নিশির ডাক

oputanvir
4.4
(43)

অন্য সময় হলে কিংবা অন্য কারো কথাটা শুনলে নাজনীন হয়তো হেসে ফেলতো কিংবা খানিকটা বিরক্তি দেখাতো । কিন্তু সামনে যে মানুষটা বসে আছে তার মুখ থেকে এই রকম কথা শোনার পরে সরাসরি বিরক্তি প্রকাশ করাটা সমীচিন হবে না । হাজার হলেই এই মানুষটার সাথে তার বিয়ের কথা বার্তা চলছে । পরিবারের লোকজন খুব করে চাইছে আবিদের সাথেই ওর বিয়ে হোক । আর আবিদ এমন একজন মানুষ যে তাকে অপছন্দ করার কোন কারণই নেই । নাজনীনেরও আপত্তি নেই বিয়েছে । কিন্তু সেই মানুষের মুখে এমন অদ্ভুত কথা শুনে নাজনীনের একটু হাসি পেল বটে । তবে সে হাসলো না ।

আবিদ আবার বলল, সত্যিই তুমি বিশ্বাস করলে না?
-আপনিই বলুন, এটা কি বিশ্বাস করার মত কোন কথা?

আবিদ চট কটে কোন জবাব দিতে পারলো না । তবে সে মনে মনে বিশ্বাস করতে চায় যে এমন কিছুই ঘটেছে । নয়তো নাজনীনকে তার এমন ভাল কেন লাগবে? এমন ভাবে তাকে মনে কেন ধরবে ?

নাজনীন এবার বলল, শুনুন আবিদ, আপনাকে আমার পছন্দ হয়েছে । সত্যিই পছন্দ হয়েছে । কিন্তু আপনার যদি মনে হয় আপনি আমাকে কেবল এই কারণে পছন্দ করেছেন কারণ আমার প্রাক্তন স্বামীর আত্মা আপনার ভেতরে ঢুকেছে তাহলে আমি বলবো আমাদের বিয়েটা না হোক । ঠিক আছে কি !

হঠাৎ করে নাজনীন এমন কঠিন কন্ঠে কেন কথা বলল সেটা আবিদ ঠিক বুঝতে পারলো না । সে জলদি জলদি বলে উঠলো না প্লিজ, তুমি এমন কথা বলবে না । প্লিজ । আমি আর কিছুই বলছি না । কিছু বিশ্বাস করতে হবে না । তবে বিয়েতে অমত কর না কেমন !

নাজনীন আবিদের ভেতরের উতলা ভাবটা দেখে একটু অবাকই হল । তার ভাব দেখে নাজনীনের মনে হচ্ছে যে কোন উপায়ে নাজনীনকে তার বিয়ে করতেই হবে । ওকে ছাড়া সে বাঁচবে না । নাজনীনের কেন জানি ব্যাপারটা ভাল লাগলো । বলল, ওকে । দয়া এই সব কথা বলবেন না আর। আর আমি আপনার কথা বিশ্বাস করি নি কেন জানেন?
-কেন?
-কারণ হচ্ছে সত্যিই যদি আমার মৃত স্বামীর আত্মা আপনার ভেতরে ঢুকতো তাহলে আপনি কোন ভাবেই আমাকে পছন্দ করতেন না ।
-মানে?
-সব মানের ব্যাখ্যা করে বলতে হয় না । কিছু কিছু বুঝে নিতে হয় !

আবিদ আসলেই বুঝলো না । তবে পরে এটা নিয়ে চিন্তা করা যাবে ভাবলো । এখন বরং মেয়েটাকে আরো ভাল করে দেখা যাক ।

নাজনীনের সাথে আবিদের বিয়ে হওয়ার কোন কথা ছিল না । এমন কি বিয়ের কথা বার্তাও হওয়ার কথা ছিল না কোন ভাবেই । তারপরেও হচ্ছে । এবং এর পেছনে একটা অদ্ভুত কারন যুক্ত । আবিদ নিজে এই ব্যাপারটা কোন ভাবেই বিশ্বাস করতো না যদি না সেটা নিজের সাথে ঘটতো । এই যুগে এসে এমন কথা বিশ্বাস করাটা সত্যিই বড় হাস্যকরই শোনাবে ।

