খোপায় বেলিফুলের মালা

4.8
(26)

অফিস থেকে বাসায় যেতে আমার প্রায়ই দেরি হয়ে যায়। অবশ্য এতে আমার খুব একটা সমস্যা নেই। আমার কাছে বাইক রয়েছে। তাই রাতে একটু দেরি হলেও খুব একটা সমস্যায় আমাকে পড়তে হয় না। পান্থপথের সিগনালে দাঁড়িয়ে আছি এমন সময় এক বৃদ্ধ মহিলাকে দেখতে পেলাম। হাত হাতে কয়েকটা বেলিফুলের হাতে নিয়ে আমার সামনে এসে দাঁড়ালেন। মালাগুলর দিকে তাকিয়ে বুঝতে কষ্ট হল না যে মালাগুলো এই মাত্রই গাথা হয়েছে। এই রাতের বেলা সাধারণত ফুলের মালা এরা গাথে না। আমার দিকে তাকিয়ে বৃদ্ধ মহিলা কিছু সময় তাকিয়ে থেকে বললেন, বাবাজি নিবা ফুল গুলা? মাত্র দশ টেকা কইরা।
আমি একটু হেসে বললাম, দাদী আমার ফুল দেওয়ার মত কেউ নাই।
আমার কাছ থেকে এই উত্তর শুনে যে যখন হতাশ হয়ে চলেই যাচ্ছিল তখন আমি বললাম, আচ্ছা দিন সুন্দর গন্ধ ছড়াচ্ছে। ঘরে রেখে দিবো নে।
বৃদ্ধ মহিলার মুখে যেন একটা একশ পাওয়ারের আলী জ্বলে উঠল। আমি তার কাছ থাকা সবগুলো ফুলই নিয়ে নিলাম। কেন যে নিলাম আমি সেটা নিজেও জানি না।
বাসায় যখন এসে হাজির হলাম তখন প্রায় এগারোটা বেজে গেছে। আমি বাইক গ্যারেজে রেখে লিফটের ভেতরে ঢুকে পড়লাম। যখন লিফটের দরজাটা বন্ধ হতে যাবে তখনই সেটা আবার খুলে গেল। মানে হচ্ছে একজন বাটনে চাপ দিয়েছে। আমি কয়েক মুহুর্ত পরেই তার চেহারা দেখতে পেলাম। এবং একটু সোজা হয়ে দাড়ালাম।
অনুশেখা।
আমাদের উপরের তলাতে থাকে বাবা মায়ের সাথে। পেশায় জেলা ম্যাজিস্ট্রেইট।
আমার দিকে একটু তাকাল।
অনুশেখার মুখ সব সময় গম্ভীর থাকে। শুনে এই মেয়ে স্কুল কলেজে বিশ্ববিদ্যালয়ে সব সময় টপ ছাত্রী ছিল। বিসিএসেও বেশ ভাল ফল কয়েছিল। আপনাদের পাড়াতে এমন কিছু ছেলে মেয়ে থাকে যাদের দিয়ে আপনার বাবা মা সব সময় আপনাদের সাথে তুলনা দেয়, আপনাদেরকে বলে যেন তার পা ধোয়া পানি খেতে, এবং আপনারা কেউ তাদেরকে পছন্দ করেন না, অনুশেখা হচ্ছে সে টাইপের মেয়ে।
অনুশেখা সব সময় মুখ গম্ভীর করে থাকে। অবশ্য সে যেই পোস্টে আছে সেখানে গাম্ভীর্য খুবই দরকার। আমি যতবারই তার মুখোমুখী হয়েছি ততবারই আমার মনে হয়েছে যেন এই মাত্রই অনুশেখা কাউকে ঝাড়ি দিয়ে এসেছে নয়তো বসের কাছে ঝাড়ি খেয়ে এসেছে। আজকেও আসলে তেমনটাই মনে হল।
সে আমার পাশে এসে দাঁড়াল গম্ভীর মুখে। আমি ফুল হাতে নিয়ে চুপচাপ দাঁড়িয়ে রইলাম। ফুলের গন্ধে পুরো লিস্ট একটা চমৎকার আবহাওয়া বিরাজ করতে। সেই সময়ে আমাকে খানিকটা অবাক করেই দিয়ে অনুশেখা আমাকে বলল, ফুল কার জন্য কিনলেন ফয়সাল সাহেব?
আমি সত্যিই কিছু সময়ের জন্য বিমুঢ় হয়ে গেলাম। কারণ হচ্ছে দুইটা। অনুশেখা কোনদিন এভাবে আমার সাথে কথা বলে নি। আর দ্বিতীয় কারণটা হচ্ছে সে আমার নাম জানে! কিভাবে জানে কে জানে!
আমার বিমুঢ় ভাবটা কাটার আগেই অনুশেখা আবার বলল, আমাদের স্কুলের মাঠে একটা বেলি ফুলের গাছ ছিল। তখন আমরা স্কুলের কাছেই থাকতাম। প্রতিদিন সকালে আমি বেলিফুল কুড়াতে যেতাম। অনেকদিন পরে এমন চমৎকার গন্ধ পেলাম!
আমি সত্যিই অবাক হলাম অনুশেখার কথা শুনে। মেয়েটা এভাবে কথা বলবে আমি ভাবতেও পারি নি। আমি তখন একটা অবাক করার মত কাজ করলাম। লিফট ততক্ষণে আমার ফ্লোরে চলে এসেছে। আমি ফুলগুলো নিয়ে তার সামনে ধরলাম। বললাম, এগুলো আপনার জন্য!
-আরে না না সেকি!
আমি ফুলগুলী তার সামনে আরেকবার এগিয়ে দিয়ে বললাম, প্লিজ নিন।
অনুশেখার মুখের দিকে তাকিয়ে কেন জানি আমার মনে হল যে ফুলগুলো তার নিতে ইচ্ছে করছে। কিন্তু ভদ্রতার কারণে হ্যা বলতে পারছে না। লিফটের দরজা ততক্ষণে খুলে গেছে পুরোপুরি। একটু পরেই বন্ধ হয়ে যাবে সেটা। আমি মুখে একটা ভাব করলাম যে এখনই আমাকে বের হয়ে যেতে হবে। অনুশেখা এবার ফুলগুলো হাতে নিল। আমার দিকে তাকিয়ে একটু হাসল। সত্যি বলতে কী এই প্রথম আমি ওকে হাসতে দেখলাম। আমার মনটা কেন যেন ভাল হয়ে গেল। আমি লিফট থেকে বের হয়ে যাওয়ার আগে একবার একটু হাসি দিলাম।
রাতের খাওয়া শেষ করে আমি ব্যাপারটা নিয়ে কিছু সময় ভাবলাম। সত্যি বলতে আমি কোনদিন ভাবিও নি যে এমন একটা ঘটনা ঘটতে পারে। কিন্তু এর থেকেও আরও একটা চমৎকার ঘটল পরদিন সকালে।
আমি অফিস যাওয়ার আগে নিজের ঘরের বারান্দায় এসে সকালটা একটু উপভোগ করছিলাম এমন সময় আমি অনুশেখাকে দেখতে পেলাম। সে এতো সকালেই অফিসের জন্য বের হয়েছে। ওকে নিতে সরকারি গাড়ি এসে হাজির হয়েছে। আমার অফিস আরও একঘন্টা পরে শুরু তাই আমি একটু পরেই বের হই। অনুশেখাকে আমি বের হতে দেখলাম। আজকে সে শাড়ি পরেছে। এবং সব থেকে অবাক হলাম অনুশেখার মাথায় গতকালকে আমার দেওয়া ফুলগুলো দেখে। সে খোপা করেছে এবং সেই খোপায় ফুল দিয়েছে। আমি অবাক হয়ে তাকিয়ে রইলাম সেদিকে। মনটা সকাল বেলাতেই ভাল হয়ে গেল।
অনুশেখা যখন গাড়ির দরজার কাছে গিয়ে দাঁড়াল তখন সে আমার দিকে ফিরে তাকাল। সরাসরি আমার দিকেই যেন সে জানতোই আমি এখন এখানে দাঁড়িয়ে থাকব। কিছু সময় যেন সব কিছু স্থির হয়ে গেল। সে আমার দিকেই তাকিয়ে রইল। তারপর হাত দিয়ে নিজের খোঁপার ফুল স্পর্শ করল। আমাকে বোঝাল যে সে আমার দেওয়া ফুল মাথায় দিয়েছে। আমি একটু হাসি মুখ দিয়ে তার দিকে তাকিয়ে রইলাম কেবল। আসলে এই পরিস্থিতিতে আমার কেমন প্রতিক্রিয়া দেখানো উচিত আমি সেটা বুঝতেই পারছিলাম না। অনুশেখা চলে গেল আমি সেখানেই দাঁড়িয়ে রইলাম আরো কিছু সময়। মনের ভেতরে একটা আনন্দ কাজ করছে। কেন এই আনন্দ কাজ করছে সেটা আমি জানি না।

দুই
অনুশেখাকে আমি এতোদিন দূর থেকেই দেখে এসেছি। সত্যি বলতে অনুশেখা এমনই একজন মেয়ে ছিল যাকে আমি কেবল দূর থেকেই দেখতাম কিন্তু এখন কেন জানি মনে হল যে অনুশেখার এই গাম্ভীর্যের মাঝেও একটা অন্য অনুশেখা বাস করে। বিশেষ করে অনুশেখা আমার নাম জানে এটা জেনে আমি বেশ চমৎকৃত হয়েছিলাম। সত্যি বলতে অনুশেখার আমার নাম জানার কোন কারণই থাকার কথা না। তারপরেও সে জানে!
আমাদের মাঝের ব্যাপারটা আরেকটু এগিয়ে গেল সপ্তাহ খানেক পরে। সেদিন রাতের দিকে ঝুম বৃষ্টি নামল। রাতে ঘুমানোর আগে আমি একবার গোসল করি। এটা আমার অনেক দিনের অভ্যাস। হঠাৎ আমার কী যেন মনে হল, আমি বৃষ্টিতে ভিজতে চাইলাম। একটা ট্রাউজার আর টিশার্ট পরে আমি ছাদে চলে গেলাম বৃষ্টিতে ভেজার জন্য। এই রাতের বেলা কারো থাকার কথা না। কেউ ছিল না। আপন মনে আমি বৃষ্টিতে ভিজতে শুরু করলাম। মিনিট দুয়েক পরেই আমি বুঝতে পারলাম যে আমি একা নই। ছাদে একজন ছিল এবং সেই একজনটা হচ্ছে অনুশেখা। আমি ওকে দেখে একটু থমকে গেলাম। সম্ভবত সেও আমাকে এখানে আশা করে নি। আমরা দুজন দুজনের দিকে কিছু সময় তাকিয়ে রইলাম কেবল। কয়েকবার বিদ্যুৎ চমকালো ওকে আরো ভালো ভাবে দেখলাম।
আমার এখন কী করা উচিত আমি ঠিক বুঝতে পারছিলাম না। আমি নিশ্চিত ভাবে অনুশেখার একান্ত বৃষ্টি উপভোগের সময়টার ভেতরে ব্যাঘাট ঘটিয়েছি। বিশেষ করে অনুশেখার পোশাকের দিকে তাকিয়ে আমি একটু অবাকই হলাম। এতোদিন আমি যতবার অনুশেখাকে দেখেছি ততবারই ওকে হয় শাড়ি নয়তো সেলোয়ারকামিজে দেখেছি। বাসায় সে কী পরে থাকে সেটা অবশ্য আমার জানার কথা না। এখন সে একটা ঢোলা টিশার্ট পরে আছে আর নিচে থ্রিকোয়ার্ট ট্রাইজার। আমাকে দেখে সে যে অপ্রস্তুত হয়েছে সেটা বলে দেওয়ার অপেক্ষা রাখে না। আমার মনে হল আমার এখন চলে যাওয়া উচিৎ। আমি ঘুরে চলে যেতে যাবো তখনই অনুশেখা বলল, আপনিও বৃষ্টিতে ভিজেন?
এই প্রশ্নের উত্তর দিতেই হয়। আমি বললাম, মাঝে মাঝে ভিজি?
-এই রাতের বেলা?
-আসলে দিনে তো সুযোগ পাওয়া যায় না।
অনুশেখা আমার দিকে তাকিয়ে বলল, জানেন একটা সময় ছিল আমার বৃষ্টি অনেক পছন্দের ছিল। বৃষ্টি হলেই ভিজতাম। রাত দিন কোন কথা নেই।
-এখন ভিজেন না?
-এখন আর সময় পাই কোথায়? আজকেও ভেজা হত না। কাল অফিস যাবো না বলে রাত একটু রাত জেগে ছিলাম তখন বৃষ্টি নামল। কাউকে কিছু না বলে চলে এলাম। আপনিকে মাঝে মাঝে দেখি আপনি বাইকে করে ভিজতে ভিজতে বাসায় আসছেন!
আমি এই তথ্যটা জেনে একটু অবাক হলাম। সত্যি তাই। বৃষ্টিতে বেজা আমার নিজেরও বেশ পছন্দ। অফিস থেকে ফেরার সময় যদি বৃষ্টি হয় আমি সাধারণত রেইনকোর্ট পরি না। ভিজতে ভিজতে আসি। তবে এটা যে অনুশেখা খেয়াল করেছে এটা আমি জানতাম না। আমি একটু হেসে বললাম, ফেরার পথে বৃষ্টি হলেই রেইনকোর্ট পরতে ইচ্ছে করে না।
-মাঝে মাঝে অফিস থেকে ফেরার পথে বৃষ্টি দেখি। জানালা দিয়ে বৃষ্টির দিকে তাকিয়ে থাকি। খুব ইচ্ছে করে বৃষ্টির ভেতরে নেমে যেতে। কিন্তু নামা হয় না।
-কেন, চাইলেই তো পারেন!
আমার কথা শুনে অনুশেখা যেন বেশ মজা পেল। বলল, আমি যে পোস্টে চাকরি যদি এই ভাবে বৃষ্টিতে নেমে পরি তবে একেবারে সোজা ওএসডি হয়ে যাবো!
আমি অবাক হয়ে বললাম, সেকি! কেন?
-আমরা পাব্লিক এপ্লোয়ীরা চাইলেই অনেক কিছু করতে পারি না। বিশেষ করে পাব্লিক্যালি তো করতেই পারি না। আর এখন যে ভাইরালের যুগ যদি কেউ ভিডিও করে ফেসবুকে ছেড়ে দেয়, উপায় আছে!
তখনই দেখলাম বৃষ্টির বেগ যেন আরেকটু বাড়ল। আমার কাছে মনে হল যে এই বৃষ্টি আজকে রাতে আর থামবে না। তখন হঠাৎ আমার মনে একটা চিন্তা এল। আমি একটু চিন্তা করেই অনুশেখাকে কথাটা বললাম। যদিও মনে ক্ষণ সন্দেহ ছিল যে অনুশেখা রাজি হবে না সম্ভবত তারপরেও বললাম!
-রাস্তায় ভিজবেন?
অনুশেখা একটু চমকে গেল যেন। বলল, কী? মাথা খারাপ নাকি? এখন নামা যায় নাকি?
-আরে চাইলেই যাবে? নামবেন কিনা বলেন? আমি বাইক বের করছি!
-না না মোটেই না। এটা হয় নাকি!
আমি এবার বললাম কে কী বলবে এতো চিন্তা করতে হবে না। আমি নিচে নামছি। একটু পরে বাইক নিয়ে বের হব। এই বৃষ্টি সহজে থামছে। এমন সুযোগ কিন্তু বারবার আসবে না।
আমি অনুশেখাকে আর কিছু বলার সুযোগ না দিয়েই নিচে নেমে এলাম। বাইকের চাবিটা দরজার কাছেই থাকে সব সময়। তাই সেটা নিচে সমস্যা হল না। গেটের চাবিটাও নিচে নিলাম। নিজেই গেট খুলে বাইক বের করলাম। তারপর কিছু অপেক্ষা করতে লাগলাম। আমার মনে একটা সন্দেহ ছিল যে অনুশেখা হয়তো নামবে না। তবে মিনিট দুয়েক পরেই দেখলাম অনুশেখা নিচে নেমে এল। আমি একটু হেসে বললাম, চলুন যাওয়া যাক!
অনুশেখা বাইকে উঠতে উঠতে বলল, কী পাগলামী করছি কে জানে! কেউ জানলে কী যে হবে!
-আরে এতো চিন্তা করে লাভ নেই, যা হবার হবে!

বাইক চলতে শুরু করলাম। একে তো বেশ রাত তার উপর ঝুম বৃষ্টি। রাস্তাঘাট একেবারে ফাঁকা। মাঝে মাঝে অভস্য ভুসভাস করে গাড়ি চলে যাচ্ছে। আমি অনুভব করতে পারছিলাম যে পেছনে বসে অনুশেখা দুইহাত বাড়িয়ে দিয়েছে। ওর ভাল লাগছে। আমরা অনেক দুরে গিয়ে হাজির হলাম। মাঝে রাস্তায় থামলাম। অনুশেখা রাস্তার মাঝেই দৌড়াদৌড়ি করল কিছু সময়। তারপর এক সময় আমাদের ফেরার সময় এল। যখন আমরা আবার বাসায় এসে হাজির হলাম তখন দুজনেই শীতে একটু কাঁপছি। এতো লম্বা সময় ধরে অনেক দিন বৃষ্টিতে ভেজা হয় না। বাইক রেখে এক সাথেই সিড়ি দিয়ে উপরে উঠলাম। আমার বাসায় কাছে এসেই অনুশেখা আমার সামনে এসে দাঁড়াল। তারপর বলল, আপনাকে কী বলে যে ধন্যবাদ দিব সেটা বলে বোঝাতে পারছি না। সত্যি অনেক দিন পরে নিজেকে মুক্ত মনে হল।
আমি বললাম চাইলে আসলে এমন কিছু করাই যায়।

তিন

তারপরে এই ব্যাপারটা আমাদের জন্য নিয়মিত ব্যাপার হয়ে দাঁড়াল। প্রায় রাতে আমরা দুইজন বের হয়ে যেতাম। বাইক নিয়ে এদিক সেদিন চলে যেতাম। কোন নির্জন রাস্তার বসে চা খেতাম আর গল্প করলাম। একবার আমাদের পুলিশ আটকালো। আমরা রাতের বেলা কেন এভাবে ঘুরে বেড়াচ্ছি। তবে আমাদের খুব বেশি বিপদে পড়তে হল না। কারণ পেট্রোল ইনচার্জ অনুশেখাকে চিনে ফেললেন।
তবে অনুশেখা যে ভয়টা আসলে পাচ্ছিল সেটাই একদিন বাস্তবে পরিণত হল। সেদিন রাতেও আমরা বাইক নিয়ে বের হয়েছিলাম মাঝ রাতে। রাস্তার পাশের একটা চায়ের দোকানে বসে চা খাচ্ছিলাম আর গল্প করছিলাম। জায়গাটা একেবারে নির্জন ছিল না। আশে পাশে কয়েকতা উচু উচু বিল্ডিং ছিল। এখানে আসার কারণ হচ্ছে এই চাচার চা বেশ চমৎকার ছিল। আমরা আগেও বেশ কয়েকবার এসেছি। সেদিনো গিয়েছিলাম। দুজন বসে বসে গল্প ছিল আর চা খাচ্ছি কিন্তু যে ব্যাপারটা আমরা কেউ খেয়াল করি নি সেটা হচ্ছে ঐ উচু বিল্ডিংয়ের কেউ আমাদের এই দৃশ্যটাকে ভিডিও করেছিল। দামী ক্যামেরায় আমাদের স্পষ্টই দেখা যাচ্ছিল। সে ভিডিওটা ফেসবুকে আপলোড করে দিল। আমরা তখনও কিছু জানি না।
তার অবশ্য খারাপ মনভাব ছিল না। আমাদের সে আগেও দেখেছে কারণ ক্যাপশনেই সে লিখেছে এই কাপলটাকে সে আগেও দেখেছে। এভাবে রাতের বেলা চা খেতে আসে গল্প করে কতই না রোমান্টিক। ব্যাস ভিডিওটা ভাইরা হয়ে গেল। কয়েকজন কৌতুহলী মানুষ অনুশেখার পরিচয়ও বের করে ফেলল। প্রথমে আমাদের হাজব্যান্ড ওফাইফ মনে করলেও পরে বের হয়ে এল আমরা বিবাহিত নই। আগে কেবল পজেটিভ প্রতিক্রিয়া এলে এরপর নেগেটিভ প্রতিক্রিয়াও আসা শুরু হল।
আমার মনে হল যে এবার অনুশেখা বুঝি আর আমার সাথে রাতের বের হবে না। সত্যি বলতে কি আমাদের সময়টা এতো চমৎকার কাটছিল যে বলে বোঝানোর নয়। আমার মনে একটা ভয় এসে জড় হল এই যে অনুশেখাকে এবার বুঝি ওএসডি করা হবে কিংবা বদলি করে দেওয়া হবে। আজকাল ফেসবুকে ভাইরাল হয়ে গেলে অনেক কিছুই তো হয়।
তবে এরপর অনুশেখা যা করল সেটা দেখে আমি অবাক হয়ে গেলাম। সত্যি বলতে অনুশেখা যে এমন একটা কাজ করতে পারে সেটা আমি ভাবতেও পারি নি। ঘটনা ঘটলা পরদিনই। আমি বিকেলে অফিসে ছিল তখনই দেখতে পেলাম ব্যাপারটা। অনুশেখা তার ফেসবুকের প্রোফাইল পিকচার বদলেছে। যে ছবিটা সে দিয়েছে সেটা একটা সেলফি এবং ছবিটা আমার সাথেই তোলা। ছবিটা দেখার পরে আমার হাত থেকে মোবাইলটা পড়েই যাচ্ছিল এক প্রকার। আমি অনুশেখাকে ফোন দিতেই যাবো তার আগেই দেখলাম তার ফোন এসে হাজির।
-হ্যালো।
আমি হ্যালোর জবাব না দিয়ে বলল, কী ব্যাপার ? এভাবে ছবি দিয়ে দিলে একেবারে?
অনুশেখা আমার প্রশ্নের জবাব না দিয়ে বলল, নিচে নামো তো!
-মানে কী?
-মানে হচ্ছে আমি তোমার অফিসের নিচে। নেমে এসো।
আমি আসলে কিছুই বুঝতে পারছিলাম না। দ্রুত বের হয়ে এলাম। দেখলাম অনুশেখার গাড়ির ড্রাইভার ওকে রেখে চলে যাচ্ছে। আমি কাছে যেতেই বললাম গাড়ি ছেড়ে দিলে কেন?
অনুশেখা কিছু বলল না। কেবল আমার দিকে একভাবে কিছু সময় তাকিয়ে রইল। আমি সেই দৃষ্টি দেখেই বুঝে গেলাম যে ও আসলে কী করতে চাইছে। সে এখন এই দিনের বেলা সবার সামনে আমার বাইকের পেছনে উঠে ঘুড়ে বেড়াবে!
এতো সাহস কীভাবে হল ওর! প্রথমে ছবি তারপর …
আমি কোন প্রতিবাদ করতে পারলাম না। বাইক নিয়ে এলাম এবং সে আমার বাইকের পেছনেই উঠে বসল। আমি সোজা সেই জায়গাতে গিয়েই হাজির হলাম, সেই চায়ের দোকানে। সেখানে বসে চা খেতে গল্প করতে করতে লাগলাম।

কিছু সময় পরে দেখলাম একটা মেয়ে আমাদের সামনে এসে হাজির হল। আমাদের দিকে তাকিয়ে বলল, হ্যালো ম্যাম আমার নাম নওরিন।
অনুশেখা তার দিকে তাকিয়ে বলল, হ্যালো নওরিন কেমন আছো তুমি?
মুখে হাসি হাসি ভাব ছিল। আমার কেন জানি মনে হল অনুশেখা নওরিনকে চেনে। নওরিন বলল, আমি ভাল আছি ম্যাম। আসলে আমার কাজটা করা উচিৎ হয় নি। কারো অনুমতি ছাড়া তার ছবি ভিডিও করা তারপর সেটা প্রকাশ করে দেওয়া মোটেই ঠিক না। আমি খুবই দুঃখিত!
আচ্ছা, এবার আমিও বুঝতে পারলাম। এই মেয়েটিই সম্ভবত আমাদের ভিডিও করেছিল। নওরিন আবার বলল, কিন্তু আপনাদের আসলে এতো চমৎকার লাগছিল এক সাথে, প্রায়ই আমি আপনাদের রাতের বেলা দেখতাম। এতো ভাল লাগত। ভিডিওটা যে এভাবে ভাইরাল হয়ে যাবে বুঝতে পারি নি।
অনুশেখা হাসল। তারপর বলল, কোন সমস্যা নেই। এরপর থেকে অনুমতি নিয়ে করবে কেমন!
-জ্বী ম্যাম অবশ্যই। আর ভুল হবে না।
-তবে তোমাকেও ধন্যবাদ। তোমার কারণে আমিও একতা ভয় থেকে মুক্ত হয়েছি।
নওরিন হাসল। অনুশেখা বলল, চাইলে আজকে আমাদের দিনের বেলার এই ভিডিও করতে পারো তারপর সেটা আপলোড দিতে পারো।
-সত্যিই?
-হ্যা।

নওরিন চলে গেল। আমি অনুশেখার ব্যাপারটা বুঝতে পারছিলাম না। ওর আসলেই আর ভয় নেই। আমরা আরও কিছু সময় ওখানে বসে তারপর আবার বাসায় চলে এলাম। বাসায় ঢোকার আগে সে আমাকে জানাল যে এবার থেকে প্রতিদিন অফিস শেষ করে আমাকে তার অফিসের সামনে যেতে হবে এবং বাইকে করে নিয়ে আসতে হবে। আর কোন লুকোছাপা নেই। বিয়ের আগ পর্যন্ত করতে হবে। যে যা ভাবার ভাবুক! ও আরেকটা শর্ত দিয়েছে। তার জন্য প্রতিদিন না হলেও সপ্তাহে অন্তত একবার অবশ্যই বেলিফুলের মালা নিয়ে যেতে হবে এবং সেটা সবার সামনে তাকে দিতে হবে। যদি বেলি ফুলের মালা না পাওয়া যায় তবে অন্য ফুলের মালার ব্যবস্থা করতে হবে।
এক বেলিফুলের মালা থেকে কত কিছু হয়ে গেল! সেদিন যদি মালাগুলো না দিতাম তাহলে এই খানে আজকে কি আসা হত! নিশ্চয়ই না। যাক যা হয়, ভালর জন্যই হয়।

ফেসবুকের অর্গানিক রিচ কমে যাওয়ার কারনে অনেক পোস্ট সবার হোম পেইজে যাচ্ছে না। সরাসরি গল্পের লিংক পেতে আমার হোয়াটসএপ বা টেলিগ্রামে যুক্ত হতে পারেন। এছাড়া যাদের এসব নেই তারা ফেসবুক ব্রডকাস্ট চ্যানেলেও জয়েন হতে পারেন।

অপু তানভীরের অনুবাদ গ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে

বইটি সংগ্রহ করতে পারেন ওয়েবসাইট বা রকমারী বা ফেসবুকে থেকে।

এছাড়া সকল গল্পের লিস্ট পাবেন সূচিপত্রে। পুরানো আগের গল্প পড়তে পারবেন সামহোয়্যারইন ব্লগ ও ওয়াটপ্যাড থেকে।

How useful was this post?

Click on a star to rate it!

Average rating 4.8 / 5. Vote count: 26

No votes so far! Be the first to rate this post.


Discover more from অপু তানভীর

Subscribe to get the latest posts sent to your email.

About অপু তানভীর

আমি অতি ভাল একজন ছেলে।

View all posts by অপু তানভীর →

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *