ভালোবাসার অভিশাপ

4.3
(13)

পাহাড় দিশার কাছে নতুন নয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের দিনগুলোতে বন্ধুদের সাথে ট্যুরে এসেছে অনেকবার। নাফাকুম দিয়ে শুরু হয়েছিল পাহাড় যাত্রা। প্রথম সেই যাত্রায় পাহাড়কে এমন ভাবে ভালোবেসে ফেলেছিল যে এখান থেকে সে মন সরাতে পারে নি। অন্যেরা যেখানে বেড়ানো বলতে কক্সবাজার কিংবা সিলেট বোঝে অথবা টাঙ্গুয়ার হাওড় দিশার কাছে সেটা কেবলই বান্দরবান। প্রথমবার আসার পরে কতবার যে এই পাহাড়ে আসা হয়েছে আর নাম মনে-না-রাখা কত পাহাড়ি পাড়াতে যে দিশা রাতে থেকেছে তার ঠিক নেই। আজকেই দইনাল পাড়াতেও এর আগেও এসেছে কয়েকবার। সর্বশেষ এসেছিল রায়হানের সাথে বিয়ের আগে। অনেক কিছুই বদলেছে। আগে এই পাড়াতে ঠিকঠাক মত ওয়াশরুম ছিল না। তবে এখন কয়েকটা ওয়াশরুম বানানো হয়েছে।
দিশা কাল সন্ধ্যার একটু আগে এখানে এসেছে। সাথে ছিল গাইড সাং। দিশা ভেবেছিল পাড়াটা সে ফাঁকাই পাবে। ট্যুরগ্রুপগুলো সাধারণত শুক্রবার কিংবা সরকারি ছুটির দিনে এই সব পাহাড়ে আসে। এই কারণে সে সপ্তাহের মাঝখানে এসেছিল যাতে করে একটু নিড়িবিলি পাওয়া যায়। কিন্তু পাড়াতে আসতেই দেখা গেল যে এখানে একটা না দুটো গ্রুপ অবস্থান করছে। পুরো পাড়াটা গমগম করছে মানুষ দিয়ে। এটা খুব বেশি বড় পাড়া না। সব মিলিয়ে ১৫/১৬টা পরিবারের বাস। তার ভেতরে কেবল ৪/৫টা ঘরই আছে যারা গেস্ট রাখে।
দিশাকে দেখে কয়েকজন বেশ অবাকই হল। দিশা কোন গ্রুপের সাথে আসে নি। এই দুর্গম এলাকাতে সাধারণত কেউ গ্রুপ ছাড়া আসে না। যদিও কিছু কিছু ট্রাভেলার আছে যারা পাহাড়ে চষে বেড়ায় কিন্তু দিশার মত কোনো মেয় একা এভাবে সাধারণত আসে না। এই ব্যাপারটা এখানে খুব একটা দেখা যায় না।
দিশার জন্য আলাদা জায়গা অবশ্য হল না। ঘুরতে আসা গ্রুপের সাথে একই ঘরে থাকতে হল। অবশ্য পাহাড়ে এভাবেই থাকতে হয়। একটা বড় ঘর থাকে। সেই ঘরেই সবাই পাশাপাশি ঘুমায়। অবশ্য এতে দিশার খুব একটা সমস্যা ছিল না। এমনটাই হওয়া স্বাভাবিক একটা ব্যাপার। এমন ব্যাপার আগেও অনেকবার হয়েছে।
গ্রুপের মেয়েদের সাথে টুকটাক কথাও হল দিশার। কোন নির্দিষ্ট জায়গায় যাবে না শুনে ওরা বেশ অবাকই হল। দিশা ওদের বলল যে ওরা কাল যে পাহাড়ে যাচ্ছে সেই পাহাড়ে দিশা আগেই আগেই উঠেছে। এবারের ট্যুরে তাই তার আসলে কোথাও ওঠার ইচ্ছে নেই। কেবলই কয়েকটা দিন এই পাড়া থেকে ঐ পাড়াতে হেটে বেড়ানো। দিশার একদম পাশে যে মেয়েটা শুয়ে ছিল সে নানান কথা বলল। নিজের নাম বলল মিশু। সে তার বয়ফ্রেন্ডের সাথে এখানে এসেছে। হাত দিয়ে একটা ছেলেকে দেখালো সে। ভিড়ের মাঝেও মিশুর বয়ফ্রেন্ডকে আলাদা ভাবে লক্ষ্য করল দিশা। দিশা অবশ্য সেই চিন্তা বাদ দিয়ে নিজের চিন্তায় মগ্ন হয়ে গেল। কালকে একটা ভয়ংকর কাজ করতে হবে ওকে। সে আসলে পারবে তো?
ভোর বেলাতেই গ্রুপদুটোর সবাই বের হয়ে গেল। কেবল দিশা রয়ে গেল পাড়াতে। একটু পরে পাড়ার বড়রাও একে একে কাজে বের হয়ে যেতে লাগল। সকাল নয়টার ভেতরে দিশা অনুভব করল যে পুরো পাড়াতে কেবল কিছু মানুষই রয়ে গেছে। পাহাড়ে সব পাড়ার চিত্রটাই এমন। দিনের আলো ফুটতে না ফুটতেই পাড়ার পুরুষ এবং নারীরা কাজে বের হয়ে যায়। পাড়াতে কেবল বাচ্চারা এবং বৃদ্ধরা থাকে। দিশার গাইড ওর জন্য সকালে নাস্তা রেডি করে দিয়ে গেছে। নাস্তা বলতে কেবল খিচুড়ি আর ডিম ভাজি।
নাস্তা খেয়েই দিশা বাইরে বের হবে। বের হওয়ার আগে ছোট একটা ব্যাগ নিয়ে নিল সাথে। ব্যাগের ভেতরে ওর রায়হানের বাবার লাইসেন্স করা রিভালবারটা আছে। এটা নিয়ে আসতে গিয়ে ওর মনের ভেতরে একটা ভয় কাজ করছিল কারণ এখানে আসার পথে বেশ কয়েক জায়গাতে আর্মির চেকপোস্ট আছে। আশার কথা হচ্ছে ট্যুরিস্টদের সাধারণত চেক করা হয় না। মেয়ে হলে তো আর হয় না। পিস্তলটা রাখা হয়েছিল দিশার ব্যাগের একেবারে ভেতরে। আশা ছিল যে দিশার ব্যাগ ওরা চেক করবে না। যদিও দিশা জানে না যে এই পিস্তলটা ওদের আদৌও কোনো সাহায্য করবে কিনা!
আজকের ভেতরেই তাদের কাজটা শেষ করে ফেলতে হবে। এই পাড়ার কেউ ব্যাপারটা জানে না। সে যেভাবে পাড়াতে এসেছে, যদি এখানে বেশি দিন বসে থাকে তবে পাড়ার লোকজন সন্দেহ করতে পারে। এমনিতেই পাড়ার কারবারি সাহেব ওর দিকে কেমন চোখে তাকিয়ে ছিল। কিছু যেন একটা সন্দেহ করেছে সে। যেন এভাবে পাড়াতে আসাটা স্বাভাবিক কোন ব্যাপার না। তাই তাদের সন্দেহ হওয়ার আগেই কাজটা শেষ করে ফেলতে হবে। তাদের কোনো ভাবেই জানতে দেওয়া যাবে না। ওর গাইড সাং যদিও জানে তবে সাংকে দিশা অনেক দিন ধরেই চেনে। অনেকগুলো জার্নিতে সাং দিশার সাথে ছিল। এমনকি সাং কয়েকবার ঢাকাতে যখন গিয়েছে দিশা ওর সাথে দেখা করেছে, নানান জায়গায় ঘুরে বেড়িয়েছে। এমনকি রাতে সে দিশার বাসাতেই থেকেছে। এই কারণেই সাং দিশাকে এখানে নিয়ে আসতে রাজি হয়েছে। তবে সে এটাও পরিষ্কার বলে দিয়েছে সে কিছুতেই তার সাথে ভেতরে যাবে না। তাকে একাই যেতে হবে।
হাটতে হাটতে সে পাড়ার শেষ প্রান্তে চলে এল। পাড়া থেকে বের হওয়ার পথ একটাই। সেদিক দিয়ে নেমে গেল নিচে। নিচে নামতে নামতে প্রচলিত পথটা চিনতে তার কষ্ট হল না। অন্য সময় হলে দিশা হয়তো চারপাশের প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের দিকে তাকাত, সেটা উপভোগ করতো, পাহাড়ের এই কাজটাই তার সব থেকে বেশি পছন্দ। কিন্তু আজকে দিশা কিছুই করছে না। সে কেবল নিশ্চুপ হয়ে সামনের দিকে হাটছে। কোন কিছুর দিকে তার খেয়াল নেই। তার মনে চিন্তার ঝড় বয়ে চলছে।
প্রায় আধাঘন্টা হাটার পরেই সে পথটা দেখতে পেল। ডান দিকের নিচ দিয়ে আরও একটা পথ নেমে গেছে নিচে। তবে এই পথে কেউ খুব একটা যায় না। কিন্তু দিশাদের এই পথেই যেতে হবে। এই পথের মাঝে পড়বে একটা ঝিরি এবং এরপর একেবারে শেষ প্রান্তে রয়েছে সেই মন্দিরটা।
পথটার সামনে দাঁড়িয়ে কিছু সময় ওরা কিছু সময় একভাবে দাঁড়িয়ে রইল। মনের ভেতরে একটা অশুভ আশংঙ্কা কাজ করছে। বারবার মনে হচ্ছে যে কাজটা ওরা করতে পারবে তো? যদি না পারে তখন?
যদি কাজটা না পারে তাহলে রায়হানের কী হবে?
আজকে রায়হানের এই অবস্থার পেছনে কেবল সে দায়ী!
রায়হানের অবস্থা এখন কিছুটা ভাল মনে হলেও সেটা কেবল ওর হাতের ঐ ব্রেসলেটটার জন্য। রমিজ কবিরাজ বলেছিল যে এই কাপড়ের ব্রেসলেটটা খুব বেশি দিন টিকবে না। এটা দিয়ে সাময়িক ভাবে হয়তো নিস্তার পাওয়া যাবে তবে স্থায়ী কোন সমাধান পাওয়া যাবে না। স্থায়ী সমাধানের জন্যই সে এখানে এসেছে। ওকে শেষ চেষ্টা একবার করতেই হবে।

-আপু!
দিশা চমকে উঠল। পেছন তাকিয়ে দেখল ওর গাইড সাং। ওর দিকে তাকিয়ে বলল, চলেন।
দিশা বলল, হ্যা দেরি করে তো লাভ নেই। আরো কিছুটা পথ হাটতে হবে!
-আমি আপনাদের গেট পর্যন্ত নিয়ে যাই।
সাংয়ের কথা শুনে দিশা মাথা নাড়ল। সাং আগেই ওকে স্পষ্ট করেই বলে দিয়েছে যে মন্দিরের পথে কোনো পাহাড়ী যাবে না, এমন কি সে নিজেও যাবে না। দিশা অনেক টাকার লোভ দেখিয়েছিল তাতেও সাং রাজি হয় নি। তবে দিশার আকুল আবেদন শুনে সাংয়ের মন একটু গলেছে। সে কেবল বন্ধপথ পর্যন্ত ওকে এগিয়ে দিতে রাজি হয়েছে। বাকিটা পথ ওকে একাই যেতে হবে। এছাড়া আর কোন পথ খুজে না পেয়ে দিশা তাতেই রাজি হয়েছে।
সাং আগে আগে নেমে গেল। দিশারা নামল তার পেছন পেছন। কেউ কোন কথা বলছে না। মিনিট বিশেক চুপচাপ হাটার পরে একটা ঝিরি পড়ল পথে মাঝে। সাং ঝিরি এপাশেই দাঁড়িয়ে পড়ল। দিশা দেখতে পেল যে ঝিরি পার হয়েই ওপাশটা গাছপালা দিয়ে ভরতি। তার মাঝেই একটা ছোট অন্ধকার যাওয়ার পথ। তবে সেই পথটার সামনে বাঁশ দিয়ে আটকানো।
সাং বলল, আমরা এই ঝিরি পার হই না। এটা আমাদের জন্য মানা।
দিশা বুঝতে পারছিল। সে এক ভাবে তাকিয়ে রইলো সে অন্ধকার পথেই মাঝে। এখন দিনের আলো হলেও ওর কেন জানি মনে হল যে ওপাশটা একেবারে অন্ধকারে ভরা। এখনই যদি এমন অবস্থা হয় তবে রাতের বেলা কী হবে সেটা দিশা ভাবতেও পারছে না। এর ভেতরে তাকে ঢুকতে হবে।
সাং পকেট থেকে একটা কাগজ বের করে দিল দিশার হাতে। দিশা তাকিয়ে দেখল সেটা হাতে আঁকা একটা ম্যাপ। দিশা সেটার দিকে একবার তাকাল। সাং বলল, মন্দিরটা পাবেন সোজা পথেই। পথ চিনতে অসুবিধা হবে না। মনে রাখবেন মন্দিরটা কেবল নিচের দিকে যাচ্ছে। তাই যখন যখন দুই রাস্তার মোড় দেখবেন তার ভেতরে নিচের দিকে গেছে সেদিকেই নামবেন।
তারপর সে নিজের কাধের ব্যাগ থেকে একটা বড় ছুরি বের করে দিশার দিকে দিল। তারপর বলল, তারপরেও সাবধানের মার নেই। আপনি হাটার সময় একটু পরপরই গাছের ডালপালা বা বাঁশের কোঞ্চি কাটবেন তারপর সেটা পথের মাঝে পুতে দিবেন যাতে কোন পথ দিয়ে গেছেন সেটা চিনতে সুবিধা হয়। বুঝেছেন?
দিশা মাথা নাড়ল। সে ব্যাপারটা বুঝতে পেরেছে। সাং ওকে বলেছে তাকে একা একা চিনে ফেরত আসতে হবে। কেউ এই রাস্তায় ঢুকবে না। এমন কি বিজিবির লোকজনও আসবে না।
দিশা লম্বা একটা দম নিল। তারপর ঝিরির পানিতে নেমে গেল। ঠান্ডা একটা স্রোত দিশার পুরো শরীর দিয়ে বয়ে গেল। অন্য সময় হলে এই ঠান্ডা ভাবটা সে উপভোগ করত তবে এখন সে মনভাব নেই। এখন তার মনে একটা অদ্ভুত অনুভূতি কাজ করছে। এক অচেনা বিপদের সাথে সে মোকাবেলা করতে যাচ্ছে!
তাদের সাহায্য করার মত কেউ নেই। কেউ এগিয়ে আসবে না।

দিশা আসলেই এই ব্যাপারটা এখনও বিশ্বাস করতে পারছে না। এই আধুনিক যুগে কেউ কি এসব বিশ্বাস করে? কিন্তু চোখের সামনে যে যা দেখেছে সেটা কিভাবে অবিশ্বাস করবে? দিশা বারবার নিজেকে বোঝানোর চেষ্টা করেছে যে ওটা ওর চোখের ভুল ছিল অথবা হ্যালুসিনেশন ছিল। কিন্তু ওর ননদ শ্বশুর শাশুড়ি সবাই কি চোখ ভুল দেখবে? সবাই একই জিনিস দেখবে?
রায়হানের মুখ দিয়ে সেই অদ্ভুত কন্ঠস্বর বের হওয়া তারপর এই অপদেবতার কথা উল্লেখ করা! রায়হানের কোন ভাবেই এই পাড়ার কথা জানার কথা না। সে জীবনেও কোন দিন পাহাড়ে বেড়াতে আসে নি।
কিন্তু যখন রাবিবকে তারা ধরল তখন পুরো ব্যাপারটা একদম পরিষ্কার হয়ে গেল। রাবিব তার পা চেপে ধরেই বলেছিল যে সে ভুল করে ফেলেছে। সে টাকার লোভ সামলাতে পারে নি। সাব্বিরকে সে আগে থেকেই চেনে ভাল করে। দিশার সাথে সম্পর্ক থাকা কালে দিশাই রাবিবকে সাথে নিয়ে যেত দেখা করতে। সম্পর্কটা শেষ হয়ে যাওয়ার পরেই সাব্বির ঠিকই রাবিবের সাথে যোগাযোগ রেখেছিল। কেন রেখেছিল সেটা দিশা এখন বুঝতে পারছে। কিন্তু রায়হানের তো কোন দোষ নেই। সে তো কারো কোনো ক্ষতি করে নি। কেউ যদি অপরাধী হয়ে থাকে তবে সেটা ছিল দিশা নিজে। রায়হানকে কেন কষ্ট দেওয়া? রায়হানের চেহারার দিকে দিশা তাকাতে পারছিল না। দিনকে দিন রায়হানের অবস্থা খারাপের দিকেই যাচ্ছিল। রায়হানকে দেখে মনে হচ্ছিল যেন কিছু একটা ওকে ভেতর থেকে খুবলে খেয়ে ফেলছে। কোন ডাক্তারের চিকিৎসা তাকে ভাল করতে পারছে না।
ঠিক সেই সময়ে ওদের বাসার কাজের মেয়ে প্রথমে কথাটা তুলেছিল। সে দিশাকে বলেছিল, ভাইজানতে কেউ তাবিজ করছে! দিশা এই কথা শুনে একটু বিরক্তই হয়েছিল প্রথমে। তবে তারপর যখন যখন আবারও দ্বিতীয়বার ভাবল তখন মনে হল যে একবার একজন হুজুরকে ডেকে আনে। যথারীতি হুজুরকে ডেকে আনা হল। দিশা ভেবেছিল যে সব কিছুই তো চেষ্টা করা হচ্ছে। এটা কেবল মনের শান্তির জনই করা। আজ কাল কেউ কি এসবে বিশ্বাস করে?
কিন্তু দিশা বিশ্বাস করে বাধ্য হয়েছিল। রায়হানের পুরো পরিবার বিশ্বাস করতে বাধ্য হয়েছিল। হুজুর যখন বাসার ভেতরে ঢুকল তখনই তার চেহারার একটা পরিবর্তন দিশা লক্ষ্য করেছিল। মানুষ যেমন দুর্গন্ধ পেলে নাক কুচকে ওঠে হুজুর সাহেবও ঠিক তেমন করে তার মুখ বিকৃত করে ফেললেন। তাকে বলেও দিতে হল না যে রায়হানের ঘরটা কোন দিকে। তিনি যেন গন্ধ শুকেই সেদিকে চলে গেলেন। দরজাটা খুলতে গিয়েও খুললেন না। তারপর আবারও তাদের দিকে ফিরে এলেন। তারপর দিশার শ্বশুরের দিকে তাকিয়ে বললেন, ভাই সাহেব, আমাকে মাফ করেন। এই জিনিস আমার দ্বারা সারানো সম্ভব না। আমি কাছেই যাইতে পারবো না এটার।
-মানে? কী বলছেন আপনি?
-আপনার ছেলেকে খুব খারাপ কিছুতে ধরেছে। আর যে ধরেছে সে এই পৃথিবীর কেউ না। তাকে ডেকে দিয়ে এসে আপনার ছেলের উপর লেলিয়ে দেওয়া হয়েছে।
হুজুরের মুখে যে ভয়টা দিশা দেখেছিল সেটা তার কাছে কোনো ভাবেই ভণিতা মনে হয় নি। হুজুর আসলেই ভয় পেয়েছেন সেটা স্পষ্ট। হুজুর বললেন, মানুষ আর জ্বিনের শরীরের যে গন্ধ থাকে সেটা আমি চিনি। আপনারা বিশ্বাস করেন বা না করেন আমি এটা বুঝতে পারি ছোটবেলা থেকেই। যে গন্ধটা ঐ ঘর থেকে আসতেছে তারা এই পৃথিবীতে থাকে না। তার অন্য জগতে থাকে। তাদেরকে ডেকে আনা ছাড়া তারা আসে না আর একবার যখন আসে তখন কোন প্রাণ না নিয়ে তারা ফেরত যায় না। আমার এখানে কিছুই করার নেই। আমার কেন কারোরই কিছু করার নেই।
হুজুর আর কিছু না বলে সেখান থেকে দ্রুত চলে গেলেন। তাকে দেখে মনে হল তিনি যেন পালিয়ে বাঁচতে চাইছেন। হুজুর যে মিথ্যা বলছে না সেটার প্রমান পাওয়া গেল দিন দুয়েক পরে। আরেকজন হুজুর ডেকে আনা হল। তাকে দেখে বেশ আত্মবিশ্বাসী মনে হল। সে সোজা রায়হানের ঘরের ভেতরে ঢুকে পড়ল। দিশাদের ঘরের বাইরেই থাকতে বলল। বেশ কিছু সময় কোন আওয়াজ শোনা গেল না তবে একটা সময় ঘরের ভেতরে ঢুপ করে কিছু পরার আওয়াজ হল। তারপর কিছু সময় নিরবতা। তারপরই দরজাটা খুলে গেল। দিশা অবাক হয়ে দেখল হুজুরটা পড়িমড়ি করে দৌড় দিল। তার কাপড় ছিড়ে গেছে। ভেতরে যে ভয়ংকর কিছু হয়েছে সেটা বুঝতে কারো আর কষ্ট হল না।
এরপর প্রায় সাতদিন কেটে গেল। রায়হানের অবস্থা আরও খারাপ হয়ে গেছে। কয়েকবার ডাক্তার এসেছে। সব কিছু ঠিক আছে কিন্তু রায়হানের হুস নেই। অল্প শ্বাস প্রশ্বাস আছে এই যা। দিন দিন সে যেন শুকিয়ে যাচ্ছে। যখন তারা একেবারে আশা ছেড়েই দিয়েছিল তখন একজন লোক এসে হাজির হল ওদের বাসায়। নিজের পরিচয় দিলেন কবিরাজ হিসাবেই। তিনি কারো কাছ থেকে খবর পেয়েছেন তারপর এসেছেন এখানে। তিনি রায়হানের ঘরে ঢুকলেন। সাথে দিশা আর দিশার শ্বশুর শাশুড়িও ঢুকলেন। লোকটা বেশ কিছু সময় রায়হানের হাত ধরে বসে রইল। তারপর হাত ছেড়ে দিয়ে সে তাকালো দিশার শ্বশুরের দিকে। তারপর বলল, আপনার ছেলেকে দইনালে ধরেছে।
-এটা আবার কী?
-এক ধরনের অপদেবতা বলতে পারেন।
-আপনি এতো নিশ্চিত কিভাবে হচ্ছেন?
-নিশ্চিত হচ্ছি কারণ আমি এটার পেছনে কিছুটা দায়ী!
-মানে? কী বলছেন আপনি?
লোকটা কিছু সময় চুপ করে থেকে বলল, কয়েকমাস আছে আমার কাছে একটা ছেলে এসেছিল। সে আমার কাছে এই দইনালের কথা জানতে চায়। কেন জানতে চায় সেটা আমি সেই সময় বুঝি নি। সে আমাকে বলল যে তার পুরানো মিথ পাহাড়ি অপদেবতা সম্পর্কে আগ্রহ রয়েছে। সেটা নিয়ে একটা ভিডিও নাকি বানাবে। এই জন্য অনেক তথ্য দরকার। আমাকে কিছু টাকাও দিতে চাইল। আমি তখন আর তেমন কিছু চিন্তা করি নি। আমি তাইকে দইনাল দেবতা সম্পর্কে বলি।
এটা বান্দরবানের গহীনের একটা পাড়ার গল্প। একটা সময়ে ঐ পাড়া এবং তার আশে পাশের সব লোকজন এই দেবতার পুজা পুজো করতো। নিয়ম করে নানান পশু পাখি বলি দিত। তবে যতই দিন যাচ্ছিল দেবতার ক্ষুধা যেন মিটছিল না। তাই সে পাড়ার পুরোহিতকে বারবার স্বপ্ন দেখাতে শুরু করল যে বড় কিছু বলি দিতে। পাড়ার লোকজন যখন পুরোহিতের কথা মত প্রথমে ছাগল পরে একটা গয়াল পর্যন্ত বলি দিল কিন্তু দেবতা সন্তুষ্ট হল না। তখন আর কারো বুঝতে বাকি রইলো না যে দইনাল দেবতা কিসের বলি চাচ্ছে। কিন্তু সেটাতে পাড়ার লোকজন রাজি ছিল না। বিশেষ করে পাড়া প্রধান এবং পুরোহিত কেউ রাজি ছিলেন না। কিন্তু একজন ঠিকই মনে মনে ফন্দি এটেছিল এই কাজ করার। তার মনে এই বাসনা ছিল যে যদি সে দেবতার উদ্দেশ্য বলি দেয় তবে তার মনের ইচ্ছে পূরণ হবে। সেই মোতাবেগই একদিন রাতের বেলা সে নিজের পাঁচ বছরের ছেলেকে নিয়ে হাজির হল চুপিচুপি দেবতার সামনে। তবে একেবারে শেষ মুহুর্তে পাড়ার লোকজন টের পেয়ে যায়। বলি আটকে যায়!
এতে দইনাল ভিষণ রেগে যায়। সে পাড়ার লোকজনের উপরে নানান ঝামেলা সৃষ্টি করতে থাকে। তখন পুরোহিত পুরো মন্দিরটা চারপাশের এলাকাটা একেবারে সিল করে দেয়। তারপর থেকে সেখানেই বন্দি রয়েছে সে।
লোকটা কিছু সময় চুপ করে রইলো কিছু সময়। প্রত্যেক অবদেবতার মত দইনালকেও নিজেকের কাজে ব্যবহারের জন্য বেশ কিছু নিয়ম কানুন রয়েছে। পাড়ার লোকজন ভেট দেওয়ার মাধ্যমে নিজেকের পাড়ার উপরে নানান আশীর্বাদ চাইত। বিশেষ করে ঐ এলাকাতে পানির বেশ সমস্যা ছিল। তাদের পাড়ার আশে পাশ দিয়ে যেন ঝিরি চলতে থাকে এটাই তাদের চাওয়া ছিল। সেই সময়ে বেশ বড় একটা ঝড়ছিল কাছেই। দইনালকে বন্দি করার পর সেই ঝর্ণাটা প্রায় মরে গেছে। এছাড়া দইনালকে দিয়ে কারো ক্ষতিও করা যেত। যাকে ক্ষতি করতে হবে তার পরিধানের কোন পোশাক নিয়ে বলির প্রাণীটার গায়ে পরাতে হবে। তারপর সেটাকে জবাই করে সেখানেই রেখে দিতে হবে। তবেই কাজ হবে। এই সব কথা আমি সেই ছেলেকে জানাই।
দিশা বলল, তার মানে রায়হানের কোনো পোশাক দিয়ে এই কাজটা করানো হয়েছে।
-হ্যা। এটা ছাড়া সম্ভব না।
দিশা বলল, সেই ছেলেটা দেখতে কেমন ছিল বলতে পারেন?
লোকটা একটু ভাবল তারপর বলল, বেশ লম্বা ছিল। চোখ দুটো উজ্জ্বল আর ঘনকালো চুল। গায়ের রং শ্যামলা।
বর্ণনা শুনেই দিশার মুখ কালো হয়ে গেল। সে চিনতে পারল সাথে সাথেই। কিন্ত রায়হানের পোশাক সে পেল কিভাবে? এমন প্রশ্নটা যখন মাথায় কাজ করছে তখনই তার রাবিবের কথা মনে হল। কদিন আগে রাবিব ওদের বাসায় এসেছিল। আর রাবিবের সাথে সাব্বিরের খুব ভাল সম্পর্ক ছিল।
দিশার মাথার ভেতরে তখন চিন্তার ঝড় চলছে। সে বলল, এটার থেকে বাঁচার কোন উপায় নেই?
-আছে তবে সেটা বেশ কঠিন একটা কাজ।
-কী করতে হবে?
-সেই মন্দিরে গিয়ে সে বলির শরীর থেকে সেই পোশাকটা খুজে নিয়ে আসতে হবে। এরপর সেটাকে পানি দিয়ে ধুয়ে পরিষ্কার করতে হবে যতটা সময়ে না সেই বলির রক্ত একেবারে পুরোপুরি পোশাক থেকে আলাদা না হয়ে যায়।
দিশা তখনই ঠিক করে নিল যে সে যাবে। সে নিজেই যাবে সেই মন্দিরে। তবে কবিরাজ বলল, তবে সেখানে যাওয়া সহজ হবে না।
দিশা সবার আগে রাবিবকে গিয়ে ধরল। একটু চাপ দিতেই সে সব স্বীকার করে নিল। সাব্বির তাকে আসলেই টাকা দিয়েছিল রায়হানের একটা শার্ট বা টিশার্ট নিয়ে আসতে। কদিন আগে সে ঠিক এই উদ্দেশ্যেই দিশাদের বাসায় বেড়াতে এসেছিল। রাগে দিশার শরীরে আগুন ধরে গেল। সে তখনই সাব্বিরদের বাসায় গিয়ে হাজির। আজকে তাকে সে দেখে নিবে। তবে সেখানে গিয়ে অবাক হয়ে একটা খবর পেয়ে। প্রায় মাস খানেকের উপরে সাব্বির নিখোজ। সে কোথায় আছে কেউ জানে না।

সাব্বিরের পেছনে আর বেশি সময় নষ্ট করল না। সে এবার তার সঙ্গি খুজতে শুরু করল। তবে অবাক হয়ে খেয়াল করল যে পরিচিত কেউ সেখানে যেতে রাজি হল না। পাহাড়ে ঘুরেছে সে অনেকবারই, এমনই কি সেই পাড়াতেও সে গিয়েছে। তাই সেখানে যাওয়া দিশার জন্য খুব একটা ঝামেলার না। তবে যখনই পুরো গল্প কঠিন হবে না। তার পরিচিত কয়েকজন গাইডদের সাথে কথা বলেও কাজ হল না। পাড়া পর্যন্ত যাওয়ার লোক পাওয়া যাবে তবে ও মন্দিরের কথা শুনলেই আর কেউ এগিয়ে আসছে না। শেষে সাংয়ের হাতে পায়ে ধরে রাজি করিয়েছে। সাং তাকে বলছে কেউ তাকে মন্দির পর্যন্ত নিয়ে যাবে না। এমন কি কেউ যদি শোনে যে দিশা মন্দিরে যেতে চায় তাহলে তারা তাকে যেতেও দিবে না। সাং তাকে বড়জোর সেই মন্দিরের যাওয়ার পথ পর্যন্ত নিয়ে যেতে পারে। এর বেশি দূরে নয়। আর উপায় না দেখে দিশা তাতেই রাজি হয়েছে।

রায়হানের বাবা কিছুতেই দিশাকে একা ছাড়তে রাজি ছিল না। কিন্তু দুঃখের ব্যাপার হচ্ছে রায়হানদের এমন কেউ নেই যে দিশার সাথে যেতে পারে। রায়হানের বাবা বান্দরবান পর্যন্ত আসতে চেয়েছিলেন তবে দিশা নিজেই মানা করে দিয়েছে। রায়হানের বাবার বেশ বয়স হয়েছে। পারতপক্ষে তিনি ভ্রমন করেন না। তাই এতোটা কষ্ট তাকে দিতে রাজি ছিলেন না। আর দিশা তাকে আস্বস্ত করে এসেছে সে প্রচুর পাহাড়ে ঘুরে বেরিয়েছে। তার কাছে এসব ডাল ভাত। সে সব সামলে নিতে পারবে।
কিন্তু এই বনের ভেতরে ঢোকার আগে দিশার আবারও মনে হল যে আসলেই সে সামলে নিতে পারবে তো?
সাংয়ের দিকে একবার পেছন ফিরে তাকাল সে। ছেলেটা তার দিকে ভীত চোখে তাকিয়ে রয়েছে। তবে এই চিন্তা দিশার নিরাপত্তা নিয়ে নাকি দিশা যে জঙ্গলে ঢুকবে সেটার ভেতরে যে ভয়ংকর জিনিসটা আছে। দিশা আর কিছু চিন্তা না করে পা বাড়াল। অন্ধকার পথের দিকে এগিয়ে যেতে লাগল। কিছুদুর হাটতেই দিশার মনে হল সে একেবারে অন্য কোনো জগতে চলে এসেছে। একটা পাখি ডাকছে না কোথাও। সব কিছু একেবারে অন্য রকম। মিমি সামনের দিকে এগিয়ে যেতে লাগল। চলার সময়েই মিমি একটা ব্যাপার ঠিকই খেয়াল করতে পারল। সেটা হচ্ছে এই বন জঙ্গলের মাঝেও একটা সরু চলে গেছে এবং বেশ কয়েকটা জায়গাতে সে পেল বন্য গাছের ডালপালা কাঁটা। এই পথে কদিন আগেই কেউ গিয়েছে। সেই কেউ টা যে কে সেটা বুঝতে দিশার কষ্ট হল না মোটেও। সত্যি বলতে সাব্বির যে এভাবে ওর উপরে প্রতিশোধ নিবে সেটা দিশা ভাবতেও পারে নি। অবশ্য নিজেকে সে পুরোপুরি নির্দোশ ভাবতে পারে না। দোষ তার নিজেরও আছে। সাব্বিরকে সেও ভালোবেসেছিল। কথা দিয়েছিল যে জীবনের বাকি সময় সে সাব্বিরের হাত ছাড়বে না তবে সে ছেড়ে দিয়েছিল। পড়াশোনা শেষ করার পরেও যখন একটা ঠিকঠাক চাকরি সাব্বির জোগার করতে পারল না তখন দিশা তার হাত ছেড়ে রায়হানের হাত ধরেছিল। কাজটা যে ঠিক হয় নি সেটা দিশা জানে। একটা অপরাধ দিশার ভেতরে কাজ করে সব সময় কিন্তু বাস্তবতা বড় কঠিন। শুধু আবেগ দিয়ে জীবন চলে না।
কত সময় ধরে দিশা হাটল সেটা নিজেও জানে না। দুইবার এমন জায়গাতে এল যেখানে দুইটা রাস্তা ভাগ হয়ে গেছে। সাং তাকে বলে দিয়েছিল যে মন্দির হচ্ছে নিচের দিকে। তাই সব সময় যে রাস্তাটা নিচের দিকে গেছে সেদিকেই যেতে হবে। দিশা নিচে নেমে যাচ্ছিল। রাস্তায় চারপাশে গাছপালায় ভরে গেলেও এখানে যে একটা রাস্তা রয়েছে সেটা চিনতে আসলে কষ্ট হয় না। এছাড়া হাতে ছাড়া বড় ছুড়ি দিয়ে দিশা সামনে আসা ডালপালা এবং বাঁশের কোঞ্চি কেটে পরিষ্কার করে দিয়ে এগিয়ে যাচ্ছিল। কত সময় সে এগিয়ে গেল সামনে সেটা দিশা নিজেও জানে না। কেবল মনে হচ্ছে যে সামনে ওকে যেতেই হবে।
তারপরই সে দেখতে পেল মন্দিরটা । মন্দিরটার দিকে তাকিয়ে কেমন একটা ভয়ের শিহরণ বয়ে গেল তার মনের ভেতরে। মনে হতে লাগল যেন কেউ তার জন্য সেখানে অপেক্ষা করছে। এবং এই অপেক্ষাটা ভাল কিছু নয় মোটেও।

মন্দিরটার দিকে এগিয়ে যেতে যেতে দিশার পা যেন আপনাআপনি ভারী হয়ে আসছিল। চারপাশের গাছপালা ঘন হয়ে এসেছে। আলো প্রায় নেই বললেই চলে। দিনের বেলায়ও মনে হচ্ছে যেন সন্ধ্যা নেমে এসেছে এখানে।
মন্দিরটা আসলে মন্দির বললে ভুল হবে। একটা পুরনো কাঠের কাঠামো। চারপাশে শেওলা ধরে গেছে। ছাদের অর্ধেক ভেঙে পড়েছে। কাঠের দেওয়ালে অদ্ভুত সব নকশা কাটা। দিশা কাছে যেতেই বুঝতে পারল নকশাগুলো আসলে ভয়ংকর কোনো মুখের ছবি। সব কটা মুখ একই ভাবে খোলা, যেন চিৎকার করছে।
দরজার সামনে এসে দিশা থামল।
ভেতর থেকে একটা গন্ধ আসছে। পুরানো স্যাঁতস্যাঁতে একটা গন্ধ, কিন্তু সেই গন্ধের নিচে আরেকটা গন্ধ লুকিয়ে আছে। দিশা সেই গন্ধটা চেনে। একবার রাস্তায় একটা কুকুর মরে পড়েছিল। কয়েকদিন পর সেটার পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় এই রকম একটা গন্ধ পেয়েছিল সে। লাশ পচা গন্ধ। দিশার বুকটা ধক করে উঠল।
সে ধীরে ধীরে দরজা ঠেলা দিল। কাঠের দরজাটা একটা ক্যাঁচকুচ শব্দ করে খুলে গেল। প্রথমে অন্ধকারে কিছুই দেখা গেল না। তারপর চোখ সয়ে আসতে লাগল আস্তে আস্তে। মন্দিরের মেঝেটা কাঠের। পা দিলেই আওয়াজ হচ্ছে তবে মাঝখানে একটা পাথরের বেদি। বেদির উপরে কিছু একটা আছে।
দিশা এগিয়ে গেল। তারপর থমকে দাঁড়াল। বেদির উপরে একটা মানুষ শুয়ে আছে। উপুড় হয়ে। কাপড়চোপড় পরা। গায়ে একটা শার্ট, যেটা এখন বাদামি লাল রঙে ভেজা। মাথার কাছে একটা ছুরি পড়ে আছে। দিশার মুখ দিয়ে একটা শব্দও বের হল না। শার্টটা সে ঠিক চিনতে পারল। এই শার্টটাই হারিয়ে গিয়েছিল। সে ধীরে পায়ে মানুষটার কাছে গেল। মনের ভেতরে একটা ভয়ংকর সম্ভবনা দেখা দিচ্ছে কিন্তু সেটা সে কিছুতেই বিশ্বাস করতে চাচ্ছে না। কাঁপা হাতে লাশের কাঁধ ধরে উল্টে দিল।
সাব্বির।
সাব্বিরের মুখটা দেখে দিশার পায়ের তলা থেকে যেন মাটি সরে গেল।
দিশার গলার ভেতরে একটা চিৎকার আটকে গেল। মাথা ঘুরে উঠল তীব্র ভাবে। সে পিছিয়ে আসতে গেল এক পা, দুই পা। তারপর পায়ের নিচে পুরনো পচা একটা কাঠের তক্তা মড়াৎ করে ভেঙে গেল।
দিশা পড়ে গেল। মাথার পেছনটা পাথরের মেঝেতে ঠুকে গেল সজোরে।
তারপর সব অন্ধকার।

কতক্ষণ সে পড়েছিল জানে না। জ্ঞান ফিরল একটা ঠান্ডা অনুভূতিতে। একটা ঠান্ডা বাতাস আসছে যেন। পাহাড়ে সূর্য ডুবলেই ঠান্ডা হয়ে আসে সব। দিশা চোখ খুলল।
অন্ধকার। প্রায় পুরোপুরি অন্ধকার।
ভাঙা ছাদের ফাঁক দিয়ে যেটুকু আলো আসত সেটাও এখন নেই। বাইরে সন্ধ্যা নেমে গেছে। দিশা উঠে বসল। মাথার পেছনে একটা তীব্র যন্ত্রণা দপদপ করছে। হাত দিয়ে ছুঁয়ে দেখল। বেশ ব্যাথা করছে।
দিশা ব্যাগ হাতড়ে টর্চটা বের করল। জ্বালাল।
আলোর বৃত্তে প্রথমেই পড়ল সাব্বিরের মুখ।
দিশা চোখ সরিয়ে নিল। দাঁতে দাঁত চেপে উঠে দাঁড়াল। পা টলছে। দেওয়ালে হাত রেখে নিজেকে সামলে নিল। তার মনের ভেতরে একটা তীব্র অনুভূতি কাজ করছে।
দিশা অন্য সব চিন্তা বের করে দিতে চাইল। রায়হানের শার্ট। শার্টটা খুলে নিতে হবে।
সাব্বির রায়হানের শার্ট নিজে গায়ে পরে এসেছিল এখানে। নিজেকেই বলি দিয়েছে।
কিন্তু কেন?
প্রশ্নটা মাথায় আসতেই দিশার মাথা ঘুরে গেল। কিছু একটা ওর মনে খেলে গেল হঠাৎ। কবিরাজ বলেছিল যে শার্টটা গায়ে পরিয়ে বলির প্রাণীকে জবাই করতে হয়। যতবড় প্রাণী হবে অভিশাপটা তত বড় হবে, তত শক্তিশালী হবে। আর মানুষের থেকে বড় বলি আর কী হবে? নিজের থেকে বড় বলি আর কিছু হতে পারে না। সাব্বির তাকে আর ফেরত চায় কিন্তু সে চেয়েছে দিশাকে যেন কেউ না পায়! এই জন্যই ক্ষতিটা দিশার জন্য না হয়ে রায়হানের দিকে গেছে।
নিজেকেই বলি দিয়েছিল সে।
দিশার চোখ ভিজে আসতে চাইছিল। একটা সময় এই মানুষটাকে সে ভালোবেসেছিল। কিন্তু কান্নার সময় এখন নেই।
শার্টটা খুলতে হবে।
দিশা ব্যাগ থেকে গ্লাভস বের করল। কবিরাজ বলেছিল খালি হাতে ছোঁয়া যাবে না। রক্ত থেকে দূরে থাকতে। গ্লাভস পরে সে সাব্বিরের শার্টের বোতাম খুলতে শুরু করল। আঙুলগুলো কাঁপছে। শার্ট শক্ত হয়ে গেছে রক্ত শুকিয়ে। দিশা দাঁতে দাঁত চেপে কাজ করে গেল। একটু তীব্র গন্ধ এসে লাগছে নাকে। সে সহ্য করা কঠিন হয়ে যাচ্ছে!
শার্টটা নিতে হবে। এখনই।
সে এগিয়ে গেল বেদির দিকে। ব্যাগ থেকে গ্লাভস বের করে পরল। সাব্বিরের শার্টের প্রথম বোতামে হাত দিল।
তখনই টের পেল ব্যাপারটা।
কেউ রয়েছে। মন্দিরের চারপাশে কেউ যেন নড়ছে।
টর্চের আলো ঘুরিয়ে দেখল চারদিক। কেউ নেই। কিছু নেই। কেবল পুরনো দেওয়াল, শেওলা, অন্ধকার সব কিছু। কিন্তু অনুভূতিটা গেল না। কেউ তাকিয়ে আছে। ঠিক ঘাড়ের কাছ থেকে। দিশা হাত থামাল না। বোতাম খুলতে লাগল। একটা। দুটো। হাত কাঁপছে কিন্তু থামানো যাবে না।
তখন শুনল শব্দটা।
শ্বাসের শব্দ।
ভারী, ধীর, অনিয়মিত। দিশার নিজের শ্বাস নয়। অন্য কোথাও থেকে আসছে। মন্দিরের বাইরে থেকে আসছে সেটা। দিশা তাকাল না সেদিকে। তাকানোর কোনো মানে নেই।
শেষ বোতামটা খুলল। শার্ট টেনে বের করল। হাত যেন খুলে যাচ্ছিল শরীর থেকে। দম বন্ধ হয়ে এল। বমি করে দিল সে। তবে সেটাতে থামল না। শার্টটা কোনো মতে খুলে নিয়ে এল। ব্যাগে ভরল সেটা।

আর এখানে থাকার কোনো মানে নেই। এখনই দৌড়াতে হবে। তারপর ঘুরল। দরজার দিকে হাঁটা দিল। তখনই পেছন থেকে একটা শব্দ হল।
থপ। থপ।
দিশার পা থামল না। মন্দির থেকে বের হয়ে সোজা দৌড়াতে থাকল। পেছন থেকে আওয়াজটা আসছে।
থপ। থপ।
ভারী কিছু একটা হাঁটছে। ধীরে। কিন্তু নিশ্চিত পায়ে।
দিশা দরজা ঠেলে বাইরে বেরিয়ে এল। বাইরে কিছুটা আলো এখনও আছে। আকাশে শেষ নীলের আভা।
দিশা দৌড়াল। পেছনে শব্দটা বাড়তে লাগল।
থপ। থপ। থপ।
ভারী, একটানা, থামছে না। দিশা ঝোপের পাশ দিয়ে ছুটছে। ডালপালা মুখে লাগছে, হাতে আঁচড় কাটছে। অন্ধকারে পথ দেখা যাচ্ছে না ঠিকমতো। টর্চটা ছুটতে ছুটতে নিভে গেছে।
থপ। থপ। থপ।
কাছে আসছে।
দিশার ফুসফুস জ্বলছে। পা আর চলতে চাইছে না। তীব্র একটা ভয় এসে জড় হয়েছে তার মনে। দিশা জানে না তার পেছনে কে আসছে তবে সেটা যে ভালো কিছু নয় সেটা দিশা জানে। এই ভারীপায়ের আওয়াজ কোন ভাল স্বাভাবিক মানুষের হতে পারে না।
একটা ডাল পায়ে জড়িয়ে গেল। দিশা প্রায় পড়েই যাচ্ছিল, কোনোমতে সামলে নিল।
থপ। থপ।
ঠিক পেছনে। দিশা অনুভব করল ঘাড়ে একটা ঠান্ডা নিঃশ্বাস পড়ল যেন। এখনই সেটা দিশাকে চেপে ধরবে। দিশার পা যেন একটু থেমে যাচ্ছে!
যখন তার মনে হল যে সব শেষ হয়ে যাবে, এখনই তার কাঁধে কিছু একটা স্পর্শের অনুভূতি সে পাবে ঠিক তখনই ঘটল ঘটনাতা! ডালের সাথে পা বেধে দিশা হুমড়ি খেয়ে পড়ে গেল রাস্তায়। তীব্র একটা ব্যাথা অনুভব করল সে। কিন্তু তার থেকেও বড় অনুভূতি তাকে গ্রাস করে ফেলেছিল। ভয়ে অনুভূতি। সেই অশরীরিটা তার দিকে এগিয়ে আসছে ধীরে ধীরে।
দিশা সেদিকে তাকাল। সাথে সাথেই কিছু দেখতে পেল না সে। চারিদিকে অন্ধকার। টর্চের আলোটা পরে আছে দুরে। তবে সেতা নিভে যায় নি। অন্য দিকে আলো পড়েছে। সেই আলোতেই দিশা কিছুটা দেখতে পেল সেটাকে!
চোখ বড় বড় করে সেদিকে তাকিয়ে রইলো কেবল! কিভাবে সে এটাকে বর্ণনা করবে সেটা দিশার জানা নেই।
তখনই মনে পড়ল যে কাধের ব্যাগের ভেতরে একটা অটোমেটিক পিস্তল আছে।
দ্রুত বের করল সেটা। সেফটি লক খুলেই অন্ধকারের সেই অপদেবতাকে লক্ষ্য করেই গুলি চালালো।
একবার দুইবার তিনবার!
গুলি যে নিশানাতে লাগল সেই ব্যাপারে দিশার কোন সন্দেহ নেই তবে তাতে কোন ফল হল না।
দিশার মনে হল যে ওর সময় বুঝি শেষ এখনই। এখনই সে এই অপদেবতার হাতে মারা পড়বে। কেউ ওর লাশ খুজে পাবে না! কেউ না।
দিশা পালানোর চেষ্টা করল না আর! কারণ সে জানে আর পালিয়ে লাভ নেই। সে পালাতে পারবে না। যখন সে একেবারে নিজের জীবনের আশা ছেড়েই দিল তখনই ঘটল ঘটনাটা!

একটা তীব্র আলোর ঝলকানি।
পেছন থেকে এল। পুরো বন যেন আলোকিত করে দিল। সেই আলোতেই দিশা সেই অদ্ভুত অপদেবতাকে আরও পরিষ্কার ভাবে দেখল। মন্দিরের দেওয়ালে আঁকা সেই মুখগুলোর মত কিছুটা আসছে।
আলোর ঝলকানিটা সরাসরি ওটার উপরেই এসে পড়ল। দিশা অনুভব করতে পারল যে পুরো জঙ্গলটা যেন একটু কেঁপে উঠল। ছিটকে গিয়ে সেটা পড়ল দুরে।
তারপর আবার অন্ধকার হয়ে এল। সব নিরব।

দিশা ঠিক বুঝতে পারল না যে কী হল। একটা হাত তার কাধে এসে ঠেকল। চিৎকার বের হয়ে এল আপনাআপনি। দিশা যখন ঘুরে তাকাল দেখতে পেল সেই মানুষটাকে! পাড়ার সেই গ্রুপের একজন।
মিশু নামের মেয়েটার বয়ফ্রেন্ড!
সে দিশার দিকে তাকিয়ে বলল, আপনি ঠিক আছেন?
দিশা ঠিক ছিল না তবে বেঁচে ছিল। দিশা মাথা ঝাকাল। সে বলল, চলুন এখান থেকে। ওটা খুব বেশি সময় পড়ে থাকবে না। আমাদের এখান থেকে বের হতেই হবে!
দিশাকে উঠতে সাহায্য করল সে। তারপর ওর হাত ধরে একপ্রকার টেনে নিয়ে চলল সামনের দিকে।
কত সময় দিশা আর ছেলেটা দৌড়েছিল সেটা দিশা বলতে পারবে না। দৌড়ানোর সময়েই দিশা বুঝতে পারছিল যে সেই অপদেবতা আসছে তাদের পেছনে। দুরে সেই আওয়াজ পাচ্ছে সে। তবে এক সময় অনুভব করল সে সেটা ধীরে ধীরে পিছিয়ে যাচ্ছে। দিশারা এক সময়ে বের হয়ে এল সেই জঙ্গল থেকে।
যখন জঙ্গলের সেই গেট দিয়ে বের হল দিশা দেখতে পেল সেখানে সাং চিন্তিত মুখে দাঁড়িয়ে আছে। মিশু মেয়েটাও দাঁড়িয়ে আছে। ওরা বের হতেই মিশু এগিয়ে এসে দিশাকে ধরল। তারপর নিজের বয়ফ্রেন্ডের দিকে তাকিয়ে বলল, ঠিক আছো তোমরা?
দিশা কিছুই বুঝতে পারছিল না। তবে এই মানুষটাকে তাকে উদ্ধার করতে ভেতরে ঢুকেছিল এবং তাকে উদ্ধার করেই নিয়ে এসেছে। এমন একটা ভাব করছিল যেন এরা সব জানে। মিশুর আচরণ দেশে দিশার কাছে সেই রকমই মনে হচ্ছে।
দিশা দেখল মিশুর বয়ফ্রেন্ড বন্ধ গেটের কাছে কী যেন করছে। দিশার মনে হল সে যেন কিছু পড়ছে।
এক সময় কাজ শেষ হল। সে দিশার দিকে ফিরে তাকিয়ে বলল, এবার কাপড়টা ধুয়ে ফেলুন।
দিশার মনে পড়ল। হ্যা। কাপড় ধুয়ে পরিষ্কার করতে হবে।
সব কাজ শেষ করতে করতে প্রায় ভোর হয়ে গেল। পুরো সময় মিশু আর তার বয়ফ্রেন্ড সেখানেই ছিল। সাং মাঝে একবার পাড়াতে গিয়ে আবার ফিরে এসেছিল। দিশা ঝিরির পানি দিয়ে সেই শার্টটা পরিষ্কার করতে থাকল যত সময় না রক্তের সব দাগ চলে যায়!

পরিশিষ্ট
দিশা সেই গ্রুপটার সাথে ফিরে এল থানচিতে। তার কাজ আপাতত শেষ। এখানে আর কিছুই করার নেই। আবার যখন থানচিতে এল তখন নেটওয়ার্কের ভেতরে এল দিশা। সাথে সাথে ওর ফোনের রিং বেজে উঠল। ফোন করেছে দিশার শ্বশুর মশাই। দিশাকে জানাল যে রায়হানের চেতনা ফিরেছে। সে কথা বলছে।
থানচিতে এসে যখন দিশা মিশুদের খুজতে যাবে তখন খেয়াল করে দেখল যে মিশুরা সেখানে নেই। সেই গ্রুপের লিডারের কাছে জানতে চাইলে সে জানাল যে তারা থানচিতে আসে নি। তারা নাকি অন্য আরও কয়েক জায়গাতে যাবে। দিশার মনের ভেতরে একটা আফসোস খেলা করল। ঠিক মত তাদের কাছ থেকে বিদায় নেওয়া হয় নি। এছাড়া তার মনে আরও বেশ কিছু প্রশ্ন ছিল। দিশা ভেবেছিল যে ধীরে সুস্থে জিজ্ঞেস করবে। বিশেষ করে রাতের বেলা সেই আলোর ঝলকানিটা কিসের ছিল। কিভাবে ওরা দিশার ব্যাপারটা জানল? কিভাবে ঢুকল ভেতরে! কিন্তু কিছুই জানা হল না। তবে সব থেকে আনন্দের ব্যাপার হচ্ছে রায়হানের সমস্যা সমাধান হয়েছে। রায়হান সুস্থের দিকে।
দিশা সাব্বিরের কথা ভাবল। আবারও সেই অপরাধবোধটা তাকে পেয়ে বসল। ছেলেটা তাকে ভালোবেসে ছিল । বরং দিশাই নিজের স্বার্থের জন্য তাকে ছেড়ে দিয়েছিল। এটা সাব্বির মেনে নিতে পারে নি। তারপরেও দিশার ক্ষতি সে করে নি। রায়হানের ক্ষতি করতে চেয়েছিল। দিশা মনে মনে ঠিক করে নিল যে ঢাকায় ফিরে সে সাব্বিরের জন্য দোয়া করবে। নিজের অপরাধের জন্য ক্ষমা চাইবে। এটা ছাড়া আর কীই বা করার আছে তার!

ফেসবুকের অর্গানিক রিচ কমে যাওয়ার কারনে অনেক পোস্ট সবার হোম পেইজে যাচ্ছে না। সরাসরি গল্পের লিংক পেতে আমার হোয়াটসএপ বা টেলিগ্রামে যুক্ত হতে পারেন। এছাড়া যাদের এসব নেই তারা ফেসবুক ব্রডকাস্ট চ্যানেলেও জয়েন হতে পারেন।

অপু তানভীরের নতুন অনুবাদ গ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে

বইটি সংগ্রহ করতে পারেন ওয়েবসাইট বা ফেসবুকে থেকে।

How useful was this post?

Click on a star to rate it!

Average rating 4.3 / 5. Vote count: 13

No votes so far! Be the first to rate this post.

About অপু তানভীর

আমি অতি ভাল একজন ছেলে।

View all posts by অপু তানভীর →

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *