পরীর মত মেয়ে

4.3
(22)

আমি কিছু সময় মেসেজটার দিকে তাকিয়ে রইলাম। ঠিক মেসেজটার দিকে না। মেসেজটা যে পাঠিয়েছে তার নামের দিকে। একবার চোখ কঁচলে দেখলাম যে আসলেই আমি ঠিক দেখছি কিনা! সত্যিই মেসেজটা এসেছে। কোন ভুল নেই। সত্যিই এসেছে। ঈশিতাইই মেসেজটা পাঠিয়েছে। আমি আরও কিছু সময় মেসেজটার দিকে তাকিয়ে রইলাম। এরই মাঝে দেখলাম আরেকটা মেসেজ এসে হাজির।
‘কী মিস্টার, মেসেজ সীন করে উত্তর না দেওয়া কী ধরণের অভদ্রতা?’
এবার উত্তর যে আমাকে দিতেই হবে। আমি উত্তরে লিখলাম, আসলে আমার বিশ্বাস হচ্ছে না।
ঈশিতা লিখলো, কী বিশ্বাস হচ্ছে না?
-এই যে তুমি আমাকে মেসেজ দিয়েছো?
-বাহ! এতো ফার্স্ট। একেবারে তুমি!
আমি প্রথমে হাসির ইমোজি দিলাম। তারপর বললাম, তুমি আমার থেকে বয়সে ছোটই হবে।
-বয়সে ছোট হলেই তুমি বলতে হবে?
-তাহলে আপনি বলব?
-না থাক। তুমিই ভাল। আমিও তোমাকে এখন থেকে তুমিই বলব তাহলে।
-আচ্ছা তাহলে আমার সাথে এর পরেও আরো কথা বলার ইচ্ছে আছে? যাক জেনে ভাল লাগল।

ঈশিতা আহসানকে আমি চিনি অনেক দিন ধরেই। আমি যখন নিয়মিত টিকটকে ভিডিও দেখতাম তখন এসা আর তার বোন নিশিতা, দুই দুজনকে ফলো করতাম। একেবারে জমজ বোন দুইজন। একই রকম দেখতে তবে আমি দুইজনকে ঠিকই আলাদা করতে পারি। নিশিতার চেহারার ভেতরে একটা রুক্ষ ভাব রয়েছে অন্য দিকে ইশিতার চেহারায় রয়েছে এক আশ্চর্য নমনীয়তা। সেই টিকটক থেকে ফেসবুকেও ফলো করি। গত কালকে আমি ঈশিতার একটা ভিডিও আমার টাইমলাইনে শেয়ার দিয়েছি। শাড়ি পরেছে সে। হালকা মেকাপ চুলগুলো ছাড়া। সে ক্যামেরার দিকে তাকিয়ে হাসছে। সত্যি বলতে এতো চমৎকার আর নমনীয় লাগছে ঈশিতাকে ভিডিওতে সেটা আর কী বলব! আর আজকে দেখি সেই মেয়ে আমাকে মেসেজ দিয়েছে। সত্যিই মেসেজ দিয়েছে?
ঈশিতা আবার লিখল, তা জনাব অন্য মেয়ের ভিডিও যে শেয়ার দিলে, গার্লফ্রেন্ড যদি বকে!
আমি লিখলাম, আমার কোন গার্লফ্রেন্ড নাই। যদি থাকতো তোমার মনে হয় আমার এতো সাহস হত তোমার ভিডিও শেয়ার দেওয়া!
এতোগুলো হাসির ইমোজি এল। তারপর সে লিখল, পয়েন্ট। তা আমার ভিডিও কেন শেয়ার দিলে শুনি?
আমি কিছু সময় ভাবলাম। তারপর বললাম, ভিডিওটা আমি কম করেই হলেও ১০০ বার দেখেছি। ওখানে তোমাকে সত্যি অদ্ভুত মায়াময় মনে হয়ে হচ্ছিল। আমি অনেক দিন ধরেই তোমাকে দেখছি কিন্তু এটাতেই সব থেকে বেশি মায়াময় মনে হয়েছে।
দেখলাম অনেকটা সময় ঈশিতা কোন কথা বলল না। আমিও বললাম না। বাড়তি কোন কথা হল না। মিনিট দশেক পরে ঈশিতা আবার নক দিয়ে বলল, আজকে তাহলে যাই। ঘুম আসছে। টাটা।
আমার কেন জানি মনে হল আমি সম্ভবত এমন কিছু বলেছি যেটাতে ঈশিতা একটু মন খারাপ করেছে, তাই আর কথা না বলে সে চলে গেল। এমনো হতে পারে যে একটু পরে সে আমাকে ব্লক মেরে দিবে। আমার অবশ্য তাতে একটু মন খারাপ হবে তাতে। তার সাথে কথা না বলতে পারাতে আমার কোন আফসোস নেই। তবে মাঝে মাঝে তার ভিডিও দেখতে আমার খারাপ লাগে না। আমি ঈশিতার প্রোফাইলে গিয়ে বেশ কয়েকটা ভিডিও ডাউনলোড করে নিলাম। তারপর ঘুমাতে গেলাম।
তবে আমার অনুমান ঠিক হল না। ঈশিতা আমাকে ব্লক তো করলোই না বরং আমার সাথে যোগাযোগ বাড়িয়ে দিল অনেক গুণে। সকালে গুডমর্নিং মেসেজ থেকে শুরু করে রাতে গুড নাইট মেসেজ পর্যন্ত নিয়মিত আমাদের কথা হতে লাগল। তারপর একদিন আমার সাথে দেখা করতে চাইল। দিন ক্ষণ ঠিক হল। আমি যথা সময়ে হাজির হলাম। তবে সেই ক্যাফে গিয়ে দেখি আমার আগেই ঈশিতা এসে হাজির। আমার দিকে তাকিয়ে বলল, বাহ তুমি দেখি ছবির থেকেও বেশ হ্যান্ডসাম!
আমি অফিস থেকে সরাসরি ক্যাফেতে হাজির হয়েছি। অফিসের ফর্মাল ড্রেস পরা রয়েছে। ওর দিকে তাকিয়ে একটু হেসে বললাম, তুমি ঈশিতা নও!
আমি দেখলাম নিশিতা একটু চমকে উঠল। সেই সাথে বেশ অবাকও হয়েছে। তবে নিজেকে সামলে নিল সাথে সাথেই বলল, আরে না। আমিই ঈশিতা। নিশিতা এখন বাসায়।
আমি আবারও বললাম, তুমি নিশিতাই। ঈশাতা নও। সে কি এসেছে নাকি আমি চলে যাবো?
আমি চলে যাওয়ার জন্য বা বাড়াতে যাবো তখনই ঈশিতাকে দেখতে পেলাম। সে হাসি মুখ দিয়ে বের হয়ে এসে দাঁড়াল আমার সামনে। তার চোখে একটা প্রশংসার হাসি। সে বলল, আমি আসলেই ভাবি নি যে তুমি ব্যাপারটা ধরে ফেলবে!
আমি বললাম, আমি আগেই বলেছি।
নিশিতা পেছন থেকে বলল, এই নে তোর পাঁচশ টাকা। আমি হেরে গেলাম। এখনো একবারও দেখা হয় নি অথচ এতো প্রেম!
আমি একটু অপ্রস্তুত হলাম। দেখলাম ঈশিতা নিশিতাকে একটা ছোট ধাক্কা দিল। হাত থেকে ৫০০ টাকার নোটটা নিতে নিতে বলল, যা ভাগ এখান থেকে।
নিশিতা বলল, আরে থাকি না একটু। তোর বয়ফ্রেন্ডকে তো নিয়ে নিচ্ছি না।
-না। যা ভাগ। কোন কথা না।
তারপর দেখলাম একপ্রকার ধাক্কা মেরেই ঈশিতা ওকে ক্যাফে থেকে বের করে দিল। তারপর আমার দিকে আবার ফিরে এল। ওর চেহারাতে একটা স্বলজ্জার হাসি। আমার দিকে তাকিয়ে বলল, ওর কথায় তুমি কিছু মনে করো না কেমন!
আমি বললাম, আরে কী যে বল। মনে কেন করব শুনি! খুব চমৎকার একটা কথা সে বলেছে!
-তাই না! শখ কত!

আমরা এক সাথে কফি খেলাম। আর সত্যি বলতে ঈশিতাকে বাস্তবে আরও বেশি সুন্দর মনে হল আমাকে। গায়ের রং এমন দুধে আলতা যে চোখ ফেরানো দায়। আমি খেয়াল করে দেখলাম যে ক্যাফের অনেকেই আমাদের দিকে তাকিয়ে দেখছিল। একজনকে দেখলাম আমাদের সামনে এগিয়ে এসে ঈশিতার সাথে কথা বলল। সে জানাল যে সে ঈশিতার ফেসবুক ফলোয়ার। ঈশিতার ভিডিও দেখে নিয়মিত। বুঝলাম সেও আমার মতই। তবে তার থেকে আমার ভাগ্য বেশি ভাল বলতেই হবে। নয়তো আমি এভাবে ঈশিতার সামনে বসে থাকতাম না। এবং সম্ভবত সব থেকে ব্যাপার আমি ঈশিতার বয়ফেন্ডও হয়ে গেছি।

আমার ধারণা যে সঠিক সেটার প্রমান পেলাম আমি বাসায় গিয়ে। ঈশিতা আমার সাথে অনেকগুলো ছবি তুলেছিল। তার ভেতরে বেশ কয়েকটা সেলফি ছিল। বেশ কাছাকাছি এসেই সে ছবিগুলো তুলেনিল। সেই ছবিগুলোর একটা ছবি সে নিজের প্রোফাইলে দিল। এরপর থেকে আমাদের কথা বার্তা যেমন বাড়ল তেমনি বাড়ল দেখা সাক্ষত। আমরা কেউ কাউকে ভালোবাসি বলি নি তবে আমাদের আচরণ তেমনই। সত্যি বলতে সময় খুব ভাল কাটতে লাগল।
আমার অবশ্য নিশিতার সাথেও ভাব হয়ে গেল বেশ। ছুটির দিনগুলোতে আমরা যেখানে বেড়াতে যেতাম, নিশিতাও আমাদের সাথে যেত। কাবাবের ভেতরে কিছুটা হাড্ডির মত মনে হলেও আমার আসলে খারাপ লাগত না।
তবে আমি বুঝতে পারতাম যে নিশিতাও আমার প্রতি খানিকটা আগ্রহী ছিল। আমি এটা বুঝতে পারতাম বটে তবে দেখেও সেটা না দেখার ভান করে রইলাম।
ঈশিতাকেও আমার কেমন যেন মনে হত। মাঝে মাঝেই ঈশিতা একেবারে হারিয়ে যেত। তখন ওর ফোন বন্ধ থাকত। ফেসবুক ডিএকটিভ থাকত। কোথাও কোন খোজ পাওয়া যেত না। এটা আমি অনেক আগে থেকেই খেয়াল করেছিলাম। মাঝে যখন থেকে আমি ওকে টিকটকে ফলো করতাম তখন থেকেই আমি এমনটা দেখেছি। মাসের ভেতরে অন্তত একবার এমন হবেই যখন ঈশিতাকে অনলাইনে খোজ পাওয়া যেত না। এখন আমি যখন ওর এতো কাছে চলে এলাম তখনই সেই একই রকম ঘটনা ঘটল। সে মাঝে মাঝে একদম গায়েব হয়ে যেত। দুই চার দিনে একেবারে ঈশিতার কোন খোজই পেতাম না। তখন নিশিতাকে ফোন দিত, নিশিতাও কিছু বলত না। কেবল বলত এটা নিয়ে এতো ভাবতে হবে না। সে ফিরে আসবে কদিন পরেই। ঈশিতা ফিরেও আসত। তারপর এমন একটা ভাব করতো যেন কিছুই হয় নি। এমন ভাবে আচরণ করত। আমি কিছু জিজ্ঞেস করতাম তবে সে সেই প্রশ্নের উত্তর দিত না। সে যে কিছু একটা লুকাচ্ছে সেটা আমার বুঝতে কষ্ট হল না।
আমার একবার মনে হল যে প্রেমিক হওয়ার অধিকার আমি ফলাই। কিন্তু তারপর মনে কী দরকার ঝামেলা করার! বাকি সময়টা তো ঈশিতা আমার সাথে দারুন ব্যবহার করে।
সত্যি বলতে কী ওদের দুইবোনের অইনলাইন জীবন দেখে আমার মনে হয়েছিল যে ওরা বুঝি বেশ উশৃঙ্খল হবে। তবে যখন আমি ওদের সাথে মিশতে শুরু করলাম তখন ব্যাপারটা ঐ রকম মনে হল না। ওরা দুইবোন সেই রকম নয়।
কিন্তু সেই ভুল ধারণা আমার ভাঙ্গল আরও কয়েকদিন পরে।

আমি একদিন অফিসে বসে কাজ করছি একটু পরেই লাঞ্চ ব্রেক হবে ঠিক এমন সময়ে নিশিতার ফোন এসে হাজির হল। ফোন রিসিভ করতে ওপাশ থেকে নিশিতার কান্নাজড়িত কন্ঠ শুনতে পেলাম। সে আমাকে যে আমি যেন এখনই তার সাথে দেখা করি। সে নিচে আসছে। আমি কিছু বলতে পারলাম না কেন জানি। বিশেষ করে নিশিতার কান্না জড়িত কন্ঠ শুনে আমার কেন জানি মনে হল যে কিছু একটা হয়েছে। ঈশিতা আবারও গত দিন থেকে গায়েব হয়ে গেছে।
আমি যখন নিচে নেমে এলাম তখন দেখতে পেলাম নিশিতা আমার দিকে খানিকটা দৌড়েই এগিয়ে আসছে। তার চোখে পানি। সে আসলেই কাঁদছে। তার মানে ভয়ংকর কিছু হয়েছে। ঈশিতার কিছু হয় নি তো?
হ্যা ঈশিতারই কিছু হয়েছে!
নিশিতা কাঁদতে কাঁদতে যা বলল তার অর্থ হচ্ছে ঈশিতা গতকাল রাতে মারা গেছে। আমার কথাটা বিশ্বাস হল না। কিন্তু নিশিতার কন্ঠে এমন কিছু ছিল যে আমি ওকে অবিশ্বাস করতে পারলাম না। সে আমাকে জড়িয়ে ধরে কাঁদতেই লাগল।
নিশিতা আমাকে যা বলেছিল তার সারমর্ম হচ্ছে ঈশিতা গতদিন একটা পার্টিতে গিয়েছিল। সেখানে ড্রাগ ওভারডোজে ঈশিতা মারা যায়। আমি বুঝতেই পারলাম না কী বলব। আমার কথাটা বিশ্বাসই হল না। আমার সব কিছু কেমন যেন শূন্য মনে হতে লাগল। আমি নিজেকে কিভাবে সামলাব বুঝতে পারলাম না। নিশিতা জানালো যে মৃতদেহ এখনও নাকি হাসপাতালেই রয়েছে। সেখানে পুলিশ রয়েছে। পুলিশ নাকি ঈশিতার মৃতদেহ এখনই দিতে চাচ্ছে না। আমি যদি কিছু করতে পারি!
আমার কাছে পুরো ব্যাপারটা এখনও বিশ্বাস হচ্ছে না। আমি ভাবতেই পারছি না যে ঈশিতা ড্রাগ নিত। আমি কোনদিন টের পাই নি। অবশ্য আমার সাথে পরিচয়ের আগে যে ভিডিও বা ছবিগুলো দেখতাম সেখানে ওকে আমি ড্রিংস করতে দেখেছি। তবে পরিচয়ের পর থেকে কোনদি এসব দেখি নি। তাহলে! আর পুলিশই বা ওর মৃত দেহ কেন দিবে না?
আমার স্কুল বন্ধু রনক বিসিএস দিয়ে পুলিশে ঢুকেছে। ঢাকাতেই আছে। ওকে ফোন দিলাম। রনক জানাল যে ও হাসপাতালের যাচ্ছে কিছু সময়ের ভেতরে। আমিও যেন যাই! আমি নিশিতাকে নিয়ে গেলাম হাসপাতালে।
রনক চলে এল কিছু সময় পরেই। এটা ওর থানার ভেতরেই পড়ে। সে আমার দিকে তাকিয়ে বলল, তুই এই মেয়েকে কিভাবে চিনিস?
আমি বললাম, এই ফেসবুকের মাধ্যমে পরিচয়। তারপর ….
আমি কিছু না বলে রনকের দিকে তাকালাম। আমার নিরবতা ওকে বাকি টুকু বুঝিয়ে দিল। তবে এরপর রনক যা বলল তাতে আমার পায়ের তলা থেকে মাটি সরে গেল। রনক জানাল যে ঈশিতা একজন হাইক্লাস কর্লগার্ল ছিল। আমি চোখ বড় বড় করে তাকালাম রনকের দিকে। আমাকে বিস্মিত হওয়ার সময়টুকু সে দিল। সাথে সাথে আমি বুঝতে পারলাম যে ঈশিতা কেন মাসের ভেতরে এক দুইবার গায়েব হয়ে যেত।
রনক আরও কিছু কথা বলল বটে তবে আমার সে সব মাথায় ঢুকল না। আমি ইশিতার দিকে তাকিয়ে দেখি সে আমার দিকে তাকিয়ে রয়েছে। তার চোখ দেখেই আমি বুঝতে পারলাম যে নিশিতাও ব্যাপারটা জানে।
আমি চলে যেতে চাইলাম বটে তবে পারলাম না। রনক সাহায্য করল অনেক। ওর কারণেই লাশ দ্রুত হাসপাতাল থেকে ছাড়ানো গেল। ঈশিতার লাশ নিয়ে আমরা বের হলাম। তারপর সেটা ওদের বাসায় পৌছে দিলাম। দেখলাম একজন মাঝ বয়সী মহিলা এসেছেন। আমার বুঝতে কষ্ট হল না যে ইনি ওদের মা। ওদের সেখানে রেখে আমি নিজের বাসার দিকে রওয়ানা দিলাম।

বাসায় চলে এলাম। বাসায় বসে বসে পুরো ব্যাপারটা আরেকবার ভাবতে লাগলাম কেবল। আমি আসলে বোকাই ছিলাম। ওদের ভিডিও দেখে আমার আসলে মনে হয়েছিল যে ঈশিতাদের জীবন আসলে উশৃঙ্খলই হবে। যদি এতোটা হবে সেটা আমি ভাবি নি। তবে যখন বাস্তবে ওর সাথে দেখা হল, ওকে জানা হল তখন মনে হল যে আমি ভুল ছিলাম। ঈশিতা আমার কাছে থেকে ওর এই ব্যাপারটা লুকিয়ে রেখেছিল। খুব ভাল ভাবেই সে লুকিয়ে রাখতে পেরেছিল। ঈশিতার প্রতি একটা তীব্র রাগ আসতে গিয়েও কেন জানি এল না। আমি ওর উপর রাগ করতে পারলাম না। যথারীতি ওর আইডি ডিএকটিভ ছিল। তার সেই ডাউনলোড করা ভিডিওগুলো আমি দেখতে লাগল। সেই শাড়ি পরা হাসি হাসি মায়াময় ভিডিওটা বারবার দেখতে লাগলাম কেবল!

নিশিতা আমার কাছে এল আরও মাস খানেক পরে। দেখলাম বেশ ভালই সামলে নিয়েছে সে। আমার কাছে এসে বেশি কথা বলল না। কেবল একটা কাগজ আমার দিকে বাড়িয়ে দিল। সে জানাল যে এই খামটা ঈশিতা অনেক আগে নিশিতার কাছে দিয়েছিল। বলেছিল যে যদি কোন দুর্ঘনা ঘটে তবে এটা যেন আমাকে দেওয়া হয়।
খামটা দিয়ে সে চলে গেল। কোন কথা বলল না।
অনেকটা সময়ে আমি খামটা নিয়ে বসে রইলাম। আমার কেন জানি মনে হল চিঠিতে এমন কিছু লেখা আছে যা আমি জানলে আমার মন খারাপ হবে। তাই সেটা না পড়াই বরং ভাল। কিন্তু সেটা না পড়েও আমি থাকতে পারলাম না। আমি খাম খুলে পড়তে শুরু করলাম।

ফায়সাল,
এই চিঠি যখন পড়ছ, তার মানে হচ্ছে আমার সাথে খারাপ কিছু হয়েছে। আমার ব্যাপারে সব কিছু জেনে গেছ। আমাকে ঘৃণা করছো না খুব? আমি রাগ করবো না। আমার আসলে ঘৃণাই প্রাপ্য। আমি তোমার ভুল ভাঙ্গাবো না, কোন ব্যাখ্যাও দিবো না। তবে যদি পারো তবে আমাকে ক্ষমা করে দিও। আমি নিজেকে তোমার সাথে যুক্ত করতে চাই নি। বিশ্বাস কর চাই নি। যেদিন আমি তোমাকে মেসেজ করেছিলাম সেদিন আমি আত্মহত্যা করার কথা ভাবছিলাম। সব প্রস্তুতি নিয়েই ফেলেছিলাম কিন্তু তখনই কেন জানি একটু শেষবার বাঁচার ইচ্ছে হল। কোন কারণ ছাড়াই আমি আমার ফেসবুক প্রোফাইলে গিয়ে আমার শেষ ভিডিওটার শেয়ার অপশনে গেলাম। কারো সাথে আমার কথা বলতে খুব ইচ্ছে করছিল। তোমাকে আমি ভাগ্য ক্রমেই সেদিন নক দিয়েছিলাম। যদি তখন রিপ্লে না দিতে তাহলে সেদিনই হয়তো আমি চলে যেতাম উপরে। তারপর কিভাবে তোমার প্রতি আমি আসক্ত হয়ে গেছি আমি নিজেও জানি না। কতবার চেষ্টা করেছি তোমাকে সব কিছু খুলে বলতে বা সব কিছু পেছনে ফেলে এসে তোমাকে নিয়ে নতুন ভাবে জীবন শুরু করতে কিন্তু পারি নি একটাও। আমি যে ভয়ংকর জালে জড়িয়েছে সেখান থেকে আমার কোন মুক্তি নেই। আমি কেবল নিশিকে নিয়ে চিন্তায় আছি। বিশ্বাস কর ফয়সাল নিশি আমার মত নয়। সব পাপকাজ আমি একাই করেছি, নিশিকে সেই পাপের একটু ছোঁয়াও লাগতে দেই নি। আমার যদি সত্যিই কিছু হয়ে যায় তবে ওকে একটু দেখে রেখো। আমার মতই তো দেখতে ও। সব কিছু আমার মত। আর নিশি তোমাকে খুব পছন্দও করে। আমরা ছোটবেলা থেকেই দুইবোন সব সময় একই রকম জিনিস পছন্দ করে এসেছি। আমি তোমাকে মন উজাড় করে ভালোবেসে এসেছি নিশিও তাই। তুমি টের পেয়েছে আমি জানি। এটাকে আমার শেষ ইচ্ছে বলেই ধরে নিও। যদি আমাকে কোনদিন একটু ভালবেসে থেকো তাহলে আমার বোনটাকে দেখে রেখো। আমার পরে আর কেউ নেই ওকে দেখার।
ইতি ঈশিতা

চিঠি পড়ে আমি কিছুটা সময় গুম মেরে বসে রইলাম। আমার মনে হল যেন আমার বুকের ভেতরে একটা তীব্র কষ্ট এসে জড় হয়েছে। ঈশিতার সত্যটা জানার পরেও আমি কেন জানি ওকে ঘৃণা করতে পারছি না। সত্যিই পারছি না। ওর সেই হাসিমাখা মুখটা বারবার আমার চোখের সামনে ভেসে উঠছে।
নিশিতার সাথে আমার দেখা হল প্রায় মাস ছয়েক পরে। আমি একটা কাজে গিয়েছিলাম বসুন্ধরাতে। কাজ শেষ করে আটতলাতে গেলাম আইসক্রিম খেতে। সত্যি বলতে আট তলার এই আইসক্রিম আমি ঈশিতা প্রায়ই খেতাম। আমি আইসক্রিম হাতে নিয়ে যখন সিনেপ্লেক্সের পাশ দিয়ে যাচ্ছি তখনই আমার চোখ গেল নিশিতার উপর। আমি থমকে গেলাম। নিশিতা সিকিউরিটি হিসাবে সেখানে কাজ করছে। নিশিতাও দেখতে পেল কিছু সময়েই। সেও কিছু সময় যেন থমকে গিয়েছিল আমাকে দেখে। একটু পরে সেই ভাবটা কাটিয়ে আমার দিকে তাকিয়ে হাসল। আমি কেন জানি আর যেতে পারলাম না যেখান থেকে। আমি অবাক হয়ে খেয়াল করলাম নিশিতার হাসিটা আমার কাছে একদ ঈশিতার মতই মনে হল। সেই আগের উগ্র ভাবটার ছিটে ফোটাও পেলাম না।

তারপর…
তারপর কী আর হবে! আপনারা অনুমান করেই নিতে পারেন।

ফেসবুকের অর্গানিক রিচ কমে যাওয়ার কারনে অনেক পোস্ট সবার হোম পেইজে যাচ্ছে না। সরাসরি গল্পের লিংক পেতে আমার হোয়াটসএপ বা টেলিগ্রামে যুক্ত হতে পারেন। এছাড়া যাদের এসব নেই তারা ফেসবুক ব্রডকাস্ট চ্যানেলেও জয়েন হতে পারেন।

অপু তানভীরের নতুন অনুবাদ গ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে

বইটি সংগ্রহ করতে পারেন ওয়েবসাইট বা ফেসবুকে থেকে।

How useful was this post?

Click on a star to rate it!

Average rating 4.3 / 5. Vote count: 22

No votes so far! Be the first to rate this post.

About অপু তানভীর

আমি অতি ভাল একজন ছেলে।

View all posts by অপু তানভীর →