অপু তানভীর

মাই ডিয়ার হোম মিনিস্টার (পর্ব ০৭)

4.8
(4)

আমার মা তখনও এক মনে কথা বলেই যাচ্ছে । কে তার কথা শুনছে কি শুনছে না সেটার দিকে লক্ষ্য নেই । আমি নিকিতাকে নিয়ে মায়ের সামনে এসে দাড়ালাম । মা আমার দিকে না তাকিয়েই বলল

-কে এসেছে ?

আমি কিছু বললাম না । এক সময় মা আমাদের দিকে ফিরে তাকালো । নিকিতাকে দেখে বলল

-এটা কে ?

আমি খানিকটা দ্বিধা দ্বন্দ্ব নিয়ে তাকিয়ে রইলাম মায়ের দিকে । একটু বোঝার চেষ্টা করছি মা নিকিতাকে ঠিক চিনতে পেরেছে কি না । মা তখনও নিকিতার দিকে তাকিয়ে আছে । একটা পর্যায়ে আমার মনে হল মা নিকিতাকে চিনতে পারে নাই । আমি বলল

-ও নিকি ! আমার ফ্রেন্ড !

-ফ্রেন্ড ! কেমন ফ্রেন্ড ! আগে তো দেখি নি কোন দিন !

নিকিতা আমাকে অবাক করে দিয়ে বলল

-আম্মু, ও আসলে লজ্জা পাচ্ছে । আমরা ফ্রেন্ড না । বয়ফ্রেন্ড গার্লফ্রেন্ড ! এতোদিন আপনার ভয়ে আমাকে সামনে আনে নি । আমি কয়েকবার আসতে চেয়েছি ।

মা অবাক হয়ে তাকিয়ে রইলো নিকিতার দিকে । অবাক হওয়ার বেশ কারন আছে । প্রথমত নিকিতা মাকে খুব স্বাভাবিক ভাবে আম্মু ডেকেছে । একেবারে প্রথম দিনেই এভাবে আম্মু ডাকাটা সহজ নয় ! তারপর এখনও কোন মেয়ে এতো সহজে তার প্রেমিকের মায়ের কাছে এই কথা টা বলতে পারে এটা কেউই বিশ্বাস করবে না । ব্যাপারটা ঠিক স্বাভাবিক না আমাদের দেশের মেয়ের জন্য ।

আর মায়ের থেকে সম্ভবত আমি নিজেই সব বেশি অবাক হয়েছি । বলে কি এই মেয়ে ?

মা এবার আমার দিকে তাকিয়ে রইলো চোখ গরম করে ! তার চোখের ভাষা আমার পড়তে মোটেই কষ্ট হল না । মা যেন আমার কাছে জানতে চাইছে যে কদিন আগে তুই বললি রিদিকে পছন্দ আবার আজকে এই মেয়েকে নিয়ে এসেছিস ! এই মেয়ে আবার বলছে তোরা নাকি বয়ফ্রেন্ড গার্লফ্রেন্ড ! মানে কি এসবের !

আমি কিছু না বোঝার ভান করে তাকিয়ে রইলাম । নিকিতা বলল, আম্মু আপনি ওকে বকবেন না প্লিজ ! আসলে ও আপনাকে অনেক ভালবাসে তো, আমার থেকেও বেশি তাই আপনি অন্য কারো সাথে যখন ওর বিয়ে দিতে চাইলেন ও মানা করে নি । এমন কি আমিও ওকে বলেছি আম্মুর যদি পছন্দ হয় তাহলে তুমি আমাকে ছেড়ে ওকেই বিয়ে কর !

এই কথা শুনেই দেখলাম আম্মু খানিকটা গলে গেল । দেখলাম হাতের কাজটা এক পাশে সরিয়ে রেখে নিকিতার কাছে এগিয়ে এল । নিকিতাকে দেখতে শুরু করলো ভাল করে । তারপর আমার দিকে তাকিয়ে বলল, তা তুই ঐ মেয়ের কথা কেন বলেছিলি আমাকে ? আর প্রথমেই একে কেন নিয়ে আসিস নি ?

তাই তো এই প্রশ্নের জবাব আমি এখন কিভাবে দিবো ? আমি আমতা আমতা করে বললাম

-আসলে ….

নিকিতা আবারও আমাকে উদ্ধারের জন্য এগিয়ে এল । বলল, আসলে আম্মু আমার মধ্যে একটা কারন আছে যেটা আপনি পছন্দ করেন না । এই জন্য ও আপনাকে কষ্ট দিতে চায় নি ।

মা বলল, কি কারন ?

নিকিতা আমার দিকে একবার তাকালো । তারপর মায়ের দিকে তাকিয়ে বলল, আসলে আমি রাজনীতির সাথে যুক্ত ! আপনি তো রাজনীতি ঠিক পছন্দ করেন না । তাই ?

ঘরের ভেতরে খানিকটা নিরবতা বিরাজ করলো । কেউ কোন কথা বলল না কিছু সময়ে । নিকিতা নিজের মুখকে করুণ করে রেখেছে । কিন্তু মাকে দেখে মনে হচ্ছে সে দ্বিধা দ্বন্দ্বে ভুগছে । সে কি বলবে ঠিক বুঝতে পারছে না । আমি বললাম

-মা একটু বোঝার চেষ্টা কর । যারা রাজনীতির সাথে যুক্ত তারা তো সবাই খারাপ না । নিকিতাকে দেখো তোমার কি মনে হচ্ছে ….. মা

আমাকে মাঝ পথেই থামিয়ে দিল । তারপর বলল

-আমাকে বুঝাতে হবে না ।

তারপর নিকিতার দিকে তাকিয়ে বলল

-দেখো মেয়ে, আমি কিছু বলছি না তোমাকে কিংবা তোমাদের । তবে তুমি যদি আমার ছেলেকে পছন্দ কর আর ওর ও যদি একই ইচ্ছে থাকে তাহলে তুমি নিজেকে ঐ লাইণ থেকে আস্তে আস্তে সরিয়ে আনো । আমি জানি একেবারে সহজ হবে না তবে সম্ভব ! তোমার সহজ সোজা সত্য কথা আমার পছন্দ হয়েছে । আর আমি তোমার বাবা মায়ের সাথে কথা বলতে চাই !

দেখলাম নিকিতা হাসলো । আপাতত মা যে পটে গেছে সেটা আমার কিংবা নিকিতার কারোই বুঝতে বাকি রইলো না । নিকিতা হঠাৎ করেই মা জড়িয়ে ধরলো । এইবার মায়ের মুখে হাসি দেখতে পেলাম । যাক আপাতত মা পটে গেছে । এবং মা নিকিতাকে মোটেই চিন্তে পারে নি । কিন্তু বাবা মোটেই চিনতে ভুল করলেন না । রাতে বাবা একটু হাটতে যান । ফিরে এসে নিকিতাকে দেখে চোখ কপালে তুলে তাকিয়ে রইলো কিছুটা সময় । মায়ের সাথে নিকিতা তখন টেবিল সাজাচ্ছিলো ।

মা বাবার দিকে তাকিয়ে বলল

-দেখো তোমার ছেলের কান্ড ! তোমার ছেলে নাকি এই নিকিকে পছন্দ করে । অথচ দেখো আমরা কি করতে যাচ্ছিলাম । যা হয় ভালর জন্য হয় !

বাবার মুখের কথা তখন হারিয়ে গেছে । আর হারাবে না কেন ! দেশের হোম মিনিস্টারকে যদি নিজের ঘরে দেখা যায় হঠাৎ করে যে কারো মুখের কথা হারিয়ে যাবে । কিছু বলতে যাবে তখনই আমি সেখানে হাজির । বাবাকে অন্য রুমে নিয়ে এলাম । বাবা আমার দিকে তাকিয়ে বলল

-এই মেয়ে এখানে কেন ? আর তোর মা কি বলছ ?

আমি একটু শুকনো হাসি হেসে বললাম

-আমি কিছুই জানি না বাবা । আমার হাতে কিছুই নেই ।

-এই মেয়েকে কিভাবে পটালি ?

-আমি পটাই নি বাবা !

-তাহলে ?

-কিভাবে যে কি হয়েছে সেটা আমি নিজেই জানি না । এখন কেবল জানি যে এই মেয়ে খুব জলদি আমাকে বিয়ে করবে !

বাবা তখনও আমার দিকে অবাক চোখেই তাকিয়ে রয়েছে । তার এখনও কথাটা ঠিক বিশ্বাস হচ্ছে না । অবশ্য আমি হলেও আমার ঠিক বিশ্বাস হত না এই সব কথা । বাবা বলল

-তো মা তো চিনতে পারে নি মনে হচ্ছে !

-হ্যা । চিনতে পারে নি ।

-চিনতে পারলে কি হবে বুঝতে পারছিস ?

-না । তবে এমন কিছু করতে হবে যাতে চিনতে না পারে ?

-কত দিন ?

-যতদিন পারা যায় ।

বাবা তখনও আমার দিকে তাকিয়ে রয়েছে অবিশ্বাসের চোখে । তার ছেলের প্রেমিকা যে দেশের হোম মিনিস্টার সেটা তার বিশ্বাস করতে কষ্ট হচ্ছে ।

রাতের খাবার সময়ও বাবা ঠিক স্বাভাবিক হতে পারছিলো না । নিকিতার সাথে কথা বলার সময় বাবার মুখ দিয়ে বারবার আপনি বের হয়ে যাচ্ছিলো । মা শুনে বিরক্ত হয়ে বলল, কি ব্যাপার বলতো ! তোমার কি বুদ্ধি শুদ্ধি লোপ পেয়ে গেল ! ছেলের বন্ধুকে কেউ আপনি করে বলে !

রাতের খাবারের পর মা নিকিতার সাথে আরও কিছু সময় গল্প করলো । তারপর আমার উপর দায়িত্ব পরলো ওকে বাসায় পৌছে দিয়ে আসার জন্য । রুম থেকে বের হতেই নিকিতা নিজের ওড়না বের করে সেটা মুখে পেঁচিয়ে নিল । যে কেউ ওকে দেখে ফেলতে পারে । তখন চিনে ফেললে ঝামেলা হয়ে যাবে । আমি কেবল ওর চোখের তাকিয়ে রইলাম । নিকিতা বলল

-কি দেখো !

-তোমাকে দেখছি । মাঝে মাঝে মনে হয় যে স্বপ্নে দেখছি ! এখনও ঠিক বিশ্বাস হচ্ছে না ।

-হবে হবে ! আরও সময় যেতে দাও ! সব ঠিক হয়ে যাবে । দেখছো না তোমার আম্মুকে কিভাবে নিজের দলে নিয়ে এলাম !

-দেখলাম ! সত্যিই তোমার বুদ্ধির তারিফ না করে পারছি না । অবশ্য যেভাবে তুমি তোমার মন্ত্রনালয় চালাও তোমার অসম্ভব কিছু নেই ।

-তাহলেই বুঝো ! সাবধান !

আমি হেসে ফেললাম !

কথা বলতে বলতেই আমরা বাসার বাইরে চলে এলাম । দেখলাম সাথে সাথেই একটা গাড়ি এসে থামলো । নিকিতা দরজা খুলে উঠতে উঠতে বলল, উই হ্যাভ এ লং ওয়ে টু গো ! টেক কেয়ার !

নিকিতা গাড়িতে উঠে বসলো । আমি অনেকটা সময় ধরে ওর গাড়ির দিকে চলে যাওয়ার দিকে তাকিয়ে রইলো । কেন জানি মনের ভেতরে আশ্চর্য রকম আনন্দ অনুভূতি হল আমার ! সত্যিই তাহলে হোম মিনিস্টারের প্রেমে পড়ে গেলাম !

পরের পর্ব

How useful was this post?

Click on a star to rate it!

Average rating 4.8 / 5. Vote count: 4

No votes so far! Be the first to rate this post.

Related Posts

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *