স্মৃতিরা রয়ে যায়

4.8
(29)

তাইরা যখন ধরেই নিয়েছিল যে আজকে রাতে সে আর মানুষের দেখা পাবে না, এই চা বাগানের ভেতরে, খোলা আকাশের নিচে ভুতের ভয় পেয়ে তাকে রাত কাটাতে হবে, তখনই সে আলোটা দেখতে পেল। তাইরার কাছে মনে হল যে যেন বুকে পানি খুজে পেয়েছে। জীবনে এমন ভয় সে পায় নি। তীব্র অন্ধকারের ভেতরে এক টুকরো আলো দেখতে পেয়ে সে দৌড়ে সেদিকে গেল। একটা ছোট বাংলো বাড়ি। বাড়ির সামনে কোমর পর্যন্ত উচু বেড়া দেওয়া। সামনে ফাঁকা উঠোন। সেখানে একটা ছাউনির মত দেওয়া রয়েছে। তার নিচে একটা জিপ গাড়ি দাঁড়িয়ে। বাংলোটার বারান্দায় আলো জ্বলছে। সেই আলোর নিচে একজন বসে রয়েছে আরাম কেদারায়। হাতে একটা বই। মনযোগ দিয়ে সে বই পড়ছে। তাইরার কাছে মনে হল যে এটা সত্যিই কোন নাটকের দৃশ্য। তবে এখন তার সেই নাটকের দৃশ্য উপভোগ করার মত মানসিকতা এখন তাইরার নেই। তাইরার এখন এই অন্ধকার ভৌতিক পরিবেশ থেকে মুক্তি পেতে হবে।
তাইরা যখন গেট খুলে ভেতরে ঢুকল তখনও সে মুখ তুলে তাকাল না। বই পড়াতেই সে তার মনযোগ দিয়ে রেখেছে। একদম যখন কাছে গিয়ে হাজির হল তখন সে তাইরার অস্তিত্ব টের পেল। বই থেকে মুখ তুলে তাকাল তাইরার দিকে।
লোক না বলে যথেষ্ঠ যুবকই বলা চলে তাকে। তাইরা ভেবেছিল এটা চা বাগানের ম্যানেজারের বাংলো। তবে এতো কম বয়সের কেউ এতো বড় চা এস্টেটের ম্যানেজার হওয়ার কথা না। সম্ভবত সে অন্য কোনো কর্মচারি। যাক, সেসব এখন ভেবে লাভ নেই। এখন এই বিপদ থেকে উদ্ধার পাওয়া দরকার। তবে যুবক যেভাবে তার দিকে তাকিয়েছে, তাতে তাইরা একটু দ্বিধায় পড়ে গেল। এমন অভিজ্ঞতা তার হয় না খুব একটা। যেখানেই যাক না কেন মানুষজন একবার দেখেই তাকে চিনে ফেলে। কিন্তু সামনে বসা এই মানুষটার চেহারার ভাব দেখেই তাইরার মনে হল যে সে তাকে চিনতে পারে নি। সম্ভবত তাইরা যেখানে দাঁড়িয়ে রয়েছে সেখানে ঠিক মত আলো এসে পৌছায় নি। এই কারণেই তাকে চিনতে পারছে না। তাইরা আরেকটু এগিয়ে গেল।
যুবক এবার বইটা এক পাশে সরিয়ে রেখে তাইরার দিকে তাকাল। তারপর বলল, আপনি কি পথ হারিয়ে ফেলেছেন?
তাইরা একটু বোকার মত হাসল। তারপর বলল, জ্বী। আসলে বাগানটা এতো বড় এতো এতো টিলা কোন পথে যে এসেছিলাম বুঝতে পারছি না।
যুবক তখন গলা খায়েরী দিয়ে বলল, চাচা, চাচা শুনছেন?
একটু পরেই একজন মাঝ-বয়সী লোক বের হয়ে এল পাশের দরজার থেকে। সামনে এসে দাঁড়াল।
যুবক বলল, রশিদ কি চলে গেছে?
-জ্বী চলে গেছে। ডাক দিবো?
-থাক, ডাকতে হবে না। আপনি যান।

মাঝ-বয়সী লোকটা একবার তাইরার দিকে তাকাল। তারপর ঘরের ভেতরে চলে গেল। যুবক বলল, আপনি এখানে এসে একটু বসুন। আমি গাড়ির চাবিটা নিয়ে আসছি। আপনি কিছু খাবেন কি? চা কিংবা কফি! আপনার মুখ দেখে মনে হচ্ছে বেশ লম্বা সময় ধরে হাটছেন!

তাইরা একটু হাসল। তারপর বারান্দায় উঠে এল। বলল, এখন কিছুই খাবো না। ধন্যবাদ। আমি আসলে রিসোর্টে ফিরে যেতে চাই। ওরা নিশ্চয়ই আমাকে খুজতে বের হয়েছে।
যুবক একটু মাথা কাত করে তাইরার কথাই সম্মতি জানাল তারপর ভেতরে চলে গেল। তাইরা চেয়ারে বসতে বসতে চারিদিকে দেখতে লাগল। আশে পাশে আর কেউ নেই। এই এতোটা সময়ে সে বাগানের ভেতরে ঘুরে বেড়াল। কোন মানুষের সাথে তার পরিচয় হয় নি। এতো ভয় সে জীবনে পায় নি। এভাবে একা একা বের হয়ে আসাটা একদম উচিত হয় নি। মোবাইলের চার্জটাও যে এমন সময় শেষ হয়ে যাবে সেটা কে ভেবেছিল! সারাদিনের স্যুটিংয়ের কারণে মোবাইলটা ঠিকমত ধরাই হয় নি। তার এসিস্ট্যান্টও দেখে নি যে চার্জ দেওয়া নেই। স্যুটিং শেষ করে সে বের হয়েছিল একটু হাটতে। চারদিকটা অনেক সুন্দর। একটার পর একটা ছবি তুলছিল। এক সময়ে ধুপ করে মোবাইলটা বন্ধ হয়ে গেল। মোবাইলটা বন্ধ হয়ে যাওয়ার পরেই তাইরা টের পেল যে হাটতে হাটতে আর ছবি তুলতে তুলতে যে অচেনা পথ হারিয়ে ফেলেছে। সে বেশ কিছুটা সময় এদিক ওদিক দৌড়াদৌড়ি করল বটে কিন্তু কাজ হল না। তারপর কত সময় পার হয়েছে তাইরার কোন ধারণাই নেই। এক সময়ে ধুপ করে অন্ধকার নেমে এল।
যুবক ফিরে এল একটু পরেই। তার হাতে একটা চাদর। সেটা তাইরার দিকে বাড়িয়ে দিতে দিতে বলল, আপনার সম্ভবত ঠান্ডা লাগছে। এই চাদর গায়ে জড়িয়ে নিন।
তাইরার সত্যিই ঠান্ডা লাগছে। একটা টিশার্ত আর কালো লেগিংস পরে সে বের হয়েছিল হাটতে। আর কিছুই সাথে নেয় নি। ভেবেছিল একটু হেটেই ফিরে আসবে। তাইরা চাদরটার দিকে তাকিয়ে একটু ইতস্তর করল একটু। সেটা দেখে যুবক বলল, ধোয়া চাঁদর। কেউ গায়ে দেয় নি।
তাইরা একটু লজ্জা পেল বটে। তারপর চাদরটা নিয়ে জড়িয়ে নিল শরীরে। বলল, এদিকে কি সব সময়ই ঠান্ডা পরে? ঢাকাতে তো ডিসেম্বরও ঠিকমত শীত পরে না।
-হ্যা এদিকে ঠান্ডা থাকে সব সময়। আসুন আপনাকে পৌছে দিচ্ছি। স্টেটের রিসোর্টে উঠেছেন তো?
-জ্বী!

তাইরা যুবকের পেছন পেছন গিয়ে জিপে উঠল। বসল জিপের প্রথম সিটে। এই জিপ গাড়িগুলোর কোন দরজা নেই। একেবারে খোলা। গাড়ি চলতে শুরু করলে যুবক বলল, তাহলে আপনি ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রিকে আছেন? ম্যানেজার সাহেব বলছিলেন যে একটা গ্রুপ আসছে শ্যুটিংয়ের জন্য।
তাইরার ধারণাই ঠিক তাহলে। এই কম বয়সে এই এস্টেটের ম্যানেজার হওয়ার সম্ভব না। সে নিশ্চয়ই অন্য কোন পোস্টে চাকরি করে।
তাইরা বলল, শুনেছি আমাদের ডিরেক্টর সাহেব এই বাগানের ম্যানেজার সাহেবের কোন ভাবে পরিচিত। তিনিই ম্যানেজ করেছেন।
যুবক বলল, সরি, আমি আসলে আপনাকে ঠিক চিনতে পারি নি। মানে আমি নাটক সিনেমা একদমই দেখি না। দেখতেই পাচ্ছেন যে কোথায় থাকি। এখানে এসব দেখাও যায় না। আর বাস্তব জগতের অনেককেই আমি চিনি না।
তাইরাও বুঝতে পেরেছিল। এই যুবক আসলেই তাকে চেনে না। চিনলে তার মুখের ভাব অন্য রকম হত। তবে না চিনেও তার প্রতি যে যথেষ্ঠ আন্তরিক আচরণ করল।
আরও মিনিট পনের পরে এসে গাড়িটা থামলো রিসোর্টের সামনে। তাইরা গাড়ি থেকে নামতে নামতে বলল, আপনাকে যে কী বলে ধন্যবাদ দিব বুঝতে পারছি না।
যুবক হাসল একটু। তারপর বলল, কোন সমস্যা নেই। রাত হয়ে যাচ্ছে। আজকে যাই!

তাইরা একটু অবাকই হলে এতো দ্রুত যুবক তার কাছ থেকে বিদায় নিয়ে চলে গেল বলে। গাড়িটা যখন তাকে ছেড়ে চলে গেছে তখনই সে বুঝতে পারল যে তার শরীরে যে চাদরটা রয়েছে সেটা ফেরত দেওয়া হয় নি।

পরের দুইটা দিন স্যুটিংয়ের কাজ তাইরা ব্যস্ত রইলো। তৃতীয় দিনে কাজ শেষ হল মোটামুটি। তৃতীয় দিনে তাইরা তার সাথে কয়েকজন কো-আর্টিস্ট মিলে এস্টেস্টটা ঘুরে দেখতে লাগল। এক দিকে এই পুরো চা বাগানের ফ্যাক্টরি রয়েছে। চা পাতা সেখানে নিয়ে প্রোসেসিং করা হয়। তাইরা যখন ফ্যাক্টরিতে ঢুকল তখন স্বয়ং ম্যানেজার তাকে ঘুরিয়ে দেখাতে লাগল সবকিছু। কিন্তু তাইরার চোখ যেন অন্য একজনকে খুজছিল। সেদিনের সেই যুবক কোথায় রয়েছে!
যখন তারা ম্যানেজারের রুমে বসে নাস্তা খাচ্ছিল তখনই তাইরার চোখ পড়ল সেই যুবকের দিকে। সে গাড়ি নিয়ে ফ্যাক্টরিতে ঢুকছে। তাইরা দেখতে পেল ম্যানেজার সাহবে কিছুটা ব্যতিব্যস্ত হয়ে ওদের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে দরজা দিয়ে বের হয়ে গেল। যুবক ফ্যাক্টরির পাশে থাকা একটা ছোট ঘরের দিকে পা বাড়াল। সেটা যে তার অফিস তাইরার বুঝতে কষ্ট হল না। বিশেষ করে ম্যানেজার সাহেব যখন তার সামনে দাঁড়িয়ে কথা বলতে লাগল তখন তাইরার চোখে ব্যাপারটা ধরা পড়ল। ম্যানেজার সাহেবের মধ্য একটা নতুজানু ভাব রয়েছে। তার মানে কি এই যুবক বড় কোন পোস্টে রয়েছে? অবশ্য তাইরা তখনই তার কৌতুহল মেটানোর সুযোগ পেল না। ম্যানেজারের সাথে যুবক তার অফিসরুমে ঢুকে গেল। সেখানেই অনেকটা সময় পার করে দিল তারা। তাইরাতা নাস্তা খেয়ে তারপর বের হয়ে এল।

সবাই যখন বাগান দেখায় ব্যস্ত, তাইরার মনের ভেতরে যুবকের চিন্তা ঘুরতে লাগল। কিছুতেই সেটা বের করতে পারছিল না। ঘুরে ফিরে যুবকের কথাই তার মনের ভেতরে ঘুরপাক খাচ্ছিল। কেন খাচ্ছিল সেটা তাইরার জানা নেই। সন্ধ্যাবেলা তাই সে আবারও বের হয়ে গেল সেই বাংলোতে যাওয়ার জন্য। এবার অবশ্য পথ হারানোর ভয় তার ভেতরে নেই। সে তার নিজের ফোনে ম্যাপ চালু করল। ম্যাপে সম্ভাব্য বাংলোটাও সে খুজে পেল। সেই অনুযায়ী হাটতে শুরু করল।
আজকেও হাটতে হাটতে প্রায় সন্ধ্যা নেমে এল। সেদিনের মত সেই বাংলোর সামনে এসে হাজির হল সে। তবে আজকে বাংলোর বারান্দায় সেই যুবককে দেখতে পেল না। এমনকি জিপটাও নেই আজকে। তার মানে যুবক এখনও বাসায় ফেরে নি।
গেট খুলে ভেতরে যাবে কিনা সেটা যখন ভাবছে তখন সেদিনের সেই মাঝ-বয়সী লোকটা বারান্দায় এসে হাজির হল। তাইরা তাকে দেখেই গেট খুলে ভেতরে ঢুকল। লোকটার দিকে তাকিয়ে একটু হেসে তাইরার বলল, উনি নেই বাসায়?
-ছোট সাহেব তো ঢাকা গেছেন আজকে!
-ও! আচ্ছা। আমি আসলে সেদিনের চাদরটা দিতে এসেছিলাম।
আসলে এই অযুহাতেই তাইরা এসেছিল এখানে। গতদিনের চাদরটা সে ফেরত দিবে। কিন্তু যখন শুনল যে ছোট সাহেব বাসায় নেই, ঢাকা গেছে তখন সে একটু হতাশই হল। চাদরটা সে লোকটার হাতে দিল। তারপর বলল, আপনাদের ছোট সাহেবের নাম কী?
-ছোট সাহেবের নাম সায়েম চৌধুরী।
তাইরা আর কিছু জিজ্ঞেস করল না। একটু মন খারাপ করেই ফিরে এল। পরের দিন তাদের স্যুটিংয়ের দল ঢাকা ফেরত গেল। তবে সায়েম চৌধুরী তার মন থেকে হারিয়ে গেল না। কেন সে হারিয়ে গেল না সে তাইরা জানে না। প্রায়ই দিনই তাইরার মনে পড়তো সেই দৃশ্যের কথা। রাতের অন্ধকারে তাইরে সেই বাংলো বাড়িতে ফিরে যেত। দেখতে পেত সায়েম নামের সেই মানুষটা বাংলোর বারান্দায় বসে বই পড়ছে আপন মনে। তাইরার আগ্রহের ব্যাপার অবশ্য অন্য খানে।
ঢাকাতে এসে তাইরে একটু খোজ করার চেষ্টা করেছিল এই সায়েম চৌধুরীকে নিয়ে। তিনি চৌধুরীর গ্রুপের মালিক আজিজ চৌধুরীর ছোট ছেলে। এটা জানার পরে তাইরা বেশ অবাক হয়েছে। চৌধুরী গ্রুপের কথা জানে না এই দেশে এমন কেউ নেই। সেই গ্রুপের ছোট ছেলে কিনা এমন নির্জন মানুষ বিজর্তিত বাগানে থাকে। সে খোজ নিয়ে জেনেছে সে তার বাবা ও বড় দুই ভাই ঢাকার সব ব্যবসা বানিজ্য সামলায়। আর সে সিলেট শ্রীমঙ্গলের সব কিছু দেখাশোনা করে। পুরোটা সময় শ্রীমঙ্গলের সেই চা বাগানের সেই বাংলোতেই থাকে। চা বাগান ছাড়াও ওখানে তাদের গরুর খামার, মুরগির খামার, মাছসহ আরও অনেক কিছু রয়েছে। পুরোটাই সে একাই দেখাশোনা করে বাগানের সেই ছোট অফিস থেকে। তবে কাজ শেষ হলেই সে সবার কাছ থেকে একেবারে দুরে চলে যায়। নির্জন বাংলোবাড়িতে সময় কাটায়। বই পড়ে কিংবা মাছ ধরে। এভাবে সে সময় পার করে। এই ব্যাপারটা তাইরাকে প্রবল ভাবে বিস্মিত করেছে। কেন একজন মানুষ এভাবে জীবন পার করবে, তাও সায়েমের মত একজন মানুষ। বাড়ির ছোট ছেলেরা তো এমন হয় না সাধারণত।
এই কারণটা সে জানতে পারল আরও মাস দুয়েক পরে। সায়েম চৌধুরীর সাথে তার আবারও দেখা হল।

চৌধুরী গ্রুপের একটা বিজ্ঞাপনের জন্য তাইরার সাথে যোগাযোগ করা হল। স্যুটিং স্পট ঠিক হল সেই একই বাগানে। একই রিসোর্টে তাইরার থাকার ব্যবস্থা হল। স্যুটিংয়ের দিন সায়েম একটু এসে হাজিরও হল সেখানে। ওকে দেখে একটু অবাক হল বটে। তাইরার মনটা একটু আনন্দিত হল এটা দেখে যে সায়েম চৌধুরী তাকে মনে রেখেছে। সায়েম চৌধুরী তার দিকে তাকিয়ে বলল, আরে আপনি এখানে?
-হ্যা।
-আপনাকেই যে মডেল হিসাবে যোগাযোগ করা হয়েছে, সেটা জানতাম না।

সায়েম অবশ্য বেশি সময় থাকল না। তবে সেদিন ম্যানেজার সাহেবের সাথে তাইরার বেশ লম্বা সময় কথা হল। ম্যানেজার সাহেবের কাছ থেকেই তাইরা আসল কারণটা জানতে পারল যে কেন সায়েম এই নির্জন জায়গায় থাকে। নিজের কাজ কর্ম নিয়ে ব্যস্ত থাকে আর তার বাইরে আর কারো সাথে ঠিক মেলামেশা করে না। কারণটা জানার পরে সায়েমের প্রতি তাইরার আকর্ষণ যেন আরও বহুগুণে বেড়ে গেল। বারবার মনে হতে লাগল যে আজকের যুগেও এমন মানুষ আছে? এমন ভাবে আজকের পুরুষরা কাউকে ভালোবাসতে পারে? ম্যানেজার সাহেবের কাছ থেকে সায়েম চৌধুরীকে সে মাথা থেকে বের করতেই পারছে না। শ্যুটিংয়ের কাজ শেষ হয়ে গেলেও তাইরা ঢাকা চলে গেল না। পুরো টিম চলে গেল বটে সে রয়ে গেল। আরেকটা দিন বিকেল বেলা হাটতে হাটতে সে আবারও সায়েমের বাংলোর কাছে গিয়ে হাজির হল। আজকে তাকে ঠিকই দেখতে পেল সে। গায়ে চাদর জড়িয়ে সে বারান্দায় বসে রয়েছে। আজকে অবশ্য সে বই পড়ছে না। তাইরা গেটের কাছে আসতেই তাকে দেখতে পেল সে। তাইরা একটু দ্বিধা নিয়ে ভেতরে ঢুকে এল।
-আপনি ফিরে যান নি এখনও?
তাইরা হাসল। বলল, আসলে আপনাদের এই জায়গাটা এতো সুন্দর যে দুটোদিন বেশি থাকার লোভ সামলাতে পারলাম না। আবার হয়তো সুযোগ নাও আসতে পারে!
সায়েম বলল, এখানকার সব রিসোর্টগুলো সুন্দর। আমরা আসলে টুরিস্ট ব্যবসার কথা চিন্তা করে রিসোর্টটা বানাই নি। নিজেদের ব্যবহারের জন্যই বানানো।
-আচ্ছা, তার মানে বলছেন যে পরের বার এখানে এলে আর এখানে থাকা যাবে না। বাইরের কোন রিসোর্টে থাকতে হবে!

সায়েম চৌধুরী কিছু সময় তাইরার দিকে তাকিয়ে থেকে হেসে ফেলল। তারপর বলল, না না। এমন কিছু বলছি না। আপনি পরের বার রলেও এখানেই থাকতে পারবেন। কোন সমস্যা নেই।
তাইরা বলল, আমি বুঝতে পারছি। আমি আসলে এমনি কথার কথা বললাম। প্রিয় মানুষের স্মৃতি রক্ষা করার ইচ্ছেটা স্বাভাবিক। বাইরের মানুষজন তা কোনদিন বুঝতেই পারবে না। তাই না?

এই কথা শুনে সায়েব চৌধুরী কিছুটা সময় তাইরার দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর বলল, বোঝার জন্য ধন্যবাদ। চা খাবেন?
তাইরা সাথে সাথে বলল, আমাকে পুকুর পাড়ে নিয়ে যাবেন একবার?
-ওখানে গিয়ে কী করবেন?
-আমি আসলে একটা বার একটু দেখতে চাই। আর কিছু না। কথা দিচ্ছি আমি সাবধান থাকব। কোন কিছু নষ্ট করব না।

সময়টা বিকেলের শেষ। তখনও কিছু সময় বাকি রয়েছে পুরোপুরি আলো নিভতে। সায়েব বলল, চলুন নিয়ে যাই আপনাকে।

পুকুরটা বাংলো থেকে আরও মিনিট দশেক হাটার পথ। তাইরা যখন সেখানে হাজির হল তখন দিনের আলো কমে এসেছে। পুকুরে কাঠের পাড় বাঁধানো রয়েছে। তার পাশে ছোট একটা কাঠের ঘর। কেবিন জাতীয়। পাড়ের কাছে গিয়ে বুজতে পারল যে ঘরটার সামনে ছোট একটা বারান্দা রয়েছে। বারান্দাটা পুকুরের পানির উপরে গিয়ে পড়েছে। বারান্দা থেকে চাইলে কেউ পা ঝুলিয়ে বসতে পারে। তার পা গিয়ে পরবে পুকুরের পানিতে।
সায়েম বলল, ইরার খুব পছন্দের জায়গা ছিল এটা। এই জায়গাটা ঠিক আগের মতই রাখা হয়েছে। ইরার যেমনটা পছন্দ কর। আমি যতবার কাজের জন্য এখানে আসতাম ইরাও আমার সাথেই আসত। দিনের বেশির ভাগ সময়ে সে এখানে বসে বই পড়ত। তারপর যখন…
সায়েব আর কথাটা শেষ করল না। একভাবে সে পুকুরের দিকে তাকিয়ে রইল। তাইরা জানে এরপর কী হয়েছিল। যখন সিঙ্গাপুরের ডাক্তারেরা জানিয়ে দিয়েছিলেন যে ইরার ফোর্থ স্টেজ ক্যান্সারের আর কোন চিকিৎসা নেই, তখন ইরা দেশে ফিরে আসতে চাইল। তাকে প্রথমে ঢাকার হাসপাতালে থাকলেও এক সময়ে সে এই খানে এসে হাজির হল। শেষ দিনগুলো সে তার পছন্দের জায়গাতে থাকতে চায়। এই কেবিনেই একটা ছোটখাটো হাসপাতাল ঘর বানানো হয়েছিল। সায়েম পুরোটা সময় থাকত এখানেই। তারপর এখানেই ইরা মারা যায়। তার পছন্দের জায়গাতেই।
তারপর থেকে সায়েম আর ঢাকায় যায় নি। এখানেই ইরার পাশেই রয়ে গেছে। ইরার স্মৃতি নিয়ে। এইপুরো গল্পটা শোনার পরে তাইরার মনের ভেতরে একটা অদ্ভুত বিষন্নতা এসে ভর করেছে। নাটক সিনেমাতে সে অভিনয় করে, কত চমৎকার গল্পে সে অভিনয় করে। কিন্তু বাস্তবে এমন একটা ভালোবাসার গল্পের কাছে সে হাজির হবে সেটা কোনো দিন ভাবে নি।
তাইরা আর সায়েম বেশ কিছু সময় নিশ্চুপ হয়ে সেই পুকুর পাড়ে দাঁড়িয়ে রইল। কেউ কন কথা বলল না। এক সময় রাত নামল। চারপাশটা অন্ধকার হয়ে এল।
-চলুন রাত হয়ে যাচ্ছে!
-হ্যা। চলুন যাওয়া যাক!
একটু দূর হাটতে হাটতে তাইরা বলল, আচ্ছা একটা ব্যাপার কি জানেন?
-কী?
-আমি সম্ভবত আপনার প্রেমে পরেছি। ঠিক বুঝতে পারছি না।
তাইরা অনুভব করল সায়েম একটু যেন থেমে গেছে। তবে আবার চলতে শুরু করল। তাইরা আবারও বলল, প্রথম যেদিন আপনার সাথে দেখা হল সেদিন আপনাকে দেখে আমার কেন জানি মনে হচ্ছে আপনি কোন নাটকের চরিত্র। একেবারে পার্ফেক্ট ভাবে বসে আছেন। তারপর আবার যখন আপনাকে দেখলাম তখনও তাই মনে হল। এরপর যখন আপনার সম্পর্কে আমি সব কিহচু জানতে পারলাম, জানেন আমি কোন ভাবেই আপনার চিন্তা মাথা থেকে বের করতে পারছি না। কোন ভাবেই না। এটা হয়তো মোহ হতে পারে। এই পরিবেশটাই আসলে এমন। প্রেম প্রেম ভাব হওয়া স্বাভাবিক। হয়তো ঢাকায় ফিরে গেলে সব কেটে যাবে!
সায়েম বলল, তাই হয়তো!
-তবে যদি না হয় তখন?
সায়েম এই প্রশ্নের উত্তর দিল না। তাইরা বলল, আমি জানি এই প্রশ্নের উত্তর আপনার কাছে নেই। আমার নিজের কাছেও নেই। যাই হোক এতো চিন্তা করে লাভ নেই। এই যে আপনার পাশে হাটছি এটা আমার জীবনের অন্যতম সুন্দর সময়গুলোর একটা মনে হচ্ছে। আপনি হয়তো বিরক্ত হচ্ছে তবে বিরক্ত হয়ে লাভ নেই। আমি খুব জোঁক চাইপের মেয়ে। এতো সহজে আপনার পিছু ছাড়ছি না, বুঝলেন!

সায়েম হেসে ফেলল। বিশেষ তাইরা নামের এই মেয়েটার ছেলেমানুষী দেখে! এভাবে অকপটে কেউ এই কথা বলে দিতে পারে সেটা সায়েমের জানা ছিল না।

পরদিন ঢাকা ফেরার আগে তাইরা আরেকটাবার সায়েমের সাথে দেখা করতে গেল। সায়েব তখন নিজের অফিসে ব্যস্ত ছিল তাইরাকে ঢুকতে দেখে একটু সম্ভাষণ জানাল। তাইরা বলল, আমি কিন্তু সত্যিই আবারও আসব। কাজ থেকে একটু সুযোগ পেলেই চলে আসব। মানা করতে কিন্তু পারবেন না।
সায়েম হেসে বলল, আচ্ছা কোন সমস্যা নেই।
-আর আপনি ঢাকা গেলেই অবশ্যই আমার সাথে যোগযোগ করবেন।
-আচ্ছা।
-না শুধু আচ্ছা বললে চলবে না। দেখা করতেই হবে।
-আচ্ছা।

সায়েম দরজার পর্যন্ত এল তাইরাকে এগিয়ে দিতে। অফিসের অনেকেই তাইরার সাথে একটা ছবি তোলার জন্য দাঁড়িয়ে আছে। তাইরা সবার সাথেই হাসিমুখে ছবি তুলল। তবে তার চোখে সায়েমের দিকে। সায়ে এই চোখের ভাষা চেনে। মেয়েটা কেবল মোহ পরে নি। মেয়েটা সত্যিই তার প্রেমে পড়েছে। গাড়িতে ওঠার আগ পর্যন্ত তাইরা কতবার তার দিকে ফিরে তাকালো তার ঠিক নেই। এমন কি যতদুর পর্যন্ত সম্ভম তাইরা সায়েমের দিকেই তাকিয়ে রইল গাড়ির জানালা দিয়ে। এতোদুর থেকেও তাইরার চোখের কোণের চিকচিক করা অশ্রু বিন্দু চিনতে সায়েমের কষ্ট হল না। অদ্ভুত একটা অনুভূতি হল তার নিজের মনে। ঢাকা গেলে মেয়েটার সাথে একবার দেখা করা যাবে।

হয়তো সায়েমের সাথে তাইরার নতুন কোন গল্প হবে আবার হয়তো হবে না। হয়তো সাইয়েম তার প্রায়ত স্ত্রীর স্ত্রী আঁকড়ে ধরেই বাকি জীবন কাটিয়ে দিবে আবার হয়তো সায়েমের জীবনে নতুন করে তাইরা নামের মেয়েটা জায়গা করে দিবে, সৃষ্টি হবে নতুন ভালোবাসার স্মৃতি! তবে সে অন্য কোন গল্পে। আজকের গল্প এখানেই শেষ।

ফেসবুকের অর্গানিক রিচ কমে যাওয়ার কারনে অনেক পোস্ট সবার হোম পেইজে যাচ্ছে না। সরাসরি গল্পের লিংক পেতে আমার হোয়াটসএপ বা টেলিগ্রামে যুক্ত হতে পারেন। এছাড়া যাদের এসব নেই তারা ফেসবুক ব্রডকাস্ট চ্যানেলেও জয়েন হতে পারেন।

অপু তানভীরের নতুন অনুবাদ গ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে

বইটি সংগ্রহ করতে পারেন ওয়েবসাইট বা ফেসবুকে থেকে।

How useful was this post?

Click on a star to rate it!

Average rating 4.8 / 5. Vote count: 29

No votes so far! Be the first to rate this post.

About অপু তানভীর

আমি অতি ভাল একজন ছেলে।

View all posts by অপু তানভীর →

One Comment on “স্মৃতিরা রয়ে যায়”

  1. গল্পটা পড়ার পর মনটা ব্যাথাতুর হয়ে উঠল; সায়েমের এই যে নিভৃতে পরম মমতায় স্মৃতির সাথে বসবাস, তা আজকের এই দ্রুতগতির পৃথিবীতে ঠিক যেন এক বিষণ্ণ অথচ সুন্দর তৈলচিত্র।

    তাইরার মতো গ্ল্যামারাস জগতের একজন মানুষের এমন সহজ আর সাহসী স্বীকারোক্তি এবং সায়েমের সেই নীরবতা- দুটোর বৈপরীত্য আপনি খুব চমৎকার করে ফুটিয়ে তুলেছেন।

    স্মৃতি আঁকড়ে থাকা যেমন সম্মানের, তেমনি নতুন করে জীবনের স্পন্দন অনুভব করাটাও যে কোনো অপরাধ নয়, গল্পের শেষে আপনার রাখা এই প্রশ্নটি এই পাঠক মনকে দ্বিতীয়বার ভাবতে বাধ্য করেছে। জীবন আর ভালোবাসার এমন সূক্ষ্ম অনুভূতিগুলো শব্দবন্দী করার জন্য আপনাকে অনেক ধন্যবাদ!

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *