হৃদয়ের পথ

oputanvir
4.7
(40)

সায়েম, এই সায়েম !

আমি গেটের দিকে হাটা দিয়েছিলাম । পেছন থেকে ডাকটা শুনে আবার ফিরে তাকালাম । নিলয় ডাকছে । আমি নিলয়ের দিকে হেটে গেলাম । নিলয় আমার কাছে এসে বলল, কী ব্যাপার কোথায় চলে যাচ্ছিল?

আমি বললাম, বাসার দিকে যাচ্ছি । আজকে তো আর ক্লাস নেই ।

নিলয়কে দেখলাম একটু বিরক্ত হতে ! আমার দিকে তাকিয়ে বলল, ভুলে গেলি?

আমি মনে করার চেষ্টা করলাম যে আজকে কোথাও আমাদের যাওয়ার কথা ছিল কিনা ! প্রথমে কিছু মনে না হলেও একটু পরেই আমার মনে পড়ল । আজকে আমাদের নওরিনদের বাসায় যাওয়ার কথা !

নিলয় নওরিনকে পছন্দ করত আমি জানি । যদিও সেটা অনেক দিনের আগের কথা ।

প্রায় ছয় মাস আগে নওরিন মারা গেছে ! 

আমি বললাম, আমার আসলে এমন … তুই তো জানিস !

নিলয় বলল, আরে বেটা এটা তো মৃত বাড়ি না । কুলখানিও না । আমরা যাচ্ছি ঐ মেয়েটার সাথে দেখা করতে ! 

-সেটা কী দরকার আছে?

-কেন নেই বল ! মেয়েটার ভেতরে নওরিনের হার্ট রয়েছে । নওরিনের কারণেই মেয়েটা বেঁচে আছে ।

আমি কী বলব বুঝতে পারলাম না । একবার মনে হচ্ছে যাই আবার মনে হচ্ছে এসবে গিয়ে লাভ নেই । কিন্তু নিলয়ের জন্য আমাকে যেতে হল । বেটা আমাকে জোর করেই নিয়ে গেল !

রিক্সা করে যাওয়া সময়ে নিলয় ননস্টপ কথা বলেই চলল । আমার কানে অবশ্য সেসব কিছুই গেল না । আমার এতোদিন পরে নওরিনের কথা মনে পড়ল । ফার্স্ট ইয়ার থেকেই নওরিনকে আমরা সবাই চিনতাম । নতুন ক্লাসে এসে, কয়েকটা ক্লাস করার পরেই সবাই বুঝতে পারে যে কে ভাল ছাত্র আর কে খারাপ তেমন ভাবেই আমরা নওরিনকে চিনেছিলাম । চুপচাপ গম্ভীর । আর পড়াশোনা নিয়ে খুব সিরিয়াস । আমরা নিশ্চিত ছিলাম যে নওরিন আমাদের ডিপার্টমেন্টে ফার্স্ট হবে । প্রথম সেমিস্টারে সেটাই হল । পর পর তিন সেমিস্টারে সে সবার থেকে এগিয়ে গেল । 

তবে তার ভাগ্য অন্য কিছু লেখা ছিল ফোর্থ সেমিস্টার পরীক্ষা দেওয়ার আগে হঠাৎ শুনি নওরিনের নাকি শরীর খারাপ । মাস খানেক না যেতেই আমরা জানতে পারলাম মেয়েটার ব্রেন টিউমার । কোন ভাবেই আর বাঁচানো সম্ভব না । আমাদের মাঝে অনেকেই ওর সাথে দেখা গেলেও আমি যাই নি । ক্লাস মেট হিসাবে হয়তো যাওয়া উচিত ছিল তবুও যায় নি । আমার হাসপাতাল মৃত্যু এবস খুব ভয় লাগে । আমি এগুলো থেকে দূরে থাকি সব !

নওরিন মাস খানেক পরেই মারা গেল । তবে তখন আমরা জানতে পারলাম যে মেয়েতা নাকি মৃত্যুর আগে তার হার্ট অন্য এক মেয়েকে দিয়ে গেছে । মেয়েটাও সেই সময়ে ঐ হাসপাতে ভর্তি ছিল । এবং ট্রান্সপ্লান্ট সফল হয়েছিল । আর কিছু জানতাম না আমরা । তবে সপ্তাহ খানেক আগে নওরিনের বাবা আমাদের ক্যাম্পাসে এসেছিলেন । তিনি আমাদের সবাইকে নওরিনের জন্মদিনে যেতে বলেছেন বিশেষ ভাবে । সেখানে নাকি তাদের নতুন মেয়ের সাথে আমাদের সবাইকে পরিচয় করিয়ে দিবেন ! মানে যে মেয়েটার শরীরে এখন নওরিনের হার্ট রয়েছে । 

বিকেলের মাঝেই আমরা প্রায় সবাই হাজির হয়ে গেলাম ।নানান আয়োজন ছিল । সময়টা ভাল কাটল আমাদের । এবং কিছু সময় পরেই সেই মেয়েটাকে আমরা সবাই দেখতে পেলাম । আমাদের থেকে বয়সে একটু বড়ই হবে মনে হল । মেয়েটা আমাদের সবার দিকে তাকালিয়ে ভাষণ দেওয়ার মত করে নিজের কথা শুরু করল, 

আমাদের মেডিকেল সায়েন্স বলে যে আমাদের হৃদয় বলে আসে কিছু নেই । যা আছে সবই আমাদের মস্তিস্ক । আমিও তাই এতোদিন মনে করতাম । কিন্তু নওরিনের হৃদয়টা যেদিন থেকে আমার বুকের ভেতরে এসে আসন গেড়েছে সেদিন থেকে আমি একটা পরিবর্তন আমার নিজের ভেতরে অনুভব করছি । এই যে নওরিনের বাবা মাকে আমার এখন বড় আপন মনে হয় । সত্যিই হয় । আমি এটা অনুভব করতে পারি । এই যে তোমরা ওর বন্ধু ছিলে তোমাদেরকে আমার বড় আপন মনে হচ্ছে । আমি আশা করবো আমাদের এই চেনা জানা এখানেই শেষ হয়ে যাবে না !

মেয়েটাকে আমার কেন জানি একটু পরিচিত মনে হল । কোথায় যেন দেখেছি তাকে !

মেয়েটার নেহা সাইরিন । নামটাও কেমন যেন পরিচিত মনে হল । আমাদের থেকে মেয়েটা বছর দুয়েকের বড় । আমাদের জানালো যে সে বাংলাদেশ ব্যাংকে চাকরি করে । একে একে আমাদের সবার সাথে কথা বলল সে । আমার সাথেও এসে কথা বলল । 

ঘটনা মনে হল এখানেই শেষ হওয়ার কথা ছিল । কিন্তু এখানে শেষ হল না । 

পরের দিন আমি নেহাকে আমাদের ক্যাম্পাসে দেখতে পেলাম । আমার কেন জানি মেন হল আমার সাথে দেখা করার জন্যই সে এখানে এসেছিল । আমার দিকে এল । 

-আপনি এখানে?

নেহা হাসল একটু । তখনই আমি মেয়েটাকে ভাল করে চিনতে পারলাম । নেহা আসলে একজন মডেল । সে চাকরির পাশাপাশি মডেলিংও করে । ওর কিছু ভিডিও আর ছবি আমি দেখেছি । নেহা বলল, এখানে এসেছিলাম একটা কাজে । ভাবলাম এতো কাছে যখন এলাম তোমাদের সাথে দেখা করে যাই । কিন্তু কোথায় যাবো ঠিক বুঝতে পারছিলাম না । 

আমার কেন জানি মনে হল নেহা মিথ্যা বলছে । ও কারো সাথে নয়, কেন জানি মনে আমার সাথে দেখা করতে এসেছে । গতদিন আমার সাথে যখন ওর চোখে চোখ পড়েছিল কথা বলার সময় তখনই আমার মনে হয়েছিল যেন নেহা খুব অবাক হয়েছে । আমাকে যেন সে চিনতে পেরেছে এমন একটা ভাব !

আমি বললাম, চলুন সবার সাথে আড্ডা দেওয়া যাক । ওরা মাঠে আছে।

মুহুর্তের ভেতরেই নেহা বলল, আজকে না । আসলে চলে যাচ্ছিলাম । তুমি বাসায় যাচ্ছো ?

-হ্যা বাসায় যাবো !

-তোমার বাসা তো মোহাম্মাদপুরে তাই না । চল তোমাকে পৌছে দিই !

আমি এবার সত্যিই একটু অবাক হলাম । আমি যে মোহাম্মাদপুরে থাকি এটা যখন নেহা জানে তার মানে হচ্ছে আমার সাথেই সে দেখা করতে এসেছে । সেটার ব্যাপারে কোণ সন্দেহ নেই । আমি বললাম, ওদিকেই ।

-আমার সাথে গাড়ি আছে ! এসো !

আমি ভেবেছিলাম নেহার গাড়িতে ড্রাইভার থাকবে । তবে সেটা সত্যি হল না । নেহা নিজেই গাড়ি চালিয়ে এসেছে । আমি সামনের সিটে উঠে বসলাম । গাড়ি চলল এগিয়ে । তবে আমার বাড়ির দিকে গেল না । সেটা যে যাবে না সেটা আমি জানতাম । আমরা এলাম গুলশানের দিকে । এখানেই একটা রেস্টুরেন্টের সামনে গাড়িটা থামল । আমি গাড়ি থেকে নামলাম । দেখলাম একজন এগিয়ে এসে গাড়ি নিয়ে গেল । 

নেহা আমাকে নিয়ে ভেতরে ঢুকল । একেবারে একটা কোনার দিকে টেবিলে আমরা বসলাম ! বোঝায় যাচ্ছে নেহা এখানে প্রায়ই আসে । সবাই ওকে চেনে !

-তোমাকে এখানে নিয়ে এলাম দেখে কী অবাক হয়েছে

-একটু কৌতুহল হচ্ছে ! 

নেহা একটু সময় কী যেন ভাবল । তারপর বলল, নওরিন সম্ভবত তোমাকে পছন্দ করত । তুমি জানো এটা?

আমি একটু অবাক হলাম । আমার মুখের ভাব দেখেই নেহা বুঝে নিল যে আমি জানি না । নেহা বলল, আমি প্রথমে ভেবেছিলাম নওরিনের কারো সাথে কোন প্রেম আছে কিনা সেটা খুজে বের করতে । খুব ভাল করে খোজ নিয়ে জানলাম যে এমন কিছু ছিল না । তারপরই মনে হল মনে মনে মেয়েটা কাউকে না কাউকে পছন্দ করতই ।

-কীভাবে নিশ্চিত হলেন?

-ভুলে কেন যাচ্ছো আমার বুকের ভেতরে ওর হৃদপিণ্ডটা রয়েছে । কিভাবে জানি আমি জানি না আমি কেবল জানি । 

-ওর ক্লাসমেটদের কেউ কিনা সেটা বের করার জন্যই আমাদের দাওয়াত দিয়েছিলেন?

-হ্যা !

-এবং আমার দিকে তাকিয়েই আপনি বুঝতে পারছেন সেটা আমি !

নেহা আমার প্রশ্নের উত্তর দিল না । কিছু সময় কেবল তাকিয়ে রইল আমার দিকে । তারপর বলল, শুনতে সীলি শোনাবে জানি ! কিন্তু সুস্থ হওয়ার পর থেকে আমার কেবলই মনে হয়েছে যে আমি কিছু যেন একটা কিছু মিস করছি খুব । খুব বেশি । গত দিন তোমার সাথে দেখা হওয়ার পরে সেই অনুভূতিটা আমার চলে গেছে । তোমাকে চোখে ভরে দেখার জন্য আমার চোখ যেন তৃঞ্চিত ছিল । তোমাকে নওরিন অসম্ভব ভাল বাসত । হয়তো কোন দিন বলে নি তবে বাসত কোন সন্দেহ নেই । আর এখন আমার কেন জানি মনে হচ্ছে তোমাকে ছাড়া আমার একটা দিনও চলবে না !

নেহা যে এভাবে সরাসরি কথাটা বলে দিবে আমি ভাবতেও পারি নি । আমার নিজের কাল লাল হয়ে গেল । নেহা বলল, তুমি অবশ্যই আমাকে রিজেক্ট করতে পার । তোমার পূর্ণ অধিকার রয়েছে তবে এতে আমার মনের অবস্থার কোণ পরিবর্তন হবে না । 

আমি সত্যিই কোন দিন বুঝতেও পারি নি যে নওরিনের মত একজন মেয়ে আমাকে মনে মনে পছন্দ করতে পারে । সে কোন আমাকে বুঝতেও দেয়নি । আমাদের মাঝে কথাও হয় নি কখনও । তারপরেও মেয়েটা আমাকে পছন্দ করে গেছে । আর এখন এই সুপার মডেল নেহা ! এই মেয়েটার কী সাহসের সব কিছু বলে দিল আমাকে । কোন রাকঢাক না করেই ।   

এবং ব্যাপারটা মোটেই সে গোপন করল না । পরের মাসের ভেতরেই আমাদের ক্লাসের মানুষ তো বটেই দেশের অর্ধেক মানুষ জেনে গেল যে নেহার একজন বয়ফ্রেন্ড রয়েছে এবং সেটা আমি । আমি যদিও নেহাকে হা না কিছুই বলি নি। তবে ও যখন আমার সাথে দেখা করতে আসে কিংবা আমার সাথে ফোনে কথা বলত আমার ভালই লাগত । ওর ইনস্টাগ্রামে আমার সাথে ছবি আসা শুরু করল । আমার চেহারাও মানুষ চিনতে শুরু করল । 

তবে মাঝে মাঝে আমার মনে হয় নওরিন যদি আমাকে বলত নিজের মনের কথা তাহলে আমি কী করতাম?

রাজী হতাম কি?

কী জানি ! 

তবে এভাবেই হয়তো নওরিনের হৃদয় তার নিজের পথ খুজে নিয়েছিল । যে যদি বেঁচে থাকত তাহলেও হয়তো ঠিকই আমার কাছে এসে হাজির হত !

গল্পটা মূল থিক মৌলিক না । অনেক দিন আগে একটা মুভি দেখেছিলাম, নাম ছিল ডিলনে জিসে আপনা কাহা। সালমান খান এবং ভূমিকা চাওলার মুভি । সেখানে সালমান খানের আগের স্ত্রীর হার্ট ভুমিকার ভেতরে ট্রান্সপ্লান্ট করা হয় । এছাড়া সম্প্রতি এনিলেম মুভিতেও এমন একটা কাহিনী আছে । সেই থিম থেকেই এই গল্প । আরও একটা গল্প আসবে এই একই থিমে । মানে হার্ট ট্রান্সপ্লান্টের থিম ।

How useful was this post?

Click on a star to rate it!

Average rating 4.7 / 5. Vote count: 40

No votes so far! Be the first to rate this post.

About অপু তানভীর

আমি অতি ভাল একজন ছেলে।

View all posts by অপু তানভীর →

One Comment on “হৃদয়ের পথ”

Comments are closed.