রিমি মাথা নিচু করে বসে রইলো আরও কিছু সময়। তার বাবার মাথাটাও নিচু হয়ে গেছে। রেহান আবারও রিমির বাবার দিকে তাকিয়ে বলল, আপনি জিজ্ঞেস করেন আমি মিথ্যা বলছি কিনা!
রিমির বাবা কিছুই জিজ্ঞেস করলেন না। কারণ তিনি জানেন যে তার মেয়ে এই অপরাধ করেছে। জামাইয়ের সামনে লজ্জায় তার মাথা কাঁটা যাচ্ছে। রেহান বলল, আমি কখনই ওর কাছে খারাপ ব্যবহার করেছি কিনা ওকে জিজ্ঞেস করেন? ওর গায়ে হাত তুলেছি বা চোখ গরম করেছি কিনা জানতে চান? আমি জানি আমার কিছু ডিজএবিলিটি আছে। সেটার জন্য আমাকে সে ছেড়ে চলে যেতেই পারে। সেটার জন্য প্রক্রিয়া আছে। কিন্তু ও যেটা করেছে সেটা তো গ্রহনযোগ্য?
রুমের ভেতরে কিছু সময় নিরবতা বিরাজ করল। রেহান আবার বলল, ও যদি ডিভোর্স চায় আমি সেটা দিয়ে দিব। কোন আপত্তি নেই। তবে আমার কাছ থেকে কোন এলুমনি পাওয়া আশা করবেন না। শান্তিপূর্ণ ভাবে ডিভোর্স হয়ে যাবে। তবে যদি অন্যথায় হয় তবে আমি অবশ্যই জাজের সামনে বলব যে এই বাচ্চা কার? এবং আপনার মেয়ে কী করেছে।
রিমিও জানত যে ব্যাপারটা অবশ্য এই দিকেই যাবে। এটা ছাড়া আর কোন সমাধান নেই ওদের সামনে। ওদেরকে আলাদা হয়ে যেতে হবে। এটা ছাড়া আর কোন সমাধান ওদের হাতে নেই। কিন্তু রিমি জানে যে রেহানের কাছ থেকে আলাদা হয়ে গেলে ওর জীবনটা একে দুর্বিসহ হয়ে উঠবে। আমাদের সমাজে এমনিতেই মেয়েদের ডিভোর্সকে ভালো চোখে দেখা হয় না, আর সেখানে সেতো করেছে পরকিয়া এবং এই পরকীয়ার আবার প্রমান রয়েছে। রিমির গর্ভে এখন তার প্রেমিকের বাচ্চা।
রিমি আর রেহানের সংসারটা চমৎকার ভাবেই শুরু হয়েছিল। পারিবারিক ভাবে বিয়েটা হলেও রিমি বিয়ের কয়েক দিন পরেই বুঝতে পারে যে রেহান ছেলে হিসাবে খুবই ভাল। নম্র ভদ্র এবং কেয়ারিং। ভাল চাকরি করে। একটা মেয়ের জীবনে যেমন স্বামীর স্বপ্ন থাকে রেহান ঠিক তেমনই। দুইটা বছর কিভাবে পার হয়ে গেল রিমি টেরই পায় নি। কিন্তু রেহান একেবারে নিখুঁত ছিল না। যখন তারা বাচ্চা নেওয়ার চেষ্টা করল তখন ব্যাপারতা সামনে এল। রেহানের স্পার্মের পরিমান কম। রিমি বাচ্চা কন্সিভ করতে পারছিল না। ব্যাপারটা দুইজনের জন্যই একটা ধাক্কা ছিল।
তারপর থেকে ওদের সম্পর্কে কিছুটা ফাটল ধরে। তবে রেহান আগের মতই ছিল। ওকে ভালবাসত কিংবা ভালোবাসার চেষ্টা চালিয়ে যেতে লাগল। রিমি কিছুটা বদলে গিয়েছিল যেন। মনে মনে সে রেহানকে আগের মত করে আর ভালোবাসতে পারছিল না। তারপরেই সে সজিবের দিকে ঝুকে পড়ে। সজিবকে সে অনেক দিন ধরেই চিনত। সেই বিশ্ববিদ্যালয় জীবন থেকে। এক সময় সজিব ওকে বেশ পছন্দ করত। তবে সজিব সারা জীবনই একটু ভ্যাগাবন্ড টাইপের ছেলে। দায়িত্ব নেওয়ার ছেলে না। তাই রিমি তাকে পাত্তা দেয় নি। কিন্তু এখন কেন জানি সজিবের দিকে সে ঝুকে পড়েছিল।
সম্পর্কটা বিছানা পর্যন্ত যেতে সময় লাগে নি। তারপর যা হবার তাই হল। একদিন রেহানের কাছে ধরাও পরে গেল। সেদিনও রেহান রিমির সাথে খারাপ ব্যবহার করে নি। রিমি তারপর চলে এসেছিল বাবার বাসায়। বাবার বাসায় আসার সপ্তাহ খানেক পরেই রিমি ব্যাপারটা টের পায়। ওর মাথা ঘুরে উঠেছিল। ডাক্তার ডেকে এনেছিল ওর বাবা। সেখানেই জানা যায় যে রিমি প্রেগনেন্ট। রিমির বাসায় তখনও কেউ জানে না কিছু। তারা তো ভেবেছিল যে এই বাচ্চা রেহানের। খুশির একটা বন্যা বয়ে গিয়েছিল তবে সেটা কাটতে সময় লাগে নি যখন রিমির বাবা রেহানকে বাচ্চার সংবাদটা জানিয়েছিল। রেহান আসল সংবাদটা যখন রিমির বাবাকে জানাল তখন তিনি যেন আকাশ থেকে পড়লেন। তার নিজের মেয়ে এমন একটা কাজ যে করতে পারে সেটা তার ধারণার বাইরে ছিল।
রিমির কাছে যখন সত্যটা জানতে চাইলেন তখন তখন রিমি সত্যটা অস্বীকার করতে পারে নি। একটা রামচড় এসে পড়ল গালে। তারপর আরও দুইটা চড় মারলেন তিনি রিমিকে। ঘাড় ধরে বাসা থেকে বের করে দিতে চাইলেন।
রিমি ভেবেছিল যে সজিব বাচ্চার কথা শুনলে বুঝি আর দুরে থাকতে পারবে না। কিন্তু রিমির সেই ধারণা একেবারে ভুল প্রমাণিত হল। বাচ্চার কথা শুনে সজিব একেবারে হাত গুটিয়ে নিল। সে পরিষ্কার ভাবেই জানিয়ে দিল যে বাচ্চার দায়িত্ব নেওয়া কিংবা এখনই বিয়ে করা তার পক্ষে কোনো ভাবেই সম্ভব না।
রিমি হঠাৎ করেই উপলব্ধি করতে পারল যে তার আসলে যাওয়ার কোনো জায়গা নেই। নিজেকে বড় অসহায় মনে হল তার। অবশ্য এর জন্য সে নিজেই দায়ী। সে যদি সজিবের দিকে পা না বাড়াত তবে এই দিন তাকে দেখতে হত না। অন্যায় কাজটা না করলে আজকে এভাবে পথের মাঝে তাকে ছেড়ে সবাই চলে যেত না। হয়তো তার বাবা তাকে বাসা থেকে বের করে দিবেন না তবে সে তার বাবার চোখে পুরো পরিবারের চোখে একেবারে নিচে নেমে গেছে। এখান থেকে আর কোনো দিন সে উঠতে পারবে না।
আজকে রিমির বাবা রেহানকে ডেকেছিল একটা সমাধানের জন্য। রেহান এসে চুপচাপ কথাগুলো বলল। রিমির বাবাও জানতো রেহান এমন কিছুই বলবে। কিন্তু তারপরেই রেহান সেটা বলল সেটা শোনার অনেকটাই অপ্রত্যাশিত ছিল। রেহান বলল, আমি এখনও ওর সাথে সংসার করতে চাই। তবে এই বাচ্চা রাখা যাবে না। ও যদি বাচ্চা ফেলে দিয়ে আমার কাছে আসতে চায় তবে আগে যা হয়েছে সেটা আমি ভুলে যাব।
এরপরে আর কিছু বলা দরকার হল না। রিমির বাবা এক লাফে উঠে বললে, সত্যি বলছ বাবা!
-হ্যা।
-তাহলে তাই হবে। রিমি এটাই করবে।
রিমিও খানিকটা অবাকই হয়েছিল। রেহান যে তার সাথে সংসার করতে চাইবে এটা সে ভাবে নি।
কিন্তু ঝামেলাটা বাধল বাচ্চা এবোরশনের সময়ে। শারীরিক কারণে বাচ্চাটাকে নষ্ট করা গেল না। আর ইতিমধ্যে তিন মাস পার হয়ে গেছে। এই সময়ে বাচ্চা ফেলা যাবে না। আর যতই পরকীয়ার ফল হোক না কেন রিমির নিজের বাচ্চা তো! একটা মায়া জন্মে গেল বাচ্চাটার উপর। রিমি আর বাচ্চাটাকে নষ্ট করতে দিল না। ওর বাবার শত রাগারাগির পরেও রিমি রাজি হল না। সেদিনের পর রেহান অবশ্য আর এল না ওদের বাসায়।
দেখতে দেখতে রিমির বাচ্চা ডেলিভারির সময়ে চলে এল।
দুই
-কেন ফোন দিয়েছো?
রিমি প্রথমে কী বলবে সেট খুজে পেল না। আসলেই সে কেন ফোন দিয়েছে সেটা রিমি জানে না। কিন্তু রিমির কেন জানি মনে হয়েছে এই কথাগুলো রেহানকে না বললে হয়তো শান্তি পাবে না। প্রেগনেন্সির সময়ে মেয়েদের মন এমনিতেই নরম থাকে। আর রিমির করা অন্যায়ের কারণে রিমি মানসিক ভাবে বেশ ভেঙ্গে পড়েছিল। রিমি বলল, তোমার কাছে আমি ক্ষমা চাই নি এখনো।
-এসব চেয়ে লাভ কী বল?
-জানি লাভ নেই। আমি যদি ঐ অন্যায় না করতাম তাহলে হয়তো আমাদের জীবনটা অন্য রকম হত। এমন কি আলাদা হয়ে গেলেও এমন হত না। তাই না?
-হ্যা। অন্যায়ের ফল কোন দিন ভাল হয় না।
-সেটা আমি বুঝতে পারছি। একটা অনুরোধ করব?
-কী অনুরোধ?
রিমি একটা দম নিল। তারপর বলল, আমি যদি মারা যাই আর বাচ্চাটা যদি বেঁচে থাকে, তবে বাচ্চাটাকে একটু দেখা শোনা করবে?
ওপাশ থেকে কোন কথা শোনা গেল না কিছু সময়। রেহান তারপর বলল, তুমি অসম্ভব কথা বলছ, এটা তুমি জানো?
-জানি। তবুও। ওর কেউ থাকবে না। আমি বলছি না যে নিজের কাছে রেখে বড় কর, এতিম খানাতে দিয়ে দিও। একটু মাঝে মধ্যে গিয়ে দেখো। সেতো আমারও একটু অংশ। আমাকে যেটুকু ভাল বাসো বা বাসতে সেই ভালোবাসার একটু খানি দিও ওকে। প্লিজ। আর কেউ থাকবে না তুমি ছাড়া ওর!
রেহান কোন কথা বলল না। ওর কাজ আছে বলে ফোনটা কেটে দিল। কিন্তু রিমির কেন জানি মনে হল রেহান ঠিক ঠিক দেখে রাখবে। রিমির মনটা আসলেই দূর্বল হয়ে গিয়েছিল। সে ধরেই নিয়েছিল যে মারা যাবে সে। এমনটা অবশ্য সব মেয়েদেরই মনে হয়। রিমির ক্ষেত্রে এই অনুভূতিতা ছিল আরও প্রবল। তাই নিজের অনাগত সন্তানের একটা গতি করার ইচ্ছে ছিল। এখন রিমির মনে একটা শান্তি বিরাজ করছে।
হাসপাতালে কেবল রিমির মা এসেছিল সাথে। আর কেউ আসে নি। ওটিতে ঢোকার সময়েও আর কাউকে দেখতে পায় নি। এই সময়টা প্রতিটা মেয়ের স্বপ্ন থাকে যে কাছের মানুষগুলো তাদের ঘিরে থাকবে কিন্তু রিমির কপালে সেই সব ছিল না। তীব্র এক কান্না আসতে লাগল তার।
তিন
রিমি যখন চোখ মেলে তাকাল তখন বেডের কাছেই তার মাকে দেখতে পেল। একটু দুরে তার বাবাকেও দেখতে পেল। কিন্তু একটু ঘার কাত করতেই তীব্র বিস্ময় নিয়ে দেখতে পেল ঘরে আরেকজন মানুষ রয়েছে।
রেহান।
সে ঝুকে কিছু একটা দেখছে।
কী দেখছে সেতা বুঝতে রিমির কষ্ট হল না। রেহান তার বাচ্চাটাকে দেখছে। রেহান যে আসবে সেটা ভাবতেও পারে নি । আপনা আপনি চোখ দিয়ে পানি বের হয়ে এল। রেহান বাচ্চার উপর থেকে মুখ তুলে তাকাল রিমির দিকে। তারপর বসল ওর পাশের। রিমিকে কাঁদতে দেখে ওর মাথায় হাত বুলিয়ে বলল, বাচ্চা ভাল আছে। চিন্তা কর না।
এতে যেন রিমির কান্নার বেগ আরও বাড়ল।
এরপর ঘটনা ঘটতে লাগল আরো দ্রুত। হাসপাতাল থেকে রিলিজ দেওয়ার পরে রিমি অবাক হয়ে দেখল যে রেহান তাকে নিজের বাসায় নিয়ে গেল। রেহানের মা এল গ্রাম থেকে দেখাশোনার জন্য। রিমির সাথে সব কিছু যেন স্বপ্ন মনে হচ্ছিল। রেহান তার বাসায় আসল সত্যটা বলে নি। রেহানের মা ধরেই নিয়েছে সে এটা তারই নাতনি। রিমির মধ্যে একটা তীব্র অপরাধ বোধ জাগ্রত হয়। রেহান বা তার পরিবার যখনই তার মেয়ের দেখাশোনা করে আদর করে তখন তার নিজেকে খুব ছোট মনে হয়।
মেয়েটার নাম রাখা হল মাহি। রেহানই নামটা রেখেছিল। রিমি নিজ থেকে কিছুই করে নি। মাহির প্রতি রেহানের এই ভালোবাসা দেখতে তার ভাল লাগছিল। মাঝে মাঝে সব কিছুই তার কাছে কেন জানি স্বপ্নের মত মনে হত। এতো বড় অপরাধ করার পরেও রেহান তাকে মাফ করে দিয়েছে। কেবল মাফই করে নি, একই সাথে মাহিকে আপন করে নিয়েছে। এটা রিমির কাছে অবিশ্বাস্য মনে হয়!
একদিন রাতে রিমি ঘুম ভেঙ্গে দেখল রেহান মাহিকে কোলে নিয়ে ঘরের ভেতরে পায়চারি করছে। চাঁদের আলো জানালা দিয়ে ঢুকে পড়েছে ঘরে। রেহানের মুখের দিকে তাকিয়ে রিমি বুঝতে পারল — এই মানুষটা সত্যিই ভালোবেসে ফেলেছে বাচ্চাটাকে। কোনো অভিনয় নয়।
রিমি উঠে বসল। রেহান ফিরে তাকাল। বলল, ঘুমাওনি?
-না।
কিছুক্ষণ চুপ থেকে রিমি বলল, তুমি কেন এটা করছ রেহান?
রেহান জানালার দিকে তাকিয়ে রইল একটু। তারপর আস্তে বলল, জানি না। হয়তো কারণ ওর কোনো দোষ নেই।
রিমির গলা ভেঙে এল। বলল, আমার দোষ আছে।
-আছে।
-তাহলে?
রেহান মাহিকে একটু বুকের কাছে টেনে নিল। বলল, তোমার দোষ দিয়ে তো এই বাচ্চাটাকে বিচার করা যায় না।
রিমি আর কথা বলতে পারল না।
রেহান বলল, ওকে জড়িয়ে ধরার সময়ে আমার বারবার মনে হয় যে এমন কেউ আমাদের হয়তো হতে পারত। কিন্তু হয় নি, সম্ভব না। কিন্তু দেখ তারপরেও আমি মাহিকে ঠিক ঠিক জড়িয়ে ধরেই আছি। আর জগতে সবাই সবার প্রাপ্য ফল পেয়েই যায়।
চার
রিমির মাঝে মাঝে মনে হত যে সজিব হয়তো কোনোদিন ফিরে আসতে পারে। অবশ্য সজিব বলেছিল বাচ্চাটাকে ফেলে দিতে। তারপর থেকে সজিবের আর কোন দেখা নেই। সে কোথায় গেছে কেউ জানে না। হয়তো সে জানে যে রিমি বাচ্চাটা নষ্ট করে নি আবারহয়তো জানে না। জানলে হয়তো মেয়েটার মুখ একবার দেখতে চাইবে। কিন্তু সজিবের কোন খোজ কেউ জানে না। পরিচিত অনেকের কাছেই সে জানতে চেয়েছে। কেউ বলতে পারে নি। ওরা কেবল বলেছিল যে চাকরি নিয়ে নাকি সজিব খুলনার দিকে চলে গেছে। তারপর থেকে আর কারো খোজ নেই।
রিমি ভেবেই নিল যে সজিব ভয় পেয়ে পালিয়েছে। সজিব সেরকমই মানুষ। দায়িত্ব থেকে পালানো তার পুরনো অভ্যাস।
কিন্তু মাসের পর মাস গেল। কোনো খবর নেই। রিমি তাই একসময় খোঁজা ছেড়ে দিল। তাকে মনে রাখার আর কোন দরকার নেই। যদি কোন দিন সে নিজের মেয়ের দাবি নিয়ে আসে সেদিন দেখা যাবে।
রেহানের বাসায় দিনগুলো অদ্ভুত এক নিয়মে চলছিল। রেহান মাহিকে আপন করে নিয়েছিল। রাতে ঘুম না হলে কোলে নিয়ে পায়চারি করত। রিমি দূর থেকে দেখত আর নিজেকে ছোট মনে হত। রিমি কাছে যেতে দ্বিধাবোধ করত।
একদিন রাতে রিমির ঘুম ভাঙল। পাশের ঘরে রেহান নেই। মাহিও নেই। একটু ঘাবড়ে উঠল। তারপর দেখল বেলকুনিতে চেয়ার পেতে রেহান বসে আছে মাহিকে কোলে নিয়ে। বাইরে তাকিয়ে আছে চাঁদের দিকে। দৃশ্যটা রিমির বেশ ভাল লাগল।
রিমি ডাকল, ঘুমাওনি?
রেহান ফিরে তাকাল। মুখে একটু হাসি এনে বলল, মাহি উঠেছিল।
রিমি এগিয়ে গেল দুজনের দিকে। তারপর রেহানের পাশের বসল। চুপচাপ বসে রইলো কিছু সময়। এমন সময়ে হঠাৎ রেহান প্রশ্নটা করল। বলল, যদি কোনদিন মাহির বাবা ফিরে আসে কী করবে তুমি? ওকে যদি নিয়ে যেতে চায়?
প্রশ্নটা এমন আকস্মিক ছিল যে রিমি বুঝতেই পারলো না কী জবাব দিবে। অনেক সময় চুপ করে থেকে বলল, শুধু কী স্পার্ম দিলেই বাবা হওয়া যায়? বাবা হতে পরিশ্রম লাগে, দায়িত্ব লাগে! মাহি ওর বাবার কোলেই আছে!
জবাবটা শুনে রেহান যেন একটু সন্তুষ্ট হল। সে চাঁদের দিকে তাকিয়ে বলল, ভয় নেই । কোন স্পার্ম ডোনারকে কোন দিন আমি ওর আশে পাসে আসতে দিব না।
রেহানের কন্ঠের দৃঢ়টা দেখে রিমির মনে এক অদ্ভুত অনুভূতি হল। কেন হল সেটা রিমি নিজেও জানে না। অবশ্য সেটা নিয়ে খুব বেশি ভাবল না সে।
পাঁচ
সেদিন বিকেলে রিমির পুরনো বিশ্ববিদ্যালয়ের বান্ধবী তানিয়া ফোন করল। কথায় কথায় তানিয়া একটু থেমে বলল, তুই কি জানিস সজিবের কথা?
রিমির বুকটা একটু নড়ে উঠল। বলল, না। কী হয়েছে?
-ওকে পাওয়া গেছে।
রিমির দমটা আবারও বন্ধ হয়ে এল। নিজেকে শান্ত রেখে সে জানতে চাইলো, কোথায়?
তানিয়া একটু চুপ করে রইল। তারপর আস্তে বলল, বুড়িগঙ্গার ধারে একটা পরিত্যক্ত গুদামঘরে। মাসখানেক আগে। কিন্তু পুলিশ এখনও খোজ খবর করছে। খবরে আসেনি তেমন। দেশের পরিস্থিতি তো দেখছিই। আন্দোলনের পর আইন শৃঙ্খলার অবস্থা যেমন নাজুক হয়ে আছে।
রিমিও জানে। সরকার পতনের পর কত যে খুন হয়েছে তার কোন হিসাব নেই।
রিমির গলা শুকিয়ে গেল। বলল, কিছু জানা গেছে?
-তেমন কিছুই না। তবে যেভাবে পাওয়া গেছে… পুলিশ বলছে এটা পরিকল্পিত। কেউ অনেক সময় নিয়ে কাজটা করেছে। রাগের বশে না, ঠান্ডা মাথায়। এবং খুনটা করার সময়ে সজিবকে বেশ টর্চার করা হয়েছে। সব চেয়ে ভয়ংকর ব্যাপার হচ্ছে…
তানিয়া একটু সময় চুপ করে রইলো। রিমি বলল, কী?
-সজিবের পুরুষাঙ্গ মিসিং। কেউ ওটা কেনে নিয়েছে!
রিমির হাত থেকে ফোনটা প্রায় পড়েই যাচ্ছিল।
তানিয়া আরও বলল, পুলিশ নাকি কোনো সূত্রই পাচ্ছে না। একেবারে সাফ। অবশ্য পুলিশের এতো ঠেকাও নেই। ওরা সজিবের মত কারো পেছনে এতো সময় নষ্ট করছে বলে মনে হয় না।
ফোন রাখার পরে রিমি অনেকক্ষণ স্থির হয়ে বসে রইল। বেলকুনি থেকে ঘরে ঢুকে দেখল রেহানের দিকে।
রেহান তখন মাহিকে কোলে নিয়ে শুয়ে আছে। একদম শান্ত। একদম স্বাভাবিক।
অথচ সেই শান্ত মুখের দিকে তাকিয়ে রিমির বুকের ভেতরে হঠাৎ একটা ঠান্ডা স্রোত বয়ে গেল। কোন কারণ নেই এমনটা ভাবার তারপরেও রিমির মনে একটা তীব্র ভাবনা এসে হাজির হয়েছে। এই ভাবনাটাকে সে কিছুতেই মন থেকে দূর করতে পারল না। রেহানের একটা কথা তার মনের ভেতরে ঘুরপাক খেতে লাগল। সবাই তার প্রাপ্য ফল ঠিক ঠিক পেয়েই যায়!

