মৃত্যু ঘড়ি

4.8
(14)

বাসা বদলানোর মত ঝামেলা আর নেই। তবে আশা কথা হচ্ছে এই ভাড়ার বাসার বদলে আমরা এবার যাচ্ছি নিজেদের বাসায়। মিরপুরে আমাদের নতুন একটা ফ্লাট কেনা হয়েছে। এরপর থেকে আমাদের স্থায়ী ঠিকানা সেটাই হবে। গোছগাছ করার সময়ে ঠিক হল যে পুরানো এবং বাতিল জিনিসপত্র সব এখান থেকে বিক্রি নয়তো ফেলে দেওয়া হবে। সেই জন্য আমরা কয়েকদিন ধরে বাসার সব পুরানো জিনিস পত্র বের করছি। যেগুলো বিক্রি করা যাবে সেগুলো আলাদা করে রাখছি আর যেগুলো একেবারে বাতিল সেগুলো বাসার সামনের ডাস্টবিনে ফেলে দিচ্ছি।
স্টোর রুম ঘাটতে গিয়ে আমি পুরানো একটা ট্রাঙ্ক খুজে পেলাম। এখন আর এই ধরণের ট্রাঙ্ক আর কেউ ব্যবহার করে না। এটা কার হতে পারে কে জানে? আমি ট্রাঙ্কটা খুলে ভেতরে দেখলাম। পুরানো কিছু জিনিসপত্র। পুরানো হয়ে যাওয়া কিছু জামা কাপড়। আমি জামা কাপড়গুলো দেখেই বুঝতে পারলাম যে এটা আমার দাদার ট্রাঙ্ক। দাদা মারা গেছেন বেশ কয়েক বছর হয়েছে। আমি তাকে খুব ভাল চিনতামও না। হাতে গোনা কয়েকবার দাদার সাথে আমার দেখা হয়েছে। কী এক অদ্ভুত কারণে বাবা আমাদের দাদা বাড়িতে নিয়ে যেতেন না বা নিয়ে যাওয়ার আগ্রহ দেখাতেন না। কোন দরকার হলে তিনি একাই যেতেন।
আমি ট্রাঙ্কটা ঘেটে ঘুটে তেমন কিছুই পেলাম না। মনে হল এটা আমাদের নতুন বাসায় নিয়ে যাওয়ার কোন মানে নেই। আমি ট্রাঙ্কটা বন্ধ করতেই যাচ্ছিলাম তখনই এক কোনার দিকে একটা কালো চামড়ার পুতলির মত কিছু একটার দিকে আমার চোখ পড়ল। আমি সেটা হাতে নিতেই অনুভব করলাম যে ভেতরে কিছু একটা আছে।
একটা ঘড়ি বের হল! পুরানো দিনের দম দেওয়া ঘড়ির মতই মনে হল। তবে ঘড়িটা দেখতে বেশ ভালই মনে হল। ঘড়ির কাঁটা দেখলাম তখনও নড়ছে। আমি একটা অবাক না হয়ে পারলাম না । এই ঘড়িটা এখনো চলছে কিভাবে? এই ট্রাঙ্কটা অন্তত দশ বছর খোলা হয় নি আমি নিশ্চিত। তাহলে এতোদিন পরেও একটা ঘড়ি কি চালু অবস্থায় থাকতে পারে?

