এক মুহুর্তে

oputanvir
4.7
(32)

নিধির যেদিন জার্মানিতে ফুলফান্ডেড স্কলারশিপ লেটার আসলো, সেদিনই আমি বুঝেছিলাম যে আমাদের সম্পর্কের বিদায় ঘন্টা বেজে গেছে। দেশের বাইরের উন্নত জীবনের ইচ্ছে আমার ছিল না। তবে একেবারে শুরু থেকেই আমি দেখতাম যে নিধি সব সময় চাইত এই দেশ ছেড়ে দিয়ে চলে যেতে। তার এখানে থাকার কোন ইচ্ছে ছিল না। তাই মনের কোন এক কোণে আমি জানতাম যে আমাদের সম্পর্কের শেষ পরিনতি পাবে না। আমি এই সত্য জেনেও কেন জানি নিজের কাছেই লুকিয়ে রাখতাম। কেবল নিজেকে বোঝানোর চেষ্টা করতাম যে ভবিষ্যতের চিন্তা করে আসলে লাভ নেই। বর্তমান সময়টা আমি ওর সাথে কাটাই। আর সত্যি বলতে কি বর্তমান সময়টা আমাদের ভাল কেটেছে। নিধি আসলেই একজন চমৎকার প্রেমিকাই ছিল।
স্কলারশিপ লেটার আসার পর থেকে নিধিও ব্যাপারটা বুঝতে পেরেছিল। যতই যাওয়ার দিন এগিয়ে আসছিল আমাদের মাঝে একট অস্বস্তি কাজ করছিল। নিধি সম্ভবত ব্রেকআপ করতে অস্বস্তিবোধ করছিল। যাওয়ার একেবারে আগের দিন আমার সাথে দেখা করল ও। আমরা লম্বা সময় কেবল বসে রইলাম। কেউ খুব একটা কথা বললাম না। আমি নিধির হাত ধরে রেখেছিলাম। একেবারে রাত এগারোটার দিকে আমি নিজেই ওকে বাসায় পৌছে দিলাম। সিএনজি থেকেও নিধি আমাকে ব্রেকআপের কথা বলতে পারল না। কেবল বলল, আমার জন্য অপেক্ষা করে থেকো না কেমন! পেট্রোবাংলার চাকরিটা হয়ে যাবে তোমার। চাকরি পেলে একটা ভাল মেয়ে দেখে বিয়ে করে নিও।
তারপর আমার ঠোঁটে মৃদু একটা চুমু খেল। তারপর একবারও পেছনে না তাকিয়ে বাসার ভেতরে চলে গেল।
আমি আরও কিছু সময় সেখানে দাঁড়িয়ে রইলাম। মনের ভেতরে একটা আশা ছিল যে হয়তো নিধি এখনই আবার গেট থেকে বের হয়ে আসবে! তবে নিধি এল না। আমি বাসায় ফিরে এলাম।
তবে নিধি আমাকে তার ফ্রেন্ডলিস্ট থেকে ব্লক করে দেয় নি। আমরা ফ্রেসবুকে কানেক্টেড ছিলাম। কদিন পরেই সত্যিই আমার পেট্রোবাংলার চাকরিটা হয়ে গেল। ইচ্ছে করেই ফেসবুকে স্টাটাস আপডেট দিলাম। নিধিও সেটা দেখে লাভ রিএকশন দিল।

এরপর আমি চাকরি নিয়ে ব্যস্ত হয়ে গেলাম। তবে দিনের একটা সময়ে আমি ঠিকই নিধি ফেসবুকে ঢুকতাম। দেখতে পেতাম জার্মানিতে সে নিজের জীবনকে গুছিয়ে নিয়েছে। পড়াশোনা করছে, নানান জায়গায় ঘুরছে। দেখতে ভালই লাগত। তবে সেই সাথে মনের ভেতরে একটা কষ্টের অনুভূতি জাগত।
এরপরেই আমি নিধির সাথে একটা ছেলেকেও দেখতে শুরু করলাম। ছেলেটা আমাদের দেশীই মনে হল। বুঝতে কষ্ট হল না যে তার সাথে নিধির সম্পর্কটা কীসের! সত্যিই বলতে কি এরপর থেকেই আমি ফেসবুকে আসা বন্ধ করে দিলাম। নিজের ফোন থেকে ফেসবুক এপটা ডিলিট করে দিলাম। নিধিকে যদিও ভোলা আমার জন্য সম্ভব হল না তবে ওকে মনের এক কোণে ঠেলে রাখলাম। সেখানে আরও কতকিছুই যে জমিয়ে রাখলাম যাতে নিধি আর বের হয়ে না আসতে পারে!
ব্যাপারটা আমার নিজের কাছেই অবাক লাগল বেশ। আমি মানসিক ভাবে একটা প্রস্তুতি নিজেই রেখেছিলাম যে নিধি এক সময়ে আমাকে রেখে চলে যাবেই তারপরেও আমার ওকে হারিয়ে কষ্ট হতে লাগল। এই কষ্টের কোন সীমা পরিসীমা নেই। আমি কিছুতেই নিধির ভালবাসা থেকে বের হতে পারলাম না। এক সময় হার মেনে নিয়ে আমি নিধির স্মৃতি নিয়ে বেঁচে রইলাম কোন মতে।
নিধিকে ভুলে থাকার জন্য আমার মনে হল যে বাড়তি কিছু কাজ করা দরকার। অফিসের কাজের বাইরের সময়টুকু আমি কাজ নিয়ে ব্যস্ত হয়ে থাকতে চাইলাম। যদি কাজের ভেতরে ব্যস্ত থাকি তবেই নিধিকে ভুলে থাকতে পারব। এই ভাবনা থেকেই আমি একটা ফার্ম দেওয়ার কথা ভাবলাম।
মোহাম্মাদপুর বসিলা ব্রিজ পার হয়ে বেশ খানিকটা দুরে গেলেই আমার বাবার কিছু জায়গা জমি ছিল। ক্ষেতের জমিই বলা যায়। এখানে একজনকে লিজ দেওয়া ছিল। সে ধান চাষ করত। আমি আব্বাকে বলে সেই জমিটা চেনে নিলাম। আব্বা যখন শুনল যে আমি এখানে একটা গরুর ফার্ম করব সে বেশ অবাকই হল। আমাকে বলল যে গরুর ফার্ম করা সহজ ব্যাপার না। আমিই তাই চাচ্ছিলাম যে ব্যাপারটা যেন মোটেই সহজ না হয়। আমাকে প্রচুর পরিশ্রম করতে হবে যাতে শরীর ক্লান্ত থাকে। রাতের বেলা বিছানায় শোয়ার সাথে সাথে যেন আমি ঘুমিয়ে পড়তে পারি।
সেই কঠিন সংগ্রাম শুরু করলাম। ব্যাংক থেকে লোন পেতে খুব একটা সমস্যা হল না। দুই মাসের ভেতরেই ফার্ম চালু হয়ে গেল। মাংসের জন্য এবং দুধের জন্য। সত্যি বলতে আমার পুরো জীবনই যেন বদলে গেল এতে। প্রতিদিন অফিস যাওয়ার আগে এবং অফিস থেকে আসার পর আমি ফার্মেই থাকতাম। কাজের জন্য মানুষ রাখা ছিল তবে আমি নিজেও তাদের কাজে হাত লাগাতাম। গরুর ঘাস কাটতাম নিজে। আমার কর্মচারীরা মাঝে মাঝে খুব অবাক হত। তবে আমি যে ওদের সাথে হাতে হাত লাগিয়ে কাজ করছি এতে ওরা খুশিও হত। আমার মই মন প্রাণ দিয়ে কাজ করত। এক বছরের মাথায় ফার্ম বেশ ভাল ফল দিতে লাগল। গরুর ফার্মের সাথে সাথে মাছের চাষ শুরু করলাম। একটা পুকুর আগে থেকেই ছিল পাশের আরও দুইটা পুকুর লিজ নিয়ে নিলাম। এরপর পরিশ্রম বাড়ল টাকাও আসতে লাগল। মোটামুটি বছর পাঁচেকের মধ্যেই আমার ফার্ম একেবারে ফুলে ফেঁপে উঠতে লাগল।
আমার জীবনে তখন কেবল দুইটা কাজ। আমি ভোরে ঘুম থেকে উঠে ফার্মে যাই, যেখন থেকে বাসায় এসে নাস্তা করে অফিসে যাই। অফিস থেকে ফিরে এসে খেয়ে আবার ফার্মে চলে যাই কাজ করতে। রাতে ক্লান্ত শরীরে বাসায় এসে ঘুম দিই। সারাদিনে প্রচুর পরিশ্রমের কারণে রাতে ঘুম চলে আসে দ্রুতই।
ছুটির দিনগুলো সকাল থেকে পুরোটা সময়ই আমি ফার্মেই থাকে। সেখানে আমার থাকার জন্য একটা ঘর রয়েছে। সেখানে দরকার জিনিসপত্র সহ পড়ার জন্য বইপত্র রয়েছে। ছুটির দিনে মাঝে মাঝে বন্ধু বান্ধব আসে আমার ফার্মে। ওদের সাথে আড্ডা দিই, খাওয়া দাওয়া হয় সেখানেই। অনেকটা পিকনিক পিকনিক ভাব হয়। নিজের পুকুর থেকে মাছ ধরি। এভাবেই আমার সময় কাটে।
ওইদিনের পরে আমি আর কোন দিন ফেসবুকে ঢুকে নি। আমার মনে একটা তীব্র ভয় জমে আছে যে যদি আমি নিধি অন্য পুরুষের সাথে দেখি তাহলে সেই দৃশ্য আমার সহ্য হবে না। আমি যেভাবে নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করতে শিয়েছি সেটা একেবারে ভেঙ্গে পড়বে। আমার আর নিধির কমন যে বন্ধুরা ছিল তাদের সাথে আমি মেলামেশা কমিয়ে দিয়েছি। যাদের সাথে পরিচয় আছে তাদের স্পষ্ট করে জানিয়ে দিয়েছি যে কোনো ভাবেই যেন নিধির কথা আমার সামনে কোনদিনই না বলে। ওর জীবন নিয়ে ও সুখে থাক। আমি কখনই যেতে চাই না।
এদিকে বাসা থেকে আমাকে বিয়ে দেওয়ার জন্য পাগল হয়ে গিয়েছিল। আমি এটা নিয়ে তাদের সাথে বেশ কয়েকবার রাগারাগি করেছি। এক সময় বাসা ছেড়ে ফার্মেই উঠে চলে এসেছিলাম। বাসায় আর যাবো না। তারপর বাসা একটু ঠান্ডা হয়েছে। তারপরেও মা মাঝে মাঝে এই কথা তোলার চেষ্টা করত। আমি একা কিভাবে জীবন পার করব, তার পরে আমাকে কে দেখা শোনা করবে। বয়স কালে দেখা শোনার দরকার আছে। আমি এসব এক কান দিয়ে শুনতাম আর এক কান দিয়ে বের করে দিতাম।
আমি ভেবেছিলাম আমার জীবনে আর কোন মেয়ে আসবে না। আসলে আমি আর কোন মেয়েকে ভালোবাসতেই পারতামই না কোন দিন। পারব না। কিন্তু তারপরেও আমার জীবনে আর একজন মেয়ে এসে হাজির হল।
রাইমা আমার অফিসেরই কলিগ। আমার দুই ব্যাচ পরে সে অফিসে ঢুকেছিল। ততদিনে আমার অফিসে একটু পরিচিত এসেছে। কাজে কর্মে আমি খুবই কর্মঠ ছিলাম। অনেক কলিগের কাজ আমি নিজ থেকেই করে দিতাম বলে অনেকের সাথেই আমার সম্পর্ক ভাল ছিল। এছাড়া আমার ফার্মের কথা অফিসের অনেকেই জানে। যাদের বাসা মোহাম্মাদপুরের আশে পাশে তাদের অনেকেই এখানে এসে দুধ ডিম বা হাস মুরগি কিনে নিয়ে যেত। তাজা মাছ নিয়ে যেত। কুরবানির জন্য আমি গরু পালতাম আলাদা ভাবে। আমাদের অফিসের বসেরা আমার কাছ থেকেই গরু নিয়ে যেত। এই ভাবে একটা ভাল পরিচিতি আমার তৈরি হয়েছিল সবার মাঝে। রাইমার সাথে আমার ভাল করে পরিচয় হয় অফিসের একটা পিকনিকে। সেটা আমার ফার্মের হয়েছিল। অফিসের পহেলা বৈশাখের ছুটিতে ঠিক হল যে একটা গেটটুগেদার হবে। তবে সেটা পরে গিয়ে আমার ফার্মে এসে ঠেক। ঠিক হল যে সকাল সকাল আমরা গিয়ে হাজির হব ফার্মে। সামিয়া টাঙ্গিয়ে সেখানে রান্না হবে। আমাদের সামনেই পুকুর থেকে তাজা মাছ ধরা হবে এবং হাসের মাংসের সাথে খিছুড়ি রান্না হবে। আমার ডিপার্টমেন্টের দশ বারোজন মিলে প্লান করেছিলাম। কিন্তু সেটা অফিসের অনেকেই জেনে গেল। এমন কি এমডি সাহেব পর্যন্ত তার পরিবার নিয়ে আসতে চাইলেন। হিসাব মত দেখা গেল প্রায় ৪০জনের একটা গেট টুগেদার হবে। সেই মোতাবেগই সব কিছু হল।
একেবারে খাটি পিকনিক যেটা বলে আরকি। আমরা সবাই নিজেরা নিজেরাই কাজ কর্ম করলাম। যদিও সাহায্যের জন্য আমার ফার্মের লোকজন ছিল। তাই সমস্যা হল না। দুপুরের খাওয়া দাওয়া বেশ ভালই হল। ফার্মের পরিবেশটাও বেশ ভাল লাগল সবার। রাইমা ঘুরে ঘুরে সব দেখছিল। বিকেলের দিকে সবাই যে যার মত চলে গেল। তবে রাইমা রয়ে গেল। সে পুকুর বসে ছিল আপন মনে। যখন সবাই চলে গেল তখন আমিই রাইমার কাছে গেলাম। তখনও রাইমার সাথে আমার ততখানি পিরিচিত তৈরি হয় নি। আমি গিয়ে বললাম, আপনি যাবেন না?
রাইমা আমার দিকে কিছুটা অস্বস্তি নিয়ে বলল, আপনার এই পুকুর পাড়টা খুব চমৎকার। এখানে বসে থাকতে খুব ভাল লাগছে। যদি কিছু মনে না করেন তাহলে আরও কিছু সময় থাকি। আর আমার বাসা কাছেই।
আমি হেসে বললাম, আরে মনে করার কী আছে! আপনি যত সময় ইচ্ছে তত সময় থাকুন। কোনো সমস্যা নেই। আমি একটু বাসা থেকে ঘুরে আসি। কোনো কিছু লাগলেই ডাক দিবেন। আমি সগিরকে বলে যাচ্ছি। ঠিক আছে?
রাইমা হাসল। আমি সগিরকে বলে বাসার দিকে গিয়ে রওয়ানা দিলাম।

সন্ধ্যার পরে যখন আবারও ফার্মে গিয়ে হাজির হলাম তখন অবাক হয়ে দেখলাম যে রাইমা তখনও পুকুর পাড়ে বসে আছে। আপন মনে গুনগুন করে গান গাইছে। আমি কৌতুহল নিয়ে তার কাছে গিয়ে হাজির হলাম। আমাকে দেখে সে একটু লজ্জা পেল। আমি বললাম, আপনার গানের গলা চমৎকার!
রাইমা এবার আরও লজ্জা পেল।
আমরা দুইজন আরও কিছুটা সময় সেই পুকুর পাড়েই বসে রইলাম। রাতের বেলা আমি রাইমাকে বাসায় পৌছে দিলাম।

পরদিন সে অফিসে এসে আমার কাছে একটা অনুরোধ করল। সে আমার ফার্মে মাঝে মাঝে আসতে চাইল। পুকুরপাড়ে সে বসতে চায় কেবল। আমার কোন আপত্তি আছে কিনা। আমার কোন আপত্তি ছিল না। তারপর থেকে প্রায় দিনই রাইমা পুকুর গিয়ে বসত। ছুটির দিনগুলোতে বিকেলবেলা সে পুকুরপাড়ে থাকত। মাঝে মাঝে অফিস থেকে সরাসরি যেত। এভাবেই আমাদের মধ্যে একটা ভাল সম্পর্ক গড়ে উঠল। মা মাঝে মাঝে আসত ফার্মে। মায়ের সাথে আমি রাইমাকে পরিচয় করিয়ে দিয়েছিলাম। মাঝে মাঝে দেখলাম মা নিজেও রাইমার সাথে বসে গল্প করছে। তাদের দুজনের ভেতরেও একটা ভাল সম্পর্ক গড়ে উঠল। তারপরই একদিন রাইমা আমাকে প্রশ্নটা করল।
-এভাবে আর কতদিন পালিয়ে থাকবেন?

আমি প্রশ্নটা শুনে কিছু সময় চুপ করে রইলাম। নিশ্চিত ভাবেই মায়ের কাছ থেকে রাইমা আমার সব কিছু জেনেছে। আমি চুপ করে থেকে বললাম, আসলে জানি না আমি।
-এভাবে কি জীবন চলবে?
-চলছে তো!
-আসলেই কি চলছে?

আমি রাইমার এই প্রশ্নের জবাব দিলাম না। আরও ভাল করে বললে জবাব দিতে পারলাম না। আসলেই কি জীবন চলছে? জীবন কেটে যাচ্ছে বলা যায়। এর বেশি কিছু না। জীবনে আমি কী চেয়েছিলাম, কাকে চেয়েছিলাম কী স্বপ্ন দেখেছিলাম এখন সব কিছু আমার কাছে কেমন যেন অবান্তর মনে হয়। মনে হয় যে এভাবেই বুঝি মানুষ বেঁচে থাকে না পাওয়ার কষ্ট বুকে নিয়ে। একবার যাকে মন থেকে ভালোবাসা যায় তার জায়গায় অন্য কাউকে স্থান দেওয়া কি এতোই সহজ। অথচ আমি কিন্তু আগে থেকেই জানতাম যে নিধি আর আমার পথটা আলাদা। আমি জীবনে কোনদিন দেশের বাইরে যেতে চাই নি। কিন্তু সেই শুরু থেকেই নিধির এই দেশের প্রতি একটা বিতৃষ্ণা কাজ করত। সে এই দেশে থাকবেই না–এমন ছিল তার মনভাব। আমি জনতাম প্রথম সুযোগ এলেই সে দেশ ছেড়ে চলে যাবে। আচ্ছা আমি যদি চেষ্টা করতাম আমিও কি ওর সাথে যেতে পারতাম না? কিন্তু আমার যাওয়াটা কি এতোই সহজ ছিল। বাবা মায়ের একমাত্র সন্তান হিসাবে আমার দায়িত্ব ছেড়ে আমি যেতে পারতাম না। আমি নিধিকে দোষ দেই না চলে যাওয়ার জন্য। আমি যেখানে নিজে দেশ ছেড়ে বাবা মাকে ছেড়ে চলে যেতা চাই নি, নিজের স্বপ্ন আমি ছাড়তে পারি নি, সেখানে নিধিকে নিজের স্বপ্নে ছাড়তে বলি। লজিক মত সব ঠিকই আছে কিন্তু মন কি আর লজিক মেনে চলে?
আমি রাইমার মনের ভাবটা যে বুঝতাম না সেটা বলব। একজন মানুষ যখন অন্য একজনের প্রেমে পড়ে বা মনে ধরে তখন সেটা তা আচরণেই বোঝা যায়। রাইমা হয়তো আমার প্রেমে হাবুডুবু খাচ্ছিল না তবে সে আমাকে যে পছন্দ করে সেটা বুঝতে আমার কষ্ট হল না। আমি অবশ্য সেটা না বোঝার ভান করেই রইলাম। তবে সেই না বোঝার ভান করে বেশি সময় বসে থাকতে পারলাম না।
দিনটা ছিল শনিবার। অফিসের না গেলে আমি সকাল থেকেই ফার্মেই থাকি। তবে আকাশটা মেঘলা থাকার কারণে কেন জানি কাজ করতে ইচ্ছে করছিল না। কিছু সময় কাজ করে ফার্মের ঘরে ফিরে গিয়ে একটু শুয়ে পড়লাম। একটু যেন ঘুমের মত চলে এসেছিল। ঘুম ভাঙ্গার পরে যখন বারান্দায় এসে দাড়িয়েছি তখন বৃষ্টি শুরু হয়ে গেছে। আমি আবার ভেতরে যাবো ভাবছিলাম তখনই রাইমাকে দেখতে পেলাম। সে এরই ভেতরে ফার্মে চলে এসেছে। আমি ঘুমিয়ে ছিলাম বলেই বোধহয় আমাকে ডাকে নি। সে পুকুর পাড়ের সিমেন্টের বেঞ্চের উপর বসে বসে ভিজছে। তাকিয়ে আছে পুকুরের পানির দিকে।
আমি কেন জানি দৃশ্যটার থেকে চোখ সরাতে পারলাম না। রাইমা আজকে পরেছে নীল সাদা রং মিশেলের একটা সাড়ি। সে এক মনে পুকুরের দিকে তাকিয়ে তাকিয়ে বৃষ্টিতে ভিজছে। তার মুখে এক আশ্চর্য বিষন্নতা রয়েছে। আমার তখনই কেন জানি মনে হল এই মেয়েটা আমার জন্য মন খারাপ করে আছে।
আমি জানি এমনটা ভাবার আসলে কোনো কারণ নেই। রাইমা আমাকে পছন্দ করে আমি জানি কিন্তু তার মানে এই না যে আমাকে ছাড়া সে বাঁচবে না। এই টাইপের প্রেমট্রেন না। আমি রাইমার দিকে একভাবেই তাকিয়ে রইলাম। ব্যাপারটা রাইমা যেন টের পেল। সে আমার দিকে ফিরে তাকাল।
আর তখন আমার সেই আগের ধারণাটা আরও খানিকটা পাকাপোক্ট হল। আমি মন্ত্রমুগ্ধের মত করে বারান্দা থেকে নেমে এলাম বৃষ্টিতে। মুহুর্তের ভেতরেই একেবারে ভিজে গেলাম। অনেক দিন পর আমি বৃষ্টিতে ভিজতে নামলাম। নিধির সাথে বেশ কয়েকবার আমি বৃষ্টিতে ভিজেছি। এই ব্যাপারের স্মৃতি আমার রয়েছে। তাই সচেতন ভাবেই এই কাজটা আমি এড়িয়ে চলতাম সব সময়। কিন্তু আজকে সেসব আমার মনে রইলো না।

আমি যখন রাইমার সামনে গিয়ে দাড়ালাম তখন দেখি সে কেমন একটা ঘোলা চোখে আমার দিকে তাকিয়ে আছে। আমার দিকে তাকিয়েই সে বলল, আজকের বৃষ্টিটা কী সুন্দর তাই না? আমার এই রকম অনেক দিন বৃষ্টিতে ভেজার ইচ্ছে ছিল!
আমি জবাব না দিয়ে কেবল মাথা ঝাকালাম। রাইমা কিছুটা হাত উঠিয়ে শরীরটা কিছুটা ঘুরিয়ে আবার আমার সামনে মুখ করে দাঁড়াল। বৃষ্টির পানিতে ওর সারা দেহ পল্লবে ছড়িয়ে পড়েছে। আমি একভাবেই রাইমার দিকে তাকিয়ে আছি।
আমি হঠাৎ করে রাইমার আরও খানিকটা কাছে গিয়ে হাজির হলাম। রাইমা একটু চমকে উঠলেও পিছিয়ে গেল না। বরং একটু যেন কাছে এগিয়ে এল আমার। আমাদের দুজনের মাঝে যে দেওয়াল ছিল সেটা যেন এক মুহুর্তের ভেতরেই ভেঙ্গে গেল।
আমার ফার্মের কর্মচারিরা আমাদের চুমু খেতে দেখেছিল কিনা সেটা আমি জানি না। অবশ্য সেসব ভাবার চিন্তা আমাদের কারো মাথায় ছিল না। আমরা দুজন কেবল সেই মুহুর্তের ভেতরেই ছিলাম।

পরিশিষ্ট
আমাদের বিয়েটা পারিবারিক ভাবেই হল। আমার পরিচবারের মানুষ এটাতেই খুশি যে আমি বিয়ে করতে রাজি হয়েছি। আর ছেলে হিসাবে একেবারে খারাপ ছিলাম না যে রাইমার পরিবার মানা করবে। তাই বিয়ে সম্পন্ন হল স্বাভাবিক ভাবেই।
তবে এখন আমার মনে প্রায়ই হয় যে যদি সেদিন আমি রাইমাকে ওভাবে বৃষ্টিতে না ভিজতে দেখতাম তাহলে আমি কি রাইমার দিয়ে কোন দিন এগিয়ে যেতাম? আমি জানি না। সেদিকের সেই এক মুহুর্তেই সব কিছু বদলে গেল। আসলে এমন ভাবেই তো হয় সব কিছু । মানুষের মন এক মুহুর্তের পরিবর্তিত হয়, এক মুহুর্তেই মানুষ প্রেমে পড়ে! আমার মনও সেই এক মুহুর্তেই রাইমাকে কাছে আসতে দিয়েছিল। সেই এক মুহুর্তেই সব দেওয়াল ভেঙ্গে ছারখার হয়ে গিয়েছিল। আমিও আর নিজেকে দুরে রাখি নি। জীবন আমাদের সবাইকে কোনো না কোনো ভাবে সুযোগ দেয়। একটু ভালো থাকার। আমার সবারই উচিত সেই সুযোগটা গ্রহণ করা। নতুন ভাবে ভালোবাসা আর নতুন ভাবে সব কিছু শুরু করা!

ফেসবুকের অর্গানিক রিচ কমে যাওয়ার কারনে অনেক পোস্ট সবার হোম পেইজে যাচ্ছে না। সরাসরি গল্পের লিংক পেতে আমার হোয়াটসএপ বা টেলিগ্রামে যুক্ত হতে পারেন। এছাড়া যাদের এসব নেই তারা ফেসবুক ব্রডকাস্ট চ্যানেলেও জয়েন হতে পারেন।

অপু তানভীরের নতুন অনুবাদ গ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে

বইটি সংগ্রহ করতে পারেন ওয়েবসাইট বা ফেসবুকে থেকে।

How useful was this post?

Click on a star to rate it!

Average rating 4.7 / 5. Vote count: 32

No votes so far! Be the first to rate this post.

About অপু তানভীর

আমি অতি ভাল একজন ছেলে।

View all posts by অপু তানভীর →

6 Comments on “এক মুহুর্তে”

  1. গল্পের শুরুতে একটা চাপা কষ্ট কাজ করছিল আর শেষ দিকে এসে এক ধরনের প্রশান্তি অনুভব করলাম। মানুষের জীবনে বিচ্ছেদ যেমন চরম সত্য, নতুন করে বাঁচতে শেখাটাও ঠিক ততটাই বাস্তব।

    বৃষ্টির সেই বিশেষ মুহূর্তটি এবং রাইমার সাথে তার জীবনের নতুন শুরুটা দারুণ একটা অনুভূতি সৃষ্টি করেছে। অহেতুক আবেগপ্রবণ না হয়েও জীবনের রূঢ় আর কোমল উভয় দিকই আপনি দারুণভাবে তুলে ধরেছেন।

    সুন্দর এই গল্পটির জন্য আপনাকে অনেক ধন্যবাদ। এমন আরও জীবনমুখী গল্পের অপেক্ষায় রইলাম।

    1. গল্পটা লেখার সময় আমার নিজেরও এমনই মনে হচ্ছিল। এক সময় আমার ইচ্ছে ছিল যে গল্পে অন্য কোন মেয়েকে আনবো না কিন্তু তারপর মনে হল সুখের সপাপ্তিই ভাল।

  2. গল্পটা পড়লাম। পড়তে পড়তে একসময় নিজের অজান্তেই থমকে যেতে হচ্ছিল কয়েক জায়গায়। বিশেষ করে সেই বৃষ্টির মুহূর্তটায়; যেন চোখের সামনে দেখতে পেলাম দুজন মানুষকে, যারা নিজেদের তৈরি দেওয়ালের এপারে ওপারে দাঁড়িয়ে, আর বৃষ্টি সেই দেওয়ালটাকে ধুয়ে দিচ্ছে। দারুণ লেগেছে আপনার গল্পের সেই সহজ, সাদামাটা টান।

    নিধি থেকে রাইমা পর্যন্ত যাত্রাটা কৃত্রিম লাগেনি, বরং জীবনের মতোই স্বাভাবিক লেগেছে। অনেক সময়ই আমরা বুঝতে চাই না যে মনও বদলায়, বদলাতে পারে। আর সেই বদলটা মেনে নিতেও যেন একটু সাহস লাগে।

    সত্যি, ভালো লাগার মতো গল্প লিখেছেন।

    আপনাকে অনেক ধন্যবাদ। আরও নতুন গল্প উপহার দেবেন, অপেক্ষায় থাকলাম।

    1. প্রতিটা মানুষের জীবনেই এই মুহুর্ত আসে। তখন প্রকৃতি হয় সুযোগ দেয়, দেওয়াল ভাঙ্গার একটা চরম মুহুর্ত এসে হাজির হয়।
      (পুরানো পোস্টের কমেন্ট ক্লোজড এর অপশনটা তুলে নিয়েছি। আপনার না পুরানো পোস্টের মন্তব্যের ইচ্ছে ছিল। তবে স্পার্ম কমেন্ট যদি বেড়ে যায় আবারও হয়তো বন্ধ করে দিতে হবে।)

  3. বৃষ্টির দিনে পুকুরপাড়ের সেই দৃশ্যটা পড়ার সময় মনে হচ্ছিল যেন আমি নিজেই সেখানে দাঁড়িয়ে আছি। মানুষের মনের দেয়াল কীভাবে একটা সুযোগেই ভেঙে যায়, আপনার গল্পে সেটা দারুণ ভাবে চিত্রায়ন হয়েছে। এই গল্পটা পড়ে মনে হচ্ছে, জীবনের কিছু পাতা নিজে থেকেই ওলটে যায়, আর কিছু পাতা অপেক্ষায় থাকে এভাবে উল্টে যাবার জন্যে।

    শুভকামনা রইল আপনার জন্য।

    1. আমার নিজেরও সেই রকমই মনে হচ্ছিল। চোখের সামনে আমি দেখতে পাচ্ছিলাম যেন সেই পুকুর পাড় আর বৃষ্টি।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *