অফিসের শেষে মীরা মাঝে মাঝে এই রুফটপ ক্যাফেতে এসে বসে। এখানকার কফিটা খুব বেশি ভাল না হলেও কাজ চালিয়ে নেওয়া যায়। তবে এখানে আসার কারণ হচ্ছে এখানকার নির্জনতা। এখানে খুব বেশি মানুষজন আসে না। মীরা শান্তিমত এখানে বসে সময় কাতাতে পারে। আজকেও মীরা কফির কাপটা সামনে নিয়ে বসে আছে। আজকে কয়েকদিন ধরেই মীরার মনটা কেমন যে লাগছে। ঠিক মত কাজে মন বসছে না। কেন বসছে না সেটাও সে জানে না। এমন অদ্ভুত একটা অনুভূতি তার কেন হচ্ছে সেটা সে জানে না। বারবার কেবল মনে হচ্ছে যেন কোথাও কিছু একটা যেন তার নেই। কাউকে যেন সে খুব মিস করছে। কিন্তু কাকে যে সে মিস করছে সেটাই সে জানে না। এমন অদ্ভুত অনুভূতি হওয়ার কারণ কী সেটা সে জানে না।
কফিতে একটা চুমুক দিল সে। তারপর তাকাল আকাশের দিকে। আকাশটা লাল হয়ে আছে। এই লাল হয়ে আসা আকাশটা তার কাছে পরিচিত মনে হল বেশ। মনে হল যেন এই আকাশটা সে আগেও দেখেছে। অবশ্য প্রায় সন্ধ্যায় সে এখানে আসে। কিন্তু এই আকাশটা যেন অন্য রকম লাগছে!
-চমৎকার না আকাশটা?
মীরা একটু চমকে উঠল। একজন মানুষ কখন যে তার পাশে এসে বসেছে সেটা সে টেরই পায় নি। তার সমান বয়সীই এক যুবক। মেজাজটা একটু যেন খারাপ হতে গিয়েও হল না। যুবকের চোখের দিকে চোখ পড়তেই মীরার মনে হল যেন এই চোখ সে অনেক দিন ধরেই চেনে। অথচ তার চেহারাটা মীরার পরিচিত মনে হল না। আবার চোখের দিকে তাকিয়ে মনে হল এই চোখ তার চেনা। বড় অদ্ভত একটা অনুভূমি হল তার। মীরা কিছু সময় তাকিয়ে থেকে নিজেকে সামলে নিল। তারপর বলল, আপনাকে কি আমি চিনি?
যুবক হাসল একটু। চেয়ার চেনে বসতে বসতে বলল, হ্যা আবার না!
-মানে?
-মানে হচ্ছে একদিক দিয়ে আপনি আমাকে চেনেন আবার বাস্তবতা বিচার করলে চেনেন না।
-হেয়ালি না করবেন না দয়া করে। আমি হেয়ালি শোনার মুডে নেই।
এই লাইনগুলো মীরা একটু কঠিন করেই বলল। তবে মুখ দিয়ে শব্দগুলো বের হয়ে যাওয়ার পরে ওর মনে একটু আফসোস হতে লাগল যে এতো কঠিন করে বলার কী দরকার ছিল। নিজের খারাপ দিন যাওয়া মানে তো এটা না যে অন্যের সাথে খারাপ ব্যবহার করতে হবে!
তবে যুবকের চেহারা দেখে মীরার মনে হল সে কিছু মনে করল না। এমন একটা চেহারা নিয়ে সে মীরার দিকে তাকিয়ে রয়েছে যেন সে জানতোই যে মীরা এমন কঠিন স্বরে কথা বলবে।
যুবক বলল, সরি বলতে হবে না। আমি কিছু মনে করি নি। বসের কাছ থেকে ঝাড়ি খেলে অনেকেরই মাথা ঠিক থাকে না।
এবার মীরা সত্যিই একটু অবাকই হল। কারণ সত্যিই মীরা সরি বলতে যাচ্ছিল। আর অফিসে যে আজকে বসের ঝাড়ি শুনেছে এটা এই যুবক কিভাবে জানল! মীরা এবার যুবকের দিকে তাকাল ভাল করে। সে যেন বুঝতে পারছে না কিছু? এই যুবক কি তার অফিসে কাজ করে? নাহ! সেটা সম্ভব না। নতুন জয়েন করলেও মীরা এই ছেলেকে ঠিকই চিনত।
যুবক হেসে বলল, না আমি আপনাদের অফিসেও চাকরি করি না!
এবার মীরা সত্যিই অবাক না হয়ে পারল না। এই ছেলে তার মনের কথা কিভাবে জেনে যাচ্ছে? এটা কিভাবে সম্ভব?
যুবক বলল, ভয় পাবেন না। আমি আপনার মনের খবর পড়তে পারছি না। কারো মনের কথা পড়া আমার পক্ষে সম্ভব না। আমার কেন, কারোর পক্ষেই সম্ভব না।
-তাহলে কিভাবে বলছেন?
যুবক একটু চুপ করল। তারপর বলল, আমি জানি কারণ এই একই ঘটনা আমার সাথে বারবার হয়েছে।
মীরা যেন ঠিকমত বুঝতে পারল না। সে বলল, আপনার কথা ঠিক বুঝলাম না। বারবার হয়েছে বলতে!
-আপনি আমার কথা বিশ্বাস করবেন না জানি তবুও বলি। আমি এই দৃশ্যটা এর আগেও অনেকবার দেখেছি, আপনার সাথে আমার আরও কয়েকবার কথা হয়েছে। ভাল করে বললে এই নিয়ে ২৮বার ঘটল ঘটনাটা।
মীরা কী বলবে ঠিক বুঝতে পারছে না। সামনের যুবক যা বলছে সেটা আসলে বিশ্বাস করার মত ব্যাপার নয়। তবে যুবকের চেহারা দেখে কেন জানি মনে হল যুবক যা বলছে সত্যি বলছে। কেন তার এটা মনে হল সেটা সে নিজেও জানে না।
যুবক বলল, আপনার হয়তো আমার কথা বিশ্বাস হচ্ছে না। তবে আমি আপনাকে এমন কথা বলতে পারি যাতে আপনার বিশ্বাস হবে।
-যেমন?
-এই ক্যাফেটার ব্যাপারে তো খেয়াল করে দেখেছেন, এখানে কেবল লিফট দিয়েই আসা যায়। তাই না?
মীরা জানে এটা। এই ছোট ক্যাফেতে কেবল লিফট করে আসা যায়। সিড়ির ঘরের দরজাটা বন্ধ করা। পুরো সিড়িঘরটা একটা গুদাম হিসাবে ব্যবহার করা হয়।
-হ্যা। আমি জানি এটা।
-আর মাত্র মিনিট দুয়েক পরেই বিদ্যুৎ চলে যাবে। জেনারেটর চালু হওয়ার কথা থাকলেও সেখানেও ঝামেলা হবে। তার মানে হচ্ছে এখানে আপনি বেশ লম্বা সময়ের জন্য আটকা থাকবেন আমার সাথে। আর একটা ব্যাপার খেয়াল করে দেখুন যে ক্যাফের ছেলেটা কিন্তু নেই। সে আপনাকে কফি দিয়ে নিচে গেছে ওয়াশরুমে। সেও ঢুকতে পারবে না। তবে আপনি যদি ঠিক দেড় মিনিটের ভেতরেই এখান থেকে বের হয়ে যেতে পারেন তবে আপনি আমার সাথে আটকা পড়বেন না।
মীরার মনের ভেতরে অদ্ভুত একটা অনুভূতি হল। সে আসলেই বুঝতে পারল না আসলে এখন ওর কী করা দরকার। সামনে বসা ছেলেটা যা বলছে সেটা বিশ্বাস করার কোন মানে নেই। কিন্তু আবার সে এমন ভাবে বলছে যে না বিশ্বাস করার কোন আরণও নেই।
মীরা বলল, আমি কফি শেষ করি তারপর যাব এর আগে।
যুবক হাসল। হাসিটার অর্থ হচ্ছে আমি জানি এমনই হবে। এমনই ভাবে সব হওয়ার কথা।
ঠিক দুই মিনিটের মাথায় সত্যিই বিদ্যুৎ চলে গেল। কাছেই কোথাও ট্রান্সমিটার ব্লাস্টের শব্দ হল। মীরা আশা করেছিল এখনই জেনারেটর চালু হয়ে যাবে। হলও বটে। তবে সেটাও কয়েক মুহুর্তের জন্য। আরেকটা ব্লাস্টের আওয়াজ হল। এবার সেটা যে বিল্ডিংয়ের ভেতর থেকেই সেটাও বুঝতে পারল।
মীরার চোখে মুখে এবার একটা চিন্তার রেখা ফুটে উঠল। যদি সত্যিই জেনারেটরটা ব্লাস্ট হয়ে থাকে তবে সেটা চালু হবে না। তার মানে বিদ্যুৎ না আসা পর্যন্ত এখানেই আটকে থাকতে হবে।
তাহলে কী যুবক সত্যি কথা বলছে! মানে?
কিভাবে সম্ভব?
যুবক বলল, আমার রাফিদ! আমি একজন বেকার।
-বেকার?
-ঠিক বেকার না। চাকরি থেকে অবসর নিয়েছি। ঢাকা শহর ছেড়ে গ্রামে গিয়ে থাকি। সেখানে কিছু জমি-জমা আছে সেটাই চাষ করি। আর ঘুরে বেড়াই। বইপত্র পড়ি। ঢাকাতে এসেছিলাম একটা কাজে। একজনের সাথে করার দরকার ছিল। আজকে এখানেই তার আসার কথা ছিল। কিন্তু এই ঝামেলায় আটকা পড়ে গেলাম।
-আমি আসলেই আপনার কথা বুঝতে পারছি না। আটকা বলতে? একটু পরেই বিদ্যুৎ চলে আসলেই লিফট চালু হয়ে যাবে তখন বের হয়ে যেতে পারবেন।
-পারব না। আপনার কথা ঠিক আছে। আমি লিফটে যাওয়ার জন্য ভেতরে ঢুকব। তবে যখন আবার লিফটের দরজার খুলবে আবারও এই ক্যাফেতেই এসে হাজির হব।
মীরা কিছু সময় তাকিয়ে রইলো রাফিদের দিকে। তবে তার মনের ভেতরে একতা চিন্তা কাজ করছে। এখন এই ছোট ক্যাফেতে কেবল তারাই রয়েছে। আর এখন এখান থেকে বের হওয়ার কোন উপায় নেই। যদি এই তার মনে উল্টাপাল্টা কিছু এসে হাজির হয়? চিন্তাটা জোর করে মাথা থেকে দূর করে দেওয়ার চেষ্টা করল। এখন এই দিনের আলোতে এই মানুষ ওর সাথে কিছু করার সাহস করবে না।
মীরা নিজেকে শান্ত রাখার চেষ্টা করল। তারপর বলল, আপনি বলছেন যে আপনি আমার সাথে এর আগে আরু ২৮ বার কথা বলেছেন, তার মানে এই দৃশ্যটা আরও ২৮বার আপনার সাথে ঘটেছে, রাইট?
-২৭বার। আজকে নিয়ে ২৮।
-তার মানে এখানে যা যা হবে সব আপনার আগে থেকেই জানা?
-হ্যা। বলা যায়। তবে প্রতিবার ছোটখাটো কিছু পরিবর্তন হয়। এই যেমন আজকেই আমি প্রথম আপনাকে বললাম যে এটা টাইম লুপ। এর আগের গুলোতে আমি কেবল আপনার সাথে গল্প করেছি।
-কী কী গল্প করেছেন শুনি?
-এই যেমন আপনি বিয়ে করতে চান না। ব্যাপারটা এমন না যে আপনি কাউকে ভালোবাসেন তবে যার সাথে আপনার বাবা আপনার বিয়ে ঠিক করেছেন তাকে আপনার পছন্দ না। বিশেষ করে তার কিছু আচরণ আপনার পছন্দ না। লাইক রেস্টুরেন্টের সেই ঘটনা না!
মীরা এবার সত্যিই চমকালো। এই ব্যাপারটা এই ছেলেটার আসলেই জানার কোন উপায় নেই। এই কথা অন্য কারো জানার কথা না। এই ঘটনা ঘটেছে মাত্র সপ্তাহ খানেক আগে। এই ঘটনা সে কাউকে বলে নি। এই ছেলেটা জানে তার মানে হচ্ছে ছেলেটা সত্যি কথা বলছে। মীরা এবার সত্যিই তাকালো রাফিদের দিকে। ছেলেটার চোখে একটা ক্লান্তির ভাব।
রাফিদ বলল, আপনার কফিটা শেষ হয়ে গেছে দেখা যাচ্ছে। আরেককাপ কফি কি খাবেন?
মীরা বলল, কেউ তো নেই।
-আমি বানাচ্ছি।
-আপনি?
-হ্যা। আমি ভাল কফি বানাতে পারি।
মীরার জবাবের অপেক্ষা না করেই রাফিদ এগিয়ে গেল কাউন্টারের দিকে। রাফিদ যেভাবে পুরো কাউন্টের ঘুরে বেড়াতে লাগল তাতে মীরা বুঝতে পারল যে রাফিদের সব কিছুই চেনা। অথবা চেনা হয়ে গেছে। মীরা তাকে বলল, আমি যখন লিফট দিয়ে চলে যাব তখন আপনি কি করবেন?
-আমি বসে থাকব এখানে। আমি আপনার সাথেই চেষ্টা করেছি কয়েকবার যাওয়ার। তবে লাভ হয় নি। আমি যখন লিফটের বাইরে পা দিব তখন আবারও এই ক্যাফেতেই এসে হাজির হই। তাই আপনার সাথে আমি যাই না আর। এখানেই বসে থাকি কিছু সময়। ক্যাফে বসে আরেককাপ কফি খাই। এদিক সেদিক ঘুরি। নিজের মোবাইল টিপি। একটা মজার ব্যাপার কি জানেন?
মীরা বলল, কী?
আমি যখন প্রথম এখানে ঢুকেছিলাম তখন আমার মোবাইলের চার্যের পরিমান ছিল ৭৪ পার্সেন্ট। সেটা করতে কমতে ৫১ পার্সেন্টে আসে। তারপর আমি যখন আবার লিফটের ভেতরে ঢুকি আবার যখন এই ক্যাফে আসি তখন আবারও আমার ফোনের চার্য সেই আগের ৭৪ পার্সেন্টে চলে আসে। তার মানে আমি যত ইচ্ছে ফোন চালাতে পারি।
-ইন্টারনেট ব্রাউজ করতে পারেন?
-হ্যা পারি, মানুষজনকে ম্যাসেজও দিতে পারি। তবে আমি কারো উত্তর পাই নি কিংবা কেউ সেটা দেখে নি। আবার যখন ঘুরে আমি ক্যাফেতে এসে হাজির হই তখন সেখি সেই ম্যাসেজগুলো গায়েব হয়ে গেছে। এর মানে হচ্ছে পুপের ভেতরে যা যা করি তা আসলে বাস্তবে কারো কাছে পৌছাবে না। তাই আর কারো সাথে যোগাযোগ করি না। তবে আমি নেটে ঘেটে এই ব্যাপারে অনেক খোজ খবর নিয়েছি। বেশির ভাগই সব থিউরি যা প্রমান হয় নি। কিছু মানুষ আমার মত অভিজ্ঞতার কথা শেয়ার করেছে যার কোন ভিত্তি নেই, প্রমান নেই।
মীরা বলল, ওরা কিভাবে সেই লুপ থেকে বের হয়েছে?
রাফিদ কিছু সময় ভাবল। তারপর বলল, ওদের প্রায় সবাই বলেছে যে এমন কোন ঘটনা ঘটবে যেটা লুপ ভেঙ্গে ফেলবে। তবে সেটা যে কি তা তারা জানে না। কেবল একদিন তারা দেখবে তাদের জীবন আবার স্বাভাবিক হয়ে এসেছে।
-আপনিও সে আশাতে আছেন?
-বলতে পারেন। আর সত্যি বলতে কি আমার সময় খারাপ কাটছে না এখানে। বিশেষ করে আপনার সাথে প্রতিদিন এখানে কথা হচ্ছে। গল্প করতে পারছি। এটা চমৎকার ব্যাপার।
মীরা কী বলবে ঠিক বুঝতে পারল না। এখনও মীরার কাছে পুরো ব্যাপারটা একটু অস্বাভাবিক মনে হচ্ছে। এমনটা কি আসলেই বাস্তবে সম্ভব? টাইমলুপ নিয়ে বাস্তবে আসলেই কিছু সম্ভব কিনা সেটা মীরা জানে না। এটা নিয়ে বেশ কিছু মুভি তৈরি হয়েছে, অনেক বই লেখা হয়েছে তবে বাস্তবে! কিন্তু রাফিদ যা বলছে সেটা সে অবিশ্বাসও করতে পারছে না। কেন পারছে না সেটাও সে জানে না।
মীরা বলল, আপনি বললেন আপনি গ্রামে থাকেন?
-হ্যা। গ্রামেই। আমার দাদা বাড়ি মুন্সিগঞ্জ। বালিয়াগাউএ আমাদের বাড়ি আছে কিছু জায়গা জমি ছিল। বাবা মারা যাওয়ার পরে কী যেন হল, আমি চাকরি ছেড়ে দিলাম। আগে একসাথে ঢাকায় থাকতাম। চাকরি ছাড়ার পরে মাকে নিয়ে গ্রামে চলে গেলাম। তারপর নিজেকেদের জায়য়া জমি নিয়ে চাষবাস শুরু।
-সত্যি? পড়াশোনা করে সোজা কৃষক?
-বলতে পারেন। সবাই বলেছিল আমি বেশিদিন সেখানে টিকব না তবে টিকে গেলাম। বছর খানেক পরে মাও আমাকে ছেড়ে চলে গেল। তারপর একদম একা।
মীরা অনুভব করল যে রাফিদের কথা শুনতে তার ভাল লাগছে। কেন লাগছে সেটা সে জানে না। এভাবে কত সময় ধরে দুজন কথা বলল সেটা জানে না। এক সময় আলো জ্বলে উঠল। তার মানে বিদ্যুৎ চলে এসেছে। ওরা দুজনেই তাকাল লিফটার দিকে। মীরা বলল, এখন কী হবে?
-এখন আপনি লিফট দিয়ে নিচে নামবেন!
-আমিও নামব তবে কিছু সময় পরে। তারপর আবারও একটা নতুন লুপের সৃষ্টি হবে।
-আপনি আমার সাথে চলুন।
-আমি গিয়েছিলাম। তবে কাজ হয় নি।
-আচ্ছা এমন যদি হয় আমি বসে থাকতাম আপনি আগে লিফটে ঢুকলেন, তখন?
রাফিদ কিছু সময় চুপ করে রইল। তারপর বলল, আমি এমনটা ভেবেছি। তবে এখানে একটা সম্ভবনা আছে যে আপনি তখন হয়তো লুপে আটকা পড়ে যাবেন। এই রিস্ক আমি নিতে পারি না। আপনি আগে যান!
মীরা ব্যাপারটা ভাবতেই শরীরের ভেতরে একটা শিহরোন বয়ে গেল। সত্যিই যদি এমন হয়, ছেলেটা যদি ওকে আটকে রেখে আগে লিফটে ঢুকে পড়ে পড়ে তখন? অবশ্য ছেলেটার ভেতরে সেই রকম কোন লক্ষ্মণ দেখা যাচ্ছে না। রাফিদ যদি চাইতো তবে খুব সহজেই করতে পারত, এখনও পারে। কিন্তু সে চাইছে না।
রাফিদ বলল, আমাকে নিয়ে ভাববেন না। প্রকৃতি অস্বাভাবিক কিছু বেশি সময় টিকিয়ে রাখে না। এই লুপ সে ঠিক করে ফেলবে। আমি ফিরে যাবো। আপনি চিন্তা করবেন না।
মীরা একটু হাসল কেবল। তারপর ধীর পায়ে উঠে গিয়ে লিফটের বোতাম টিপল। লিফটা ক্যাফের উপরে আসতে এক মিনিট সময় লাগল। দরজা খুলে গেল। ভেতরে ঢোকার আগে সে আরেকবার রাফিদের দিকে তাকাল। ছেলেটা ওর দিকে তাকিয়ে হাসল একটু।
লিফটা ওর অফিস ফ্লোরে নামতেই সে লিফট থেকে বের হল। নিজের অফিসের চিনোচেনা পরিবেশ দেখে ভাল লাগছে ওর। কিন্তু পরক্ষণেই তার রাফিদের কথা মনে পড়ল। তারপর কী যে হল সেটা সে নিজেও জানে না। আবারও লিফটে উঠে পড়ল। তারপর টপফ্লোরের বোতাম চাপল। ভাগ্যভাল যে এরই মাঝে কেউ কোন দিক দিয়ে বোতাম চাপে নি। লিস্টটা সোজা উপড়ে উঠতে শুরু করল। মীয়ার মনে হল যে অনন্তকাল ধরে লিফট চলছেই। লিফটটা থামতেই সে দরজার খোলার জন্য অপেক্ষা করতে লাগল। লিফট থামতেই যেমন করে দরজা খুলে যায় এইবার তেমন যেন হল না। একটু যেন বেশি সময় লাগল। বাধ্য হয়ে সে লিফটের ওপেন বাটনটা কয়েকবার করে চাপ দিল। দরজা যেন খুলছেই না। তবে শেষ পর্যন্ত টুং করে আওয়াজ হল। দরজা খুলছে।
মীরা যখন দরজা খুলে বের হয়ে এল তখন আশা করেছিল রাফিদকে সে দেখতে পাবে। তবে অবাক হয়েই খেয়াল করে দেখল যে কেউ নেই ক্যাফেতে। পুরো ক্যাফেটা চেয়ে দেখল সে। কেউ নেই সেখানে। রাফিদ নামের ছেলেটা গেল কোথায়?
লিফট দিয়ে ছাড়া তো অন্য কোন ভাবে যাওয়া যায় না। আর লিফটটা মীরাকে নিয়ে গেছে আবার মীরা সেই লিফটেই উঠে এসেছে। তাহলে ছেলেটা এরই ভেতরে গেল কোথায়?
মীরা বুঝতে পারছে না। সে কি আবারও লুপের ভেতরে ঢুকে গেছে। ছেলেটা কি সেইখানেই আটকে আছে। মীরার সাথে কফি খাচ্ছে?
পরিশিষ্ট
অফিসে ফেরত এসে মীরা একটা আরেকটা ব্যাপার খেয়াল করল। সময় বেশি পার হয় নি। মীরার হিসাব মত সে রাফিদের সাথে প্রায় ঘন্টা তিনেক ক্যাতে আটকা ছিল। অথচ এখানে দুইও বাজে নি। অন্যান্য দিন কফি শেষ করতে যেমন সময় লাগে আজকেও ঠিক তেমন সময় লেগেছে। তাহলে এই মাঝের এই সময়টা কিভাবে পার হল?
মীরার সব বড় অবাক লাগল আরেকটা কথা শুনে। এই সময়ে কোন বিদ্যুৎ যায় নি। এলাকার কোন ট্রান্সমিটার ব্লাস্ট হয় নি। এমন কি তাদের অফিসের জেনারেটরও ঠিক ছিল পুরো সময়। আরও নিশ্চিত হতে সে নিচে জেনারেটর রুমে গিয়ে হাজির হল। সেখানকার এক লোকের সাথে কথা বলে নিশ্চিত হল যে সত্যি এমন কিছু হয় নি। এই জেনারেটর গত দুই বছরে একবারও নষ্ট হয় নি।
তাহলে? মীরা নিজে ট্রান্সমিটার ফাটার আওয়াজ পেয়েছে। একই সাথে নিজেদের জেনারেটর ফাটার আওয়াজও পেয়েছে। তাহলে সে কি ভুল শুনেছে? আচ্ছা এমন কি হতে পারে যে মীরা ক্যাফেতে গিয়ে কোন কারণে ঘুমিয়ে পড়েছিল! তারপর ঘুমের ভেতর এই স্বপ্নটা দেখেছে? এমন হতে পারে!
মীরা মন থেকে চিন্তাটা বের করে দিতে চাইল তবে কিছুইতেই মাথা থেকে সে চিন্তাটা বের করে দিতে পারল না। রাফিদ নামের সেই ছেলেটার আসলে কী হল! সত্যিই কি ছেলেটা সেই টাইমলুপের ভেতরে আটকা পরে আছে? এই উত্তর মীরার কাছে নেই। মীরার জানার কোন উপায়ও নেই। ছেলেটা কেবল বলেছিল যে প্রকৃত কখনই অস্বাভাবিক ব্যাপার সহ্য করে না। এক সময় না এক সময় সে সব ঠিক করে নেয়। মীরা কেবল আশা করল যেন রাফিদ সেই টাইমলুপ থেকে বের হয়ে স্বাভাবিক জীবনে ফিরে গেছে!
এই গল্পের কোন শেষ নেই। দেখা যাবে যে রাফিদ নামের ছেলেটা তখনও সেই টাইমলুপের ভেতরে ঢুকে রয়েছে।
এই গল্পটা মৌলিক গল্প বলা যাবে না। আমি টাইমলুপ নিয়ে অনেক গল্প পড়েছি, বেশ কিছু মুভিও দেখেছি। সেই থিম থেকেই এই গল্পটা লেখা।


টাইমলুপের ধারণা কতটা জটিল আর রহস্যময় হতে পারে! গল্পটা শেষ করার পরেও মাথায় ঘুরছে।
রাফিদ কি এখনও সেই ক্যাফেতে বসে আছে? আপনিই বললেন এর কোনো শেষ নেই, কিন্তু এই “শেষ না থাকা”টাই গল্পের সব থেকে বড় শক্তি হয়ে গেল।
মীরার ফিরে যাওয়ার পরেও রাফিদের জন্য একটা অস্বস্তি থেকে গেল মনে, যেটা সাধারণত এত ছোট গল্পে হয় না।