আমি কিছু সময় ঘড়িটা নেড়ে চেড়ে দেখলাম। তারপর কী মনে হল সেটা নিজের হাতে পড়লাম। বেল্ট দিয়ে হাতের সাথে আটকাতেই প্রথম কিছু সময় কিছুই ঘটল না। তারপরই আমি মাথার ভেতরে একটা তীব্র যন্ত্রণা অনুভব করলাম। কেন এমন করে হঠাৎ আমার মাথায় যন্ত্রণা শুরু হল সেটা আমি সত্যিই বলতে পারব না তবে এমন কিছু আমি এর আগে কোন দিন অনুভব করি নি। আমি সেই স্টোর রুমের ভেতরেই ধপ করে বসে পড়লাম পা ছড়িয়ে।
কত সময় আমি সেভাবে বসে ছিলাম সেটা আমি জানি না আস্তে আস্তে সেই ব্যাথাটা কমে এল। আমি যখন সুস্থির হয়ে আবার উঠে দাঁড়ালাম তখন আমার চোখটা আমার হাতের ঘড়ির দিকে চলে গেছে। ঘড়িটা থেমে গেছে। সময়টা মিনিট দশেক আগের। মানে আমি যখন ঘড়িটা হাতে দিলাম আর আমার মাথায় ব্যাথা শুরু হল সেই সময়ে ঘড়িটা বন্ধ হয়েছে। এমনটা ভাবার কোন কারণ নেই, কিন্তু তারপরেও আমার কেন জানি মনে হল আমার মাথার এই ব্যাথার কারণটা হচ্ছে এই ঘড়িটা। আমার এখনই ঘড়িটা এখানে ফেলে চলে যাওয়া উচিৎ। কিন্তু কেন জানি আমি ঘড়িটা খুলে ফেলতে পারলাম না। ঘড়িটা খুলতে চাইলাম না। আমার মন বলল যে এই ঘড়িটা আমার হাতেই থাকা উচিৎ।
আরও কিছু সময় কাজ কর করে জিনিস পত্র আলাদা করে আমি নিচে নেমে এলাম।

নিচে নেমে এসে আমি রান্নাঘরে পানি খেতে গেলাম। মাথার ব্যাথাটা চলে গেছে, শুধু একটা ভোঁতা অনুভূতি রয়ে গেছে কপালের এক পাশে। মা রান্নাঘরে কাজ করছিল। আমাকে দেখে বলল, সব গুছিয়েছিস?
-হ্যা সব বাতিল জিনিসগুলো আলাদা করে রেখেছি। বিকেলে ভাংড়ির লোক আসবে।
আমি আর কিছু মাকে বললাম না। পুরানো ট্রাঙ্কে বা ঘড়িটার কথা বলতে ইচ্ছে করল না। কেন করল না, সেটাও ঠিক বুঝলাম না।
পানি খেয়ে যখন মায়ের দিকে তাকালাম, তখনই প্রথমবার জিনিসটা চোখে পড়ল।
মায়ের মাথার ঠিক উপরে, বাতাসে ভাসমান, কিছু একটা ভেসে রয়েছে। সব শূন্যের মত মনে হল। আমি ব্যাপারটা কিছুতেই বুঝতে পারলাম না।
আমি চোখ কচলে আবার তাকালাম। সংখ্যাগুলো মিলিয়ে গেল না। ওখানেই আছে, মায়ের চুলের ঠিক উপরে, যেন কেউ বাতাসে এঁকে রেখেছে। আমার এই ভাবে তাকিয়ে থাকতে দেখে মা বলল, কী দেখছিস এভাবে?
-কিছু না।
আমি রান্নাঘর থেকে বেরিয়ে এলাম, বুকের ভেতরটা ধকধক করছে। সিঁড়ির কাছে বাবার সাথে দেখা হল। বাবার মাথার উপরেও একই ব্যাপার — অনেকগুলো শূন্য ভেসে রয়েছে। ছোট বোনের মাথার উপরেও। বাসার কাজের লোকটার মাথার উপরেও।
আমার মনে হল আমি যেন পাগল হয়ে যাচ্ছি। কী সব ভুলভাল দেখছি। দ্রুত আমি নিজের ঘরে গিয়ে হাজির হলাম।
গোসগাস করতে করতে আমার শরীরে বেশ ময়লা জমেছে। এখন একবার গোসল করে নেওয়া ভাল।

গোসল শেষে মাথাটা একটু পরিষ্কার হল। যখন দুপুরের ভাত খেতে নামলাম তখন কারো মাথার উপরে সেই শূন্য আর দেখতে পেলাম না। তখন মনে হল যে স্টোররুমে কাজ করার সময় মাথার ভেতরে যে চিনচিন ব্যাথা করে উঠেছিল সেতার জন্য সম্ভবত আমার এমন হ্যালুশিনেশন হচ্ছিল। গোসল করার ফলে আবারও সব ঠিক হয়ে গেছে।
কিন্তু ভুল ভাঙ্গতে দেরি হল না। বিকেল বেলা আমার টিউশিনি যাওয়ার পথে কী মনে করেই আমি আবারও সেই পুরানো ঘড়িটা হাতে দিলাম। যদিও ঘড়িটা বন্ধ কিন্তু কেন জানি এটা হাতে দিতে ইচ্ছে হল। এছাড়া আরেকটা কারণ হচ্ছে আমি যেখানে পড়াতে যাই সেখানে যাওয়ার পথে একটা ঘড়ির দোকান পড়ে। ঘড়িটা সেখানে নিয়ে দেখাবো। তারা ঠিক করতে পারে কিনা দেখা যাক।
আমি যখন বাইরে বের হলাম তখনই আবার আমার চোখে সেই ব্যাপারটা। সবার মাথার উপরে সেই থেমে থাকা শূন্যের সারি। যেদিকেই তাকাই না কেন সবার মাথায় রয়েছে। আমি কি আবারও হ্যালুশিনেট করা শুরু করেছি? খাওয়ার সময় তো দেখলাম না! তাহলে এখন …
তখনই একটা ব্যাপার মনে পড়ল। গোসলের আগে আমি যখন মায়ের সামনে গিয়েছিলাম তখন আমার হাতে ঘড়িটা পরা ছিল কিন্তু গোসলের জন্য আমি হাতের ঘড়িটা খুলে রেখেছিলাম এবং খাওয়ার সময় যখন নিচে গেলাম তখন আর সেটা পরি নি। তখন কারো মাথার উপরে কিছু দেখা যায় নি। এখন আবার আমি হাতে পরেছি ঘড়িতা এবং আবারও সেই শূন্যের সারি এসে হাজির হয়েছে।
আমি অনুভব করলাম যে আমার মাথার ভেতরে একটা অদ্ভুত সম্ভবনা দেখা দিয়েছে । বুকের ভেতরে একটা তীব্র অনুভূতি হচ্ছে। আমি কাঁপা হাতেই ঘড়িটা হাত থেকে খুলে নিলাম। এবং সাথে সাথেই সবার মাথার উপর থেকে শূন্যের সারি গায়েব হয়ে গেল। চমকে উঠলাম আমি। যা ভেবেছিলাম ঠিক তাই হল। আমি আবার যখন ঘড়িটা পরলাম আবারও সবার মাথার উপরে সেই শূন্য এসে হাজির হল।
নিশ্চিত হওয়ার জন্য আরও বেশ কয়েকবার কাজটা করলাম। তারপর ঘড়িটা পকেটে রেখে টিউশনির দিকে রওয়ানা দিলাম। যদিও পড়াচ্ছিলাম তবে আমার মনযোগ ছিল ঘড়ির দিকে। এমন অদ্ভুত ব্যাপার কেন হচ্ছে ঘড়িটা পড়লেই। তখন আমার মনে হল যে আচ্ছা এই ঘড়িটা যদি অন্য কেউ পরে তবে কি আমার মত ব্যাপার ঘটবে? সেও কি মাথার উপর শূন্যের সারি দেখতে পাবে।
সামনে বসা আমার স্টুডেন নাইমকে কি পরিয়ে দেখব? কিন্তু মনে মনে একটা সন্দেহ হল? আমি প্রথমবার ঘড়ি পরার সময় যে মাথায় তীব্র ঝটকা খেয়েছিলাম নাইমও যদি খায়? থাক দরকার নেই। শেষে কোন ঝামেলা হবে। তবে নিজেকে দুরে রাখতে পারলাম না। আমি পকেট থেকে ঘুড়িটা বের করলাম। নাইমের স্বভাব আমি জানি। আমার হাতে ঘড়িটা দেখলেই সে ওটা পরতে চাইবেই। হলও তাই। ঘড়িটা দেখার সাথে সাথেই নাইম বলল, এই ঘড়ি কোথায় পেলেন স্যার? দারুন তো স্টাইলটা?
আমার হাত থেকে ছো মেরে ঘড়িটা নিয়ে নিল। তারপর দ্রুত নিজের হাতে পরে ফেলল। আমি মনে মনে ভয় পাচ্ছিলাম যে এই বুঝি নাইম এখন চিৎকার করে উঠবে ব্যাথায়।
কিন্তু কিছু সময় পরেও যখন নাইম স্বাভাবিক রইলো তখন মনে হল যে নাইমের কিছু হবে না। তারপর নাইমের দিকে তাকিয়ে আমি আগ্রহ নিয়ে তাকিয়ে রইলাম এটা দেখার জন্য যে সেও আমার মাথার উপরে কিছু দেখতে পায় কিনা। বেশ কয়েকবারই সে আমার দিকে তাকাল তবে কিছু দেখেছে বলে মনে হল না। শেষ পর্যন্ত আমি থাকতে না পেরে বলেই ফেললাম, নাইম আমার দিকে তাকাও তো!
নাইম আমার দিকে তাকাল। বললাম, কিছু দেখতে পাচ্ছো ?
আমি হাত দিয়ে মাথার উপরটা দেখালাম। নাইম কিছু সময় দেখার চেষ্টা করে বলল, কী দেখব স্যার? কিছুই তো নাই! কী দেখতে বলছেন?
বুঝতে পারলাম যে নাইম কিছুই দেখতে পাচ্ছে না। তার মানে হচ্ছে এই ঘড়িটা পরলেই আমি সেই অদ্ভুত শূন্য সংখ্যার সারি দেখতে পাই এবং কেবল আমিই পাই। আর কেউ পায় না।
নাইমদের বাসা থেকে বের হয়ে আমি সেই ঘড়ির দোকানে গিয়ে হাজির হলাম। ঘড়িটা ওরা বেশ কিছু সময় নেড়ে চেড়ে দেখে বলল যে এমন ঘড়ি আর কেউ এখন ব্যবহার করে না। তাই ওরা এটা ঠিক করতে পারবে না। তবে এই ঘড়ির কোথায় ঠিক হতে পারে এমন একটা দোকানের ঠিকানা দিলেন। সেদিন অবশ্য যাওয়ার সময় ছিল না আর। আমি ঘড়িটা পকেটে পুরে বাসার দিকে রওয়ানা দিলাম।

দোকানটা খুঁজে পেতে বেশ কষ্ট হল। ছোট্ট একটা দোকান। দোকানটার সাইনবোর্ডের লেখাটাও প্রায় মুছে গেছে। ভেতরে ঢুকতেই একটা টিকটিক শব্দ কানে এল—অসংখ্য ঘড়ির কাঁটার শব্দ, একসাথে মিলেমিশে একটা অদ্ভুত সুর তৈরি করেছে। দেয়াল জুড়ে সারি সারি পুরনো ঘড়ি ঝুলছে। কোনোটা দেয়াল ঘড়ি, কোনোটা পকেট ঘড়ি, কোনোটা আবার আমার মতোই হাত ঘড়ি।
কাউন্টারের পেছনে একজন বৃদ্ধ লোক বসে ছিলেন। মাথার চুল সব সাদা, চোখে মোটা কাচের চশমা। হাতে একটা ছোট যন্ত্র নিয়ে একটা ঘড়ির ভেতরটা পরীক্ষা করছিলেন। আমাকে দেখে মাথা তুললেন।
-কী চাই
বয়সের তুলনায় লোকটার কন্ঠস্বর আমার কাছে বেশ জোড়ালোই মনে হল। আমি অবশ্য সেটা নিয়ে আর বেশি কিছু ভাবলাম না। পকেট থেকে ঘড়িটা বের করে কাউন্টারে রাখলাম।
-এটা ঠিক করা যাবে?

বৃদ্ধ লোকটা প্রথমে খুব একটা আগ্রহ দেখালেন না। চশমাটা ঠিক করে ঘড়িটা হাতে তুলে নিলেন। কিন্তু ঘড়িটা হাতে নেওয়ার সাথে সাথেই তার মুখের ভাব বদলে যেতে দেখলাম। তিনি ঘড়িটা চোখের কাছে এনে খুব ভালো করে দেখতে লাগলেন। আঙুল দিয়ে চামড়ার বেল্টটা স্পর্শ করলেন, তারপর ঘড়ির কাঁচের উপর আলতো করে আঙুল বুলালেন।
অনেকক্ষণ কোনো কথা বললেন না। শুধু ঘড়িটার দিকে তাকিয়ে রইলেন। এতো মনযোগ দিয়ে সে দেখছে সেটা আমি বলতে পারব না। তার কপালের ভাঁজ আরও গভীর হল।
তারপর তিনি সরাসরি আমার দিকে বললেন, রইস উদ্দিনের কে হয় তোমার?
নামটা শুনে আমি একটু চমকে উঠলাম। এই লোক আমার দাদার নাম জানল কীভাবে? দাদার সাথে আমার তেমন কোনো পরিচয়ই ছিল না। তবে তার নাম আমি জানতাম। আমি বললাম, উনি আমার দাদা। কিন্তু আপনি… আপনি ওনাকে চেনেন কীভাবে?
বৃদ্ধ লোকটা ঘড়িটা কাউন্টারে নামিয়ে রাখলেন, খুব সাবধানে, যেন জিনিসটা ভেঙে যাবে এমন ভয় পাচ্ছেন। সে তারপর বললেন, তার সাথে আমার একবার দেখা হয়েছে। অনেক বছর আগে। এই ঘড়ি ঠিক করতেই সে আমার কাছে এসেছি। ঠিক তেমন তুমি এসেছো!
আমি কিছুটা বিস্মিত হয়ে লোকটার দিকে তাকিয়ে রইলাম। আমার দাদুও এসেছিল এই ঘড়িটা নিয়ে। ব্যাপারটা আমার কাছে সত্যিই অবাক করে দেওয়ার মতই মনে হল!
আমি বললাম, ঠিক করতে পেরেছিলেন?
আমার কথা শুনে লোকটা একটু যেন বিরক্ত হলেন। তারপর বললেন, পারব না কেন? আমি ঠিক করতে পারি না এমন কোন ঘড়ি নেই।
-এটা পারবেন?
-হ্যা পারব। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে তুমি আসলেই কি এটা ঠিক করতে চাও?
-হ্যা চাই।
লোকটা আমার দিকে বেশ কিছুটা সময় স্থির সৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলেন। তারপর বললেন, এই জগতের এমন অনেক ব্যাপার আছে যা আগে থেকে জেনে নেওয়া মোটেই ভাল ব্যাপার না।
আমি লোকটার কথার কোন আগামাথা বুঝতে পারছি না। এই আসলে কী বলতে চাচ্ছে? আমি বললাম, আপনি ঠিক করে দিবেন কিনা সেটা বলেন? নয়তো অন্য কারো কাছে যেতে হবে!
আমার মুখের কথা শুনে লোকটা যেন খুব মজা পেল। তারপর একটু হেসে বললেন, তোমাদের জেনারেশনের আসলেই অনেক তাড়াহুড়া। ধৈর্য্য একেবারেই নেই। তুমি চাইলে এই ঘড়ি এখন থেকে নিয়ে অন্য যে কোন কারো কাছে নিয়ে যেতে পারো। কেউ এই ঘড়ি ঠিক করতে পারবে না আমি ছাড়া। রেখে যাও। কাল এসে নিয়ে যেও।
-কত টাকা দিতে হবে?
লোকটা হাসলেন, তারপর বললেন, কোন টাকা দিতে হবে না। এই ঘড়ির রিপেয়ার চার্জ দেওয়ার মত ধনী এই দুনিয়াতে নেই।
আমি আবারও কিছুটা বিভ্রান্ত হয়ে গেলাম। তারপর বললাম, ফ্রি ফ্রি করে দিবেন?
-একেবারে ফ্রি না। তবে সময় আসুক। তখন চেয়ে নিবো!

আমি ঘড়িটা রেখে চলে এলাম। বৃদ্ধের কথা বার্তার আগামাথা কিছুই আমার মাথায় ঢুকছিল না। তবে দাদু যখন ঘড়িটা তার কাছেই নিয়ে গিয়েছিল তখন তার ভেতরে কিছু তো একটা ব্যাপার আছে। আর আমারও সত্যিই মনে হল যে সেই ঘড়িটা ঠিক করতে পারবে।
পরের দিন সন্ধ্যা বেলা আমি হাজির হলাম ঘড়িটা নেওয়ার জন্য। দোকানের ভেতরে ঢুকতেই বৃদ্ধকে দেখতে পেলাম। গতদিনের মত একই ভাবে সে বসে আছে। আমার কেন জানি মনে হল এই দোকানে লোকজন আসে না বললেই চলে। গত কয়েকদিনে সম্ভবত আমিই একমাত্র কাস্টমার। আমি বৃদ্ধর সামনে গিয়ে দাঁড়ালাম। তিনি কোন কথা না বলে আমার একটু ঝুকে কাউন্টারের নিচ থেকে আমার দাদুর ঘড়িটা বের করে কাউন্টারের উপরে রাখলেন। আমি তাকিয়ে দেখি সেটা চলছে। আমার মনটা খুশি হয়ে উঠল। আমি জলদি জলদি সেটা হাতে পরতে গেলাম। কিন্তু আমাকে বৃদ্ধ লোকটা থামালেন। আমার দিকে তাকিয়ে বললেন, তুমি কি সত্যিই এটা পরতে চাও?
-কেন, চাইবো না কেন?
-তুমি জানো না?
আমার তখনই মনে হল যে এই ঘড়ির ব্যাপার এই লোকটা সব কিছুই জানেন।বৃদ্ধ লোকটা আবার বললেন, আমাদের সব কিছু জানতে নেই। না জানার ভেতরে অনেক আশীর্বাদ রয়েছে। তাই না?

আমি তার কথা কিছুই বুঝতে পারছিলাম না। তবে কেন জানি আমার মনে ভেতরে একতা তীব্র বাসনা জন্মালো এই ঘড়িটা পরার জন্য। আমাকে এই ঘড়িটা পরতেই হবে এমন একটা অনুভূতি আমার মনের ভেতর জেগে উঠল। আমি ঘড়িটা হাতে পরলাম। এবং সাথে সাথেই আমার মাথার ভেতরে আবার সেই তীব্র একটা যন্ত্রণা দেখা দিল। তবে এটা সেদিনের মত স্থায়ী হল না। মাত্র কয়েক মুহুর্ত পরেই সেটা চলে গেল। আমি হাতের দিকে তাকিয়ে দেখলাম ঘড়িটা চলছে। বন্ধ হয় নি। আমার সবার আগে লোকটার মাথার উপরে চোখ গেল এবং অবাক হয়ে খেয়াল করলাম যে সেখানে কোন শূন্য সংখ্যা নেই। কিছু নেই। তিনি যেন আমার মনের কথা টের পেলেন। একটু হাসি মুখে বললেন, কী দেখছো?
-কিছু না। আপনাকে কী দিতে হবে?
-এখন কিছু দিতে হবে না। তবে কোন এক সময়ে আমার কাছে তোমাকে আবার আসতে হবে। তখন দিও।

আমি আর কিছু না জিজ্ঞেস করে দোকান থেকে বের হয়ে গেলাম। কিছু দূর যেতে রাস্তার বিপরীত দিক একটা ছোট পিচ্চি বাচ্চকে আমার দিকে এগিয়ে আসতে দেখছিলাম। এবং এই বাচ্চাটার মাথার উপরে সেই শূণ্য সংখ্যা ভাসতে আমি দেখছিলাম। তবে এবার এই সংখ্যাগুলো শুণ্য ছিল না। এখানে অনেকগুলো সংখ্যা ছিল। আমি অবাক হয়ে সেই সংখ্যাগুলোর দিকে তাকিয়ে রইলাম। 59364235958
এবং শেষ দুই সংখ্যা ক্রমাগত কমছে।
59364235957
59364235956
——————
59364235941
59364235940

আমাকে একভাবে তাকিয়ে থাকতে দেখে পিচ্চি ছেলেটা আমার দিকে তাকিয়ে বলল, কী দেখেন?
আমি কিছু বলতে পারলাম না। কোন মতে বললাম, কিছু না। তোমার চেহারাটা কেমন পরিচিত মনে হচ্ছে!

পিচ্চিটা একটু যেন বিরক্ত হল। তবে আর কিছু বলল না সে। আমাকে পাশ কাটিয়ে চলে গেল। আমি এই সংখ্যাটার মাথা মুন্ডু কিছুই বুঝতে পারলাম না। তবে ব্যাপারটা বুঝতে আমার খুব বেশি লাগল না।
বাসায় যাওয়ার জন্য আমি যে রিক্সায় উঠলাম সেই লোকটার মাথার উপরেও সংখ্যাগুলো ছিল। আমি যেহেতু পেছনে ছিলাম তাই সংখ্যাগুলো খুব ভাল করে দেখতে পাচ্ছিলাম।
01204182958
বোঝার জন্য আমি মোবাইলে সেই সংখ্যাগুলো লিখলাম। তারপর চ্যাট জিপিটিকে জিজ্ঞেস করলাম এগুলো কিসের প্যার্টার্ন। এক নিমিশেই চ্যাটজিপিটি যা বলল তাতে আমার চোখ কপালে উঠল। সে জানালো সংখ্যাগুলোর ভেতরে কোন প্যার্টার্ণ নেই তবে এটা দিয়ে একটা সময় বোঝাচ্ছে। ০১ বছর, ২০৪ দিন, ১৮ ঘন্টা, ২৯ মিনিট এবং আটান্ন সেকেন্ড।
ঐ পিচ্চিটার বেলাতে অন্য সংখ্যাগুলো আমার মনে না থাকলেও প্রহতম দুইটো সংখ্যা ছিল ৫৯। আর এই লোকটার সামনের দুই সংখ্যা রয়েছে ০১। আচ্ছা তাহলে কী?
ব্যাপারটা মাথার ভেতরে ধরতে পারতেই আমার পুরো শরীরটা কেঁপে উঠল। মানে হচ্ছে ঐ পিচ্চিটা এখনও ৫৯ বছর বাঁঁচবে। এটা তার আয়ু যা প্রতিনিয়ত কমছিল আর সামনের এই রিক্সাওয়ালা আয়ু হচ্ছে মাত্র এক বছর ২০৪ দিন!
আমার কাছে পুরো ব্যাপারটা সত্যিই অবিশ্বাস্য মনে হচ্ছিল। এমনটা হওয়ার কোন কারণ নেই। এমনটা সম্ভব না। এই ব্যাপারটা জানার কোনো ভাবেই সম্ভব না। এই নম্বরগুলোর অন্য কোনো মানে নিশ্চয়ই আছে!
কিন্তু আমার ধারণা ঠিক হল না।
আমি বাসায় ঢোকার আগে আমি মুদি দোকান থেকে কিছু জিনিসপত্র কিনতে গেলাম। সেখানেই আমি মুদি মামার মাথার উপরের সংখ্যাটা দেখতে পেলাম এবং সাথে সাথেই আমার চোখ কপালে উঠল। সংখ্যাটা দেখাচ্ছে মাত্র সাড়ে চার ঘন্টার কিছু বেশি। মানে হচ্ছে এই লোকটা আর মাত্র সাড়ে চার ঘন্টার পরে মারা যাবে?
আমি কিছু সময় লোকটার দিকে তাকিয়ে রইলাম। তারপর মাল সদাই নিয়ে বাসার দিকে রওয়ানা দিলাম। তবে বাসায় ঢোকার আগে আমি আমার হাতের ঘড়িটা খুলে রাখলাম। আমি কোন ভাবেই বাসার লোকজনের আয়ু জানতে চাই না। আমি দেখতে চাই না তারা কতদিন বেঁচে থাকবে আর কতদিন পরে তারা মারা যাবে।

ঠিক রাত সাড়ে এগারোটার দিকে আমি কান্নার আওয়াজ পেলাম। মুদি দোকানদার তার পরিবার নিয়ে আমাদের বাসার কয়েক বাসা পরেই থাকত। তাই কান্নার আওয়াজটা আমার শুনতে কষ্ট হল না। লোকটা সত্যিই ঠিক সাড়ে চার ঘন্টার পরেই মারা গেছে। তার মানে হচ্ছে এই ঘড়িটা আমাকে মানুষের আয়ু দেখতে সাহায্য করছে। আমি দেখতে পাচ্ছি কে কখন মারা যাচ্ছে!

চলবে…

ফেসবুকের অর্গানিক রিচ কমে যাওয়ার কারনে অনেক পোস্ট সবার হোম পেইজে যাচ্ছে না। সরাসরি গল্পের লিংক পেতে আমার হোয়াটসএপ বা টেলিগ্রামে যুক্ত হতে পারেন। এছাড়া যাদের এসব নেই তারা ফেসবুক ব্রডকাস্ট চ্যানেলেও জয়েন হতে পারেন।

অপু তানভীরের অনুবাদ গ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে

বইটি সংগ্রহ করতে পারেন ওয়েবসাইট বা রকমারী বা ফেসবুকে থেকে।

এছাড়া সকল গল্পের লিস্ট পাবেন সূচিপত্রে। পুরানো আগের গল্প পড়তে পারবেন সামহোয়্যারইন ব্লগ ও ওয়াটপ্যাড থেকে।

How useful was this post?

Click on a star to rate it!

Average rating 4.8 / 5. Vote count: 14

No votes so far! Be the first to rate this post.


Discover more from অপু তানভীর

Subscribe to get the latest posts sent to your email.

About অপু তানভীর

আমি অতি ভাল একজন ছেলে।

View all posts by অপু তানভীর →

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *