নিষিদ্ধ নৈকট্য

4.4
(23)

নওরিনের বাবা আজাদ আহমেদের দিকে একটু সংকুচিত হয়ে তাকালাম। এতো সময় আমি কফির কাপের দিকে তাকিয়ে ছিলাম। কফির রংটা দেখেই মনে হচ্ছিল যে কফিটা ভাল হয়েছে। কিন্তু আমি সেটাতে চুমুক দিতে পারছি না। যে কথা আমি আজাদ আহমেদকে বলতে এসেছি সেটা কফি খেতে খেতে বলাটা মানায় না। এতো সময় আমি কফির দিকে তাকিয়ে থাকলেও আমার মনে হল যে এবার আমার মুখ খোলা দরকার। কারণ যে কথা আমি বলতে এসেছি সেটা আমাকে বলতেই হবে।
আমার সংকুচিত চোখে তাকিয়ে থাকতে দেখে নওরিনের বাবা বললেন, তুমি যেন কী বলতে এসেছিলে? নওরিনের সাথে তোমার কিভাবে পরিচয়?
আমি বললাম, আমি আসলে …
আমি বাক্যটা শেষ করতে পারলাম না। কারণ এই লাইনটা বলা আসলে খুব একটা সহজ না। আমরা যতই আধুনিক হয়ে যাই না কেন বাংলাদেশের বাবাদের কাছে গিয়ে বলা যায় না যে আমি আপনার মেয়ের প্রেমিক। এই কথা সত্যিই কঠিন। আমি তাই একটু হোচট খেলাম। তবে আমাকে অবাক করে দিয়ে নওরিনের বাবা বললেন, আমি জানি তুমি নওরিনের বয়ফ্রেন্ড! আমি জানতে চাইছি যে নওরিনের সাথে তোমার পরিচয়টা কিভাবে হল?
আমি একটু থতমত খেলাম। বিশেষ করে আমার আর নওরিনের ব্যাপারটা উনি জানেন এবং সেটা স্বাভাবিক ভাবে নিচ্ছেন এটা দেখে। এর আগে তো এমন হয় নি। এবার কী পরিবর্তন হল? আমি জানি না।
নওরিনের সাথে আমার পরিচয়টা হয়েছিল ওদের কলেজের সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান থেকে। আমার বিশ্ববিদ্যালয় আর ওর কলেজে পাশাপাশি। ওদের কলেজের সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে আমরা কয়েকজন বন্ধু মিলে হাজির হয়ে গেলাম। সেখানে নওরিনের একক নাচ পরিবেশন হল। নওরিনকে দেখে আমার বেশ লাগল। মনে হল মেয়েটার সাথে প্রেম করা যাক। যদিও তখন আমার সিরিয়াস কোন ইচ্ছে ছিল না। কম বয়সী মেয়েদের সাথে প্রেম করলে সেটা বেশি দিন টিকবে না এটাই আমার ধারণা ছিল। মেয়েরাও বয়স বাড়ার সাথে সাথে আবেগকে পাশ কাটিয়ে বাস্তবতা বুঝতে শেখে তখন আমার মত প্রেমিকদের প্রতি তাদের আকর্ষন কমে যায়।

