অপু তানভীর

মাই ডিয়ার হোম মিনিস্টার (পর্ব ১১)

5
(3)

দুপুরের এই সময়টা রাস্তায় গাড়ির পরিমান কম থাকে । কিন্তু আজকে মনে হচ্ছে সব গাড়ি রাস্তায় নেমেছে । তীব্র জ্যাম সৃষ্টি হয়েছে । নাকি আমার মনেই এমন মনে হচ্ছে । রাস্তাঘাট আমার কাছে কেমন যেন মনে হচ্ছে ! সব কিছু অপরিচিত ঠেকছে । আমি জোরে জোরে দম নিচ্ছি কেবল ! কত সময় ধরে দৌড়াচ্ছি আমি বলতে পারবো না । একটু আগে একটা সিএনজিতে ছিলাম । তবে সেটা ছেড়ে দিয়েছি । জ্যামের ভেতরে আটকে থাকতে থাকতে দম বন্ধ হয়ে আসছিলো । আমার কেবল মনে হচ্ছে আমার এখন নিকিতার কাছে পৌছাতে হবে ।

আজকে কাটাবনের কাছে একটা সম্মেলন ছিল । সেখানে বক্তিতা দেওয়ার সময় নিকিতার উপর হামলা হয়েছে । স্নাইপার দিকে কেউ ওকে গুলি করেছে । এর বেশি কিছু কেউ জানে না । ওকে দ্রুত সরিয়ে নেওয়া হয়েছে । কত টুকু আঘাত পেয়েছে সেটা বলা যাচ্ছে না । সংবাদটা শোনার সাথে সাথে আমার বুকের ভেতরে একটা তীব্র আকুলতা দেখা দিয়েছে ওকে দেখার জন্য । ওকে কয়েকবার ফোন দিয়েছি কিন্তু কেউ ফোন ধরে নি । আমি আর নিজেকে ধরে রাখতে পারি নি । আমার কেবলই এখন মনে নিকিতাকে নিজের চোখে না দেখতে পারলে আমার শান্তি নেই ।

ওর বাসার সামনে যখন পৌছালাম ততক্ষনে সামনে প্রচুর ভীড় জমে গেছে । আমি ভীড় ঠেকে গেটের কাছে এসে হাজির । অন্য সবাইকে ভেতরে ঢুকতে না দিলেও আমাকে ভেতরে ঢুকতে দিল । আমি এর আগেও এই বাসায় এসেছি কয়েকবার । তাছাড়া আমাকে সবাই মোটামুটি চেনে । দরজা ঠেলে ভেতরে ঢুকতেই দেখতে পেলাম ঘরের ভেতরে কয়েকজন মানুষ রয়েছে । এক পাশে সোফার নিকিতা বসে আছে । আমি ভেতরে ঢুকতেই সবার চোখ আমার উপর পড়লো । নিকিতাকে দেখলাম উঠে দাড়ালো । ওর বাবাকেও দেখতে পেলাম ।

আমি জানি না আমার ভেতরে কি হল আমি সবার সামনে গিয়েই নিকিতাকে গিয়ে জড়িয়ে ধরলাম । যদিও কাজটা কতখানি ঠিক হল আমি জানি না তবে মনে হল এটা না করলে যেন আমি শান্তি পাবো না । প্রথমে কিছু সময়ে আমার মুখ দিয়ে কোন কথাই বের হল না । আমার বুকের ভেতরের আন্দোলনে কারনে আমি কোন কথা বলতে পারছিলাম না । একটা সময় নিকিতা আমাকে জড়িয়ে ধরে বলতে শুরু করলো, আরে বাবা আমার কিছু হয় নি । বিশ্বাস কর ! কিচ্ছু হয় নি ! এই দেখো আমি একদম ঠিক আছি !

কত সময় পড়ে আমি নিজেকে নিকিতার থেকে আলাদা করেছিলাম মনে পড়লো না । তবে তখন তাকিয়ে দেখি ঘর ততক্ষণে একদম ফাঁকা হয়ে গেছে । সবাই রুম ছেড়ে চলে গেছে । আমার মুখের ভাব দেখে নিকিতা বলল

-এমন বাচ্চাদের মত আচরন করে কেউ ? সবার সামনে আমাকে এভাবে জড়িয়ে ধরলে ! আমি লজ্জায় শেষ !

আমি ততক্ষণে একটু সামলে নিয়েছি । নিকিতাকে বললাম

-সরি ! আসলে আমি …

-তুমি কি ?

-জানি না । নিজেকে ধরে রাখতে পারি নি । বারবার মনে হচ্ছিলো যদি তোমার কিছু হয়ে যেত…..

আমার কথা বলার ভাবটাই এমন ছিল নিকিতা আমার দিকে বেশ কিছু সময় তাকিয়ে রইলো । তারপর আমার ঠোঁটে চুমু খেল খুব গভীর ভাবে ! একটা পর্যায়ে ও আমাকে নিয়ে ওঠে আরও ভেতরের ঘরে ! আরও তীব্র ভাবে দুজন দুজন কে ভালবাসতে শুরু করলাম !

সন্ধ্যার পরপরই নিকিতা সাংবাদিকদের জানালো যে সব কিছু ঠিক আছে । তার শরীরের কোন আঘাত লাগে নি । হামলা হয়েছিলো তবে স্নাইপার লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়েছে । কে এই হামলার পেছনে আছে সেটা সে ঠিকই খুজে বের করবে । সে মোটেই এই হামলার কারনে ভীত হয়ে পড়ে নি । তার কাজ সে করেই যাবে । এবং আরও বেশি উদ্দম আর সততার সাথে ।

রাতে আমি নিকিতার বাসাতেই থেকে গেলাম । আমার আসলে ওকে চোখের আড়াল করতে ইচ্ছে করছিলো না । ওকে যে কতখানি ভালবাসতে শুরু করেছি সেটা আমি আজকে আরও ভালবাসে উপলব্ধি শুরু করেছি । রাতে ওর ঘরের ঝুল বারান্দায় বসে বসে দুজন গল্প করতে লাগলাম ।

কফির মগ হাতে নিয়ে নিকিতা বলল

-এই যে প্রফেসর সাহেব, আপনি যে কাজটা করলেন এতো গুলো মানুষের সামনে সেটা কি ঠিক হয়েছে ? আমার বাবা ছিল বাবার কয়েকজন বন্ধু পর্যন্ত ছিল । তারা কি মনে করলো ?

-যা মনে করে করুক ! আমার বউ বলে কথা !

-এখনও বউ হই নি !

-হও নি, হবা ! ইনফ্যাক্ট খুব জলদি । আমি তোমাকে নিজের বউই মনে করি । আর তুমিও যদি তা নাই ভাববে তাহলে ঐ কাজ….

আমাকে কথা শেষ করতে না দিয়ে নিকিতা বলল

-এই বেয়াদপ চুপ ….

-বাহ রে তুমি করতে পারবা আর আমি বলতে …..।

সাথে সাথেই দেখলাম নিকিতার মুখ লাল হয়ে গেল । ও বলল

-এবার কিন্তু ভাল হবে না । একদম চুপ ! ঐ সময়ে তোমার মাথা যেমন ঠিক ছিল আমারও না । ঠান্ডা মাথায় এসব কখনই হত না । বুঝলে !

আমি কিছু বললাম না । নিকিতা আমার দিকে তাকিয়ে থেকে আবার বলল

-জানো,তোমার ঐ চেহারা দেখে আমারও আসলে ….. আমিও আসলে আামর আবেগ কে নিয়ন্ত্রন করতে পারি নি । তুমি জানো আমি এই পুরো জীবনে আমার প্রতি কারো এতো তীব্র আবেগ দেখাতে দেখি নি । আমাকে অনেকে চেয়েছে কিন্তু আই গেস তোমার মত করে কেউ নয় । আমি যে তোমাকে সেদিন তুলে নিয়ে গিয়েছিলাম মোটেই ভুল করি নি !

আমি ওর আরেকটু কাছে এসে আরেকবার চুমু খেলাম ওকে ! নিকিতা সেটাতে বাঁধা দিল না । তখন নাকি ওর মাথা ঠিক ছিল না কিন্তু এখন তো মাথা ঠান্ডা । এখনও নিজেকে নিয়ন্ত্রন করার কোন লক্ষ্যন দেখতে পেলাম না !

পরের কয়েক দিন আমাদের আরও ঘন ঘন দেখা হতে লাগলো । মোটামুটি ও যেখানে যেত আমি কাজ না থাকলে সেখানে আমিও হাজির থাকতাম । একদিন রাত বারোটার দিকে তীব্র বৃষ্টির মাঝে ওর বাসার সামনে হাজির হলাম । ওকে ফোন করতেই ও জানলা দিয়ে কিছু সময় আমার দিকে তাকিয়ে রইলো । তারপর নিজেই নেমে এল । দুজন ওদের বাসার সামনে খানিক সময় লাফালাফি করলাম । তখনই আমার মনে হল এই মেয়েকে আমার বিয়ে করতে হবে । এবং জলদিই বিয়ে করতে হবে । নিজের ভেতরেই একটা পরিকল্পনা করে ফেললাম ।

পরের সপ্তাহেই কাজটা করতে হবে । ওকে বললাম যে আমার পছন্দের রেস্টুরেন্টে ওকে নিয়ে আমি ডিনার করতে চাই । এর আগে দুবার আমরা গিয়েছি সেখানে । তবে আগের দুবারই নিকিতার মুখ ঢাকা ছিল ওড়না দিয়ে । এবার সেটা থাকবে না । আর ঠিক করেছি এবার ওকে আমি সবার সামনেই বিয়ের জন্য প্রোপোজ করবো ।

ঠিক সময় মতই ও হাজির হল । ওকে আসতে দেখে অনেকেই অবাক হল । কয়েকজন ওর সাথে এসে ছবি তুলল । অনেকে অটোগ্রাফও নিলো । এমনটা হবে আমি জানতামই । তাই মুখ বুঝে সহ্য করা ছাড়া আর আসলে কিছু করার নেই । যখন সময় পেলাম তখন আমি ম্যানেজারকে ইশারা করলাম । সে হঠাৎই রেস্টুরেন্টের আলো খানিকটা কমিয়ে দিল । সেই সাথে নিকিতার সব থেকে পছন্দের গানটা বেজে উঠলো মৃদু স্বরে । নিকিতা অবাক হয়ে বলল

-কি ব্যাপার কি হচ্ছে ?

আমি ওকে আরও খানিকটা অবাক করে দিয়ে ঠিক ওর সামনে হাটু গেড়ে বসলাম । পকেট থেকে আংটি বের করে ওর সামনে বাড়িয়ে দিলাম । বললাম

-মাই ডিয়ার হোম মিনিস্টার তুমি কি আমার ঘরের হোম মিনিস্ট্রির দায়িত্ব নিবে ?

নিকিতা কিছু সময় তাকয়ে রইলো আমার দিকে । ওর চোখে আমি পানি দেখতে পেলাম । চারি দিকে তখন সবাই চুপ করে তাকিয়ে আছে আমাদের দিকে ! এমন কি গানও বন্ধ হয়ে গেছে । পুরো রেস্টুরেন্টে একটা পিন পতন নিরবতা ।

নিকিতা কিছু বলবে এর আগে ঢং ঢং করে ঘড়ির আওয়াজ শুনতে পেলাম । আওয়াজটা যেন একটু বেশিই তীব্র মনে হল আমার কাছে । সেই সাথে কোথাও কাচ ভাঙ্গার আওয়াজ শুনতে পেলাম আমি । সাথে সাথেই একটা তীব্র ব্যাথা অনুভব করলাম আমি । আমার বুকের ভেতরে যেন আগুন ঢুকে পড়েছে ।

আমি আংটিটা তখনও হাত দিয়ে ধরে রেখেছি । তবে নিজেকে ধরে রাখতে পারলাম না । চোখটা চলে গেল আমার নিজের বুকের দিকে । এই রকম আলোতেও সাদা শার্টে লাল রক্ত চিনতে অসুবিধা হল না আমার ।

কেউ আমাকে গুলি করেছে !! আমি মারা যাচ্ছি !

মাটিতে ঢলে পড়ার আগে নিকিতার চিৎকার শুনতে পেলাম কেবল । চোখ বন্ধ হওয়ার আগে নিকিতাকে দেখলাম আমার দিকে এগিয়ে আসতে । একেবারে চোখ বন্ধ করার আগে কেবল একটা কথাই মনে হল, নিকিতা কি “হ্যা” বলেছিলো !

পরের পর্ব

How useful was this post?

Click on a star to rate it!

Average rating 5 / 5. Vote count: 3

No votes so far! Be the first to rate this post.

Related Posts

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *