন ব্লগ ও ওয়াটপ্যাড থেকে।

How useful was this post?

Click on a star to rate it!

Average rating 4.8 / 5. Vote count: 17

No votes so far! Be the first to rate this post.


Discover more from অপু তানভীর

Subscribe to get the latest posts sent to your email.

About অপু তানভীর

আমি অতি ভাল একজন ছেলে।

View all posts by অপু তানভীর →

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *