ছইমুং পাড়াতে শুরুটা একটু অস্বস্তির হলেও যখন আমি থাকার জায়গাতে এলাম তখন আমার মনটা ভাল হয়ে গেল। ঘরটা পাড়ার একেবারে এক পাশে। একটা ঘরই এখানে আছে। আমি ভেতরে ঢুকে বুঝতে পারলাম যে এখানে নিয়মিত ভাবে কেউ না কেউ থাকে। ঘর একেবারে পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন। একপাশে তোষকও বালিশও দেখতে পেলাম। আমি পাশেই এসে নইরং এসে দাঁড়াল। বলল, এটা আমাদের ঘর। দিনের বেলা এখানে এসে আমি আর আমার বড় ভাই থাকি। বড় ভাই শহরে গেছে কয়েকদিন আগে। আমার সাথেই আসার কথা ছিল তবে আসে নি। কাল পরশুর ভেতরে চলে আসবে।
আমি বললাম, রাতে থাকো না এখানে?
-না রাতে থাকি না। রাতে আমাদের সবাই ঐ বাড়িতেই থাকতে হয়।
ঐ বাড়ি বলতে যে সে যৌথবাড়ি বলল সেটা বুঝতে পারলাম। এরই সাথে আমি আরেকটা কথা বুঝতে পারলাম যে নইরং কিছু একটা যেন বলতে গিয়েও বলল না। আমি সেটা অবশ্য আর জিজ্ঞেস করলাম না। আমি নিজের ব্যাগটা বানিয়ে রাখলাম ঘরের একপাশে। দেখতে পেলাম নইরং ঘরের এক পাশে জড় করে রাখা তোশকতা আমার জন্য বিছিয়ে দিল। একটু ঝেড়েও দিল। তারপর আমাকে রেখে বের হয়ে গেল। অবশ্য ফিরে এল একটু পরেই। হাতে খাবারের একটা প্লেট আর পানির বোতল। সেটা ঘরের একপাশে রেখে সে বলল, আপনি খাইয়া নেন। চাইলে পাড়ার এদিক ওদিক ঘুরে দেখতে পারেন। তবে বেশি দুর যাইয়েন না।
এই বলে নইরং চলে গেল। খাওয়ার পরেই শরীরটা ছেড়ে দিল। আমি তোষকে শরীর এলিয়ে দিলাম। কখন যে ঘুম চলে এল সেটা আমি টেরই পেলাম না। পাহাড়ের এই ব্যাপারটা আমার কাছে বেশ ভাল লাগে। শরীর ক্লান্ত থাকার কারণে বালিশে মাথা দেওয়ার সাথে সাথেই ঘুম চলে আসে। যে শান্তির ঘুমটা এখানে আসে সেটা আর কোথাও আসে না।
এবার ঘুমের ভেতরেও আমি সেই মেয়েটাকে দেখতে পেলাম। এবার আরও স্পষ্ট হয়ে ধরা দিয়েছে। মুখের গড়নটা যদিও একেবারে পরিষ্কার নয় তবে সেটা আমি বুঝতে পারছি কিছুটা। আমি বুঝতে পারছি যে মেয়েটার মুখটা দারুণ সুশ্রী। এবার কিন্তু মেয়েটা দুরে রইলো না। সে বরং আমার কাছে এগিয়ে এল। আমার দিকে তাকিয়ে বলল, কী চলে এলে তো আমার কাছে!
আমি এই কথাটার মানে ঠিক বুঝতে পারলাম না। চলে তো আমার কাছে মানে কী? কী বলতে চাইছে এই মেয়েটা?
মেয়েটা আরও একটু যেন আমার কাছে এগিয়ে এল। আমি সেই মিষ্টি গন্ধটা পেলাম আবার। আমি স্পষ্ট বুঝতে পারছিলাম যে মেয়েটা আমার দিকেই আস্তে আস্তে এগিয়ে আসছে। এই দৃশ্যটাকে ভয় পাওয়ার কোন কারণ নেই তবে আমার কেন জানি মনে হল যে এই পুরো দৃশ্যের ভেতরে ভয়ংকর কোন ব্যাপার আছে! কী সেই ব্যাপার আমি সেতা জানি না, সত্যিই জানি না।
মেয়েটা আরও একটু এগিয়ে এল আমার দিকে। আর ঠিক যখন মেয়েটার চেহারা স্পষ্ট হতে শুরু করবে এমন সময়ে আমার ঘুম ভেঙ্গে গেল। আমি অনুভব করতে পারছিলাম যে আমার বুকটা বেশ জোরেই ওঠানামা করছে। আমি কেন ভয় পেলাম সেটা আমি বুঝতে পারলাম না। স্বপ্নটা কোন ভাবেই দুস্বপ্নের মত ছিল না। সেখানে ভয়ের কোন কারণ থাকার কথা না। তাহলে ভয় কেন পেলাম? আমি জানি না। আমার বেশ কিছুটা সময় আমি শুয়েই রইলাম। মনটা শান্ত হতে একটু সময় লাগল। চারিদিকটা অন্ধকার হয়ে আছে। তার মানে আমি লম্বা একটা সময় ঘুমিয়েছি। পাহাড়ে দ্রুতই রাত নামে। এখানেও তাই।
আমি ঘর ছেড়ে বাইরে বের হয়ে এলাম। বাইরের জগত আমার কাছে কেন একেবারে আলাদা মনে হল। আমি এর আগে অনেক পাহাড়েই থেকেছি। সেই সব পাহাড়ে থাকার অভিজ্ঞতা আমার আছে। কিন্তু এই অনুভূতি আমার কাছে একেবারেই নতুন। আমার কাছে পুরো ব্যাপারটা একেবারেই অন্য রকম মনে হচ্ছে। অবশ্য এটার একটা কারণ হতে পারে যে আমি আগের সব বারই পাড়ার ভেতরেই থেকেছি। এবার যদিও আমি পাড়াতেই আছি তবুও কেন জানি আমার মনে হচ্ছে আমি পাড়ার বাইরে রয়েছি। আর দিনের বেলা দেখা ঐ মূর্তিগুলো দেখে আমি মনেই হয়েছে যে ঐ গুলো ঘরগুলোকে পাহারা দিচ্ছে। কিন্তু এই ঘরে কোন পাহারা নেই। এই অদ্ভুত অনুভূতিটা আমাকে আমার মন থেকে কেন জানি যাচ্ছে না। আমি কী করব যখন বুঝতে পারছিলাম না তখনই দেখতে পেলাম যৌথ বাড়ির থেকে একটা আলো বের হয়ে এল। একটু ভাল করে তাকাতেই বুঝতে পারলাম যে দুইজন মানুষ বের হয়ে এল সেখান থেকে।
নইরং এসেছে। পেছনে তার বাবা। নইরংয়ের হাতে একটা প্লেট। এক বোতল পানিও দেখতে পেলাম আমি। আমার দিকে তাকিয়ে নইরং বলল, আলো জ্বালেন নি?
-আলো আছে নাকি?
-হ্যা আছে।
এই বলেই সে আমাকে পাশ কাটিয়ে ভেতরে ঢুকে গেল। তারপরই একটা সুইচ টেপার আওয়াজ পেলাম আর সাথে সাথেই আলো জ্বলে উঠল। আমার দিকে তাকিয়ে নইরং বলল, জলদি জলদি খেয়ে নেন। প্লেট ঘরেই রেখে দিয়েন। আমি সকালে এসে নিয়ে যাবনে। আর…
আমি বললাম, আর?
-আর রাইতে বাইরে টাইরে যাইয়েন না। যদি ছোট বাথরুম পায় তখন ঐ পাশ দিয়েই সাইরা ফেলেন!
এই বলে ঘরের পেছনের ঝুল বারান্দায়র দিকে তাকিয়ে দেখাল। আমি সেদিকে তাকালাম। ব্যাপারটা একটু অদ্ভুতই মনে হল আমার। এভাবে ঘরের ভেতর থেকে বাথরুম করতে বলছে। অবশ্য আমি একটা ওয়াশরুমের মত ছোট ঘরে দেখেছি। সেটা এই ঘর থেকে একটু দুরে। যদিও রাতে আমার ঘুম ভাঙ্গে না খুব একটা।
নইরং আর দাঁড়াল না। সে আমাকে রেখে আবার নিজেদের সেই যৌথবাড়ির দিকে চলে গেল। আমার কাছে তার হাটার ধরণ দেখে মনে হল যেন সে এখান থেকে পালিয়ে যাচ্ছে। এখানে সে নিজেকে নিরাপদ মনে করছে না। কেন করছে সেটা আমি নিজেও বুঝতে পারছি না। আমি বুঝতে পারছি না পুরো ব্যাপারটা ঠিকমত।
নইরং চলে যাওয়ার পর আমি আরও কিছু সময় সেখানেই দাঁড়িয়ে রইলাম। সত্যি বলতে কি, কিছু সময়ের ভেতরেই আমার মনের ভেতরে একটা অস্বস্তির দানা বাধতে শুরু করল। আমি এর আগে অনেকবার পাহাড়ে এসেছি। এমনও অনেকবার হয়েছে যে রাতে আমরা কোন পাড়ায় পৌছাতে পারি নি। খোলা আকাশের নিচে স্লিপিংব্যাগ পেতে শুয়েছি। ঝর্ণার পাশে তাবু খাটিয়ে ঘুমিয়েছি। কিন্তু এমন অস্বস্তি কোনবার হয় নি। তাহলে এখন এমন কেন হচ্ছে? আমার মনে হচ্ছে যেন কেউ আমার দিকে তাকিয়ে আছে! আমাকে খেয়াল করছে। আমাকে চোখে চোখে রাখছে। এমন অনুভূতি হওয়ার কারণ আমার জানা নেই তবে হচ্ছে।
আমি আরও কিছু সময় রাতে জেগে রইলাম। তারপর রাতের খাবার খেয়ে শুয়ে পড়লাম।
ঘুমটা ভাঙ্গল কখন টের পেলাম না। মোবাইলটা হাতে নিয়ে সময় দেখা যায় তবে কেন জানি সময় দেখতে ইচ্ছে করল না বরং আমার মনে হল যে আমার এখন বাইরে যাওয়া উচিত। সত্যি বলতে কি এমন একটা অনুভূতি ঠিক কী কারণে আমার মনে জাগল সেটা আমি জানি না। আমি বিছানা থেকে উঠে পড়লাম। বাইরে বের হতেই বাইরে একটা আলো বন্যা চোখ পড়ল। এই আলোটা ঠিক আমার কাছে চাঁদের আলো মনে হল না। আমার কাছে আলোটাকে কেমন যেন একটু অন্য জগতের মনে হল! কেন এমন মনে হল এতা আমার জানা নেই। হয়তো এমন হতে পারে যে আমি এতো সময় ধরে ঘুমিয়ে ছিলাম এই কারণেই আমার কাছে সব কিছু কেমন যেন অস্বাভাবিক লাগছে। তবে ব্যাপারটা টের পেলাম কিছু সময় পরেই। আমি সেটার দিকে কেবল একভাবে তাকিয়ে রইলাম। আমি যেন চোখ সরাতে পারছিলাম না। আমি সেদিকে একভাবে তাকিয়ে রইলাম।
আলোটা আসছে পাড়া থেকে ডান দিকে থেকে। ডাক দিকের রাস্তাটা নেমে গেছে নিচের দিকে। সেই আলোটা পুরো আকাশ জুড়ে ছড়িয়ে আছে। কিন্তু আলোটা আসছে নিচ থেকেই। আমি নিশ্চিত। আমি সেদিকে তাকিয়ে রইলাম কিছু সময় তারপরই ঘর থেকে পা বাড়ালাম। ধীরে ধীরে সেদিকে হাটতে লাগলাম। আমার মনের ভেতরে একটা তীব্র অনুভূতি হতে লাগল। আমার মনে হতে লাগল যে আমাকে এখন এই আলোর উৎস বরাবর যেতেই হবে। আমার জন্য বুঝি সেখানে কেউ অপেক্ষা করছে। সত্যি বলতে কি এই অপেক্ষা করার ব্যাপার আমার মনের ভেতরে কিভাবে এল সেটা আমি জানি না। কিন্তু আমি ঠিক এই ভাবনাটা আমার মনে এল সেটা আমি নিজেও বুঝলাম না। আমি ধীরে পায়ে এগিয়ে যেতে লাগলাম সেই আলোর দিকে। আমি যখন যৌথবাড়ি পেরিয়ে যেতে লাগলাম তখন একটা অনুভব করতে পারলাম যেন কয়েকটা চোখ যেন আমার দিকে তাকিয়ে রয়েছে বেড়ার ফাঁক দিয়ে। আমি সেদিকে অবশ্য মনযোগ দিলাম না। আমার মনযোগ তখন শুধু মাত্র সামনের সেই আলোর দিকে। আমার কেবল মনে হচ্ছিল যে আমার আলোর দিকে যেতে হবেই।
আমি আস্তে আস্তে নামতে লাগলাম পাহাড়ি পথ দিয়ে। এমন রাস্তায় আমি এর আগে অনেক চলেছি, রাতের বেলাতেও আমাকে অনেকবারই ট্রাকিং করতে হয়েছে। তাই আমার হাটতে সমস্যা হচ্ছিল না। আমি যতই নিচে নামতে লাগলাম আমার চোখের সামনে সেই আলোর পরিমানটা আরও বাড়তে শুরু করল।
আমি কত সময় হাটলাম সেটা আমার মনে নেই। তবে এ সময়ে আমাকে থামতে হল। আমি সেই আলোর উৎসকে দেখতে পেলাম। আমি তাকে দেখতে পেলাম! আমি সেই মেয়েটাকে দেখতে পেলাম। কোনো মেয়ে যে এতো সুন্দর হতে পারে সেটা আমার ধারণার বাইরে ছিল। এই মেয়েটাকেই যেন আমি আমার স্বপ্নে দেখে এসেছি এতোদিন। সেই মেয়েটা আমার দিকে তাকিয়ে আছে। তার শরীর থেকে আলোর তীব্র আভা বের হচ্ছে। এই ব্যাপারটা যে অস্বাভাবিক একটা ব্যাপার এটা আমার সাথে কেন জানি অস্বাভাবিক মনে হল না। আমার কাছে মনে হল যে এমনটা হওয়াটাই স্বাভাবিক। আমি তাকিয়ে দেখলাম সেই মেয়েটি আমার দিকে ধীরে পায়ে এগিয়ে আসতে লাগল।
এরপর আসলে কী যে হয়েছিল সেটা আমার মনে নেই। সকালে যখন আমার ঘুম ভাঙ্গল তখন আমি অনুভব করলাম যে আমি আমার সেই ঘরেই শুয়ে আছি। আমি কিছু সময় অবাক হয়ে ভাবার চেষ্টা করলাম যে কী হয়েছে। রাতের বেলা আমি যেটা দেখলাম বা অনুভব করলাম সেটা আমি স্বপ্নে দেখেছি? কিন্তু স্বপ্ন কি এতো বাস্তব হয়? আমি আমার পুরো শরীরে সেই আলোকিত মেয়েটার স্পর্শ যেন অনুভব করতে পারছিলাম।
যখন উঠতে গেলাম তখন আমার শরীরতা একটু যেন ক্লান্ত মনে হল! আমার মনে হল যেন আমি রাতে খুব বড় কোন পরিশ্রম করেছি। ক্লান্তিতে আমার আবারও ঘুম চলে এল।
একেবারে দুপুর বেলা খাবারে ঘুম ভাঙ্গল। নইরংয়ের ডাকে আমার ঘুম ভাঙ্গল। সে খাবার নিয়ে এসেছে। নইরং আমার সাথে খুব বেশি কথা বলল না। আমি চুপচাপ খাওয়া দাওয়া করলাম। তারপর আবারও ঘুমিয়ে পড়লাম।
আবার যখন ঘুম ভাঙ্গল তখন দিনের আলো প্রায় শেষ হয়ে গেছে। আমি ঘরের চৌকাঠে এসে বসেছি। আমার চোখ গেল সেই যৌথবাড়ির দিকে। আমি লক্ষ্য করলাম যে সেই বাড়িতে কেমন যেন একটা আয়োজন শুরু হয়েছে। কোন যেন অনুষ্ঠানের আয়োজন। আমি সেদিকে তাকিয়ে রইলাম কেবল। আমার মনের ভেতরে কিছু একটা পরিবর্তন আসছে। আমি যেন পরিষ্কার ভাবে কিছু চিন্তা করতে পারছি না। বরং আমার মনে হচ্ছে এই ব্যাপার এখানে ঘটাই স্বাভাবিক।
এমন সময়ে আমি দেখতে পেলাম যে পাড়ার বাইরে থেকে একজন পাড়ায় ঢোকার রাস্তায় দিয়ে প্রবেশ করছে। আমাকে দেখতে পেয়েই সে থমকে দাঁড়াল। আমার দিকে কিছু সময় তাকিয়ে রইল অবাক হয়ে। তারপর আমার দিকে এসে বলল, আপনি কে?
আমি বললাম, আমি টুরিস্ট!
তারপরেই সে বলল, রাতে এখানে ছিলেন? একা?
আমি একটু অবাকই হলাম। সে হঠাৎ আমাকে ঠিক এই প্রশ্ন কেন জিজ্ঞেস করল? আমি উত্তরে কেবল মাথা নাড়লাম। সে আর আমাকে কিছুই জিজ্ঞেস করল না। দ্রুত পায়ে সে যৌথ বাড়ির দিকে পা বাড়াল। একটু পরেই আমি সেই যৌথবাড়ি থেকে উত্তপ্ত আওয়াজ শুনতে পেলাম। সে তাদের ভাষায় কিছু একটা বলছে। তার রাগের ব্যাপারটা আমি ঠিকই টের পাচ্ছিলাম। তবে সেটা কিছু সময় থেমে গেল।
রাতের দিকে আবারও একই ভাবে নইরং রাতের খাবার নিয়ে এল। আমি সেই নতুন মানুষটার কথা জিজ্ঞেস করতেই নইরং জানাল যে সে নইরংয়ের বড় ভাই। সে শহরে গিয়েছিল। আমি যখন তার রাগের কারণ জানতে চাইলাম তখন সে বলল, আপনাকে এখানে এনেছি এই কারণে রাগ করেছে। আমাদের এই পাড়াতে বাইরের লোকজন ঠিক আসে না। পাড়ার লোকজনও ঠিকপছন্দ করে না।
নইরং আর বেশি কিছু বলল না। আমার কেন জানি মনে হল যে নইরং যেন আমার কাছ থেকে পালিয়ে বাঁচতে চাচ্ছে। সে দ্রুত এখান থেকে চলে যেতে চায়। আমি খাবারটা ঢেকে রেখে আবারও বারান্দায় এসে বসলাম। আর গত রাতের কথা চিন্তা করলাম। আমি আসলেই কি স্বপ্নে দেখেছি? আজকে সারাটা দিন আমার শরীরে একটা অস্বাভাবিক ক্লান্তি ছিল! এটা কেন ছিল আমি জানি না। পাহাড়ে হাটাচলা করলে শরীরে ক্লান্তি আসে তবে রাতে ঘুমালেই সেটা ঠিক হয়ে যায়। তবে আজকে শরীর যেমন ক্লান্ত ছিল, এমন ভাবে এর আগে কোনদিন হয় নি।
তবে রাতের বেলা আমি দেখা সেই মেয়েটাকে কল্পনা করার চেষ্টা করলাম। স্বপ্নই হোক আর বাস্তব হোক মেয়েটা সত্যিই খুব বেশি সুন্দর ছিল। এমন সুন্দরী মেয়ে আমি এর আগে কোনদিন দেখি নি। আরও ঘন্টা দুয়েক এভাবেই আমি সময় পার করে দিলাম। তারপর যখন মনে হল এবার রাতের খাওয়া দরকার ঠিক সেই সময়ে সেই লোকটা এসে হাজির হল ঘরের দরজায়। আমার দিকে তাকিয়ে পরিষ্কার বাংলায় বলল, কাল রাতে আপনি তাকে দেখেছিলেন, তাই না?
আমি অবাক হয়ে বললাম, কী বলছেন বুঝতে পারছি না।
-ছইমুং দেবী? তাকে দেখেছিলেন, তাই না?
আমি কিছুই বুঝলাম না। বললাম আমি আসলে বুঝতেছি না আপনি কী বলছেন? আমি কাকে দেখব?
একটু যেন বিরক্ত হল সে। আমার দিকে তাকিয়ে বলল, আমি গত দুই তিন ধরেই তো দেখছেন একজনকে! তাই না?
আমি ঠিকই বুঝতে পারছিলাম সে কী বলছে। আমি আসলেই তাকে দেখছি। সেই মেয়েটাই কি দেবী ছইমুং।
লোকটা বলল, আপনি কি বুঝতে পারছেন না যে আপনি ভয়ানক বিপদে পড়েছেন।
-বিপদ? মানে? কী বলছেন?
লোকটা আমার দিকে তাকিয়ে বলল, আপনাকে যে ছইমুং দেবীর ভোগ হিসাবে ব্যবহার করা হয়েছে সেটা বুঝতে পারেন নি? আপনাকে এখানে নিয়ে আসা হয়েছে সেই জন্য। আর দেবী আপনার পিছু নিয়েছে। আপনাকে দেখা দিচ্ছে।
আমি আসলে কী বলব ঠিক বুঝতে পারলাম না। আমার কাছে পুরো ব্যাপারটা হাস্যকর মনে হল। আমাকে কোন দেবীর উদ্দেশ্যে বলি দেওয়া হবে! কিন্তু তখনই ব্যাপারটা আমার কাছে পরিষ্কার হল একটু এই পাহাড় যতই দুর্গম হোক, যদি কোন পর্যটক হারিয়ে যায় তবে তাকে খুজতে ঠিকই লোক আসে। আর্মি আসে। কিন্তু আমি এখানে এসেছি একেবারে লুকিয়ে। মানে হচ্ছে আমার এখানে আসার ব্যাপারে কারো কাছে কোন তথ্য নেই। এবং নইরং এই ব্যাপারটা নিশ্চিত করেছে। আমাকে কোনো আর্মি ক্যাম্পে এন্ট্রি করতে দেয় নি। তার মানে হচ্ছে ওর শুরু থেকেই এই প্লান ছিল।
নইরংয়ের বড় ভাই বলল, রাতের খাবার খান নি তো?
-না এখনো খাই নি।
-চলুন এখন এখান থেকে। ব্যাগ কাধে নিন। আজকে সারারাত চলতে হবে!
-আপনি আমাকে যেতে দিবেন?
-না হলে আসলাম কেন! পাড়ার সবাই এখন মন্ত্র বসেছে। এখনই সময়। দ্রুত চলুন
খুব বেশি গুছানোর কিছু ছিল না কারণ কিছু বেরই করা হয় নি। আমি দ্রুত নইরংয়ের ভাইয়ের পেছন পেছন চলতে লাগলাম। সে রীতিমত দৌড়াচ্ছিল আমি তার সাথে পেড়ে উঠছিলাম না। তবে আমি থামছিলাম। না থামার কারণ হচ্ছে আমি অনুভব করতে পারছিলাম যে কেউ যেন আমার পিছু নিয়েছে, আমাকে ডাকছে।
তবে নইরংয়ের বড় ভাই কিছু একটা মন্ত্র পড়ছিল জোরে জোরে। আমার কেন জানি মনে হতে লাগল যে এই মন্ত্রের কারণে আমার কাছে আসতে পারছিল না।
সকাল পর্যন্ত আমরা থামলাম না।
পরিশিষ্টঃ আমি কিভাবে বান্দরবান শহরে পৌছালাম আমি নিজেই জানি না। আগে যে দুরত্ব আমরা তিনদিনে পার করেছিলাম সেই দুরুত্ব আমরা দেড় দিনে পার করে এলাম। নইরংয়ের বড় ভাই আমাকে খুব বেশি সাহায্য করলেন। যে যখন আমাকে বিদায় দিয়ে চলে যাচ্ছিল আমি তাকে কিছু টাকা দিতে চাইলাম। প্রথমে সে মানা করলেও পরে টাকাটা নিল। সে চলে যাওয়ার আগে আমি তাকে আরেকটা কথা জিজ্ঞেস করলাম।
-আপনি আমাকে কেন এখানে নিয়ে এলেন? মানে আপনার পাড়ার ভাল জন্যই এই কাজটা করছিল ওরা?
আমার প্রশ্ন শুনে সে কিছু সময় তাকিয়ে রইলো। তারপর বলল, যে প্রথা বিলোপ হয়েছিল সেটা যদি আবার চালু হয়ে যায় তবে আবার একই কাজ করা শুরু হবে। আবারও নিয়মিত ভোগ দিতে হবে। আমি এটা চাই না। আর সত্যি বলতে কি আপনাকে দিয়ে আদৌও কাজ হত কিনা সেটা আমি নিশ্চিত না। ভোগ কেবল পাড়ার নিজেস্ব ছেলে মেয়েদেরই দেওয়ার কথা। বুঝতেই পারছেন। আপনি ভোগ হিসাবে কতটা কার্যকর হতেন কে জানে। নিশ্চিত হওয়ার কোন উপায় ছিল না। মাঝ খান দিয়ে শুরু শুধু মারা পড়তেন!
আমি ঢাকার বাসে যখন উঠলাম তখন মনের ভেতরে একটা অস্বস্তি আমার ভেতরে কাজ করছিল। আমার মনে হচ্ছিল যেন সেই সন্দুরীর মেয়েটা দেবী ছইমুং আমাকে দেখছে, আমাকে ডাকছে।

