ভলান্টিয়ার

4.9
(9)

নওরিনের ফোন পেয়ে বেশ কিছুটা সময় কী করবো ঠিক বুঝতে পারলাম না। রিসিভ করবো কি করবো না এই চিন্তাতেই প্রথমবার লাইনটা কেটে গেল। তবুও দ্বিধা কাটলো না । ওপাশ থেকে কী শুনবো কিংবা আমি কী শোনার জন্য অপেক্ষা করছি সেটা যদি না হয় তাহলে?
মন চাইছে যেন আমার ধারনা মোটেই সত্য না হয় কিন্তু যদি সত্য হয়ে যায়, তখন ?
আমি অনুভব করলাম যে আমার সারা শরীরে একটা অন্য রকম উত্তেজনা কাজ করছে। আমার কী করা উচিৎ আমি কিছুতেই বুঝতে পারছি না। যা ধারনা করেছি সেটা যদি সত্যিই হয় তাহলে ব্যাপারটা আসলেই অন্য রকম হয়ে দাঁড়াবে। কিন্তু সত্যটা আমার জানা জরুরী!
আমি নিজেই ফোনটা হাতে নিলাম নওরিনকে ফোন দেওয়ার জন্য। কিন্তু তার আগেই ফোন এসে হাজির।
কাঁপা হাতে ফোনটা ধরলাম। ফোনটা কানের ধরার সাথে সাথেই ওপাশ থেকে নওরিনের কান্নার আওয়াজ পেলাম। আমার আর কিছু বুঝতে বাকি রইলো না। আমি যেটা ধারনা করেছিলাম সেইটা সত্য হতে চলেছে!
সত্যি কি হতে চলেছে ?
আমি কোনো মতে বললাম, কী হয়েছে ?
কন্ঠটা যে কাঁপছে আমি বেশ ভালো করেই বুঝতে পারছি। আমি আবারও বললাম, এই কী হয়েছে?
-পুটি মারা গেছে!
পুটি নওরিনের আদরের বিড়ালটার নাম। আমি গলায় অবাক হওয়ার ভান এনে বললাম, কিভাবে?
-জানি না। বিকেলবেলা তুমি যখন ওর ছবি তুলে বাসায় গেলে তখনও ভালই ছিল। কিন্তু একটু আগে দেখি ও বারান্দায় উপর মরে পরে আছে।
-আশ্চর্য! এমন ভাবে কেউ মরে নাকি? কোন কারণ থাকবে না?
-আমি জানি না।

নওরিন ঠিক মত কথা বলতে পারছিলো না। ফোনের আমি বললাম, দেখো আমরা মানুষের মৃত্যুটাকেই কোনভাবে ঠেকাতে পারি না। পশু পাখির মৃত্যুটা ঠেকানোও সম্ভব না, তাই না?
-কিন্তু তাই বলে এভাবে মারা যাবে? কেন? কোন কারণ ছাড়া!

আমি কী বলবো ঠিক খুজে পেলাম না। পুটি নওরিনের বেশ পছন্দের বিড়াল ছিল। একটু খারাপই লাগলো। বিশেষ করে যখন ওটার মৃত্যুর পেছনে আমার নিজের হাত রয়েছে। আমি প্রথমে কিছুটা সময় কিছুই ভাবতে পারলাম না। কেমন একটা অপরাধবোধ আমাকে ঘিরে ধরলো। নিজের অজান্তে আমি কী ভয়ংকর কাজ করে ফেলেছি।
মানুষ মারার মত ভয়ংকর কাজ!
আমি টেবিলের উপরে রাখা ক্যামেরাটা নিজের কাছে নিয়ে এলাম। কোলের উপর নিয়ে খানিকক্ষণ এক ভাবেই তাকিয়েই রইলাম ক্যামেরা দিকে। যে কেউ দেখলে এটাকে একটা সাধারণ ক্যামেরাই মনে করবে। কিন্তু কেউ জানে না, অসম্ভব একটা ক্ষমতা রয়েছে এই ক্যামেরাটার ভিতর।

দুই
সপ্তাহ খানেক আগে আমি বাসায় ফিরছিলাম। সময়টা সন্ধ্যার কিছু পরে। বাসায় আসার জন্য আমি ছোট একটা অন্ধকার গলির ভিতর দিয়ে আসি মাঝে মাঝে। যদিও এটা প্রধান রাস্তা নয়। তবে মাঝে মাঝে আমি এই শর্টকার্টটা বেছে নেই তাড়াতাড়ি বাসায় যাওয়ার জন্য। এই এলাকায় ছিনতাইয়ের কোন ভয় নেই তবুও এই অন্ধকার গলির ভিতর দিয়ে আসতে কেমন যেন লাগে। তবে বেশি তাড়াহুড়া থাকলে এটা দিয়েই যাই আমি।
ঐ দিন সবে মাত্র গলির ভিতর ঢুকেছি তখনই কেউ একজন যেন আমার গায়ের উপর এসে পড়লো। আমার বুকটা ধক করে উঠলো মুহুর্তেই। কিন্তু সামলে নিলাম সাথে সাথে। আবছায়া আলোতে তাকিয়ে দেখি একজন মাঝ বয়সী লোক সামনে দাড়িয়ে। ভাল করে চেহারা না দেখা গেলেও লোকটি যে বেশ সুদর্শন বেশ ভালই বোঝা যাচ্ছিল। অন্তত ছিনতাইকারি না এটা বেশ বুঝতে পারছিলাম।
আমার সামনে কিছুক্ষণ চুপচাপ দাড়িয়ে থেকে লোকটি বলল, আমি একটা ক্যামেরা বিক্রি করবো।
বলা নেই কওয়া নেই একজন সামনে এসে বলল আমি একটা ক্যামেরা বিক্রি করবো আর হয়ে গেল নাকি? আমি ততক্ষণে নিজেকে পুরোপুরি সামলে নিয়েছি । বললাম, তো?
-আপনি নিতে পারেন।
-আমার লাগবে না।
-ভাল ক্যামেরা।
-ভাই, আমার লাগবে না। আমার বাসায় ডিএসএলআর আছে। আরেকটা লাগবে না আমার।
-আপনার জন্য নিয়ে এসেছি।
-আমার জন্য নিয়ে এসেছেন মানে?

আমার এই প্রশ্নের জবার না লোকটা কিছু সময় দাঁড়িয়ে রইলো চুপচাপ। আমি যে লোকটাকে পাশ কাটিয়ে চলে যাবো সেটাও পারছি না। কেন পারছি না সেটাও আমার কাছে ঠিক স্পষ্ট না।
লোকটা নিজের ব্যাগ থেকে আরও ছোট কালো রংয়ের একটা ব্যাগ বের করে আমার দিকে বাড়িয়ে দিয়ে বলল, এটা আপনি নিয়ে যান?
-মানে কী? আপনি আমার কাছে জোর করে দিবেন নাকি? আমি তো বললাম আমার লাগবে না।
লোকটা আরও কিছুক্ষন আমার দিকে তাকিয়ে থেকে বলল, টাকা দেওয়া লাগবে না। এটা নিয়ে যান যদি পছন্দ না হয় তাহলে পরে ফেরত দিয়ে দিবেন।
এই বলে লোকটি একটা অদ্ভুত কাজ করলো। ক্যামেরার কালো ব্যাগটা আমার হাতে দিয়ে সোজা পেছন ঘুরে হাটা দিল। আমি কিছু বলার আগেই গলির শেষ মাথায় গিয়ে হারিয়ে গেল।
বাসায় এসে ক্যামেরাটা বের করে কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইলাম। মানুষ এমন কাজ করতে পারে ঠিক ভাবি নি। খুব বেশি আগ্রহ জন্মালো না। কারণ বের করে দেখি ডিজিটাল ক্যামেরা না, এনালগ ক্যামেরা। ফিল্ম ভরতে হয় সেই ক্যামেরা। এই ক্যামেরা এখনো টিকে আছে সেটা জানা ছিল না।
আমি ডিএসএলআর দিয়ে ছবি তুলি আর আমাকে দিয়ে গেছে এই আদিম যুগের ক্যামেরা! আরও কিছুক্ষণ ঘুরিয়ে ফিরিয়ে দেখলাম। চালু করে দেখলাম চালুও হল। এমন কি ভিতরে ক্যামেরার ফিল্মও আছে । আমি এমনি কোন দিকে ফোকাস না করে সাটার দেওয়ার জন্য পাওয়ার বাটন চাপ দিলাম। কিন্তু লাইট জ্বললো না।
আগের এনালগ ক্যামেরাগুলোতে মেইন সাটার টেপার আগে লাইট জ্বলার জন্য অপেক্ষা করতে হয়। তা না হলে ছবি ওঠে না। কিন্তু দেখলাম আলো জ্বলল না। বিরক্ত হয়ে আমি ক্যামেরাটা আবার ব্যাগে রেখে দিলাম।
থাকুক! পয়সা তো দিতে হয় নি। আর যদি আবার দেখা হয় তাহলে দিয়ে দেব। বলব যে এই ক্যামেরা আমার দরকার নেই।

তিন
দুদিন ক্যামেরাটার কথা আমার মনেই পড়লো না। তৃতীয় দিন কী মনে হল এনালগ ক্যামেরাটা ব্যাগের ভিতর ভরে নিলাম। বাসা থেকে বের হয়ে গলির মাথায় এসে দিল সগীর পাগলা পথ আগলে দাঁড়িয়ে আছে।
-এই? আমার একটা ফটো তুল। তুল না!
সগির পাগলার এই এক সমস্যা। একদিন আমাকে দেখেছিল ক্যামেরা দিয়ে ছবি তুলতে। তারপর থেকেই আমাকে দেখলেই বলে একটা ছবি তুলে দিতে। আজকে এমন ভাবে সগীর পাগলা দাঁড়িয়ে রয়েছে ওকে পাশ কাটিয়ে চলে যাওয়া সম্ভবও না । আর কোন উপায় না দেখে আমি ব্যাগ থেকে ক্যামেরা বের করতে গিয়ে সেদিনের এনালগ ক্যামেরার দিকে চোখ পড়লো। কী মনে হল আমি ডিজিটালটা না বের করে এনালগ ক্যামেরাটা বের করলাম। দেখা যাক ক্যামেরাটা কাজ করে কিনা!
ক্যামেরার পাওয়ার চালু করে লাইট জ্বালানোর জন্য অপেক্ষা করলাম। আগেরকার ক্যামেরায় ছবি তোলার জন্য একটা সিগনালের জন্য অপেক্ষা করতে হত।
কয়েক মুহর্ত পরেই লাল রংয়ের আলো জ্বলে উঠলো। আমি ফোকাস করে সাটার চেপে দিলাম। কেবল ক্লিক করে আওয়াজ হল। আর কিছু না। ছবি কি রকম উঠেছে? পাগলা খুশি হয়ে চলে গেল। শব্দ শুনে নিশ্চয়ই বুঝতে পেরেছে ওর ছবি তোলা শেষ।
কী মনে চায়ের দোকানের কুকুরের ছবি তুললাম। আরও কয়েকটা কাকের ছবি তুললাম। মনে হল বেশ ভালই ছবি উঠলো। প্রত্যেকবার ছবি তোলার পরে কেমন একটা অনুভুতি হচ্ছিল। মনে হচ্ছে যেন কিছু একটা যেন ঠিক হচ্ছে না!

সব কিছু স্বাভাবিকই ছিল কিন্তু পরদিন যখন আবার বাইরে বের হলাম তখন আর সগীর পাগলাকে দেখলাম না। এমনটা হয় না। পাগলা সব সময় মোড়ের মাথায়ই বসে থাকে। চায়ের দোকানে গিয়ে দোকানীর মুখ শুকনা। জানতে চাইলে বলল তার আদরের কুকুরটা নাকি রাতে মারা গেছে। আরও একটা খবর দিল সগীর পাগলাও গতকাল রাতে কিভাবে যেন মারা। আমার প্রথমে কিছু মনে না হলেও রাতের বেলা কেমন যেন সন্দেহ হল। গতকাল আমি কুকুর আর সগীর পাগলার ছবি তুললাম আর দুজনেই মারা গেল। কিছু কাকের ছবিও অবশ্য তুলেছিলাম।
এমন কোন গুরুত্ব দেওয়ার মত বিষয় না। কিন্তু ব্যাপারটা আমার মনে শান্তি দিচ্ছিলো না। বারবার মনে হচ্ছিল কিছু একটা যেন ঠিক হয় নি। বারবার মনটা মৃত্যু দুইটাকে জোড়া লাগানোর চেষ্টা করছিল। বাসায় আম্মার কয়েকটা পোষা মুরগি ছিল সেগুলোর ছবি তুললাম সেই ক্যামেরা দিয়ে। একটাকে রেখে বাকী সব কয়টার ছবি তুললাম। এবং পরদিন সকালে আম্মার চিৎকারে ঘুম ভাঙ্গল। তার মুরগীর খাঁচার ভিতর তার সবগুলো মুরগি মারা গেছে। কেবল সেই একটা মুরগি বাদ দিয়ে।
তবুও মনে শান্তি পাচ্ছিলাম না কিছুতেই। শেষে নওরিনদের বাসায় গিয়ে পুটির ছবি তুলে নিয়ে আসলাম এবং যথারীতি যা আশা করেছিলাম তাই হল। আমার মনে শান্তি লাগছিল না। বারবার মনে হচ্ছিলো এই অশুভ জিনিসটা আমার কাছে রাখা উচিৎ হবে না। কোন ভাবেই উচিৎ হবে না।

কী যেন মনে আমি তখনই সেই অন্ধকার গলির দিকে রওনা দিলাম। আমার কেন জানি মনে হল আজকে সেই আগন্তকের সাথে আমার দেখা হবে। আমার জন্য সে অপেক্ষা করছে সেখানে।

চার
-আমি জানতাম তুমি আসবে।
আমি কোনো কথা না বলে কেবল চুপ করে দাড়িয়ে রইলাম। গলির ভিতরে ঢুকতেই সেদিনের সেই সুদর্শন লোককে দেখতে পেলাম দাড়িয়ে আছে। এমন একটা ভাব যেন আমার জন্যই সে অপেক্ষা করছিল।
লোকটা বলল, তো আমার ক্যামেরা কি আপনার পছন্দ হয়েছে?
-জি না। আমি ক্যামেরা ফেরৎ দিতে এসেছি।
-নিতে চাও না?
-জি না।
আমার কথা শুনে লোকটা যেন খুব মজা পেল। হাহা করে হেসে উঠলো। হাসতে হাসতে বলল, আমি কোন টাকা চাই না। ক্যামেরাটার বদলে তোমাকে কোন টাকা দিতে হবে না।
আমি ক্যামেরা নিতে চাই না বললাম তবুও লোকটা বলল সে কোন টাকা নিতে চায় না। আমি খানিকটা জিজ্ঞাসু চোখ বললাম, তাহলে? কী চান আপনি ?
-ক্যামেরার বিপরীতে আমার কিছু কাজ করে দিতে হবে আপনাকে?
-কাজ।
লোকটা নিজের পকেট থেকে একটা কাগজ বের করে আমার দিকে বাড়িয়ে দিল। হাতে নিয়ে দেখাল সেখানে কিছু মানুষের নাম লেখা আছে। আমার বুঝতেও বাকি রইলো না যে আসলে লোকটা কি বলতে চাইছে । আমি বললাম, এই কাজ আমার দ্বারা হবে না।
কয়েক মুহুর্ত কেটে গেল। আমি কিছু ভাবছি, লোকটাও নিশ্চয়ই কিছু একটা ভাবছে। আর একটা বিষয় আমি একটু আগে লক্ষ্য করলাম লোকটা প্রথম দিন আমাকে আপনি করে কথা বলছিল কিন্তু আজকে বলছে তুমি করে ! আমার মনের কথা মনেই রইলো লোকটা বলল, আসলে তুমি যেটা ভাবছো সেটা কিন্তু না !
লোকটার কন্ঠে একটু যেন কর্তৃত্বের সুর পেলাম। কিছুটা যেন আমার উপর প্রভাব বিস্তার করতে চাইছে। আমি বললাম, আমি তেমন কিছুই মনে করছি না।
-না, তোমার মনে কি কিছু প্রশ্ন জাগছে না?
-কী রকম?
-না এই যে এমন একটা ক্যামেরা আমি তোমাকে কেন দিলাম! আবার এই ক্যামেরাটা আমি কোথায় পেলাম? এতো লোক থাকতে তোমাকেই কেন ?
হ্যা। এই কৌতুহলটা আমার অবশ্য ছিল অনেক কিন্তু আমি কোন কথা বললাম না। আরও ভাল করে বললে আমার মনে কোথায় যেন একটা ভয় কাজ করছে। যেন খুব একটা অশুভ কিছু একটার সামনে আমি দাঁড়িয়ে আছি। আমি কোন রকমে বললাম, আপনার ক্যামেরা আমি চাই না।
-সত্যি চাও না ?
-আমার তো মনে হয় ক্যামেরাটা তোমার বিশেষ দরকার !
-আমাকেই কেন ?
-কেন তোমাকেই নয় ?

লোকটা কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে পকেটে হাত দিয়ে একটা চুরুট বের করে নিজের মুখে নিয়ে আগুন ধরালো । হঠাৎ জ্বলে ওঠা আগুনে আমি লোকটার চেহারা দেখতে পেলাম। কেমন মায়াময় একটা চেহারা। সেদিন কিছু আবছায়া চেহারা দেখে কেমন ভদ্রলোক মনে হয়েছিল আজকে কেমন মায়াময় মনে হল।
হাস্যকর লাগলো নিজের কাছেই। আমি বললাম, দেখুন আমি এমনিতেই আপসেট। আমার কারনে একটা মানুষ মারা গেছে। দুইটা পোষা প্রানী মারা গেছে। শুধু মাত্র আমার কারণে।
-না ঠিক তোমার কারণে না। সগীর এমনিতেও মারা যেত। জানোই তো জন্ম মৃত্যুর কথা কেউ কথা নিশ্চিত হয়ে বলতে পারে না।
-তাহলে আপনি কিভাবে বলছেন?

আমার কথা শুনে ভদ্রলোক নিরবে হাসল। আবছায়া আলোতে আমার কেন জানি সেই হাসি দেখে বুকের রক্ত হিম হয়ে গেল। একটু আগে যে চেহারাটা মায়াময় মনে হচ্ছিল সেই চেহারার হাসি এতো ভয়ংকর হতে পারে আমি ভাবতে পারি নি। আমার আবার এখান থেকে চলে যাওয়া প্রবনতাটা বেড়ে গেল। কিন্তু লোকটা ইচ্ছের বিরুদ্ধে আমার যাওয়ার যেন কোন উপায় নেই। আমি কেমন যেন মাটির সাথে আটকে গেছি মনে হচ্ছে।
লোকটা বলল, দেখো আমার মাঝে মাঝে কিছু ভলান্টিয়ার দরকার পরে।
-ভলান্টিয়ার?
-আরে তুমি দেখো নি বিভিন্ন অনুষ্ঠানে কলেজ ভার্সিটির কিছু ছেলে মেয়েকে নিয়োগ দেওয়া হয় কিছু দায়িত্ব দিয়ে? সেরকম আর কি।
-আমি কী করতে পারি?
-কিছু করতে হবে না। তোমাকে কিছু মানুষের নামের লিস্ট দিয়ে যাবো সেই লোকগুলোর ছবি কেবল তুলতে হবে তোমাকে।
-ছবি? তার মানে তারা সবাই মারা যাবে?
-টেকলিক্যালি বলতে গেলে, হ্যা।
-আমার কারণে তারা মারা যাবে তারা।
-তোমার কারণে না। এটা তাদের নিতি।
-দেখুন এভাবে কারো ছবি তোলা যায় না। নিয়তি হলেও যে কেউ অজানা অচেনা কাউকে ছবি তুলতে দিবে না আমাকে।
-ও ছবি তোলায় সমস্যা? সমস্যা নেই। তুমি চাইলে অন্য কিছু দিতে পারি।
-মানে?
অবুঝ ছাত্রকে যেমন করে বোঝায় ঠিক তেমন করে লোকটি বলল, দেখো প্রত্যেকটা মানুষের একটা নিয়তি আছে। একটা নির্দিষ্ট সময়ের পরে তাকে এই পৃথিবী থেকে চলে যেতে হয় এবং এই কাজে কিছু একটা নিয়জিত থাকে। যারা সেই লোকগুলোকে মানে তাদের আত্মাকে এই পৃথিবী থেকে নিয়ে যায়। তাদেরকে নিয়ে যায় বিশেষ চিহ্ন দেখে। সেই মানুষটার শরীরে সেই চিহ্নটা বসানোর ব্যাপারটা দেখার দায়িত্ব হচ্ছে আমার। বুঝেছো?
-তার মানে এই ক্যামেরা হচ্ছে সেই বিশেষ চিহ্ন বসানোর মেশিন? সিল মারার মত?
-এই তো বুঝেছো। এখন তুমি ফটোগ্রাফার বলে তোমাকে ক্যামেরাটা দিয়েছিলাম। চাইলে অন্য কিছু দিতে পারি। এর আগে একজনকে কলম দিয়েছিলাম সে তাতে শুধু নাম লিখতো। একজনকে দিয়েছিলাম চশমা, একজনকে হাত মোজা। আরও কত কিছু! তুমি চাইলে বদলে দিতে পারি।
-আমার দরকার নেই। আপনি আপনার ক্যামেরা নিয়ে যান। আমি এই কাজ পারবে না।
-সত্যি পারবে না ?
-জি না। পারবো না।
-আরেকবার ভেবে দেখো।
-অনেক ভেবেছি । আর না।
আমি আর দেরি করলাম না। লোকটা কাছে ক্যামেরা দিয়ে তাকে পাশ কাটিয়ে চলে এলাম। যদিও নিজের হাতে চলে আসা অনেক ক্ষমতাকে দুরে ঠেলে দিলাম। কিন্তু তবুও নিজের কাছে কেমন একটা শান্তি শান্তি লাগছিল।

পাঁচ
বাসায় পৌছানোর ঠিক আগ মুহুর্তে নওরিনের ফোন এসে হাজির।
-কী হল ?
-তুমি কোথায়?
-এই তো বাসার সামনে।
-এখনই ছাদে আসো।
-কী হয়েছে?
-তুমি এখনই আসো।

আমি তাড়াতাড়ি ছাদের দিকে উঠে গেলাম। নওরিনরা আমাদের ঠিক উপরের তলায় থাকে। তাই কোন কিছু দরকার হলে কিংবা দেখা করতে ইচ্ছা হলে ছাদে চলে যাই আমরা।
আমি ছাদে গিয়ে দেখি নওরিন চিন্তিত মুখে দাঁড়িয়ে আছে। আমি কাছে যেতেই নওরিন আমাকে কিছু না বলেই জড়িয়ে ধরলো। আমি কিছু বুঝতে পারলাম না গত দিনের পুটির মৃত্যুর কথা কি ওকে এখনও খুব বেশি শোকাহত করে তুলেছে? দেখি আগামীকালকেই ওর জন্য একটা বিড়াল কিনে আনতে হবে। নতুন একটা বিড়াল পেলে নিশ্চয়ই ওর মন ভাল হবে।
কিন্তু আমাকে বেশ অবাক করে দিয়ে নওরিন বলল, কালকে আমাকে দেখতে আসবে।
আমি আকাশ থেকে পড়ার ভঙ্গিতে বললাম, দেখতে আসবে মানে কী?
-মানে বোঝো না। কালকে দেখতে আসবে। যদি পছন্দ হয় তাহলে মনে এক সপ্তাহের ভিতরেই বিয়ে করে নিয়ে যাবে লন্ডন। তুমি কিছু একটা কর।
-কী করবো?
-আমি কী জানি? দেখো যদি তোমাকে ছেড়ে আমার অন্য কাউকে বিয়ে করতে হয় তাহলে আমি কিন্তু এই ছাদ থেকে লাফ দিবো।
আমি ওকে আবার জড়িয়ে ধরলাম। বললাম, ছিঃ এসব কি বল? আমি আছি না? এক কাজ কর। তুমি রেডি থাকো। আমরা না কাল পরশু কোথাও চলে যাই।
নওরিন আমাকে জড়িয়ে ধরা অবস্থায় বলল, তাই? দেখো কিন্তু। আমি কিন্তু সত্যি ছাদ থেকে লাফ দিবো। এই বলে দিলাম আমি।
-আচ্ছা বাবা। লাফ দিতে হবে না। আমি আসি তো?
আমার মনে তখন অন্য চিন্তা কাজ করছে। কিছু একটা করতেই হবে আমার।

ছয়
-কী হয়েছে? তোমার মন বিষন্ন কেন?
-আর বল না ! আমাকে সেদিন দেখতে এসেছিলো না?
-হুম ! কী হয়েছে ?
-আমাদের এখানে যাওয়ার সময় ওদের কারটা না এক্সিডেন্ট করেছে। তিনজনই মারা গেছে !
-সত্যি ? তাহলে তো …..
নওরিন আমার দিকে তাকিয়ে বলল, ঠিক আছে। কিন্তু এভাবে তিনজন মারা যাবে আমার ভালো লাগে নি। মানুষের মৃত্যু আমার ভালো লাগে না।
আমি বলল, মৃত্যুর উপর তো কারো হাত নেই। তুমি ভেবো না।

নওরিনের সাথে কথা বলে যখন নিচে এলাম তখনও নিজের কাছে সেদিনের মত অপরাধবোধ কাজ করছিল। এভাবে তিনজনকে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দিতে আমার একটুও বাঁধলো না?
নিজের কাছে প্রশ্নটা বারবার জিজ্ঞেস করলাম।
কোন উত্তর পেলাম না।

সেদিন নওরিনের কথা শোনার পরে আমার মাথায় আর কোন কাজ করে নি। আমি আবারও সেই গলির ভিতর চলে গেছি। দেখি লোকটাও গলির ওপর প্রান্ত থেকে হেটে আসছে। যেন ঠিকই জানতো আমার আবার ফিরে আসবো। কোন কথা না বলে ক্যামেরার কালো ব্যাগটা আমার দিকে ফিরিয়ে দিতে দিতে বলল, তুমি যখন নিজের প্রয়োজনে ক্যামরাটা নিচ্ছি তখন মনে রেখো আমার কাজটা কিন্তু তোমাকে করতেই হবে। যদি ঠিক সময় মত কাজটা না কর তাহলে কিন্তু তোমার সমস্যা হতে পারে।
-করে দেবো।
লোকটা একটা কাজের লিস্টও দিল আমার হাতে। আমি ক্যামেরা আর লিস্ট নিয়ে চলে এলাম।

সাত
টিনের একটা একতলা বাড়ি। সামনেই একটা চটের বেড়া দেওয়া। তার থেকে প্রায় শখানেক গজ দুরে একটা বড় আম গাছ। আমি এই আম গাছের নিচে দাঁড়িয়ে আছি। আমার অবস্থান এমন একটা জায়গায় যে চটের বেড়া পার হয়ে যে বেরুবে সে চাইলেই আমাকে চট করে দেখতে পারবে না। কিন্তু আমি তাকে দেখতে পাবো ঠিকই।
অনেকক্ষণ ধরে অপেক্ষা করছি। আমি জানি জানি জহির মিয়া ঠিক এই সময়টাতেই বাইরে বের হবে। ক্যামেরা রেডি করে নিয়ে বসে আছি। বের হলেই তার ছবি তুলে ফেলবো।
গত কালকে তার ব্যাপারের খোজ খবর বের করেছি। জহির মিয়া কোথায় থাকে কখন কাজে বের হয় এই সব। আমি ক্যামেরাটা আরেকবার চেক করি। এখনও ক্যামেরায় লাইট জ্বলে ওঠে নি। যখনই টার্গেট সামনে আসবে তার আগেই লাইট জ্বলে উঠবে। অন্তত গত তিন বারে তো এমনই হয়েছে। জহির মিয়াকে নিয়ে এটা আমার চতুর্থ টার্গেট। এটা হয়ে গেলে আর দুইটা। তারপর আমি ঝামেলা মুক্ত হব।
প্রথম প্রথম ভেবেছিলাম হয়তো ছবি তুলতে গিয়ে আমার হাত কেঁপে উঠবে। কারণ আমার একটা ক্লিকের কারণে লোকটা নাম মৃত্যু তালিকায় উঠে যাবে। ছবি তোলার পরে খুব বেশি হলে এক দিনের মাথায় সে মারা যাবে। যে কোন স্বাভাবিক মানুষের জন্য এটা একটু মেনে নেওয়া কঠিন!
নওরিন যখন হারানোর প্রশ্ন আসলো তখন আমি ঠিক স্বাভাবিক ছিলাম না। মাথার ভিতর কেবল ওকে হারানোর ভয় কাজ করছিল। তাই ঝোকের বসেই কাজটা করেছি। কিন্তু যখন মাথটা ঠান্ডা হল তখন একটা অপরাধ বোধ আমাকে পেয়ে বসেছিল। বারবার মনে হচ্ছিলো যে আমি ঐ তিনটা মানুষকে মেরে ফেলেছি। কেবল মাত্র আমার জন্যই মানুষগুলো মারা গেছে। এই অপরাধ বোধে কী পরিমান যে অশান্তিতে আছি আমি কিছুতেই বলে বোঝাতে পারবো না!
একবার মনে হল লোকটাকে ক্যামেরা ফেরৎ দিয়ে বলি আমি তার কাজ পারবো না। কিন্তু লোকটা দ্বিতীয়বার আমাকে ক্যামেরা দেওয়ার সময় শর্ত দিয়েছিল তার হয়ে আমাকে কিছু কাজ করে দিতে হবেই।
তবে প্রথম যে মানুষটা ছবি তুলেছিলাম তার ছবি তুলে কেমন যেন শান্তি শান্তি লাগছিল। মানুষটা পুরান ঢাকার একজন বিখ্যাত মাস্তান। আমি যখন তার খোজ নিতে যাই, চায়ের দোকানে বসে তার জন্য অপেক্ষা করছিলাম, চোখের সামনে তার কীর্তিকলাপ দেখলাম। পথে চলতে থাকা একটা গার্মেন্টসকর্মীর ওড়না ধরে টান দিল। মেয়েটা অসহায়ের মত এদিক ওদিক তাকালো সাহায্যের জন্য কিন্তু ভাল মানুষগুলো যেন কিছু দেখেই এমন একটা ভাব করেই চলে গেল।
আমি ক্যামেরার দিকে তাকিয়ে দেখি ক্যামেরার লাইট জ্বলে উঠেছে। আমি আর দেরি না করে ছবি তুলে ফেললাম। এরপরে একজন রাজনৈতিক ব্যক্তি আর একজন ভদ্র চেহারার ধর্ষক। এদের জন্য ক্যামেরা সাটার চাপতে আমার একটুও দেরি হয় নি। একটুও হাত কাঁপে নি। জহির মিরা ব্যাপারেও হাত কাঁপার কথা না। আমি অপেক্ষা করতে থাকি জহির মিয়ার জন্য।
মিনিট পাঁচেকের ভিতরেই লক্ষ্য করলাম আমার ক্যামেরার লাইট জ্বলে উঠেছে। এখনই নিশ্চয়ই বের হয়ে আসবে। আমি প্রস্তুত হয়ে অপেক্ষা করি। ঠিক তার পরপরই চটের দরজা দিয়ে একজন বেড়িয়ে আসে। আমি ক্যামেরা সাটার টিপতে যাবো ঠিক তখন চটের দরজাটা আবার নড়ে উঠলো। জহির মিয়াকে দেখলাম আবারও পেছন ফিরে তাকালো।
খুব বেশি হলে ৪/৫ বয়স হবে মেয়েটার। পিচ্চি মেয়েটি বাবা বাবা বলে জহির মিয়াকে পেছন থেকে জড়িয়ে ধরলো। জহির মিয়া পরম মমতায় মেয়েটাকে কোলে তুলে নিল। তারপর আদর করতে লাগলো। একটু পরে দেখলাম আরও একটা নারী মূর্তি চটের দরজা থেকে বাইরে বের হয়ে এল। জহির মিয়া পিচ্চি মেয়েটিকে নারী মূর্তির কোলে দিয়ে আবার সামনের দিকে হাটা দিল। ফিরে তাকালো আবারও কয়েক বার।
আমি কেন জানি ইচ্ছে থাকা সত্ত্বেও ক্যামেরার সাটার চাপতে পারলাম না। আগের তিন জনের বেলায় এমনটা হয় নি কিছুতেই। এমন কি আগের কোন জনাে বেলাও এমনটা হয় নাই।
আমার চোখের সামনে কেবল পিচ্চি মেয়েটির চেহারা ভেসে উঠতে লাগলো। পুরো দিনে আরও বেশ কয়েকবার চেষ্টা নিলাম। কিন্তু কিছুতেই কাজ হল না। শেষে বাড়ির পথ ধরলাম। বুঝলাম এ কাজ আবার দ্বারা হবে না।

-তুমি তাহলে ফেরৎ দিতে চাও ক্যামেরা টা ?
-জি !
-কিন্তু এমন তো কথা ছিল না।
-আমি দুঃখিত। আমি পারবো না ! আমাকে ক্ষমা করুন প্লিজ !
আমি জানি আমি ডিল ভঙ্গ করেছি। কিন্তু তবুও পিচ্চি মেয়েটাকে কিছুতেই পিতৃহারা করা আমার পক্ষে সম্ভব হবে না। আমাকে খানিকটা অবাক করে দিয়ে লোকটা পেছন দিকে হাটা দিল। আমি বললাম, ক্যামেরাটা নিবেন না?
আমার দিকে না তাকিয়ে লোকটা বলল, তোমার কাছ থেকে আরও তিন দিন পরে আমার ক্যামেরা নেওয়ার কথা। আমি সেদিন এসে তোমার কাছ থেকে ক্যামেরা নিয়ে যাবো। এর আগে না।
-তাহলে আমি কী করবো?
-যা ইচ্ছা কর। তোমাকে যা করতে বলা হয়েছিল তা করতে পারো আবার নাও করতে পারো। তবে পরে আমাকে কোন কথা কিন্তু পরে বলতে পারবে না।

আট
-মা আমার ক্যামেরাটা কোথায়?
-কোনটা?
-আরে আমার ড্রায়ারের ভেতরে ছিল। পুরানো ক্যামেরাটা। কে হাত দিল?
-ও মনে হয় সাবিহা নিয়েছে। তোকে খুজছিল একটু আগে। ছবি তোলার জন্য। তাহলে মনে ঐ নিয়েছে।
-কোথায় গেছে? কোন দিকে?
-আরে ক্যামেরাই তো। এমন করছিস কেন? ও কী ছবি তুলতে পারে না নাকি?
-মা কোথায় ও? জলদি বল প্লিজ।
-আরে তোর বড় আপা আর রিনুর ছবি তুলতে গেছে মনে হয় ছাদে।

আমার মাথার ভিতর চক্কর দিয়ে উঠলো। কখন গেছে? এতোক্ষনে কী ছবি তুলে ফেলেছে? আমি ছাদের দিকে দৌড় দিলাম। আমার মাথায় তখন আর কোন কিছু কাজ করছে না। আমার মনে হচ্ছে ভয়ংকর একটা কাজ হতে যাচ্ছে। লোকটা বলেছিল যে তার কাজ না করলে আমার ক্ষতি হবে কিন্তু এখনও তো সময় আছে! তিন দিনের ভেতরে আমাকে কাজটা শেষ করতে হবে। তিনদিন তো পার হয় নি এখনো।
আমি যখন ছাদে গেলাম তখন দেখতে পেলাম যে সাবিহা আমার ডিএসএলআরটা দিয়ে বড় আপার ছবি তুলছে। আর পুরানো ক্যামেরার ব্যাগটা চেয়ারের উপরে রাখা। আমি দ্রুত সেটার কাছে গিয়ে হাজির হলাম। আমার চেহারার ভাব দেখেই সাবিহা বলল, বড় আপা ছবি তুলতে চাইল তাই ক্যামেরা নিয়েছি। আমি সেই প্রশ্নের উত্তর না দিয়ে ব্যাগটার কাছে গিয়ে হাজির হলাম। তারপর সেটা থেকে ক্যামেরা বের করলাম। সেটা দেখিয়ে সাবিয়ার দিকে তাকিয়ে বলল, এটা দিয়ে ছবি তুলেছিস?
সাবিহা মাথা ঝাকাল। আমি আরো শক্ত জিজ্ঞেস করলাম। আমার কন্ঠস্বরেই এমন কিছু ছিল যে সাবিহা যেন একটু চমকে উঠল। তারপর বলল এই পুরাবো ক্যামেরা দিয়ে কিভাবে ছবি তুলতে হয় জানি না।
আমার বুকের ভেতরে তখন তোলপাড় চলছে। সেটা আস্তে আস্তে শান্ত হয়ে এল এক সময়। আমি বুঝতে পারলাম যে এই ক্যামেরা দিয়ে ছবি তোলা হয় নি। আমি ক্যামেরাটা ব্যাগে ভরে তারপর নিচে নেমে এলাম। কারো সাথে কোন কথা বললাম না। আমি বুঝতে পারলাম যেকাজ আমি হাতে নিয়েছি সেটা আমাকে করতেই হবে। আমাকে জহির মিয়াকে মেরে ফেলতেই হবে।
পরের দিন আমি সেখানে গিয়ে হাজির হলাম আবার। জহির মিয়ার বাড়ির সামনে। সেদিন আমার ক্যামেরার সাটার টিপতে কষ্ট হল না।
সময় মত আমি যখন ক্যামেরা লোকটার দিকে তাকিয়ে বললাম, আপনাদের কথামত আমি কাজ করেছি। আশা করি এখন আর কোন ঝামেলা হবে না।
লোকটা হাসল। তারপর বলল, হ্যা আলাদা ভাবে আর কোন সমস্যা হবে না। তবে তুমি নিশ্চিত যে ক্যামেরাটা নিজের কাছে রাখতে চাও না? এতো ক্ষমতাধর একটা ডিভাইস? রাখবে না?
-জ্বী না। আমি এটা চাই না। আমি এই ক্ষমতা চাই না।
-সত্যিই চাও না?
-হ্যা চাই না। যে অপরাধ আমি করেছি সেটার কোন ক্ষমা নেই। কোন ক্ষমা নেই। আমি এটা চাই না। মোট সাতজন মানুষকে আমি মেরে ফেলেছি। সাতজন! এই মানুষগুলোর মৃত্যু আমার হাতে জড়িয়ে আছে। আমি কিভাবে নিজেকে মাফ করবো আমি জানি না।
লোকটা ক্যামেরার হাতে নিয়ে হাসল একটু। তারপর আর কিছু না বলেই সে গলির অন্ধকারেই হারিয়ে গেল।

নয়
ঠিক এক সপ্তাহ পরে আমি একটা ভয়ংকর ব্যাপার আবিস্কার করলাম। আমার মানসিক অবস্থা বেশ খারাপই ছিল। বারবার আমার মনে হচ্ছিল যে আমার কারণে এই মানুষগুলো মারা গেছে। আমি এদের খুনী এই অপরাধবোধ থেকে আমি কিছুতেই নিস্তার পাচ্ছিলাম না। বিশেষ করে জমির মিয়া নামের মানুষটা একেবারে নিরীহ মানুষ ছিল। সে কারো সাথে পাছে ছিল না। প্রতিদিন সকালে সে কাজে যেত। একটা বেকারিতে সে কাজ করত। দিন ভয় সেখানেই কাজ করতো তারপর সন্ধ্যার দিকে বাড়ি ফিরে আসত। এরপর পুরো সময়টা সে নিজের মেয়ে আর স্ত্রীর সাথে সময় কাটাতো। আর আমি সেই মানুষটাকেই মেরে ফেললাম। নিজের পরিবারের জন্য আমি অন্য একটা মানুষের পরিবারকে ধ্বংস করে দিলাম। আমি একজন খুনী ছাড়া আর কিছুই না।
আমি সেই অপরাধবোধ থেকেই জমির মিয়ার বাড়ির সামনে গিয়ে হাজির হলাম। আমার দেখা ইচ্ছে ছিল যে প্রতিদিন সকালে এখনও কি বের হয়ে আসে? বাবাকে খোজে?
আমি অপেক্ষা করতে লাগলাম। তারপর সেদিনের মতই চটের বস্তাটা কেঁপে উঠল এবং সেটা ভেদ করে একজন বের হয়ে এল। আমি তীব্র বিস্ময় নিয়ে সেদিকে তাকিয়ে রইলাম। কারণ যে মানুষটা পর্দা ভেদ করে বের হয়ে এসেছে সে আর কেউ নয়, জহির মিয়া!
একই ভাবে সে পর্দা ভেদ করে বের হল। আজকে অবশ্য তার মেয়ে তার কোলেই ছিল। হাস্যজ্জ্বল মেয়েটা বাবাকে কী যেন বলছে। জহির মিয়া গভীর মনযোগ দিয়ে সেটা শুনছে। এক সময় তার স্ত্রীও বের হয়ে এল। মেয়েকে স্বামীর কাছ থেকে নিজের কোলে নিয়ে নিল তারপর দুজন মিলে জহির মিয়াকে বিদায় দিল। আমি সেদিকে একভাবে তাকিয়ে রইলাম।
একটা স্বস্তির নিঃশ্বাস আমার ভেতর থেকে বের হয়ে এল।
জমহির মিয়া মারা যায় নি। সে বেঁচে আছে!
কিন্তু কিভাবে?

চলবে ….

ফেসবুকের অর্গানিক রিচ কমে যাওয়ার কারনে অনেক পোস্ট সবার হোম পেইজে যাচ্ছে না। সরাসরি গল্পের লিংক পেতে আমার হোয়াটসএপ বা টেলিগ্রামে যুক্ত হতে পারেন। এছাড়া যাদের এসব নেই তারা ফেসবুক ব্রডকাস্ট চ্যানেলেও জয়েন হতে পারেন।

অপু তানভীরের অনুবাদ গ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে

বইটি সংগ্রহ করতে পারেন ওয়েবসাইট বা রকমারী বা ফেসবুকে থেকে।

এছাড়া সকল গল্পের লিস্ট পাবেন সূচিপত্রে। পুরানো আগের গল্প পড়তে পারবেন সামহোয়্যারইন ব্লগ ও ওয়াটপ্যাড থেকে।

How useful was this post?

Click on a star to rate it!

Average rating 4.9 / 5. Vote count: 9

No votes so far! Be the first to rate this post.


Discover more from অপু তানভীর

Subscribe to get the latest posts sent to your email.

About অপু তানভীর

আমি অতি ভাল একজন ছেলে।

View all posts by অপু তানভীর →

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *