মিমির জেদ যে এতোটা তীব্র হবে আমি ভাবতে পারি নি। আমি কেবল মিমির দিকে তাকিয়ে রইলাম কিছু সময়। সে শান্ত চোখে বিছানার উপরে বসে রয়েছে। অন্য দিকে তাকিয়ে রয়েছে। আমি জানি আমার দিকে তাকাতে তার অস্বস্তি হচ্ছে। তাই আমি আর ওকে অস্বস্তিতে ফেলতে চাইলাম না। আমি ওর দিকে তাকিয়ে বললাম, আমি বরং একটু কথা বলে আসি!
মিমি আমার দিকে ফিরল, তারপর বলল, আমি তোমাকে কী বলেছিলাম মনে নেই?
আমি বললাম, মনে আছে। কিন্তু এইভাবে বাসায় চলে এলে কী করব বল। তোমাকে কথা বলতে হবে না। আমি অন্তত কথা বলে আসি। ভদ্রতা বলে একটা কথা আছে নাকি!
মিমি আমার দিকে তাকিয়ে রইলো কিছু সময়। তারপর বলল, এটাই যেন শেষ হয়!
-আচ্ছা আমি দেখব।
আমি দরজা খুলে বের হয়ে এলাম। ড্রয়িং রুমে এসে দেখি শ্বশুর মশাই বসে রয়েছেন সোফাতে। আমার দিকে তাকিয়ে হাসল একটু। হাসিতে কোন প্রাণ নেই। আমার দিকে তাকিয়ে বলল, এলো না।
-জ্বী না। আপনি তো ওকে চেনেন।
-হ্যা, নিজের মেয়ে ! চিনব না কেন!
একটা দীর্ঘশ্বাস বের হয়ে তার ভেতর থেকে। আমি কী বলব বুঝতে পারলাম না। আমি চুপ করে রইলাম। এক সময় শ্বশুর মশাই বললেন, আমি বরং আজকে যাই।
-সেদিক দুপুরে খেয়ে যান!
-নাহ! ওকে আর ঝামেলায় ফেলছি না। মিমি যখন আমার মুখ দেখতে চাইছে না, আমি বরং চলে যাই।
সত্যি বলতে কি আমি নিজেও চাচ্ছিলাম তিনি যেন চলে যান। মিমিকে নিয়ে এই বাসায় আসার পর এই নিয়ে উনি চারবার এখানে এসে হাজির হয়েছেন আমার বাসায়। মিমির সাথে কথা বলার চেষ্টা করেছেন, তার রাগ ভাঙ্গানোর চেষ্টা করেন তবে মিমির রাগ ভাঙ্গে নি। বাবার সাথে একটা কথা পর্যন্ত বলে নি মিমি। আমি কিছু বলতে পারি নি কারণ মিমি আমাকে একেবারে প্রথমেই এই শর্তই দিয়েছিল।
মিমির সাথে আমার বিয়ে হয়েছিল পারিবারিক ভাবেই। তবে মিমির এই বিয়েতে মত ছিল না। আমি এই ব্যাপারে আগে কিছুই জানতাম না। বিয়ে আগে কেবল একবার মিমির সাথে আমার দেখা হয়েছিল। সেই এক দেখাতেই আমি বুঝতে পেরেছিলাম যে মিমি বিয়ে করতে চায় না। এই কথাটা আমি আমার বাবা মাকে জানিয়েছিলাম। মা বলেছিল যে বিয়ের আগে এই রকম একটু আধটু হয়ে থাকে। একবার বিয়ে হয়ে গেলে সব ঠিক হয়ে যাবে।
বিয়ে হয়ে গেল আমাদের। বাসর রাতে আমি বুঝতে পারলাম যে সব কিছু ঠিক হয়ে যায় না। মিমির আসলেই এই বিয়েতে একদমই মত ছিল না। বিয়ের আনুষ্ঠানিকতা শেষ করে মিমিকে নিয়ে যখন শ্রীমঙ্গল গেলাম সেদিন মিমি প্রথম আমার সাথে ভাল করে কথা বলল। রিসোর্টের একটা লেক পাড়ে সে বসে ছিল। আমি পাশে গিয়ে বসতেই মিমি কথাটা বলল। তবে আমার দিকে তাকিয়ে নয়। তার চোখ লেকের দিকেই। মিমি বলল, আমি একটা ছেলেকে ভালোবাসতাম।
আমিও এটা আশা করেছিলাম। মিমির কোন ছেলের সাথে সম্পর্ক ছিল, এই কারণেই সে বিয়েতে রাজি ছিল না। তবে এর পরে যেই খবরটা আমি পেলাম সেটার জন্য প্রস্তত ছিলাম না। মিমি বলল, শুভ আমার বিয়ের দিন সুইসাইড করে মারা গেছে।
এই কথাটা হজম করতে আমার একটু সময় লাগল। আমি কী যে বলব যে খুজেই পেলাম না। তবুও বললাম, আমি আসলেই জানতাম না। তুমি আগে আমাকে বললে হয়তো ……
-আপনি নিজেকে দোষ দিবেন না প্লিজ। আমি জানি আমি যদি আপনার সাথে কথা বলতে পারতাম তবে হয়তো আপনি বিয়েটা অফ করে দিতেন। কিন্তু অন্য কেউ করতো।
মিমি একটু সময় চুপ করে বসে রইলো। তারপর বলল, জানেন আমি বাবাকে কত করে বলেছি কত অনুরোধ করেছি, কিন্তু তিনি শোনেন নি। আমি জানতাম আমার বিয়ে হয়ে গেলে শুভ টিকতে পারবে না। কিন্তু আমার কিছুই করার ছিল না। আমাকে বাসা থেকে বের হতে দেয় নি, আমার ফোন কেড়ে নিয়েছিল।
আমি মিমিকে কেঁদে উঠতে দেখলাম। আমি কিছুটা অপ্রস্তুত হয়ে তাকিয়ে রইলাম মিমির দিকে। তারপর মিমির কাছে আরেকটু সরে এলাম। তারপর ওকে এক পাশ থেকে একটু জড়িয়ে ধরার মত করে জড়িয়ে ধরলাম। ভেবেছিলাম মিমি হয়তো আমাকে ছাড়িয়ে দিবে। তবে ছাড়িয়ে দিল না। মেয়েরা সাধারণত অন্যের সামনে নিজেকে এভাবে উন্মুক্ত করে না, এভাবে কাঁদে না। কেবল কাছের মানুষদের সামনেই কাঁদে। আমার কেন জানি মনে হল মিমি আমাকে গ্রহন করে নিয়েছে। আমরা সেখানে অনেকটা সময় সেখানেই বসে রইলাম। মিমিকে অনেকটা সময় পরে নিজেকে সামলে নিল। তারপর বলল, আমি আপনার সাথে অবিচার করব না। বিশ্বাস করুন। আমি আপনার ভাল স্ত্রী হওয়ার চেষ্টা করব। আমাকে একটু সময় দিতে হবে। আমি আপনাকে কোন অভিযোগের সুযোগ দিব না।
আমি বললাম, টেক ইয়োর টাইম। কোন সমস্যা নেই। আমি অপেক্ষা করব।
মিমি তারপর আরেকটা কথা বলল, আমি আপনার কাছে আরেকটা কথা বলতে চাই।
-হ্যা বল।
-আজকের পর থেকে আপনি আমার বাসার সাথে কোন সম্পর্ক রাখবেন না। কোন সম্পর্ক না।
-মানে?
-মানে আমি চাই না আপনি আর আমার বাসার সাথে যোগাযোগ করেন। বিশেষ করে আমার বাবার সাথে।
আমি সত্যিই কী বলব বুঝতে পারলাম না। আমার মনে হল যে মিমি বাবার প্রতি তীব্র অভিমান থেকেই এই কথা বলছে। কদিন পরে সেটা কমে যাবে। আমার এখন প্রধান লক্ষ্যই হচ্ছে মিমির মন জয় করা। পরেরটা পরে ভাবা যাবে।
আমি ওর সাথে যথা সম্ভব সহযোগিতা করেই সংসার শুরু করলাম। নিজের বাসায় উঠে পড়লাম দ্রুতই। আস্তে আস্তে মিমি আমার সাথে সহজ হয়ে এল। তবে তখনও মিমির ভেতরে একটা সংকোচ কাজ করছিল। তখন আমি একটা কাজ করলাম। আমি শুভর করবের খোজ করা শুরু করলাম। খুব একটা কষ্ট হল না আমার বের করতে। শুভর বাবা মা দুইজনেই মারা গিয়েছিল। সে ছোট থেকেই তার নানা বাড়ি ছিল। ইন্টারের পরে ঢাকা চলে আসে। তার মৃত দেহ নানা বাড়িতেই গেছে।
আমি শুভর নানা বাড়িতে খোজ নিলাম। শুভর ছোট মামার সাথেই কথা বললাম। পরিচয় দিলাম যে আমি শুভর পরিচিত। আমি যে তার প্রেমিকাকে বিয়ে করেছি সেই কথা বললাম না। আমি কেবল জানালাম যে ওর কবরটা আমি কেবল জিয়ারত করতে চাই। শুভ যখন মারা গিয়েছিল তখন আমি ঢাকার বাইরে ছিলাম। আমি তার জানাযাতে থাকতে পারি নি। ওরা কিছু সন্দেহ করল না।
এক শুক্রবার সকালে আমি মিমিকে বের হলাম। মিমি বারবার জানতে চাইল যে আমরা কোথায় যাচ্ছি আমি ওকে বললাম যে কোন ঠিক নেই। গাড়ি নিয়ে যত দুর চোখ যায়, যাব, তারপর ফেরত চলে আসব। মিমি আর আমাকে আর বেশি প্রশ্ন করল না। ঘন্টা তিনেকের ভেতরে আমরা পৌছে গেলাম। শুভর মামা আমাকে খুব ভাল করেই সব পথ বলে দিয়েছিল। আমার সেটা খুজে পেতে কষ্ট হল না। আমি সরাসরি সেখানে গাড়িটা থামালাম। যখন আমি গাড়িটা থামালাম তখনই বুঝি মিমি পুরো ব্যাপারটা বুঝতে পারল। তারপরই আমার দিকে তাকালো বিস্ময় নিয়ে। তারপরই আমি ওর চোখে পানি দেখলাম।
আমি ওকে নিয়ে গাড়ি থেকে নামলাম। ওকে নিয়ে কবর খানাতে ঢুকলাম। শুভ করবটা খুজে পেতে খুব বেশি কষ্ট হল না। ওটার সামনে কিছু সময় আমরা দাঁড়িয়ে রইলাম। আমি বললাম, আমি কখনই বলব না যে তুমি শুভকে তোমার জীবন থেকে মুছে ফেল। বললেও এটা সম্ভব না। টেক ইয়োর টাইম। আমি বাইরে দাড়াচ্ছি।
মিমি বেশ কিছুটা সময় পরে বের হয়ে এল। ওর চোখের দিকে তাকিয়ে বুঝতে পারলাম যে সে একটু কান্নাকাটি করেছে। তবে সেই একই সাথে ওর চেহারাতে একটা শান্তির ভাব দেখতে পেলাম আমি। আমার কেন জানি মনে হল মিমিকে এখানে নিয়ে আসাটা সঠিক সিদ্ধান্ত ছিল। গাড়িতে উঠতে উঠতে মিমি বলল, থ্যাঙ্কিউ। তুমি সত্যিই খুব ভাল একজন মানুষ।
আমি তখনই টের পেলাম যে মিমি আপনি থেকে তুমিতে নেমে এসেছে।
সেদিন রাতেই মিমি আমার আরও কাছে চলে এল। সেই সংঙ্কোচটাও দূর হয়ে গেল। মিমি সত্যিই বলেছিল। সে আমার ভাল স্ত্রী হতে শুরু করল। তার ভেতরে চেষ্টার কোন কমতি ছিল না। আমরা আবারও হানিমুনে গেলাম। এবার গেলাম নেপালে। মিমি বাচ্চা মেয়ের মত খুশি হল। আমরা আরও একটু কাছে চলে এলাম।
এর মাঝে আমি মিমির দ্বিতীয় শর্তের কথা ভুলেই গিয়েছিলাম। সেটা টের পেলাম আরও মাস খানেক। আমি অফিস থেকে বাসায় ফিরে এসে দেখি আমার শ্বশুর মশাই আমাদের বাসার বাইরে দাঁড়িয়ে রয়েছেন। তার মুখের দিকে তাকিয়েই আমি বুঝতে পারলাম যে তিনি বেশ কিছু ধরেই এখানে দাঁড়িয়ে আছেন। মিমি কি বাসায় নেই?
তখনই আমার মনে পড়ল মিমির দ্বিতীয় শর্তটার কথা। আমি শ্বশুর মশাইকে সালাম দিলাম। তিনি আমার দিকে তাকিয়ে একটু হাসার চেষ্টা করলেন। তারপর বললেন, মিমি হয়তো ঘুমিয়ে আছে! এই জন্য দরজা খুলছে না।
আমিও হাসার চেষ্টা করলাম একটু। এবং আমি বুঝতে পারলাম যে শ্বশুর মশাইও জানেন যে মিমি ঘুমিয়ে নেই। আমি দরজার খোলার জন্য বেল টিপলাম। একটু পরে দরজা খুলে গেল। আমি মিমির দিকে তাকিয়ে দেখলাম তার মুখ গম্ভীর হয়ে আছে। মিমি দরজা খুলেই ভেতরে চলে গেল। আমার পেছন পেছন শ্বশুর মশাই ঢুকলেন।
সেদিন মিমি নিজের ঘর থেকে বের হল না। আমিই শ্বশুর মশাইয়ের সাথে রাতের ভাত খেলাম। রাতে শ্বশুর শুতে গেলে আমি মিমিকে খেতে বললাম। মিমি কিছু বলল না বটে তবে সে আমার আচরণ যে পছন্দ করছে সেটা বুঝিয়ে দিল। আমি কী করব এমন একটা ভাব করে বসে রইলাম।
আমি ভেবেছিলাম মিমি এই শর্তের কথা ভুলে যাবে। অভিমান কমে যাবে তবে এখন আমার কেন জানি মনে হল মিমির অভিমান সহজে কমবে না। সত্যিই কমল না। পরের দিন সকালে এক প্রকার অপমান করে শ্বশুর মশাইকে বাসা থেকে বের করে দিল মিমি।
পরের একটা বছর আমি শশুর মশাইকে আরও কয়েকবার চেষ্টা করতে দেখলাম মিমির রাগ ভাঙ্গাতে। তবে মিমি প্রতিবারই কঠিন মুখ দিয়ে তাকে ফিরিয়ে দিত। কী তীব্র অভিমান যে দেখতে পেতাম মিমির চোখেমুখে সেটা বলে বোঝানো যাবে না। মিমি আমার বাবা মায়ের সাথে খুব স্বাভাবিক আচরণ করতো। কিন্তু আমাকে কিছুতেই ওদের বাসায় যেতে দিতো না।
আমি প্রথম প্রথম ওকে বোঝানোর চেষ্টা করলাম। তবে একটা ঘটনা ঘটার পরে আমি বুঝে গেলাম যে মিমির অভিমান কিছুতেই ভাঙ্গবে না। সেইবার শ্বশুর মশাই গাড়ি এক্সিডেন্ট করলেন। বেশ সিরিয়াস ছিল পুরো ব্যাপারটা। আমি অফিস থেকে খবর পেয়েই হাসপাতালে গিয়ে হাজির হলাম। আমি মিমিকে কয়েকবার ফোন করে আসতে বললাম। আমি ভেবেছিলাম এইবার মিমি সকল অভিমান ভুলে বাবাকে দেখতে আসবে। কিন্তু মিমি এল না। সত্যিই মিমি এল না। আমিও বুঝে গেলাম যে মিমির জেদ আর কোনদিন ভাঙ্গবে না। মেয়েদের জেদ যে এতো ভয়ংকর হতে পারে সেটা আমার ধারণার বাইরে ছিল।
আমার অবশ্য খুব একটা সমস্যা ছিল না। আমি আমার শ্বশুর বাড়ির কথা একেবারে ভুলে গেলাম। আমার সেটা দরকারও ছিল না। আমার মিমিকে দরকার ছিল। মিমি আমার চমৎকার বউ হয়েই রইলো। পরে কোন দিন কী হবে না হবে সেটা আমি জানি না, তবে আমার কাছে অন্য সব কিছুর থেকে মিমির ভালোবাসা পাওয়াটাই সব থেকে জরূরী ছিল। আর আমি কেবল আশা করতে পারি যে একদিন মিমি তার বাবা মা পরিবারের প্রতি সকল অভিমান ভেঙ্গে তাদেরকে কাছে টেনে নিবে। এর থেকে আর কীই বা করার আছে!