নওরিনের সাথে প্রেমের সম্পর্কে গড় উঠতে মাস দুয়েক লাগল। নাচের পোশাকে ওকে যেমনটা দেখেছিলাম বাস্তবে তার থেকে বেশি নমনীয় দেখতে সে। মেকাপ ছাড়া চেহারাতে একটা আলাদা আভা ছড়িয়ে থাকে। কয়েক মাস এভাবেই সম্পর্ক চলল। তারপরই আমার তার উপর থেকে আকর্ষণ কমে যেতে শুরু করল।
আমি নওরিনের সাথে আমার পরিচয় আর প্রেমের শুরুটার কথা বললাম। আজাদ আহমেদ চুপ করে শুনলেন। তারপর বললেন, তুমি ভাল ছেলে। তোমার খোজ খবর আমি নিয়েছি। এপ্লাইড ফিকিক্স পড়ছ ঢাবিতে। আমার আসলে তোমাদের সম্পর্ক মেনে নিতে আপত্তি নেই।
এই কথা শুনে যে কোন প্রেমিকের মন ভাল হয়ে যাওয়ার কথা। মুখে একটা উজ্জ্বল আভা ফুটে ওঠার কথা। কিন্তু আমার মনে তেমন কোন আভা ফুটে উঠল না। এই খুশি না হওয়ার ব্যাপারটা আজাদ আহমেদ খেয়াল করলেন। তিনি বললেন, কী খুশি হও নি তুমি?
আমি সেই প্রশ্নের জবাব দিলাম না। কারণ এরপরের কথাটা আমি ঠিক কিভাবে তাকে বলব সেটাই ভাবছি। কিভাবে বললে সে আমার কথা বিশ্বাস করবে। অবশ্য আমি এতাও জানি যে যেভাবেই আমি বলি না কেন এই কথা কোন ভাবেই বিশ্বাসযোগ্য নয়। কিন্তু তারপরেও আমাকে বলতে হবে। যে কোন ভাবেই হোক নওরিনকে বাঁচাতেই হবে।
আমি বললাম, নওরিন আত্মহত্যা করতে যাচ্ছে। মানে করবে। এই মাসের ১৮ তারিখে।
আজাদ আহমেদ আমার দিকে সরু চোখে তাকালেন। তিনি আসলে আমার চেহারা পরীক্ষা করে দেখছেন। বুঝতে চাইছেন যে আমি সত্য নাকি মিথ্যা কথা বলছি। তারপর বললেন, তুমি কিভাবে জানো যে সে আত্মহত্যা করবে? আমি তো মেনে নিচ্ছি তোমাদের ব্যাপারটা।
-আপনি বা আমি যাই করি না কেন এটা ঘটবেই।
-এতো নিশ্চিত কেন হচ্ছো?
-কারণ……
আমি একটু থামলাম। কিভাবে বলব এখনও জানি না। আমার মুখ দিয়ে এমন কথা আমিইই যদি শুনতাম তবুও বিশ্বাস করতাম না। অন্য মানুষ বিশ্বাস করবে না এটাও আমি জানি। তারপরেও আমাকে বলতেই হবে। আমি বললাম, কারণ এই ঘটনা আগেও ঘটেছে।
আজাদ আহমেদ বললেন, আমি তোমার কথা ঠিক বুঝলাম না। আগেও ঘটেছে বলতে?
-দেখুন আমি আপনাকে কিভাবে বোঝাবো আমি জানি না। বুঝতে পারছি না। তবে এই ঘটনাগুলো বারবার ঘটছে, একই ঘটনা বারবার ঘটছে আমার সাথে।
আজাদ আহমেদ একটু নড়েচড়ে বসলেন। তারপর বললেন, আমি এখনও তোমার কথা বুঝি নি।
-আচ্ছা আমি আরও পরিষ্কার করেই বলছি।

আমি একটা বড় করে দম নিলাম। তারপর বললাম, আমার শুরু থেকে নওরিনের প্রতি তেমন কোন সিরিয়াসনেস ছিল না। আমি ভেবেছিলাম কয়েকদিন প্রেম করে তারপর ব্রেকআপ করব। কিন্তু আমি আসলে বুঝতে পারি নি যে নওরিন আমার উপরে এমন ভাবে ফল করেছে। আমি যেদিন নওরিনের সাথে ব্রেকআপ করেছিলাম সেদিন রাতের বেলাতেই নওরিন সুইসাইড করেছিল। আমি সেদিন আমার ভুল বুঝতে পারি। আমি সেদিন রাতে বারবার নিজের মৃত্যু কামনা করেছিলাম। আমার কেবল মনে হচ্ছে যে যদি একটা বার সুযোগ প্রেম তাহলে আমি নওরিনের সাথে ব্রেকআপ করতাম না। নওরিনও সুইসাইড করত না। তারপরই ঘটল সব থেকে আশ্চর্য ঘটনা। পরদিন সকালে যখন আমার ঘুম ভাঙ্গল আমি আবিস্কার করলাম যে আমি সেই আগের সময়ে পৌছে গেছি। সময়টা যে দিন নওরিন আমার প্রস্তাবে রাজি হয়েছিল, তারপর দিন সকালে ঘুম ভাঙ্গার দিন। আমার প্রথমে বিশ্বাস হল না ব্যাপারটা, কিছুতেই না। কারণ এই জিনিস বিশ্বাস করা সম্ভব না। কিন্তু তারপরেও হল। আমি আমাদের প্রেম আবারও চলল। এবার আমি সতর্ক ছিলাম। আমি এবার ব্রেকআপ করলাম না। ব্রেকআপের জন্যই যেহেতু নওরিন সুইসাইড করেছিল। তাই নওরিন এবার সেদিকে যাবে না।
আজাদ আহমেদ বললেন, কিন্তু তেমনটা হল না, তাই না?
-জী। আমাদের সম্পর্কের ব্যাপারটা আপনি জেনে গেলেন। এবং আপনি সেটা মেনে নিলেন না। নওরিনকে ঘরে বন্দী করলেন। এবার নওরিন এই কারণে সুইসাইড করল। আমি আবার জেগে উঠলাম একই দিনে।
-তাহলে আমি যদি মেনে নিই তাহলে তো আর নওরিন সুইসাইড করবে না?
আমি তাকিয়ে রইলাম তার দিকে। ব্যাপারটা যদি এমন হত তাহলে তো হতই। আমি বললাম, না সেটা না। আপনি মেনে নিলেও নওরিন সুইসাইড করবে। আপনি এবার বললেন যে নওরিনকে ঢাবিকে চান্স পেতে হবে তবেই আপনাদের সম্পর্কটা নেমে নিবেন। কিন্তু সে পেল না চান্স। তাই……

আমি চুপ করে রইলাম কিছু সময়। কী বলছি সেটা আসলে আমার নিজেরই বিশ্বাস হচ্ছে না। আমি বললা, আপনার কাছে আমার কথা হয়তো বিশ্বাস হবে না। তবে আমি এই অফিসে এর আগেও এসেছি, এই কথা বার্তা আগেও বলেছি। আমি ঘড়ির দিকে তাকালাম, তারপর বললাম, ঠিক এক মিনিট পরেই আপনার ল্যান্ডলাইন ফোন বেজে উঠবে। আপনার সেক্রেটারি জানাবে যে জার্মান ডেলিগেটদের সাথে আপনার যে মিটিং হওয়ার কথা ছিল সেটা আজকে হবে না। তাদের একজনের ফুড পয়জনিং হয়েছে।

আজাদ আহমেদের চেহারার ভাবের কোন পরিবর্তন এল না। কিন্তু যখন সত্যিই ল্যান্ড লাইনটা বেজে উঠল তখন তার চেহারায় একটু পরিবর্তন এল। সে ফোন ধরল এবং হু হা করে রেখে দিল। আমার দিকে তাকিয়ে বলল, হ্যা তারপর?
-আমার কথা ঠিক আছে?
-হ্যা। বাকি গল্প শেষ কর।
আমি বললাম, আমি যাই করি না কেন নওরিন ঠিকই ১৮ তারিখে সুইসাইড করবে। একবার সব কিছু ঠিক থাকা সত্ত্বেও কেবল আমার সামান্য রাগ করার কারণে নওরিন ঠিকই সুইসাইড করেছিল। আমি আসলে জাই না ঠিক কী করলে এটা থামানো যাবে। আমি অনেকবার ভেবেছি যে আমি যদি মারা যাই তবে হয়তো হয়তো নওরিন বেচে যাবে। আমি আসলে এমন কোন কাজ নেই যে করি নি কিন্তু প্রতিবারই দেখেছি এই ঘটনা ঘটছেই। নওরিন মারা যাচ্ছে। আমি জানি না আমি কী করবো।
আমি আর খুব বেশি কথা বলতে পারলাম না। তখন আমাকে অবাক করে দিয়ে আজাদ আহমেদ বললেন, লাভ হবে না। তুমি সুইসাইড করলে সেই শোকেই নওরিন সুইসাইড করবে।
আমি অবাক হয়ে তার দিকে তাকালাম। আজাদ আহমেদ বললেন, তোমাকে আমি এইবারই প্রথম দেখছি না। তুমি এর আগেও আমার অফিসে এসেছ। তুমি যেমন বারবার এসেছো আমিও তাই। গতবার তুমি নিজের মৃত্যুর কথা বললে।
-তার মানে আপনিও বারবার জেগে উঠছেন?
-হ্যা।
-তাহলে এর আগে কেন বলেন নি?
-কারণ আমার কেবল একটার কথাই মনে আছে। কেবল গতবারের কথাটা। তুমি যেখানে নিজের মৃত্যুর কথা বলেছিলেন। তুমি মারাও গেলে এবং তারপরের দিনই নওরিন সুইসাইড করল তোমাকে শোকে। তার মানে হচ্ছে এই মৃত্যু আমরা কোন ভাবেই ঠেকাতে পারব না। যাই করি না কেন আমরা
-আমাদের কিছুই করার নেই? কিছুই না? আমি প্রতিবার নওরিনের মৃত্যুর শোক সহ্য করতে পারছি না।

আজাদ আহমেদ চুপ করে কিছুক্ষণ আমার দিকে তাকিয়ে রইলেন। তার চোখে এমন একটা ভাব ছিল যেন তিনি অনেক দূরের কোনো কিছু দেখছেন। তারপর ধীরে ধীরে বললেন, আমরা আসলে জানি না যে আমাদের কিছু করার আছে কিনা। অন্তত আমরা যেভাবে চেষ্টা করছি, সেভাবে নয়।
তার কথা শুনে বুকের ভিতরটা হালকা করে কেঁপে উঠল। আমি জিজ্ঞাসা করলাম, তাহলে… আমরা কী করব? শুধু বসে বসে দেখব?
আজাদ আহমেদ মাথা নেড়ে বললেন, “এই লুপটা ভাঙতে হলে আমাদের একসাথে কাজ করতে হবে। আমি গতবার শুধু তোমার মৃত্যুর কথাটাই মনে রাখতে পেরেছিলাম। কিন্তু এবার… এবার তোমার সাথে কথা বলার পর থেকে আমার মনে হচ্ছে আরও কিছু টুকরো টুকরো স্মৃতি ফিরে আসছে। যেন লুপটা প্রতিবার একটু একটু করে বড় হচ্ছে।
তিনি টেবিলের উপর রাখা কলমটা তুলে নিয়ে একটা কাগজে কী যেন আঁকিবুকি করতে লাগলেন। তারপর বললেন, তুমি বললে, প্রথমবার ব্রেকআপের জন্য মারা গিয়েছিল। দ্বিতীয়বার আমি মেনে নেওয়ার পরও ঘরে বন্দী করায় মারা গিয়েছিল। তৃতীয়বার আমি চান্সের শর্ত দিয়েছিলাম। চতুর্থবার… তুমি বললে, শুধু তোমার সামান্য রাগের জন্যও মারা গিয়েছে। এখন এবার আমরা দুজনেই জানি।

আমি উত্তেজিত হয়ে বললাম, তাহলে এবার আমরা একসাথে সবকিছু ঠিক করে ফেলব। আমি নওরিনের সাথে কোনো রাগারাগি করব না। আপনি ওকে কোনো চাপ দেবেন না। ও যা চায় তাই হবে।
আজাদ আহমেদ ম্লান হেসে মাথা নাড়লেন। বললেন, তুমি এখনও বুঝতে পারছ না। এটা কোনো সাধারণ কিছু না। এটা হওয়ার কথা না কিন্তু হচ্ছে। যেন কোনো অদৃশ্য শক্তি, কোনো নিয়তি, প্রতিবার ১৮ তারিখে ওকে টেনে নিয়ে যাচ্ছে। আমরা যতই চেষ্টা করি, শেষ মুহূর্তে কিছু না কিছু ঘটেই যায়।
তিনি একটু থেমে আমার চোখে সোজা তাকালেন।
-আমার মনে হয়, এই লুপটা তৈরি হয়েছে অন্য কোন কারণে। বা বলা যায় এমন কোন ঘটনা যেটা ঘটার কথা ছিল না।
আমি একটু চিন্তা করার চেষ্টা করলাম। আসলে এমন কী ঘটেছে আমাদের জীবনে যা ঘটার কথা না। তারপরেই মনে হল যে যদি নওরিনের দেখাই না হত, ওর সাথে পরিচয় না হত তাহলে হয়তো এই লুপটা তৈরিই হত না। আমার চেহারার ভাব দেখে আজাদ আহমেদ যেন বুঝতে পারলেন আমার মনের কথা। তিনি বললেন, হ্যা ঠিকই ধরেছো। হয়তো তোমার সাথে নওরিনের পরিচয় হওয়ারই কথা ছিল না। কিন্তু হয়েছে।
-আর আমি যখন জেগে উঠি প্রতিবার সেটা আমাদের পরিচয়ের পরে। যদি আগেকোন ভাবে জেগে উঠতে পারতাম তবে আমি সেদিন যেতামই না ওদের কলেজে।
আজাদ আহমেদ আরও কিছু সময় কী যেন ভাবলেন। তারপর বললেন, যা আমাদের হাতে নেই তা নিয়ে খুব বেশি চিন্তা কয়ার দরকার নেই। আপাতত আমরা অন্য পথ ধরি।
আমি চুপ থাকি। সে বলল, আমরা যেহেতু দুইজনই জানি তাই ভিন্ন কিছু একটা কিছু করা যায় কিনা দেখা যাক। যদি ভিন্ন কিছু করলে লুপ ভেঙ্গে যায়! এবার আমরা একটা ভিন্ন পথ নেব।
-কী করব?
-আমি বলব, পরিবারের সাথে একটা ছোট ট্রিপে যাব। তুমিও আমাদের সাথে যাবে। কোনো একটা নির্জন জায়গায়, যেখানে ফোন নেটওয়ার্ক কম। কোনো বড় শহর না। কোনো পাহাড়ি এলাকা বা নদীর ধারে। ওখানে আমরা তিনজন ছাড়া আর কেউ থাকবে না।
আমি অবাক হয়ে বললাম, কিন্তু… যদি তাতেও হয়?
-তাহলে আমরা আবার চেষ্টা করব। কোন কাজের জন্য নওরিন সেই পথ বেছে নিয়েছে সেটা করব না।
আমি আবারও চিন্তা করলাম। আবারও আমাকে নওরিনের মৃত্যু দেখতে হবে। আবারও আমাকে তাকে হারানোর কষ্ট পেতে হবে? আমি জানি না এভাবে কতদিন চলবে।
আজাদ আহমেদ যেন আমার মনের কথা বুঝতে পারলেন। তিনি বললেন, আমাদের আর কিছুই কী করার আছে?
তিনি উঠে দাঁড়ালেন। জানালার কাছে গিয়ে বাইরের দিকে তাকিয়ে বললেন, এবার তুমি যাও। নওরিনকে কিছু বলার দরকার নেই। এমন কি আজকের কথাও না। সে যখন আমাদের দুজনকে এক সাথে দেখবে নিশ্চয়ই খুব অবাক হবে।
তিনি ফিরে তাকালেন।
-যদি এবারও ব্যর্থ হয়, তাহলে পরের লুপে কী হবে জানি না।
আমি মাথা নেড়ে সম্মতি জানালাম। কিন্তু কেন জানি ঠিক ভরশা পেলাম না। মনে হচ্ছে যেকোন ভাবেই হোক নওরিন ঠিকই মারা যাবে।

আমি অফিস থেকে বেরিয়ে এলাম। রাস্তায় হাঁটতে হাঁটতে মনে হচ্ছিল, এই লুপটা হয়তো কোনো শাস্তি। আমার অবহেলার শাস্তি। নওরিনের অন্ধ ভালোবাসার শাস্তি। আর আজাদ আহমেদের… হয়তো তার কোনো অতীতের শাস্তি, যা আমরা এখনও জানি না। কিন্তু আমার কাছে মনে হচ্ছে, সময়টা যেন ইতিমধ্যেই ফুরিয়ে আসছে। এবার হয়তো সত্যিই শেষবার। আসলেই আমরা এইবার নওরিনকে বাঁচাতে পারব? আমি জানি না ।

নওরিনের পরিকল্পনামতো আমরা ১৫ তারিখে রওনা হলাম। আমাদের গন্তব্য পাহাড়ি বান্দরবান। বান্দারবানের সাইরুতে থাকব কয়েকটা দিন। সব ব্যবস্থা নওরিনের বাবাই করেছে। ১৮ তারিখের সেই অভিশপ্ত মুহূর্তটা কাটানোর জন্য এর চেয়ে নিরাপদ জায়গা আর হতে পারত না। আজাদ আহমেদ নিজে গাড়ি ড্রাইভ করছিলেন, পেছনের সিটে নওরিন আর আমি।
নওরিন সব থেকে খুশি আছে। আমিও যে সাথে যাব এটা নওরিনের বাবা কিংবা আমি ওকে বলি নি। আমি আমার সামনে যখন নওরিনদের গাড়িটা থামল তখন নওরিনের চোখমুখ বিস্ময়ে হা হয়ে গিয়েছিল। আ,আলে যে ওর বাবা চেনেন কিংবা ওর বাবার যে কোন আপত্তি নেই আমাদের সম্পর্কের ব্যাপারে এটা জেনে ওর আনন্দের সীমা নেই। কিন্তু ও জানত না যে ওর জীবনের সবচেয়ে বড় দুই পুরুষ ওকে বাঁচানোর জন্য এক জোট হয়েছে। আমরা কথা বলতে বলতে যাচ্ছিলাম। ঠিক সেই মুহুর্তে ঘটনা ঘটল। পাহাড়ি সরু বাঁক নিতে গিয়ে উল্টো দিক থেকে আসা একটা ট্রাকের সাথে আমাদের মুখোমুখি সংঘর্ষ হলো।

গাড়িটা কয়েকবার পাল্টি খেয়ে গভীর খাদে পড়ে গেল। কাঁচ ভাঙার শব্দ, নওরিনের একটা আর্তনাদ আর তারপর সব নিস্তব্ধ। আমি বুঝতে পারলাম আমার শরীর অবশ হয়ে আসছে। পাশে পড়ে থাকা নওরিনের নিথর হাতের দিকে তাকিয়ে রইলাম। আমার চিন্তা শক্তি সব হারিয়ে গেল। আমি শেষবারের মত নওরিনকে ধরার চেষ্টা করলাম তবে কাজ হল না। আমার শরীরে কোন অনুভূমি অনুভব করতে পারলাম না। আমার বুঝতে কষ্ট হল না যে আমি মারা যাচ্ছি।
আমরা এবারও নওরিনকে বাঁচাতে পারলাম না। তবে এবার একটা ভাল দিক হয়েছে। আমাকে এবার নওরিনের মৃত্যুর শোক বইতে হবে না। আমি এবার নওরিনের সাথে মারা যাচ্ছি। আমি চোখ বুঝলাম।

**
চোখ মেলতেই আমি নিজেকে আবিষ্কার করলাম আমার হলের সেই পুরনো বিছানায়। জানালার বাইরে রোদের কড়া তেজ। দেওয়াল ঘড়িতে তাকালাম—এ তো সেই দিন! আমার সাথে সাথে সব মনে পড়ে গেল। আমি চোখ বন্ধ করে শুয়ে রইলাম কিছু সময়। তারপরই একটা ব্যাপার খেয়াল করলাম। সাথে সাথেই চমকে উঠলাম। সেদিন সকালে তো আকাশ মেঘলা ছিল। রোদ ছিল না।
আমি দ্রুত আমার মোবাইলটা খোজ করার চেষ্টা করলাম। সেটা নিয়ে ডেটটা দেখতেই আমার শরীর ঠান্ডা হয়ে গেল। আজকে সেই দিন নয়। আজকে হচ্ছে সেই দিন যেদিন নওরিনের কলেজে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ছিল। যে দিন আমি প্রথম নওরিনকে দেখেছিলাম, যে দিন আমার নওরিনকে ভালো লেগেছিল। আজকে সেই দিন যখন সব কিছু শুরু হয়েছিল।
আমার শরীর কাঁপতে লাগল। এতোদিন আমি এমন সময় জেগে উঠতাম যখন নওরিনের সাথে আমার পরিচয় হয়ে গেছে। প্রেম হয়ে গেছে। কিন্তু আজকে যদি আমি না যাই তবে নওরিনের সাথে আমার দেখা হবে না। এইবার তাহলে সত্যি সত্যি নওরিনকে বাঁচানোর একটা উপায় রয়েছে।
আচ্ছা এমনটা কেমন করে হল?
কেন আমি এইবার এই সময়ে জেগে উঠলাম?
সম্ভবত আমরা দুইজনই এক সাথে মারা গিয়েছিলাম। এই জন্য? নাকি অন্য কোন কারণ আছে?
কারণ যাই হোক তাতে আসলে কিছু যায় আসে না। সুযোগ এসেছে। এটাই হচ্ছে সব থেকে বড় ব্যাপার।

একেবারে দুপুর পর্যন্ত আমি শুয়েই রইলাম। দুপুরের পরে রিমন এসে বারবার দরজায় কড়া নাড়ল।
-কিরে চল! পাশের কলেজে ফাংশন আছে। যাবি না?
আমি বালিশে মুখ গুঁজে পড়ে রইলাম। ভেতর থেকে চিৎকার করে বললাম, শরীর ভালো লাগছে না, তুই যা।
রিমন বেশি বিরক্ত করল না। চলে গেল। আমি নওরিনকে কল্পনা করার চেষ্টা করলাম।

আমি সিদ্ধান্ত নিলাম, আমি আর কোনোদিন ওই কলেজের সীমানায় যাব না। নওরিনের সাথে আমার আর কোনোদিন দেখা হবে না। ওর সাথে আমার কোনো পরিচয় হবে না, কোনো কথা হবে না। ও আমাকে চিনবে না, আমিও ওর কাছে একজন অপরিচিত মানুষ হয়েই থেকে যাব।
হয়তো কয়েক বছর পর ও অন্য কাউকে ভালোবাসবে। হয়তো ১৮ তারিখ আসবে এবং চলে যাবে, কিন্তু নওরিন মরবে না। ও বেঁচে থাকবে। শুধু সেই জীবনের কোথাও আমি থাকব না।
নওরিনকে বাঁচানোর এটাই ছিল একমাত্র পথ—তাকে ভালো না বাসা। চোখের কোণ দিয়ে এক ফোঁটা জল গড়িয়ে পড়ল, কিন্তু মনের গভীরে এক অদ্ভুত শান্তি অনুভব করলাম। নওরিন বেঁচে থাকুক, আমার থেকে অনেক দূরে, একদম অচেনা হয়ে।

পরিশিষ্ট
নওরিনের সাথে আমার দেখা হল প্রায় বছর চারেক পরে। আমরা পড়াশোনা শেষ করে চাকরিত ঢুকিয়েছি। বাসা থেকে আমার বিয়ের জন্য চাপ দিচ্ছে তবে আমার কেন জানি সেদিকে যাওয়ার কোন ইচ্ছে নেই। আমার মনের ভেতরে এখনও নওরিন ছাড়া আর কেউ নেই। আমি কোন ভাবেই তাকে আমার মন থেকে ভুলতে পারি নি। তার মৃত্যুর শোক আমার মনের ভেতরে গেথে আছে অথচ নওরিন বেঁচে আছি। আমি জানি সে বেঁচে আছে। সে ১৮ তারিখের দিনটা পার করে ফেলেছে। যদি না করত তাহলে হয়তো আমি আবারও জেগে উঠতাম। যেহেতু আমি আর আগের জায়গায় জেগে উঠি নি তার মানে হচ্ছে নওরিন বেঁচে আছে। লুপ ভেঙ্গে গেছে। নওরিন সাথে আমার পরিচয়ই হয় নি। তবে আমি নওরিনকে চিনি।
অফিস থেকে ছুটি নিয়ে আমি গিয়েছি বান্দরবানের সাইরুতে। খুব ভোরে সেদিন আমি উঠেছিলাম সকালটা দেখার জন্য। সাইরুর বাইরে হাটছিলাম তখনই নওরিনকে দেখতে পেলাম। সেও হাটতে বের হয়েছে। আগের থেকে একটু বড় হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ে সম্ভবত। কোথায় পড়ে কেন জানে? আমার দিকে চোখ পড়েই নওরিন একটু যেন থমকে দাঁড়াল। আমি আমার বুকের হার্টবিট মিস করলাম। নওরিনের দৃষ্টি দেখে আমার কেন জানি মনে হল নওরিন আমাকে চেনে। তবে সেটা হল না। স্মিত হেসে সে ঘুরে অন্য দিকে চলে গেল। আমার মনে হল ওর কাছে যাওয়া ঠিক হবে না। কোন ভাবেই পরিচয় হওয়া যাবে না। আমার সাথে পরিচয় হলেই যদি আবারও বিপদে পড়ে সে।
আমি ঘুরে হোটেলের দিকে এগিয়ে আসতে লাগলাম। কিন্তু আমাকে আবারও থামতে হল। আজাদ আহমেদ আমার পথের সামনে দাঁড়িয়ে আছে। তার সাথে আমার চোখাচোখি হতেই আমার মনে দৃঢ় বিশ্বাস জন্মালো যে আজাদ আহমেদ আমাকে চেনেন। কোন সন্দেহ নেই। আমার যেমন স্মৃতি মনে আছে আজাদ সাহেবেরও তেমন স্মৃতি মনে আছে। থাকতে বাধ্য।
তবে আমি সব কিছু উপেক্ষা করলাম। সরাসরি নিজের রুমে গিয়ে ব্যাগপত্র সব বের হয়ে গেলাম। এখানে দিন তিনেক থাকার ইচ্ছে ছিল তবে সেটা হবে না। নওরিনের কাছ থেকে আমাকে দুরে যেতেই হবে। ওর কোন ক্ষতি হোক আমি চাই না। কোন ভাবেই চাই না। আমাদের কাছে প্রকৃতি চায় না।

ফেসবুকের অর্গানিক রিচ কমে যাওয়ার কারনে অনেক পোস্ট সবার হোম পেইজে যাচ্ছে না। সরাসরি গল্পের লিংক পেতে আমার হোয়াটসএপ বা টেলিগ্রামে যুক্ত হতে পারেন। এছাড়া যাদের এসব নেই তারা ফেসবুক ব্রডকাস্ট চ্যানেলেও জয়েন হতে পারেন।

অপু তানভীরের নতুন অনুবাদ গ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে

বইটি সংগ্রহ করতে পারেন ওয়েবসাইট বা ফেসবুকে থেকে।

How useful was this post?

Click on a star to rate it!

Average rating 4.4 / 5. Vote count: 23

No votes so far! Be the first to rate this post.

About অপু তানভীর

আমি অতি ভাল একজন ছেলে।

View all posts by অপু তানভীর →

8 Comments on “নিষিদ্ধ নৈকট্য”

  1. গল্পটা বরাবরের মতই ভালো লেগেছে।

    সময়ের পুনরাবৃত্তি আর ভালোবাসার জন্য নিজেকে উৎসর্গ করার এমন গল্প নতুন না হলেও, এই গল্পে আপনার উপস্থাপনের ভঙ্গিটা কিছুটা আলাদা। বিশেষ করে ছেলেটার মনের ভেতরের প্রকৃত আকুতিটা দারুণ ভাবে ফুটে উঠেছে। নওরিনের বাবার চরিত্রটাও দারুণ, যিনি একসময় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছিলেন, তিনিই আবার পরে আবার হয়ে উঠলেন লুপ ভাঙ্গার সহযোগী। অবশ্য নিজের মেয়ের কথা চিন্তা করে সকল বাবারাই সম্ভবত এমনটাই করবে।

    প্রতিবার ব্যর্থ হয়ে নতুন করে চেষ্টা করার যে কষ্টটা ফুটিয়ে তুলেছেন, সেটা বেশ স্পষ্ট। আর সবচেয়ে বেশি ভালো লেগেছে শেষের দিকটা- যেখানে বাঁচানোর একমাত্র উপায় হয়ে দাঁড়ায় দূরে সরে যাওয়া। শেষের সেই অচেনা হয়ে থাকার সিদ্ধান্তটা দারুণ রকম আঘাত করেছে, আবার নওরিনের পরিণতি ভেবে মন শান্তিও পেয়েছে।

    ধন্যবাদ।
    এমন আরও গল্প লিখুন, অপেক্ষায় থাকলাম।

    1. এই গল্পের থিমটা কমন টাইমপুলের কাহিনীর উপর লেখা। এই একই থিমে আরেকটা গল্প আমি লিখেছিলাম কয়েকদিন আগে। টাইমলুপ থিমটা বেশ ভালই।

  2. এক নিঃশ্বাসে পুরো গল্পটা পড়ে ফেললাম। গল্পের চরিত্রটির অসহায়ত্ব আর বারংবার একই কষ্টের মধ্যে দিয়ে যাওয়ার অনুভূতিটা যেন নিজের ভেতরে অনুভব করছিলাম। ভাবলাম, যদি আমার প্রিয়জনের ব্যাপারে এমন ঘটতো তাহলে আমি আসলে কি করতাম!?

    শেষটা পড়ে বুকের ভেতরটা কেমন যেন ফাঁকা হয়ে গেল; আবার এক অদ্ভুত শান্তিতেও মনটা ভরে উঠল।

    এরকম একটি চমৎকার গল্প উপহার দেওয়ার জন্য আপনাকে অসংখ্য ধন্যবাদ।

    ভবিষ্যতে আরও চমৎকার গল্প পাওয়ার অপেক্ষা জানিয়ে আজকের মতো বিদায় নিলাম।

    1. আমরা মাঝে মাঝে এমন পরিস্থিতিতে পড়ি তখন আমাদের হাতে আসলে কিছুই করার থাকে না। সব কিছু ছেড়ে দিতে হয় উপরওয়ালার হাতেই। এই গল্পের কাহিনীও সেই রকমই।

  3. রাফায়েল এর গল্প যে চরিত্রটা সেটা আর একটু ফুটিয়ে তোলেন ভাই,
    আর প্রতি মাসে একটা করে গল্প দেন রাফায়েল এর,
    আমি মূলত রাফায়েল এর গল্প পড়ার জন্যই আসি!

    1. রাফায়েলের গল্প চাইলেই প্রতিমাসে একটা করে লেখা যায় না। একটা রাফায়েল লিখতে অনেক সময় যায়। বছরে দুই তিনটাই লেখাই কষ্টকর হয়ে যায়।

  4. প্রেম বা ভালোবাসা আসলে কতটা গভীর হতে পারে আর মানুষের মন কতটা অদ্ভুত রকমের শক্তি রাখে, গল্পটা পড়ে খুব ভালোভাবেই অনুভব করলাম।

Comments are closed.