পাঁচ
রাতে যখন ছাদে আমি ইরার জন্য অপেক্ষা করছিলাম তখনই আমার কেন যেন মনে হচ্ছিলো কিছু যেন একটা ঠিক নেই। ছাদ থেকে যখন নিচে তাকাই তখন দেখলাম সেখানে বেশ কিছু লোকের আনাগোনা । তারা কী নিয়ে যেন কথা বলছে । আমি কিছু বুঝতে পারছিলাম না । তবে ওদের মুখে আমি বেশ কয়েকবার ইরার নামটা শুনতে পেলাম ।
ইরার কি কোন ক্ষতি হয়েছে ?
ওকে ফোন দিয়ে গিয়ে দেখি ওর ফোনটা বন্ধ ! কি হয়েছে কিছুই বুঝতে পারছিলাম না । আজকে সকালেও ইরা আমার সাথেই ক্যাম্পাসে গিয়েছিলো । হেসে হেসে আমার সাথে কথা বলছিলো । যখন ও রিক্সা থেকে নেমে গেল আমার দিকে তাকিয়ে চমৎকার একটা হাসিও দিয়ে গেল । আর বলে যে রাতে ছাদে দেখা হবে !
কিন্তু এখন তার কোন দেখা নেই । সত্যি বলতে কি আমার চিন্তা হচ্ছিলো । আমি চিন্তিত মুখেই নিচে নেমে এলাম । নিজেদের বাসাতে যাওয়ার আগে একবার মনে হল বাড়িওয়ালার বাসায় গিয়ে খোজ নেই । ইরা ঠিক আছে তো । কিন্তু সেটা করলাম না । নিজের বাসাতেই ঢুকে পড়লাম ।
আমি নিজের রুমে বসে গান শুনতে শুরু করলো এমন সময়ই আম্মু আমাকে ডেকে নিয়ে এল ড্রয়িং রুমে । গতদিন যখন আমাকে চিন্তিত মুখে আম্মু দেখে নিয়ে আসে তখন এই রুমে সজিব আর নিশি বসে ছিল । আজকে দাড়িয়ে আছে আমাদের বাড়িওয়ালা ! আমার দিকে তাকিয়ে বললেন, বাবা তুমি কি ইরার কোন খোজ জানো ?
আমি যেন আকাশ থেকে পড়লাম ! আঙ্কেল কী বলছে ! আমি কিভাবে ইরার খোজ জানবো ? বাড়িওয়ালা আবার বললেন, সকালে তোমরা না এক সাথে ক্যাম্পাসে গিয়েছিলো ?
আমি আর ইরা যেন মাঝে মাঝেই এক সাথে এক রিক্সা করে ক্যাম্পাসে করে ক্যাম্পাসে যাই এটা এলাকার সবাই জানে । তারা সবাই আমাদের যেতে দেখে । এর ভেতরে কোন লুকোচুরি নেই । আমি বললাম, হ্যা আজকে তো একই রিক্সাতে গিয়েছিলাম । ও ওর ক্যাম্পাসের সামনে নেমে গেল ।
-তারপর ?
-তারপর আর কী ? আমি আমার ক্যাম্পাসে চলে গেলাম !
-আর কথা হয় নি ?
-নাহ ! আর কথা হয় নি ! কে বলুন তো ? ইরা ঠিক আছে তো !
বাড়িওয়ালা আমাদের দিকে অদ্ভুত চোখে তাকালো । তারপর বলল, আচ্ছা আমি আরেকটু খোজ করে দেখি ! তুমি কিছু খোজ পেলে আমাকে জানিও !
এই বলে বাড়িওয়ালা আবার হাটা দিল দরজার দিকে । আমি বোকার মত তাকিয়ে রইলাম । কি হচ্ছে এই সব !
বাড়িওয়ালা বেরিয়ে যাওয়ার কিছু সময় পরেই বাবলু নামের ছেলেটাকে দরজাতে দেখতে পেলাম । আমার দিকে তাকিয়ে বলল
-নিশি আপা আপনাকে ডাকে !
-নিশি !
আব্বা বাসায় ছিল না । আম্মুর দিকে তাকিয়ে দেখ সেও আমার দিকে তাকিয়ে আছে । আমি আম্মুর দিকে তাকিয়ে বললাম, আমি আসছি মা !
-কিন্তু …।
-সমস্যা নেই মা !
আম্মুকে আর কিছু বলার সুযোগ না দিয়ে বেরিয়ে এলাম । আমার কেবলই মনে হতে লাগলো যে ইরার এই ভাবে হারিয়ে যাওয়ার ব্যাপারে নিশি কিছু না কিছু অবশ্যই জানে । ঐদিনও সে আমাকে এই ব্যাপারে বলেছিলো । কি বলেছিলো সেটা আমি ঠিক বুঝতে পারি নি । এখনও ঠিক বুঝতে পারছি না অবশ্য ।
আমাদের বাসা থেকে একটু দুরেই নিশি আর সজিব বসে ছিল ওদের বাইকের উপর । আমি কাছে যেতেই নিশি আমাকে দেখিয়ে সজিবকে বলল, এই দেখ তোর ইরাতো ভাই চলে এসেছে !
এই বলে জোরে জোরে হাসতে লাগলো !
ইরাতো ভাই !
সজিব নিশির দিকে তাকিয়ে গম্ভীর কন্ঠে বলল, ইরার্কি মারবি না বললাম । মাইর খাবি !
নিশি বিন্দু মাত্র হাসি না থামিয়ে বলল, আরে বাবা খালাতো ভাইদের ভেতরে সম্পর্ক হচ্ছে খালা, মামাতো ভাইয়ের ভেতরে মামা আর ইরাতো ভাই হচ্ছে তোদের দুজনকেই ইরা ঘোল খাইয়েছে !
আমি সত্যিই কিছু বুঝতে পারছিলাম না । সজিব আর বসলো না । বাইক থেকে উঠে বসলো । তারপর বাইক স্টার্ট দিয়ে চলে গেল। দেখলাম বাবলুও আমাদের রেখে চলে গেল । আমি নিশির সামনে একা দাঁড়িয়ে রইলাম । কী বলব ঠিক বুঝতে পারছিলাম না । নিশি আমার দিকে তাকিয়ে বলল, তোমাকে না ইরার ব্যাপারে সাবধান করেছিলাম ! সে কী করেছে জানো ?
-কী করেছে ?
-এক সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ারের সাথে ভেগেছে !
-কী ! কী বলছো তুমি ?
-একদম সত্যি বলছি ! আমার কাছে প্রমান আছে বলেই বলছি । যদিও তারা এখন কোথায় আছে সেটা ঠিক বলতে পারবো না । সায়দাবাদ বাসস্ট্যান্ডের দিকে যেতে দেখেছি । ওখান থেকে কক্সবাজার কিংবা সিলেট বান্দরবান যেকোন দিকে যেতে পারে !
আমার মাথার ভেতরে তখন সত্যিই সত্যিই কাজ করছিলো না । আমি পেছন থেকে নিশির হাসি শুনতে পাচ্ছিলাম না । আমি দ্রুত সেখান থেকে বাসার দিকে রওয়ানা দিলাম ।
পরের দিনগুলো আমার জন্য সত্যি অসহনীয় হয়ে গেল। বাড়িওয়ালার কাছ থেকে জানতে পারলাম ইরা সত্যি সত্যিই বাসা থেকে পালিয়েছে। কদিন থেকেই তিনি ইরার বিয়ের জন্য উঠে পড়ে লেগেছিলেন। একটা ছেলের সাথে বিয়ে প্রায় ঠিকই করে ফেলেছিলেন। কিন্তু মাঝ খান দিয়ে কী থেকে কী হয়ে গেল৷
ইরা একবার নাকি ফোনটা চালু করেছিল। তার বাবাকে ফোন করে বলেছে তারা ভাল আছে। বয়স হিসাবে সে সাবালিকা তাই পুলিশে খবর দিয়ে লাভ নেই। তবে তারপরেও যদি সে এমন কিছু করে তাহলে সে আর কোন দিন ফেরৎ আসবে না। তাই বাড়িওয়ালা চুপচাপ আছেন। তার মনভাব দেখে মনে হচ্ছে সে ইরাকে মাফ করে দিয়েছেন। এখন ইরা ফেরৎ আসলেই তিনি খুশি।
কিন্তু আমি কিছুতেই শান্তি পাচ্ছিলাম না। আর পাড়ার ঐ বদ মেয়েটা আমাকে কিছুতেই শান্তি দিচ্ছিলো না। আমি যখনই বাইরে বের হয়, আর যখনই নিশির সাথে আমার দেখা হয় সে আমার দিকে তাকিয়ে মুচকি মুচকি হাসে। তার যেন খুব মজা লাগছে। ইরা পালিয়ে যাওয়ায় নিশি যে সব থেকে বেশি খুশি হয়েছে সেটা আর বলে দিতে হল না। আমি নিজেকে নিশির কাছ থেকে সব সময় দুরে লুকিয়ে রাখতে লাগলাম।
কিন্তু একদিন ঠিকই নিশির একদম সামনে পড়ে গেলাম। বলতে গেলে বাধ্য হলাম। তবে সেটা একেবারে খারাপ হল না।
আমার সেমিস্টার ফাইনাল পরীক্ষা চলছিলো। পরীক্ষা শুরু হল দুপুর দুইটা থেকে। আমি বাসা থেকে ঘন্টা খানেক আগে বের হতাম। সেদিনও বের হয়েছি কিন্তু বের হয়েই আকাশ থেকে পড়লাম। পুরো এলাকাতে একটা বাস কিংবা একটা রিক্সা নেই। সব কেমন খাঁ খাঁ করছে। খবর নিয়ে জানতে পারলাম একটু আগে এখানে নাকি পরিবহন শ্রমিক আর ছাত্রদের মাঝে মারামারি হয়েছে। দুই পক্ষই সব যান বাহন চলাচল একেবারে বন্ধ করে দিয়েছে। এমন রিক্সা পর্যন্ত চলবে না। আমি পড়ে গেলাম বিপদে। দুপুরের এই সময়টা রাস্তা ঘাট বলতে একটু ফাঁকাই থাকে। আর আমার ক্যাম্পাস এমন দুরুত্বে যে হেটে গেলে সময় মত পৌছাতে পারবো না।
উবারে চেষ্টা করলাম কিন্তু কেউই রাইড পিক করলো না। ওদিকে সময় চলে যাচ্ছে। আমি আর দেরি না করে হাটতে শুরু করলাম। একটু পরে দৌড়াতে হবে। কিন্তু সেটা আর করতে হল না৷ আমার সামনেই এসে ব্রেক করলো নিশির বাইকটা৷
হেলমেট খুলে আমার দিকে তাকিয়ে হাসলো। তারপর বলল, কী মিস্টার দেবদাস, নিড এ রাইড?
আমি নিশির দিকে তাকিয়ে রইলাম। আজকে ও কালো রংয়ের একটা জিন্স পরেছে। আর চেকের শার্ট। চুল গুলো সেই পনি টেইল করেই বাঁধা। আমি কি বলব বুঝতে পারলাম। ওর বাইকে উঠতে ইচ্ছে করছিলো না কিন্তু এখন এ ছাড়া কোন উপায়ও নেই৷
আমার পজেটিভ মনভাব দেখে ওর মুখে হাসি দেখা দিল। আমি কিছু না বলে ওর বাইকের পেছনে উঠে বসলাম৷
আমার বাইকে উঠতে সত্যিই ভয় করে। ছোট বেলাতে একবাত বড় মামার সাথে বাইকে উঠে দুর্ঘটনায় পরেছিলাম। বড় হাত ভেঙ্গে একাকার অবস্থা। আমার পুরো শরীরে রক্তারক্তি অবস্থা। তারপর থেকে এই বাইক জিনিসটা আমি ভয় পাই।
বাইক চলতে শুরু করলেই আমার সেই ভয়টা চেপে বসলো। আমি নিশির কাধে হাত রাখলাম কিন্তু বদ মেয়ে সম্ভবত বুঝতে পেরেছিলো এবার সে স্পিড দিলো বাড়িয়ে৷ মারামারির জন্য রাস্তা একদম ফাঁকা ছিল তাই হুহু করে স্পিড বাড়তে লাগলো। এবার আমি সত্যি সত্যিই নিশির কোমর জড়িয়ে ধরলাম। আমি বুঝতে পারছিলাম এই বদ মেয়ে এতে খুশিই হচ্ছিলো। থাপড়িয়ে কান মুখ গরম করে দেওয়া উচিত।
কত সময় পরে বাইক থামলো আমি বলতে পারবো না৷ আমি চোখ বন্ধ করে রেখেছিলাম। বাইক থাকতেই চোখ মেলে তাকালাম। তাকিয়ে দেখি ক্যাম্পাসের সামনে দাঁড়িয়ে আছি। বাইক থেকে দ্রুত নেমে পড়লাম। তারপর নিশিকে বললাম
-এতো দ্রুত না চালালেও চলতো!
নিশি হাসতে হাসতে বলল, তুমি এতো ভিতুর ডিম কেন বলতো? তবে যেভাবে জড়িয়ে ধরেছিলে সুযোগ পেলে আবারও এই কাজ করবো।
বদ মেয়ের কথা শোন। আর সুযোগ দিবোই না। আমি উল্টো পথে দেওয়ার আগে হঠাৎ মনে হল আজকে নিশি না থাকলে আমার পরীক্ষা দেওয়া হত না। রাগটাকে এক পাশে সরিয়ে রেখে বললাম, থেঙ্কিউ!
নিশি হাসলো। তারপর বলল, পরীক্ষা দিও ভালভাবে। যাও।
নিশি কন্ঠে আর চোখের দৃষ্টিতে কিছু একটা ছিল। আমাকে কেমন যেন আন্দোলিত করে দিল। আমি হাটতে শুরু করলাম বিল্ডিংয়ের দিকে কিন্তু বারবার পেছন ফিরে তাকাতে লাগলাম। নিশি তখনও আমার দিকেই তাকিয়ে আছে।
কিন্তু সব থেকে বড় ধাক্কাটা খেলাম যখন তিন ঘন্টা পরে পরীক্ষা দিয়ে বের হয়ে এলাম। তাকিয়ে দেখি নিশি আমার জন্য অপেক্ষা করছে। আমি ওর কাছে গিয়ে বললাম, এখনও অপেক্ষা করছো?
-আরে না। বাসায় গিয়েছিলাম একটু আগে এলাম।
আমি নিশির দিকে তাকিয়ে রইলাম। আমার কেন যেন মনে হল নিশি মিথ্যা বলছে। ও পুরোটা সময় এখানেই অপেক্ষা করেছে আমার জন্য৷ আমি সত্যি অবাক না হয়ে পারলাম না৷ নিশি বলল, চল যাওয়া যাক।
-তার আগে আসো তোমাকে আমাদের ক্যাম্পাসের বিখ্যাত চটপটি খাওয়াই।
আমার কথা শুনে নিশি এবার খুবই খুশি হল। অন্তত ওর মুখ দেখে আমার তাই মনে হল। পুরোটা বিকাল আমি নিশির সাথে বসে গল্প করলাম আমাদের ক্যাম্পাসে। মনে হচ্ছিলো কিছু একটা পরিবর্তন হচ্ছে। খুব দ্রুত।
ছয়
আমি নিশির রাগ দেখে কিছুটা সময় কেবল থ হয়ে দাঁড়িয়ে রইলাম। নিশিকে তখনও শান্ত করা যায় নি। ওর ভাই সজিব সেই চেষ্টাই চালিয়ে যাচ্ছে কিন্তু আটকাতে পারছে না। যে কোন ভাবেই হোক নিশি বাবলুকে মারবেই। কয়েকটা থাপ্পড় যে মারে নি তা নয়। বেচারা মাথা নিচ করে দাঁড়িয়ে আছে।
সজিব নিশিকে আটকাতে পারছে না দেখে আমি নিজে এগিয়ে গেলাম৷ নিশির হাত ধরে বললাম,শান্ত হও প্লিজ।
নিশি আবার দিকে তাকিয়ে বলল, শান্ত হব? এই কুত্তারবাচ্চা তোমার গায়ে হাত দিয়েছে আর আমি শান্ত হব! আমি ওকে আজকে মেরেই ফেলবো! এতো বড় সাহস ওর!!
আমি সজিবের দিকে তাকিয়ে বলল, বাবলুকে নিয়ে যাও এখান থেকে।
নিশি এই কথা শোনার সাথে সাথে সাথে বলল, এই সজিব, খবরদার বলছি, ভাল হবে না।
আমি বললাম,নিয়ে যাও তো। আমি দেখছি।
ঐদিনের পর পরিস্থিতি অনেকটাই বদলে গেছে। আগে যেমন নিশিকে দেখলেই আমি পালিয়ে বেড়ানোর চেষ্টা করতাম এখন আর সে কাজ করি না। প্রতিদিন বরং নিশির সাথেই এখন গল্প করি। আমার বাইক ভীতি অনেকটাই কেটে গেছে এখন নিশির কারণেই। এবং নিজেও রাইক চালানো শেখা শুরু করেছি।
কিন্তু এই সব কিছু একজনের কাছে ভাল লাগছিলো না। সেটা হচ্ছে এই বাবলু। আগে আমার প্রায়ই মনে হয় বাবলু নামের ছেলেটা নিশিকে পছন্দ করে কিন্তু ওর ভাইয়ের কারনে নিশিকে কিছু বলতে সাহস পায় না।
আর নিশি যখন আমার সাথে সময় কাটাচ্ছে, হাসছে খেলছে এটা বাবলুর কিছুতেই সহ্য হয় নি।
তিনদিন আগের এক দুপুরে বাবলু আমার পথ আটকালো। তারপর আমাকে পাশের গলির ভেতরে যেতে বলল। আমি প্রথমে মনে করলাম হয়তো নিশিই আমাকে ডাকছে। নিশি না হলেও সম্ভবত সজিব ডাকতে পারে কোন কারনে। যদিও কদিন ধরে ওদের দুজনের সাথেই আমার সম্পর্ক অনেক ভাল হয়ে গেছে। ফোনেই কথা হয়। দরকার হলে এখন ফোনে ফোনেই হয়। এভাবে বাবলুকে দিয়ে ডাকাডাকির দরকার নেই। তবুও মনে হল হতেই পারে৷
কিন্তু গলির ভেতরে কেউ ছিল না। বাবলুর দিকে তাকিয়ে বললাম, কী ব্যাপার এখানে ডাকার মানে কি?
বাবলু আমার দিকে তাকিয়ে হিসহিস করে বলল, বাহ গলার স্বর দেখি বদলাইয়া গেছে!
আমি বললাম, মানে?
বাবলু সেই প্রশ্নের উত্তর দিল না। বলল, শোন তোরে সাবধান কইরা দিতাছি। নিশির কাছ থেইকা দূরে থাকবি।
আমার কেন জানি মজা লাগলো। আগে এদের ব্যাপারে একটা ভয় কাজ করতো, এটা অস্বীকার করবো না কিন্তু এখন সেটা কাজ করছে না। করার মানে নেই কোন।
আমি বললাম, কেন দূরে থাকবো?
বাবলু এবার আমার কলার চেপে ধরলো তারপর বলল, তোগো মত পোলাদের চিনা আছে। নিশিরে সরল সোজা পাইয়া যা ইচ্ছে তাই করবি, সেইটা হইতে দিমু না।
তখনই আমার বুঝতে বাকি রইলো না যে এই ছেলে নির্ঘাত নিশিকে পছন্দ করে। পছন্দ করলে এই কাজ সে করতোই না৷ আমি নিজের কলার ওর কাছ থেকে ছাড়িয়ে নিলাম। তারপর আর কোন কথা না বলে উল্টো পথে হাটা দিলাম। পেছন থেকে বাবলুর হম্ভিদম্ভি শুনতে পাচ্ছিলাম যদিও সেসবে কান দেওয়ার কোন কারন দেখছি না।
আর এই কথাই নিশি কোন ভাবে জেনে ফেলেছে। আমাকে ডেকে নিয়ে এসে আমার সামনেই বাবলুর উপর চড়াও হয়েছে।
সজিব ওদেরকে নিয়ে চলে গেল। আমি তখনও নিশির দুই হাত ধরে রেখেছি। এবার এক হাত ছেড়ে অন্য হাতটা নেড়ে চেড়ে দেখলাম। ডান হাতটা লাল হয়ে গেছে৷ আমি বললাম, এই যে হাত দিয়ে মারলে ওকে ব্যাথা তো তুমি পেয়েছো।
নিশি কোন কথা বলল না। আমি বললাম, এতো রাগ কেন?
-জানি না।
-একটা কথা জিজ্ঞেস করি?
-কী?
-আমাকে এতো পছন্দ করার কারন কি বলতো?
প্রশ্নটা শুনে নিশি কেমন যেন বিভ্রান্ত হয়ে গেল। আমি মনে মনে একটু খুশি হলাম। আপাতত নিশি অন্য কিভহু নিয়ে চিন্তা করুক৷ আমি বললাম, দাড়াও
এই বলে দৌড়ে গিয়ে মোড়ের মাথা থেকে দুইটা আইস্ক্রিম কিনে নিয়ে এলাম। একটা ওকে বাড়িয়ে দিয়ে অন্যটা ওর হাত চেপে ধরলাম। হাতটা সত্যিই লাল হয়ে আছে। নিশ্চয়ই ব্যাথাও করছে। আইসক্রিমের ঠান্ডা ওর হাতের ব্যাথাটা প্রশমিত করবে।
নিশিকেকে শান্ত করতে আরও বেশ খানিকটা সময় লাগলো। পুরোটা সময় আমি কেবল ওর দিকে তাকিয়ে ছিলাম। অন্য কেউ ওকে সামলাতে পারছিলো না, এমন কি সজিবের কথাও ও ঠিক শুনছিলো না অথচ আমার কাছে কতই না সহজে সব মেনে নিল।
রাতের অন্ধকারের দিকে তাকিয়ে নিশি কি যেন ভাবছিলো। আমি ওকে ডাক দিতেই আমার দিকে ফিরে তাকালো। আমি বললাম, একটা কথা জানতে চাইবো?
নিশি বলল, বল
আমাকে পছন্দ কেন হল তোমার বল তো?
নিশি এই প্রশ্নের উত্তর টা সাথে সাথেই দিল না। আবছায়া অন্ধকারে আমি ওর চোখ দেখতে পাচ্ছিলাম। নিশি বলল, আমি জানি না তোমাকে হঠাৎ এরকম পছন্দ কেন হল? ঐদিন যখন তুমি আমার দিকে তাকিয়ে ছিলে, অন্য কেউ ঐভাবে তাকালে তাকে ধরে মাইর দিতাম কিন্তু তোমার দিকে তাকিয়ে আমার কেমন যেন লাগলো, কেমন একটা অদ্ভুদ অনুভূতি হল। এটা আমি বলে বোঝাতে পারবো না ঠিক।
এই কথা গুলো বলেই হঠাৎ নিশি আমার হাত ধরলো। তারপর বলল, জানো তোমার আগেও একটা ছেলেকে আমার মনে ধরেছিল। অনেক আগে তখন স্কুলে পড়তাম।
আমি এই গল্প জানি। সজিব আমাকে নিশির এই প্রথম পছন্দের কথা বলেছে। নিশি তখন স্কুলে পড়ে। ক্লাস নাইনে একটা ছেলেকে ওর পছন্দ হয়। ছেলেটাও ওর সাথে কথা বার্তা বলা শুরু করে। একদিন নিশিকে ছেলেটা ওদের বাসায় নিয়ে যায়। ছেলেটার বাবা মায়ের সাথে পরিচয় করিয়ে দেয়। তারপর নিশি যখন নিজের ফ্যামিলি সম্পর্কে বলে তখন ঘটে আসল ঘটনা। ছেলেটার বাবা গম্ভীর হয়ে যায়। তারপর দিন থেকেই ছেলে আর নিশির সাথে ঠিকঠাক মত কথা বার্তা বলে না, মিশতে চায় না, এড়িয়ে চলে। ওত কোমল মনে একটা বড় রকমের ধাক্কা লাগে।
তারপর থেকেই নিশি খানিকটা বদলে যায়, বাইক চালানো শেখে, এমন করে দস্যিপনা করে বেড়ায়।
আমি ওর হাতটা আরও একটু ভাল করে ধরে বললাম পুরাতন কথা মনে করে লাভ নেই। কে তোমার জীবনে ছিল, এই প্রশ্নের থেকেও বড় কথা এখন কে আছে?
নিশি হাসলো আমার কথা শুনো। খুশি হওয়ার হাসি।
নিশিকে তারপর ওর বাসায় পৌছে দিতে গেলাম। ওদের বাসার কাছে সব সময় মানুষজনের ভীড় লেগেই থাকে। এমন কি এই রাতের বেলাতেই। গেটের কাছে আসতেই দেখতে পেলাম স্বয়ং রাজিব কমিশনার দাঁড়িয়ে কিছু মানুষের সাথে কথা বলছে। আমাদের দেখতে পেয়ে একটু থমকে দাঁড়ালো তারপর লোকগুলিকে বিদার করে দিয়ে আমাদের দিকে তাকালো। নিশিকে বলল, এভাবে মাথা গরম করা কি ঠিক হয়েছে তোর?
নিশি বিন্দুমাত্র বিচলিত না হয়ে বলল, কেন আমি মেয়ে বলে রাগ করা কিংবা রাগ প্রকাশ করা যাবে না, তুমি করলে ঠিক ছিল?
-এর ভেতরে ছেলে মেয়ে কোথা থেকে আসলো?
-যেখানে থেকে আসার কথা সেখান থেকেই এসেছে।
এরপর কমিশনার সাহেব আমার দিকে তাকিয়ে বলল, এই ছেলে তুমিই বল দেখি ঐভাবে রাগ করা ঠিক হয়েছে ওর?
আমি কিছু বলতে যাবো তার আগেই নিশি বলল, ওকে কেন কিছু জিজ্ঞেস করছো? তোমার ঐ গুনধর চামচাকে আমার চোখের সামনে থেকে দূরে থাকতে বল। সে যা করেছে তার জন্য ঐ শাস্তিটুকু অনেক কম হয়ে গেছে। আজকে অপু না থাকলে ওকে মাটির নিচে কবর দিয়ে দিতাম।
এই লাইন গুলো বলে নিশি বাসার দিকে হাটা দিল। আমি আর কমিশনার সাহেব দুইজনেই ওর চলে যাওয়ার দিকে তাকিয়ে রইলাম কিছুটা সময়। কমিশনার সাহেবের চেহারার দিকে তাকিয়ে মনে হল বেচারা খানিকটা অসহায় বোধ করছে। খানিকটা বিব্রতবোধ করছে। যে মানুষটাকে এলাকার সব মানুষ ভয় পায় তাকে তার পিচ্চি বোন একদম পাত্তাই দেয় না, ব্যাপারটা তার জন্য খানিকটা বিব্রতকরই বটে৷
হঠাৎ কমিশনার সাহেব বলল, দেখেছো তো?
আমি প্রথমে ঠিক বুঝতে পারলাম না কমিশনার আসলে কি বলতে চাইছে। তাই বললাম, জি ভাইয়া, কী বললেন?
কমিশনার একটু হাসলেন। তারপর আমার কাধে হাত রাখলেন। বললেন, তোমাকে আমার পছন্দ হয়েছে। দয়া করে এমন কোন কাজ কর না যাতে আমার বোনটা কষ্ট পায়।
কন্ঠে যদিও আন্তরিকতার কোন কমতি ছিল না, তবুও আমার বুঝতে কষ্ট হল না যে নিশি কে কোন ভাবেই কষ্ট দিতে মানা করা হচ্ছে। কষ্ট দিলে আমার খবর আছে।
আমি বাড়ির দিকে রওয়ানা দিলাম। মনের ভেতরর তখন বেশ আনন্দ কাজ করছে। কেন করছে সেটা ঠিক বুঝতে পারছি না। বাসার কাছ আসতেই একটা ছায়া মূর্তি হঠাৎ করে আমার সামনে হাজির হল। আমি চমকে উঠলাম তবে সামলে নিতেও সময় লাগলো না। তাকিয়ে দেখি ছায়া মুর্তিটা আর কেউ নয় বাবলু। আমার দিকে অগ্নি দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে। আমি বললাম, কী ব্যাপার?
বাবলু বলল, কামডা তুই ভাল করিস নাই।
আমি বললাম, আমাকে তোমার ধন্যবাদ দেওয়া উচিৎ। নিশিকে যদি আমি না থামাতাম আজকে তোমার কী অবস্থা হত ভেবে দেখেছো?
বাবলু অগ্নি চোখেই তাকিয়ে রইলো। তারপর বলল, তোদের দুইজনরেই আমি দেখে নিমু। আমারে চিনোস না !
প্রথমে হয়তো একটু চমকে গিয়েছিলাম তবে বাবলুর দৌড় আমার জানা আছে। তাই আর কিছু মনে করলাম না । বললাম, আজকে আমি না থাকলে তোমার কী অবস্থা হত মনে আছে? মনে না থাকলে মনে করার চেষ্টা কর ! আর শুকরিয়া আদায় করতে শেখো !
বাবলু আমার দিকে তাকিয়ে রইলো আরও কিছুটা সময় । ওর চোখের দিকে তাইয়ে সত্যিই আমার কেন জানি মনে হল এই ছেলে সত্যিই কোন অঘটন ঘটিয়ে ফেলতে পারে । জীবনে হয়তো এমন অপমানিত হয়তো হয়নি কোন দিন । যে এলাকাতে যে বাঘের মত ঘুরে বেড়িয়েছে সেই এলাকাতেই সে একটা মেয়েরা হাতে মাইর খেয়েছে, যতই হোক সে কমিশোনারের বোন তবুও তো একটা মেয়ে! এই অপমান সহ্য করা খানিকটা কষ্টের ওর জন্য । তবে এখন আর কিছু বলল না । আমার সামনে থেকে চলে গেল। আমি বাসার ভেতরে ঢুকে পড়লাম ।
সাত
কয়েকদিন পরে ঘটলো আরেক ঘটনা । ইরা যে ফিরে এসেছে সেটা আমার জানা ছিল না । ক্যাম্পাসে যাওয়ার জন্য বাইরে বের হয়েছি দেখি ইরা ঠিক আগের মতই দাড়িয়ে আছে । আমার দিকে তাকিয়ে এমন ভাবে হাসলো যেন কিছুই হয় নি । তারপর বলল, অপু ভাইয়া ক্যাম্পাসে যাবেন ?
-হ্যা !
-চলুন এক সাথে যাই !
আমার মোটেও ইরার সাথে একই রিক্সাতে ওঠার কোন ইচ্ছে নেই আর আমি যদি ইরার সাথে এক রিক্সায় উঠি তাহলে এই কথা ঠিক ঠিক নিশির কানে চলে যাবে । আর তখন আমার সত্যি সত্যিই খবর আছে । আমি মনে মনে ঠিক করতেছি ইরাকে কী বলে মানা করবো ঠিক সেই সময়েই আমাকে রক্ষা করার জন্য আমার বাইকার কন্যা আমার সামনে এসে হাজির !
বাইকটা থামলো ঠিক আমাদের সামনেই । নিশি সাধারনত হেটমেট পরে না, কিন্তু আজকে দেখলাম একেবারে আটসাট বাইকের পোশাক পরে এসেছে । কালো রংয়ের লেদার প্যান্টের সাথে পরেছে লেদার জ্যাকেট । হাতে কালো গ্লোভস । নিশিকে দেখে ইরা কেমন যেন দমে গেল । বাইক থেকে নেমে নিশি আমার সামনে এসে দাড়ালো । তারপর মাথা থেকে হেমলেট টা খুলল । আমি উপরওয়ালাকে ধন্যবাদ দিলাম । যাক একটা বড় ঝামেলা থেকে বেঁচে গেছি !
নিশি এবার ইরার দিকে তাকিয়ে বলল, কি ব্যাপার ইরা কেমন আছো ?
-ভাল আছি আপু । আপনি ভাল আছেন ?
-হ্যা ভাল আছি ! তা তোমার ইঞ্জিনিয়ার জামাই কেমন আছে ?
ইরার মুখ এবার কেমন যেন কালো হয়ে এল । নিশির কন্ঠে একটু বিদ্রুত ছিল । সেটা পরিস্কার বুঝতে পারছিলাম । নিশি এবার ইরার দিকে তাকিয়ে বলল, রিক্সায় উঠবে নিজের জামাইকে নিয়ে ! অন্যের বয়ফ্রেন্ডকে নিয়ে না ! বুঝতে পেরেছো ?
-জি আপু !
আমি দাড়িয়ে দাড়িয়ে নিশিকে দেখতে থাকি । মেয়েটা দিন দিন আমার ব্যাপারে এতোএগ্রিসিভ হয়ে যাচ্ছে ! ব্যাপারটা আমাকে খানিকটা ভিত করে তুলছে । এর পরবর্তিতে ও ঠিক কী করবে কে জানে ! আর ওখানে বেশি কথা হল না । নিশি এরই মাঝে আমার সাথে একটা কথাও বলে নি । ও আবার বাইকে গিয়ে বসলো । বাইক স্টার্ট দিল । আমি ঠিক ওর পেছনে গিয়ে উঠলাম । ইরার দিকে শেষ বারের মত তাকিয়ে দেখি ও মুখ হা করে তাকিয়ে আছে আমাদের দিকে । ওকে খানিকটা অবাক চোখে তাকিয়ে আছে । আসলে ও চলে যাওয়ার পরে যে আমি নিশির কাছাকাছি চলে এসেছি এই ব্যাপারটা ওর জানা নেই । আমি যখন নিশির বাইকের পেছনে উঠলাম তখন ও ভাবতেও পারে নি এমন কিছু হবে ।
ইরার মুখটা খোলা রেখেই আমরা সেখানে থেকে রওয়ানা দিলাম । বলাই বাহুল্য যে সেদিন আর আর ক্লাসে যাওয়া হল না । কোথায় গিয়ে হাজির হলার আর কি কাজ কর্ম করলাম সেসব সবার না জানলেও চলবে !
এভাবেই আমাদের দিন কেটে যেতে লাগলো । মনে হতে লাগলো যে সময় কত চমৎকার ভাবেই না কেটে যাচ্ছে । সামনের দিন গুলোও বুঝি এতো চমৎকার ভাবে কাটবে । কিন্তু আমাদের কপালে অন্য কিছু লেখা ছিল । অন্তত আমি কোন দি ভাবি নি এরকম একটা ঘটনা ঘটতে পারে আমার চোখের সামনে । আমি তাতে যুক্ত থাকবো !
সেদিন সকাল থেকেই বৃষ্টি পড়ছিলো । বর্ষাকালে এরকম দিনের পরদিন বৃষ্টি হয়ই । তখন বাসায় বসে থাকা ছাড়া আর কোন কাজ থাকে না । আমি সকাল থেকে বাসাতেই শুয়ে বসে দিন কাটাচ্ছিলো । এমন সময় নিশির ফোন । এখনই বাইরে বের হয়ে আসতে হবে । ফোনটা যেন বাসাতেই রেখে আসা হয় । কারন মহারানীর ইচ্ছে হয়েছে তিনি আমার সাথে বৃষ্টিতে ভিজবেন । ইচ্ছে যখন হয়েছে সেটা তো পূরন করতেই হবে । কোন উপায় নি ।
বাবা মায়ের চোখ ফাঁকি দিয়ে বাসার বাইরে বের হয়ে এলাম । নিশি আমার বাসার ঠিক সামনেই দাড়িয়ে দিল । আমি প্রথমে কিছুটা সময় কেবল চুপ করে তাকিয়ে রইলাম নিশির দিকে । পুরো এলাকাটা টুকু নিতব্ধ হয়ে আছে । সারাদিন বৃষ্টি হওয়ার কারনে আজকে দোকান পাট গুলো একটু সকাল সকালই বন্ধ হয়ে গেছে । সেই নিতব্ধ বৃষ্টির ভেতরে নিশি ছাতা নিয়ে দাড়িয়ে আছে !
আমি ছাতা নিয়ে বের হয় নি । একবার মনে হল আরেকবার দৌড় দিয়ে ছাতা একটা নিয়ে আসবো কি না তখনই দেখলাম নিশি এগিয়ে এল আমার দিকে । আমাকে বলল, ছাতার নিচে এসো !
আমি কথা না বাড়িয়ে ওর ছাতার নিচে চলে এলাম । তারপর আমরা হাটতে শুরু করলাম । পুরো এলাকাটা কেমন যেন নির্জন মনে হল । হাউজিং টা ছাড়িয়ে আসতেই একেবারে নিস্তব্ধ হয়ে এল সব । হাউজিং এলাকাতে বাড়িঘর থেকে আলো আসছিলো কিন্তু এই এলাকাতে বাজার আর দোকানপাট যার সবই এখন বন্ধ । কেমন শুনশান নিরবতা । আমরা দুজন ঠিক রাস্তার মাঝখান দিয়ে হাটছি । আশে পাশে কেউ নেই ।
হঠাৎ নিশি ছাতাটা নামিয়ে আনলো । এক পশলা বৃষ্টি আমাদের দুজনকেই ভিজিয়ে দিল । আমি কিছু বলতে গিয়েও বললাম না । নিশি ততক্ষনে ছাতাটা রাস্তার উপর ফেলে দিয়েছে । আর আমার সামনে এসে দাড়িয়েছে । আমি আবছায়া অন্ধকারে ওর চোখে ঘোলা দৃষ্টি দেখতে পেলাম । বুঝতে পারছিলাম ও আসলে কি চাচ্ছে ।
চারিপাশে শুনশান নিরবতা । কাউকে দেখা যাচ্ছে না । একটা গ্যারেজের পাশে একটা মাইক্রবাস দাড়িয়ে আছে কেবল । এদিকে একটা রিক্সা দাড় করানো । আমি আবারও নিশির চোখের দিকে তাকাই । সত্যিই সত্যিই বুকের ভেতরে একটা আলাদা কাঁপন অনুভব করি । মেয়েটার ঠোঁট আস্তে আস্তে এগিয়ে আসছে ।
আমি চোখ বন্ধ করতে যাবো ঠিক তখনই আমি অস্বস্তিটা টের পেলাম । কেবল আমিই না, আমার মনে হল নিশি নিজেও টের পেয়েছে। আমাদের দুজনের এবার চোখাচোখি হল । চোখেই আমি ওকে বললাম যে কেউ সম্ভবত আমাদের দেখছে । আমাদের মনের কথা মনেই রয়ে গেল একটা আলো এসে আমার শরীরের উপর পড়লো । তারপর ইঞ্জিন চালু হওয়ার আওয়াজ !
গ্যারেজের সামনে দাড়িয়ে থাকা মাইক্রবাসটা চলতে শুরু করেছে । মুহুর্তের ভেতরে ওটা আমাদের কাছে চলে এল । আমরা কিছু বুঝে ওঠার আগেই দেখতে পেলাম ওরার পাশের দরজা খুলে গেল । নিশিকে টেনে নিল ভেতরে !
কয়েক সেকেন্ড লাগলো পুরো ঘটনা ঘটতে । আমি কেবল অবাক হয়ে তাকিয়ে রইলাম । কেবল দেখতে পেলাম নিশিকে মাইক্রবাসের ভেতরে নিয়ে যাচ্ছে আর দরজাটা বন্ধ হয়ে যাচ্ছে ।
আমি আর কিছু চিন্তা না করে দরজা বরাবর ঝাপ দিল । একবার মনে হল হয়তো আমি দরজাটা ধরতে পারবো না তবে শেষ পর্যন্ত ধরতে পারলাম । দরজাটা বন্ধ হতে দিলাম না । আমি জানি না আমার ভেততে এতো শক্তি কোথা থেকে এল । আমার কেবল মনে হতে লাগলো যে নিশিকে কোন ভাবেই নিয়ে যেতে দিবো না ।
মাইক্রবাসটা তখন চলতে শুরু করেছে । আমি দরজায় পা দিয়ে উঠে পড়েছি । ভেতরে থেকে একজন আমাকে ঠেলে ফেলার চেষ্টা করছে । আর দুজন নিশিকে সামলাতে চেষ্টা করছে । একজনকে আমি ঠিক ঠিক চিনতে পারলাম ।
বাবলু ! সেই আমাকে ঠেলে ফেলার চেষ্টা করছে ।
অন্য দুজন মানুষ নিশিকে ধরে রাখার চেষ্টা করছে । আমি গেট থেকে হাত কোন মতে ভেতরে নিচে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছি কিন্তু পারছি না । বুঝতে পারছি খুব বেশি সময় ধরে থাকতে পারবো না । বাবলু ঠিকই আমাকে ঠেলে ফেলে দেবে তারপর দরজাটা বন্ধ করে দেবে । আর একবার দরজা বন্ধ হয়ে গেলে নিশিকে ওরা নিয়ে যাবেই । তখনই আমার মাথায় একটা বুদ্ধি এল। আমি কোন মতে মাইক্রোর দরজাতে পা দিয়ে দাড়িয়ে একটু ব্যালেন্স করার চেষ্টা করলাম । তারপর আমি দুই হাতের এক হাত ছেড়ে দিলাম !
বাবলু এটার জন্য ঠিক প্রস্তুত ছিল না । ছাড় হাত দিতেই বাবলুর মুখ বরাবুর একটা জোড়ে ঘুসি চালালাম । তারপর অন্য হাতটাও মাইক্রির দরজা ছেড়ে দিয়ে নিশির কোমর জড়িয়ে ধরলাম দুইহাত দিয়ে ! এরপর নিজেকে গাড়ি থেকে বের হয়ে দিলাম ! নিশি সহ আমি গাড়ি থেকে পড়ে যেতে শুরু করলাম ।
এটার জন্য ওরা কেউই ঠিক প্রস্তুত ছিল না । দুজন মিলে নিশির হাত ধরে রাখার চেষ্টা করলো তবে যখন বুঝলো আমাদের দুজনকে কোন ভাবেই ধরে রাখতে পারবে না আর আমি নিশিকে ছাড়বো না তখন ওরা নিশির হাত ছেড়ে দিতে বাধ্য হল ।
যখন পাকা রাস্তার উপর পড়লাম মনে হল যেন মাথাটার সাথে একটা আস্তো ইটের ঢাক্কা খেলো । শরীরের ধাক্কার কথাটা নাই বললাম। আমার সেই ছোট বেলার মামার সাথে বাইক এক্সিডেন্টের কথা মনে পড়লো । পুরো মাথাটা ঝিম করে উঠলো । প্রথম কিছু সময় আমি কোন ব্যাথা অনুভব করলাম না । কিন্তু তারপর পরই যেন সব ব্যাথা এক সাথে ধাক্কা মারলো আমাকে !তবে নিশি পুরোপুরি আমার শরীরের উপরেই পরেছে তাই ওর কোন ক্ষতি হওয়ার কথা না !
নিশি সাথে সাথেই উঠে দাড়ালো । আমার দিকে তাকিয়ে বলল, এই অপু এই অপু !
কোন মতে বললাম, হুম !
-ঠিক আছো তুমি ?
আমার মাথায় তখন চিন্তা বাবলু আবার যদি ফিরে আসে ? এবার তো আমার বাঁধা দেওয়ার কোন উপায় নেই । মাথায় খুব জোরে আঘাত লেগেছে রাস্তার উপর পরার সময় !
আমি বললাম, ওরা কি ফিরে আসছে !
নিশি আমার মুখের উপর ঝুকে এল । তারপর বলল, নাহ।
মনে একটু শান্তি লাগলো । যাক আপাতত নিশি নিরাপদ । আমার আর কিছু মনে নেই । সম্ভবত তখনই চেতনা হারালাম !
যখন চোখ খুললাম তাকিয়ে দেখি একটা ঘরে শুয়ে আছি । প্রথমেই চোখ গেল নিশির উপর । চোখ ভর্তি অশ্রু নিয়ে আমার দিকে তাকিয়ে আছে । আরও কয়েকটা পরিচিত মুখ দেখতে পেলাম । সজিবও আছে দেখা যাচ্ছে তবে বাবা মাকে দেখলাম না । সম্ভবত তাদের খবর দেওয়া হয় নি । আমাকে হাসপাতালেও নেওয়া হয় নি । আমি সম্ভবত নিশির ঘরে শুয়ে আছি !
নিশিই প্রথম বলে উঠলো, এখন কেমন লাগছে ?
-ভাল ! কতক্ষন অজ্ঞান ছিলাম ।
নিশি বলল, বেশি না ঘন্টা খানেক । ভয় পেয়ে গিয়েছিলাম আমি !
এই বলে আমাকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরেই হুহু করে কেঁদে উঠলো । ঘরে ওর যে আরও কেউ রয়েছে সেটা যেন ও ভুলেই গেছে । আমাকে জড়িয়ে থাকা অবস্থায় নিশি বলল
-সজিব, তুই এখনই যাবি, আমি কোন কিছু শুনতে চাই না ঐ বাবলুকে আমি আমার সামনে চাই । চাই মানে চাই । না হলে এই বাড়ি আমি আগুন ধরিয়ে দেব !
সজিব বলল, সেটা আমি দেখছি । বাবলুর এতো বড় সাহস হবে ভাবি নি । এবার ওর সত্যিই একটা ধফারফা হবে !
নিশি আমাকে জড়িয়েই ধরে রাখলো । আস্তে আস্তে ঘর দেখলাম ফাঁকা হয়ে গেল । নিশির কান্নার আওয়াজ যেন তখন বাড়তে লাগলো! ফোঁফাতে ফোঁফাতেই বলল, ওভাবে কেউ ঝাঁপিয়ে পড়ে ? যদি কিছু হয়ে যেত !
আমি বললাম, যদি তোমাকে নিয়ে যেতো ওরা ?
-নিয়ে গেলে যেত তাতে কি ?
-আমি থাকতে তোমার কিছু হতে দিবো না !
-ইস ! আসছে আমার নায়ক অনন্ত জলীল !
এই বলে নিশি যেন আরও একটু শক্ত করে জড়িয়ে ধরলো আমাকে ! রাতে ওভাবেই যে কখন ঘুমিয়ে পড়লাম জানি না !
পরিশিষ্টঃ
ঠিক এক সপ্তাহের ভেতরে নিশির সাথে আমার আকদ হয়ে গেল । বাবা কিভাবে রাজি হল সেটা আমি বলতে পারবো না তবে তিনি রাজি হয়েছেন এটাই আমি কেবল জানি না । নিশির বড় ভাই কিভাবে সেটা সামলেছে সেটা সেই জানে । আমি বলেছিলাম আর কিছুদিন পরে বিয়ে শাদীর দিকে এগুলে হবে এতো জলদি কি কিন্তু নিশিকে কিছুতেই বোঝানো যায় নি । ঐদিনের ঘটনার পরে সে নাকি একটা দিনও আমাকে ছাড়া থাকতে পারবে এটাই হচ্ছে তার কথা । এখন যদি বিয়ে নাও হয় তবুও নাকি সে আমার কাছে এসেই থাকবে !
বাবলুকে আর খুজে পাওয়া যায় নি। সে যে কোথায় গেছে কে জানে । তবে একদিন না একদিন তাকে ঠিকই খুজে পাওয়া যাবে । আমি জানি সেদিনই নিশি বাবলুর খবর খারাপ করে ছাড়বে ! আপাতত সে আমাকে নিয়ে ব্যস্ত । আমিও অবশ্য তাকে নিয়েই ব্যস্ত এখন !
সমাপ্ত


একবার ভালোবাসায় হোঁচট খেয়ে নিশি যেভাবে নিজের উপর বিশ্বাস হারিয়েছিল, অপুকে দিয়ে আপনি আবার সেই নিজের উপর বিশ্বাস টুকু ফিরিয়ে দিয়েছেন।
…
গল্পে নিশিকে এমনভাবে এঁকেছেন যে- মেয়েটাকে ভালো না লেগে উপায় নেই। দাপট আছে, রাগ আছে, কিন্তু ভেতরে একটা পুরোনো ক্ষত আছে। আর সেই ক্ষত বাইক চালিয়ে, গলা উঁচিয়ে ঢেকে রেখেছে এতদিন। আর অপু সেই ক্ষত ঢাকা চাদরটা সরিয়ে দিল একদম অজান্তেই, কিছু না করেই!
বৃষ্টির রাতের সেই দৃশ্যটা আর মাইক্রোবাস থেকে ঝাঁপ দেওয়ার মুহূর্তটা- গল্পের সেরা দুটো জায়গা। পড়তে গিয়ে দুটো জায়গাতেই টানটান উত্তেজনা কাজ করেছে। একটায় নিঃশব্দে অনেক কিছু বলা হয়েছে, অন্যটায় কোনো কথা না বলেই সব বলা হয়ে গেছে।
শেষটুকু একটু তাড়াহুড়োর মনে হয়েছে, আরেকটু সময় নিলে আরও জমতো। তবে “ইস! আসছে আমার নায়ক অনন্ত জলীল!” -এই একটি লাইনেই নিশির মনের আনন্দটুকু পুরোপুরি ফুটে উঠেছে!
…
লোভী পাঠক, নতুন গল্পের অপেক্ষায় রইলাম!