রসুলপুর গ্রামে আবিদদের জমিদারি আছে । বিশাল জায়গা সম্পত্তির মালিক ওরা । ছোট থেকে আবিদ ওর বাবা মায়ের সাথে ঢাকাতেই মানুষ । সেখানেই পড়াশোনা শেষ করে ভাল চাকরি করে জীবন শুরু করেছিলো সে । ঠিক সেই সময়েই ঘটলো বিপত্তি । আবিদের শরীরে মরন ব্যাথি বাসা বাঁধলো । অনেক কাঠ খড় পোড়ানো হল বটে কিন্তু কাজ হল না । সব ডাক্তারেরা জবাব দিয়ে দিলেন । বললেন যে শেষ সময়টা পরিবারের সাথে যেন কাটানো হয় । সেই মোতাবেগই আবিদকে ওদের গ্রামের বাসায় নিয়ে আসা হয় দাদা-দাদীর কাছে ।

সব আশা যখন শেষ তখন একটা অদ্ভুত কাজ হল । একদিন রসুলপুরের ওদের জমিদার বাড়িতে একজন ওঝার মত লোক এসে হাজির হল । সে এক অদ্ভুত প্রস্তাব দিল আবিদের দাদাকে । বলল যে সে তার নাতিকে সুস্থ করে তুলতে পারবে । তবে এর জন্য একটা মানুষ মারা পড়বে । এবং এর দায়ভার তাকে নিতে হবে ।

আবিদের দাদা নিজের নাতিকে বাঁচানোর জন্য তাতেই রাজি হলেন । খুব সাধারণ কিছু জিনিস পত্র আনতে দিল । তার দাদা সব কিছু জোগার করে দিলেন । তারপর এক আমাবস্যার রাতে ওঝা বসলো ধ্যানে । আবিদের দাদার এই কাজের কথা কেউ জানলো না । তাদের নিজ বাড়ি থেকে একটু দুরে একটা বড় বাগানে এই যজ্ঞের ব্যবস্থা করা হল ।

ওঝা পুরো ব্যাপারটা বুঝিয়ে দিল তার দাদাকে । খুব সহজ একটা হিসাব । একটা প্রাণের বদলে আরেকটা প্রাণ । সে ধ্যান করে নিশিকে ডেকে নিয়ে আসবে এবং নিশি মূলত তার নাতির প্রাণ নিতেই আসবে । তবে ওঝার মন্ত্রের কারণে সে ভুলে গ্রামে গিয়ে ডাক দিতে থাকে । সেই ডাক গ্রামের মানুষ শুনতে পাবে । সেই ডাক শুনে যদি কেউ বাইরে বের হয়ে আসে তাহলে তার আত্মাকে নিয়ে চলে যাবে নিশি । এবং আবিদের জীবন রক্ষা পাবে । তবে এখানে একটা রিস্ক আছে । যদি এই ডাক শুনে গ্রামের কোন মানুষ সাড়া না দেয় তাহলে আজই আবিদের মরন হবে । এই ঝুকি টুকু আবিদের দাদা নিয়েছিলেন । তবে তার মনে একটা দৃঢ় বিশ্বাস ছিল যে কেউ না কেউ ঠিকই সাড়া দিবে । এভাবে তার নাতি মারা যেতে পারে না ।

যজ্ঞ শেষ হল এবং ওঝা জানালো যে নিশি তার শিকার পেয়ে গেছে । তার নাতি সুস্থ হয়ে যাবে ।
সবাইকে অবাক করে দিয়ে আবিদ তারপর দিন থেকে ধীরে ধীরে সুস্থ হতে লাগলো । এক মাসের ভেতরে আবারও আগের স্বাস্থ ফিরে পেতে শুরু করলো সে । আবার ডাক্তার দেখানো হল এবং সবাই অবাক হয়ে খেয়াল করলো যে তার শরীর থেকে মরন ব্যাধি দুরে হয়ে গেছে । কিভাবে গেছে সেটা কেউ জানে না তবে গেছে । এটাই সব থেকে বড় কথা ।

কেউ না জানলেও দুজন মানুষ ঠিকই জনাতো । বছর খানেক পরে মৃত্যুর সময় আবিদকে সে এই কথা বলে যান । প্রথমে অবিশ্বাস করলেও তার এভাবে সেরে ওঠাটা আবিদের কাছে রহস্যই থেকে গেছে । এবং আবিদকে তার দাদা এও জানালেন যে ঐদিন সত্যিই গ্রামে ওর বয়সী এক যুবক মারা গিয়েছিলো অদ্ভুত ভাবে ।

যুবকের নাম জাহির আহমেদ । সে গ্রামে এসেছিলো তার বউকে নিয়ে । তাদের বিয়ে হয়েছিলো দুবছর ধরে । মেয়েটা এখন ঢাকাতে থাকে তার বাবা মায়ের সাথে। চাকরি করে । আবিদের মনে একটা কৌতুহল জন্ম দিল । এবং খোজ খবর নিয়ে সে মেয়েটির কাছে চলে গেল ।

মেয়েটি একটা ব্যাংকে কাজ করে । সেই ব্যাংকের ক্লাইন্ট সেজেই প্রথমে তার সাথে দেখা করলো । দেখা করে যখন সে বাসায় আসলো তখনই আবিস্কার করলো যে নাজনীন নামের ঐ মেয়ের প্রেমে পড়েছে সে । অদ্ভুত ভাবে নাজনীনকে তার ভালো লাগছে ।
পরের দিন আবিদ আসলে বুঝতে পারলো যে তার দাদা যে সংবাদটা তাকে দিয়েছে সেটার ভেতরে আসলে সত্যতা থাকলেও থাকতে পারে । কারণ তার দেওয়া তথ্য মতে নাজনীন ছিল জাহিরের স্ত্রী । এবং যেহেতু জাহিরের আত্মা তার ভেতরে এসেছে তাই তাকে ভালো লাগাটা খুবই স্বাভাবিক । এই কারণেই নাজনীনকে ভাল লাগছে তার । মনে হচ্ছে ওকে ছাড়া জীবন চলবে না ।

বাসায় যদিও প্রথমে রাজি হচ্ছিলো না একটা স্বামী মারা বিধবা কে ছেলের বউয়ের করার ব্যাপার তবে শেষ পর্যন্ত আবিদের জেদের কাছে সবাই হার মানলো । নাজনীনের বাসায় বিয়ের প্রস্তাব গেল । সেখানেও সব রাজি ।

দেখতে দেখতে ওদের বিয়ে হয়ে গেল । বাসর রাতে নাজনীনকে মুগ্ধ চোখে দেখতে লাগলো । নাজনীন যে দেখতে আহামরি সুন্দরী সেটাও কিন্তু না তারপরেও আবিদের চোখে সে পৃথিবীর সব থেকে বেশি সুন্দরী। নাজনীন বলল, এভাবে তাকিয়ে কেন আছেন শুনি?
-বারে ! নিজের বউকে দেখবো না?
-হ্যা দেখুন ভাল করে ! তা এখনও সেই ভুত যায় নি মাথা থেকে?
-কোন ভুত?
-ঐ যে নিশির ডাকের ভুত !

আবিদ চট করে উত্তর দিতে পারলো না । আবিদকে চুপ থাকতে থেকে নাজনীন বলল, আপনার থিউরিতে যে ভুল আছে সেটা বলবো?
-বল শুনি।
-আপনি বললেন যে নিশির আপনার বদলে জাহিরের আত্মা নিয়ে গেছে । আপনার কথা যদি সত্যি হয় তাহলে জাহিরের আত্মা চলেই গেছে । তাই না সেটা তো আপনার ভেতরে আসে নি । তাহলে আপনার তো আমাকে ভাল লাগার কোন কারণ নেই ।

আবিদ কী বলবে খুজে পেল না । নাজনীন যে কথা বলল সেটা তো যুক্তিযুক্ত মনে হল । এভাবে তো ভাবে নি সে ।
নাজনীন আবারও হাসতে হাসতে বলল, তা আমাকে যেমন পছন্দ হয়েছে জাহিরের বাবা মায়ের প্রতি আপনার কেমন মনভাব । তাদেরকে কি আপন মনে হচ্ছে খুব?

আবিদ নিজে গিয়েছিলো জাহিরের বাসায় । ওদের গ্রামেই তো বাড়ি । কিন্তু তার বাবা মায়ের প্রতি আলাদা কোন অনুভূতি কাজ করে নি । অথচ করা উচিৎ ছিল না ।
নাজনীন বলল, জাহির কিন্তু তার বাবা মায়ের খুব ভক্ত ছিল । বুঝেছেন জনাব। আমার থেকেও বেশি । যদি সত্যি আপনার দাবী সত্য হত তাহলে তাদের পছন্দ হত বেশি আমাকে নয় । আর আমাকে সে খুব বেশি পছন্দ করতো না । আপনাদের গ্রামে রুবি নামের একটা মেয়ে আছে । তাকে পছন্দ করতো !

এই বলে নাজনীন হাসতে শুরু করলো ।

তাহলে বিবাহিত জীবনে কি নাজনীন সুখী ছিল না ? এই কারণেই সেদিন বলেছিলো কথাটা?
তাহলে সবই কি ছিল বুজরুকি!
নিশির ডাক বলে আসলেই কিছু নেই?

আবিদ অবশ্য আর কিছু চিন্তা করতে চাইলো না । সে বেঁচে আছে এবং সুস্থ হয়ে বেঁচে আছে । সেই সাথে নাজনীনকে বিয়ে করে ফেলেছে । এটাই এখন সব থেকে বড় কথা ।

নাজনীন আবিদের ছেলে মানুষী দেখে হাসলো কেবল । ছেলেটা কেন যে তার প্রেমে পড়লো নাজনীন ঠিক বুঝলো না । অথচ জাহিরকে প্রেমে পড়ানোর জন্য কতই না চেষ্টা করেছে । কোন কাজ হয় নি । মন থেকে সে কোন নাজনীনকে ভালোবাসে নি । কেবল বাবা মায়ের কথা রাখতে গিয়ে ওকে বিয়ে করেছিলো । অন্য একটা মেয়েকে ভালোবাসতো সে । এটা কোন ভাবেই নাজনীন মেনে নিতে পারে নি । তাই তো ব্লাক ম্যাজিক করেই জাহিরকে খুন করেছিলো সে । একই ভাবে সে চেষ্টা করেছিলো জাহিরের মন পেতে কিন্তু কাজ হয় নি । অথচ ঠিকই মারা পড়লো ।

তবে নিশির ডাকের ব্যাপার সম্পর্কে নাজনীন খুব ভাল করেই জানে । নাজনীন শুনেছে আবিদের অবস্থা সত্যিই খুব খারাপ ছিল এবং সে সত্যি সত্যি মিরাকেল ঘটিয়েই সুস্থ হয়েছে । তার মানে হচ্ছে ঐ দিন রাতে অন্য কেউ সাড়া দিয়েছিলো নিশির ডাকে । আর একই দিনে অন্য ভাবে জাহির মারা পড়েছে । আর আবিদ ভেবে নিয়েছে যে জাহির নিশির ডাকে মারা পড়েছে ।

কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে মারাটা পড়লো কে?

নিশির ডাক গল্পের থিম আমরা অনেকেই পড়েছি । একজন কে সুস্থ করতে এভাবে নিশিকে ডেকে আনা হয় তারপর সে বাড়ি বাড়ি গিয়ে ডাক দেয় । যে ডাকে সাড়া দেয় তার জীবন নিয়ে চলে যায় অন্য দিকে আরেকজন বেঁচে ওঠে । এই গল্প সেই থিম থেকে লেখা।

How useful was this post?

Click on a star to rate it!

Average rating 4.4 / 5. Vote count: 43

No votes so far! Be the first to rate this post.


Discover more from অপু তানভীর

Subscribe to get the latest posts sent to your email.

About অপু তানভীর

আমি অতি ভাল একজন ছেলে।

View all posts by অপু তানভীর →