পরিকল্পিত পরিকল্পনা

4.8
(30)

মীরার সাথে কোথাও যাওয়ার মত বিপদ আর নেই। বসের সাথে কোথাও যেতে কারই বা ভাল লাগে, তাও আবার কোনো রকম প্রস্তুতি ছাড়া? আমি সকাল সকাল এতো বিপদে পড়ব সেটা বুঝি নি। আজকে সকালে একেবারে বিনা নোটিশে সে আমাকে চট্টগ্রামে যাওয়ার নির্দেশ দিল। আমি ভেবেছিলাম যে গাড়িতে করে যেতে হবে খুব একটা সমস্যা হবে না। গাড়িতে ড্রাইভার থাকবে, আমি সামনে বসে আরাম করে মোবাইল টিপব। কিন্তু যখন গাড়ির সামনে গিয়ে হাজির হলাম, আর ড্রাইভার বের হয়ে আমার সামনে দিয়ে চলে গেল, তখন বুঝতে পারলাম যে গাড়ির ড্রাইভার সাথে যাবে না। তার মানে, আমাকে গাড়ি চালিয়ে যেতে হবে। এ কেমন বিপদে পড়লাম!
সব থেকে বড় বিপদ হল মীরা গাড়ির পেছনের সিটে বসল না। সে বসল গাড়ির সামনে, আমার পাশের সিটে। আমি একটু শক্ত হয়ে বসে গাড়ি চালাতে শুরু করলাম। গাড়ি ঢাকার জ্যাম ছাড়িয়ে যখন কাঁচপুর ব্রিজ পার হয়েছে তখন মীরাও যেন একটু সহজ হয়ে এসেছে। এতো সময় একটা ফাইলের দিকেই তার মনযোগ ছিল, সেটা পেছনে রেখে সামনের দিকে মন দিল। নিজেই পছন্দ করে একটা গান ছেড়ে দিল। তারপর আমার দিকে তাকিয়ে বলল, কী ব্যাপার তুমি এমন শক্ত হয়ে গাড়ি চালাচ্ছো কেন? রিলাক্স হয়ে চালাও!
আমি একটু হাসার চেষ্টা করলাম বটে তবে কাজ হল না। আমি নিজেকে যতই সহজ করার চেষ্টা করি আ কেন, কাজ হল না খুব একটা। আমি সামনের দিকে তাকিয়ে গাড়ি চালাতে লাগলাম। এদিকে মীরা আমার সাথে টুকটাক কথা বলতে লাগল। সত্যি বলতে কি আমার কাছে পুরো ব্যাপারটা একটু অদ্ভুতই মনে হচ্ছিল। আমি মীরাকে চিনি প্রায় বছর দুয়েক ধরে। তার অফিসে যতদিন ধরে আমি চাকরি করছি মীরাকে সব সময় আমি গম্ভীর মানুষ হিসাবেই চিনে এসেছি। দরকারি কথা ছাড়া একটা কথাও সে বলে না। আর আজকে সে কিনা আমার সাথে এতো কথা বলছে! এর পেছনে কারণ কী থাকতে পারে?
তার উপরে চট্টগ্রামে যাওয়ার জন্য আমাকেই কেন সাথে নিতে হল? আর নিলেও ড্রাইভার ছাড়া আমাকে দিয়েই বা গাড়ি কেন ড্রাইভ করতে হচ্ছে সেটাও আমি ঠিক বুঝলাম না। এর পেছনে কী কারণ থাকতে পারে সেটা আমি বুঝতে পারলাম না।

আমাদের গন্তব্য ঠিক চট্টগ্রাম ছিল না। ফেনী জেলার একেবারে শেষ প্রান্তে কোম্পানীর একটা নতুন ফ্যাক্টরির কাজ চলছে। আমরা সেখানেই গিয়ে হাজির হলাম। সব কাজ কর্ম শেষ করে আবার যখন ঢাকার দিকে রওয়ানা দিলাম তখন বিকেল পার হয়ে সন্ধ্যা হয়ে গেছে। সেই সাথে আকাশের অবস্থাও বেশ খারাপ ছিল। বিকেল থেকে ঘন কালো মেঘ জমেছিল আকাশে। বুঝতেই পারছিলাম যে যাত্রা পথেই বৃষ্টি নামবে। হলও সেটা। কুমিল্লা ঢোকার আগেই তীব্র বৃষ্টি শুরু হল। এতো তীব্র বৃষ্টির ভেতরে হাইওয়েতে গাড়ি চালানোটা বেশ কঠিন একটা ব্যাপার। আমি যথাসম্ভব সাবধানে গাড়ি চালাতে শুরু করলাম। এমন সময় মীরা আমাকে সামনের বাজার থেকে ডান দিকের রাস্তায় ঢুকতে বলল। একটু বিরক্ত লাগছিল। সারাদিন আমি এই এক কাপড়ে রয়েছি। এখন দ্রুত বাসায় গিয়ে একটা ঘুম দিতে চাই কিন্তু এখন আবার কোথায় যেতে চাচ্ছে সে! কিন্তু কিছুই করার নেই আসলে। বসরা যা বলবে আমাদের আসলে তাই করতে হবে!

একটু পরেই বাজার চলে এল। ডান দিকের পথও খুজে পেলাম। গাড়িটা সেদিকেই ঘুরিয়ে দিলাম। কিছুদুর যেতেই বুঝতে পারছিলাম যে আমরা কোন গ্রামের রাস্তায় চলে এসেছি। গাড়ির হেডলাইটের আলোতেই বুঝতে পারছিলাম যে রাস্তার দুই ধারে ধানের ক্ষেত রয়েছে। গাড়িটা সেই রাস্তা ধরে কিছু সময় চলার পরে মীরা গাড়ি থামাতে বলল। আমি গাড়ি থামালাম। তারপর মীরা আমাকে অবাক করে দিয়ে গাড়ি থেকে নেমে পড়ল বৃষ্টির ভেতরে!
আমি তীব্র বিস্ময় নিয়ে তাকিয়ে রইলাম কিছু সময়। আমি সত্যিই এমন কিছু যে দেখব সেটা কোন দিন ভাবিও নি। মীরাকে আমি গাড়ির হেডলাইটের আলোতে বৃষ্টিতে ভিজতে দেখলাম। আমার কাছে ওকে আর তখন আর আমার বস বলে মনে হল না। মনে হল যেন সে আমার প্রেমিকা। দুইজন একসাথে আমরা লংড্রাইভে বের হয়েছিলাম। পথের মধ্যে বৃষ্টি নেমেছে এবং সে তখন বৃষ্টিতে নেমে গিয়েছে। আমি এই দুই বছরে মীরাকে সব সময় আমার বস হিসাবেই দেখে এসেছি। যখন আমি প্রথম এই কোম্পানীতে যোগ দিয়েছিলাম তখন থেকেই দেখে এসেছি যে মীরা এমডির পদে রয়েছে। তার আব্বা চেয়ারম্যান হলেও মীরার সব কাজ কর্ম সামলাও। সবাইকে একেবারে দৌড়ের উপরে রাখে। কিন্তু আজকে আমার মীরাকে কেন জানি আর বস বলে মনে হল না। কিশোরী এক মেয়ের মত সে বৃষ্টিতে ভিজছে! আমার মনে হল ব্যবসার এতো কঠিন কাজের চাপ সামলানো এই মেয়ের মধ্যেও একটা ছোট্ট কিশোরী সুলভ মেয়ে রয়েছে।
এরপর ঘটল আরেকটা ঘটনা। মীরা এবার গাড়ির জানালার কাছে এল। আমার দিকে তাকিয়ে আমাকে বের হত বলল।
আরে এই মেয়ে বলে কী!
আমি মানা করলাম বটে তবে কাজ হল না। সে নিজেই গাড়ির দরজার খুলে আমাকে এক প্রকার টেনেই বের করল গাড়ি থেকে। মুহুর্তের ভেতরেই আমিও ভিজে গেলাম। কতদিন পরে আমি বৃষ্টিতে ভিজলাম আমি নিজেই জানি না। আমি সত্যিই কোন দিন ভাবতেও পারি নি যে মীরার সাথে আমি এভাবে বৃষ্টিতে ভিজব কোন দিন!
কত সময় আমরা বৃষ্টিতে ভিজলাম সেটা আমরা নিজেরাও জানি না। তবে এক সময়ে মীরা বলল যে আমাদের যাওয়া উচিৎ।
আমি ভেবেছিলাম আমরা বুঝি এবার ঢাকার দিকে রওয়ানা দিব। এই ভেজা শরীর নিয়ে ঢাকা পর্যন্ত যেতে আমাদের খবর হয়ে যাবে নিশ্চিত। তবে আমাকে অবাক করে দিয়ে সে সামনের দিকেই গাড়ি চালাতে বলল। কেন বলল সেটা আমি টের পেলাম মিনিট দশেক পরে। গাড়িটা এসে থামল একটা বাড়ির গেটের সামনে। রাস্তার পাশেই একটা বাংলো বাড়ি টাইপের করা। সামনের গিয়ে একবার হর্ণ দিতেই দেখলাম গেটটা খুলে গেল। আমি গাড়ি নিয়ে ভেতরে ঢুকে পড়লাম।
গাড়িটা ছাউনির নিচে রেখে আমরা বের হলাম দুজন। আমাদের দুজনের শরীর তখন ভেজা। মীরা একটু যেন কাঁপছে। আমারও একটু ঠান্ডা ঠান্ডা লাগছে। গেট যে খুলে দিয়েছিল ছাতা হাতে তাকে দেখলাম আমাদের সামনে আসতে। মীরা তার দিকে তাকিয়ে বলল, গরমপানি করা আছে?
-জ্বে মেডাম! গিজার চালু করা!
-দুই রুমেই?
-জ্বে!

মীরা আমার দিকে তাকিয়ে বলল, আসো আগে গোসল করে নিই। ভেজা শরীরে বেশি সময় থাকলে জ্বর আসবে। আমি কিছুটা বিভ্রান্তের মত করে মীরার সাথে বাড়ির ভেতরে উঠে এলাম। মীরা আমাকে একটা ঘর দেখাল। বলল, গোসল করে নাও।
আমি নিঃশব্দে ঘরের ভেতরে ঢুকলাম। এবং অবাক হয়ে খেয়াল করলাম যে সেই ঘরের বিছানার উপরে একটা টিশার্ট আর ট্রাইজার রাখা রয়েছে। মীরা কি তাহলে জানত যে বৃষ্টি হবে, বৃষ্টিতে ভিজব আর আমাদের পোশাক বদলাতে হবে?
বৃষ্টিতে যে ভিজব সেটা হয়তো জানতো না তবে এখানে যে আসব সেটা সে আগে থেকেই ঠিক করে রেখেছে এটা একেবারে পরিষ্কার! এই সব তার পরিকল্পনা।
অবশ্য এতে অবাক হওয়ার কিছু এই। মীরা এই রকমই। অনেক কিছুই আগে থেকেই সে ভেবে রাখে! প্রতিটা কাজ সে করে পরিকল্পনা মাফিকই। তার মানে এখানে এভাবে আসা কোনো ভাবেই কোন কাকতালীয় ব্যাপার না।
সারাদিনের পর গরম পানিতে গোসলটা দিয়ে বেশ আরাম লাগল। সত্যি বলতে কি আমার বাসায় গিজার নেই। শীতকালেই কেবল চুলাতে গরম পানি করে গোসল করা হয়। তাই এমন আরামের গোসল করে বেশ মজা লাগল। গোসল শেষ করে সেই টিশার্ট আর ট্রাইজার পরলাম এবং আমার বুঝতে মোটেই কষ্ট হল না যে এগুলো একেবারে আমার গায়ের মাপের কেনা হয়েছে। তার মানে হচ্ছে আমাকে এখানে নিয়ে আসার পরিকল্পনা তার আগে থেকেই ছিল।
একটু পরে খাবারের জন্য ডাক পরল। আমি যখন ডাইনিং রুমে এলাম তখন মীরাও বের হয়ে এসেছে। সত্যি বলতে মীরাকে দেখে আমি অবাকই হয়ে গেলাম। তাকে আমি সব সময়ই ফরমাল পোশাকে দেখেছি। স্যুট শাড়ি কিংবা মার্জিত সেলোয়ার কামিজ। আজকে আমি ওকে এই প্রথমে দেখলাম টিশার্ট পরা অবস্থায়। একেবারে ঘোরোয়া পরিবেশে একটা মেয়ে যেমন ভাবে থাকে ঠিক তেমন ভাবে।
তাকে দেখে যে আমি অবাক হয়েছি সেটা সে নিজেও বুঝল তবে কিছু বলল না। আমার বিস্মিত হওয়াটা সে যেন বেশ উপভোগ করল। একটু হাসল কেবল।
রাতের খাবার টেবিলে ধোয়া ওঠা সবজি খিচুড়ি আর দেশী মুরগির মাংস রান্না করা হয়েছে। আমি বেশ অবাক হলাম। কারণ এই সবজি খিচুড়ি আমার খুবই পছন্দের একটা খাবার। আর বৃষ্টির পরে এই খিচুড়ির কোন তুলনা হয় না। আমার মনে তখন ক্ষীণ একটা সম্ভবনা দেখা দিল। আচ্ছা মীরা কি আমার পছন্দের জিনিসের খাবারের কথা জানে? এখন তো অন্য কিছুই রান্না হতে পারত। যেমন সাদা ভাত, মাংস! একেবারে খিচুড়িই রান্না হতে হল? তাও আবার আমি যে খিচুড়ি পছন্দ করি সেটাই?

খেতে খেতে আরও টুকটাক কথা বার্তা হল। আমি জানতে চাইলাম, এটা আপনাদের বাসা?
-হ্যা। এটা আমাদের গ্রামের বাসা। তবে এখানে খুব একটা আসা হয় না।
-কেন? চমৎকার বাসা তো!
মীরা কী যেন ভাবল। তারপর বলল, দেখতেই পাচ্ছো এখানে কেউ নেই। কিন্তু আমার বাবা কিন্তু একা না। তারা দুই ভাই। আমার বড় চাচা আছেন এবং তিনি এই গ্রামেই থাকেন। আমার দাদীও এখনও বেঁচে আছেন। বাবা যখন বিশ্ববিদ্যলয়ে পড়ে তখন আমার মাকে বিয়ে করা নিয়ে বাবা তার পরিবারের সাথে বেশ ঝামেলা করেছিল। বিশেষ করে দাদা আর বড় চাচা এই বিয়ের তীব্র বিরুদ্ধে ছিল। পরে বাবা বাসা থেকে চলে যায়। দাদার কোন জায়গা সম্পত্তিও সে নেয় নি। এখন যা করেছে সবই নিজে নিজে। পরিবারের উপরে একটা অভিমান আর রাগ ছিল। এই যে এখানে এই বাড়িটা এটা বাবা পরে কিনেছে। যদিও দাদার মৃত্যুর পরে রাগ অনেকটাই পরে গেছে। তবে আগের সেই সম্পর্ক আর ফিরে আসে নি এখনও। আমি মাঝে সাজে এখানে আসি। দাদী তখন এখানে আসে। দাদীকে বাবা অবশ্য আমাদের ঢাকার বাসায় গিয়ে যেতে চেয়েছে দাদী নিজের স্বামীর ভিটা ছেড়ে যেতে চান নি। আমরাও আর কিছু বলি নি।

আরও অনেক কথা বার্তা হল। মীরা যে আমার সাথে এতো কথা বলছিল ব্যাপারটা আমার কাছে ভালই লাগছিল। তাকে আর সেই অপছন্দের বসের মত মনে হচ্ছিল না। মনে হচ্ছিল যেন আমরা কতদিনের বন্ধু মানুষ। অবশ্য বয়সের দিক থেকে মীরা কোন ভাবেই আমার থেকে বড় হবে না। বেশ রাত পর্যন্ত গল্প করে আমরা ঘুমাতে গেলাম।

সকালে মীরার ডাকেই ঘুম ভাঙ্গল। মীরা বলল, চল হেটে আসি বাইরে থেকে। ঢাকাতে তো এই পরিবেশ পাওয়াই যায় না।
সকালে আমি একটু বেলা করেই ঘুমাতে পছন্দ করি যদিও, মীরার কথা অমান্য করার উপায় ছিল না। আমি ওর সাথে সাথে হাটতে বের হলাম।
ঢাকাতে এতো সকালে মানুষজন বের হয় না খুব একটা। কিন্তু এখানে দেখলাম এরই ভেতরে মানুষ ক্ষেতে কাজ শুরু করে দিয়েছে। আমি মীরার পাশে পাশে হাটছিলাম। মীরা মাঝে মাঝে হাত নেড়ে আমাকে দেখাচ্ছিল তাদের দাদার জায়গা সম্পত্তি কোনটা। এক সময় কথা বলতে বলতে আমি একটা বড় গেরস্ত বাড়িতে ঢুকে পড়লাম। একেবারে উঠানে গিয়ে দাঁড়ালাম। আমি একটু অস্বস্তি নিয়ে চারিদিকটা দেখতে লাগলাম। এইভাবে অন্য কারো বাসায় ঢুকে পড়ার ব্যাপারটা আমার কাছে ঠিক হজম হল না। তরে একটু পরেই বুঝতে পারলা যে এটা অন্যকারো বাড়ি না। এটা মীরার দাদাবাড়ি।
মীরা সোজা একটা ঘরের বারান্দার দিকে এগিয়ে গেল। সেখানে একজন বৃদ্ধা খাটের উপরে বসে আছেন। তার সামনে মুড়ি আর গুড় আর এক গ্লাস পানি রাখা। মীরা একেবারে তার সামনে গিয়ে দাঁড়াল। তারপর বলল, কী বুড়ি, এখনও মরো নি?
বুড়ি চোখ তুলে ভাল করে মীরাকে চিনতে চেষ্টা করলেন কিছু সময়। তারপর বলল, মীরু! তুই!
-চিনেছো তাহলে?
বৃদ্ধা যেন কিছুটা চিৎকার করে উঠলেন আনন্দে। তারপর বললেন, মীরু তুই আইসোস বাজান!
মীরা তার পাশে বসতে বসতে বৃদ্ধাকে জড়িয়ে ধরলেন। একটু পরেই একজন মাঝ বয়সী মহিলা বের হয়ে এলেন পাশের ঘর থেকে। একবার আমার দিকে তাকালেন তিনি। তারপর তাকালেন মীরার দিকে। তার চোখে একটু বিস্মিত ভাব। সে মীরার দিকে এগিয়ে গেলেন। তারপর বলল, মীরা!
-কেমন আছেন চাচী!
-এতোদিন পরে মনে পড়ল। কতদিন পরে এলি! তোর বাপের তুই দেখি রাগ করে আসিস?

কয়েক মুহুর্তের পুরো বাড়ির চেহারাই বদলে গেল। সবাই মীরাকে নিয়ে ব্যস্ত হয়ে গেল। মীরা সম্ভবত এবারই প্রথম এল এই বাড়িতে। মীরা বড়চাচা এবং তার দুই চাচাতো ভাইকেও দেখতে পেলাম।

সকালের নাস্তা ওখানেই করতে হল। এরপর এল সব থেকে ধাক্কাটা। আমি কে সেটা অনেকের চোখের কৌতুহল ছিল। তবে কেউ তখনও জিজ্ঞেস করে নি। মীরার চাচাতো ভাইয়ের একজন আমার পাশে এসে জিজ্ঞেস করল আমি কে। আমি জানালাম যে আমি মীরার অফিসে কাজ করি। অফিসের কাজে চট্টগ্রাম গিয়েছিলাম। ফেরার পথে বৃষ্টির কারণে এখানে থেমেছি। তবে নাস্তার টেবিলে মীরা আমাকে যা বলে পরিচয় করিয়ে দিল তাতে আমার চোখ কপালে উঠল। আমি মীরার পাশেই বসেছিলাম। আমার আসলে এই পরিবারের সদস্যের মধ্যে থাকতে একটু অস্বস্তি লাগছিল। আমাকে মীরা এখানে না আনলেই পারত।
মীরার বড় চাচা যখন আমার ব্যাপারে জানতে চাইলেন তখন মীরা যা বলল তাতে আমার চোখ উঠল কপালে। মীরা বলল, আসলে রেহান আমাদের অফিসে যোগ দিয়েছে আমাকে সাহায্য করার জন্যই। জানেনই তো আব্বু এখন আর আগের মত কাজ করতে পারে না। রেহান না থাকলে আমার পক্ষেও একা সামলানো সম্ভব হত না।
আমার দম বন্ধ হয়ে এল যেন। লাইনটা মীরা এমন ভাবে বলল যে টেবিলে বসা সবার কাছে এটা স্পষ্ট হয়ে গেল যে মীরা আমার গার্লফ্রেন্ড। আমি দেখলাম সবাই একটু যেন গম্ভীর হয়ে গেল। বিশেষ করে মীরার বড় চাচা এবং দুই ভাই।
আসার সময় আরেকটা ঘটনা। আমাকে মীরা দাদীর কাছে নিয়ে গেল। তারপর মীরা বলল, বুড়ি তোমার হবু নাতজামাইকে টাকা দাও!
কথাটা সে এমন ভাবে বলল যেন বাড়ির অন্য সবাই শুনতে পায়! তারপর আমার দিকে চোখের ইশারায় কিছু বলল। আমি প্রথমে কিছু বুঝতে না পারলেও এক সময় বুঝতে পারলাম যে মীরা আমাকে তার দাদীকে সালাম করতে বলছে। আমি কোন কোন কথা না বলে বসের হুকুম তামিল করলাম। দেখলাম দাদী নিজের জায়গা থেকে উঠে গেলেন। একটু পরেই ফিরে এলেন। আমার হাতে কড়কড়ে ৫টা এক হাজার টাকার নোট ধরিয়ে দিলেন। আমি বলল, আরে দাদী এতো না।
মীরা আমাকে ধমকে বললে, দিচ্ছে নাও। মানা করছো কেন! আমি আর মানা না করে ৫ হাজার টাকা নিজের পকেটে ভরলাম।
মীরার চাচার বাসা থেকে বের হতেই আমি মীরাকে বলল, এটা কী হল?
কিছুই হয় নি এমন একটা ভাব করে মীরা বলল, কী হল?
-মানে, ভেতরে আপনি কী বললেন? কেন বললেন?
মীরা বলল, এতো কিছু বুঝতে হবে না। এখন ঢাকায় চল।
আমি অবাক হয়ে কেবল তাকিয়ে রইলাম। আমার মাথার ভেতরে আসলেই কিছু ঢুকছিল না। আর কিছু জানতেও চাইলাম না। কারণ জানি যে জানতে চেয়ে লাভও নেই। মীরা যদি নিজ ইচ্ছেতে না বলে তাহলে কিছুই জানা যাবে না।

মীরাদের বাসায় ফিরে আরেকটা অবাক করা ব্যাপার ঘটল। মীরা বলল, কালকের কাপড় এখন শুকায় নি সম্ভবত। দেখো তোমার জন্য আলমারিতে শার্ট আর প্যান্ট রাখা আছে।
আমি আলমারি খুলে সত্যি শার্ট আর প্যান্ট খুজে পেলাম। সেগুলো একেবারে আমার শরীরের মাপের। মীরা এতো সঠিক ভাবে জিনিসপত্র কিনে রেখেছে!

ফেরার পথে মীরা খুব বেশি কথা বলল না আর। পরের দিন অফিসে গিয়ে আবারও আগের মত আচরণ শুরু করল। এমন একটা ভাব যেন কিছুই হয় নি। আমি আসলে কিছুই বুঝতে পারছিলা না। পুরো ব্যাপারটাতে আমার অবশ্য খুব একটা লস হয় নি। ৫ হাজার নগদ টাকা এসেছে। তার উপর দুই সেট জামা প্যান্ট। খারাপ হয় নি ব্যাপারটা। হয়তো মীরার কোনো উদ্দেশ্য ছিল। আমি তাতে কাজে লেগেছি। আমার কন লস হয় নি। আমি ব্যাপারটা ভুলে যাবো ভাবলাম তবে ভোলা গেল না।

সপ্তাহ খানেক পরে আমার ডাক পড়ল চেয়ারম্যানের রুমে। মীরার বাবা আজিজুর রহমান প্রতিদিন অফিসে আসেন না। সপ্তাহে দুই এক দিন আসেন। আমি যখন তার কেবিনে ঢুকলাম দেখি তিনি চেয়ারে না বসে সোফার উপরে বসে পত্রিকা পড়ছেন। আমাকে ঢুকতে দেখে একটু হাসলেন। তারপর বলল, কই এসো। নাস্তা হয়েছে?
-জ্বী স্যার!
-কফি?
-ওকে!
তিনি বেল টিপলেন। তারপর পিয়নকে দুইকাপ কফি দিতে বললেন। আমি বসলাম তার সামনেই। আমি আসলে বুঝতে পারছিলাম না যে চেয়ারম্যান তার কেবিনে ডেকে আমাকে কফি কেন খাওয়াচ্ছে। একটু পরেই অবশ্য সেটা বুঝতে পারলাম। কফির কাপে চুমুক দিতে দিতে তিনি বললেন, গত সপ্তাহে তোমরা কুমিল্লা গিয়েছিলেন?
আমি একটু সোজা হয়ে বসলাম। তোমরা বলতে তিনি যে আমার আর মীরা কথা বলছেন এবং কুমিল্লা বলতে তার বাবার বাড়ি বোঝাচ্ছেন সেটা বুঝতে আমার কষ্ট হল না। আমি মাথা নাড়লাম। বললাম, আসার প্রচুর বৃষ্টি হচ্ছিল। তাই আমরা থেমেছিলাম।
আজিজুর রহমান হাসলেন। তারপর বললেন, তোমার কী মনে হয়, বৃষ্টি যদি না হত থামতে না?
আমি একটু চুপ করে রইলাম। বললাম, থামতাম। হয়তো অন্য কোন কারণে!
-পুরো ব্যাপারটাই যে মীরার পূর্ব পরিকল্পিত, সেটা নিশ্চয়ই তোমাকে বলে দিতে হবে না, তাই না?
আমি মাথা ঝাকালাম। আমি বুঝতে পারলাম যে আজিজুর রহমান পুরো ব্যাপারটাই জানেন।
-সে এই কাজটা কেন করল এটা জানতে ইচ্ছে হয় নি।
-মীরা ম্যাম না বললে আসলে জানার কোন উপায় নেই। এই জন্য আর জানতে চাই নি।
চেয়ারম্যান স্যার হাসলেন। তারপর বলল, মীরা কেন তোমাকে নিয়েছে বুঝতে পারছি। যাক, তোমার বাকিটুকু জানা উচিত। আমি কেন আমার বাবার বাড়ি যাই না সেটুকু তো মীরা বলেছে সম্ভবত তোমাকে, তাই না?
-জ্বী।
-বাকি গল্প হচ্ছে, আমি আমার ভাইকে ভালোবাসি। ও ছাড়া আর কে আছে বল? তবে আমি নিজের রাগকে ঝেড়ে ফেলতে পারি নি। আমার কথা ছিল তাদের কারণে আমি বাড়ি ছেড়েছি তারা না এলে আমি যাবো না। আমার ভাইয়ের বয়স হয়েছে। একবার একটা মাইনোর হার্ট এটাকও হয়েছে। এখন সে পুরানো সব ঝামেলা মিটিয়ে ফেলতে চায়। কিন্তু এভাবে তো কোন উপলক্ষ ছাড়া ছোট ভাইয়ের কাছে আসা যায় না। ইগো কেউ কারো কম নেই। তাই তার ইচ্ছে ছিল যে তার বড় ছেলের সাথে তিনি মীরার বিয়ের প্রস্তাব নিয়ে আসবেন। এভাবে দুই ভাইয়ের ভেতরে আবারও সম্পর্ক ঠিক হয়ে যাবে। আর সত্যি বলতে কি আমার ভাই যদি এই প্রস্তাব নিয়ে আসত তবে আমি তাকে মানা করতে পারতাম না। আর মীরা আবার আমাকে মানা করতে পারত না। ও আমাকে বেশ ভালোবাসে কিন্তু সে তার চাচাতো ভাইকে বিয়েও করতে চায় না। সো, এমন কিছু করা দরকার ছিল যেন আমার ভাই আসুক তবে বিয়ের প্রস্তাব যেন না আনতে পারে! বুঝতে পারছো নিশ্চয়ই মীরা কেন তোমাকে নিয়ে গেছে!
-জ্বী স্যার বুঝতে পারছি।

আমার কাছে এখন পুরো ব্যাপারটা একেবারে পরিষ্কার। আমি নিশ্চিত মীরা অনেক আগে থেকেই এই ব্যাপারটা নিয়ে ভেবেছে এবং পরিকল্পনা সাজিয়েছে। আমি আর কী বলব বুঝতে পারলাম না। আমি বলল, আমি সব বুঝতে পারছি।
-গুড। তবে একটা ব্যাপার সম্ভবত এখনও বুঝো নি।
-কোন ব্যাপারটা স্যার?
-মীরা কিন্তু তোমার ব্যাপার সত্যিই সিরিয়াস?
আমি বিস্মিত হয়ে বললাম, জ্বীইইইইইই!
-হ্যা। তবে এমন না যে তুমি তাকে পেয়ে গেছ তবে যদি একটু চেষ্টা কর তবে সে রাজি হয়ে যাবে। আর ওর বিয়ে বয়স হচ্ছে। আমি ঠিক করেছি ওর বিয়েছে আমার ভাইকে দাওয়াত দিতে যাবো। উপলক্ষ্য তো দরকার, নাকি!

আমি যখন চেয়ারম্যানের ঘর থেকে বের হলাম তখন অনুভব করছিলাম যে আমার শরীর কাঁপছে। মীরার বাবা মূলত আমাকে তার মেয়ের জামাই হিসাবে মেনে নিতে সম্মতি দিয়ে দিলেন! আমি নিজের ডেস্কে বসতে ভাবছি যে কী হল পুরো ব্যাপারটা তো আমার ডাক পরল মীরার কেবিনে। আমি কেবিনে গিয়ে হাজির হতেই মীরা বলল, বাবা কী বলেছে তোমাকে? শোনো যা বলেছে একেবারে ভুলে যাও! চিন্তাও করবে না!
আমি মীরার চোখের দিকে তাকালাম। তখনই আমার মনে হল মীরা আমার দিকে একবারও তাকিয়ে কথা বলছে না। চোখ লুকাতে চাইছে। আমরা যখন নিজের মনের কথা লুকিয়ে অন্য কথা বলি তখন যেমন ভাবে চোখ লুকাতে চাই, সেই ভাবে মীরাও নিজের চোখ লুকাতে চাইছে। আমার মনে হলে কেবল মীরার বাবাই নয়, মীরাও সম্মতি দিয়ে দিয়েছে।
আমি বললাম, জ্বী বুঝতে পেরেছি।
-হ্যা হ্যা। বুঝলেই ভাল। যাও কাজ কর।
আমি কেবিন থেকে বের হয়ে যাওয়ার জন্য একবার ঘুরলাম। কিন্তু আবার ফিরে এলাম। তারপর মীরার দিকে তাকিয়ে বললাম, একটা কথা জানার ছিল?
মীরা আমার দিকে না তাকিয়ে কম্পিউটার স্ক্রিনের দিকে চোখ রেখে বলল, কী কথা?
-আমার প্যান্টের মাপ আপনি কিভাবে জানলেন? আর আমি যে সবজি খিচুড়ি পছন্দ করি, দেশি মুরগির ঝোল দিয়ে এটা কিভাবে জানলেন?
মীরা প্রশ্ন শুনে আমার দিকে ঝট করে চোখ তুলে তাকাল। তবে প্রশ্নের উত্তর দিল না। আমি বললাম, আপনি নিশ্চিত এটাও জানেন যে ঢাকায় আমার একটা খুব পছন্দের জায়গা আছে। আমি প্রায় দিনই সেখানে যাই। একা একা গিয়ে বসে থাকি।
মীরা যদিও উত্তর দিল না তবে আমার কেন জানি মনে হল মীরা জানে এই প্রশ্নের উত্তর। আমি বললাম, আমি আজকে লাঞ্চের পরে সেখানে যাবো। অপেক্ষা করব। যদি আপনি সেখানে না আসেন তবে আপনি আর কোন দিনই আমার এই চেহারা দেখবেন না।
আমি আর কিছু না বলে কেবিন থেকে বের হয়ে গেলাম। নিজের ডেস্কে এসে অনুভব করলাম যে আমার বুকের ভেতরটা আরও বেশি বেশি করে লাফাচ্ছে।

আপনাদের কী মনে হয়?
মীরা আসবে?
আমি জানি আপনারা কী ভাবছেন। মীরা আসবেই। মীরাকে আসতেই হবে।

ফেসবুকের অর্গানিক রিচ কমে যাওয়ার কারনে অনেক পোস্ট সবার হোম পেইজে যাচ্ছে না। সরাসরি গল্পের লিংক পেতে আমার হোয়াটসএপ বা টেলিগ্রামে যুক্ত হতে পারেন। এছাড়া যাদের এসব নেই তারা ফেসবুক ব্রডকাস্ট চ্যানেলেও জয়েন হতে পারেন।

অপু তানভীরের নতুন অনুবাদ গ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে

বইটি সংগ্রহ করতে পারেন ওয়েবসাইট বা ফেসবুকে থেকে।

How useful was this post?

Click on a star to rate it!

Average rating 4.8 / 5. Vote count: 30

No votes so far! Be the first to rate this post.

About অপু তানভীর

আমি অতি ভাল একজন ছেলে।

View all posts by অপু তানভীর →

One Comment on “পরিকল্পিত পরিকল্পনা”

  1. বৃষ্টিতে ভেজার দৃশ্য থেকে শুরু করে নাস্তার টেবিলের সেই মুহূর্ত- পুরো গল্পটা পড়তে পড়তে বুঝতে পারছিলাম মীরা আসলে মনে মনে কতটা এগিয়ে আছে। প্যান্টের মাপ আর খিচুড়ির পছন্দ জানার প্রশ্নটা দিয়ে শেষ করাটা চমৎকার হয়েছে, কারণ এই একটা লাইনেই মীরার লুকায়িত মনের ভাব পুরো খুলে গেছে পাঠকের সামনে।

    মীরা যে আসবে সেটা নিয়ে কোনো সন্দেহ নেই, তবে সে কীভাবে আসবে সেটা দেখার অপেক্ষায় থাকলাম।

    এই গল্পের একটা সিক্যুয়েলের জন্য জোড় দাবি জানালাম।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *