অনিশ্চিত অপেক্ষা

4.9
(29)

দিনের শেষ আলোটুকু আস্তে আস্তে মিলিয়ে যাচ্ছে দূর আকাশে। সেই দিকেই তাকিয়ে রয়েছে অপু। সামনে যে একজন মানুষ বসে আছে সেটা যেন ভুলেই গেছে। এক ভাবে সেদিকে তাকিয়ে রয়েছে। মিতু একটু শব্দ করে বলল, অপু বললেন না তো?

অপু ফিরে তাকালো মিতুর দিকে। তারপর বলল, আসলে বলার মত কিছুই নেই। সে আমাকে ছেড়ে চলে গেছে। ফিরে আসবে না জেনেও অপেক্ষা করছি। কেন করছি জানি না।

মিতু বলল, তবুও বলুন প্লিজ। শুনতে ইচ্ছে করছে খুব। আর সামনের দুই তিন ঘন্টা আমাদের কোন কাজ নেই। বাসায় যাওয়ার তাড়া নেই। তাই না?

অপু আরও কিছুটা সময় তাকিয়ে রইলো সামনের আকাশের দিকে। তারপর আস্তে আস্তে কথা বলতে শুরু করলো।

তৃষার সাথে আমার দেখা হয়েছিল বই মেলাতে। আমার অনেক দিনের অভ্যাস বই মেলার প্রায় প্রতিদিনই গিয়ে হাজির হওয়া। ঘুরে ঘুরে বই কেনা। মেলার মাঝামাঝি সময়ে এসে প্রতিটা স্টলের স্টাফরাই আমার মুখ চিনে ফেলতো। এমনই একটা স্টলে তৃষা বসতো। প্রথম দুইদিন আমরা একে অন্যকে খুব বেশি ভাল করে খেয়াল করলাম না বটে কিন্তু তৃতীয়বারের মত যখন ওর ঐ স্টলে গেলাম সেদিন তৃষা আমাকে চিনতে পারলো। একটু হেসে কথাও বলল। সেই থেকে পরিচয়, কথা শুরু। তৃষাকে প্রথম খেয়াল করলাম। তৃষার চোখ আর ঠোঁট দারুন সুন্দর ছিল। আমার মেয়েদের চোখের দিকে খুব সাধারনত তাকাই না। তাই প্রথম দুদিন খেয়াল করি নি।

পরের দিন আবার যখন গেলাম তখন আর তৃষাকে দেখতে পেলাম না। লজ্জার কারণে আর জিজ্ঞেস করা হল না। ভেবেছিলাম মেয়েটার সাথে বুঝি আর কোনদিন দেখা হবে না। কিন্তু হল ঠিকই।

বাসা থেকে তখন বিয়ের জন্য খুব চাপ দিচ্ছে। বিয়ে তখন করতেই হবে এমন একটা অবস্থা। বাধ্য হয়ে মেয়ে দেখতে গেলাম। সেখানেই দেখা হল তৃষার সাথে। তবে পাত্রী তৃষা নয়, তৃষা পাত্রীর কাজিন। আমার পুরো সময় পাত্রীর বদলে তৃষার দিকে চোখে আটকে রইলো। বাসায় এসে বললাম যে তৃষাকে পছন্দ। বিয়ে করলে তাকেই করবো।

তৃষা নিজে আমার অফিসে এসে হাজির হল দুইদিন পরে। সোজা কথা জানিয়ে দিল সে ম্যারেজ ম্যাটেরিয়াল না। তার পক্ষে বিয়ে করা সম্ভব না। আমি যেন পাগলামি না করে তার কাজিনকে বিয়ে করতে রাজি হয়ে যাই।

এই বলে তৃষা চলেই যাচ্ছিলো তখনই আমি বললাম, আপনাকে ছাড়া আমি কাউকে বিয়ে করবো না।

তৃষার মুখে একটু কৌতুকের হাসি দেখতে পেলাম। সে বলল, প্লিজ বলবেন না যে আপনি আমাকে দুদিন আগে দেখেই প্রেমে পড়ে গেছেন!

-নাহ। দুইদিন আগে না। ঠিক ২৫৭ দিন আগে আমি আপনাকে দেখেছি। সেদিনের পর থেকে একটা এমন দিন নেই যে আপনাকে কল্পনা করি নি, আপনার কথা ভাবি নি।

তৃষার স্বাভাবিক ভাবেই আমার কথা মনে থাকার কথা না। আমি তাকে বই মেলার কথা বললাম। সে শুনে এবার একটু অবাক হল। তবে আর কিছু বলল না।

আমি যেন আরও একটু পাগলামি করতে শুরু করলাম। ওর ব্যাপারে সব খোজ খবর নিতে শুরু করলাম। ও কোথায় থাকে, কি করে। প্রায়ই ওর অফিসের সামনে দাঁড়িয়ে থাকতাম। ওকে একবার দেখে চলে আসতাম। প্রথম প্রথম তৃষা খুব বিরক্ত প্রকাশ করতো। কিন্তু যখন বছর ঘুরলো, আমার আচরনে বদল এল না তখন তৃষা একটু নমনীয় হল। একদিন অফিসের পরে আমাকে রেস্টুরেন্টে নিয়ে গেল। আমাকে বোঝালো অনেক।

-বিশ্বাস করুন, কোন ভাবেই দোষ আপনার না। সমস্যাটা আমার।

-কী সমস্যা শুনি? যে কোন কিছুর বিনিময়ে আমি আপনাকে বিয়ে করতে চাই।

তৃষা কিছু সময় কি যেন ভাবলো। তারপর বলল, আমার বেশি দিন আপনাকে ভাল লাগবে না। এর আগে আমি দুইটা সিরিয়াস প্রেম করেছি। একেবারে বিয়ে করার মন স্থির করেই। কিন্তু জানেন কি হয়েছে, সময় অতিবাহিত হওয়ার সাথে সাথে তাদের প্রতি আমার আগ্রহ কমে গেছে। এক সময় শূন্য হয়ে গেছে। আপনার ক্ষেত্রেও তাই হবে। প্রথমে খুব প্রেম থাকবে, এক সময় সেটা কমতে কমতে একেবারে শূন্যের কোঠায় পৌছাবে। তখন না পারবো আপনাকে ছাড়তে না পারবো ভালোবাসতে। আপনি গলায় আটকে থাকবেন। এই পরিস্থিতি আমি চাই না। আর তখন আপনাকে ছেড়ে দিলে আপনার কষ্ট আরও তীব্র হবে। কী দরকার বলুন।

আমি তৃষার কথা গুলো শুনলাম। ওর কন্ঠশুনেই মনে হল যে মেয়েটা মোটেই মিথ্যা বলছে না। আমি হঠাৎ বললাম, কতদিনের ভেতরে আগ্রহ চলে যাবে?

তৃষা প্রথমে যেন ঠিক বুঝতে পারলো না আমার কথা। বলল, মানে?

-বললাম, কতদিন আগ্রহ থাকে সাধারনত?

-এই ছয়মাস বেশি হলে এক বছর।

-ওকে। আমরা বিয়ে করি। আমার সাথে আপনি ছয় মাসই সংসার করুন। ছয় মাসের পর আপনার যেদিন মনে হবে যে আর কোন আগ্রহ নেই। আর ভালো লাগছে না আমাকে সেদিন আপনি চলে যাবেন। জাস্ট আমাকে জানাবেন না। একদিন অফিসে গেলাম এসে দেখলাম আপনি নেই। একটা চিরকুট লিখবেন যে চলে যাচ্ছেন। কথা দিচ্ছি আপনাকে খুজতে যাবো না। আর কোন ডিস্টার্ব করব না।

তৃষা আমার দিকে একভাবে কিছু সময় তাকিয়ে থেকে বলল, তবুও আমাকে বিয়ে করা লাগবেই?

আমি বললাম, আপনার ঐ ঠোঁটে চুমু না খেলে আমার জীবন অসম্পূর্ণ রয়ে যাবে।

তৃষা কিছু বলতে গিয়ে হেসে ফেলল। মনে হল কাজ হয়ে গেছে।

এক সপ্তাহ পরেই বিয়ে করলাম আমরা। কোন প্রকার অনুষ্ঠানের ধার দিয়ে গেলাম না। বাবা মাকে বললাম বিয়ে করেছি তবে এখন কোন আয়োজন না। এক বছর পরে। মা বেশি উচ্চ বাচ্চ করলেন না। আমাকে ভাল করেই চিমতেন।

ছয়টা মাস যে কিভাবে কেটে গেল আমি নিজেই বলতে পারবো না। জীবনের শ্রেষ্ঠ সময়টা কাটিয়েছি তখন। তৃষার ঠোঁটে কী পরিমান যে চুমু খেয়েছি এই কয়দিনে সেটার কোন হিসাব নেই। এতো চমৎকার সম্পর্ক ছিল আমাদের। এতো সুখের সংসার।

কেটে গেল আরও কয়েকমাস। ঠিক নয় মাসের মাথায়, যখন আমার মনে হল যে এই মেয়ে আর আমাকে ছেড়ে যাবে না, তখনই তৃষা ছেড়ে চলে গেল। অফিস থেকে ফেরত এসে টেবিলের উপর কাগজ টা পেলাম।

আই এম সরি অপু। আমি চলে যাচ্ছি। আমার জন্য অপেক্ষা করবে না আর। নতুন করে জীবন শুরু কর।

ব্যাস আর কিছু নেই। গল্প এখানেই শেষ। তারপর থেকে ওর জন্য অপেক্ষা করছি। জানি আসবে না। তবুও।

গল্প শেষ করে অপু চুপ করে রইলো। মিতু বলল, এখনও ভালোবাসেন তাকে?

-হ্যা। ঐ যে নয়টা মাস, ঐ নয় মাসেই আমি আমার পুরো জীবন টুকু পার করেছি। ঐ স্মৃতি নিয়েই বাকি জীবন কেটে যাবে।

-জানেন তৃষা কোথায়? মানে পরে খোজ নিয়ে ছিলেন?

-ওকে কথা দিয়েছিলাম ওর পেছনে যাবো না। জানেন খুব যেতে ইচ্ছে করতো, ইচ্ছে করতো যেকোন ভাবেই তাকে ফিরিয়ে নিয়ে আসি।কিন্তু করি নি।

আর বেশি সময় অপু বসলো না। উঠে পড়লো। অপু চলে যাওয়ার পরে মিতু আরও অনেকটা সময় বসে রইলো সেখানে। প্রায় ঘন্টা খানেক পরে সেখানে একজন একজন মেয়ে এসে বসল। কিছু সময় কেটে গেল নিরবে। নতুন আসা মেয়েটি বলল, গাধাটা এখনও অপেক্ষাতে আছে, তাই না?

মিতু বলল, তৃষা এমন ভালোবাসার মানুষ পাওয়া ভাগ্যের ব্যাপার!

তৃষা হাসলো। তারপর বলল, সত্যিই আমি ভাগ্যবান। জানিস আগে যখন একা লাগতো তখন মনে হত এই দুনিয়াতে আমার আপন বলে কেউ নেই, কেউ না। কিন্তু এখন সেটা মনে হয় না। এখন মনে হয় অন্তত একজন আছে যে আমার জন্য অপেক্ষা করে আছে। এই অনুভূতি টা চমৎকার।

-আর যাবি না অপুর কাছে?

-যাবো। তবে এখন না। নিজের সাথে আরও একটু বোঝাপড়া করে নিই। ঐ পাগলটাকে আর বেশি দিন একলা রাখব না। আর তুই তো আছিসই ওর খোজ খবর নেওয়ার জন্য। চিন্তা কি!

মিতু কি বলবে খুজে পেল না। তার এই বন্ধুটি কে সে কোনদিন বুঝতে পারে নি। ওর মনের ভেতরে কি যে চলে আর কেন চলে সেটাও জানে না।

এ এক অনিশ্চিত গল্প। অপু কি বাকি জীবন অপেক্ষা করেছিল তৃষার জন্য? আসলেই কি মানুষ অপেক্ষা করতে পারে এভাবে? আর তৃষা কি ফেরত গিয়েছিল অপুর জীবনে? দুজনের অনিশ্চিত অপেক্ষা কি শেষ হয়েছিল? কেউ বলতে পারে না সেটা! কেউ না।

How useful was this post?

Click on a star to rate it!

Average rating 4.9 / 5. Vote count: 29

No votes so far! Be the first to rate this post.

Related Posts

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *