আমি নিজেকে এমন একটা স্থানে আবিস্কার করলাম যেখানে এর আগে কোন দিন আসি নি । জায়গাটাকে আমি মোটেই চিনতে পারছি না। এখানে কিভাবে এলাম সেটাও বুঝতে পারছি না । সামনে কিংবা পিছনে যেদিকেই তাকাই না কেন কোন কিছুই ঠিক পরিস্কার বুঝতে পারছি না । চারিদিকে কেমন ধোয়া ধোয়া ভাব দেখা যাচ্ছে ।
আমি একটা বেঞ্চে বসে আছি । কত সময় ধরে বসে আছি সেটা আমি বলতে পারবো না । আর কেনই বা বসে আছি সেটাও ঠিক বলতে পারবো না । আমি কেবল বসে আছি !
একটা সময়ে দেখতে পেলাম কেউ আমার দিকে এগিয়ে আসছে । দুর থেকেই বুঝতে পারছি একটা মেয়ে ! জিন্স টিশার্ট পরা অবস্থায় ধির পায়ে এগিয়ে আসছে আমার দিকে । একবার মনে হল আমি উঠে গিয়ে মেয়েটার সাথে দেখা করি । তারপরই মনে হল আমার ওঠার কোন দরকার নেই । মেয়েটা তো এই দিকেই আসছে ।
মেয়েটা যখন আমার কাছে এল আমি অবাক হয়ে তাকিয়ে দেখি মেয়েটা আর কেউ নয়, আমার প্রথম প্রেমিকা আইরিন !
আমি সত্যিই অবাক না হয়ে পারলাম না । আইরিনের সাথে আমার শেষ কবে দেখা হয়েছিলো আমি মনেও নেই । ইণ্টারের পর আর দেখা হয় নি । এই মেয়ে কোথায় আছে সেটা আমি জানিও না । আইরিন আমার পাশে এসে বসলো ।
আইরিন আমার দিকে মিষ্টি করে হেসে বলল, এখনও আমার উপর রাগ করে আছো ?
আমি বললাম, এখানে এই প্রশ্ন ?
-না মনে হল ! আমার কেন জানি মনে হয় তুমি কোন দিন আমাকে ক্ষমা করবে না আমি যা করেছি তোমার সাথে !
কথা অনেকটাই সত্য । আমি হয়তো কোন দিনই মন থেকে আইরিনকে ক্ষমা করতে পারবো না । মনের ভেতরে একটা ঘৃণা বোধ রয়েই যাবে সব সময় । আইরিন বলল,
-এটার কারনে তুমি কোন দিন পরিপূর্ন সুখী হবে না । যতদিন আমাকে ঘৃণা করবে ততদিন তোমার শান্তি নেই ।
-তুমি শান্তি পাবে ? বিশেষ করে আমার সাথে ঐ আচরণ করার পরে ?
-না হয়তো ! আমার হয়তো সারা জীবন এর থেকে কোন মুক্তি নেই । এটা আমার কৃতকর্ম । এটার ফল আমাকে ভোগ করতে হবে । কিন্তু তুমি তো আর অন্যায় কর নি । তাহলে তুমি কেন কষ্ট পাবে শুনি ! তুমি চাইলেই এটা থেকে মুক্তি পেতে পারো !
-সো তুমি এখন আমার শান্তির জন্য ভাবছো ?
আইরিন কোন কথা না বলে উঠে দাড়ালো । তারপর হাটতে লাগলো । আমি কয়েকবার ডাক দিলাম তবে সে শুনতে পেল না যেন । না থেমে চলে গেল । দেখতে দেখতে দৃষ্টির অনেক দুরে চলে গেল । আমি মন খারাপ করে বসে রইলাম । এই অদ্ভুত স্থানে একা একা বসে থাকার চেয়ের আইরিনের সাথে বসে থাকাটা মন্দ ছিল না । ওর সাথে কথা বলতে চেয়েছি অনেক দিন । এখন অবশ্য আর চাই না । তবে আইরিন সত্যই বলেছে । ওকে ঘৃণা করার কারনে হয়তো কোন দিন পুরোপুরি সুখী হব না । হঠাৎ কি মনে হল আমি আইরিনকে মাফ করে দিলাম । ওর প্রতি জমে থাকা সকল ঘৃণা ক্লেশ এক নিমিশেই মুছে দিলাম । মনে মনে বললাম তোমাকে মাফ করে দিলাম আইরিন । আমি এখন তোমার কাছ থেকে একেবারে মুক্ত !
এরপর অদ্ভুত একটা ঘটনা ঘটতে লাগলো । আমার জীবনে আমি যে সব মানুষের কাছ থেকে কষ্ট পেয়েছি তারা হঠাৎ হঠাৎ আমার সামনে আসতে লাগলো । যাদের সাথে আমার অনেক দিন দেখা হয় নি, অনেক পুরানো বন্ধু বান্ধব, পরিচিত মানুষ যাদের আচরনে আমি কষ্ট পেয়ে তাদের কাছ থেকে নিজেকে গুটিয়ে নিয়েছি এমন অনেক মানুষ আমার সামনে হাজির হতে লাগলো । সবাইকে আমি আস্তে আস্তে ক্ষমা করে দিলাম । তাদের প্রতি জমে থাকা রাগ গুলো মুছে যেতে লাগলো ধীরে ধীরে !
কি হচ্ছে এই সব এখানে !
যখন খানিকটা অস্থির হয়ে যেতে শুরু করেছি তখনই আমি নিকিতাকে দেখতে পেলাম । আমার দিকে হাসি মুখে এগিয়ে আসছে !
এই মেয়েটার উপর তো আমার কোন রাগ নেই । তাহলে এখানে কেন আসছে ?
নিকিতা সামনে এসে বলল
-কি জনাব ! এখনও বসে আছেন ?
আমি কিছু না বলে কেবল মাথা ঝাকালাম । নিকিতা বলল
-আসুন ! অনেক কাজ হয়েছে । এখন বাসায় যাওয়ার সময় হয়েছে !
-বাসায় !
-হুম !
এই বলে নিকিতা আমার দিকে হাত বাড়িয়ে দিল । আমি ওর হাতটার দিকে কিছু সময় অবাক হয়ে তাকিয়ে রইলাম । ওর হাতের অনামিকায় একটা আংটি দেখা যাচ্ছে । অংটিটা আমার কাছে খুব বেশি পরিচিত মনে হচ্ছে । কিন্তু আমি ঠিক মনে করতে পারছি না আমি কোথায় দেখেছি ! আমার মনের ভেতরে খুব অস্থির লাগতে লাগলো । আমার পুরো পৃথিবী যেন কেঁপে উঠলো ।
তখনই আমি জেগে উঠলাম ।
চোখ মেলে কিছু সময়ে ঠিক বুঝতে পারলাম না আমি কোথায় আছি । সাদা ছাদের দিকে তাকিয়ে রইলাম বেশ খানিকটা সময় । আমার নিজের ঘরের সিলিংটা ঠিক সাদা নয় । আমি এখানে কিভাবে এলাম !
কয়েক সেকেন্ড পরেই আমার সব কিছু মনে পড়ে গেল । আমি নিকিতার সাথে রেসন্টুরেন্টে ছিলাম । ওকে বিয়ের জন্য প্রপোজ করেছিলাম। অপেক্ষা করছিলাম ও কখন হ্যা বলবে । ঠিক সেই সময়ে আমি একটা তীব্র ব্যাথা অনুভব করি । নিজের বুকের দিকে তাকিয়ে দেখি সেখানটা লাল রক্তে ভেসে যাচ্ছে । কেউ আমাকে গুলি করেছে ।
গুলির আওয়াজ শুনি তবে একটা কাঁচ ভাঙ্গার আওয়াজের মত শুনেছি । সম্ভবত স্নাইপার রাইফেল দিয়ে গুলি করা হয়েছে !
আমি একটু নড়তে চেষ্টা করলাম । সাথে সাথেই সেই ব্যাথাটা অনুভব করলাম । মুখ দিয়ে একটু আওয়াজ বের হয়ে গেল । সাথে সাথেই একটা মুখ দেখতে পেলাম চোখের সামনে !
নিকিতা !
ওর চোখে পানি দেখতে পাচ্ছি । চোখ লাল হয়ে আছে । নিশ্চয়ই ঘুমায় নি ।
নিকিতা কোন কথা বলছে না । কেবল আমার দিকে তাকিয়ে আছে ! আমি কোন মতে বললাম
-তুমি কি হ্যা বলেছিলে ?
নিকিতা চোখে পানি নিয়ে হেসে ফেলল । তারপর ওর অনামিকাটা আমাকে দেখালো । ওখানে আমার দেওয়া আংটি টা দেখা যাচ্ছে ।
নিকিতা বলল
-যদি কিছু হয়ে যেত তোমার খবর ছিল ! আমি বিয়ের আগে মোটেই বিধবা হতে চাই না । হতে দিবোও না !
হতে দিবো না শব্দে নিকিতার জোর দেওয়া দেখে আমার ভাল লাগলো । তবে ভাল লাগলো যে আমি বেঁচে আছি । হয়তো খুনি নিকিতাকে নিশানা করেছিলো । আমি মাঝ পথে পড়ে গেছি । এমনটা একটা রিস্ক যে থাকবে সেটা আমি অনেক আগে থেকেই জানি । অতীতে আমাদের দেশে এমন হামলা হয়েছে । বিশেষ করে যারা সত্যি সত্যটি দেশের জন্য কাজ করতে যায় তারা অনেকের কুনজরে পড়ে যায় সব সময় । অনেকে অস্বস্থির কারন হয়ে দাড়ায় । নিকিতার কথা বলার অপেক্ষা রাখে না । নিকিতা যে কত মানুষের অস্বস্তির কারন সেটা সবাই জানে । এবং তারা বেশ ক্ষমতাবান মানুষ ।
নিকিতা আরও কিছু বলতে গেল কিন্তু তার আগেই আমি মায়ের কন্ঠস্বর শুনতে পেলাম । একটু মাথা কাত করে দেখি মা আর বাবা দরজা দিয়ে ঢুকছে ।
আমার দিকে তাকিয়ে কিছু সময় মা বিলাপ করলো । তার বেশির ভাগই নিকিকে দোষারোপ করে । আমার এইপরিস্থিতির জন্য নিকিতা দায়ী সেটা সে কোন প্রকার রাকঢাক না করেই বলতে লাগলো । নিকিতার দিকে তাকিয়ে দেখি সে মুখ কালো করে দাড়িয়ে আছে । কোন কিছু বলছে না । এক পর্যায়ে বাবা মায়ে থামালো । তারপর নিকিতার দিকে তাকিয়ে বলল,
-তুমি মা এখন বাসা যাও । গত চারদিনে একবারও এই রুমের বাইরে যাও নি । তুমি গুরুত্বপূর্ন পদে আছো । সব কিছু ফেলে এখানে বসে থাকাটা মানায় না ।
আমি নিকিতার দিকে তাকালাম । নিকিতার চেহারা দেখেই প্রথমে মনে হয়েছিলো যে ও যেন নিজের ভেতরে নেই । পুরোটা সময় সে নাওয়া খাওয়া বাদ দিয়ে আমার পাশে বসে ছিল । নিকিতা আমার দিকে তাকিয়ে একটু হাসলো তারপর বলল
-আমি আসি !
-আচ্ছা !
নিকিতা রুম থেকে বেরিয়ে যেতেই আমি মায়ের দিকে তাকিয়ে বললাম
-এভাবে বলার দরকার ছিল মা ?
-শোন যা বলেছি ঠিকই বলেছি । আমি এই জন্য রাজনৈতিকদের দেখতে পারি না । তুই বল আজকে ঐ মেয়ে যদি তোর জীবনে না আসতো তাহলে এসব কিছু হত ?
আমি কোন কথা না বলে চুপ করে রইলাম না । এক হিসাবে মায়ের কথা ঠিকই আছে । মা আবার বলল
-আমি কিছু জানি না । এই মেয়ের সাথে আমি তোর মেলামেশা করতে দিবো না ।
আমি বললাম
-দেখো এসব বলে লাভ নেই । যা হবার হবে । এটা নিয়ে আমি ভাবতে চাই না । আমি নিকিতাকে ছাড়বো না ।
-হ্যা এখন তা ছাড়বা কেন ? তুমি নায়ক হয়েছো । মরবা তবুও নায়িকাকে ছাড়বা না ! আমরা কে ? বুক খালি হলে তো আমার হবে অন্য কারো হবে না ! কিন্তু আমার কথা ভাবে কে !
মা এই কথা বলতে বলতে ঘর ছেড়ে চলে গেল । আমি বাবার দিকে তাকিয়ে রইলাম । বাবা একটু একটু হাসলো । তারপর আমার পাশে এসে বসলো । বলল, তোমার মায়ের মাথা একটু গরম হয়ে আছে । কি করবি বল । তবে নিকিতাকে আমার পছন্দই হয়েছে । শুরু থেকে মনে হয়েছিলো মেয়েটা হয়তো টাইমপাশ করছে কিন্তু গত চার দিনে বুঝেছি যে মেয়েটা সত্যিই তোকে ভালবাসে । একটা মিনিটের জন্য তোকে চোখের আড়াল করে নি । সব সময় তোমার সামনে ছিল । ঠিক মত খায়ও নি কিছু । এর ভেতরে অনেকে এসে তোকে দেখে গেছে । এমন এমন সব মানুষ যে আমি কোন কল্পনাও করি নি । পিএম অফিস থেকে আমার ফোনে ফোন এসেছে । বুঝতে পারছিস ব্যাপারটা ?
আমি হাসলাম ! বললাম, হুম !
পরের কটা দিন শান্ত ভাবেই কেটে গেল । রাতে নিকিতা আসতো । সারা রাতই বসে থাকতো আমার রুমে । আমি ঘুমানোর থেকে ঘুম ভাঙ্গা পর্যন্ত নিকিতাকে দেখতে পেতাম । মায়ের সাথেও নিকিতার দেখা হত । মা চুপ করে থাকতো । এমন একটা ভাব করতো নিকিতাকে যে যেন দেখেই নি । বিয়ের আগেই বউ শ্বাশুড়ির লড়াই শুরু হয়ে গেল ।
কিন্তু একদিন খুব অস্বাভাবিক ঘটনা ঘটলো । তখনও নিকিতা আসে নি । মা একটু আগে বাড়ির দিকে গিয়েছে । বাবা সম্ভবত আছে তবে রুমে আমি একলাই ছিলাম । এমন সময় একজন নার্স ঘরে ঢুকলো । তার মুখে একটা মাস্ক পরা তাই চেহারা আমি দেখতে পাচ্ছিলাম না । মেয়েটা আমার কাছে এসে আমার রিপোর্ট দেখার ভান করে আমার সামনে এসে দাড়ালো । তারপর একটা ছবি আমার দিকে বাড়িয়ে দিল । আমি তাকিয়ে দেখি একটা জনসভার ছবি । নিকিতার জনসভা । সামনের দিকে বেশ কিছু মানুষকে দেখা যাচ্ছে । একটা মাথার উপর গোল দেওয়া আছে । আমি কৌতুহল নিয়ে নার্সের দিকে তাকালাম । নার্স বলল, গোল সার্কেল দেওয়া মানুষটাকে দেখতে পাচ্ছেন ?
-হ্যা ।
-এই মানুষটা আপনাকে গুলি করেছে ।
আমি অবাক হয়ে মেয়েটার দিকে তাকিয়ে রইলাম । মেয়েটা আবার বলল
-লোকটা আপনার হোম মিনিস্টারের দলের লোক । সার্প সুটার । এর আগেও এই কাজ করেছে । তবে তার উপর দলের নেক নজর থাকায় আমরা কিছু করতে পারি নি ।
-আমরা মানে ? আপনারা কারা ?
মেয়েটা সেই প্রশ্নের জবাব না দিয়ে বলল
-গত কালকে এই লোকটা মারা গিয়েছে এনকাউন্টারে ! এতোই গোপন ছিল যে আমিও কিছু জানতে পারি নি । আপনার উপর আবারও হামলা হবে মিস্টার অপু ! এইবার সে তারা ভুল করবে না !
আমি অবাক হয়ে বললাম
-আপনি কে ? কি বলছেন এসব ?
-আমাকে আপনি চিনবেন না । তবে আপনি এমন কাউকে চিনেন যে আমাকে চিনে ?
-কে ?
মেয়েটা কিছু সময় তাকিয়ে থেকে বলল
-আমি রিদির বন্ধু । আমরা এক সাথে পড়াশুনা করেছি । ও ইউনিভার্সটিতে গিয়েছে আমি ডিবিতে এসেছি । দেশে ছাড়ার আগে ও আমাকে আপনার ব্যাপারে বলেছে । যাই হোক আমার এখন যাওয়া দরকার । আমি আপনার সাথে যোগাযোগ করবো । যদিও খুব একটা কিছু করার নেই আমার হাতে তবে অন্তত সাবধান করতে পারবো আপনাকে । আপনার প্রতিপক্ষ বড় শক্ত আর ক্ষমতাবান ।
মেয়েটা আর দেরি না করে চলে গেল গেল । আমি কেবল অবাক হয়ে তাকিয়ে রইলাম মেয়েটার চলে যাওয়া পথের দিকে । কি বলে গেল মেয়েটি ! রিদির বন্ধু মেয়েটা ! আর আমাকে যে গুলি করেছিলো সে নিকিতার দলের ছত্রছায়ার মানুষ হওয়া এক স্যুটার !!
আমার ঠিক বিশ্বাস হল না ব্যাপার টা ! না এসব হতে পারে না । মোটেই পারে না !