সুখ সমাপ্তি

5
(25)

অফিসের শাহেদ শরীফকে কেউ পছন্দ করে না। মৌ নিজেও সেই না-পছন্দ করার দলে। অফিসে যে কর্মী সব থেকে বেশি দক্ষ এবং বসদের সুনজরে থাকে সেই কর্মীকে কেউ ঠিক পছন্দ করে না। তার উপরে শাহেদ আবার অফিসের ঠিক কারো সাথে মেশে না। সে থাকে নিজের মত। অফিসে আসে, মন দিয়ে কাজ করে, কারো সাথেও নেই, পাঁচেও নেই। তাকে অফিসের অনেকেই কানাঘোষা করে বটে তবে শাহেদের সেদিকে খেয়াল নেই। সে নিজের মত করেই কাজ করে চলেছে। এই কারণে তাকে অফিসের কেউ ঠিক পছন্দ করে না। মৌও শাহেদকে ঠিক পছন্দ করে না। তাকে পছন্দ করার কোন কারণ নেই।
কিন্তু পরবর্তী প্রজক্টে মৌকে শাহেদের সাথে যুক্ত করে দেওয়া হল। মৌ কয়েকজনকে ধরল বটে তবে কাজ হল না কোন। কারণ প্রজেক্টটা এসাইন করেছে জেনারেল ম্যানেজার সাহেব। তাই তাকে মানা করার কোন উপায় নেই। এমন হলে দেখা যাবে বার্ষিক মূল্যায়নে মৌ-এর অবস্থা খারাপ হতে পারে। তাই বাধ্য হয়েই সে রাজি হয়ে গেল।

প্রোজেক্ট শুরুর কয়েকদিনে শাহেদ ওর কাজে ভুল ধরতেই থাকল। প্রতিটা ব্যাপারেই ভুল বের করতে থাকল। কিন্তু দুইদিন পার হতেই মৌ একটা ব্যাপার বুঝতে পারল যে শাহেদ ওর ভুল বের করছে ঠিকই তবে তার উপর বিরক্ত হচ্ছে না। প্রবল ধৈর্য্য নিয়ে মৌকে ব্যাপারটা বোঝাচ্ছে বা কিভাবে কাজটা করতে হবে সেটা বলে দিচ্ছে। অফিসের কেউ যে শাহেদকে ঠিক পছন্দ করে না, এটা শাহেদ নিজেও জানে। তাদের মৌও যে আছে সেটাও জানে। তাহলে যখন শাহেদ সুযোগ পেয়েছে তখন চাইলেই মৌকে এক হাত দেখে নিতে পারত তবে সেটা সে করে নি। করছে না। এই ব্যাপারটা মৌকে অবাকই করল।
পরের কয়েকদিন মিলে ওরা ভালই কাজ করে চলল। কাজ বললে বেশির ভাগ কাজ শাহেদই করল। মৌ তাকে সাহায্য করল বটে তবে মৌ ভাল করেই জানে যে সে না থাকলেও শাহেদ একাই এই কাজগুলো সামলে নিতে পারত। শাহেদের সাথে কাজ করতে গিয়েই মৌ আসলে বুঝতে পারল যে বসরা কেন শাহেদকে পছন্দ করে। সে আসলে পরিশ্রমী।
সেদিন মৌ অফিসে এসে দেখল সে শাহেদ নিজের ডেস্কের উপরে ঘুমাচ্ছে। পুরো ব্যাপারটা বুঝতে তার কিছুটা সময় লাগল। শাহেদ পুরো রাতেই এখানে ছিল। আজকেই প্রোজেক্টের প্রেজেন্টেশন দেওয়ার দিন। কাল একটু কাজ তখনও বাকি ছিল। মৌ যখন বাসায় যাওয়ার জন্য আকুপাকু করছিল, তখন শাহেদ হেসে বলেছিল যে সে চলে যেতে পারে। বাকি যে কাজটুকু আছে সেটা সে সামলে নিবে। কাল একটু সকাল সকাল এলেই চলবে। আজকে তাই একটু আগে আগে এসেছে। কিন্তু এসে দেখতে পেল এই কাণ্ড। একটু লজ্জাই লাগল।
শাহেদকে ডাক দিতেই শাহেদ জেগে উঠল। তারপর ওর দিকে তাকিয়ে একটু হাসল বোকার মত। একটু যেন ধাতস্ত হল। তারপর বলল, আরে চলে এসেছেন!
-আপনি রাতে বাসায় যান নি?
-একটু কাজ বাকি ছিল। সেটা করতে গিয়েই দেরি হয়ে গেল!
মৌ-এর আবারও লজ্জা লাগল। তারপর বলল, সরি আসলে। আমাকে নেওয়াই ঠিক হয় নি। কাজের কাজ কিছুই পারি না, তাই না?
শাহেদ হেসে বলল, আরে কী যে বলেন। আপনি দারুন কাজ করেছেন। এখন একটা কাজ করুন। পুরো প্রেজেন্টেশনটা আরেকবার ভাল করে চেক করুন। কোন ভুল যেন না থাকে। আমি যদিও চেক করেছি তবে মনে হচ্ছে কোন ভুল থাকলেও থাকতে পারে। আপনি আরেকবার দেখুন। আমি একটু ফ্রেশ হয়ে আসি।
মৌ খুব ভাল করে জানে যে এই কাজে আসলে কোন ভুল থাকবে না। তবুও তাই চেক করতে বসল। যা ভেবেছিল তাই হল। এখানে আসলেই কোন ভুল ছিল না। থাকার কথা না।

প্রেজেন্টেশন খুবই ভাল হল। ক্লায়েন্টের পুরো ব্যাপারটা এতোই সে জানালো যে এরপর থেকে যত কাজই তারা করবে সব তাদেরকে দিয়েই করাবে। এমডি সাহেব বেশ প্রসন্ন হলেন দুজনের উপরে। তাদের নিজের কেবিনে ডেকে জানালেন যে তাদের আলাদা বোনাক দেওয়া হবে। সামনের মাস থেকে বেতনও বাড়বে। মৌ একটু সংকুচিত হয়ে বলল, স্যার আসলে সব ক্রেডিট শাহেদ সাহেবরই। আমি যৎসামান্য কাজ করেছি।
শাহেদ সাথে সাথে বলল, না না আমরা দুজন মিলেই পরিশ্রম করেছি। আসলে দুজন ছাড়া এই কাজটা শেষ করা সম্ভব হত না।

দুই
মৌ যেমনটা ভেবেছিল তেমনই হল। শাহেদ বলল, আসলে… এখন তো কাজের সময়।
মৌ বলল, আপাতত কোন কাজ নেই। আমি স্যারকে বলেছি। চলুন।
-না মানে?
-কোনো মানে নেই। আপনাকে ট্রিট নিতেই হবে। খুব দুরে যাবো না। এই বসুন্ধরাতে চলুন। প্লিজ চলুন। প্লিজ!

এক সময়ে শাহেদ রাজি হল। তারা দুজন মিলে লাঞ্চের সময়ে বসুন্ধরার আটতলায় গিয়ে হাজির হল। কফি খেতে খেতে টুকটাক কথা বলতে লাগল। মৌ খেয়াল করল যে শাহেদ তুলনা মূলক ভাবে শাই নেচারের মানুষ। আরও কিছু বলতে যাচ্ছিল ঠিক সেই সময়ে একটা মেয়ে তাদের সামনে এসে দাঁড়াল। তারপর একবার মৌ-এর দিকে আরেকবার শাহেদের দিকে তাকিয়ে রইলো। মেয়েটার মুখটা একটু হাসিহাসি। সে তারপর শাহেদের দিকে তাকিয়ে সে বলল, কী ব্যাপার, অফিস টাইমে এইখানে?
শাহেদ বলল, তুই এখানে কী করিস?
-প্রশ্ন আমি আগে করেছি। তুমি অফিস আওয়ারে এখানে বসে গার্লফ্রেন্ডের সাথে কফি খাচ্ছো! আজকে সূর্য কোন দিকে উঠল!
গার্লফ্রেন্ড শব্দটা শুনতেই মৌ-এর মুখটা লাল হয়ে গেল। তীব্র একট অস্বস্তি এসে জড় হল মনের ভেতরে। শাহেস দ্রুতই বলল, সর্মি মাইর খাবি। যা ভাগ এখান থেকে। ও আমার কলিগ।
সর্মি নামের মেয়েটা কিছু সময় আবারও তাকাল দুজনের দিকে। মৌ তাকাল সর্মির দিকে। মেয়েটা দেখতে বেশ ভালই। মুখের ভেতরে একটা সুশ্রী ভাব রয়েছে। তবে পরনের পোশাক পরিচ্ছেদও বেশ ভাল। আড়ং কুর্তা আর জিন্স পরা রয়েছে। হাতে একটা একটা আইফোন দেখা যাচ্ছে। মেয়েটা কে হতে পারে?
শাহেদ এবার মৌ-এর দিকে তাকিয়ে বলল, প্লিজ ওর কথায় কিছু মনে করবেন না। ও আমার ছোট বোন।
মৌ একটু অবাক হল। বিশেষ সর্মির পোশাক দেখে কেন জানি শাহেদের সাথে মিলছে না। শাহেদ খুবই সাধারণ ভাবে। দামী কোনো পোশাক সে পরে না কোনো দিনই। কিন্তু তার বোনের পরনের পোশাকগুলো বেশ দামী। এছাড়া হাতের ফোনটার দাম লাখ টাকার কাছাকাছি।
শাহেদ তার বোন সর্মির দিকে তাকিয়ে বলল, এখানে কী করছিস তুই, ক্লাস নেই?
-আজকে নেই আর। তাই এখানে এসেছি। মুভি দেখব। সবাই তো আর তোর মত রোবট না।
-আচ্ছা যা ভাগ।
-এক হাজার টাকা দাও।

শাহেদ কিছু না বলে মানিব্যাগ থেকে বের করে দুইটা এক হাজার নোট দিল। সেটা নিয়ে সর্মি এক লাফে চলে গেল। যাওয়ার আগে মৌ-এর দিকে তাকিয়ে একটু হেসে বলল, যাই আপু। আপনার সাথে একটু ইয়ার্কি মারলাম। আমার ভাইয়ের কোন গার্লফ্রেন্ড নাই এটা আমি খুব ভাল করেই জানি। ও পটাবে মেয়ে! যাই কেমন!

মৌ একটু হাসল কেবল! সে দেখল সর্মি চলে যাচ্ছে। সর্মি চলে যেতেই শাহেদ বলল, আপনি কিছু মনে করবেন না। কেমন!
মৌ হাসল। তারপর বলল, আরে কিছু মনে করি নি। আপনারা কয় ভাইবোন?
-আমরা দুই ভাইবোন।
-আর বাসায় কে কে আছে?
-এই তো আমরা দুজন আর বাসায় মা আছে।
-বাবা!
-বাবা নেই। অনেক আগে মারা গেছেন!
-ওহ সরি। আসলে আমি জানতাম না।
-না ঠিক আছে। অনেক দিন আগের কথা।
মৌ বলল, আপনি কি তাহলে এখন ওদের দেখা শোনা করেন?
-আর কে করবে বলুন। আর কেউ নেই আমাদের। মামারা প্রথম প্রথম কিছু একটু সাহায্য করতেন। তবে তাদেরও পরিবার রয়েছে। তারপর থেকে আমরা আমরাই।
মৌ তাকিয়ে রইলো শাহেদের দিকে। তার মনের ভেতরে কিছু প্রশ্ন তখনও কাজ করছে। তবে সে মুখে কিছুই বলল না। সেদিনের মত কফি খেয়ে তারা আবারও অফিসে ফেরত গেল।

এরপর থেকে শাহেদের সাথে মৌ-এর সম্পর্ক একটু একটু উন্নতি হতে থাকল। যদিও শাহেদ নিজেকে একটু আটকেই রেখেছিল। তবে একদিন এমন একটা ঘটনা ঘটল যে মৌ-এর মনের অনেক প্রশ্নের জবাবই পেয়ে গেল। এবং সেটা পেল শাহেদের ছোটবোন সর্মির কাছ থেকে।
সর্মির সাথে মৌ-এর দেখা হল ওদের বিশ্ববিদ্যালয়ে। মৌ গিয়েছিল পুরানো বন্ধুদের সাথে আড্ডা দিতে। আড্ডা শেষ করে যখন ফিরে আসবে তখন সর্মিকে দেখতে পেল। সে মাঠে বসে আছে তার কিছু বন্ধু বান্ধবদের সাথে। কী মনে হল সে পায়ে পায়ে এগিয়ে গেল সর্মির দিকে। সর্মি ওকে দেখা মাত্রই চিনতে পারল তারপর উঠে এল ওর দিকে। বলল, আরে আপু আপনি এখানে?
-এটা আমার ক্যাম্পাস!
-আরে তাই নাকি! জেনে ভাল লাগল। খুব।
-তুমি কি ক্লাসের পরে এখানেই থাকো বেশির ভাগ সময়?
-আড্ডা দিই সময় পেলে। একটা টিউশনি করি ……
বলেই জিহব্বায় কামড় দিল। তারপর বলল, আপু খবরদার ভাইয়া যেন না জানে যে আমি টিউশনি করি!
মৌ একটু অবাক হল। তারপর বলল, কেন এটা তো অন্যায় না। জানলে কী সমস্যা?
সর্মি একটু চুপ থেকে বলল, আসলে ভাইয়া চায় যে আমি কষ্ট করি। এক সময়ে ভাইয়া খুব কষ্ট করেছে, আমরাও অনেক কষ্ট করেছি তাই ভাইয়া চায় না এখন এর কিছু করি। বিশেষ করে আমি,

সর্মি কী যেন ভাবল। তারপর বলল, আপনার সময় হবে ? আপনাকে তাহলে কয়েকটা কথা বলতাম!
মৌ-এর নিজেরও কিছু জানার ছিল। সে মনে মনে ঠিক করল যে সর্মি কী কথা বলতে সেটা সে শুনবে তারপর নিজের মনের কথাটা জানতে চাইবে। মৌ বলল, হ্যা আজকে তো ছুটির দিন। চল কোথাও বসি!
সর্মি হাসল। তারপর বলল, ওদের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে আসি। সামনের ঐ ক্যাফে বসি। এই কফিটা বেশ ভাল।
সর্মি যখন ব্যাগের ভেতরে ও ম্যাকবুকটা ভরতে ভরতে এগিয়ে এল তখন মৌ-এর মনের সেই প্রশ্নটা আবারও উদয় হল। তবে সেটা মনের ভেতরে দাবিয়ে রাখল। তারপর ওরা দুজন চলল সামনের ক্যাফের দিকে।
তবে সর্মি যখন কথা বলতে শুরু করল তখন মৌ ভাবতেও পারে নি যে প্রশ্নটা ওর মনের ভেতরে ছিল সেতাই সর্মি ওকে বলে বসবে।
সর্মি বলল, আপনি সেদিন আমাকে দেখে অবাক হয়েছিলেন তাই না?
-অবাক বলতে?
-এই যে ভাইয়া এতো সাদাসিধা ভাবে থাকে। সাধারণ কাপড় পরে, অথচ তার বোন হয়ে আমি এতো দামী দামী পোশাক পরছি। ভাইয়ার হাতে একটা কম দামী এন্ড্রোয়েড ফোন অথচ আমার হাতে আইফোন। তাই না?
সর্মি একটু অস্বস্তিতে পড়ল। তবে স্বীকার করল। বলল, হ্যা সত্যি ব্যাপারটা আমার কাছে একটু অন্য রকম লেগেছেই।
সর্মি বলল, ভাইয়া কখনই আপনাদের সাথে ঠিক বাইরে যায় না, আড্ডা দেয় না। অফিসের কলিগদের ভেতরে যেমনটা থাকে। তেমন কিছুই করে না। তাই না?
-হ্যা।
-কেন করে না জানেন?
-কেন?
-আমাদের জন্য। আমার আর আমার মায়ের জন্য।
মৌ যেন ঠিক বুঝতে পারল না সর্মির কথা। সর্মিও বুঝতে পারল যে মৌ তার কথা ঠিক বুঝতে পারে নি। সর্মি একটা লম্বা দম নিল, তারপর বলল, আমার বাবা মারা গেছেন অনেক আগে, ভাইয়া যখন যখন ক্লাস সেভেনে পড়ত তখন। আমাদের দেখার মত আসলে তখন কেউ ছিল না। কপাল ভাল যে বাবার একটা ছোট বাড়ি ছিল নয়তো আমাদের রাস্তায় নেমে আসতে হত। কোনো মতে আমরা টিকে ছিলাম। ভাইয়া যখন ক্লাস নাইনে পড়ে আমি তখন ক্লাস ফোরে। একবার আমি স্কুলে যাবো বলে রাগ করে বসে আছি কারণ আমার পায়ের স্যান্ডেল ছিড়ে গেছে, সেলাই করা স্যান্ডেল পরে আমি যাবো না। আমি গাল ফুলিয়ে বসে আছি। মা আমাকে বলেছে যে মামাদের কাছ থেকে কিছু টানা নিয়ে এসে সামনের সপ্তাহে নতুন স্যান্ডেল কিনে দিবে। তখন মামারাই আমাদের একটু সাহায্য করত। কিন্তু আমি শুনব না। আমি গাল ফুলিয়ে বসে আছে। সেই সময়ে ভাইয়া বাসা থেকে বের হয়ে যায়। সারাদিন কোথায় ছিল সেটা কেউ জানে না। সন্ধ্যার দিকে আমার জন্য নতুন একজোড়া স্যান্ডেল কিনে আনে। স্যান্ডেল পেয়ে আমি কী খুশি! জানেন সে কোথায় গিয়েছিল?
মৌ তাকিয়ে রইলো। তার জানার কথা ছিল না। সর্মি বলল, ভাইয়া সেদিন দিন মজুরের কাজ করেছিল সারাদিন। আমি তো তখন বুঝি না এসব। আমি যখন একটু বুঝতে শিখেছি তখন মা আমাকে বলেছিল। আমাদের খুব বেশি জামা কাপড় ছিল না। মায়ের তিনটা শাড়ি ছিল কেবল। দুইটা সব সময় পরতেন আর একটা কোথায় যেতে হলে পরতেন। আমারও তাই। আমরা ভাইয়া ইন্টারে উঠলে টিউশনি করা শুরু করে। আগের থেকে একটু ভাল করে টিকে ছিলাম তখন । ভাইয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে উঠলে আরও বেশি টিউশনি শুরু করে। সকাল ক্লাসের সময় বাদ দিয়ে পুরো সময়টাই। তারপর সে গ্রাফিক্স ডিজাইন শুরু করে। তখন হাতে একটু ভাল টাকা আসতে শুরু করে।
মৌ চুপ করে শুনে যাচ্ছে। তার কাছে কেমন যেন অবিশ্বাস্য মনে হচ্ছে। সর্মি বলেই চলেছে, বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে ভাইয়া কোনো দিন ঘুরতে যাই নি বন্ধুদের সাথে। বন্ধুদের সাথে দামী কোন রেস্টুরেন্টে যায় নি। আমি যখন তাকে জিজ্ঞেস করতাম যে তুমি এমন কর কেন? নিজের জন্য কিছু কর না কেন তখন সে বলে আমি ঘুরতে যাওয়ার থেকে একঘন্টা পড়ালে বা গ্রাফিক্স ডিজাইন করলে টাকা আসবে, সেই টাকা দিয়ে মায়ের জন্য একটা শাড়ি কেনা যাবে, তোর জন্য একটা জামা কেনা যাবে! আমি যখন বলতাম আমাদের তো এখন জামার অভাব নেই। ভাইয়া বলত, এখন নেই এক সময় তো ছিল, আমি তো দেখেছি তুই দুইটা জামা দিয়ে দিনের পর দিন পার করেছিস! মা কিভাবে একটা শাড়িই বারবার করেছে।

মৌ দেখল কথা বলতে বলতে সর্মির গলাটা কেমন যেন ধরে এসেছে। সে নিজেকে একটু সামলে নিল। সামনে রাখা কফিতে একটু চুমুক দিল। তারপর আবার বলতে শুরু করল, জানো আপু আমার মায়ের এখন দুই আলমারি ভর্তি কেবল শাড়ি আর শাড়ি। মা খুব রাগ করে এখন শাড়ি কিনলে তারপরেও ভাইয়া শোনে না। মাসের বেতন পেলে কিংবা কোন ক্লায়েন্টের কাছ থেকে বিল পেলেই আমার জন্য কিছু কিনবে, মায়ের জন্য শাড়ি কিনবেই। নিজে দেখ কেমন কম দামী জামা কাপড় ব্যবহার করে অথচ আমাদের জন্য সব থেকে দামী জিনিস তার চাই। গত বছর আমাকে আইফোন কিনে দিয়েছে। মাস ছয়েক আগে নতুন ম্যাকটা কিনেছে আমার জন্য। অথচ নিজের জন্য কিছুই করে না সে। বাধ্য হয়ে আমি ভাইয়ার জন্য জামা কাপড় কিনি আমার, সেটাতেও তার রাগ। সে বলে আমি তোকে হাত খরচ দিয়েছি তুই খরচ করবি আমার জন্য কিনবি কেন। টিউশনির কথা শুনলে খুবই রেগে যায়। বলে তোকে আর কষ্ট করতে হবে না। অথচ আমার ভাইটা সারা জীবন কষ্টই করে যাচ্ছে। সে নিজের জন্য কিছুই করবে না, সব আমাদের জন্য।
মৌ আসলে কী বলতে খুজে পেল না। শাহেদের জীবনটা এমন হবে সেটা মৌ ভাবতেও পারে নি। সর্মি বলল, আমি জানি না আমাদের বাবা বেঁচে থাকলে তিনি আমাদের জন্য কী করতেন। অবশ্যই আমরা হয়তো ভাল থাকতাম। ভাইয়াকে এতো কষ্ট করতে হত না। তবে সত্যি বলতে ভাইয়া আমাদের জন্য এখন যা করছে সেটা আমাদের বাবাও করতেন না আমি নিশ্চিত। সবাই বলে মেয়েদের জীবনে তার বাবাই হচ্ছে তার প্রথম প্রেম প্রথম হিরো। আমার জীবনে আমার ভাইয়া হচ্ছে আমার হিরো। আমি যে কোন পুরুষকে বিচার করতে গেলে তার ভেতরে আমার ভাইয়ের কোয়ালিটি খুজি। ভাইয়ার স্ট্যান্ডার্ডের কাছে সবাই ফেইল। সবাই।
মৌ-এরও তাই মনে হল। যদি সত্যিই কোন মেয়ে শাহেদকে আদর্শ ধরে ছেলের দোষগুণ বিচার করে কেউ শাদেহকে উতড়ে যাবে না। মৌ-এর মনে শাহেদের চেহারা ভেসে উঠল। নিজেকে কিছুটা অপরাধী মনে হল। শুধু থেকে যদি মৌ শাহেদের ব্যাপারটা জানত তাহলে কি সে তাকে অপছন্দ করতে পারত? মোটেই পারত না।
সর্মি বলল, আপু তোমাকে একটা কথা বলি। খবরদার ভাইয়াকে বলবে না।
-কী কথা?
-তোমাদের সেদিন কফি খেয়ে দেখার পরে আমার সত্যিই ভাল লেগেছিল অনেক। তবে মাস খানেক আগে একটা তথ্য আমি জেনে খুবই খুশি হয়েছিলাম।
-কী তথ্য?
সর্মি কিছু সময় যেন কী ভাবল। ভাবছে যে কথাটা বলা ঠিক হবে কিনা! একটা সময়ে বলল, সেদিন ভাইয়া আমার ম্যাকবুকটা নিয়ে কী যেন একটা কাজ করছিল। তার ল্যাপটপটা নাকি তার কাছের লোড নিতে পারছে না। আমি ভাইয়ার ল্যাপটপটা নিয়ে মুভি দেখছিলাম। কী মনে করে আমি ড্রাইভে ড্রাইভে ঘুরে বেড়াচ্ছিলাম। তখনই একটা ফোল্ডার দেখে একটা সেটার ভেতরে ঢুকি। তারপরেই আমি সেখানে…
মৌ কৌতুহল নিয়ে তাকিয়েই রইলো সর্মির দিকে। কিন্তু তারপর সর্মি যা বলল সেটা শোনার জন্য মোটেই প্রস্তুত ছিল না। সর্মি বলল, সেখানে তোমার অনেকগুলো ছবি ছিল।
-কী?
-হ্যা।
মৌ প্রথমে পুরো ব্যাপারটা ঠিক মত যেন বুঝতেই পারল না যে সর্মি কী বলল। শাহেদের ল্যাপটপে আলাদা ফোল্ডারে ওর ছবি কেন থাকবে। সর্মি বলল, ভাইয়া সম্ভবত তোমাকে পছন্দ করে। কিন্তু আমি জানি যে কোন দিন তোমাকে কিছু বলবে না। তাই মনে হল যে আমিই তোমাকে বলে দিই।
মৌ তখনই অবাক হয়েই তাকিয়ে রয়েছে সর্মির দিকে। তার যেন তখনও হজম হচ্ছে না। সর্মি বলল, আপু তুমি যদি অন্য কাউকে পছন্দ না করে থাকো তবে আমার ভাইটাকে একটা চান্স দিয়ে দেখতে পার। ঠকবে না এটা বলতে পারি।
মৌ কিছুই বলল না। বলতে পারল না। কথা শেষ করে যখন বাইরে এল তখন সর্মি হঠাৎ করে মৌকে জড়িয়ে ধরল। তারপর বলল, ভাইয়াকে খবরদার বলবে না কিন্তু আমি আমি তোমাকে এসব বলেছি।
-আচ্ছা বলব না। তুমি যে সকটা আমাকে দিলে সেটা কাটাতে সময় লাগবে।

রাতের বেলা মৌ-এর ঘুরে ফিরে কেবল শাহেদের কথাই মনে হতে লাগল। পরদিন অফিসে গিয়ে যখন শাহেদের দিকে তাকাল তখন মৌ আসলেই টের পেল যে শাহেদের চোখের দৃষ্টি একটু অন্য রকম। এতোদিন সে ভালো করে দেখে নি কিন্তু এখন খেয়াল করল। ছেলেটা কারো প্রেমে পড়লে এমন ভাবেই তাকায়। পুরো অফিসের সময়ে মৌ কয়েকবার নানান ছুঁতোতে সে শাহেদের কাছে গেল। অফিস থেকে বের হয়ে সেদিনও শাহেদকে নিয়ে গেল কফি খেতে। শাহেদ প্রথমে যেতে না চাইলেও মৌ অনেকটা জোর করেই তাকে ধরে নিয়ে গেল।
এভাবে প্রায়ই দিন মৌ শাহেদের সাথে সময় কাটাতে লাগল। ব্যাপারটা মানুষের চোখেও পড়তে শুরু করল। তবে মৌ সেসবে কান দিল না। মৌ-এর অবশ্য পুরো ব্যাপারটাতে বেশ মজা লাগছিল। শাহেদ জানে না যে সর্মি মৌকে সব বলে দিয়েছে। শাহেদ জানে না যে মৌ পছন্দের ব্যাপারটা জানে। অথচ মৌ ঠিকই সব জানে, এটাই ওকে আরও বেশি মজা দিচ্ছিল। শাহেদের আচরণ সে ঠিক ঠিক বুঝতে পারছিল।
এদিকে সর্মির সাথে মৌ-এর নিয়মিত যোগযোগ হত, দেখা সাক্ষাত হত। কয়েকবার সে সর্মির সাথে শাহেদের বাসায় গিয়ে হাজির হত। শাহেদের মায়ের সাথেও মৌ-এর পরিচয় হল। শাহেদ এসবের কিছুই জানে না। শাহেদ জানল আরও পরে।

সেদিন মৌ অফিসে আসে নি। শাহেদের একটু অস্থির লাগছিল কারণ এখন অফিসে মৌ-এর সাথে যোগাযোগ একটা নিয়মিত রুটিন হয়ে দাঁড়িয়েছে তার। এতোদিন সে নিজেকে ধরে রেখেছিল এসব থেকে কিন্তু মনটা মৌ-এর দিকে ছুটেছে এমন ভাবে যে নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে। এখন তার প্রায়ই মনে হয় যে জীবনের এই পর্যায়ে এসে নিজের জন্য কিছু করাটা দোষের নয় যদিও সেই সাহস সে করত না আগে। এখন মনে হয় এই চাওয়াটা দোষের নয়। সারাদিন অফিসে একটু মন মরাই কাটল। অফিস শেষ করে যখন সে বাসায় এসে হাজির হল তখন সব থেকে বড় ধাক্কাটা খেল। দরজায় খুলল স্বয়ং মৌ। ওর দিকে তাকিয়ে বলল, অফিস কেমন ছিল?
শাহেদের মনে হল বুঝি সে ভুল দেখছে, স্বপ্ন দেখছে। আসতে আসতে সিএনজির ভেতরে সে কি ঘুমিয়ে পড়েছে? কিন্তু যখন ঘরের ভেতরে ঢুকল তখনও তার বিশ্বাস হচ্ছিল না যে আসলেই কী হচ্ছে। ঘরের ভেতরে একটা আনন্দময় পরিবেশ। শাহেদ দেখল রান্না ঘরে মায়ের সাথে একজন মাঝ বয়সী মহিলা গল্প করছে। একটু পরেই সে বুঝল যে সেই মহিলা মৌ-এর মা। তারা দুপুর বিকেল থেকেই এখানে আছে। তার বোনের সাথে মৌ-এর হাহহিহি আওয়াজ আসছে। শাহেদ আসলে কিছুই বুঝতে পারছে না। তবে তার মনের ভেতরে একটা আনন্দ অনুভূত হচ্ছে। কলেজে থাকা কালীন সময়ে একটা মেয়েকে তার পছন্দ হয়েছিল কিন্তু কোনো দিন সে সামনে এগিয়ে যায় নি। বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে টাকা আয়ের দিকে এমন ভাবে ঝুকে ছিল যে অন্য কোন দিকে তাকানোর সময়ই ছিল না। অফিসে ঢুকে মৌকে তার মনে ধরেছিল। তাদের প্রথম কাছে আসার সুত্রপাতও শাহেদ নিজ থেকেই করেছিল। ম্যানেজের সাহেব যখন জানতে চেয়েছিল প্রোজেক্টে কাকে সে নিতে চায় তখন শাহেদই মৌ-এর নাম সাজেস্ট করেছিল। আরও কিছুটা মৌ-এর কাছাকাছি আসার ইচ্ছে ছিল যদিও ইচ্ছেটা কেবল মৌ-এর সাথে কাজ করার মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল। শাহেদ কোনদিন ভাবে নি যে এর ফলে ওদের সম্পর্ক এতোটা ভাল হয়ে যাবে। আর আজকে মৌ তার মাকে নিয়ে হাজির হয়েছে ওদের বাসায়। অনেকগুলো বছর পরে শাদের মনের ভেতরে আজকে অন্য রকম আনন্দ হচ্ছে।

পরিশিষ্ট
শাহেদ আর মো-এর বিয়ে হতে আরও মাছ ছয়েক লেগে গেল। তবে বিয়েটা শেষ পর্যন্ত হল। হাজার ঝড় পার হয়ে শাহেদও এক সময়ে তার মনের মানুষকে কাছে পেল।

ফেসবুকের অর্গানিক রিচ কমে যাওয়ার কারনে অনেক পোস্ট সবার হোম পেইজে যাচ্ছে না। সরাসরি গল্পের লিংক পেতে আমার হোয়াটসএপ বা টেলিগ্রামে যুক্ত হতে পারেন। এছাড়া যাদের এসব নেই তারা ফেসবুক ব্রডকাস্ট চ্যানেলেও জয়েন হতে পারেন।

অপু তানভীরের নতুন অনুবাদ গ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে

বইটি সংগ্রহ করতে পারেন ওয়েবসাইট বা ফেসবুকে থেকে।

How useful was this post?

Click on a star to rate it!

Average rating 5 / 5. Vote count: 25

No votes so far! Be the first to rate this post.

About অপু তানভীর

আমি অতি ভাল একজন ছেলে।

View all posts by অপু তানভীর →

One Comment on “সুখ সমাপ্তি”

  1. শাহেদের মতো মানুষেরা ভালোবাসে নীরবে; কথায় নয়, কাজে।

    ছেঁড়া স্যান্ডেলের জন্য সারাদিন দিনমজুরি করা সেই কিশোরটার কথা পড়ার সময় বুকের ভেতরে কোথাও একটু টান লাগছিলো।

    কিছু মানুষ সারাজীবন অন্যের জন্য বেঁচে থাকে; নিজের সুখের প্রয়োজনটা সবার শেষে রাখে। আপনার গল্পের শাহেদ সেই মানুষ।

    শেষটুকু না বললেই না, দরজা খুলে মৌ-কে দেখে শাহেদের যে অবিশ্বাস, সেই একটু মুহূর্তেই পুরো গল্পের সব কষ্ট যেন শান্ত করে দিলো।

Comments are closed.