এই সব মিথ্যে গল্প (রাগ-অভিমান)

oputanvir
4.7
(66)

অফিসের লিফট থেকে নামতেই শুভকে দেখতে পেল । লিফটের কাছেই ছেলেটা সব সময় দাড়িয়ে থাকে । যদিও এই কদিন সে দাড়িয়ে ছিল না । ওদের ভেতরে ঝগড়া চলছিলো। তার কথা বার্তা দেখা বন্ধ ছিল কয়েকটা দিন । গত রাতে প্রিয়ন্তি নিজ থেকে ফোন করে শুভর সাথে মিটমাট করে নিয়েছে । রাতে লম্বা সময়ে কথা বলে তারপর ঘুমিয়েছে । আজকে তাই প্রিয়ন্তির মনটা ভাল বেশ । কিন্তু শুভর চেহারা দেখে প্রিয়ন্তির মনে যে শুভ মনটা যেন বিষন্ন । নিজ থেকেই এগিয়ে গেল শুভর দিকে । তারপর বলল, তোমাকে এমন কেন মনে হচ্ছে ?
শুভর চোখের দিকে তাকিয়ে প্রিয়ন্তির মনে হল যে শুভ সম্ভবত রাতে ঘুমায় নি ।
শুভ প্রয়ন্তির কথার জবাব না দিয়ে বলল, তোমার হাতে সময় হবে একটু ।
প্রিয়ন্তি বলল, হ্যা । চল কোথাও বসি ।
-রেস্টুরেন্টে না । পার্কে বসি । তারপর ডিনার করা যাবে । কেমন ?

প্রিয়ন্তিদের অফিসের পাশেই একটা পার্ক রয়েছে । রাত দিন প্রায় সব সময়ই এখানে অনেক মানুষজন থাকে । প্রিয়ন্তি ওখানে খুব একটা যায় না । তবে আজকে শুভর কথার দ্বিমত করলো না । গতকালকেই ওদের ভেতরে ঝগড়ার অবসান ঘটেছে । এখন আর সে কোন ভাবেই চায় না ওর উপর আবারও শুভ অভিমান করুক । কয়েকটা দিন শুভ যা বলবে তাই মেনে নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সে ।

শুভকে নিয়ে পার্কের একটা দিকে গিয়ে বসল প্রিয়ন্তি । বসতে বসতেই অনুভব করলো শুভ ওর খুব কাছ ঘেষে বসেছে । তারপর নিজ থেকেই প্রিয়ন্তির হাতটা নিজের হাতের ভেতরে নিলো । একটু অবাক না হয়ে পারলো না প্রিয়ন্তি । শুভ সব সময়ই একটু লাজুক ধরনের ছেলে । প্রেমিকার হাত ধরতে কিংবা চুমু খেতে লজ্জা পায় । প্রিয়ন্তি নিজ থেকে এগিয়ে না এলে ঠিকঠাক মত কিছুই হয় না । বেশ কয়েকদিন ওদের কথা হয় নি, এই কারণেই শুভ এমনটা করছে ।
তবে শুভর দিকে তাকিয়ে প্রিয়ন্তির মনে হল যেন কিছু একটা অস্বাভাবিক ব্যাপার রয়েছে । প্রিয়ন্তি বলল, শুভ তোমাকে এমন কেন দেখাচ্ছে ? মনে হচ্ছে রাতে ঘুমাও নি । কাল কথা বলার সময় তো সব ঠিক মনে হয়েছে ।
শুভ একটু বোকার মত হাসলো । তারপর বলল, কাল রাতে তোমার সাথে কথা বলার পরে আসলে আর ঘুম আসে নি ।
-সেকি কেন? শরীর খারাপ নাকি?
-না সে জন্য না ।
-তাহলে ?
-সেটার বলার জন্যই এখানে নিয়ে এসেছি । রেস্টুরেন্টে গেলে অনেক মানুষ থাকতো, সেখানে শান্তিমত বলা যেত না কথা গুলো । আমি জানি পার্কে বসা ঠিক মত তোমার পছন্দ না । তারপরেও কিছু সময় বসি এখানে !

প্রিয়ন্তির নিজের কাছে খুব অবাক লাগলো । শুভকে সে বেশ কিছু দিন ধরে চেনে । শুভ আর ওর অফিস আলাদা হলেও ওদের অফিসের বিল্ডিংটা একই । প্রতিদিনই ওদের তাই দেখা হয়, কথা হয় । ওকে এর আগে কখনই এমন মনে হয় নি । তাহলে আজকে এমন কেন মনে হচ্ছে ।

প্রিয়ন্তি দেখলো শুভ কিছু সময় চুপ করে রইলো । এই সময়ে সে হাতের ভেতরে প্রিয়ন্তির হাতটা মৃদু ভাবে আদর করছিলো । ব্যাপারটা খারাপ লাগছিলো না প্রিয়ন্তির । মনে মনে শুভকে আরো একটু সময় দিল সে । কী বলতে চায় সেটা শুনতে আগ্রহী হয়ে উঠেছে সে এখন ! ছেলেটার জীবনে গতকাল কিছু একটা হয়েছে যা ওকে সারা রাত ঘুমাতে দেয় নি । কী এমন হল !

কিছুটা সময় পরে শুভ নিজেকে সুস্থির করে নিলো । তারপর বলল, আমি ছোট বেলা থেকে অনেকটাই অবহেলায় মানুষ হয়েছি । অনেক গুলো ভাইবোন ছিলাম তো আমরা । সেই সাথে তিন চাচা, চাচার ফ্যামিলি একই বাড়িতে থাকতাম আমরা । বাড়ি ভর্তি লোকজন । তাই আমার দিকে কারো কখনই খেয়াল থাকতো না । আমি কি খেলাম না খেলাম সেদিকেও না। আমার মনে আছে যে আমি যখন সিক্সে পড়ি তখন রাগ করে আমি ভাত খেয়েছিলাম না সারা দিন অথচ আমি যে রাগ করেছি সেটা কেউ খেয়ালই করলো না । এমন কি আমার মাও না । আসলে তাকেও দোষ দিয়ে লাভ নেই । মা ছিল বাড়ির বড় বৌ । তাই দায়িত্ব ছিল সব থেকে বেশি । এই দায়িত্ব পালন করতে করতে সবার দিকে খেয়াল দিতে পারতেন না ।
প্রিয়ন্তি বলল, তারপর ? মানে না খেয়েছিলে কেন?
-কেন যে ছিলাম সেটা মনে নেই এখন আর । তবে ছিলাম । কিন্তু লজ্জার ব্যাপার কী জানো?
-কী?
-যখন সন্ধ্যা হল তখন প্রচন্ড ক্ষুধা লাগলো । এতো ক্ষুধা যে সেটা সহ্য করা মুসকিল হয়ে গেল আমার জন্য । শেষে নিজেই রান্না ঘরে গিয়ে ভাত বেড়ে নিলাম । সেদিন নিজের কাছে এতো লজ্জা লাগছিলো । সেই ছোট বয়সেই আমি নিজের কাছে কেমন যেন ছোট হয়ে গেলাম । আর বুঝে গেলাম যে আসলে আমার রাগের ধার কেউ ধারে না । কেউ না । এই সত্যটাই আমি আস্তে আস্তে উপলব্ধি করেছি পুরো জীবন ভরে । আমার রাগ কেউ কখনো ভাঙ্গাতে আসে নি । আমি অভিমান করি রাগ তাতে কারো কিছু যায় আসে নি ।

কথা গুলো একবারে বসে শুভ চুপ করে রইলো কিছুটা সময় । প্রিয়ন্তির মনে অদ্ভুত একটা অনুভূতি হচ্ছে । বিশেষ করে শুভ কন্ঠে রয়েছে কিছু একটা । একটা অচেনা বেদনা ।
শুভ আবারও বলতে শুরু করলো, কেবল যে পরিবারের মানুষের কাছেই আমি যে এমন ছিলাম তাই নয়, বন্ধুদের কাছেও এমনই ছিলাম । থাকে না গ্রুপে এমন একজন যার অনুভূতি নিয়ে আসলে কেউ ভাবে না । কেউ তার জন্মদিনের কথা মনে রাখে না । কেউ খেয়াল করে না যে তার মন খারাপ কিনা ! আমি ছিলাম সেই একজন । গতকয়েক দিন আমি যখন মন খারাপ করে ছিলাম, তখনও আমার মনে হচ্ছিলো যে তোমারও বুঝি খুব একটা কিছু যাবে আসবে না । কিন্তু রাতে যখন তুমি ফোন দিয়ে নিজ থেকে আমার সাথে কথা বললে তখন আমি এই ব্যাপারটা কেন জানি ঠিকঠাক মত ওভারকাম করতে পারলাম না । সারা রাত কেবল মনে হল যে আমার রাগও কেউ ভাঙ্গায় তাহলে ! কেউ যখন কারো রাগ ভাঙ্গায় তখন এমন লাগে ! এই অনুভূতি আামর কাছে একদম আলাদা প্রিয়ন্তি একেবারে আলদা । জীবনের প্রথম তো তাই !

শুভ অন্য দিকে তাকালো । প্রিয়ন্তির স্পষ্টই মনে হল যে শুভ কেন অন্য দিকে তাকিয়ে আছে । চোখে পানি এসেছে ওর । সেটা আটকানোর চেষ্টা করছে । প্রিয়ন্তি অন্য হাত টা দিয়ে শুভ মুখটা নিজের দিকে ঘুরিয়ে আনলো । পার্কটা অন্ধকার হলেও জায়গায় জাগয়ায় আলো জ্বলছে । সেই আলোতেই শুভর চোখের পানি ঠিক ঠিক দেখা যাচ্ছে ।
প্রিয়ন্তি ওর মুখটা শুভর একেবারে কাছে নিয়ে এল । এতো কাছে যেন নিঃশ্বাসের শব্দ পর্যন্ত শোনা যায় বেশ ভাল ভাবে ।
শুভ বলল, আমি যদি মাঝে মাঝে এভাবে রাগ করি তুমি কি সেই রাগ ভাঙ্গাবে?

প্রিয়ন্তির বুকের ভেতরে কথা এমন ভাবে ধাক্কা লাগলো ! কেউ এতোটা আকুল হয়ে কারো কাছে কিছু চাইতে পারে সেটা প্রিয়ন্তির ধারণা ছিল না । তখনই দেখলো শুভর চোখ দিয়ে টুপ করে পানি গড়িয়ে পড়লো । প্রিয়ন্তু কিছু সময় সেই চোখের দিকে তাকিয়ে তারপর আলতো করে শুভর ঠোঁটে চুমু খেল । এই ছেলেটা জীবনে কেবল অবহেলাই পেয়ে এসেছে । একটু ভালোবাসা কেয়ার যে কেমন হয় সেটা কখনই পায় নি । প্রিয়ন্তি মনে মনে ঠিক করে নিল যে পরের পুরোটা সময় শুভকে ভালোবাসা দিয়ে সে ভরিয়ে দেবে যাতে আগের জীবনের
তারপর বলল, চল বিয়ে করে ফেলি !
-কী বললে?
-হুম । করবে?
-এখনই?
-কেন করতে চাও না বিয়ে?
-হ্যা অবশ্যই চাই ।
-তাহলে চল ।

শুভ কিছুটা সময় তাকিয়েই রইলো । তারপর বলল, চল বিয়ে করেই ফেলি ।

যখন ওরা রিক্সা করে মগবাজার কাজী অফিসের দিকে যাচ্ছিলো তখন দুজনের কারোই ঠিক বিশ্বাস হচ্ছিলো না যে ওরা সত্যই বিয়ে করতে চলেছে । তবে সেটা নিয়ে ওরা কেউই চিন্তিত নয় মোটেই । ওদের কারোই মনে হচ্ছে না যে ওরা ভুল করতে চলেছে ।

How useful was this post?

Click on a star to rate it!

Average rating 4.7 / 5. Vote count: 66

No votes so far! Be the first to rate this post.

About অপু তানভীর

আমি অতি ভাল একজন ছেলে।

View all posts by অপু তানভীর →