5
(30)

সায়েরা আপাকে এখানে দেখতে পাবো ভাবি নি । শেষ কবে দেখেছিলাম মনেও নেই ঠিক । শুনেছিলাম সে লন্ডন চলে গিয়েছিলো । কবে ফিরে এল কে জানে !
আমাকে দেখেই সায়েরা আপা বলল, আরে ফয়সাল যে । এখানে ?
তার চোখে কৌতুহল ! আমি নিনার দিকে তাকালাম । নিনা খানিকটা অপ্রস্তুত হয়ে গেছে । ও আসলে বুঝতে পারে নি যে এই ক্লিনিকের ডাক্তার আমার পরিচিত হবে । আমিও যে খানিকটা অপ্রস্তুত হয়ে যাই নি সেটা না । আমি খুব ভাল করেই জানি যে আমি যখন এখানে আসার কারণটা সায়েরা আপাকে বলব তখন সে আমার দিকে ভুরু কুচকে তাকাবে । আর ভাববে আমার ভেতরে সমস্যা আছে ! আর এমনটা ভাবলে তাকে খুব একটা দোষও দেওয়া যায় না !

নিনা সম্পর্কে আমার বন্ধু হয় । অনেক দিন ধরে ওকে চিনি । আজকে সকালে ফোন দিয়ে জানালো যে সে প্রেগনেন্ট । কিন্তু এই বাচ্চা সে মোটেই রাখবে না । এখন সে কোন ভাবেই মা হতে প্রস্তুত না । নিনার জামাই এই কথা জানে না । এবং সে তাকে জানাতেও চায় না । একা একা ক্লিনিকে যেতে তার কেমন যেন লাগছে । তাই বন্ধু হিসাবে আমাকে যেতে হবে !

আমি খুব ভাল করে জানি যে ও আসলে আমাকে স্বামী সাজিয়ে নিয়ে যেতে চাচ্ছে । প্রথমে একটু গাইগুই করছিলাম । কিন্তু শেষে রাজি হতে হল । আমার পুরো জীবনে নিনা আমাকে অনেক বার বিপদ থেকে উদ্ধার করেছে । ওর এই উপকার টুকু আমি করতেই পারি । নিনা আমাকে বলল যে আমাকে কিছু করতে হবে না । কেবল আমি সাথে গেলেই চলবে । বাকি সব ব্যবস্থা সে করেই রেখেছে । আমি তাই আজকে সাথে এসেছি । এসেই পড়লাম বিপদে । সায়েরা আপাকে এখানে দেখতে পেলাম ।

সায়েরা আপা অবশ্য আমাকে আর নিনাকে খুব বেশি বিব্রত করলেন না । অহেতুক প্রশ্ন করলেন না । নিনাকে নিয়ে গেলেন ভেতরে ।

সকল কাজ শেষ করে নিনাকে নিয়ে যখন বের হয়ে যাবো তখন সায়েরা আপা বললেন, ফয়সাল, তোমার সাথে আমার একটু কথা ছিল । এখন না হলে কাল পরশু একটু এসো তো আমার কাছে । কেমন !
আমি মাথা কাঁত করে জি আচ্ছা বলে বের হয়ে এলাম ।

পরের সপ্তাহে আবার গিয়ে হাজির হলাম সায়েরা আপার ক্লিনিকে । নানান কথা বার্তা হল । আগে যখন আমরা যশোর ছিলাম, সায়েরা আমাদের পাশের বাসায় থাকতো । আমার থেকে চার বছরের সিনিয়র ছিল । ভাল ছাত্রী হিসাবে তখন থেকেই তার নাম ডাক ছিল বেশ । তাই মা বলতো তার কাছে গিয়ে যেন পড়া দেখে নিই । সেখান থেকেই আপার সাথে ভাল পরিচয় হয়েছিলো । আমাকে ছোট ভাইয়ের মত আদর করতো । পরে আপার বাবা বদলি হয়ে গেলে যোগাযোগ টা কমে যায়। ঢাকাতে এসে আবার যোগাযোগ হলেও দুরত্ব আর কমে নি ।

এক সময় সায়েরা আপা বললেন, শিমুলের সাথে যোগাযোগ আছে কি?
আমি একটু অপ্রস্তুত হয়ে গেলাম । আসলে শেষবার যখন আপার কাছে এসেছিলাম তখন শিমুল আমার সাথে ছিল । ওর জন্যই আসা । শিমুল তখন আমার প্রেমিকা ছিল । একই সাথে কাজ করতাম আমরা । দুজনের ভেতরে সম্পর্কটা বেশ গাঢ় ছিল । ওকে বিয়ে করার একটা পরিকল্পনা ছিল আরও একটু গুছিয়ে নিয়ে । একদিন হঠাৎ শিমুল এসে বলল যে সে প্রেগনেন্ট । আমি সত্যি বলতে কি তখন বাচ্চার নেওয়া কিংবা বিয়ের কথা ভাবছিলাম না । ওকে বোঝালাম যে চাকরিটা সবে মাত্র শুরু হয়েছে । এখনই বিয়ে কিংবা বাচ্চার দিকে আমি যেতে চাই না । দুতিন বছর পার করে বিয়ে করবো । শিমুলকেই বিয়ে করবো তবে এখন না । ও চুপচাপ শুনলো । এবং সব কথা মেনে নিল । ঠিক হল আমরা বাচ্চা এবোর্ট করে ফেলবো । তখন এই সায়েরা আপার কাছেই এলাম । সব কিছু উনিই সামাল দিলেন ।
আমি বললাম, আসলে আপা, ঐ ঘটনার পরে শিমুল কেমন জানি হয়ে গিয়েছিলো । আমার সাথে যোগাযোগ কমিয়ে দিতে দিতে একেবারে বন্ধ করে দিল । তারপর চাকরিটাও ছেড়ে দিলো ।
-এখন আর যোগাযোগ নেই?
-না । আমি তখন অনেক চেষ্টা করেছিলাম যোগাযোগ করতে । ও রাজি হয় নি ।

সায়েরা আপা কিছু সময় কি যেন ভাবলেন । তারপর বললেন, তোমার কাছ থেকে একটা কথা আসলে আমি লুকিয়েছি ।
-কি কথা ?
একটা জোরে দম নিলেন আপা । তারপর বললেন, ঐদিন শিমুল বাচ্চাটা নষ্ট করতে দেয় নি । এমন ভাবে কাঁদছিলো যে আমি পারি নি । ও…
-মানে !

আমার পুরো মাথার ভেতরে যেন শক খেল । আমি ঠিক শুনলাম তো ! বাচ্চা এবোর্শন করে নি । তার মানে বাচ্চাটা রয়ে গেছে । আমি অনুভব করলাম আমি ঠিকঠাক মত ভাবতে পারছি না । কোন মতে বললাম, তার মানে….।
-হ্যা বাচ্চাটা রয়ে গেছে । চেকাপের জন্য শিমুল আরেকবার আমার কাছে এসেছিলো । তখনও বাচ্চা আর শিমুল ভালই ছিল । তারপরই তো আমি চলে গেলাম বাইরে !

আমি আর কিছু ভাবতে পারলাম না । সায়েরা আপা বললেন, শিমুল আমাকে অনুরোধ করেছিলো আমি যেন ব্যাপারটা তোমাকে না বলি ! কিন্তু একটা সময়ে আমার মনে হল তোমার ব্যাপারটা জানা দরকার !

আমি উঠে দাড়ালাম । আমার মাথায় তখন আর কিছু কাজ করছে না । বারবার মনে হচ্ছে কি করেছি আমি ! শিমুল কী তীব্র ভাবে চেয়েছিল । আমি তো ওকে ভালোবাসতাম তাহলে কেন বুঝতে পারি নি । কি হত দুজন মিলে যদি বাচ্চাটা রাখার সিদ্ধান্ত নিতাম । আমি নিতে পারি নি কিন্তু শিমুল নিয়েছে । আজকে প্রায় চার বছর শিমুলের দেখা নেই । তার মানে বাচ্চাটার বয়স নিশ্চয়ই তিন সাড়ে তিন বছর । আমার কেবল মনে হল যে যেকোন ভাবেই শিমুলকে খুজে বের করতে হবে ।

অফিসে গিয়ে ঠিকানা জোগার করলাম । আমি জানতাম ওর বাসা মাগুরা সদর থানাতে । কিন্তু বাড়ির ঠিকানা জানতাম না । এখন ওর হোম টাউনে শিমুলকে পেলেই হয় ! অবশ্য না পেলে ওর বাবার কাছ থেকে তো নেওয়া যাবে । ওর বাবা স্থানীয় একটা স্কুলের হেড মাস্টার ছিল, এই টুকু আমার মনে আছে !

পরদিন খুব ভোরে রওয়ানা দিলাম । বাড়ির যে ঠিকানা ছিল সেখানে গিয়ে দেখি সেখানে ওরা নেই । আমি হতাশায় এদিক ওদিক তাকাতে লাগলাম । যখন মনে হল যে আর খোজ পাবো না তখনই ভাগ্য মুখ ফিরে তাকালো । একটা মুদির দোকানদারের কাছ থেকে জনাতে পারলাম যে মাস্টার সাহেব ভাড়া বাড়ি ছেড়ে নিজেদের বাড়িতে উঠেছে । তিনি যদিও বাড়ির ঠিকানা দিতে পারলেন না । তবে স্কুলের ঠিকানা দিয়ে দিলেন । স্কুল তখনও ছুটি হয় নি । সেখানে গেলে মাস্টার সাহেব কে পাওয়া যাবে আশা করি ।

স্কুল খুজে পেতে সমস্যা হল না । গেট ভেতরে প্রবেশ করলাম । সবে মাত্র টিফিন শেষ হয়েছে । নতুন ভাবে ক্লাস শুরু হয়েছে । দারোয়ানকে হেড মাস্টারের রুমটা কথা জিজ্ঞেস করতেই সে দেখিয়ে দিল। আমার পরনের পোশাকের কারণে আর কোন কথা জানতে চাইলো না । আমি স্কুলের বারান্দা দিয়ে হাটতে শুরু করলাম । একেবারে শেষ মাথায় হেড স্যারের রুম । আমি এখনও জানি না যে তাকে আমি কি বলবো ! কিভাবে বলব!
একেকটা ক্লাস পার হচ্ছি আর ভেতরে চোখ যাচ্ছে । বাচ্চাদের পড়াচ্ছেন স্যার কিংবা ম্যাডাম । একটা ক্লাস রুম পার হতেই আমি থমকে দাড়ালাম ! তারপর আবারও দরজার সামনে এসে দাড়ালাম । ভেতরে চশমা আর শাড়ি পরে একজন শিক্ষিকা পড়াচ্ছেন বই হাতে নিয়ে । আমাকে দেখে সেই থমকে গেল !

শিমুল ! প্রায় চার বছর পরে দেখছি ।
আগে শিমুলের চেহারার ভেতরে একটা কিশোরী কিশোরী ভাব ছিল । এখন সেটা নেই । বরং তার বদলে একটা নারীত্ব ভাব ফুটে উঠেছে । আমার দিকে একভাবে তাকিয়ে রইলো কিছু সময় । তারপর বাচ্চাদের উদ্দেশ্য বলল, তোমরা এই গল্পটা পড় আমি আসছি ।

আমার সামনে এসে দাড়ালো ও । তারপর বলল, তুমি এখানে?
আমি বলল, তুমি আমাকে কেন বল নি ? কেন বল নি ?

শিমুল কিছু সময় যেন বিভ্রান্ত হল । কিন্তু পরমুহুর্তেই বুঝে গেল আমি কি বুঝাতে চাইছি । বলল, এসব কথা পরে হবে ।
-না এখনই হবে । আমি জানি আমি গাধা ছিলাম । কিন্তু তুমি তো মনের কথাটা আমাকে একবার বলতে পারতে ! একবার ! তুমি তো আমাকে চিনতে নাকি ! আমি কতখানি ইম্ম্যাচিউর ছিলাম তখন !
শিমুল বলল, এসব কথা এখন না বলি ! ক্লাসের পরে বলি !
-বাবু ছেলে না মেয়ে ?

শিমুল বলল, তুমি নিজেই দেখে নাও । এসো আমার সাথে !
এই বলে আমাকে নিয়ে ও হাটতে শুরু করলো । ক্লাস রুম পার করে একটা স্টাফ রুম । তার পরেই দেখলাম একটা ছোট রুম । বাচ্চাদের খেলার জন্য । সেখানে চারটা বাচ্চা আপন মনে দেলছে । একজন মহিলা বসে আছে একটু দুরে । আমারা দরজার কাছে আসতেই দেখলাম একটা বাচ্চা মুখ তুলে তাকালো । তারপর খেলা ছেড়ে দৌড়ে এল আমাদের দিকে । আমাকে বলে দিতে হল না যে এটাই আমার মেয়ে ! আমি কেবল অপলক চোখে মেয়েটার দিকে তাকিয়ে রইলাম । কখন যে আপনা আপনি চোখ দিয়ে পানি বের হয়ে এল সেটা আমি নিজেও জানি না ।

স্কুল ছুটি হলে আমি শিমুলের সাথেই ওদের বাসায় গিয়ে হাজির হলাম । শিমুলের বাবা আমাকে দেখে মোটেও খুশি হন নি সেটা তার চেহারা দেখেই আমি পরিস্কার বুঝলাম । তবে তিনি কিছু বললেন না আমাকে ।

সন্ধ্যার সময় শিমুল আমাকে সব কিছু খুলে বলল। এই এলাকায় সবাই জানে শিমুলের জামাই বিদেশ থাকে । মেয়ে তাই এখন এখানে থাকে । যখন ঢাকাতে ছিল শিমুল তখন বিয়ে করেছিলো । জামাই বাইরে গিয়েছে পড়তে । আসল সত্যটা কেবল শিমুলের বাবা মা জানতেন । সত্য জানার পরেও সে মেয়েকে দুরে ঠেলে দেন নি । তাহলে হয়তো শিমুলের জন্য বেঁচে থাকাটা কঠিন হয়ে যেত ।
শিমুল বলল, তোমার উপর আমি রাগ করি নি ফয়সাল । সত্যি বলছি । কারণ যা করেছি দুজনের ইচ্ছেতেই হয়েছে । আর তুমি সব সময়ই বলতে যে আর কয়েক টা বছর পরেই সব গুছিয়ে নিয়ে বিয়ে করবে । আমিও সেই রকম ভেবেছিলাম কিন্তু মাঝ খান দিয়ে সব অলট পালট হয়ে গেল । আমিও হয়তো পারতাম কিন্তু কোন ভাবেই বাবুকে মেরে ফেলতে পারি নি । আর চাই ও নি তোমার উপর আমি বোঝা হয়ে যাই ।
-একটা বার আমাকে বলতে ! মাত্র একটা বার ! তোমাকে তো ভালোবাসতাম । এখনও বাসি । তুমি চলে যাওয়ার পরে আমমি কোন ভাবেই আর কাউকে নতুন ভাবে নিজের জীবনের সাথে যুক্ত করতে পারি নি ।

ঐ রাতেই আমাদের বিয়ে হল । শিমুলের বাবা তবুও গম্ভীর হয়েই রইলো । আমার মনে হল যে কাজ আমরা মানে আমি করেছি তিনি কোন দিন আমার সাথে স্বাভাবিক হতে পারবেন কিনা সন্দেহ আছে তবে আমার শাশুড়ি দেখলাম আমাকে পেয়ে বেজায় খুশি । আসলে এই সময়ে একটা বড় চিন্তার পাথর তার বুকের উপর থেকে চলে গিয়েছে । মেয়ের জামাই ফিরে এসেছে ।

আমি কোন দিন ভাবি নি আমার জীবনের মোড়টা এভাবে ঘুরে যাবে । যদি ঐদিন নিনার সাথে না যেতাম, তাহলে সায়েরা আপার সাথে দেখা হত না, তিনিও হয়তো বলতেন না । আমার কোন দিন জানাই হত না যে আমার একটা ফুটফুটে মেয়ে আছে।

রাতে শশী আমাদের মাঝে ঘুমালো । আমি ওর মুখের দিকে তাকিয়ে রইলাম একভাবে । কখন যে আমার চোখ দিয়ে টপটপ পানি পড়তে শুরু করলো আমি নিজেই টের পেলাম না । শিমুল আমাকে দেখছিলো । বলল, তুমি এখনও সেই ছেলেমানুষই আছো দেখছি ! মেয়ে বড় করতে পারবে তো?
বললাম, চিন্তা নেই । মেয়ের মা তো আছে । সে সাহায্য করবে !
আমি শিমুলের হাত ধরলাম । তারপর বলল, এই জীবনে আমি আর কোন দিন তোমাকে অভিযোগ করার সুযোগ দিবো না । আই প্রমিজ !

এটা কেবল আমি শিমুলের সাথেই না, নিজের কাছেই প্রতিজ্ঞা করলাম । একটা বড় ভুল আমি করেছিলাম । বাকিটা জীবনে আর দ্বিতীয়বার সেই ভুল আমি আর করবো না ।

গল্পের সময় কাল ২০০৫ ধরা হোক । তাহলে হয়তো আরও বেশি এপ্রোপ্রিয়েট হবে।

How useful was this post?

Click on a star to rate it!

Average rating 5 / 5. Vote count: 30

No votes so far! Be the first to rate this post.

Related Posts

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *