4.8
(42)

বাচ্চাটার মা মারা গেল সন্ধ্যা বেলা । হিমি তখন স্টাফ রুমে বসে বিশ্রাম নিচ্ছিলো তখনই একজন নার্স ছুটে এল । কেবিন নম্বর চারের পেসেন্ট কোন কথা বলছে না । হিমি উঠে দাড়ালো । রোগীর অবস্থা ভাল ছিল না । বাচ্চা জন্ম দিতে গিয়ে মেয়েটার অবস্থা বেশ কাহিল হয়ে পড়েছিলো । শরীর ভেঙ্গে গিয়েছিলো অনেকটা । হিমি বুঝতে পারছিলো যে মেয়েটা বাঁচবে না । কিছু কিছু মানুষের চেহারাতে ফুটে ওঠে ব্যাপারটা । হিমি ব্যাপারটা আগেও খেয়াল করেছে । নীলিমা নাম মেয়েটার । বয়স হবে ওর মতই । ফুটফুটে একটা বাচ্চা জন্ম দিয়েছে মেয়েটা । কি চমৎকার দেখতে হয়েছে ।

কেবিনে গিয়ে দেখলো সব কিছু শেষ । মেয়েটা ঘুমের ভেতরেই মারা গেছে । বড় স্যার এসে দেখলো । কিছুই করার ছিল না কারো । পাশে বাচ্চাটা তীব্র চিৎকার করে কাঁদছে । সম্ভবত বুঝতে পেরেছে যে এই পৃথিবীর সব থেকে আপন মানুষটা তাকে ছেড়ে চলে গেছে । কয়দিন হয়েছে বাচ্চাটার বয়স? মাত্র ছয়দিন । এর ভেতরেই গলায় আওয়াজ বেশ বেড়েছে । বাচ্চার দাদী বাচ্চাটাকে সামলানোর চেষ্টা করছে কিন্তু কোন লাভ হচ্ছে না । সবার চোখে পানি । তারপরেও চোখে একটা ব্যতীব্যস্ততা । বাচ্চাটা এতো চেচাচ্ছে কেন? ওকে কেউ থামাও !

হিমি দেখতে পেল বাচ্চার দাদী বাচ্চাটাকে নিয়ে রুমের বাইরে চলে গেল । কিন্তু কাজ হল না । বাইরে থেকেও আওয়াজ শোনা যাচ্ছে ঠিকই । হিমি বাইরে বের হয়ে এল । এখানে আসলে আর কিছু করার নেই । আর মৃত্যু ব্যাপারটা ওর কখনও ভালো লাগে নি । ওর সাথে কাজ করতে আসা সবার মাঝে এই মৃত্যু নিয়ে কোন আলাদা অনুভূতি দেখেনি । সবার কাছেই যেন এটা খুব স্বাভাবিক ব্যাপার । হাসপাতালের কেবল ডাক্তারেরাই না, নার্স আয়া সবার মাঝেই এক ব্যাপার । এসব দেখতে দেখতে সবার কাছে স্বাভাবিক হয়ে গেছে অথচ হিমি এখনও স্বাভাবিক হতে পারলো না । কোন দিন হয়তো পারবে । করিডোরে বাচ্চার দাদীর কাছে এসে হঠাৎ কি মনে হল দাদীকে বলল, আমার কোলে একটু দিবেন কি?
বাচ্চার দাদী তখনও খানিকটা দিশেহারা । একটু আগে তার ছেলের বউ মারা গেছে । ছেলের বাচ্চাকে কিছুতেই থামাতে পারছে না । কেমন একটা অসহায় ভাব ফুটে ওঠেছে । হিমির কথা শুনে বাচ্চাটাকে ওর কোলে দিয়ে দিল । তখনই ঘটলো ম্যাজিক । বাচ্চাটা প্রায় সাথে সাথে কান্না থামিয়ে দিল । এটা হিমি মোটেই আশা করে নি । এমন কি ওর দাদীও না । খানিকটা অবাক হয়ে তাকিয়ে রয়েছে ওদের দিকে । বাচ্চা একটু পরেই কেমন হেসে উঠলো । হিমির দিকে চোখ বড় বড় করে তাকিয়ে রয়েছে ।

এরপরে আরও দুইদিন বাচ্চাটাকে থাকলে হল হাসপাতালে । একটু শ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছিলো সম্ভবত । সেই একটু কাশছিলো সে। বাচ্চাটার সব পরীক্ষা নীরিক্ষা করে তারপর যখন বোঝা গেল যে এখন নিরাপদ তখন বাচ্চাটাকে বাসায় পাঠানো হল । এই দুই দিন হিমি যত সময় হাসপাতালে ছিল তার প্রায় পুরো সময়টাই বাচ্চাটার কাছে ছিল । যখনই বাচ্চাটা কেঁদে উঠতো হিমি কোলে নিলেই শান্ত হয়ে যেত । ব্যাপারটা হিমির মনেও একটা আলাদা আনন্দ দিয়েছে । বাচ্চাটা এভাবে ওকে কিভাবে চিনতে পারছে কে জানে ? আর ও যখনই কোলে নিচ্ছে তখনই থেমে যাচ্ছে কান্না । সম্ভবত বাচ্চাটা ওকে সব থেকে নিরাপদ মনে করছে । বাচ্চার ডেলিভারির সময় হিমি ছিল । বলা চলে হিমিই প্রথমে বাচ্চাটাকে বের করে কোলে নেয় । বাচ্চাটা প্রথম চোখ মেলে হিমিকেই দেখেছিলো ।

বাচ্চাটা চলে যাওয়ায় হিমির মন একটু খারাপ হল । একটা কেমন যেন শূন্য শূন্য অনুভব করলো মনের ভেতরে । নিজের পাগলামী দেখে নিজেই কেমন হেসে উঠলো । মনে মনে বলল যে এক দুই দিন গেলেই সব ঠিক হয়ে যাবে । কিন্তু হিমির ভাগ্যে বুঝি অন্য কিছু লেখা ছিল । ঠিক পরদিন হিমির সাথে অন্য রকম একটা ঘটনা ঘটলো ।
হিমি ডিউটি শেষ করে তখন বাসায় পৌছিয়েছে । ফ্রেশ হয়ে খেতে বসতে যাবে তখনই অচেনা নাম্বার থেকে ফোন এসে হাজির ।
-হ্যালো ।
-নওরিন হিমি বলছেন?
-জি ? কে বলছেন?
-আমি …..
ফোনের ওপাশ থেকে একটু ইতস্তত ভাব দেখা গেল । তারপর কন্ঠটা বলল, আমি দ্বীপের বাবা । দ্বীপ মানে তিনদিন আগে আমার স্ত্রী মারা গিয়েছে আপনাদের হাসপাতালে । চিনতে পারছেন?
এক সেকেন্ড লাগলো হিমির চিনতে । বাচ্চাটার নাম দ্বীপ রেখেছে তাহলে । বলল, জি জি বলুন । চিনতে পেরেছি ।
-আপনি বাসায় । আমি হাসপাতালে গিয়েছিলাম । বলল যে আপনার ডিউটি শেষ ।
-জি । মাত্র এসেছি ।
-আসলে কিভাবে যে বলবো বুঝতেছি না । দ্বীপ অনেক সময় ধরে কান্না করছে । কিছুতেই থামানো যচ্ছে না । মা বলল যে আপনার কোলে নাকি শান্ত হয় । একটু কি আসবেন আমার সাথে ?

হিমি বলল, আপনি আমার বাসা চেনেন?
-জি আপনার বাসার সামনেই এসেছি ।
-আচ্ছা আমি নামছি !

হিমি এই কাজটা কেন করছে সে নিজেও জানে না । কোন কি দরকার আছে । কিন্তু বাচ্চার প্রতি ওর নিজের একটা আকর্ষন কাজ করছে । এই কদিনেই যেন মায়া জন্মে গেছে ।

আধা ঘন্টার ভেতরেই পৌছে গেল ওরা । হিমি যখনই কোলে নিল দ্বীপ কে ম্যাজিকের মত আবারও কান্না থেমে গেল । হিমি নিজেও অবাক হয়ে গেল । কি এমন বন্ধন সৃষ্টি হয়েছে ওদের ভেতরে কে জানে । হিমির জানা নেই ।

পেছন থেকে সাহেদ বলল, মা মিস হিমিকে কিছু খেতে দাও । আমি ওকে খাবার টেবিল থেকে নিয়ে এসেছি ।
দ্বীপের দাদী ব্যস্ত হয়ে রান্না ঘরের দিকে দৌড় দিল ।শাহেদ বলল, আপনাকে যে কি বলে ধন্যবাদ দিবো আমি বুঝতে পারছি না ।
-আরে না । কোন সমস্যা নেই ।

একটু পরেই খাবার এসে হাজির । হিমি কোলে দ্বীপকে নিয়ে অল্প অল্প খেতে শুরু করলো । আর চারিপাশে দেখতে শুরু করলো । বাড়ির চারিদকে কেবল সুখের ছোঁয়া দেখা যাচ্ছে । সুখী পরিবারের ছোঁয়া । অথচ কিভাবে মেয়েটা মারা গেল ! অথচ এই বাচ্চাটা আসা নিয়ে মেয়েটার নিশ্চয়ই কত স্বপ্ন ছিল । পুরো পরিবারের একটা স্বপ্ন ছিল । সব কিছু কেমন ধ্বংশ হয়ে গেল । এমন কেন হয় সব কিছু !

এরপর হিমির একটা রুটিনের মত হয়ে গেল দ্বীপদের বাসায় আসা । পরের প্রায় ছয় মাস প্রতিদিন হাসপতালে যাওয়ার আগে কিংবা হাসপাতাল থেকে ফেরার পর সে দ্বীপদের বাসায় গিয়ে ঢু মারতো । ওটা যেন ওর নিজের বাসাই হয়ে গেল এমন একটা ব্যাপার । কোন কোন দিন শাহেদ দ্বীপকে হিমির কাছে রেখে যেত । ও নিজের মনকে বোঝাতো যে দ্বীপ একটু বড় হয়ে গেলেই আর যাওয়া লাগবে না । কিন্তু নিজের কাছেই জানে যে দিন যত যাচ্ছে হিমি তত মায়াতে পড়ে যাচ্ছে । এই ছোট্ট বাচ্চাটাকে রেখে দুরে থাকা যে ওর পক্ষে সম্ভব না সেটা বুঝতে খুব একটা কষ্ট হল না । হিমির মা এটা নিয়ে খুব বিরক্ত । তবে মেয়ের কারণে কিছু বলতেও পারছে না ।

একদিন হিমি হাসপাতালে যাই নি। সকাল বেলা শাহেদ দ্বীপকে রেখে গেছে হিমির কাছে । সারাটা সকাল দুপুর বিকেল এক সাথেই কাটিয়ে ওরা । তখন অল্প অল্প শব্দ উচ্চারন করতে শিখেছে । দ্বীপ একটু আগে আগে কথা শিখবে বোঝা যাচ্ছে । সন্ধ্যার দিকে শাহেদ যখন দ্বীপকে নিয়ে বাসায় ঢুকলো তখনই ঘটনা ঘটলো । দ্বীপ হিমিকে মা মা বলে ডেকে উঠলো ।
ডাকটা শুনে হিমি কিছু সময় একেবারে থমকে গেল । কী যে একটা তীব্র অনুভূতি ওর নিজের মধ্যে হল ওটা সে নিজেই বলতে পারবে না । আপনা আপনি ওর চোখ দিয়ে পানি বের হয়ে এল । এই পানির ভেতরে যে কি একটা অনুভূতি লুকিয়ে রয়েছে সেটা কোন ভাবেই ব্যাখ্যা করা যাবে না ।

শাহেদ ব্যাপারটা খেয়াল করলো ঠিকই । কি বলবে ঠিক বুঝতে পারলো না । এক সময় বলল, হিমি ।
-হুম । দ্বীপকে ঘুম পাড়িয়ে দিন । নিয়ে যাই ।
-আজকে থাকুক ও এখানে!
-থাকবে ?
-হুম । আজকে ওকে না জড়িয়ে ঘুমালে আমার ঘুম আসবে না । থাকুক প্লিজ !
-আচ্ছা । আমি তাহলে আসি !
-শাহেদ সাহেব ।
-জি !
-আমি সত্যি সত্যিই দ্বীপের মা হতে চাই । ওর কাছ থেকে দুরে কিভাবে থাকবো, আমি জানি না !
শাহেদের মুখ দেখে মনে হল যেন খুব বেশি আনন্দীত হয়েছে । বলল, আমি কতবার আপনাকে বলবো ভেবেছিলাম কিন্তু সাহস হয় নি। এমনিতেও আপনি যা করছেন এর বেশি কিছু চাওয়াটা ঠিক হবে না । তাই বলতে পারি নি । মা কতবার যে বলতে বলেছে !
-আমি বাসায় জানাচ্ছি । আপনিও জানান । তারপর…
-অবশ্যই ।

শাহেদ যখন বাইরে বের হয়ে এল দেখতে পেল হিমি বারান্দায় দাড়িয়ে রয়েয়ে দ্বীপকে কোলে নিয়ে । শাহেদ কোন দিন ভাবে নি আবার সে বিয়ে করবে । কিন্তু এখন যখন হিমির কোলে দ্বীপকে দেখে তখন মনে হয় এই মেয়েটা দ্বীপের মা হলে সব থেকে ভাল হয় । দ্বীপের সাথে হিমির যে এক বন্ধন সৃষ্টি হয়েছে সেটা কেবল দ্বীপকেই না, হিমির সাথে ওদের পুরো পরিবারকে জুড়ে দিয়েছে । সে অসমাপ্ত দৃশ্যটা পড়ে ছিলো এতোদিন এবার সেটা পূর্ণ হবে ।

How useful was this post?

Click on a star to rate it!

Average rating 4.8 / 5. Vote count: 42

No votes so far! Be the first to rate this post.

Related Posts

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *