দস্যি নিশি

4
(4)

বাবা আমার দিকে সরু চোখে তাকিয়ে বলল, ঐ মেয়ে তোকে কিভাবে চিনে? আজকাল এই সব মেয়ের সাথে তোর চলাচল?
আমি খুব ভাল করেই জানি বাবা কোন মেয়ের কথা বলছে। কিন্তু তবুও না বোঝার ভান করে বললাম, কোন মেয়ের কথা বলছো?
আমার মাথায় তখন এই চিন্তা কাজ করছে যে নিশির কথা বাবা কিভাবে জানলো? নিশির সাথে কি বাবার দেখা হয়েছে?
অবশ্য দেখা হওয়াটা খুব অস্বাভাবিক না। আর নিশি যেমন মেয়ে সে বাবার সাথে আগ বাড়িয়ে কথা বলতেই পারে। কিন্তু নিশির সাথে যে আমার পরিচয় আছে এটা বাবা কিভাবে জানলো?

বাবা আমার দিকে তাকিয়ে বলল, বেশি ঢং করবি না। বুঝতে পারছিস না কার কথা বলছি?
আমি সত্যি বলার ভঙ্গি করে বললাম, সত্যিই বুঝতে পারছি না। কার কথা বলছো? আমার ক্লাসের কারো সাথে দেখা হইছে?
আমার গলার স্বর শুনে এবার বাবা খানিকটা দ্বিধায় পরে গেল। ঠিক বুঝতে পারছে না আমার উপর ঠিক সে রাগ করবে কি না।
বাবা বলল, ঐ যে কমিশনারের বোন, নিশি না ফিশি নাম?
যা ভয় পাচ্ছিলাম তাই। এই বদ মেয়েই নিশ্চয়ই কিছু বলেছে। আমি তবুও নিজেকে খানিকটা শান্ত রেখে বললাম, আমরা কদিন হয় এসেছি এই এলাকাতে বল তো! আর এতোদিন ধরে আমাকে চিনো, আমাকে তোমার এই মনে হয়? আমি এমন মেয়েকে চিনতে পারি বল?

এবার আমি বাবার চেহারাতে খানিকটা দ্বিধার ভাব ফুটে উঠতে দেখলাম। আমি এই সুযোগ কাজে লাগিয়ে বললাম, আরে আব্বু ঐ মেয়ে এলাকার সবাইকে জ্বালাতন করে! আমি আজ পর্যন্ত কথাও বলিও নি।
বাবা বলল, জ্বালাতন! সবাইকে?
-হ্যা সবাইকে। কাউকে ছাড় দেয় না। আর কেউ কিছু বলতেও পারে না ওর ভাইয়ের জন্য।
বাবা খানিকটা চিন্তিত মুখে তাকিয়ে রইলো। তারপর খানিকটা পরে বলল, তাই নাকি?
-হ্যা৷ সত্যি তাই।
-আচ্ছা যা দেখি আমি কি করতে পারি।
আমি আর কিছু না ভেবে বাবার সামনে থেকে চলে এলাম। একবার ভেবেছিলাম বাবাকে জিজ্ঞেস করবো। কিন্তু পরে ভাবলাম থাকুক। পরে জানা যাবে। আর এই মেয়ের ব্যাপারে আমার সাবধানে থাকতে হবে।

দুই
ইদানিং কালে প্রায়ই মেয়েদের স্কুটিতে চলাচল করতে দেখি ঢাকার রাস্তায়। আমার কেন জানি এই দৃশ্যটা বেশ লাগে৷ প্রত্যেক স্কুটি চালানো মেয়েকে আমার বড় শক্ত আর সাহসী মনে হয়। মনে হয় এই মেয়ে অনায়াসে সব ঝড় সহ্য করতে পারবে৷
কিন্তু নতুন এলাকাতে বাসা সিফট করে যে এমন একজনকে দেখতে পাবো সেটা ভাবি নি। এই মেয়ে কোন স্কুটি ফিস্কুটি চালাচ্ছে না। সরাসরি বাইক চালাচ্ছে। আর বাইকটাও ইয়া বড়। আমার আবার বাইকের ব্যাপারে ধারনা কম। সম্ভব আরওয়ান কিংবা এফজেদ টাইপের কোন বাইক হবে।
মুল কথা হল এই বাইক মেয়েরা চালায় না। আমি অন্তত দেখি নি। আর এই মেয়ে কি স্বাছন্দেই না চালাচ্ছে! আমি চাইলেও চোখ সরাতে পারলাম না। রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে সরাসরিই তাকিয়ে রইলাম মেয়েটার দিকে।

মেয়েটা একটা টাইট জিন্স পরে আছে৷ সেই সাথে একটা কালো টিশার্ট। চুল গুলো পনি টেইল করে বাঁধা। হাতে সর্ট গ্লোভস পরা। আমি আরেকটা ব্যাপার লক্ষ্য করলাম। মেয়েটা এলাকার রাস্তা ধরেই বাইক চালিয়ে বেড়াচ্ছে। তবে মেয়েটার দিকে সরাসরি কেউ তাকাচ্ছে না। এটা খানিকটা আমার কাছে অন্য রকম লাগলো। একে তো মেয়েটা বাইক চালাচ্ছে তার উপর এরকম পোশাক পরে আছে। মানুষের তো ড্যাবড্যাব করে তাকিয়ে থাকার কথা। বলতে গেলে কেবল আমিই তাকিয়ে আছি মেয়েটার দিকে।
এই ব্যাপারটা কেবল আমিই নই সম্ভবত মেয়েটাও লক্ষ্য করলো। আমার থেকে একটু দূরে বাইক দাড় করিয়ে আমাকে হাতের ইশারাই ডাকলো। আমি কি করবো প্রথমে ঠিক বুঝতে পারলাম না। কেন যেন মনে হল আমি নতুন এলাকাতে বিপদে পড়তে যাচ্ছি। এই মেয়েটা সম্ভবত সাধারণ কেউ নয়।

আমি ধীর পায়ে এগিয়ে গেলাম মেয়েটার দিকে। মেয়েটা সরাসরি আমার দিকে তাকিয়ে আছে। আমার দিকে তাকিয়েই বলল, এলাকাতে নতুন?
আমি কিছু না বলে কেবল মাথা ঝাকালাম। তখনই পেছন থেকে কেউ আমার মাথায় একটা ছোট করে ধাক্কা দিল। তারপর কর্কশ কন্ঠে বলল, কী রে বেটা গলায় স্বর নাই? বোবা!
পেছনে তাকিয়ে দেখি চারজন আমাকে ঘিরে ধরেছে। বুঝতে বাকি রইলো না আজকে আমার খবর আছে।
মেয়েটি হাতের ইশারায় ছেলেটাকে থামতে বলল। ছেলেটা বলল, কিন্তু আপু এই পোলার আপনার দিকে কেমন করে তাকিয়ে ছিল! বেটা জানে না নিশি আপার দিকে চোখ তুলে তাকানো নিষেধ!
আচ্ছা তাহলে এই মেয়ের নাম নিশি। এ আবার কোন আপদ কে জানে! নিশি নামের মেয়েটা এবার একটু গলা চড়িয়ে বলল, বাবলু তোমাকে বলতে বলেছি? যাও নিজের কাজে।

বাবলু তার দলবল নিয়ে চলে গেল। নিশি আবারও বাইক স্টার্ট দিয়ে আমার দিকে তাকালো। তারপর বলল, কোন বাসায় উঠেছো?
মেয়েটা সেই কখন থেকে আমাকে তুমি করে বলে যাচ্ছে। আমি কোন ভাবেই মেয়েটার থেকে ছোট হব না, বরং বড়ই হব৷ আর এই মেয়ে কিনা আমাকে তুমি তুমি করে যাচ্ছে। অবশ্য আমার বুঝতে কষ্ট হল না মেয়েটা এখনকার স্থানীয় এবং প্রভাবশালী। একটু আগের আচরনই সেটা স্পষ্ট। আমি বললাম, আজগর সাহেবের বাসায়।
নিশি বলল, ইরাদের বাসা! আচ্ছা যাও আর এভাবে ড্যাবড্যাব করে তাকাবে না। আমার এটা পছন্দ না। প্রথমবার বলে কিছু বললাম না।
তারপর বাইক ঘুরিয়ে নিশি চলে গেল৷ আমি চুপ করে আরও কিছু সময় সেদিকে তাকিয়েই রইলাম। এমন মেয়ের সাথে কোন দিন আমার পরিচয় হতে পারে সেটা আম কোনদিন ভাবতেও পারি নি৷

নিশির ব্যাপারে আরও ভালভাবে জানতে পারি ইরার কাছ থেকে। ইরা আমাদের বাড়িওয়ালার মেয়ে। বিকেল বেলা ছাদে উঠেছিলাম। দেখলাম সেও উঠেছে। বাড়িওয়ালার মেয়েরা সাধারণত একটু ভাব নিয়েই থাকে তবে দেখলাম ইরা নিজ থেকে এগিয়ে এল। আমার দিকে তাকিয়ে বলল, কেমন আছেন অপু ভাইয়া? আপনার নাম অপুই তো!
আমি বললাম, হ্যা।
ইরা বলল, যাক নিশি আপুকে সঠিক কথাটা বলেছি। তথ্য ভুল হলে উনি আবার রাগ করতেন।
আবারও নিশির নাম শুনে একটু নড়েচড়ে বসলাম। তারপর বললাম, তোমরা ঐ মেয়েকে খুব ভয় পাও নাকি?
ইরা একটু বিরক্ত হয়ে বলল, ঠিক ভয় না, আসলে তার কথা না শুনে উপায়ও নেই। তার ভাই হচ্ছে এলাকার কমিশনার। চাইলেই অনেক ঝামেলা বাঁধাতে পারে। আমরা তো শান্তিতে থাকতে চাই। তাই চুপচাপ সহ্য করি।
আমি হাসলাম একটু। আমার দেখাদেখি ইরাও হাসলো। তারপর বলল, আপনার গার্লফ্রেন্ড আছে?
আমি অবাক হয়ে বললাম, মানে?
ইরা খানিকটা মুচকি হাসি দিয়ে বলল, সম্ভবত নিশি আপুর আপনাকে মনে ধরেছে৷ তাই আপনার ব্যাপারে খোজ খবর নিয়েছে আমার কাছে। তাই জানতে চাইলাম। যদি প্রেমিকা থাকে তাহলে হয়তো….
-তাহলে হয়তো?
-জানি না। নিশি আপুর মেজাজ মর্জি বোঝা দায়! কী করে কিছুই বলা যায় না।
আমি খানিকটা চিন্তিত বোধ করলাম। যদিও আমার বর্তমানে কারো সাথে কিছু চলছে না। কিন্তু ঐ গুন্ডি মেয়ের নাকি আমার উপর আগ্রহ জন্মেছে!
কী আজিব কথা বার্তা! আমার উপর আগ্রহ কেন জন্মাবে? আমি এমন কিছু কি করলাম!

তিন
ক্যাম্পাসে যাওয়ার জন্য বাসা থেকে বের হতেই ইরার দিকে চোখ পড়লো। আমার দিকে চোখ পড়তেই ইরা এগিয়ে এল । একটু ভাল করে মেয়েটার দিকে তাকালাম । মেয়েটাকে আজকে অন্য রকম মনে হচ্ছে । ওদের এই বাসাতে উঠে এসেছি মাস খানেক হল। বলতে গেলে মেয়েটার সাথে আমার প্রতিদিনই কথা হয়। সন্ধ্যা কিংবা রাতে আমি যখন ছাদে উঠি তখনই মেয়েটাকে দেখতে পাই। অন্যান্য মেয়েদের মত মুড নিয়ে থাকে না। নিজ থেকেই এগিয়ে আসে। আজকেও এগিয়ে এল হাসি মুখে।
-কোথায় যাচ্ছেন অপু ভাইয়া ?
-ক্যাম্পাসে !
-আসেন আপনাকে লিফট দেই !
আমি এদিক ওদিক তাকালাম কিন্তু কিছুই দেখতে পেলাম না । ইরা আমার তাকিয়ে থাকতে দেখে বলল
-আরে এই সময়ে এখানে রিক্সা পাবেন না ।
-তাহলে লিফট দিবা কিসে ?

আমার কথা মুখেই রয়ে গেল তার আগেই দেখলাম আমাদের বাসার দারোয়ান একটা রিক্সা নিয়ে হাজির হল । রিক্সাতে উঠতে উঠতে ইরা বলল
-কই আসুন ! নাকি আমার সাথে রিক্সায় চড়তে সমস্যা ?
-না সেটা না ! তোমার বাবা দেখলে সমস্যা করবে না ? হয়তো দেখা যাবে আমাদের বাসা ছেড়ে দিতে বলতেছে ।
ইরা শব্দ করে হাসলো । তারপর বলল
-ভয় নেই । কিছু হবে না । বাবা বাসা ছাড়তে বলবে না । আসুন !

আমি রিক্সাতে উঠে বসলাম। আমমি অবশ্য এমনিতেই ইরার সাথে একটু কথা বলতে চাচ্ছিলাম। গতকাল রাতে ইরার সাথে আমার কথা হয় নি। গতকাল রাতেই আমি ওর সাথে দেখা করতে গিয়েছিলাম কিন্তু গতকাল রাতে ও আসে নি। কিংবা হয়তো এসেছিলো আমি যাওয়ার আগেই চলে গিয়েছে ।

রিক্সা চলতে শুরু করলো। এলাকার ভেতর দিয়ে ইরার সাথে রিক্সায় একটু যে অস্বস্তি লাগছিলো না সেটা বলবো না। যদিও এই এলাকা আমার জন্য নতুন তবে ইতিমধ্যে কয়েকজনের সাথে চেনা পরিচয় হয়েছে। তারাও আমাকে এবং আমার ফ্যামিলির মানুষকে চিনতে শুরু করেছে । এই খবর বাসায় পৌছাতে খুব বেশি দেরি হবে না।

এলাকা থেকে বের হওয়ার ঠিক আগে নিশির সাথে দেখা হয়ে গেল । মোড়ের মাথায় নিশি সাধারনত বসে বসে আড্ডা দেয় । এই সকাল বেলাতেই যে ও আড্ডা দিবে সেটা ভাবি নি । আমাদের দিকে সরু চোখে তাকালো । আমি অনুভব করলাম ইরা তখনই যেন আমার দিকে খানিকটা সরে এল । আমার দিকে তাকিয়ে বলল,
-কী ব্যাপার অপু ভাইয়া এরকম জড়সড় হয়ে বসে আছেন কেন ?
-না মানে !
-শুনেন এতো অস্বস্তি নিয়ে থাকবেন না তো ! আমার পাশে বসলে নিশ্চয়ই আপনার মান ইজ্জত চলে যাবে না । নাকি যাবে ?
-আরে না না কি বলছো এসব ? আমার তো বরং ভাল লাগছে !
-সত্যি ?
-হুম !
-যাক ! ভাল । আমি খানিকটা চিন্তিত ছিলাম । আমি আপানকে না জানিয়েই একটা কাজ করে ফেলেছি !
আমি বললাম
-কী কাজ ?
-কেন আপনার তো আন্দাজ করার কথা !

সত্যিই আমার আন্দাজ করার করার কথা । আমি সম্ভবত বুঝতেও পেরেছি যে ইরা আসলে কী বলতে চাইছে । গতকাল রাতে ঠিক এই কারনেই আমি ওর সাথে কথা বলতে চাইছিলাম । গতকাল সন্ধ্যার সময় আমি বাসায় ফেরার সময় নিশি তার বাইক নিয়ে আমার সামনে এসে হাজির হল । আমার দিকে তাকিয়ে বলল
-বাইকে ওঠো ?
আমি বললাম
-আমি বাইকে উঠি না !
-কেন ? ভয় লাগে ?
-হ্যা ।
-পোলা মানুষ হয়ে বাইকে ভয় ?
আমি কিছু বললাম না । চুপ করে রইলাম । নিশি আমার দিকে তাকিয়ে বলল
-ইরা কি তোমার গার্লফ্রেন্ড ?
আমি খানিকটা চমকে গেলাম । এই কথা হঠাৎ ! আমি ঠিক বুঝতে পারছি না । ইরা আমার প্রেমিকা হতে যাবে কেন ? এই এলাকাতে আসার আগে ওকে আমি চিনতামও না ।
আমি বললাম
-হলেই না কি ? কেন ? হতে পারে না ? নাকি একালায় থাকতে হলে প্রেম করা যাবে না ? এমন কোন নিয়ম আছে কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে ?
শেষ কথাটা খানিকটা টিটকারির সুরেই বললাম। এই একালাতে আসার পরে একটা ব্যাপার লক্ষ্য করেছি যে নিশির ভাইকে এলাকার মানুষ খুব ভয় পায় । অবশ্য ভয় পাওয়ার কথা । ক্ষমতায় যেই আসুন কমিশনার সব সময় ওর ভাই ই থাকে । আগে ওর বাবা ছিল এখন ওর বড় ভাই । এই এলাকার শেষে ওদের বাপ দাদার আমলের কাঠের ব্যবসা । লোক মুখে শুনেছি যে এই এলাকার বসতি ওরাই নাকি শুরু করেছে ।
-না এমন কোন নিয়ম নেই ।
এইবার আমি খানিকটা অবাকই হলাম । কারণ নিশির কন্ঠে আমি খানিকটা আশাহতের সুর শুনতে পেলাম । নিশি আমার দিকে তাকিয়ে রইলো কিছুটা সময় । তারপর বাইকটা স্টার্ট দিল । আর কিছু না বলে চলে গেল । আমি খানিকটা অবাক হয়ে তাকিয়ে রইলাম । আমার সাথে ইরার কিচু চলছে কি না সেটা এই মেয়ের চিন্তার কেন ? এই মেয়ে এই তথ্য কোথা থেকে পেল !

এইটা জানার জন্যই আমি ফ্রেশ হয়ে ছাদে গিয়ে হাজির হয়েছিলাম । ইরার সাথে কথা বলতে হবে । কিন্তু ইরা রাতে ছাদে এল না। ওর নাম্বারও আমি চেয়ে নেই নি তারই ফোন করতে পারলাম না ।
ইরা বলল, গতকাল সকালে নিশি আপু আমাকে ধরেছিলো !
-কী ব্যাপারে ?
-আপনার ব্যাপারে খোজ খবর নেওয়ার জন্য । আমি যে আপনার সাথে যে আমি প্রায়ই ছাদে বসে গল্প করি এটা তার কানে গেছে ।
আমি খানিকটা রাগান্বিত হয়ে বললাম, আমি তোমার সাথে গল্প করলে তোমার বাবার অপছন্দ হতে পারে, সে কিছু বলতে পারে ! নিশি বলার কে ?
-আপনি কিন্তু আমার আগের কথা মনে রাখেন নি । আমি আপনাকে বলেছিলাম যে নিশি আপু সম্ভবত আপনাকে কোন কারনে পছন্দ করেছে । এখন পছন্দের মানুষের সাথে অন্য কেউ পুটিসপাটিস করলে তো রাগ করবেই !
আমি কি বলবো খুজে পেলাম না । ইরা বলল, আর যদি হাতে ক্ষমতা থাকে তাহলে তো বোঝেনই !
-হ্যা বুঝতে পারছি । কিন্তু এখন ?
-সেটাই । আমি জানি আপনি কিংবা আপনার পরিবার কেউ চাইবেন না এমন একটা ফ্যামিলির সাথে সম্পর্ক করতে ! তাই না ?
আমি মুখে কিছু বললাম না তবে এটা সত্য কথা । আমি আসলেই চাই না । ঐদিন এই বদ মেয়ে আমার বাবাকে ফোন দিয়ে নাকি বলেছে আমাকে সে তুলে নিয়ে যাবে !
আমি শুনে আকাশ থেকে পড়েছি । একটা মেয়ে আমার বাবাকে হুমকি দিয়ে বলেছে আমাকে নাকি তুলে নিয়ে যাবে ! এর কোন মানে হয় ! আব্বু তো বলেছে এই এলাকাতেই সে আর থাকবে না ।
আমি ইরার দিকে তাকিয়ে বললাম, কি করবো বল ?
ইরা একটু হাসলো । তারপর বলল
-সেটার জন্যই আপনার কাজ একটু সহজ করে দিয়েছি।
-মানে ?
-মানে হচ্ছে গতকাল আমি নিশি আপুকে বলেছি যে আপনি আমার বয়ফ্রেন্ড ! আপানাদেরকে আমিই আমাদের বাসায় নিয়ে এসেছি।

আচ্ছা এই জন্য গতকালকে নিশি আমাকে এই কথা জানতে চেয়েছিলো । আমি কী বলবো ঠিক খুজে পেলাম না । ইরা বলল
-আমার মনে হয়েছে এই কাজটা করলে সে হয়তো আপনার পিছু নিবে না ! আপনি রাগ করেন নি তো ?
-না না রাগ করি নি তবে অবাক হয়েছি খানিকটা !
ইরা মিষ্টি করে হাসলো । তারপর বলল, অবাক হওয়া ভালো । আমার সাথে থাকেন আরও অবাক হবেন !
আমার কেন জানি ইরার কথা শুনে বেশ ভাল লাগলো । এর আগে আমার কারো সাথে সম্পর্ক গড়ার অভিজ্ঞতা খুব একটা নেই । মুখচোরা স্বভাবের জন্যই মেয়েদের সাথে ঠিক মিশতে পারি না আমি । ইরা সেদিক দিয়ে নিজের উদ্দ্যোগেই আমার সাথে এসে কথা বলে । ব্যাপারটা আমার কাছে বেশ ভাল লাগে ।
ইরাকে একটা প্রশ্ন করতে ইচ্ছে হল খুব কিন্তু সেটা করতে পারলাম না । তার আগেই ওর ক্যাম্পাস চলে এল । রিক্সা থেকে নামতে নামতে ইরা বলল, তো সন্ধ্যা দেখা হবে আমার ফেইক বয়ফ্রেন্ড !
আমি হাসলাম কেবল । অদ্ভুত একটা আনন্দ কাজ করতে লাগলো মনের ভেতরে ! মনে হল ফেইক বয়ফ্রেন্ড থেকে আসল বয়ফ্রেন্ড হতে আমার খুব বেশি সময় লাগবে না !

চার
এই একালাতে আসার পর থেকে আমার সাথে সব নতুন নতুন ঘটনা ঘটতে শুরু করেছে। এভাবে হঠাৎ করেই ইরার সাথে আমার ভাব হয়ে যাবে আমি ভাবতেও পারি নি । বলতে গেলে প্রতিদিনই ইরার সাথে ক্যাম্পাসে যাই একই রিক্সায় করে । রাতে কিংবা সন্ধ্যায়ও আমাদের দেখা হয় ছাদে । ও আমার সাথে অনেক কথা বলে । কত রকমের গল্প যে ও করতে পারে । আমি নিজেও গল্প করি । আমার সময় খুব ভাল কাটে ! মনে হয় এমন চমৎকার সময় কিভাবে কেটে যাচ্ছে !

সব কিছু কেমন যেন একের পর এক ঘটতেই লাগলো । আমি কেবল অবাক হয়ে সেই ঘটনা গুলো সাক্ষী হচ্ছি কেবল । আমার হাতে যেন আর কিছুই নেই। মনের ভেতরে যেন খানিকটা অস্বস্তি কাজ করছিলো না সেটা আমি বলবো না তবে ইরার সাথে মেলামেশাটা আমি উপভোগই করছিলাম ।

তারপর উপর আগে নিশির চোখ । এই মেয়েটা আমার ভেতরে কী দেখেছে আমি নিজেও জানি না । আমি যখনই বাইরে বের হতাম মেয়েটাকে দেখতে পেতাম । তবে এখন নিশি আর আমার কাছে আসতো না কিংবা আমার সাথে কথা বলতেও চাইতো না । ঐদিনের পরে বাবার ফোনেও আর ফোন করে জ্বালাতন করে নি । একদিন দিয়ে ভালই হয়েছে । ইরা যেটা ভেবেই নিশিকে কথাটা বলুক না কেন সেটা দিয়ে একটা ঝামেলা শেষ হয়েছে । এইটা নিয়েই শান্তিতে ছিলাম।
তবে শান্তি বেশি সময় স্থায়ী হল না । একদিন ক্যাম্পাস থেকে বাসায় ফিরছি । হঠাৎ করে একটা ছেলে আমাকে নাম ধরে ডাক দিল । ছেলেটাকে আমি নিশির সাথে প্রায়ই দেখেছি । একটু অবাক হলাম । কারন ঐদিনের পর নিশি যেমন আমাকে আর ঘাটায় নি, তেমনি ভাবে ওর আশে পাশের ছেলে গুলোও ঘাটায় নি । তাহলে আজকে আবার কি চায় !
আমি পায়ে পায়ে এহিয়ে গেলাম । ছেলেটা আমার দিকে তাকিয়ে বলল, ভাই আপনারে ডাকে !
আমি বললাম, কোন ভাই ?
-সজিব ভাই !

আমি প্রথমে চিনতে পারলাম না এই সজিব ভাইটা আবার কে ! কিন্তু তারপরই মনে পড়ে গেল । এই সজিব ভাই হচ্ছে নিশির মেঝ ভাই । তার বড় হচ্ছে রাজিব ভাই এই এলাকার কমিশনার ! এই সজিব ভাই আবার আমার কাছে কী চায় !
আমাকে নিয়ে হাউজিংয়ের এক পাশে চলে গেল । আমি চাইলেও মানা করতে পারতে পারতাম না । তাই চুপচাপ ছেলেটার সাথে সাথে সাথে চলে এলাম ।
সজিব সাহেব বয়সে আমার আমার সমানই হবে । নিশির পিঠাপিঠি ভাই সম্ভবত । আমার দিকে তাকিয়ে বলল
-তুমিই অপু !
-জি !
কিছু সময় আমার দিকে তাকিয়ে রইলো । তারপর বলল
-দেখো তোমাকে সরাসরি কথাটা বলি ! কাজটা তুমি মোটেই ভাল করছো না !
আমি বুঝতে পারলাম যে কোন কাজটার কথা বলতেছে । তার ছোট বোন আমার পেছন পেছন ঘুরতেছে এবং আমি তাকে পাত্তা দিচ্ছি না এটা তার পছন্দ হচ্ছে না । একবার মনে হল বলি যে তোমার বোনকে সামলাও কিন্তু সেটা বলতে পারলাম না । আশে পাশে কেউ নেই । এই কথা বললে আমাকে মাইর খেতে হতে পারে !
সজিব বলল, ইরার সাথে এতো লুটুর পুুটুর কী তোমার ?
আমি একটু চমকে গেলাম ! কি বলল এই ছেলে !
ইরা !
আমি বললাম, ইরা ? আমাদের বাড়িওয়ালার মেয়ে ?
পেছন থেকে একজন ধমক দিয়ে উঠে বলল, বেটা জানোস কে ? থাপড়াইয়া দাঁত খুলে ফেলবো !
আমার এখন কি বলা উচিৎ আমি ঠিক বুঝতে পারছি না । আমি ভাবতেই পারি নাই এই ছেলে আমাকে ইরার ব্যাপারে কিছু বলবে সজিব বলল, ইরার সাথে তোকে যেন আর না দেখি ! আমার কানে যদি এই কথা যায় তাহলে তোর কিন্তু খবর আছে ! আর এক মাস সময় দিলাম । অন্য এলাকাতে বাসা নিয়ে চলে যাবি ! যা এখন !
আমি চুপচাপ মাথা নিচু করে চলে এলাম । কী সমস্যায় পড়া গেল ! এখন কি হবে ?
বাসায় এসে কথাটা বলতেই বাবা যেন রাগে ফেঁটে পড়লেন । এমন একটা ভাব যেব সব দোষ আমারই । আমারই কারনে এই এলাকা ছেড়ে চলে হবে ! বাবা এখনও মনে করছে যে নিশির কারনেই আমাদের এই এলাকা ছেড়ে চলে যেতে বলা হয়েছে !

অবশ্য দোষ যে খানিকটা আমার নেই সেটা বলব না । আমার দোষ আছে তবে সেটা খুবই সমান্য । আর এখানে আমার খুব একটা হাতও নেই । একে তো ঐ মেয়ে আমাকে পছন্দ করেছে এতে আমার নিজের কোন হাত নেই । তারপর ইরা নিজ থেকে আমাকে উদ্ধার করতে এসেছে এতেও আমার কোন হাত নেই । আমি কেবল হাওয়ার সাথে তাল দিয়ে গিয়েছি । আর তাল দিতে গিয়েই যে এই কাজ হয়ে যাবে সেটা ভাবি নি !
বাবা কিছু সময় চিৎকার চেঁচামিচি করলেও পরে বললেন যে কাল থেকে নতুন বাসা খুজতে হবে । জলে বাস করে কুমিরের সাথে লড়াই করা চলে না । আমরা সাধারন মানুষ । কিন্তু ঐ রাতেই আরও কিছু হওয়ার বাকি ছিল ।
হঠাৎ আমাদের কলিংবেল বেজে উঠলো । আমি নিজের ঘরেই ছিলাম । একটা সময় মা এসে ড্রয়িং রুমে ডাকলো আমাকে !
আমি ড্রয়িং রুমে গিয়েই ধাক্কা খেলাম । সেখানে নিশি আর সজিব বসে আছে । বাবা বসে আছে তার পাশে । বাবার মুখ গম্ভীর ! আমি কিছু সময় কেবল অবাক হয়ে তাকিয়ে রইলাম। কী হচ্ছে ঠিক বুঝতে পারলাম না । নিশি আমার দিকে তাকিয়ে একটু হাসার চেষ্টা করলো তারপর সজিবের মাথায় একটা ধাক্কা দিয়ে বলল, সরি বল !
সজিব আমার দিকে তাকিয়ে বলল, বিকেলের কথায় তুমি কিছু মনে কর না ! কেমন !
আমি বললাম, না ঠিক আছে !
সজিব বলল, সরি আমি !
তারপর নিশির দিকে তাকিয়ে বলল, হয়েছে ?
নিশি বলল, হ্যা হয়েছে । এর পর থেকে এরকম মাস্তানী বাদ দে ! যা ভাগ এখন !

সজিব সবার কাছ থেকে বিদায় নিয়ে চলে গেল । নিশি তখনও বসে আছে । আমার বাবার দিকে তাকিয়ে বলল, আঙ্কেল আমি খুবই সরি সজিবের আচরনে । আমি কিছু মনে করবেন না । ভাইয়ার কানে যদি সজিবের এই কান্ড কারখানা যায় তাহলে ওকে একেবারে মেরেই ফেলবে ! আপনারা প্লিজ কিছু মনে করেন না !
আব্বা গম্ভীর মুখেই বলল, না না ঠিক আছে । কোন সমস্যা নেই !

নিশি এবার আমার দিকে তাকিয়ে উঠে দাড়ালো । এই প্রথম আমি নিশির দিকে তাকালাম । নিশি আজকে অন্যান্য দিনের মত জিন্স টিশার্ট পরে নি । একটা নীল রংয়ের সেলোয়ার কামিজ পরে এসেছে । চোখ গুলো খোলা ! আমার দিকে তাকিয়ে বলল
-আচ্ছা আসি !
আমার কি মনে হল আমি বলল, আচ্ছা আমি এগিয়ে দেই !

বলে নিশির সাথেই বের হয়ে এলাম । সিড়ি দিয়ে নামতে নামতে নিশিকে বললাম, থেঙ্কিউ !
নিশি হাসলো । তারপর বলল, ধন্যবাদ দেওয়ার কিছু নেই । দোষ তো সজিবেরই !
-সজিব কি ইরাকে পছন্দ করে ?
-হ্যা অনেক দিন থেকেই ঘুরছে ওর পেছনে । কিন্তু আসল ঘটনা জানে না !
আসল ঘটনা বলতে নিশি সম্ভবত আমার সাথে ইরার মেলামেশার কথাটা বোঝাচ্ছে ! ইরাই তো নিশিকে আমার ব্যাপারে বলেছে । নিশির ব্যাপারটা জানার কথা ! গেট দিয়ে বের হয়ে এলাম । নিশি যাওয়ার আগে আমার দিকে তাকিয়ে বলল
-ইরার ব্যাপারে সাবধান থেকো ! তুমি যা ভাবছো ব্যাপারটা সেরকম মোটেও না !
আমাকে আর কিছু না বলার সুযোগ দিয়ে নিশি হাটা দিল । একবার মনে হল ওকে ডাক দিয়ে জিজ্ঞেস করি ! কিন্তু তারপরই মনে হল ও হয়তো ঈর্ষা থেকেই এই কথা বলছে । কিন্তু নিশি কেন যে কথাটা আমাকে বলল সেটা আমি বুঝতে পারলাম তার ঠিক দুইদিন পরে !

পরের পর্ব

ফেসবুকের অর্গানিক রিচ কমে যাওয়ার কারনে অনেক পোস্ট সবার হোম পেইজে যাচ্ছে না। সরাসরি গল্পের লিংক পেতে আমার হোয়াটসএপ বা টেলিগ্রামে যুক্ত হতে পারেন। এছাড়া যাদের এসব নেই তারা ফেসবুক ব্রডকাস্ট চ্যানেলেও জয়েন হতে পারেন।

অপু তানভীরের নতুন অনুবাদ গ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে

বইটি সংগ্রহ করতে পারেন ওয়েবসাইট বা ফেসবুকে থেকে।

How useful was this post?

Click on a star to rate it!

Average rating 4 / 5. Vote count: 4

No votes so far! Be the first to rate this post.

About অপু তানভীর

আমি অতি ভাল একজন ছেলে।

View all posts by অপু তানভীর →

2 Comments on “দস্যি নিশি”

  1. গল্পটা পড়তে পড়তে কখন যে শেষ হয়ে গেল বুঝতেই পারলাম না, এটাই আসলে ভালো গল্পের লক্ষণ।

    নিশি চরিত্রটা দারুণভাবে টানছে। বাইকে চড়া দাপুটে মেয়ে, কিন্তু ভেতরে যে একটা অন্য মানুষ আছে, সেটা লেখক খুব চুপিসারে দেখিয়ে দিচ্ছেন কোনো বাড়তি নাটকীয়তা ছাড়াই।

    আর শেষ লাইনটা? “বুঝতে পারলাম তার ঠিক দুইদিন পরে” -এই একটি বাক্যেই পরের পর্বের জন্য মনটা আনচান শুরু করে দিয়েছে।

    ইরার ব্যাপারে নিশির সতর্কবার্তাটি কিন্তু মাথায় ঘুরছে এখনও।

Comments are closed.