দীনা যখন নিজের বাবার বাসায় এসে হাজির হল তখন ওর মনের ভেতরে একটা স্বস্তির অনুভূতি এসে জড় হল। প্রেগনেন্সির শুরুর দিন থেকে দীনার ভেতরে একটা ভয় জমতে শুরু করেছে। প্রথম প্রথম ভয়টা কেবল মাত্র স্বপ্নের ভেতরেই সীমাবদ্ধ ছিল। স্বপ্নে সে দেখতে পেত কাল কুচকুচে ভয়ংকর চেহারার এক জন্তু তার আশে পাশে ঘোরাফেরা করছে। তাকিয়ে রয়েছে তার পেটের দিকে। দেখলেই মনে হবে যেন সেটা ঠিকই জানে যে সে সন্তান সম্ভবা। দীনা তখন নিজেও জানত না। সে নিজে তখনও বুঝতে পারে নি যে তার ভেতরে নতুন এক প্রাণের সৃষ্টি হয়েছে।
মাস দুয়েক পরে সে বুঝতে পারল যে সে প্রেগনেন্ট। কথাটা সজিবকে জানাতেই পুরো বাসায় একটা আনন্দের বন্যা বয়ে গেল। তবে দীনার মাঝে একটা চাপা অস্বস্তির দানা বাঁধতে লাগল। কারণ স্বপ্নটা তার পিছু ছাড়ে নি। বরং দিনকে দিন সেটা যেন আরও স্পষ্ট হয়ে উঠতে লাগল। দীনার মনে একটা ভয় এসে বাসা বাঁধতে লাগল যে তার বাচ্চার উপরে একটা কালো ছায়া এসে জড় হয়েছে। নিজের মনের কথা সে তার শ্বাশুড়িকে জানিয়েছিল। শ্বাশুড়ি হেসে বলেছিল যে প্রথম সন্তান হওয়ার সময়ে মেয়েদের মনে এমন ভয় এসে জড় হওয়াটা স্বাভাবিক। সবাই এমন করেই ভয় পায়। তাই এটা নিয়ে চিন্তার কোন কারণ নেই। তারপরেও তিনি পাড়ার মাওলানাকে ডেকে নিয়ে এসেছিলেন। মাওলানা সাহেব দোয়া পড়ে ফু দিয়ে গেছেন। তবে দীনার সেই ভয় কাটে নি। স্বপ্ন দেখাও বন্ধ হয় নি। প্রায় প্রতিদিনই সে কালো জন্তুটাকে দেখতে লাগল। স্বপ্নে জন্তুটা তার পেটের কাছে দাঁড়িয়ে থাকত আর একভাবে সেদিকে তাকিয়ে থাকত। দীনা নড়তে পারত না। তার পুরো শরীরে যেন অদ্ভুত এক অসাড়তা এসে ভয় করত। সে নিজেও বুঝতে পারত যে স্বপ্ন দেখছে সে। তাই সে প্রাণপনে চেষ্টা করত যাতে তার ঘুম ভেঙ্গে যায়। অসহায়ের মত পড়ে থাকত।
একটা সময়ে দীনা নিজের মায়ের বাসায় আসতে চাইল। সজিব অবশ্য প্রথমে একদমই তাকে আসতে দিতে চাচ্ছিল না। তবে এক সময়ে দীনার মন রক্ষার জন্য সে দীনাকে মায়ের বাসায় নিয়ে এল। দীনার ইচ্ছে সে বাচ্চার ডেলিভারির আগ পর্যন্ত মায়ের কাছেই থাকবে। স্বামীর বাড়িতে আসলে যতই আদর যত্নে থাকুক না কেন এদেশের মেয়েরা বাচ্চা হওয়ার সময়ে তার বাবার বাসায় থাকতে চায়। এটা তাদের একটা মানসিক শান্তি দেয়। দীনার মনে মনে এইটা ভেবে নিশ্চিন্ত হল যে এবার বুঝি সে আর সেই স্বপ্নটা দেখবে না।
রাতে খাওয়া দাওয়া শেষ হতেই দীনার মা তাকে জিজ্ঞেস করল, এখনও কি সেই স্বপ্নটা দেখিস তুই?
স্বপ্ন দেখা শুরুর পর থেকে দীনা তার মায়ের কাছে পুরো ব্যাপারটা বলেছিল। তার মা সেদিনই বলেছিল যে দীনা যেন তার কাছে চলে আসে।
দীনা তাকে পুরো ঘটনাটা খুলে বলল। দীনার মা রাবেয়া খাতুন বেশ চিন্তিত মুখে মেয়ের দিকে তাকালেন। প্রথম সন্তান হওয়ার সময়ে মেয়েরা এমন একটু দুঃশ্চিন্তায় ভোগে সেটা রাবেয়া খাতুন জানেন, কিন্তু তারপরেও এমন ভাবে প্রতি নিয়ত একই ধরনের স্বপ্ন দেখাটা তার কাছে ভাল মনে হল না। রাতের শোয়ার সময়ে তিনি দোয়া পড়ে দীনার শরীরে ফু দিয়ে দিলেন। এছাড়া ঘরের চারিদিকেও দোয়া পড়ে ফু দিলেন।
সেদিন রাতে আশ্চর্যজনক ভাবেই দীনা খুব শান্তি মতই ঘুমালো। কোন খারাপ স্বপ্ন সে দেখল না। সকালে রাবেয়া খাতুন দীনার চেহারা দেখেই বুঝতে পারলেন যে মেয়ে রাতে কোনো খারাপ স্বপ্ন দেখে নি। তিনিও একটু স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললেন।
পরের কয়েকটা দিন একই ভাবে কোনো খারাপ স্বপ্ন না দেখেই দীনা পার করে দিল। দীনার মনে হল যে আর সে স্বপ্ন দেখবে না। মূলত মনের ভেতরের ভয় থেকেই সে স্বপ্নটা দেখছিল বারবার। এখন মায়ের কোলে ফিরে এসে দীনা নিজেকে নিরাপদ মনে করছে। তাই এখন আর কোন চিন্তার কারণ নেই। সবই তার মনের অতিরিক্ত চিন্তার ফল।
কিন্তু তার ভুল ভাঙ্গল এক সপ্তাহ পর। একটা সপ্তাহ একেবারে নিশ্চিন্ত কাটিয়ে যখন দীনা একেবারে স্বাভাবিক জীবনে ফিরে এসেছে ঠিক সেদিন রাতেই সে আবার সেই কালো কুচকুচে প্রাণীটাকে দেখতে পেল। তবে এইবার সে প্রানীটাকে আর স্বপ্নে দেখল না। এবার সে দেখল বাস্তবে। দীনার স্বপ্নের সেই জন্তুটা একেবারে বাস্তবে এসে হাজির হল।
সেদিন সকালে সজিব এসেছিল দীনার কাছে। তার কাছে যখন শুনতে পারল যে সেই ভয়টা আর পাচ্ছে না, সেই স্বপ্নটা আর দেখছে না তখন সজিব তাকে ফিরে যেতে বলল। দীনা অবশ্য রাজ হল না। দীনা বলল যে এখনই সে যেতে চায় না। সজিব একটু মনক্ষুন্ন হল বটে তবে দীনার উপরে বেশি চাপ দিল না। দুপুরের খাওয়া দাওয়ার পরে আবার চলে গেল।
সেদিন রাতের বেলা সেদিন দীনার ঘুম আসছিল না। দিনের বেলা সে বেশ কিছুটা সময় ঘুমিয়েছি তার উপরে রাতে এক কাপ কফি খেয়েছিল। এই কারণেই ঘুম আসছিল না। নিজের ঘরের বিছানাতে শুয়ে শুয়ে সে বই পড়ছিল। রাত তখন কয়টা হবে সেটা দীনার কোন খেয়াল ছিল না। এক মনে সে বই পড়ে চলেছে। বইয়ের ভেতরে যেন ঢুকে গিয়েছিল। ঠিক এমন সময়ে বিদ্যুৎ চলে গেল। দীনা প্রথম কয়েক মুহুর্ত কোন চিন্তা করল না। কারণ তাদের বাসায় আইপিএস লাগানো রয়েছে। বিদ্যুৎ চলে যাওয়ার এক সেকেন্ডের পরই আবার আলো জ্বলে ওঠে। কিন্তু আলো জ্বলল না। দীনা অবাক হল একটু। এমন তো হয় না খুব একটা। আজকে সারাদিনে একবারও বিদ্যুৎ যায় নি। তার মানে আইপিএসে চার্জ রয়েছে। তাহলে আলো জ্বলছে না কেন?
দীনার চোখ তখন বারান্দার দিকে গেল। বাইরে তাকিয়ে দেখতে পেল যে দুরের বিল্ডিংয়ে আলো জ্বলছে। তার মানে হচ্ছে বিদ্যুৎ যায় নি। তাহলে ওদের বাসায় বিদ্যুৎ নেই কেন? ঠিক তখনই দীনার মনের ভেতরে একটা তীব্র ভয়ের অনুভূতি এসে জড় হল। তার চোখ চলে গেল ঘরের ডান দিকের কোণার দিকে। সেদিকে চোখ যেতেই দীনার বুকের ভেতরে ধরাক করে উঠল। ঘরের ভেতরের অন্ধকারটা দীনার চোখে সয়ে এসেছে এবং সেই সয়ে আসা চোখেই সে কালো সে জন্তুটাকে দেখতে পেল। তার দিকে তাকিয়ে রয়েছে। ঠিক তার দিকে না বলে তার পেটের দিকে তাকিয়ে রয়েছে। দীনার মনে হল যে সে বই পড়তে পড়তে ঘুমিয়ে পড়েছে। তারপরেই স্বপ্ন দেখেছে সে। এমনটাই সে বিশ্বাস করতে চাইল। কিন্তু কেন জানি নিজেই সে নিজের অনুমানটাকে বাতিল করে দিল। এর আগেও এই জন্তুটা তার সামনে এসেছে। সেই সময়ে কিছু সময়ের পরেই দীনা বুঝতে পারত যে সে স্বপ্ন দেখছে আর তখন সে জেগে ওঠার চেষ্টা করত কিন্তু আজকে সে স্বপ্ন দেখছে না। সে বাস্তবে রয়েছে। এবার জন্তুটা আর স্বপ্নে আসে নি, সে এসেছে বাস্তবে। দীনা কী করবে বুঝতে পারল না। ভয়ে তার গলা শুকিয়ে গেছে। তীব্র পানির পিপাশা পেল তার।
দীনা দেখল সেই জন্তুটা আস্তে আস্তে তার কাছে এসে হাজির হল। দীনা নড়তে চাইল তবে পারল না। ঠিক স্বপ্নে যেমন ভাবে তার শরীর অসার হয়ে যেত, এখনও ঠিক একই ভাবে তার পুরো শরীর যেন অসার হয়ে গেছে। দীনা কিছুতেই নড়তে পারছে না। এমন কি মুখ দিয়ে চিৎকার পর্যন্ত করতে পারছে না সে।
জন্তুটা আরও কাছে চলে এল দীনা। দীনা একটা কটু গন্ধ পেল নাকে। কোন সন্দেহ নেই যে জন্তুটা একেবার সত্যি তার কাছে এসে দাঁড়িয়েছে। সেটা আস্তে আস্তে দীনার পেটের কাছে এসে নিজের নাক শুকল। মনে হল যে তার বাচ্চার ঘ্রাণ নিল সেটা। তারপর তার দিকে তাকিয়ে একটা কুৎসিত হাসি দিল। দীনার চোখের দিকে তাকিয়ে কী যেন একটা ইশারা করল। দীনা প্রথমে তার হাতের ইশারা বুঝতে না পড়লেও একটু পরেই বুঝতে পারল। জন্তুটা তার ইশারায় জানাচ্ছে যে তার পেটের এই বাচ্চাটা তার। সে নিজে যাবে। দীনা চিৎকার করতে চাইল। হাত দিয়ে নিজের পেটটাকে ঢেকে রাখতে চাইল তবে তার হাতে যেন কোন শক্তিই পেল না। এটা দেখে জন্তুটা যেন বেশ মজাই পেল। দাঁত বের করে হাসল সেটা।
ঠিক এমন সময়ে একটা ঘটনা ঘটল। দীনার ঘরের দরজাটা খুলে গেল। সাথে সাথে একটা আলোর রেখা হয়ে ঢুকল ঘরে। মাঝখানের ঘরে আলো জ্বলছে সেই আলো ঘরে ঢুকেছে। দরজা খুলেছে দীনার মা !
দীনার মা দরজা খুলে খাটের দিকে তাকালেন। সাথে সাথে তিনি জমে গেলেন। কারণ দীনার শরীরের কাছে কালো জন্তুটাকে তিনিও দেখতে পেয়েছেন। দরজা খুলে ভেতরে ঢুকতেই সেটাও ফিরে তাকাল রাবেয়া খাতুনের দিকে। তিনি প্রথমে বুঝতেই পারলেন না যে কী দেখছেন! হাত এবং পা সমান লম্বা জন্তুটার। অনেকটা গড়িলার মত করে বসে রয়েছে সে দীনার শরীরের কাছে। রাবেয়া খাতুন কিছু সময় কেবল অবাক হয়ে তাকিয়ে রইলেন। তিনি আসলে বিমূঢ় হয়ে গেছেন। এমন কিছু যে তিনি দেখবেন সেটা তিনি ভাবতেও পারেন নি।
রাবেয়া খাতুন দেখতে পেলেন জন্তুটা তার দিকে এক ভাবে তাকিয়ে রইলো কিছু সময়। তারপর যেন একটু হাসি দিল সেটা। এরপর ধীরে ধীরে সে বারান্দার দিকে হেটে হেটে চলে গেল। তারপর চোখের পলতে গায়েব হয়ে গেল।
জন্তুটা গায়েব হয়ে যাওয়ার পরেও রাবেয়া খাতুন একই ভাবে দাঁড়িয়ে রইলেন কিছু সময়। তিনি যেন নড়তে ভুগে গেছেন। দীনার ডাকে তার সম্বিত ফিরল। তিনি দ্রুত দীনার কাছে দৌড়ে গেলেন। তারপর বললেন, তুই ঠিক আছিস?
দীনা ভীত চোখে তাকাল তার মায়ের দিকে। তারপর বলল, তুমিও দেখেছো ওটা তাই না?
রাবেয়া খাতুন কী বলবেন খুজে পেলেন না। যদি সত্যি কথা বলেন তবে দীনা যে ভয় পাবে সেটা নিশ্চিত কিন্তু তিনি মিথ্যা কথাই বা কিভাবে বলবেন? এতোটা বাস্তব ভাবে তিনি জন্তুটাকে দেখতে পেলেন?
আচ্ছা কোন ভাবে কি তিনি হ্যালুশিনেশন করলেন? দীনার কাছ থেকে শুনে শুনে তারও মনের ভেতরে কোন চাপ সৃষ্টি হয়েছে, সেটার থেকেই তিনি পুরো ব্যাপারতা কল্পনা করে নিয়েছেন?
রাবেয়া কিছু না বলে দোয়া পড়তে লাগলেন কেবল। দোয়া পড়ে ফু দিতে লাগলেন মেয়ের মাথায়। তিনি দীনাকে কী শান্তনা দিবেন সেটাই বুঝতে পারছেন না, কারণ তিনি নিজেও খুব ভয় পেয়েছেন। জীবনে প্রথমবারের মত এমন কিছু তিনি স্বচোখে দেখলেন। ভয় পাওয়াটা স্বাভাবিক। বাকি রাতটা দুজন জেগেই কাটিয়ে দিল।
পরদিন সন্ধ্যার সময়ে একজন হুজুরকে ডেকে আনা হল। পুরো সমস্যাটা আসলে কোথায় সেটা দেখার জন্য তাকে বলা হল। হুজুর পুরো ফ্ল্যাটটা একটু ঘুরে ঘুরে দেখতে লাগলেন। এমন একটা ভাব করতে লাগলেন যেন তিনি কিছু বুঝতে পারছেন। তারপর দীনার ঘরে গিয়ে তিনি কিছু দোয়া পড়তে শুরু করলেন। দীনার পরিবার বসার ঘরে বসেই সেই কাজ কর্ম দেখতে শুরু করল। সব কিছু স্বাভাবিকই ভাবেই চলছিল ঠিক এই সময়ে ধপ করে দীনার ঘরের আলো নিভে গেল। আলো নিভে যাওয়ার ব্যাপারটা দীনা বসার থেকেই দেখতে পেল। তারপরই তার ঘরের দরজাটা বন্ধ হয়ে গেল। দীনার মনের ভেতরে একতা তীব্র আতঙ্ক এসে জড় হল। দীনার মনে হল যে ভয়ংকর কিছু ঘটতে চলেছে।
দীনার মা কিংবা বাবার কারোই ঠিক সাহস হল না দরজার কাছে গিয়ে দরজাটা ধক্কা দেওয়ার, ভেতরে কী হচ্ছে সেটার জানার! দীনা একেবারে ভয়ে চুপ করে সেখানেই বসে রইল।
সময় যেন স্থির হয়ে গেছে। সেকেন্ডের কাঁটা যেন কাটছেই না। তবে এক সময় সব সেই দরজাটা আবার খুলে গেল। দীনা দেখতে পেল দরজা দিয়ে হুজুর বের হয়ে এলেন। তার পাঞ্জাবীর কয়েক জায়গায় ছিড়ে গেছে। সে দীনার মায়ের দিকে তাকিয়ে বলল, বোন এই জিনিস আবার দ্বারা সমাধান করা সম্ভব না। আপনার মেয়েকে ভালো কারো কাছে নিয়ে যান। ওর সামনে ভিষণ বিপদ!
রাবেয়া খাতুন আরও কিছু জিজ্ঞেস করতে যাচ্ছিলেন তবে হুজুর মোটেই দাঁড়ালেন না। দ্রুত বের হয়ে গেলেন। তিনি এই বাড়িতে এক মিনিটও থাকতে চান না।
সেদিন রাতে দীনা একা থাকার সাহস পেল না। তিনজন একই ঘরে শুয়ে রইল। তবে তারপরেও তারা মুক্তি পেল না। ঠিক মাঝ রাতের দিকে সেই জন্তুটা আবারও এসে হাজির। দীনা, তার বাবা আর মা অবিশ্বাসের চোখে তাকিয়ে রইলো সেদিকে। সবাই নড়তে ভুলে গেছে। এই প্রথমবারের মত সেই জন্তুটা ওদের দিকে তাকিয়ে বড় অদ্ভুত কন্ঠে বলল, আমার জিনিস আমি নিয়ে যাবোই। আমার জিনিস আমি নিয়ে যাবোই।
তারপর সেই জন্তুটা ওদের খাটের চারিপাশেই ঘুরতে লাগল। তবে মিমি বা ওদের পরিবারের কারো উপর হামলে পড়ল। ভর হওয়ার আগেই সেটা চলে গেল আগের মত করেই। এইভাবে প্রত্যেকটা দিন সেই জন্তুটা আসতে লাগল। দীনা ভয়ে ভয়ে কেবল সেদিকে তাকিয়েই থাকত। তবে দীনা বুঝতে পারত যে এই জন্তুটা তার পেটের সন্তানকে চায়। সে তাদের হয়তো ক্ষতি করবে না তবে তার পেটের সন্তানকে নিয়ে যাবে। যতই দিন যাচ্ছিল ততই জন্তুটা একটু একটু করে দীনার কাছে এগিয়ে আসছিল। আগে তো কেবল দীনাকে ঘিরে চক্কর দিত সেটা। যতই দিন যেতে লাগল সেই বৃত্তটা আরো ছোট হয়ে আসতে লাগল। দীনা কেবল অসহায়ের মত সেদিকে তাকিয়ে থাকত। এরই মাঝে আরও কয়েকজনকে ডেকে আনা হয়েছে। ঘর বন্ধ করা হয়েছে। নানান রকম ঝাড়ফুকও করা হয়েছে কিন্তু কোন লাভ হয় নি। কেউ আটকাতে পারে নি জন্তুটাকে।
সেদিনও দীনা অপেক্ষা করছিল জন্তুটার জন্যই। দীনা ছিল একাই। তার মা আর বাবাকে সে আর রাখে নি পাশে। তারা থেকেও আসলে কোন কাজ হয় নি। জন্তুটা আসলেই ঘরের সবার হাত পা পুরো শরীর একেবারে অবশ হয়ে যায়। কেউ নড়তে পারে না। ওর বাবার প্রথম দুদিনের পরেই বেশ অসুস্থ হয়ে গিয়েছিলেন। তিনি আসলে এই চাপ সহ্য করতে পারছিলেন না। রাবেয়া খাতুনেরও বয়স হয়েছে। তাই দীনা ঠিক করেছে সে একাই সব সহ্য করে নিব। এটা ছাড়া আসলে আর কোন উপায় নেই তাদের হাতে। আজকেও তাই সে জন্তুটার জন্য অপেক্ষা করতে লাগল।
নির্দিষ্ট সময়ে সেতা এসেও পড়ল। আজকে কেন জানি জন্তুটাকে আর আগের মত ভয় লাগল না তার। দীনা জানে যে তার কোন ক্ষতি করবে না। জন্তুটা বারবার কেবল একটা কথাই বলে। তার জিনিস সে নিয়ে যাবে। এই বাচ্চা তার জিনিস কিভাবে হয় দীনা জানে না। দীনা কয়েকবার চিৎকার করে জানতে চেয়েছে তবে জন্তুটা তার কথা বুঝেছে কিনা দীনা জানে না। সেটা কোন জবাব দেয় নি। আজকেও জন্তুটা এসে হাজির হল। আসার আগে ঘরের আলো চলে গেল। তারপরই দীনার পুরো শরীরটা একেবারে অবশ হয়ে গেল প্রতিদিনের মতই। দীনা তাকিয়ে রয়েছে সেই জন্তুটার দিকে। একবার চক্কর মেরে যখন দ্বিতীয়বার আবার চক্কর মারতে যাবে তখন একটা অদ্ভুত ঘটল। ঘরের আলো জ্বলে উঠল। দীনা চমকে উঠল তখনই। এবং দেখল কেবল দীনাই নয়, জন্তুটাও একটু যেন চমকে উঠেছে। দীনা তখনই টের পেল তার শরীরের অবশের ভাবটা চলে গেছে। সে নিজের হাত নাড়তে পারছে। যখন একটু নড়তে পারল তার একটু পরেই ওর ঘরের দরজাটা খুলে গেল। দীনা মুখ ফিরিয়ে দেখে সেখানে একজন অপরিচিত মানুষ দাঁড়িয়ে রয়েছে। কালো রংয়ের একটা শার্ট আর কালো প্যান্ট। সে তীক্ষ্ণ চোখে তাকিয়ে রয়েছে। দীনার দিকে নয়, জন্তুটার দিকে।
জন্তুটা তখনও ঘরের ভেতরেই রয়েছে। দীনা বুঝতে পারল সেটা রেগে গেছে । সেটা যেন রাগের কারনেই দরজায় দাঁড়িয়ে থাকা সেই মানুষটার দিকে দৌড়ে যেতে চাইল কিন্তু এক পা এগোটেইএ কটা ধাক্কা খেল যেন। তারপরেই দীনা তার জীবনের সব থেকে বিশ্ময় কর ঘটনাটা ঘটতে দেখল। দীনা দেখল সেই মানুষটা মুখ দিয়ে দুটো শব্দ উচ্চারণ করল। এবং সাথে সাথে তার হাত দিয়ে আলোর মত কিছু একটা বের হল এবং সেটা তীব্র গতিতে ছুটে গিয়ে লাগল জন্তুটার শরীরে। এতোটাই তীব্র হল সেটার ওয়েব দীনা সেটা অনুভব করতে পারল। সেই জন্তুটা ছিটকে গিয়ে পড়ল দেয়ালে। সেই দেয়ালের পাশে ড্রেসিংটেবিল ছিল। সেটায় আয়না ঝনঝন করে ভেঙ্গে পড়।
দীনা দেখল জন্তুটা উঠে দাঁড়াল। তবে আবারও সেই অদ্ভুত আলোর ঝলকানী তার শরীরে গিয়ে লাগল। দীনা এবার শব্দ দুটো বুঝতে পারল।
‘অপ্রে ভিয়েস্তা’
তারপর আবার!
‘অপ্রে ভিয়েস্তা’
আবার
‘অপ্রে ভিয়েস্তা’
দীনা এবার দেখতে পেল জন্তুটার আর আক্রমণ করার প্রবণতা নেই। সে যেন পালিয়ে যেতে চাইছে। প্রতিবার ঠিক সেদিকে গিয়ে যে গায়েব হয়ে যায় সেদিক পা বাড়াতে গেল সেটা। তবে পারল না। দীনার মনে হল কিছু যেন তার হাত দুটো আঁকড়ে ধরেছে। তারপর সেই হাত দুটো ধরে দেয়ালের সাথে চেপে ধরেছে। জন্তুটা নিজেকে ছাড়ানোর জন্য ছফফট করতে লাগল বটে কিন্তু কোন কাজ হল না। এক সময়ে জন্তুটা বুঝতে পারল যে ওর পক্ষে নিজেকে মুক্ত করা সম্ভব না। দীনা যখন আবার মানুষটার দিকে তাকাল তখন দেখতে পেল সে একটা হাত উপরে তুলে রেখেছে। দীনার কাছে অবিশ্বাস্য মনে হল বটে তবে এই হাত দিয়েই যে সে জন্তুটাকে নিয়ন্ত্রণ করে রেখেছে সেটা বুঝতে কষ্ট হল না।
একটু সময় পরে মানুষটা জন্তুটার দিকে তাকিয়ে বলল, কেন এখানে এসেছিস?
আবার সেই অদ্ভুত কন্ঠে জন্তুটার ভেতর থেকে আওয়াজ বের হল, আমার জিনিস, আমি নিতে এসেছি।
-আমার জিনিস মানে?
-আমার জিনিস?
-তোর জিনিস হয় কিভাবে?
-আমার জিনিস।
-এখানে তোর কোনো জিনিস নেই। এই বাচ্চা তোর না।
-আমার ! আমার!
-তুই জানি তোকে এখনই মেরে ফেলতে পারি। এখান থেকে যাবি না মরবি?
-আমি যেতে পারব না।
-কে পারবি না?
-আমাকে ডেকে এনেছে আমি যেতে পারব না। এই বাচ্চা আমার।
-কে ডেকে এনেছে?
-আমি জানি না। আমি যেতে পারব না। এই বাচ্চা না নিয়ে আমি যেতে পারব না। এই বাচ্চা আমার।
দীনা কেবল অবাক হয়ে তাকিয়ে রয়েছে। যে কিছুই বুঝতে পারছে না। কী হচ্ছে আর কেনই বা হচ্ছে, কিভাবে হচ্ছে? এমন সময় দীনা মা রাবেহা খাতুন ঘরে এসে ঢুকলেন। তার মুখে একটা ভয়ের চিহ্ন। তার দিকে ঘুরে তাকাল যুবক। একটু যেন মনযোগ সরে এসেছিল আর ঠিক তখনই জন্তুটা একটু ছাড় পেল। এক লাফে সেটা ঘরের বারান্দার দিকে চলে গেল। তারপরই গায়েব হয়ে গেল। যুবক সেদিকে কিছু সময় তাকিয়ে রইলো। তারপর রাবেয়া খাতুনের দিকে তাকাল। বলল, আপনাকে না বললাম এদিকে না আসতে?
-দীনা ঠিক আছে?
-হ্যা সে ঠিক আছে।
-কী বুঝলে বাবা?
যুবক একটু সময় চুপ করে থেকে বলল, কেউ আপনার মেয়ের পেছনে এই কাইরিতকে লাগিয়েছে।
কাইরিত শব্দটা শুনে দীনা আর দীনার মা দুইজনেরি একটু অদ্ভুত চোখে তাকাল। যুবক বলল, এরা এক ধরনের অপদেবতা। অনেকে এদের জ্বীনও বলে। এদের বিশেষ পদ্ধতির মাধ্যমে নিয়ে আসা হয় কোন কাজের জন্য নিয়ে আসা হয়। এবং সেই কাজের বিনিময়ে এরা কিছু নিয়ে যায়। যতদুর মনে হচ্ছে যে সেই কাজটা সে করেছে এবং এখন তার বিনিময় নেওয়ার সময়। আর দীনার অনাগত বাচ্চা হচ্ছে সেই বিনিময়!
দীনা এবং দীনার মা দুজনেই অবাক হয়ে তাকিয়ে রইলো যুবকের দিকে। যুবক যা বলল সেটা শুনে ওদের কেউ যেন বিশ্বাস করতে পারছে না। কিন্তু আবার অবিশ্বাসও করতে পারছে না। কারণ একটু আগে যে অবিশ্বাস কাজটা যে করেছে সেটা সাধারণ কোন মানুষের পক্ষে করা সম্ভব না। এই মানুষটা কে?
দীনা চিনে না তবে দীনা এটা বুঝতে পারছে যে যুবককে নিয়ে তার মা নিয়ে এসেছে।
যুবক বলল, কাইরিত সাধারণত কেবল পাওয়া নিতেই সামনে আসে। অন্য সময় আসে না। ওদের প্রধান চাহিদাই হচ্ছে অনাগত শিশুর প্রাণ।
দীনা বলল, আমি কিছুই বলতে পারছি না আপনি কী বলছেন?
-আপনার কাছে অবিশ্বাস মনে হচ্ছে তবে আসল কথা হচ্ছে আপনার বাচ্চাকে দিয়ে কেউ এই কাইরিতের সওদা করেছে। কেউ এই কাজ করেছে।
দীনা অবিশ্বাস্য চোখে তাকাল।
-আমার বাচ্চাকে দিয়ে সওদা! কী বলছেন আপনি ? কে দিবে?
-আপনার বাচ্চার উপর কার অধিকার আছে?
-মানে?
-মানে আপনার বাচ্চা উপর কর্তৃত্ব কার উপরে আছে?
-আমি আপনার কথা কিছুই বুঝতে পারছি না। কী বলছেন আপনি?
-মানে হচ্ছে কারো জিনিস নিজের হলেই না সে অন্যকে দিতে পারে? তাই না? আপনার বাচ্চা তো অন্য কাউকে দিয়ে দিতে পারব না, তাই না?
-মানে আমি আমার বাচ্চা কাউকে দিয়ে দিয়েছি?
যুবক কিছুটা সময় তাকিয়ে রইলো দীনের দিকে। যুবকের চোখ এতো তীব্র যে দীনার মনে হল যেন তার চোখের দৃষ্টি দীনার ভেতরে ঢুকে গেল একেভারে। এতো তীক্ষ্ণ চোখ কারো হতে পারে সেটা দীনার জানা ছিল না। সে নিজের চোখ সরিয়ে নিতে চাইলো বটে তবে কাজ হল না। সে চোখ সরাতে পারল না।
যুবক একটু পরে বলল, আপনার বাচ্চা তো কেবল মায়ের একার হয় না?
-মানে?
তীব্র একটা অনুভূতি দীনার ভেতরে ধাক্কা খেল। সজিব! সে বলল, আপনি এসব কী বলছেন?
যুবক বলল, এছাড়া আর কোন ব্যাখ্যা নেই তবে আমি নিশ্চিত করেই কিছুই বলছি না।
এই বলে সে দীনার দিকে একটু এগিয়ে এল। যেন কিছু একটা খুজে পেয়েছে। দীনার দিকে তাকিয়ে বলল, আপনার পেছনের বালিশটা আমাকে দিন দেখি।
দীনা কিছু না বলে বালিশটা যুবকের দিকে এগিয়ে দিল। যুবক বালিশটা একটু নাড়ল। তারপর সেটা হাত দিয়ে এক প্রকার টেনে ছিড়েই ফেলল। এবং একতু পরেই সেখান থেকে একটা তাবিজ জাতীয় জিনিস বের করল। সেটা দিকে তাকিয়ে দীনা আর দীনার মা দুজনেই অবাক হয়ে গেল। এটা তো তাবিজ! এটা তার বালিশের ভেতরে কিভাবে এল?
যুবক সেটা খুলে ভেতরের কাগজটা পড়লো। তারপর দীনার দিকে তাকিয়ে বলল, এই যে এটা হচ্ছে অনুমতি পত্র। কাইরিত যেন বাচ্চাকে নিতে পারে।
দীনার কাছে তখনই ব্যাপারটা পরিষ্কার হয়ে এল। এই বাড়িতে আসার পরে কোন সমস্যা হয় নি। কিন্তু যখন সজিব এল তারপর থেকেই ঝামেলা শুরু হল।
দীনার মা ওটা কি আবারও আসবে? পালিয়ে গেল যে?
যুবক হাসল একটু। তারপর বলল, পালিয়ে যায় নি। যেতে দিয়েছি। মূলত ওটা কোথায় সেটা দেখা দরকার। আপনারা চিন্তা করবেন না। ওটা এই ঘরে আসতে পারবে না। আমি সেই ব্যবস্থা করে দিচ্ছি।
সত্যি সত্যি দেখা গেল এক সপ্তাহ পার হয়ে গেলেও কাইরিত নামের সেই জন্তুটা আর দীনার কাছে এল না। তবে দীনা একবার দেখেছিল তার জানালার বাইরে যেন কেউ দাঁড়িয়ে আছে। কিন্তু কাছে যেন আসতে পারছে না। দীনা সত্যিই ভাবতে পারছে না যে সজিব এই কাজটা করতে পারে। কিন্তু কেন করবে? কেন?
পুরো একটা সপ্তাহ সজিবের সাথে সে কথা বলে নি। সজিব কয়েকবার ফোন দিয়েছে তবে দীনা সেই ফোন ধরে নি। সে এখন কারো সাথে কথা বলতে চায় না এমন কিছু অযুহাত দিতে বলল তার মাকে।
দীনার মনটা পুরো এলোমেলো হয়ে গেছে। পরিষ্কার ভাবে কিছুই যেন সে ভাবতে পারছে না। তারপরই সে আগের কথা মনে করার চেষ্টা করল। সজিবকে বিয়ে করার আগের সময়। তখন একটা অবাক করার ব্যাপার সে মনে করল। তার থেকেও বড় ব্যাপার হচ্ছে যে এই ব্যাপারটা তার এতোদিন মনে হয় নি। কেন মনে হয় নি সেটাও জানে না। সজিবের সাথে দীনার বিয়েটা স্বাভাবিক ভাবে হয় নি। প্রথমে সজিবের বিয়ের প্রাস্তবে দীনা কিংবা দীনার পরিবারের কেউ রাজি ছিল না। কিন্তু তারপর কিভাবে জানি রাজি হয়ে গেল। দীনা ভাবতে পারছে না যে সজিব ঠিক কিভাবে তাকে এবং তার পরিবারকে রাজি করিয়েছিল।
রাইনা তান্ত্রিক প্রতিদিন কাজের শুরুর আগে থেকেই নিজের চারিপাশে একটা বৃত্ত টেনে নেয়। এটা তার নিরাপত্তার জন্য। নিরাপত্তা বেষ্টনীভেদ করে কোন অশরীরি ঢুকতে পারবে না। এছাড়া শরীর বন্ধনী তো থাকে। এই দুইটা কাজ সে সব সময় করে। অপদেবতা বা জ্বীনদের কোন বিশ্বাস নেই। এদের যতই বশে আনা হোক না কেন সুযোগ পেলে এরা ছোবল মারবেই। তাই সে সব সময় এই ডাবল প্রোটেকশন নিয়েই কাজে নামে।
আজকের রাতটা রাইনা তান্ত্রিকের কাজে একটু যেন অস্বাভাবিক মনে হচ্ছে। এমনটা কেন মনে হচ্ছে সেটার ব্যাপারে সুস্পষ্ট কোন ধারণা রাইনা তান্ত্রীকের নেই। তবে সেটা সে আমলে নিল না। তার পেশাটাই এমন যে এখানে স্বাভাবিক ভাবে কিছু হওয়াটাই বরং অস্বাভাবিক। সে সামনে জ্বলতে থাকা আগুনের ভেতরে একটু তেল ঢেলে দিল। সাথে সাথেই সেটা আরো একটু জোড়ে জ্বলে উঠলে, আলোটা যেন একটু চারিদিকে ছড়িয়ে পড়ল। আর তখনই সে দেখতে পেল সেটাকে।
একটু অবাক হল রাইনা তান্ত্রিক।
কাইরিতটা এখানে কী করছে?
এই জন্যই অস্বাভাবিক লাগছিল তার কাছে। কাইরিত তো সাধারণত না ডাকলে আসে না।
রাইনা তান্ত্রিক কাইরিতের দিকে তাকিয়ে বলল, এখানে কী চাস? কাজ তো এখনও শেষ হয় নি।
কাইরিত কোন কথা বলল না। সে একভাবে নিশ্চল হয়ে সেখানে দাঁড়িয়ে ছিল সেখানেই দাঁড়িয়ে রইলো। রাইনা তান্ত্রিক আরেকবার জিজ্ঞেস করতে যাবে তখনই দেখতে পেল তাকে। একটা মানুষের আবয়ব। তার এই আবাসে কেউ আসে না। এটা জঙ্গলের অনেক ভেতরে। পথ হারিয়ে যাওয়ার ভয় যেমন আছে তার থেকেও বেশি ভয় রয়েছে বন্য পশুর আক্রমণের। এই রাতের বেলা এখানে একজন মানুষ এসে হাজির হবে সেটা ভাবতেই পারছে না
আরেকটু কাছে আসতেই আগুনের আভা গিয়ে পড়ল তার চেহারার উপরে। সে মানুষটাকে দেখতে পেল। যুবক বয়সের একজন। তার দিকেই তাকিয়ে রয়েছে।
রাইনা তান্ত্রিক গম্ভীর কন্ঠে বলল, কে তুই এখানে কেন এসেছিস? এই জায়গা ভাল না। সময় থাকতে এখনই চলে যা!
যুবক উত্তর না দিয়ে আরো কয়েক কদম এগিয়ে এল। চেহারাটা আরেকটু স্পষ্ট হল রাইনা তান্ত্রিকের কাছে। চেহারার ভেতরে কেমন একটা অস্বাভাবিকত্ব রয়েছে। রাইনা তান্ত্রিকের মনে হল যে এই যুবকও সম্ভবত তার মতই কেউ। তার খোজ সে পেয়েছে আর এখানে সরাসরি দেখা করতে চলে এসেছে। এমন একটা চিন্তা সে করতে চাইল বটে তবে কেন জানি মন মত হল না। কারণ মাসের ভেতরে কয়েকটা দিন সে কাছের গ্রামে গিয়ে থাকে। সেখানে তার একটা ছোট কুঁড়েঘর আছে। সেখানেই লোকজন আসে, তার কাছ থেকে নানান জিনিস পত্র নিয়ে যায়। আর বাকি দিনগুলো সে কাটায় এই জঙ্গলের আস্তানায়।এই জায়গাতে কেউ আসে না। কেউ জানে না। তাহলে এই যুবক কিভাবে জানল? কিভাবে তার খোজ বের করল? তাও আবার এই গভীর রাতে?
প্রশ্নটা রাইনা তান্ত্রিককে কেন জানি শান্তি দিচ্ছে না। এই মানুষটাকে? এটা কে একজন রক্তে মাংসে মানুষ সেই ব্যাপারে তার কোন সন্দেহ নেই। কিন্তু তারপরেও একটা অস্বস্তি কাজ করছেই?
যুবক এবার একটু সামনে এগিয়ে এল। ঠিক তার বৃত্তের বাইরে। চেহারাটা আরো পরিষ্কার হয়েছে। যুবক রাইনা তান্ত্রিকের দিকে তাকিয়ে বলল, দীনার পেছনে এটাকে কেন লাগিয়েছ?
এটাকে বলতে যে কাইরিতকে বোঝাচ্ছে সেটা রাইনা তান্ত্রিক বুঝল। এতে তার বিস্ময় আরো একটু বাড়ল বটে। তবে নিজেকে যথযত সংযত রেখে রাইনা রান্ত্রিক বলল, কে তুই? এখানে কী চাস?
যুবক বলল, যা প্রশ্ন করেছি সেটার জবাব দাও। দীনার বাচ্চার পেছনে কেন লেগেছ?
রাইনা তান্ত্রিক এবার সত্যিই অবাক হল। সে যে দীনা নামের মেয়েটার বাচ্চাটাকে চায় এটা এই যুবক জানে। তার মানে অনেক কিছুই জানে সে। এবার তান্ত্রিক একটু সংযত হল। সামনের মানুষটার সাথে একটু ভেবে চিন্তে কথা বলতে হবে। সে বলল, কী চাও তুমি আমার কাছে?
তার তুই থেকে তুমিতে নেমে আসাটা যুবক খেয়াল করল। যুবকের মুখে একটু হাসি দেখা দিল। যুবক বলল, আমি জানতে চেয়েছি যে বাচ্চাটার পেছনে কেন লেগেছে?
রাইনা তান্ত্রিক বলল, এতো কিছু যখন জানো তখন এটাও নিশ্চয়ই জানো যে আমি কেন লেগেছি! ওটা আমার পেমেন্ট। আমি কাজ করেছি আর তার বিনিময়ে ওটা আমাকে দেওয়ার ওয়াদা করা হয়েছে।
যুবক যেন একটু চিন্তা করল। তারপর বলল, বাচ্চাটাকে ছেড়ে দাও। কাইরিতকে মুক্ত করে ওটার থেকে।
-কেন করবো? আমার লাভ কী তাতে?
-তোমার লাভ হচ্ছে তুমি বেঁচে থাকবে।
-আমাকে হুমকি দিচ্ছো? এতো সাহস তোমার? তুমি জানো আমি কী করতে পারি?
যুবক একটু হাসল। খানিকটা উপহাসের হাসি। তারপর বলল, তুমি কিছুই করতে পারো না।
এই বলেই সে তার ডান হাতটা একটু উপরে তুলল আর তখনই রাইনা তান্ত্রিক জীবনের সব থেকে বিস্ময়কর ঘটনার সম্মুখীন হল। সে অনুভব করতে পারল যে সে নিজের আসন থেকে একটু উপরে উঠে গেছে। সে তীব্র ভাবে বিস্মিত হল। কোন মানুষের পক্ষে এই কাজটা যে করা সম্ভব সেটা রাইনা তান্ত্রিকের জানা ছিল না।
যুবক কী যেন ভাবল। তখনই রাইন তান্ত্রিক আবারও মাটিতে পড়ল। তার বিস্ময় ভাবটা কাটতে না কাটতেই যুবক বলল, বরং অন্য ভাবে চেষ্টা করা যাক কেমন! তা তোমার কাছে কয়টা জ্বিন পোষ মানা অবস্থায় আছে?
তান্ত্রিক তাকাল তার দিকে। যুবক আবার বলল, একুশটা তাই না? সংখ্যাটা বেশ বড়। তোমার মত কারো পক্ষে এতোগুলো জ্বিন বসে আনার বেশ কৃতিত্বের ব্যাপার। তবে একটা ব্যাপার কী জানো, তুমি তো তাদের ভাল করে বসে আনতে পারো নি। আমি এখানে আসার সময়ই খেয়াল করে দেখলাম যে তুমি সর্টকাট একটা পদ্ধতি অবলম্বন করেছে। স্মার্ট তবে বিপদজনক। বিপদটা তোমাকে দেখাই।
রাইনা তান্ত্রিক তখনই দেখতে পেল। জ্বিনটা একদম যুবকের পাশে দাঁড়িয়ে। এটা বনের ভেতরেই ছেড়ে দেওয়া ছিল। তবে বন ছেড়ে এটা যেতে পারে না। রাইনা তান্ত্রিকের বসে আনা ২১টা জ্বিনের সবগুলোই এই বনের ভেতরে থাকে। একটা নির্দিষ্ট রেডিয়াসের বাইরে তারা যেতে পারে না। এরা মূলত এই পুরো এলাকাটাকেই পাহারা দেয়। তাই যখন যুবক এখানে এসেছিল তান্ত্রিক অবাকই হয়েছিল এটা দেখে যে কোন রকম ঝামেলা ছাড়াই, জ্বিনদের চোখের সামনে দিয়ে সে কিভাবে চলে এল?
যুবক বলল, তুমি মূলত এদের গলায় একটা মন্ত্রের শেকল পরাও। তাই না?
রাইনা তান্ত্রিক এবার সত্যিই অবাক হয়ে গেল। তার মন্ত্রের শেকলের কথা আসলেই কারোর জানার কথা না। কেউ দেখতে পায় না কেবল সে ছাড়া। কিন্তু রাইনা তান্ত্রিকের মনে হল যে জ্বিনটার গলাতে যে অদৃশ্য মন্ত্রের শেকলটা রয়েছে সেটা যুবক দেখতে পাচ্ছে এবং সেটা প্রমান করার জন্যই যুবক একটু সরে গেল জ্বিনটার দিকে। হাতের একটা আঙ্গুল দিয়ে সেটা একটু টেনে ধরলে। কারো গলতে পুথির মালা এক আঙ্গুল দিয়ে টেনে ধরলে যেমন হয় ঠিক তেমন।
-ঠুস!
যুবকের মুখ দিয়ে আওয়াজটা করতে সেই মন্ত্রের মালাটা জ্বিনটার গলা থেকে ছিড়ে পড়ল, রাইনা তান্ত্রিক বড় বড় করে চোখ করে সেদিকে তাকিয়ে রইল। জ্বিনটা আর তার বন্ধনে নেই। সে মুক্তি। কিন্তু বিস্ময়ের সাথে সাথে একটা ভয় এসে জড় হল। এই জ্বিনটাকে সে বন্দি করেছিল এখন সেটা মুক্ত।
তারপর রাইনা তান্ত্রিক দেখতে পেল একই ভাবে একে একে সবগুল জ্বিন মুক্ত হল সব গুলো জ্বিন এবার রাইনা তান্ত্রিককে ঘিরে ধরেছে। তবে বৃত্তের ভেতরে তারা ঢুকতে পারবে না সে জানে। তবে আরেকটা ব্যপার যে একসাথে এতোগুলো জ্বিনের মোকাবেলা সে করতে পারবে না। কোনো ভাবেই পারবে না। প্রত্যেকটাকে সে বন্দি করেছিল আলাদা আলাদা ভাবে। এখন এক সাথে এগুলো ওকে ঘিরে ধরেছে।
যুবক বলল, আমি জানি এরা বেস্টনি পার করে তোমার কাছে যেতে পারবে না, আমি চাইলেই এখন এই বেস্টনি মুছে দিতে পারি। তবে দেব না। ওরা তোমাকে এখানেই ঘিরে রাখবে । ওরা দিনের পর দিন এখানে এভাবে তোমাকে ঘিরে রাখতে পারবে তবে তুমি কিন্তু আজীবন এখানে বসে থাকতে পারবে না। আমি তাহলে গেলাম।
এই যুবক সত্যি সত্যি পেছনে ঘুরে হাটা দিল। রাইনা তান্ত্রিক খুব ভাল করেই জানে যে যুবক যা বলছে সেটা সত্যি। জ্বিনগুলো ওকে বৃত্তের ভেতরে ঢুকে আক্রমন করতে পারবে না তবে সে তো আজীবন এখানে বসে থাকতে পারবে না। তাকে বের হতেই হবে। রাইনা তান্ত্রিক বাধ্য হয়ে ডাক দিল যুবক কে!
-কী চাও আমার কাছে! আমাকে ছেড়ে যেও না ! বল কী চাও?
যুবক থামল। তারপর ঘুরে দাঁড়াল। বলল, সব কিছু শুরু থেকে খুলে বলবে আর কিভাবে কাইরিতকে দীনার থেকে মুক্তি করব সেটা বলবে!
রাইনা তান্ত্রিক বুঝতে পারল যে যুবকের কথা মেনে নেওয়া ছাড়া তার আর কোন উপায় নেই।
**
সজিব এবার অনেকটা চিৎকার করেই বলল, তুমি আমার সাথে যাবে কিনা বল?
দীনার মনের ভেতরে একটা দোটানা সৃষ্টি হল। দীনা নিজের এই অনুভূতি দেখেই কিছুটা অবাকই হল। সজিবের জন্য সে একতা অদ্ভুত টান অনুভব করছে। তার কাছে মনে হচ্ছে যে সজিবের থেকে আপন আসলে আর কেউ নেই। এমনটা কেন হচ্ছে। আজকে বিকেল পর্যন্তও দীনার মনে হচ্ছিল যে সজিবের কাছে সে আর ফিরে যাবে না। কিন্তু যেইনা সজিবকে সে দেখছে আর সজিবের কন্ঠেস্বর শুনল তখনই সেই মনের ভেতরে সব কিছু যেন গুড়িয়ে গেল। তার এখন মনে হচ্ছে যে সজিব যা বলছে তেমনটাই আসলে করা উচিত। এমন কেন হচ্ছে।
সজিব যখন দীনার হাত ধরে ওকে নিচে যেতে যাবে তখনই সেই অদ্ভুত যবুক ঢুকল ঘরে। দীনা জানত যে আজকে এই মানুষটা আসবে। মায়ের কাছ থেকে সে এই যুবকের ব্যাপারে শুনেছে। যুবকের নাম রাফায়েল। এই মানুষটার কাছে ওর মা গিয়েছিল। সেদিন মায়ের কথা মতই রাফায়েল নামের মানুষটা এসেছিল আর তাকে সেই কাইরিত নামের অপদেবতার হাত থেকে রক্ষা করেছিল। আজকেও তার আসার কথা ছিল। সে বলেছিল যে আসলে ঝামেলা কি সেটা সে বের করে তারপর আসবে!
সজিবের দিকে তাকিয়ে রাফায়েল বলল, দীনা তোমার সাথে যাবে না।
সজিব যেন একটু থতমত খেল প্রথমে। তারপর বলল, আপনি কে আবার? আমাদের স্বামী স্ত্রীর মাঝে ঝামেলা পাকাচ্ছেন!
-স্বামী স্ত্রী! দীনাকে কিভাবে বিয়েতে রাজি করিয়েছো সেটা আমি জানি!
-মানে! কী যাতা বলছেন?
রাফায়েল কোন কথা না বলে পকেট থেকে একটা কালো পোটলাত মত জিনিস বের করল। তারপর বলল, এটা চিনতে পারছো তো?
দীনা দেখল সজিবের চেহারার ভাব একেবারে বদলে গেছে। দীনা বলল, কী এটা?
রাফায়েল বলল, এটা হচ্ছে একটা এলিমেন্ট। এটার মাধ্যমে সজিব তোমার উপর নিয়ন্ত্রন পেয়েছে। তোমার সজিবের কথা শুনলেই কেমন মনে হয়, তাই না? মনে হয় সজিব যা বলছে সেটাই শোনা উচিত?
দীনা বিস্মিত স্বরে বলল, হ্যা। আমি আজকে বিকেল পর্যন্তও ভাবছিলাম যে সজিবের সাথে যাবো না। কিন্তু এখন মনে হচ্ছে যে ওর সাথে যাওয়া উচিত।
রাফায়েল বলল, এটার কারণেই হচ্ছে। এর ভেতরে তোমার মাথার চুল আছে আর তোমার পরনের কাপড়ের একটা চুকরো। এটা দিয়েই তোমাকে ব্লাক ম্যাজিক করা হয়েছে। এবং ……
দীনা বলল, এবং?
-এবং এই যে কাজটা করছ এটার পেমেন্ট বা বিনিময় হচ্ছে তোমার বাচ্চা।
দীনা যেন নিজের কানকে বিশ্বাস করতে পারল না। সে সজিবের দিকে তাকিয়ে দেখল সে ফ্যাকাসে চোখে দীনার দিকে তাকিয়ে আছে।
রাফায়েল বলল, এটা তুমি খুলে প্রতিটা জিনিস ধ্বংস করে দাও।
সজিব চিৎকার করে বলল, না দীনা খবরদার করবে না। খবরদার করবে না।
দীনার মাথাটা আবার একটু ঘুরে উঠল। তার মনে হল যে এই কাজ করা ঠিক হবে না। পোটলাটা খোলা ঠিক হবে না। তখনই অবশ্য আরেকটা ঘটনা ঘটল। দীনা দেখল সজিব নিজের মুখ খোলার জন্য কেমন চেষ্টা করছে। কিছু যেন একটা তার মুখ চেয়ে ধরেছে।
রাফায়েল বলল, ওর কথা শুনো না, দীনা, এটা নাও। খুলে সব কিছু পুড়িয়ে দাও।
দীনা পোটলাটা নিল। তারপর সেটা খুলে ফেলল। ভেতরে একটা বিশ্রি গন্ঠ বের হল। তবে দীনা সেটাতে খেয়াল দিল না।
চুল, কাপড়ের চুকরো আরো কী কী জিনিস বের হল। একে একে প্রতিটা জিনিস আগুনে পুড়িয়ে দেওয়া হল।
দীনার মনে হল যে মাথাটা কেমন যেন ঘুরে উঠল। তবে সেটা অল্প সময়ের জন্য। সজিবের কথা শুনে মাথার ভেতরে যে চাপ সৃষ্টি হয়েছিল সেটা একেবারে চলে গেল। দীনা আবার সজিবেরকথা শুনতে পেল।
-দীনা দীনা! চল এখান থেকে। এসব কিছু বিশ্বাস কর না।
তবে দীনার কোন পরিবর্তন এল না। বরং মনের ভেতরে তীব্র এক বিরক্তি এসে জড় হল। দীনা কঠিন গলায় বলল, তোমার সাথে আমি কোথাও যাবো না। তোমার সাথে আমি থাকবও না।
সজিব বলল, কী বলছ এসব? আমি তোমাকে সত্যিই ভালোবাসি। সত্যি বলছি। আমি তোমাকে ছাড়া বাঁচব না। আমি থাকতে পারব না।
দীনা কঠিন গলায় বলল, থাকতে না পারলে মরে যাও!
সজিব বিস্ময় নিয়ে দীনার দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর রাফায়েলের দিকে তাকিয়ে বলল, কী পেলেন এটা করে?
রাফায়েল বলল, সজিব, দীনা আর তোমার বসে নেই। আমি জানি তুমি কী করেছ, কাউকে এভাবে আটকে রাখা অন্যায় যা তুমি করেছো।
তারপর দীনার দিকে তাকিয়ে বলল, তুমি সম্ভবত সজিবকে একদমই পছন্দ করতে না। কিন্তু ও তোমার পেছনে ঘুরঘুর করতো। যখন দেখল তোমাকে সে আর কোন ভাবেই রাজি করাতে পারছে না তখন অন্য ভাবে চেষ্টা করবে বলে ঠিক করল। তোমাদের বাসার সে ছুটা বুয়া ছিল তাকে টাকা খাইয়ে তোমার মাথার চুল আর কাপড় সংগ্রহ করল। সেটা দিয়েই তোমার উপর নিয়ন্ত্রণ। তবে এর বিনিময়ে তাকে নিজের সন্তানকে তুলে দিতে হত কাইরিতের হাতে। সেটা যদি দেওয়া হত তবে আজীবন তুমি সজিবের বশে থাকতে। কোন ভাবেই আর মুক্তি পেতে না।
সজিব এবার দীনার চোখে মুখে এবার ঘৃণার বহিঃপ্রকাশ দেখতে । দীনা বলল, তোমাকে আমি পুলিশে দেব। তুমি এখনই যদি আমার সামনে থেকে না যাও তবে তোমাকে দেখে নেব আমি।
সজিবকে অনেকটা ঘাড় ধাক্কা দিয়েই যেন বের করে দেওয়া হল। সজিব চলে যাওয়ার পরে রাফায়েলও যাওয়ার জন্য পা বাড়াল। সে জানাল যে আর কোন সমস্যা নেই। তবে বাচ্চাটা জন্মানোর পরে একটু সমস্যা হতে পারে। মানে আবার কাইরিত আসতে পারে। যেহেতু এক সময়ে চোখ ছিল। রাফায়েল তাদের এও বলে গেল যে চিন্তার কারণ নেই। কাইরিত যাতে কোন সমস্যা না করতে পারে সেদিকটা সে দেখবে।
রাফায়েলের মনটা একটু খারাপই লাগছিল। কেন লাগছিল সেটা রাফায়েন নিজেও জানে না। রাস্তা দিয়ে হাটতে হাটতে সে সজিবের কথা ভাবছিল। সজিব সম্ভবত সত্যিই দীনাকে ভালোবাসত তবে দীনা কোনদিন তাকে পছন্দ করে নি। আসলে মন ব্যাপারটাই এমন। যাকে ভালো লাগে না, তাকে আসলেই ভালো লাগে না। একজন কত সত্যিই ভালোবাসুক তাকে কিছু যায় না। সবাই ভালোবাসা আর যুদ্ধে সব জায়েজ। তাই সজিবও সম্ভব এমন কিছুই করেছিল নিজের ভালোবাসার মানুষকে কাছে পাওয়ার জন্য। এই গল্পটা অন্য ভাবে শেষ হলে হয়তো ভাল হত।
এই গল্পের একটা ছোট শানে নুজুল আছে। আমার বন্ধুর এক বড় আছে সত্যিই এইভাবে বশ করে একজন মেয়েকে বিয়ে করেছিল। মাস খানেকের মত সেই বিয়ে টিকেছিল। তারপর সেই মোহ কেটে যায় আর মেয়েটাও সেই বড়ভাইকে ছেড়ে চলে যায়। গল্পের বাকিটুকু বানিয়ে লেখা।


দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর আবারও রাফায়েল!!
প্রথম ধন্যবাদটি দিচ্ছি রাফায়েলকে ভুলে ডায়েরি থেকে গল্পের শব্দে তুলে আনার জন্য।
⠀⠀
গল্পটা পড়তে শুরু করার পর থামা কঠিন হয়ে গিয়েছিল। দীনার সেই অসহায়ত্ব- নড়তে পারছে না, চিৎকার করতে পারছে না; এই অনুভূতিটা পাঠকের মনে দারুণভাবে অসহায়ত্বের অনুভূতি লেপে দিচ্ছিলো।
⠀⠀
সবচেয়ে ভালো লেগেছে- ভয়টাকে কেবল ভয়ের জায়গায় রাখেননি। পেছনে একটা মানবিক গল্প আছে, একটা সম্পর্কের টানাপড়েন আছে। শেষ দিকে সজিবের ভালোবাসা নিয়ে রাফায়েলের ছোট্ট ভাবনাটুকু- এই জায়গাটা গল্পকে অন্য মাত্রা দিয়েছে।
⠀⠀
⠀⠀
গল্পটার জন্য ধন্যবাদ।
দয়া করে রাফায়েলকে আর ভুলের ডায়েরিতে ফেলে রাখবেন না, আপনার গল্পের জাদুতে তাকে পুনরুজ্জীবিত করুন।
ভালো থাকুন অবিরাম।
রাফায়েলকে ভুলে থাকার উপায় কি আছে বলেন? মূল সমস্যা হচ্ছে রাফায়েলের গল্প লিখতে প্রচুর সময় লাগে। অন্য গল্প যেখানে আমি এক বসাতেই লিখে ফেলতে পারি, রাফায়েলের গল্প লিখতে কয়েক সপ্তাহ লেগে যায়। এটাই হচ্ছে মূল সমস্যা।
গল্পটা পড়তে পড়তে মাথার ভেতর একটা চাপা অস্বস্তি ধরে বসেছিল। কিছু দৃশ্যে বিশেষ করে রাতে অন্ধকার ঘরে নীরবতার মাঝে হঠাৎ করেই কাইরিত এর উপস্থিতি – পড়ার সময় এতটাই জীবন্ত ছিল যে চোখের সামনে ভেসে উঠছিল। সহজ ভাষায় টেনশনটা সুন্দরভাবে ধাপে ধাপে গড়ে তুলেছেন। কোথাও অযথা টেনে লম্বা করা লাগেনি। কয়েকটা চরিত্রের উপস্থিতি আর সংলাপ গল্পটাকে আরও বিশ্বাসযোগ্য করে তুলেছে, শেষটা পড়েও একটা রেশ থেকে যায়।
গল্পটা পড়ার সুযোগ দেওয়ার জন্য ধন্যবাদ।
নতুন গল্পের অপেক্ষায় থাকলাম।
গল্পটা আরও ছোট লিখতে পারলে ভাল হত। তবে এতো লম্বা হয়েই গেল। তারপরেও যে ভাল লেগেছে সেতা জেনে ভাল লাগল। রাফায়েল সিরিজের সব গল্পগুলো পড়ে ফেলতে পারেন। আশা করি ভাল লাগবে।
রাফায়েল সিরিজের সবগুলো গল্প অসম্ভব প্রিয়। অন্য গল্প গুলো ভালো লাগে তবে রাফায়েল এর কথাই আলাদা। আগের গুলো অনেক বার করে পড়া হয়েছে। নতুন করে রাফায়েল এর গল্প পড়তে পেরে ভীষণ ভালো লাগলো।
শুনে আনন্দিন হলাম।
ভাল থাকুন সব সময়।