দ্যা ডার্ক কুইন (the end)

4.9
(43)

প্রথম পর্ব

পাঁচ

আসফিমা কাজটা করবে কি না, নিজেকে আরেকবার প্রশ্ন করলো । কাজটা করা ঠিক হবে না কি না সে বুঝতে পারছে না । তবে অরনি চৌধুরী যা করেছে সেটার বিপরীতে কিছু একটা করা দরকার অবশ্যই । মোবাইলটার দিকে আরেকবার তাকালো সে । বলা যায় সবাই এখন এইটা নিয়েই কথা বলছে । সবাই সায়নকে নিয়ে ছি ছি করছে । মানুষের এই এক স্বভাব । কারো বিরুদ্ধে কিছু পেলেই হল সত্য মিথ্যা কিছু যাচাই না করেই উঠে পড়ে লাগো ।

অরনী চৌধুরীকে অফিস থেকে চলে যেতে বলার পরই আসফিমা চা নিয়ে হাজির হয়েছিলো । সেই চায়ের আসরেই সায়ানের কাছ থেকে অরনীর কথা জানতে পারে । কোম্পানীর একটা বিজ্ঞাপন তৈরীর সময় অরনীর সাথে সায়ানের পরিচয় হয় ! সেখান থেকে কথা বার্তা শুরু । বেশ চমৎকার সম্পর্ক চলছিলো । কয়েকবার তাদের দেখা সাক্ষাতও হয়েছে । সায়ান অরনীর ব্যাপারে আরও একটু সিরিয়াস কিছু ভাবতে যাবে তখনই মনে হল আরও একটু খোজ খবর নেওয়া যাক মেয়েটার ব্যাপারে । এবং খোজ নিতে গিয়েই কিছু ভয়ংকর তথ্য বেরিয়ে চলে আসল । কিছু ছবিও তার হাতে আসে । তারপরই অরনীর সাথে সব যোগাযোগ বন্ধ করে দেয় সায়ান ।

কিন্তু অরনী এটা মানতে নারাজ । তার কথা হচ্ছে যা হওয়ার হয়েছে সব কিছু নতুন করে আবার শুরু করতে হবে ! সায়ানকে সে কিছুতেই ছাড়বে না ! বাসায় গিয়ে সে নিজের ফেসবুক ফ্যান পেইজে সায়ানের সাথে তোলা একটা সেলফি দিয়ে পোস্ট দিল । এবং সাথে একটা পোস্ট লিখলো যার সারমর্ম যে সায়ান তার সাথে প্রথমে কিছু দিন প্রেমের অভিনয় করে এখন তার সাথে ব্রেক আপ করেছে । সাথে সাথেই পোস্ট ভাইরার হয়ে গেল । সবাই ছিছি করতে লাগলো ।

আসফিমার এই ব্যাপারটা মোটেই সহ্য হল না । মাথার ভেতরে একটা একটা দুষ্ট বুদ্ধ কাজ শুরু করে দিল । সায়ান যে সব তথ্য যোগার করেছিলো তার কিছু তার কম্পিউটারের মেইলে ছিল । রীতিমত গোয়েন্দা লাগিয়ে সে খোজ নিয়েছিলো । গোয়েন্দা সব ছবি যোগার করে সায়ানকে মেইল করেছে । আসফিমা এই ছবির কয়েকটা নিয়ে ওদের কিছু বন্ধুদের ইনবক্সে পাঠিয়ে দিল ! তারপর যা করার আসলে ওরাই করলো । মাত্র দুই ঘন্টার ভেতরে অভিনেত্রী অরনী চৌধুরীর ছবি গুলো ভাইরাল হয়ে গেল । অরনীর ছবি গুলো ছিল কয়েকজন পরিচালকের সাথে । ছবি গুলো তারা নিজেরাই তুলেছিলো । সেই ছবি ডিটেক্টিভ কিভাবে যোগার করলো কে জানে ! সবাই সায়ানের কথা বেমালুম ভুলে গেল । সবাই এখন অরনীর দোষ দিতে শুরু করলো ।

কাজটা ঠিক না সেটা আসফিমা খুব ভাল করেই জানে । কারো ব্যক্তিগত ছবি এভাবে বাইরে নিয়ে আসা মোটেও ভাল কিছু নয় । আসফিমা জানে ব্যক্তিগত তথ্য কিভাবে মানুষকে বিপর্যস্ত করতে পারে । কিন্তু আসফিমার কেন জানি খারাপ লাগছে না ।

পরদিন সকালে সায়ানের জন্য যখন চা নিয়ে হাজির হল তখন সায়ান ওর কাছে জানতে চাইলো, কাজটা তুমি করেছো, তাই না ?
-কোন কাজটা স্যার?
-তুমি খুব ভাল করেই জানো আমি কোন কাজের কথা বলছি !

আসফিমা হেসে ফেলল । যদিও সামলে নিল সাথে সাথেই । তারপর বলল, জি স্যার আমি করেছি !
-কাজ টা কি ঠিক হয়েছে?
-সে যে কাজটা করলো ? সেটা কি ঠিক করেছে ?
-কুকুর আমার পায়ে কামড় দিয়ে আমিও কি তার পায়ে কামড় দিবো?
-কামড় না দেন অন্তত তার পেছনে একটা লাথি তো দিতেই হবে । আমি কেবল তাই করেছি !

সায়ান কি যেন একটা ভাবলো । তারপর বলল, কিন্তু তুমি যে আমাকে বিপদে ফেলে দিয়েছো !
-কি বিপদ স্যার?
-আমার মা আমার বিয়ের জন্য বলা চলে উঠে পড়ে লেগেছিলো কদিন থেকেই । আমারও প্লান ছিল সেই রকমই । কিন্তু মাঝ দিয়ে কি ঝামেলা হয়ে গেল তুমি জানো । মাকে বলেও ছিলাম যে একজনের সাথে মেলামেশা চলছে । অরনীর সাথে এই ঝামেলা না হলে ওকে নিয়েও যেতাম । অন্তত মাকে বলতাম যে অরনীর সাথে ব্রেক আপ হয়েছে । গত কাল কি হয়েছে জানো ?
-কি হয়েছে?
-মা প্রথমে অরনীর পোস্ট টা দেখতে পেয়েছে । তারপর একটু পরেই তুমি যে কাজ করেছো সেটা ! তারপর আমাকে জানতে চেয়েছে । এখন আমি নিশ্চয়ই মাকে এই কথা বলতে পারি না যে এই মেয়ের সাথেই আমার কিছু চলছিলো । কেবল বলেছি যে বিজ্ঞাপন করার সময় কয়েকদিন দেখা হয়েছে !
-তো সমস্যা কি?
-সমস্যা হচ্ছে এখন আমার মা জানতে চাচ্ছে আমার সেই গার্লফ্রেন্ড টা কে ! তার সাথে সে দেখা করতে চায় ! এটাই হচ্ছে সমস্যা !
-স্যার আপনি আমাদের ক্লাসে খুবই জনপ্রিয় ! কেবল ক্লাস না পুরো ফ্যাকাল্টিতেই জনপ্রিয় ! আপনি যদি বলেন আজই আপনার জন্য ১০০টা গার্লফ্রেন্ড যোগার করে দিতে পারি !
-তারপর?
-তারপর আর কি একটা চুজ করবেন আর বিয়ে করে ফেলবেন !
-এর থেকেও ভাল উপায় আছে আমার কাছে !
-কি উপায় স্যার?
-আজ বিকেলে তুমি আমার সাথে যাবে আমাদের বাসায় । আমার গার্লফ্রেন্ড হয়ে?

আসফিমার মনে হল সে ভুল শুনলো । তারপর বলল, কি বললেন স্যার ?
-ঠিকই বলেছি । আপাতত তুমিই সব থেকে নিরাপদ !

আসফিমা সত্যিই বুঝতে পারলো না কি বলবে ! আবার কোন ঝামেলাতে সে জড়াতে যাচ্ছে সেটা ও নিজেই জানে না ।

সন্ধ্যা বেলাতে আসফিমা সায়ানের সাথে গিয়ে হাজির হল ওদের বাসায় । বনানীর শেষ দিকে বিশাল বড় বাড়ি । বাড়িতে থাকার মত কেবল মানুস তিনজন । সায়ান তার ছোট ভাই আর মা । বাকি আর যারা আছে সবাই কাজের মানুষ । আসফিমাকে সোফার উপর বসিয়ে রেখে সায়ান ভেতরে চলে গেল । বোকার মত কিছু সময় সে কেবল বসে রইলো । মাথার ভেতরে কিছুই এল না যেন । বারবার কেবল মনে হতে লাগলো যে কি করতে সে সায়ানের কোম্পানীতে ঢুকেছিলো আর এখন এখানে কেন বসে আছে ।

আর কত সময় বসে থাকতে হবে এমন চিন্তা করতেই দেখতে পেল এক মাঝ বয়সী মহিলা ঘরে ঢুকছেন । তাকে দেখেই আসফিমা উঠে দাড়ালো । মহিলা আস্তে ধীরে আসফিমার কাছে এগিয়ে এল । ওকে দেখলেন খুটিয়ে বেশ কিছুটা সময় । এই পুরোটা সময় আসফিমা সোজা হয়ে কেবল দাড়িয়ে রইলো । মনের ভেতরে কেবল অদ্ভুত চিন্তা কাজ করছে । যে চিন্তার কোন আগামাথা নেই । তবে পর্যবেক্ষনের সময়টা শেষ হয়ে গেল । আসফিমা দেখতে পেল মহিলার মুখে একটা হাসি দেখা দিয়েছে । সে আসফিমার কাছে এসে বসতে বসতে বলল, এভাবে ভয়ে ভয়ে দাড়িয়ে কেন শুনি ? বস ।

আসফিমা বসলো । এখনও ঠিক বুঝে উঠতে পারছে না যে কিভাবে কথা বলা উচিৎ ।
সায়ানের মা বললেন, কি ব্যাপার বস । একটু সহজ হও তো । আমি মোটেই অন্য মহিলাদের মত নই বুঝেছো । এসো দেখি কাছে এসো !
আসফিমা কাছে যেতে সায়ানের মা অবাক করা একটা কাজ করলো। আসফিমা জড়িয়ে ধরলো । আসফিমা একটু চমকে গেল । সাথে সাথেই আসফিমার মনটা সিক্ত হয়ে গেল । চোখ ভোজে এল সাথে সাথে । ঠিক কত বছর কেউ ওকে জড়িয়ে ধরলো ও ঠিক বলতে পারবে না । নিজের মা ওকে শেষ কবে আদর করে জড়িয়ে ধরেছিলো সেটা ওর মনেও নেই ।

ইন্টারমিডিয়েটে ওঠার পরে রুদ্র নামের একটা ছেলের সাথে আসফিমার ভাব হয়ে যায় । আসফিমা ততদিনে সব কিছু কেমন যেন ভুলে গেছে । বারবার মনকে বুঝিয়েছে যে কেবল মনে ধরলে আসলে কিছু হবে না । রুদ্র ছেলেটার ব্যাপারে ওর বাসায় জেনে ফেলে কদিন পরেই। তবে বাসা থেকে একটা প্রছন্ন প্রশ্রয়ের ভাব ছিল । রুদ্র ছেলেটা ওদের এলাকার সিভিল সার্জনের ছেলে । ছেলে পড়া লেখাতে বেশ ভাল ছিল । এলাকাতে একটা সুনামও ছিল এটা নিয়ে ।
কদিন চল প্রেম বেশ ভাল ভাবেই । তারপরই সেই দুর্ঘটনা ঘটলো । নিউইয়ারের দিন বাসায় বলেই বের হল । যদিও বলে গেল বন্ধুদের সাথে ঘুরতে যাচ্ছে মূলত যাচ্ছে রুদ্রের সাথে । বেশ ঘুরাঘুরি চলল । তারপর রুদ্র ওকে নিজের এক বন্ধুর বাসায় নিয়ে গেল । সেখানে আরও অনেকেই ছিল । কিভাবে রুদ্র সবার থেকে আলাদা করে নিয়ে এল একটা রুমে । আসফিমা ওকে বাঁধা দিতে চেষ্টা করলো বটে তবে সেটা মাত্র কয়েক মুহুর্তের জন্য ।

বাসায় যখন ফিরে আসে বারবার কেবল উপরওয়ালার কাছে দোয়া করছিলো যেন কোন ভাবেই যেন রুদ্রের কিছু যেন না হয় । ভয়ে ভয়ে ঘুমিয়ে পড়লো । রাতে আরও দুইবার কথা বলল রুদ্রের সাথে । সব কিছু ঠিক আছে । রুদ্রের কোন সমস্যা হয় নি । এমন কি সকাল বেলাতেও রুদ্রের কাছ থেকে ফোন পেয়ে নিশ্চিত হল খানিকটা । মনের ভেতর থেকে ভয়টা চলে গেল । আগের ঘটনা গুলো কেবলই কাকতালীয় ব্যাপার ছিল । আর কিছু না ।

কিন্তু বিকেল যেতে না যেতেই সংবাদটা এসে হাজির হল । রুদ্র মারা গেছে । দুপুর বেলা খেয়ে ঘুমিয়েছিলো । আর ওঠে নি ।

ঐদিন রাতে আসফিমার মনে হল ওর আর জীবিত থাকার কোন দরকার নেই । ও মারা যাবে । মাকে জড়িয়ে ধরে হুহু করে কাঁদলো । তারপর মুখ ফুটে বলে দিল সব কথা । সেই প্রথম মৃত্যু থেকে শেষ পর্যন্ত ।
মনের ভেতরের কষ্ট হালকা করার জন্য মাকে বলেছিলো কথা গুলো অথচ অবাক হয়ে আবিস্কার করলো ওর মা কেমন চোখে ওর দিকে তাকিয়ে রয়েছে । সেদিনের পর থেকে আর ভাল ভাবে ওর মা ওর সাথে কথা বলে নি । কিভাবে জানি ওর মামার বাসায় কথাটা জেনে যায় । সম্ভবত ওর মা নিজে বলেছিলো ভাইকে । কেন বলেছিলো সেটা আসফিমা জানে না । একদিন ওর মামী বাসায় এসে ওকে যাচ্ছেতাই বলে কথা শুনিয়ে গেল । তার ছেলের মরার জন্য সেই দায়ী সেটাই বলে গেল । আসফিমা এতোই অবাক হয়ে গেল যে মুখ দিয়ে একটা কথাও বলতে পারলো না । যেন সব দোষ ওর নিজের ! অথচ ও নিজে কিছু করে নি ।

সায়ানের মা যখন আসফিমা ছাড়লেন তখন আসফিমার চোখে পানি দেখে অবাক হয়ে গেলেন । তারপর বললেন, আরে বোকা মেয়ে কাঁদছো কেন ?
-এমনি আন্টি ! আসলে এমন ভাবে অনেক দিন কেউ আমাকে জড়িয়ে ধরে নি ।
-তাই বুঝি ? আমার ছেলেও না !
আসসফিমা লজ্জা পেল । মাথা ঝাকালো ।
সায়ানের মা বলল, আচ্ছা গাধা ছেলে দেখছি !

আসফিমা আরও কিছু বলতে যাচ্ছিলো কিন্তু ওকে থেমে যেতে হল । তাকিয়ে দেখলো আয়ান এসে ঢুকে ঘরে । ওকে এখানে দেখে খানিকটা অবাকই হয়েছে । মায়ের দিকে তাকিয়ে রইলো কিছুটা সময় । সায়ানের মা বললেন, আরে এটা সায়ানের গার্লফ্রেন্ড ! সেদিন বলল না !
খানিকটা চোখ গোল গোল করেই সে তাকিয়ে রইলো আসফিমার দিকে । খানিকটা সময় বোঝার চেষ্টা করছে পরিস্থিতি কোন দিকে যাচ্ছ। তারপর আসফিমার দিকে তাকিয়ে বলল, তুমি এখানে?
সায়ানের মা বলল, তুই চিনিস নাকি মিমুকে?

আয়ান কিছু বলতে যাবে তার আগেই পেছন থেকে সায়ানের কন্ঠ শোনা গেল । সে ফ্রেশ হয়ে বের হয়ে এসেছে । মায়ের দিকে তাকিয়ে বলল, চিনবি কী মা আজকে আয়ান না থাকলে হয়তো মিমুর সাথে আমার পরিচয়ই হত না ।
ওদের মা খানিকটা অবাক হয়ে আয়ানের দিকে তাকিয়ে আছে । দুই ভাইয়ের ভেতরে যে দ্বন্দ্ব রয়েছে সেটা ওদের মায়ের থেকে ভালো আর কেউ জানে না। সায়ানের বাবা আরমান চৌধুরী তার ছোট ছেলেকে কোন দিনই ঠিক পছন্দ করে নি । অবশ্য পছন্দ করার মত তেমন কিছু ছিলও না আয়ানের ভেতরে । তাই তিনি জানতেন যে সম্পত্তি দুই ভাইয়ের ভেতরে ভাগ করে দেওয়া মানেই হচ্ছে অর্ধেকটা নষ্ট করে ফেলা । এই জন্যই পুরো ব্যবসাই সায়ানের হাতে দিয়ে গেছেন । কিছু জায়গা সম্পত্তি আয়ানের নামে দেওয়া হয়েছে তবে সেগুলো যাতে সে বিক্রি না করতে পারে সেই ব্যবস্থা করে গেছেন তিনি। অবস্থা এমন যে আয়ান নিজের প্রয়োজনী সব কিছু করতে সায়ানের কাছে যেতে হবে । সায়ান ওকে পরিস্কার বলেছে মাসিক একটা হাত খরচ ওকে দেওয়া হবে । এরবাইরে যদি কোন প্রজেক্ট করতে চায় নতুন ব্যবসা করতে চায় কিংবা যে কোন কাজ করতে চায় সেই ব্যাপারেো আয়ানকে টাকা দিতে কোন সমস্যা নেই । কিন্তু যদি টাকা উড়ানোর মতলব থাহলে একটা টাকাও সে পাবে না ।
মা হিসাবে তারা দুইজনই তার সন্তান । সায়ানের কাধে যে দায়িত্ব ও বাবা দিয়ে গেছে সেটার হিসাব করতে গেলে সায়ান যা করছে সেটা ঠিক আছে । ছোট ভাইয়ের যে কোন দরকারে কিংবা কোন ইচ্ছে সে অপূর্ণ রাখে না কিন্তু নষ্ট যাতে না সেদিকেও খেয়াল আছে । অন্য দিকে আয়ানের অভিযোগ তার বাবা তাকে বঞ্চিত করেছে । সে যা চাচ্ছে পাচ্ছে কিন্তু তাকে তার বড় ভাইয়ের কাছে চাইতে হচ্ছে । সে কেন চাইবে ! তার নিজের জিনিস সে কেন অন্যের কাছে চাইবে ।

সায়ানের মা রাহেলা বেগম বললেন, সত্যিই নাকি রে?
সায়ান বলল, শত ভাগ সত্য ভাল । আয়ান আমার জন্য মিমুকে পছন্দ করেছে । ভাবলাম ছোট ভাইয়ের পছন্দ বলে কথা !
-বাহ !
আয়ান আরও কিছু সময়ে সবার দিকে তাকিয়ে রইলো। তারপর কোন কথা না বলে ঘর থেকে বের হয়ে গেল ।

পুরো বিকেলটা আসফিমা কাটলো সায়ানদের বাড়িতে । রাহেলা বেগম কত কথা যে বললেন আসফিমার সাথে । এই এতো বাড়িতে তার একা একা লাগে । একটা সঙ্গী এবার চাই ই চাই । তাই তার ইচ্ছে যত দ্রুত সম্ভব সায়ানের সাথে আসফিমার বিয়ে দিয়ে দিবে । এই জন্য আসফিমার বাবা মায়ের সাথে রাহেলা বেগম কথা বলতে চান !
আসফিমা কেবল তন্ময় হয়ে শুনছিলো সব । ওর কাছে কেবলই স্বপ্নই মনে হচ্ছিলো । আসলে এসব আসলে স্বপ্নই । আসফিমা খুব ভাল করেই জানে যে এই স্বপ্ন কোন দিন পূরণ হবার নয় !

ছয়
সপ্তাহ দুয়েকের ভেতরেই ওদের অফিসের সবাই জেনে গেল যে আসফিমার সাথে তাদের বস সায়ান আহমেদের প্রেম চলছে । ব্যাপারটা জানা জানি হত না । সায়ানের পরিকল্পনা ছিল যে আসফিমাকে নিয়ে গিয়ে ওর মায়ের সাথে পরিচয় করিয়ে দেওয়া । এবং কিছুদিন মাকে শান্ত রাখা । আর কিছু না । কিন্তু রাহেলা বেগম যে এমন উতলা হয়ে যাবেন ছেলেকে বিয়ে দেওয়ার জন্য সেটা সায়ান বুঝতে পারে নি ।

সপ্তাহ খানেক পরেই রাহেলা বেগম সায়ানের অফিসে গিয়ে হাজির হলেন । তখন সায়ান একটা অফিস মিটিংয়ে ব্যস্ত ছিল । আসফিমা ছিল ওর পাশেই । অফিসের বেশ কিছু কর্মকর্তাদের সাথে আলোচনা ছিল নতুন একটা ফ্যাক্টরি বানানো নিয়ে । সেই সময়ে রাহেলা বেগম ঢুকে পড়ে ভেতরে ।

ঢুকে পড়েই একবার সবার দিকে তাকালেন । চোখ পড়লো আসফিমার দিকে । এমন মিটিং এ পিএসদের খাটনি সব থেকে বেশি । এটা দাও ওটা এটা নিয়ে এস, কোন ফাইলটা কোথায় আছে এসব সামলাতে হয় । আসফিমার বেশ খাটনি হয়ে যাচ্ছিলো । তবে এই পরিশ্রম করতে তার ভালও লাগছিলো । রাহেলা বেগম আসফিমার দিকে তাকিয়েই বুঝটে পারলেন মেয়েটার পরিশ্রম হয়ে হচ্ছে । ছেলের দিকে তাকিয়ে বললেন, কত সময় ধরে মিটিং করছিস তুই ।
সায়ান তখনই ঠিক বুঝতে পারে নি তার মা হঠাৎ কেন এসেছে অফিসে ! বলল, কেন মা?
-মেয়েটাকে একটু বিশ্রাম দে ! নিজের হবু বউকে কেউ এভাবে খাটায় !
পুরো সবাই অবাক হয়ে আসফিমার দিকে তাকালো ।
রাহেলা বেগম আবারও সবাইকে উপেক্ষা করে আসফিমার দিকে তাকিয়ে বলল, মিমু তুমি আমার সাথে এসো তো ! কাজ করলে এটা করুক একা একা !

আসফিমা পড়লো বিপদে । ও এখন কি করবে ! মিটিংয়ে থাকবে নাকি রাহেলা বেগমের সাথে বের হয়ে যাবে । সে অনুমূতির জন্য সায়ানের দিকে তাকালো । সায়ান ততক্ষনে বুঝে গেছে যে সর্বনাশ হওয়ার হয়ে গেছে । এখন আর কিছু ঠেকিয়ে রাখা যাবে না । সে আসফিমার দিকে তাকিয়ে বলল, যাও ।

আসফিমা সবার সামনে মাথা নিচু করে বের হয়ে এল রাহেলা বেগমের সাথে । রাহেলা বেগম তাকে নিয়ে অফিসের গেস্ট রুমের দিকে গেল । বাসা থেকে সে আসফিমার জন্য রান্না করে নিয়ে এসেছিলো । সেটাই ওকে খাওয়াই লক্ষ্য ছিল । সেটা যখন তিনি করছিলেন আসফিমা বুঝতে পারছিলো যে কাদের দেওয়ালের ওপাশ থেকে কিছু কৌতুহলী চোখ ওদের দিকে তাকিয়ে রয়েছে । ওকে নিয়ে ফিসফাস কথা বলা শুরু হয়েছে ।

রাহেলা বেগম চলে যাওয়ার পরপরই আসফিমা আমার সায়ানের রুমে গিয়ে ঢুকলো । গিয়ে দেখে সেখানে সায়ান গম্ভীর মুখে বসে আছে । আসফিমা কি বলবে সেটা বুঝতে পারলো না । আসলে পরিস্থিতি যে এদিকে চলে সেটা সে ভাবতেই পারে নি । আর এর পেছনে তার নিজের কোন হাত নেই বললেই চলে । তার কিছু করারও ছিল না ।
আসফিমা ডাক দিল, স্যার । আমি আসলে সরি !
সায়ান ফিরে তাকালো ওর দিকে । তারপর বলল, আরে এখানে তোমার কোন দোষ নেই । তুমি কেন সরি বলছো? সরি বলার কিছু নেই ।

পরদিন আসফিমা যখন অফিসে ঢুকছিলো তখন একটা ব্যাপার সে ঠিকই খেয়াল করলো যে আশে পাশের সব কিছু কেমন বদলে গেছে । সবাই ওর দিকে আলাদা এবং অন্য চোখে তাকাতে শুরু করেছে । এতোদিন সে ছিল পিএস টু বস । তার সাথে এমনিতেই সবাই একটু সমীহ করে কথা বলতো । হাজার হলেও বসের সব থেকে কাছে থাকে সব সময় । এখন সে হয়ে গেছে বসের প্রেমিকা । যেনতেন প্রেমিকা না, এমন প্রেমিকা যাকে বসের মা নিজ থাকে খাবার খাইয়ে গেছে অফিসে এসে । সবার বুঝতে বাকি নেই যে ব্যাপারটা কতদুর গড়িয়েছে ।
কিন্তু আসল ভেতরের খবর তো আর কেউ জানে না । আসফিমার কি সুখী হওয়া উচিৎ? যা হচ্ছে তেমন টাই হতে দেওয়া উচিৎ? আমার মাঝ দিয়ে আয়ান আহমেদের কথাও মনে পড়লো । যে কাজের জন্য তাকে এখানে আনা হয়েছে সেই কাজটাও তো করতে হবে ! আসফিমা হাটতে হাটতে এসবই ভাবছিল । নিজের ডেস্কে বসার আগে সায়ানের রুমে একবার ঢু মারতে ভেতরে ঢুকলো সে । ঢুকেই একটু অবাক হল । তাকিয়ে দেখলো সেখানে, সায়ানের চেয়ারে আয়ান বসে রয়েছে । ওকে ঢুকতে দেখেই আয়ান এক গাল হাসলো । তারপর বলল, তো মিস জিএফ টু সিইও, হাউ আর ইউ?
আসফিমা একটু বিরক্ত হল । তারপর বলল, আপনি জানেন এসব কিছুই না ? আমি আপনার ভাইয়ের জিএফ না !
-উফ । আসতে । এসব কথা জোড়ে বলতে নেই । আমি সব জানি । তবে যাই হোক কালে আম্মু এসেছিলো তো অফিসে? ভাল করে খাইয়ে গেছে তোমাকে?

আসফিমার কেমন যেন সন্দেহ হল । সে বলল, কাল আপনার আম্মুর এখানে আসার পেছনে কি আপনার হাত রয়েছে ?
আয়ানএই প্রশ্নের জবাব দিল না । তার উত্তরে কেবল হাসলো । হাসির ধরন দেখেই আসফিমার মনে হল যে আয়ানই তাকে কোন কু বুদ্ধি দিয়েছে । আয়ান চেহারা থেকে উঠে দাড়ালো । পুরো কেবিনে একটু হাটতে লাগলো । তারপর বলল, আমার ভাই যে নিজের মরণ এভাবে দেকে আনবে সেটা আমি নিজেও বুঝতে পারে নি । স্বভাব চরিত্রে আমার ভাই বেশ ভাল । কিন্তু নিজের স্ত্রীকে তো ভালোবাসতেই পারে । সেটা তো আর কোন দিক দিয়ে অন্যায় না । তুমি জেনে খুশি হবে আমার মা তোমাদের মায়ের সাথে ইতিমধ্যে কথা বলে ফেলেছে । মানে তোমার বিয়ের ব্যাপারে । আজ রাতে সম্ভবত তোমার মা বাবা ঢাকাতে আসবেন। তাদেরকে নিয়ে আসার জন্য গাড়ি ইতিমধ্যে রওয়ানা দিয়ে দিয়েছে ।
আসফিমা কেবল চোখ বড় বড় করে তাকিয়ে রইলো আয়ানের দিকে ।
আয়ান বলল, আই ডোন্ট কেয়ার তুমি আমার ভাইয়ের সাথে বিয়ে কর, কী কর না কর আই রিয়্যালি ডোন্ট কেয়ার ! এজ লং এজ হি ইজ গোয়িং টু ডাই আই হ্যাম নো প্রবলেম !

আয়ান চলে যাওয়ার পরে আসফিমা সোফার উপরে বসে পড়লো । মনের ভেতরে একটা অদ্ভুত অনূভূতি হচ্ছে । ও এই কদিনে সায়ানকে খুব কাছ থেকে দেখেছে । এরই ভেতরে ওকে ভালোবেসে ফেলে নি কিন্তু এই টুকু বুঝতে পেরেছে যে মানুষ হিসাবে সায়ান ভাল মানুষ ।আর যদি সত্যিই সত্যিই বিয়ে হয়ে যায় তাহলে কোন ভাবেই নিজেকে সায়ানের কাছ থেকে দুরে রাখতে পারবে না । তখন কি হবে ? নিজের স্বামীর মৃত্যুর কারণ হবে সে !
নো নো ! এটা হতে পারে না । মনে মনে ঠিক করে নিল । কিছুতেই করবে না সে । কোন ভাবেই না ।

কিন্তু ঘটনা এতো দ্রুত ঘটে গেল যে আসফিমা কিছুই বুঝে উঠতে পারলো না । পরদিন সকালে আসফিমার বাবা মা আর ভাই এসে হাজির হল ঢাকাতে । সোজা সায়ানদের বাড়িতে । আসফিমাকে তারা কিছুই জানায় নি । আসফিমা যথারীতি অফিসে এসে হাজির । কিন্তু একটু পরেই সায়ানের ফোন এসে হাজির । তাকে ওদের বাসায় যেতে বলছে সে । গাড়ি পাঠিয়েছে দিয়েছে ।

বাসায় যখন হাজির হল তখন সে আকাশ থেকে পড়লো । বিয়ের সব আয়োজন সম্পন্ন । বাবা মা কে খুশি দেখাচ্ছে । সায়ানের মা আনন্দে যেন আলো ছড়াচ্ছে । আয়ান আর ওর ছোট ভাই আরিয়ান দুজন মিলে পুরো বাড়িময় ঘুরে বেড়াচ্ছে । একটা উৎসব উৎসব ভাব । আসফিমা চোখ বড় বড় করে কেবল তাকিয়ে রইলো ।

বিয়ে যখন হবে তার ঠিক আগে সায়ানকে এক রুমে ডেকে নিয়ে গেল সে । তারপর কাতর স্বরে বলল, আমি বিয়ে করতে চাই না ।
সায়ান যেন সেটাকে একদমই পাত্তা দিল না । বলল, অন্য কাউকে পছন্দ ? আমার থেকে ভাল?
-আপনি কেন আমাকে বিয়ে করতে চাইছেন ? আপনি কি ভুলে গেছে আমি কেন এসেছি?
-ভুলি নি। এই জন্যই তো ! আমি জানি আয়ান তোমাকে কোন কারণে আমার সামনে নিয়ে এসেছে কিন্তু আমার সাথে এই কয়মাসে থেকে তুমি বদলে গেছো । আমি সেটা অনুভব করতে পারছি । তুমি আমাকে মারতে পারবে না । তার থেকেও বড় ব্যাপার হচ্ছে মা তোমাকে খুব পছন্দ করেছে । আমার কাছে মায়ের থেকে বড় কিছু নেই ।
-কিন্তু আপনি সত্যি মারা পড়বেন !
-তুমি মারবে?
-দেখুন আমি না চাইলেও মরবেন ! আমি অভিশপ্ত একটা মানুষ !
আসফিমার কথা শুনে যেন সায়ান খুব মজা পেল । তারপর বলল অভিশপ্ত ? হাহাহা !
-বিশ্বাস করুন আমার কথা ! প্লিজ ……

এরপর আসফিমা ওর পুরো কথা গুলো বলে গেল একে একে । কিভাবে ওর সাথে কি কি ঘটেছে সব ! সব শুনে সায়ান কিছু সময় চুপ করে রইলো । আসফিমা বলল, এরপরেও আমাকে বিয়ে করতে চান?
-তুমি যা বলছো তা অসবিশ্বাস্য । তারা এমনিতেই মারা গেছে !
-সবাই?
-হ্যা ।
-তার মানে আপনি বিয়ে করবেনই ?
-হ্যা ।
-তাহলে আমারও একটা শর্ত আছে?
-কী শর্ত ?
-বিয়ের পরে আপনি আমার সাথে সেক্স করতে পারবেন ন! কোন ভাবেই না । রাজি?
সায়ান একটু যেন হাসলো । বলল, ওকে রাজি । আমি তোমার কাছে যাবো না যতদিন না তুমি আমার কাছে আসো ! তবে তুমি নিজ থেকে এগিয়ে এল কিন্তু …..

সাত
আসফিমার নতুন জীবন শুরু হল । ঐদিনই ওদের বিয়ে হয়ে গেল । ঘরোয়া ভাবে । কয়েকদিন পরে আয়োজন করে আরও বড় ভাবে বিয়ের অনুষ্ঠান করা যাবে । আসফিমা হল ছেড়ে সায়ানদের বাসায় উঠে এল । রাতে সায়ানের ঘরেই ঘুমাতে লাগলো । একটা মাস কেটে গেল একই ভাবে । অফিসে সবাই জেনে গেছে আসফিমার বিয়ে হয়ে গেছে সায়ানের সাথে । পিএসে চাকরি সে যদিও এখনও করে চলেছে ।

সায়ান তার কথা রেখেছে । এই এক মাসে সে একটা বারও আসফিমার সাথে কোন প্রকার শারীরিক সম্পর্ক করার চেষ্টা করে নি । তবে ওর সাথে সময় কাটাচ্ছে ঠিকই । অফিসে যাচ্ছে এক সাথে, গল্প করছে অফিস শেষ করে বাইরে একটু ঘুরে বেড়াচ্ছে । আসফিমাও তাল মিলিয়ে চলছে । রাতে ঘুমানোর সময় মাঝে একটা কোল বালিস দিয়ে তারপর ঘুমাচ্ছে ।
কিন্তু এক দিন একটু ঝামেলা হয়ে গেল। সকালে অফিসে যাওয়ার জন্য আসফিমা গোসল সেরে সবে বের হয়েছে, চুল মুছছে । তখনই চোখ গেল সায়ানের দিকে । সায়ান ওর দিকে তাকিয়ে রয়েছে । দুজন একভাবে কিছু সময় একে অন্যের দিকে তাকিয়ে রইলো । তারপর আসফিমার যে কি হল সেটা সে নিজেই বলতে পারবে না । দেখতে পেল সায়ান ওর দিকে এগিয়ে এসেছে । হাত থেকে তোয়ালেটা পরে গেল আসফিমা । কয়েক মুহুর্ত পরে আবিস্কার করলো যে সায়ান ওকে জড়িয়ে ধরে চুমু খাওয়া শুরু করছে । নিজেকে বড় দুর্বল মনে হল । কিছুতেই সায়ানকে বাঁধা দিতে পারলো না । বাঁধা দেবে কি সে নিজেই সায়ানকে সাহায্য করতে লাগলো ।

এই এক মাসে আসফিমা এই টুকু অন্তত বুঝতে পেরেছে যে যতই সে সায়ানের সাথে থাকতে শুরু করেছে ততই সে সায়ানের প্রতি একটা আকর্ষণ অনুভব করতে শুরু করেছে । স্বামী স্ত্রীর দুজন দুজনার প্রতি এই আকর্ষন চিরন্তন । এটা কোন ভাবেই এড়ানো সম্ভব না ।
চুমু খাওয়া শেষ করে যখন সায়ান ওর পরনের তোয়ালে খুলতে উদ্ধত হল তখন আসফিমার হুস ফিরলো ।
-সায়ান প্লিজ স্টপ
-আর একটু ..।
-না না প্লিজ স্টপ প্লিজ আই বেগ প্লিজ স্টপ ।
আসফিমা কেঁদে ফেলল । কান্না শুনেই সায়ান ওকে ছেড়ে দিল । ওঠে বসলো ওর পাশে। আসফিমা কান্নারচ চোখ নিয়েই আস্তে আস্তে উঠে বসলো । তারপর সায়নকে পেছন থেকে জড়িয়ে ধরলো ।
-তোমার কাছ থেকে দুরে থাকা আমার পক্ষে কতটা কঠিন তোমাকে কিভাবে বুঝাবো?
-তাহলে কেন থাকছো ?
-আমার কারনে তোমার কিছু হলে আমি …..
-তুমি এ যুগে এসেও এসব বিশ্বাস করো !

সায়ান উঠে দাড়ালো । ওয়াশরুমে ঢুকতে ঢুকতে বলল, আমি কথা দিয়েছি তোমার ইচ্ছের বিরুদ্ধে কিছু করবো না । আমি কথা রাখবো !
তারপর ভেতরে ঢুকে পরলো ।
আসফিমা তাকিয়ে রইলো বন্ধ হয়ে যাওয়া দরজার দিকে । তারপর ভাবার চেষ্টা করলো একটু আগে কি হল ! শারীরিক সম্পর্কে এই প্রথমবার নয় । ওর সাথে আরও সাত বার এইরকম ঘটনা ঘটেছে । সে দেখেছে পুরুষ গুলো কিভাবে জংলী হয়ে ওঠে । কিছুতেই নিজেদেরকে নিয়ন্ত্রন করতে পারে না । আসফিমার উপর আগের মানুষ গলোর কোন অধিকার ছিল না । বলতে গেলে জোর করেই ওর সাথে শারীরিক সম্পর্ক তৈরি করেছে তারা মোট কথায় তাকে ধর্ষণ করেছে । রুদ্রে ব্যাপারটার জন্যও আসফিমা মোটেও প্রস্তুত ছিল না । পরে জেনেছে যে ঐদিন পার্টিতে অনেকেই নাকি মদ খেয়েছিলো । সেটা আসফিমাকেও খাইয়ে দিয়েছিলো ।
আর একটু আগে সায়ান কিভাবে থেমে গেল । যেখানে আসফিমা ওর বিয়ে করা স্ত্রী !

সকালের নাস্তার টেবিলে সায়ান গম্ভীর হয়েই রইলো । অফিস যাওয়ার পথেও চুপ করে রইলো । আসফিমার নিজের কাছে কেমন যেন অপরাধী অপরাধী লাগছিলো । দুপুরের দিকে হঠাৎ মনে হল শারীরিক সম্পর্কে না হোক, সায়ানকে সে চুমু খেতেই পারে ! কোন সমস্যা নেই তো !

ভাবনা টা মনে আসতেই সে নিজের ডেস্ক থেকে উঠে সায়ানের কেবিনে গিয়ে হাজির হল । সায়ান তখন একটা ফাইল দেখছিলো । ওর দিকেএকটু তাকিয়ে আবার কাজে মন দিল । আসফিমা সোজা সায়ানের কাছে গিয়ে হাজির হল । ফাইলটা এক পাশে সরিয়ে রেখে সায়ান কিছু বুঝে ওঠার আগেও ওর ঠোঁটে চুমু খেল । একবার দুইবার তারপর অগনিত ভাবে ! একটা সময়ে সায়ানও যোগ দিল !

-খুশি?
-জানি না । আমি আসলে তোমাকে কিছুতেই বুঝতে পারছি না । তুমি কি চাও !
-আমি চাই তুমি বেঁচে থাকো । ঠিক থাকো

রাতে শোয়ার সময়ে এরপর থেকে আর কোলবালিশ থাকতো না । সায়ানের যদিও নিয়েজে নিয়ন্ত্রন করতে কষ্ট হত তবে সে কেবল আসফিমাকে চুমু খেয়েই সন্তুষ্ট থাকতো। মাঝে কেবল চুমু কেবল ঠোটেই নয় দেহের নানান স্থানেও খেত । প্রথম প্রথম একটু ভয় পেলেও আসফিমা একটা সময় বুঝতে পারলো যে কেবল চুমু খেলে কিছু হবে না । এই ভাবে আরও বেশ কিছু সময় পার হয়ে গেল । তবে আসফিমা ঠিকই বুঝতে পারতো যে সায়ানের এই টুকুতে মন ভরে না । কিন্তু কিছু বলেও না সে । আসফিমার যে ইচ্ছে করে না সেটাও তো না ! কিন্তু এই জিনিস পরীক্ষা করার তো উপায় নেই ।

আট
আসফিমা সামনে বসা মানুষটার দিকে বেশি সময় তাকিয়ে থাকতে পারছে না । কেমন একটা তীক্ষ চোখে তাকিয়ে রয়েছে ওর দিকে । আর কী সেই তীক্ষ দৃষ্টি । এতো কঠিন কারো চোখের দৃষ্টি হতে পারে সেটা আসফিমার জানা ছিল না । এয়ারপোর্টের ক্যাফেটরিয়াতে বসে আছে ওরা দুজন । সায়ান দুদিন আগে চট্টগ্রামে গিয়েছে ব্যবসার কাজে । আসফিমার যাওয়ার কথা ছিল কিন্তু রাহেলা বেগমের হঠাৎ একটু জ্বর চলে আসার কারণে যায় নি । আজকে সায়ান ফিরে আসছে । তাকে নিতেই এয়ারপোর্টে আসছে । একটু আগে চলে এসেছে । বসে ছিল এমন সময় এই মানুষটা তার সামনে এসে বসলো । এমন ভাবে তাকে সম্মোধন করলো যেত ওকে অনেক দিন থেকেই ।
-আসফিমা কেমন আছেন?
-সরি কে আপনি?
-আমাকে চিনবেন না । আমার নাম কি সেটাও জানার দরকার নেই !

আসফিমা ভাল করে যুবকের দিকে তাকালো । বয়স ওর মতই হবে কিংবা ওর থেকে আরও একটু বড় । চুল গুলো একটু বড় মুখো খোঁচা খোঁচা দাড়ি ! পরনে কালো শার্ট আর কালো জিন্স ! আফসিমা বলল, জি বলুন !
-আপনার স্বামী আসছে চট্রগ্রাম থেকে ?
এবার একটু সতর্ক হয়ে উঠলো । যুবক অনেক কিছে জানে । কে এই লোক? আয়ান ভাড়া করেছে?

ওর মনের কথাই যেন টের পেল সে । হাসলো । তারপর বলল, ভয় নেই আমাকে কেউ ভাড়া করে নি । আমি এখানে এসেছি একটা ছোট্ট গল্প বলার জন্য । তারপর চলে যাবো !
-সরি আমার গল্প শোনার মুড নেই ।
-শুনে নিন । উপকার হবে ।
এই বলে যুবক কিছু সময় থামলো । তারপর বলল, আপনি নিশ্চয়ই মানেন যে এই পৃথিবীতে কেবল মানুষই একলা নেই? আরও অনেক এন্টিটি স্প্রিরিট রয়েছে । তাই না ?
আসফিমা কোন উত্তর দিল না ।
সে বলল, অনেক দিন আগে এমনই একটা শক্তিশালী এন্টিটি একদিন রাতের বেলা যাচ্ছিলো । হঠাৎ করেই সে একটা মেয়ের কান্না শুনতে পায় । মেয়েটি তীব্র কষ্ট নিয়ে নিজের মৃত্যু কামনা করছে । সেই এন্টিটির কৌতুহল হল । সে সেই মেয়ের কাছে গিয়ে হাজির হল । তার শরীর স্পর্শ করতেই মেয়েটির কান্নার কারণ সে জেনে গেল ! ঐদিন তার এক আত্মীয় তার সাথে জোর করে তার সাথে শারীরিক সম্পর্ক তৈরি করেছে । মেয়েটির সেই কষ্ট সে অনুভব করতে পারলো । মেয়েটির সাথে হওয়ার অন্যায় । সে তখনই গিয়ে হাজির হল সেই মানুষটির বাড়ি । বুকের হৃদপিন্ডকে থামিয়ে দিয়ে এল । তারপর থেকে সে সর্বক্ষণ সেই মেয়ের সাথেই ছিল । যতবার সে যে তার সাথে এমন অন্যায় করতে চেয়েছে ততবার তাদের মৃত্যু হয়েছে ।

আসফিমা তীব্র বিস্ময় নিয়ে তাকিয়ে রইলো সামনে বসা মানুষটার দিকে । মুখের ভাষা হারিয়ে ফেলেছে । যুবক আবার বলল, তবে মেয়েটার বিয়ের পর সেই এন্টিটি তাকে ছেড়ে গেছে । তার মনে হয়েছে তার আর থাকার দরকার নেই । তবে আবারও যদি তীব্র ভাবে তাকে ডাকা হয় তাহলে সে আসবে !

যুবক উঠে দাড়ালো ! একটু হেসে বলল, আপনাকে যাকে ভালোবাসেন, তার ক্ষতি হবে না ।
আসফিমা কোন মতে বলল, কিন্তু ….
-সেই ছেলে আপনাকে ভালোবাসতো না । ভয় নেই । আপনার স্বামীর কিছু হবে না । মনে রাখবেন স্বামী স্ত্রীর ভেতরে সম্পর্ক হচ্ছে পবিত্র সম্পর্ক ! এটার জন্য কোন ক্ষতি হতে পারে না !

তখনই ওর ফোনে রিং বেজে উঠলো । সায়ান চলে এসেছে । আসফিমা তাকিয়ে দেখে যুবক ততক্ষনে হাটা ধরেছে । কয়েকবার ডাক দিল তাকে তবে সে শুনলো না । ভীড়ের ভেতরে হারিয়ে গেছে ।

-এই কি হল?
পেছন থেকে তাকিয়ে দেখে সায়ান দাড়িয়ে । আসফিমা একভাবে তাকিয়ে রয়েছে ওর দিকে ।
-চল বাসায় চল !
সায়ান অবাক হয়ে বলল, আগে অফিসে চল একটু কাজ আছে !
-না । কোথাও না । আগে সোজা বাসায় !
-কি হয়েছে?
-কিছু হয় নি । সোজা চল বাসায় ।

সায়ান কিছু বলল না ! বাসায় গিয়ে প্রথমে মায়ের রুমে সায়ান হাজির হল । একটু কথা শেষ করতে না করতেই আসফিমা ওকে টেনে নিয়ে গেল নিজের ঘরে । দরজা বন্ধ করেই রীতিমত ঝাপিয়ে পড়লো ।
সায়ান কেবল অবাক হয়ে বলল, আরে বাবা ! কী হয়েছে এমন কেন করছো !
আসফিমা কেবল, চুপ! কোন কথা না একদম চুপ !

আসফিমার মনের ভেতরে যে একটু ভয় করছিলোনা সে বলতে পারবে না । তবে সেই যুবকের শেষ কথা টা বারবার মনে আসছিলো । মনে রাখবেন স্বামী স্ত্রীর ভেতরে সম্পর্ক হচ্ছে পবিত্র সম্পর্ক ! এটার জন্য কোন ক্ষতি হতে পারে না ! সত্যিই তাই।

পরিশিষ্ট

তারপর কেটে গেছে আরও মাস খানেক সময় । এই পুরো মাসে আসফিমা দুজন দুজনকে আরও তীব্র ভাবে ভালোবেসেছে । একে অন্যকে আরো নিবিড় ভাবে কাছে টেনে নিয়েছে । প্রথমের পর পুরোটা সময় আসফিমা ভয়ে ভয়ে ছিল । একেবারে সায়ানের সাথে সাথে ছিল । একটা ভয় ঠিকই কাজ করছিলো যে যদি কিছু হয়ে যায় । কিন্তু হয় নি । প্রথমদিন ঠিক ঠিক পার হয়ে গেল । এরপর সায়নই যেন আর পেয়ে বসলো ওকে । বলল, দেখেছো তো তুমি খামোখা ভয় পাচ্ছিলে ! এবার কিন্তু আর কোন কথা শুনবো না !
আসফিমা হেসেছিলো । তারপর বলেছিলো যে আমিও আর বাঁধা দিবো না !

এখন আয়ান মাঝে মাঝে আসফিমার কাছে জানতে চায় কিছু হয়েছে কিনা ! আসফিমা হাসে ! হাসতে হাসতেই বলে, তোমার ভাই খুব ভদ্র আমার গায়ে হাত দেয় না । তাই কিছু হয় নি এখন । তবে তুমি আশা হারিও না । একদিন হবে !

How useful was this post?

Click on a star to rate it!

Average rating 4.9 / 5. Vote count: 43

No votes so far! Be the first to rate this post.

Related Posts

2 thoughts on “দ্যা ডার্ক কুইন (the end)

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *