তৃষার ভালবাসা ২.০

oputanvir
4.9
(90)

কাজের সময় তৃষার ফোন ধরতে ইচ্ছে করে না । তাই যখন কোন কাজ নিয়ে ব্যস্ত থাকে তখন বেশির ভাগ সময়ই ওর ফোনটা সাইলেন্ট মোডে থাকে । আজ কী কারণে সেটা ছিল না । নতুন প্রোজেক্টের ফাইন নিয়ে কাজ করার সময় সেটা বেজে উঠায় একটু বিরক্ত হল । লাইনটা কেটেই দিতে যাচ্ছিলো তখনই নামটার দিকে চোখ গেল ওর !

অপুর বস !
অপুর বস ওকে হঠাৎ ফোন দিচ্ছে কেন ?

ফোনটা আর কেটে দিতে পারলো না । রিসিভ করলো ।
-হ্যা ভাইয়া । কেমন আছেন?
-হ্যা ভাল আছি । তুমি কেমন আছো?
-আমিও আছি আর কি । কাজে ব্যস্ত । কোন কারণে ফোন দিয়েছিলেন?
-হ্যা । অপুর কোন খোজ নেই কেন? গতকাল অফিসে এসে বলল যে কাজ আছে একটু বের হতে হবে । সেই যে বের হল তারপর আর কোন খোজ নেই । আজকে তো অফিসে আসে নি । ও কোথায় বল তো !

তৃষা কিছু সময় চুপ করে শুনলো কথা গুলো । প্রথমে মাথার ভেতরে একটা রাগের ভাব আসতে গিয়েও থেমে গেল । অপু নিজের কাজ তো কামাই করে না । গত পুরশুদিন অপুর সাথে তৃষার ঝগড়া হয়েছে । তারপরই তৃষা রাগ করে অপুর সাথে কথা বলে নি । কোন খোজ নেয় নি । নিজ থেকে যত সময় না অপু সরি বলবে তত সময়ে সে অপুর কাছে যায় না । প্রতিবার অপু আগে এসে সরি বলে তারপর সব কিছু ঠান্ডা হয় । তাহলে আজকে এখনও এল না কেন?
তার উপরে অফিসে যায় নি ।

তৃষা বলল, আচ্ছা ভাইয়া আমি খোজ নিয়ে জানাচ্ছি ।
ফোন রাখার পরে তৃষার কেন মনের ভেতরে একটা কু ডেকে উঠলো । কেন উঠলো সেটা তৃষা নিজেও জানে না । আসলে গতদিন তৃষার সাথে অপুর কোন ঝগড়া হয় নি । তৃষাই মুখে যা এসেছে তাই বলেছে ওকে । বিশেষ করে ওর প্রাক্তন প্রেমিকার প্রসঙ্গটা তোলা তৃষার মোটেও উচিৎ হয় নি । তারপরেও তৃষা তুলেছে । চাইলে অপুও তুলতে পারতো তবে সে তেমনটা করে নি । চুপচাপ শুনেছে । তারপর ঘর ছেড়ে বের হয়ে গেছে ।
তৃষা জানে যে অপুর খুব বেশি দুরে যাওয়ার নেই । খুব বেশি হলে ও কোন বন্ধুর বাসায় যাবে । নয়তো ওদের গাজিপুরের ফার্ম হাউজে যবে । আর না হলে যাবে ওর গ্রামের বাড়ি । এর বাইরে সে কোথাও যেতে পারবে না । এই কারণে খুব একটা চিন্তা করে নি সে । কিন্তু এখন কেন জানি মনে হচ্ছে অপু এসবের কোনটাতেই যায় নি ।

হাতের কাজ বাদ দিয়ে তখনই অপু প্রথমে ওর সব বন্ধুদের ফোন দিল । কারো বাসায় যায় নি সে । ফার্ম হাউজের কেয়ারটেকারকে ফোন দেখলো সেখানেও যায় নি । সব শেষে ফোন দিল ওর শ্বাশুড়িকে । যখন রিং বাজছে তখন মনের ভেতরে একটা ভয় এসে জড় হল ।
শ্বাশুরির সাথে কথা বলা শেষ যখন তখন তৃষা অনুভব করলো যে ওর ভেতরে একটা ভয় এসে জড় হয়েছে ।
অপু ওখানে যায় নি ।
তাহলে কোথায় গেল সে?

দুই
মইনুল আহসান নিজের ফোনের দিকে তাকালেন। তারপর তাকালেন ঘড়ির দিকে । এই সময়ে তার মেয়ে কখনই ফোন করে না তাকে । তৃষার ফোন করার সময় হচ্ছে রাতের খাওয়ার পরে । এছাড়া তৃষা কখনই ফোন করে না । ফোন করেছে এর অর্থ হচ্ছে কোন ঝামেলা হয়েছে ।

মইনুল আহসান ফোন রিসিভ করার আগেই নিজের মনকে শক্ত করে নিলেন কঠিন কিছু শোনার জন্য ।
-হ্যালো ।
-হ্যালো বাবা !

মইনুল আহসান একটা লম্বা করে দম নিলেন । তৃষা সব সময় তাকে ড্যাড বলেই ডাকে কিন্তু যখন সে খুব বেশি আপসেট হয়ে যায় তখন বাবা বলে ডাকে । তার মানে সত্যিই খারাপ কিছু হয়েছে । তিনি নিজেকে শান্ত করে বললেন, কী হয়েছে রে মা ?
-বাবা অপুকে খুজে পাচ্ছি না ।
-খুজে পাচ্ছি না মানে কি ! অপু কি এক বছরের ছেলে নাকি হারিয়ে যাবে ।
-বাবা পরশু ওর সাথে খুব ঝগড়া হয়েছে !
-তোর সাথে ও ঝগড়া করেছে?
তৃষা একটু দম নিলো যেন । তারপর বলল, আমি ওকে মুখে যা এসেছি বলেছি। ও কিছুই বলে নি । তারপর বাসা ছেড়ে গেছে । আমি ভেবেছিলাম বড়জোড় ফার্ম হাউজে যাবে কিন্তু যায় নি । কোথাও নেই ।
-সব জায়গায় খোজ নিয়েছিস?
-সব জায়গা খোজ নিয়েছি । কোথাও নেই !

বলতে বলতেই তৃষার কান্নার আওয়াজ ভেসে এল । মইনুল আহসান জীবনে সব সহ্য করে নিতে পারেন কিন্তু মেয়ের কান্না কিছুতেই মনে নিতে পারেন না । তিনি বললেন, তুই চিন্তা করিস না । আমি খুজে বের করবো অপুকে । একদম চিন্তা করিস না ।

তিনি ফোন রেখে কিছু সময় অবাক হয়ে বসে রইলেন । নিজের মেয়েকে তিনি প্রায়ই বুঝতে পারেন না । এতো বড় কোম্পানি সে একা হাতে সামলাচ্ছে । কয়েক হাজার কর্মী এক কথায় উঠবস করে তৃষার কাছে । যখন তিনি ব্যবসা ছেড়ে রাজনীতিতে ঢুকেছিলেন তখন মনে একটা সন্দেহ ছিল যে তৃষা একা সামলাতে পারবে তো সব কিছু ! কিন্তু তার সেই সন্দেহ একেবারে ভুল প্রমানিত করেছে তৃষা । সব কিছু সামলাতে পারে কিন্তু এই এক অপুর কথা আসলেই সব কিছু তাল হারিয়ে ফেলে মেয়েটা । একবার তো পরীক্ষা করার জন্য অপুকে সে তুলে নিয়ে এসেছিলো । তৃৃষা কোন কিছু না ভেবে এক কোটি টাকা পর্যন্ত দিয়ে দিতে রাজি হয়ে গিয়েছিলো । সেদিনই মইনুস আহসান বুঝেছিলেন যে এই অপু তার মেয়ের কাছে কতখানি গুরুত্বপূর্ণ !

তিন
হাসানের দিকে তাকিয়ে মিমু বলল, আপনি গুল মারছেন !
-আমাকে দেখে মনে হচ্ছে আমি গুল মারছি !
-তার মানে ম্যামের হাজব্যান্ড সত্যি হারিয়ে গেছে ।
-আরে হারিয়ে যাবে কেন ? ম্যামকে টাইট দেওয়ার জন্য তাকে ছেড়ে চলে গেছে । এর আগে একবার এই ভাবে চলে গিয়েছিলো । তুমি তো জানো ম্যাম যেমন । সবাইকে দৌড়ের উপরে রাখে । অপু স্যার কেও রাখেন তবে …..
-তবে অপু স্যারের সামনে তিনি কিছুই করতে পারেন না । মনে নেই একবার কিভাবে আমাদের আমির হোসেন আর রাকিবের চাকরি বাঁচিয়েছিলো সে ।

মিমু ঘটনাটা শুনেছে । বছর চারেক আগের ঘটনা । সেবার এই দুইজনের ভুলে বড় একটা টেনডার হাত ছাড়া হয়ে গিয়েছিল। চাকরি চলেই যেত তখন এরা অপু মানে ম্যামের হাসব্যান্ডের সাথে যোগাযোগ করে তখন যদিও বিয়ে হয় নি। প্রেমিক ছিল । সেই অফিসে এসে কিভাবে জানি ম্যামের রাগ প্রশমন করে দিয়েছিলো ।
হাসান বলল, অপু স্যার চলে যাওয়ার পর ম্যাম এখন একটা দানা পানিও মুখে নেন নি । আজকে সকালে অজ্ঞান হয়ে গিয়েছিলো। তাকে হাসপাতালে নেওয়া হয়েছে । আমি ওখানেই যাচ্ছি ।
মিমুর কী যেন মনে হল বলল, আমি আসবো আপনার সাথে
-আসবে? আসো !

মিমু আর হাসান হাসপাতালে পৌছে দেখলো সেখানে তৃষার বাবা আগে থেকেই বসে আছে । তৃৃষা শুয়ে আছে বেডের উপরে । মিমু তাদের বসের চেহারা দেখে খানিকটা অবাক হয়ে গেল । এই কোম্পানীতে সে বছর দুয়েক হল কাজ করছে কোন দিন তৃষা ম্যাডামকে এই চেহারাতে দেখেন নি । সব সময় নিজের উপর আত্মবিশ্বাসী আর কাউকে দরকার নেই এমন একটা চেহারায় দেখেছেন অথচ আজকে তাকে কেমন দেখাচ্ছে । সত্যিই কাউকে সত্যিকারের ভালবাসা মানুষকে দুর্বল আর অসহার করে তোলে ।

তৃষার বাবা মইনুল আহসান বললেন, মনে হয় অপুর খোজ পাওয়া গেছে ।
-কোথায় বাবা?
-চারদিন আগে ওকে থানচি ক্রস করতে দেখা গেছে । ওখানে লাস্ট এন্ট্রি । ওরা বলছে রেমাক্রি হয়ে নাফাকুম যাবে ।
-নাহ । ও ঐ সহজ পথে যাবেই না ।
-হ্যা আমারও তাই মনে হয় । খোজ করা হচ্ছে । সম্ভব্য সব রুটেই লোক গেছে । খোজ পাওয়া যাবে । টেনশন নিস না ।

চার
বনমোরগের মাংস টুকু মুখ দিতে দিতে অপু আকাশের দিকে তাকালো । প্রায় সন্ধ্যা হয়ে এসেছে । আজকের রাতটা এখানেই কাটানোর প্লান করা হয়েছে । ওর গাইড বাহাদুর সেই মোতাবেগই তাবু খাটিয়েছে । এখানে । রাতে এখানে ঘুমিয়ে কাল সকালে আরও সামনের দিকে যাওয়ার ইচ্ছে অপু । যদিও সামনে যাওয়াটা একটু ঝুকি পূর্ন হয়ে যাবে । একেবারে মায়ানমার বর্ডারের কাছে চলে এসেছে ওরা দুজন । যদিও বাহাদুর বলছে যে এখানে ওদের গ্রাম থেকে প্রায় শিকারে আসে । এখানে ভালল বনমোরগ পাওয়া যায় । শেয়াল বানর আর হরিণও নাকি এখানে প্রচুর আছে । যদিও অপুর হরিণ মারার কোন ইচ্ছে নেই । তবে খাবার দাবার শেষ হয়ে আসছে । আরও দিন দুয়েক এখানে থাকার ইচ্ছে । তারপর আবার ফিরে যাওয়ার সময় আছে । এই সময়ে খাবার দরকার হবে ।

গত তিনদিন ধরে অপু এই বনের ভেতরে ঘুরে বেড়াচ্ছে । সময়টা বেশ কাটছে । যদিও মাথার ভেতরে তৃষার জন্য একটা চিন্তা কাজ করছে । মেয়েটার যদি এরই ভেতরে রাগ কমে যায় তাহলে চিন্তায় অস্থির হয়ে যেতে পারে !

একটু পরেই বাহাদুরের দিকে তাকাতেই বুঝলো কোন একটা ঝামেলা হয়েছে । বাহাদুর কান খাড়া করে কিছু শোনার চেষ্টা করছে । সম্ভবত কেউ আছে আসে পাসে । মানুষ হওয়ার সম্ভবনা কম । ভাল্লুক যদি হয় তাহলে বিপদ হতে পারে ।
অপুর দিকে তাকিয়ে ইশারা করতেই অপু ব্যাগ থেকে বড় ছুরিটা তুলে নিল । সামনে কিংবা পেছন থেকে যেই আসুক না কেন তাকে প্রতিহত করতে একেবারে প্রস্তুত ।
কিন্তু কোন পশু এল না । এল মানুষ ।
আর্মির লোক । মোট চারজন ।

ওদের দিকে তাকিয়ে প্রথমে প্রশ্ন করলো, অপু হাসান আপনার নাম ?
-জ্বী !
-আপনি এখানে কেন এসেছেন? জানেন না এখানে আসা নিষেধ ।
তারপর বাহাদুরের দিকে তাকিয়ে বলল, তুই কেন নিয়ে এসেছিস ওনাকে? আজ তোকে …
অপু জানে আর্মি গাইডদের ধরে মাইর দেয় । অপু সাথে সাথে সামনে এসে দাড়ালো । তারপর বলল, ওর কোন দোষ নেই । ওকে কিছু বলা যাবে না । যা বলার আমাকে বলুন ।

আর্মির লোকটা একবার অপুর দিকে তাকিয়ে বলল, আপনার এখনই ঢাকা ফিরতে হবে ।
-কেন ?
-আপনার ওয়াইস হাসপাতে ভর্তি । আপনার খোজে সরাসরি মন্ত্রনালয় থেকে তলব এসেছে ।
অপুর বুঝতে কষ্ট হল না এটা তার শ্বশুর মশাইয়ের কাজ । আর্মির লোকটা আবার বলল, আপনি এখনই হাটা দিবেন আমাদের সাথে । থানচি গিয়ে সেখানে হেলিকাপ্টারে করে সোজা চট্টগ্রামে যাবেন । তারপর সেখানে আপনার জন্য প্লেন অপেক্ষা করছে ।

তবুও থানচি পৌছাতে আরও একটা দিন পার হয়ে গেল । সেখানে থেকে চপারে করে চট্রগ্রাম এয়ারপোর্ট তারপর সেখান থেকে ঢাকা । এারপোর্ট থেকে সরাসরি হাসপাতালেই গিয়ে হাজির হল অপু । রুমে ঢুকতে যদিও একটু ভয় লাগছিলো একটু ।

রুমে ঢুকেই দেখতে পেল তার শশুর শাশুড়ি দুজনেই বসে আছেন । এছাড়া হাসান আছে । আরেকজন মেয়েকেো দেখা যাচ্ছে । তৃষা চোখ বন্ধ করে শুয়ে ছিল । ওর রুমে ঢুকতেই চোখ মেলে তাকালো । ওর দিকে চোখ পড়তেই স্থির হয়ে তাকিয়ে রইলো । অপু দেখতে পেল চোখ দিয়ে পানি পরা শুরু করেছে । অপু ধীর পায়ে এগিয়ে বসলো তৃষার পাশে । তৃষার কোন মতে উঠতে যাচ্ছিলো তার আগেই অপু ওকে উঠতে সাহায্য করলো । সেখানেই ওকে জড়িয়ে ধরলো ।
আশে পাশে যে ও বাবা মা ছাড়াও আরও কয়েকজন মানুষ আছে সেদিকে তৃষার কোন খেয়াল নেই । অপুর ঠোঁটে একটা গভীর চুমু খেল সে । তারপর বাচ্চা মেয়ের মত করে কাঁদো কাঁদো কন্ঠে বলল, আমি খুব সরি । আর কখন কিছু বলবো না কিছু না । আর কোন দিন ঐ কথা বলবো না । প্লিজ আমাকে ছেড়ে যেও না । কেমন !
-আরে বোকা মেয়ে তোমাকে ছেড়ে যেতে পারি নাকি আমি !
-তাহলে কেন গিয়েছিলে? কেন?
-আমি তো ভেবেছিলাম তুমি রাগ করে আছো । এই কদিন আমার মুখ দেখবে না । তাই কী করবো ভাবলাম ঘুরে আসি কোথাও !
অপু ভেবেছিলো এবার বোধহয় তৃষা ঝাড়ি দিবে ওকে । তবে তৃষা তেমন কিছুই করলো না । কেবল অপুকে আরও একটু শক্ত করে জড়িয়ে ধরলো ।

পরিশিষ্টঃ
আমরা সবাই জীবনে আশা করি যে আমাদের জীবনেও এমন কেউ থাকবে যে আমাদেরকে তৃষার মত করে ভালবাসবে । কিন্তু একটা বয়সে এসে উপলব্ধি করতে পারি যে এমন ভাবে কেউ কাউকে ভালোবাসতে পারে না । এসব কেবল গল্প সিনেমাতেই হয় বাস্তবে কখনই হয় না ।

How useful was this post?

Click on a star to rate it!

Average rating 4.9 / 5. Vote count: 90

No votes so far! Be the first to rate this post.

About অপু তানভীর

আমি অতি ভাল একজন ছেলে।

View all posts by অপু তানভীর →