সেহরিটেলসঃ আয়না

oputanvir
4.8
(15)

আমি নওরিনের দিকে তাকিয়ে রইলাম কিছু সময়। মনটা একটু খারাপ হল। এতো হাসিখুশি মেয়েটা আর খুব বেশি সময় বেঁচে থাকবে না ভাবতেই মনের ভেতরে একটা বিষাদ ছেয়ে গেল। আমি নিজেকে যথা সম্ভব শান্ত রেখে ওর দিকে তাকিয়ে রইলাম। ও তখনও একমনে কথা বলেই চলেছে। ঘরের ভেতরে প্রতিটা মানুষ ওর কথা মন দিয়ে শুনছে। আমিও শোনার চেষ্টা করছি তবে খুব একটা কাজ হচ্ছে না।
আপনি যখন জানতে পারবেন যে আপনার সামনে বসা মানুষটা আর বেশি সময় বেঁচে থাকবে না তখন আপনি কোন ভাবেই আর তার সাথে স্বাভাবিক আচরণ করতে পারবেন না। অবশ্য আমার কাছে এই ব্যাপারটা এই প্রথম না। আমি আগেও এই ব্যাপারটার মুখোমুখি হয়েছি। কিন্তু তবুও নওরিনের ব্যাপারটা মেনে নিতে একটু কষ্টই হল। কষ্ট হচ্ছে।

রিচি অবশ্য আমার ভেতরের এই পরিবর্তনটা ঠিকই লক্ষ্য করল। সে আমাকে এক পাশে ডেকে নিয়ে বলল, কী হয়েছ, এমন লাগছে কেন তোমাকে?
আমি রিচির কথা উড়িয়ে দেওয়ার চেষ্টা করে বললাম, কই কী হবে?
-তোমার চেহারায় কেমন একটা ভাব দেখতে পাচ্ছি। কিছু নিয়ে চিন্তিত?
-আরে না। কোন কিছু নিয়েই চিন্তিত না।
-তাহলে বারবার নওরিনের দিকে ওভাবে তাকাচ্ছো কেন বল?
আমি আসলে কী যে বলে এই কথাটা কাটাবো যেটা বুঝতে পারলাম না। বললাম, আসলে ও কথা বলতেছে তো সেটাই শুনছি।
রিচি আমার কথা ঠিক যেন বিশ্বাস করল না। সে আমার দিকে আরও কিছু সময় তাকিয়ে রইলো বটে বলল না। আমরা আবারও নিজেদের গল্পে মেতে উঠলাম। আমি বলতে অন্য সবাই গল্পে মেতে উঠল আমি উঠতে পারলাম না। আমি সেই অস্বস্তি আর দুঃখ ভরান্ত মন নিয়ে নওরিনের দিকে তাকিয়ে রইলাম। মেয়েটা আর বেশি সময় বাঁচবে না। মারা যাবে। সত্যিই মারা যাবে।
আড্ডা ভাঙ্গল আরও ঘন্টা দুয়েক পরে। সবাই যে যার মত করে রওয়ানা দিল। নওরিনের বাসা কাছেই। সে রিক্সা নিয়ে রওয়ানা দিল একা একাই। আমার খুব ইচ্ছে করল নওরিনের সাথে যেতে কিন্তু ওর বাসা আর আমার বাসা বিপরীত দিকে। একসাথে যাওয়ার উপায় নেই। আমি রিচির সাথে রিক্সায় চড়ে বসলাম। রিচির মুখ গোমরা। আমার সাথে ঠিক কথা বলছে না। আমি অবশ্য কারণটা অনুমান করতে পারি। আমি যদিও রিচিকে সরাসরি বলি নি যে আমি ওকে ভালোবাসি তবে আমাদের ভেতরে একটা সমঝোতা হয়েছে। সে ঠিক ঠিক জানে যে আমি তাকে পছন্দ করি আর আমিও জানি যে রিচির এতে সায় আছে। তাই আমি যখন বারবার নওরিনের দিকে তাকাচ্ছিলাম সেতা রিচির ভাল লাগবে না সেটা স্বাভাবিক।

প্রায় পুরোটা রাস্তা রিচি আমার সাথে কথা বলল না। এক সময়ে আমি বলে উঠলাম, আমি জানি তুমি আমার উপরে খানিকটা রুষ্ট হয়ে আছো তবে আই ক্যান্ট হেল্প ইট।
রিচি বলল, আজকে কি নওরিনকে খুব বেশি সুন্দর লাগছিল? অবশ্য নওরিন এমনিতেই সুন্দর। তাই না?
রিচির কথায় একটা খোঁচা আর বিদ্রুপের আভাস আমি ঠিকই পেলাম। আমি সাহস করে রিচির হাত ধরলাম। তারপর বললাম, আমি ওর দিকে তাকাচ্ছিলা কারণ আজকের পরে ওর দিকে আর তাকানোর সুযোগ হবে না।
রিচি আমার কথা ঠিক বুঝতে পারল না। বলল, মানে? কী বলতে চাইছো?
-কী যে বলতে চাইছি সেটা নাই বা শুনলে। সব কিছু জানতে চেয়ো না। কেমন ! আর আমাকে ভুল বুঝো না।

রিক্সা আমার বাসার কাছে চলে এসেছে। আমি রিক্সা থেকে নেমে গেলাম। রিচির বাসা এখান থেকে আরও একটু দুরে। রিচি কিছুটা দুরে থাকে আমার থেকে। আমি দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে রিচির রিক্সাটা চলে যেতে দেখলাম। একবার মনে হল ঘুরে গিয়ে নওরিনের বাসার দিকে যাই। ওকে শেষবার কয়েকটা কথা বলি কিন্তু বললাম না। মন খারাপ নিয়ে আমি নিজের বাসার দিকে হাটা দিলাম!

আমার ঘরে কোনো আয়না নেই। আমি আয়না দেখতে ভয় পাই। কারণ আয়নায় আমি মৃত্যু দেখি। আমার কাছের মানুষের মৃত্যু। আজকে ঠিক সেই আয়নাতেই আমি নওরিনের মৃত্যু দেখেছি। মৃত্যুদূত নওরিনের একদম কাছে দাঁড়িয়ে ছিল। আমি দেখতে চাই নি। কিন্তু আজকে যেই রেস্টুরেন্টে আমরা খেতে গিয়েছিলাম, সেখানে একটা বড় কাঁচের আয়না ছিল। একেবারে আমরা যেখানে বসেছিলাম সেখানেই। আমি সেদিকে তাকাতে চাই নি। কিন্তু যখনই একবার ভাল করে চোখ গেল তখনই আমি তাকে দেখতে পেলাম। আরও কিছু সময় পরে বুঝতে পারলাম যে সে একেবারে নওরিনের দিকে তাকিয়ে আছে। নওরিনের পেছন পেছন ঘুরে বেড়াচ্ছে। কতদিন ধরে ঘুরে বেড়াচ্ছে সেটা আমি জানি না তবে সময় হয়ে এসেছে। সময় না হলে সে নওরিনের এতো কাছে চলে আসতো না।

আমার কথা শুনতে আপনাদের কাছে পাগলের প্রলাপের মত মনে হতে পারে তবে এটাই আসলে সত্যি। আমি মানুষের মৃত্যুকে আগে থেকেই টের পেয়ে যাই। আমি দেখতে পাই যে মানুষটা মারা যাবে তার পেছন পেছন একজন কালো কাপরের মৃদ্যু দূত ঘুরে বেড়াচ্ছে। সে যেখানেই যাচ্ছে সেই মৃত্যুদূতও সেখানেই যাচ্ছে। তবে আমি এটা সরাসরি দেখতে পাই না। আমি দেখতে পাই যদি আমি সেই মানুষটাকে আমি আয়নার ভেতর দিয়ে দেখি। আয়নার ভেতরেই এই মৃত্যু দূত আমার চোখে পরে। এই কারণে আমি সাধারণত আয়না থেকে দুরে থাকি।
বিশেষ করে আমি যখন আমার বাবা মা আর ভাইবোনের সাথে থাকি তখন কোন ভাবেই আমি তাদেরকে আয়নার ভেতর দিয়ে দেখতে চাই না। এই কারণে আমি এমন সব জায়গা থেকে আয়না সরিয়ে ফেলেছি যেখানে আমি আমার পরিবারের লোকজনকে দেখতে পাবো। আমার বাবা মায়ের ঘরে একটা ড্রেসিং টেবিল আছে আমি জানি। তাই আমি কোন দিন সেই ঘরে ঢুকি না। বোনের ঘরেও ড্রেসিং টেবিল আছে। ওর ঘরেও ঢুকিয়ে না। তবে ড্রয়িং বা ডাইনিং রুমে কোন আয়না আমি রাখি নি। এই ঘরগুলোকে পরিবারের সবার সাথে নিয়মিত দেখা হয়, তাই আমি কোন ভাবেই তাদের মৃত্যু সংবাদ আগে থেকে জানতে চাই না। সেটা আমার পক্ষে সহ্য করা সম্ভব হবে না কোনো ভাবেই।
পরদিন সকালে আর অফিসে যাওয়া হল না। আমি যখন অফিসে যাওয়ার জন্য বের হব তখনই রিচির ফোন এসে হাজির হল। সে জানালো নওরিনের মৃত্যুর খবরটা। সকালবেলা নওরিনদের বাসায় নাকি সিলিন্ডার ব্লাস্ট হয়েছে। পরিবারের অন্য সবার কমবেশি আহত হয়েছে তবে নওরিন মারা গেছে। ব্লাস্টের সময় সে রান্না ঘরেই ছিল। রিচি জানালো যে আজকে অফিসে যাবে না সে। আমরা সবাই নওরিনের বাসায় যাবো। আমি যেন তৈরি থাকি, যাওয়ার সময়ে আমাকে সে তুলে নেবে।
রিক্সায় উঠেই রিচি আমাকে বলল, তুমি গতকাল রাতে ঐ কথা বললে কেন? তুমি কিভাবে জানতে?
আমি কোন কথা না বলে একভাবে তাকিয়ে রইলাম আকাশের দিকে। রিক্সাটা চলছে সামনের দিকে। সিদ্ধান্ত নিতে পারছি না। রিচিকে কথাটা বলা কি ঠিক হবে? আমি রিচির সাথে অনেক কথা বলেছি, জীবনের অনেক কিছু শেয়ার করেছি কিন্তু এই ব্যাপারটা কোনদিন বলি নি। এমন কথা কি কাউকে বলা যায়? বললে সে কি আমার কথা বিশ্বাস করবে? আমাকে পাগল ভাববে!
-কই বল?
-হ্যা আমি আগেই টের পেয়েছিলাম!
-কিভাবে টের পেলে?
-আমি দেখতে পাই?
-কী দেখতে পাও?
আমি কিছু বলতে গিয়েও বললাম না। আমরা যে রিক্সায় বসে আছি, সেটা ভুলে গেলে চলবে না। আমি যা বলব রিক্সাওয়ালা সব শুনতে পাবে। আমি রিচিকে ইংরেজিতে বললাম, আমি মৃত্যুদুত দেখতে পাই।
আমার ইংরেজিতে উত্তর দেওয়ার কারণটা রিচিও বুঝতে পারল। অন্য সময় হলে রিচি হয়তো হেসে উঠত তবে আজকে হেসে উঠল না। সে আমার দিকে একভাবে তাকিয়ে রইলো। আমার চোখের দৃষ্টিই ওকে বলে দিচ্ছে যে আমি মিথ্যা বলছি না। আমি আবারও ইংরেজিতে বলল, আমি আয়নাতে ভেতর থেকে দেখতে পাই। যখন কোন মানুষের মৃত্যুর সময় হয় তখন তাকে যদি আমি আয়না দিয়ে দেখি তবে তার আশে পাশে একজন কালো আলখাল্লা পরা মৃত্যুদূতকে আমি দেখতে পাই। অনেক আগে থেকেই পাই। কবে দেখে দেখতে পাই সেটা আম্র মনে নেই তবে স্কুলের পর থেকেই আমি এই ব্যাপারটা প্রথমে খেয়াল করতে শুরু করি।
-এই জন্য তুমি আয়না থেকে দুরে থাকো?
-হ্যা।
আমার আয়না থেকে দুরে থাকার ব্যাপারটা রিচি জানে। আমার ডেস্কের পাশেই একটা জানালা আছে। সেটা আয়না হলেও সেখানে তাকালে বেশ স্পষ্টই মানুষদের দেখা যায়। আমি সেই কাঁচকে কালো কাপড়ের পর্দা দিয়ে ঢেকে দিয়েছি। এটা রিচিকে বলেছিলাম যে আমি আয়না পছন্দ করি না। সেদিন সে খুব বেশি প্রশ্ন করে নি।

রিক্সা এসে থামল নওরিনদের বাসার সামনে। আরও অনেককেই দেখলাম এসেছে। আমাদের নামতে দেখে এগিয়ে এল। লাশ নিয়ে আসা হয়েছে একটু আগে। ভেতর থেকে কান্নার আওয়াজ ভেসে আসছে। আমি রিচিকে বললাম যে আমি ভেতরে যাবো না। রিচি সহ আরও কয়েকজন ভেতরে দিকে পা বাড়াল। আমি গেটের কাছেই দাঁড়িয়ে রইলাম। ঠিক সেই সময়ে একটা ভ্যানগাড়িকে রাস্তার উপর দিয়ে যেতে দেখলাম। ভ্যানটার উপরে একটা স্টিলের আলমারি। আর আলমারির এক পাশটা বড় আয়না দেওয়া। সেই আয়নার উপরেই আমার চোখ গেল। আয়নাটা এমন জায়গাতে রয়েছে যে আমি আয়নার দিয়ে রিচিকে দেখতে পেলাম। রিচি সহ আমাদের অফিসের আরো কয়েকজন বাড়ির ভেতরে ঢুকছে। এবং তাদের পেছন পেছনে একটা কালো আলখাল্লা পরা মুর্তিও ভেতরে ঢুকছে। আমি চোখ বড়বড় করে সেদিকে তাকিয়ে রইলাম। আমি চাইলেও নিজের চোখ সড়াতে পারলাম না। আমি যদিও নিশ্চিত না যে ঠিক কার পেছনে মৃত্যু দূত লেগেছে। দুরুত্ব দেখেই আমি বুঝতে পারছি যে এখনও চার-পাঁচ দিন সময় আছে। তাই দুরুত্ব খানিকটা রয়েছে। আমি তাই নিশ্চিত করে বলতে পারছি না যে কে মারা যাবে?
হঠাৎ আমার কী হল আমি জানি না, আমি নওরিনদের গেটের সামনে থেকে দৌড় দিয়ে রাস্তায় নামলাম। তারপর দৌড়াতে শুরু করলাম। আমি জানি না আমি কেন দৌড়াচ্ছি আর কার থেকে দৌড়াচ্ছি, আমার কেবল মনে হল আমার এখন সব কিছু থেকে দৌড়ে পালিয়ে যেতে হবে। আমাকে পালিয়ে যেতেই হবে। প্রিয় মানুষটির আগাম মৃত্যুর খবর আমি কিছুতেই পেতে চাই না। আমি আর কিছুতেই আয়নার দিকে তাকাব না। কোনো দিন না।

ফেসবুকের অর্গানিক রিচ কমে যাওয়ার কারনে অনেক পোস্ট সবার হোম পেইজে যাচ্ছে না। সরাসরি গল্পের লিংক পেতে আমার হোয়াটসএপ বা টেলিগ্রামে যুক্ত হতে পারেন। এছাড়া যাদের এসব নেই তারা ফেসবুক ব্রডকাস্ট চ্যানেলেও জয়েন হতে পারেন।

অপু তানভীরের নতুন অনুবাদ গ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে

বইটি সংগ্রহ করতে পারেন ওয়েবসাইট বা ফেসবুকে থেকে।

How useful was this post?

Click on a star to rate it!

Average rating 4.8 / 5. Vote count: 15

No votes so far! Be the first to rate this post.

About অপু তানভীর

আমি অতি ভাল একজন ছেলে।

View all posts by অপু তানভীর →

2 Comments on “সেহরিটেলসঃ আয়না”

  1. নিশ্চিত মৃত্যুকে আগে থেকে জানার যে নিঃশব্দ যন্ত্রণা, তা গল্পে খুব নিখুঁতভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন। আয়নার ওপাশের মৃত্যুদূত আর নায়কের অসহায়ত্ব পাঠক হিসেবে মনে গভীর দাগ কেটেছে। যদিও এই একই ধারণার উপর ভিত্তি করে আপনার আরও কিছু গল্প রয়েছে, তবে এই গল্পটিও দারুণ হয়েছে।

    এমন হৃদয়স্পর্শী ও রোমহর্ষক গল্পের জন্য আন্তরিক ধন্যবাদ। খুব শীঘ্রই আরও একটি নতুন গল্পের অপেক্ষায় রইলাম।

    1. হ্যা মৃত্যুদূতের সাথে দেখা হওয়া নিয়ে আমার আরও কয়েকটা গল্প আছে। এই গল্পের থিমটাও মনে হল এই ভাবেও লেখা যায়।
      সত্যিই তাই। আগে থেকে মৃত্যুর খবর জেনে ফেলার মত ভয়ংকর ব্যাপার আর কিছুই হতে পারে না।

      মন্তব্যের জন্য ধন্যবাদ।

Comments are closed.