দ্য ম্যাও প্রিন্সেস (শেষ পর্ব)

4.7
(38)

পরদিন সকালে ঘটলো আরেক ঘটনা । আমাকে নিতে অফিসের গাড়ি আসে । আজকে গাড়িতে উঠেই অবাক হলাম । গাড়ি যদিও আগেরটাই রয়েছে তবে গাড়ির ড্রাইভার বদলে গেছে । এই ড্রাইভারকে আমি আগেও দেখেছি । কিন্তু সে তো এই গাড়ি চালায় না । আমি নতুন ড্রাইভারকে বললাম, কী ব্যাপার মজিদ কোথায়?
ড্রাইভার আমার দিকে তাকিয়ে একটা না জানার হাসি দিলো । বলল, জানি না স্যার । শুনছি মজিদের চাকরি নাই ।

তথ্যাটা আমি একটু চমকে গেলাম । আমার কেন জানি কাল রাতেই মনে হচ্ছিলো যে রিয়ানা আরমানের কাছে তথ্যটা ঠিকই চলে গেছে । কেমন করে গেছে আমি জানি না । বিশেষ করে কাল যে অদ্ভুত ঘটনা ঘটলো সেটার কোন ব্যাখ্যা ছিল না । এখন মজিদের চাকরি নেই শুনে মনে হল নিশ্চিত ভাবেই রিয়ানা আরমানের কাছে খবর চলে গেছে ।

আমার ধারণা সত্যি করে দিতেই রিয়ানা আরমান যখন বাড়ির বাইরে বেরিয়ে এল তখন তার চেহারার দিকে তাকিয়েই আমি একেবারে নিশ্চিত হয়ে গেলাম যে রিয়ানা আরমান গতকালকের ঘটনা জানে । আমি যে তার নির্দেশ অমান্য করে গাড়ি থেকে বের হয়ে রাতে হেটে হেটে বাসায় ফিরেছি এবং পথের মাঝখানে বিপদে পড়েছিলাম, এই তথ্য সে জানে ।

গাড়ি এগিয়ে চলল । রিয়ানা মুখ গম্ভীর করে বসে রইলো সিটের উপর । আমার দিকে কেবল একবার তাকিয়েছে সে । তারপর নিজের মোবাইলে কী যেন করছে । আমি যেন গাড়িতেই নেই এমন একটা ভাব করে আছে । আমি কিছু বলার সাহস পেলাম না । চুপ করে বসে রইলাম । তখনই খেয়াল হল গাড়ি অফিসের দিকে যাচ্ছে না । গাড়িটা যাচ্ছে মুন্সিগঞ্জের দিকে ।

আমি ড্রাইভারকে কিছু বলতে যাবো তার আগেই পেছন থেকে রিয়ানা বলল, রফিক, ফার্ম হাউজের দিকে নিয়ে যাচ্ছো তো ?
-জে ম্যাডাম ।
-গুড ।

আমি আর কিছু জানতে চাইলাম না । তবে একেবারে চুপচাপ বসে থাকতেও ভাল লাগছিলো না । কি যে করি !
অনেক সাহস করে পেছনে ফিরে তাকালাম । তারপর বলল, ম্যাম ফার্মহাউজে যাচ্ছি ! কোন কাজ ছিল কি?
-হ্যা ।
-ও !

আবারও আমি চুপ করে গেলাম । কি বলবো খুজে পেলাম না আর । বসে বসে আপন মনেই গত রাতের কথা ভাবতে লাগলাম । কিভাবে গত কাল রাতের ঘটনাটা ঘটে গেল ! কালো মত ঐ প্রাণীটা আসলে কি ছিল ? আর মিউ ওভাবে সামনে চলে এল কেমন করে ! এছাড়া মিউর আশে পাশে ঐ বিড়াল গুলোই বা কোথা থেকে এল । মিউয়ের আশে পাশের ঐ বিড়াল গুলো দেখে আমার কেন যেন মনে হয়েছে ওরা সবাই মিউয়ের বডি গার্ড টাইক কিছু একটা ।
কিন্তু মিউয়ের সাথে আমার প্রথম যেদিন দেখা হয়েছিলো সেইদিন মিউয়ের সাথে তো কেউ ছিল না । আর সেদিন মিউয়ের তো এতো সাহসও ছিল না যেমনটা ও গত রাতে দেখালো । আমার মিউয়ের সাথে প্রথম দেখা হওয়ার দিন মনে পড়লো । সেদিনও এমন রাতই ছিল । তবে সেদিন বেশ বৃষ্টি হয়েছিলো । আমার অফিসে বেশ কিছু কাজ ছিল । বের হতে হতে প্রায় রাত দশটা বেজে গেছে । আমি যখন অফিস থেকে বের হয়েছি তখন সব কিছু বন্ধ হয়ে গেছে । আমি আগেই বলেছি যে দিনের বেলা এই অফিস পাড়াটা একেবারে নিস্তব্ধ হয়ে যায় । আর সেদিন বৃষ্টি হওয়ার কারণে এলাকাটা যেন একেবারে সুনসান নিরব হয়ে গেছে । আমি চুপচা[প নিজের বাসার দিকে হাটা দিলাম ।

সেদিনও অর্ধেক পথ এসেছি তখনই কাছে কোথাও কয়েকটা বেড়ালের তীব্র চিৎকার শুনতে পেলাম । এতোই জোড়ে যে আমি বেশ চমকে গেলাম । রাস্তায় কেবল ল্যাম্প পোস্টের আলো জ্বলছে । সেই আলোতেই আমি দেখতে পেলাম একটা ধবধবে সাদা বেড়ালে দৌড়ে এগিয়ে আসছে আমার দিকে । ঠিক তার পেছনেই দুটো কালো বেড়াল ধাওয়া করে আসছে । আমি সত্যিই অবাক হয়ে তাকিয়ে রইলাম ওদের দিকে । পেছনের বেড়াল দুটো একটু বড় । বনবেড়ালের সমান বড় !
সাদা বেড়ালটা দৌড়ে এসে আমার পায়ের পেছনে লুকালো । আমি একবার ওটার দিকে তাকালাম এবং অবাক হয়ে দেখলাম কাধের কাছে একটা ক্ষত হয়ে আছে । সেখান দিয়ে রক্ত ঝরছে । এতো চমৎকার একটা বেড়াল আর এই দুটো পাজি বেড়াল ওটাকে একা পেয়ে এমন ভাবে আঘাত করেছে । মেজাজটা এতো খারাপ হল ! কালো বেড়াল দুটো এগিয়ে আসছে আর মুখ দিয়ে কেমন ঘড়ঘড় করতে লাগলো ।

ডান পাশের বেড়াল একটু যেন বেশিই কাছে চলে এসেছে । এতো সাহস দেখে আমি খানিকটা অবাকই হলাম । এবং সাথে সাথে মেজাজ আরও খারাপ হল । ডান পায়ে আমার ফুটবলের শট খুব ভাল । ক্যাম্পাসের ফুটবল টিমে আমি সেেন্ড ফরওয়ার্ড ছিলাম । অনেক দিন যদিও খেলি না তবে এই বেড়ালকে মিস করার কোন চান্সই নেই ।

বেড়ালের ঠিক পেট বরাবর আঘাতটা লাগলো । এবং সেটা উড়ে গিয়ে কোথায় যে পড়লো আমি নিজেও জানি না । কেবল একটা ভয়ংকর ডাক শুনতে পেলাম বেড়ালটার । অন্য বেড়ালটা দেখলাম একটু পিছিয়ে গেছে । একবার আমার দিকে, একবার আমার পায়ের দিকে তাকালো কয়েকবার । তারপর কয়েক মুহুর্ত চুপ করেই কেটে গেল । আমি আরেকটা লাথি মারার জন্য প্রস্তুতি নিয়েই রাখলাম । বেটা সামনে এগিয়ে আসতে গেলেই আরেকটা লাথি হাকাবো । কিন্তু বেটা এল না । আস্তে করে পেছনে সরে গেল ।

আমি পায়ের কাছে তাকিয়ে দেখি সাদা বেড়ালটা কেমন যেন মাটিতে শুয়ে পড়েছে । ক্ষত থেকে রক্ত পরছে । আমি সেটাকে কোলে তুলে নিলাম । তারপর নিজের বাসার দিকে দ্রুত হাটা দিলাম ।
বাসায় পৌছে সবার আগে বেড়ালটাকে পরিস্কার করে, ক্ষত স্থানে স্যাভলন দিয়ে ব্যান্ডেজ বেঁধে দিলাম । তারপর যত্ন করে নিজের বিছানার পাশেই শুইয়ে দিলাম ওটাকে । আরাম করে ঘুমাতে শুরু করলো ।

পরদিন সকালে যখন ঘুম ভাঙ্গলো তখন তাকিয়ে দেখি বেড়ালটা সেখানে নেই । তবে ঐদিন রাতে ঠিকই ফিরে এসেছিলো । অবাক হয়ে তাকিয়ে দেখলাম ক্ষত স্থানটা প্রায় শুকিয়ে গিয়েছে । এতো দ্রুত শুকিয়ে যাবে আমি ভাবি নি । এরপর থেকে অফিস থেকে ফিরে এসেই তাকে দেখতে পেতাম । রাতে থাকতো আর সকালে হাওয়া হয়ে যেত ।

খেয়াল করলাম যে গাড়ি থেমে গেছে । একটা বাংলো টাইপের বাড়িতে ঢুকছে গাড়ি । আমি কয়েকবার শুনেছি এই ফার্ম হাউজের কথা । তবে এইবারই প্রথম এসে হাজির হলাম । গাড়ি থামতেই রিয়ানা বের হয়ে গেল গাড়ি থেকে । তারপর সোজাসুজি হাটতে শুরু করলো । আমি দ্রুত গাড়ি থেকে নেমে তার পেছনে হাটা শুরু করে দিলাম । সত্যি আমি এসবের আগামাথা কিছুই বুঝতে পারছি না ।

ঘরের ভেতরে ঢুকতেই দেখি রিয়ানা বসার ড্রয়িং রুমের সোফার উপরে বসে রয়েছে গম্ভীর ভাবে । আমি আস্তে আস্তে এগিয়ে গেলাম সেদিকে । এখনও আমি কিছুই বুঝতে পারছি না ।
-ম্যাম !
-ইয়েস !
-আপনি কি কোন কারণে আমার উপরে রেগে আছেন ?
-তোমার কি মনে হয় না আমার রেগে থাকা উচিৎ?

আমি খানিকটা অবাক হলাম । কারণ এই কয়দিন রিয়ানা আমাকে ঠিকই আপনি আপনি করে বলতো আজকে সোজাসুজি তুমি করে বলছে । এবং আমাকে তখন আরও অবাক করে দিয়ে বলল, চাইলে তুমিও আমাকে তুমি করেই বলতে পারো!

আমি কয়েক মুহুর্ত কেবল অবাক হয়ে রিয়ানার দিকে তাকিয়ে রইলাম । এই মেয়ে কিভাবে জানলো আমার মনের কথা! আমি কী ভাবছি সেটা তো কোন ভাবেই তার জানার কথা না !

এই কথাটা ভাবতেই দেখলাম রিয়ানা সোফা থেকে উঠে দাড়ালো । তারপর আস্তে আস্তে আগিয়ে আসছে লাগলো আমার দিকে । পুরোপুরি চোখ আমার চোখের দিকে । আমি এমনিতেই রিয়ানার চোখের দিকে চোখ রেখে কথা বলতে পারি না । এই মেয়ের চোখের ভেতরে কিছু একটা আছে যা আমাকে খানিকটা অস্বস্তিতে ফেলে দেয় । আর এমন সুন্দর চোখের দিকে খুব বেশি সময় এমনিতেও তাকিয়ে থাকা যায় না । কিন্তু আজকে আমি চাইলেও চোখ সরিয়ে নিতে পারলাম না । একেবারে ওর নীল চোখের দিকে আমাকে তাকিয়ে থাকতে হল । রিয়ানা থামলো একেবারে আমার সামনে । ওর মুখ থেকে আমার মুখ মাত্র কয়েক ইঞ্চি দুরে । আমি তখনই একটা গন্ধ পেলাম । খুব পরিচিত গন্ধ । এই সুগন্ধটা আমি কোথায় পেয়েছি !

মনে করার চেষ্টা করতে লাগলাম ।

আমার চোখের দিকে তাকিয়েই রিয়ানা বলল, মনে পড়েছে?
কোন মতে বললাম, মানে?
-মানে এই পরিরিত গন্ধটা । মনে পড়েছে ?

আমার তখনই মনে পড়লো ! এটা মিউয়ের শরীরের গন্ধ । কিন্তু রিয়ানার শরীর থেকে কিভাবে আসছে এই গন্ধ !
কিভাবে?

রিয়ানা এবার আমার আরো কাছে এল । আলতো করে আমার ঠোঁটে চুমু খেল একটা । আমি যেন একেবারে জমে গেলাম । আমি এসবের কিছুই বুঝতে পারছি না । কেন হচ্ছে আর কিভাবে হচ্ছে ! একবার মনে হল আমি নিশ্চিত ভাবে গাড়িতে আসতে আস্তে ঘুমিয়ে পড়েছি । সেই ঘুমের ভেতরেই আমি স্বপ্ন দেখছি । নয়তো এমন কিছু তো হওয়ার কথা না ।

রিয়ানা আবার গিয়ে বসেছে সোফাতে । আমাকে ইশারা করলো ওর পাশে বসতে । আমি কোন কথা না বলে গিয়ে বসলাম ওর পাশে । রিয়ানা আমার হাত ধরলো । তারপর বলল, ভেবেছিলাম তোমাকে কোন দিন জানাবো না ব্যাপারটা । কিন্তু এখন মনে হচ্ছে জানাতেই হবে । এটার সাথে তোমার জীবনের নিরাপত্তা জড়িত ।
-মানে?
-বলছি !

রিয়ানা একটা দম নিল জোড়ে । তারপর বলল, আমি এখন যা বলবো তা তোমার কাছে হাস্যকর মনে হবে কিংবা অবিশ্বাস্য । তবে এটা সত্য !
আমি একভাবে তাকিয়ে রইলাম রিয়ানার দিকে । রিয়ানা বলল, এটা তো মানো এই পৃথিবীতে এমন অনেক কিছু রয়েছে যার কোন ব্যাখ্যা নেই । আছে না?
-হ্যা । তা তো আছেই !
-আমাদের জাতিটাও ঠিক তেমনই একটা জাতি, যা কোন ব্যাখ্যা নেই ।
-আমি আসলে ঠিক বুঝতে পারছি না । আমাদেরকে বলা হয় মিরুচুং । সুন্দরবনের ইন্ডিয়ান পরসনে বাস করতো আমাদের পূর্বপুরুষেরা । তারপর একজন সময় বন কমতে শুরু করলে তারা লোকালয়ে চলে আসে । সেখানেই বসবাস করতে শুরু করে । যখন দেশ ভাগ হয়ে যায় তখন এই এদেশে চলে আসে । তারপর থেকে এখানেই থাকছি । যদিও আমাদের কিছু অংশ এখনও বনের ভেতরেই বাসবাস করে । তবে গোত্র প্রধান এখন এখানে । সেটা হচ্ছে আমার বাবা ।
-তার মানে তুমি প্রিন্সেস ?

রিয়ানা হাসলো । তারপর বলল, বলতে পারো ।
আমি বললাম, এতে অবিশ্বাস করার কী আছে ! খুবই স্বাভাবিক ঘটনা ! আগে একটা সম্প্রদায় বনের ভেতরে থাকতো তারপর তারা লোকালয়ে চলে এসেছে ।সিম্পল !
-এতো সিম্পল না । আমাদের গোত্রটা ঠিক অন্য সব গোত্রের মত স্বাভাবিক না । এমন কী আমরা ঠিকঠাক মত মানুষও না ।
আমি চোখ বড় বড় করে বললাম, কী বলছো এসব !
-বন বেড়াল চেনো তো ? যেটাকে তোমাদের এলাকাতে খাটাস বলে ! চিনো না ?
-হ্যা । মুরগি চুরি খায় !
-রিয়ানা হেসে ফেলল । তারপর বলল, হ্যা । ওটাই । ঐ বনবেড়াল হচ্ছে সম্পর্কে আমাদের কাজিন !
আমি কোন কথা না বলে রিয়ানার দিকে তাকিয়ে রইলাম ।
-রিয়ানা বলল, বিশ্বাস করছো না জানি । কিন্তু এটা সত্য । আমরা অর্ধেক মানুষ আর অর্ধেক বেড়াল । আমরা মানুষের মনের কথা খুব ভাল করে বুঝতে পারি কেবল তাদের চোখের দিকে তাকিয়ে । একটু আগেই তুমি বুঝতে পেরেছো সেটা ।
অন্য কেউ হলে আমি এই কথা হেসেই উড়িয়ে দিতাম তবে রিয়ানার চোখের দিকে তাকিয়ে সেটা আমি পারলাম না ।

আমি বললাম, কিন্তু এতো কিছুর ভেতরে আমি কোথা থেকে এলাম ?
-তুমি ! আমাকে তুমি কিভাবে পেয়েছিলে মনে আছে?
-তোমাকে !

আমি যেন ঠিক মত বুঝতে পারলাম না ওর কথাটা !
রিয়ানা বলল, তোমার মিউকে ! ঐ রাতের কথা মনে আছে নিশ্চয়ই ?

আমার খুব ভাল করে মনে আছে ! রিয়ানা বলল, আমি আসলে আমার গোত্রের পিওর ব্লাড না । পিওর ব্লাড বলতে আমার বাবা আগের স্ত্রীর পক্ষের দুই ছেলে । ওদের মাও একজন মিরুচুং। কিন্তু আমার মা মিরুচুং নয় । আমার মা একজন মানুষ । এই জন্য আমি মিক্স ব্লাড । এটাই আসলে আমার দুই ভাই পছন্দ করতো না । আমাদের গোত্রে ছেলেরাই গোত্র প্রধান হবে এমন কোন কথা নেই । ছেলে মেয়ে যে কেউ প্রধান হতে পারে । আমিও পারি । কিন্তু একজন মিক্স ব্লাড প্রধান হবে সেটা ওরা কিছুতেই মেনে নিতে পারছিলো না । তাই সেদিন দুইজন মিলে আক্রমন করেছিলো । নিশ্চয়ই দেখেছো ওদের তুলনাতে আমি খানিকটা ছোট । পেরে উঠতাম না । তাই পালাচ্ছিলাম । যেহেতু ভাই বোন আমরা তাই অন্য কেউ আমাদের মাঝে ইন্টারফিয়ার করে নি । এমন কি আমাদের বাবাও না । তার ভাষ্য হচ্ছে ক্ষমতার লড়াই একান্তই আমার । এখানে আমাকে সাহায্য করলে অন্য ছেলেদের প্রতি অবিচার করা হবে । ওরা হয়তো ঐদিন আমাকে মেরেই ফেলতো যদি তুমি মাঝে না চলে আসতে । বিশেষ করে ওভাবে কিকটা যে মেরেছো ! মাই গড ! ও কোথায় গিয়ে পড়েছিলো জানো?
-কোথায়?
-গাছের ওপাশেই একটা দেওয়াল ছিল । দেওয়ালের উপরে লোহার শিক দেওয়া ছিল । ঠিক ওটার মাঝে !

রিভুকে তারপর শায়েস্তা করতে আমার খুব বেশি বেগ পেতে হয় নি । আমরা মিরুচুং রা মানুষ হিসাবে একটু ভলনারেবল । যখন বেড়ালের বেশে থাকি তখন শক্তিশালী । কিন্তু আমি মিক্স ব্লাড হওয়ার কারণে মানুষের বেশেও আমি বেশ ভাল ।
আমি এবার বললাম, তার মানে তুমি বলতে চাও তুমি মিউ ? আমার বেড়াল !
-এখনও বিশ্বাস হচ্ছে না?
-না । সত্যিই বিশ্বাস হচ্ছে না ।
-আচ্ছা থা দরকার নেই বিশ্বাস করার । ওটা সময় আসুক নিজ চোখের দেখবে । এখন তোমাকে যে কারণে আমি সব সময় চোখে চোখে রাখি, সেটা হচ্ছে রিগুকে ওভাবে কিক মারার কারণে কিছু মিরুচুংয়ের রাগ রয়েছে তোমার । গতকাল রাতেই ওদের পাঠানো একটা মিরুচ তোমাকে আক্রমন করেছিলো । মিরুচ হচ্ছে এক বিশেষ ধরণের অপদেবতা । যখন আমরা প্রথম এই লোকালয়ে বাস করতে এলাম মানুষের সাথে তো শক্তিতে আমরা পেরে উঠতাম না । তখন এই মিরুচ কে ডেকে আনা হয় নরক থেকে আমাদের সাহায্য করার জন্য । এখন যদিও আর দরকার পড়ে না তারপরেও কেউ কেউ এখনও এসবের চর্চা করে ।

এইবার আমি একটু ভয় পেলাম । যতই আমি রিয়ানার কথা বিশ্বাস না করি, গতকাল যে কিছু একটা আমার সামনে এসেছিলো সেটার ব্যাপারে তো কোন সন্দেহ নেই । এবং মিউ সহ ঐ বেড়াল গুলো যে আমাকে রক্ষা করেছিলো সেটাও ভুল না । কেবল মাত্র মিউই যে রিয়ানা এই ব্যাপারটা বাদ দিলে রিয়ানার পুরো গল্পটুকু একেবারে বিশ্বাস যোগ্য ।

আমি কিছু বলতে যাবো তখনই রিয়ানা উঠে দাড়ালো । বেড়ালের মত নাক উচু করে কি যেন শুকলো বাতাসে । সাথে সাথেই দেখলাম আমাদের ড্রাইভার ও সাথে আরেকজন দরজা দিয়ে ভেতরে ঢুকে পড়লো ।
রিয়ানা তাকে জিজ্ঞেস করলো, কত জন ?
-অন্তত দশ জন ! আমাদের আজকে এখানে আসার কথা ছিল না । আমি বলেছিলামা বডিগার্ড নিয়ে আসতে ! ওদের কেউ হয়তো পিছু নিয়েছিলো তারপর অন্যদের খবর দিয়েছে !
-চিন্তা কর না । গেট লক কর । আর খবর পাঠাও । বাকিটা দেখছি ।

ওরা চলে গেল !
আমি রিয়ানার দিকে তাকিয়ে বললাম, কি হচ্ছে এসব ?
রিয়ানা শান্ত কন্ঠে বলল, বিভু বাইরে গিয়েও ঠিক হয় নি । ওকে যেতে দেওয়াই ঠিক হয় নাই ।

আমি অবাক হয়ে ওর চেহারার দিকে তাকিয়ে রইলাম । ওকে এই কদিনে কাছ থেকে যেমন টা দেখেছি আজকে কেমন যে অপরিচিত মনে হচ্ছে। ও মোবাইল বের করে কাকে যেন ডায়েল করতে লাগলো । তারপর আমার দিকে না তাকিয়ে বলল, তুমি এক কাজ কর, পাশের ঘরের ভেতরে চলে যাও । দরজা বন্ধ করে ভেতর থেকে ।

একটা মেয়ে আমাকে বলছে ঘরের ভেতরে গিয়ে বসে থাকতে এই বাক্যটা কেন জানি আমার পৌরষত্ব্যে খানিকটা আঘাত করলো ।
আমি কিছু বলতে যাবো তার আগেই রিয়ানা বলল, এখানে অন্য কোন ভাবে নিও না । যা আসছে সেটার সাথে তুমি কোন ভাবেই লড়তে পারবে না । সো দরকার কি ! এখানে হিরোইজম দেখানোর কোন মানে নেই । আর আমি আছি, আমার সাথে ওরা আছে । সামলাতে পারবো । ততক্ষনে ফোর্স চলে আসবে । কোন চিন্তা নেই ।

আমি তবুও দাড়িয়ে রইলাম । কিছুতেই আমি ঘরের ভেতরে গিয়ে বসে থাকবো না । তখনই অদ্ভুত একটা ব্যাপার ঘটলো । রিয়ানা আমার চোখের দিকে তাকালো । একেবারে তীক্ষ্ণ চোখে আমার দিকে তাকিয়ে রইলো । সাথে সাথেই আমার মাথায় ভেতরে কেউ যেন বাড়ি মারলো কিছু একটা দিয়ে । সেখানে কেউ আমাকে বলছে এখনই ঘরের ভেতরে যাও । দরজা বন্ধ করে বসে থাকো !
আমি কিছুতেই এই নির্দেশ অগ্রাহ্য করতে পারলাম না । আমি নিজেকে নিয়ন্ত্রন করতে চাইলাম, কিছু বলতে চাইলাম কিন্তু অবাক হয়ে কেবল লক্ষ্য করলাম যে আমার হাত পা নির্দেশের প্রতি সাড়া দিতে শুরু করেছে । আমি আস্তে আস্তে দরজার দিকে পা বাড়াতে শুরু করেছি ।

আমি কয়েকবার নিজের মনকে নিজের নিয়ন্ত্রনে আনার চেষ্টা করলাম কিন্তু কোন কাজ হল না । বিন্দু মাত্র লাভ হল না । আমি ঘরের ভেতরে গিয়ে হাজির হলাম । তারপর দরজা বন্ধ করে দিলাম । আমি নিজের ভেতরে যেন নেই । বারবার আমার মাথার ভেতর থেকে কেউ যেন বলছে ঘরের ভেতরে ঢুকে বসে থাকো । চুপ চাপ বসে থাকি । আমি খাটের উপরে চুপ করে বসে রইলাম ।

কত সময় এই ভাবে বসে রইলাম আমি নিজেও বলতে পারবো না তবে হঠাৎ আমার কানে বেড়ালের ভয়ংকর আওয়াজ প্রবেশ করলো । যেন অনেক গুলো বেড়াল এক সাথে চিৎকার করছে । এই সব আওয়াজের ভেতরে মিউয়ের আওয়াজ চিনতে কেন জানি আমার মোটেও কষ্ট হল না । আমার বারবার মনে হতে লাগলো বাইরে কিছু হচ্ছে, রিয়ানা মানে বিপদে পড়েছে । ওরা মাত্র তিনজন । সবার সাথে কি পারবে !
আমার মস্তিষ্ক যেই এই চিন্তা করতে লাগলো যে আমাকে এখন বাইরে যেতে হবে তখনই একটা সুক্ষ যন্ত্রনা টের পেলাম আমি । সেটা আস্তে আস্তে বাড়তে লাগলো । চিন্তাটা আমি যতই করতে থাকলাম যন্ত্রনাটা ততই বাড়তে লাগলো । আমি জানি কোন ভাবে আমার মনের ভেতরের নিয়ন্ত্রন রিয়ানা নিয়ে নিয়েছে । সে যা হুকুম দিয়েছে আমাকে এখন সেটাই শুনতে হচ্ছে ।

আমি চিন্তা করাটা বাদ দিলাম না । আমাকে এই চিন্তা করে যেতেই হবে । ঠিক তখনই কাজ হল । মনে হল যেন আমার মাথার উপর থেকে একটা ভার কমে গেল । সাথে সাথে বাইরে আমি সেই বেড়ালের আওয়াজ শুনতে পেলাম !

আমার মনের ভেতরে কু ডেকে উঠলো । সম্ভবত রিয়ানার কিছু হয়েছে এই কারণে তার আমার উপর থেকে নিয়ন্ত্রন কমে গেছে ।

আমি দ্রুত দরজা খুলে ড্রয়িং রুমে বের হয়ে এলাম । দরজা দিয়ে বাইরে বের হতে যাবো তখনই দেওয়ালে সাজানো একটা তরবারির দিকে চোখ গেল । সেটা নামিয়ে নিলাম । খাপ থেকে খুলে আবারও বের হয়ে এলাম ।

বাইরে বের হয়ে দেখলাম মিউকে ঘিরে ধরে ধরেছে অন্তত ডজন খানেক বেড়াল । আকারে সব গুলো বড় বড় । চারিদিকে ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে আরও গোটা ৫/৬ বেড়াল । রক্তাক্ত । মিউয়ের শরীরেও লাল রক্ত আমি দেখতে পেলাম । আমার মাথার ভেতরে কি হল আমি সোজা দৌড়ে গেলাম সেদিকে । আমার সেই বিখ্যাত কিক মারলাম বেড়াল গুলো দিকে । একজনের শরীর লাগলো কেবল সেটা । আর বাকি গুলো সরে গেল । আমি সরাসরি মিউকে আড়ালে নিলাম ঠিক সেদিনের মত ।

এবং সেদিনেই সেই কালো বেড়ালটাকেও চোখে পড়লো আমার । আমার দিকেই তাকিয়ে রয়েছে । আমি যেমন ওটাকে চিনতে পেরেছি আমার মনে হল সেটাও আমাকে চিনতে পেরেছে । এটাই তাহলে রিভু আরমান ! সত্যিই কি তাই । তবে আজকে তার চোখে আগের মত সেই দৃষ্টি নেই । আমি কিছু চিন্তা না করে আগের মত করেই তাকে কিক মারতে গেলাম তবে সেটায় কাজ হল না । অদ্ভুত দক্ষতায় সে কটিয়ে গেল আমার কিক । তারপর আমার উপর লাফিয়ে উঠে এল । হাত দিয়ে গালে আচড় দিল বেশ জোড়ে । তীব্র একটা যন্ত্রনা অনুভব করলাম । একটু পরেই বুঝতে পারলাম গাল বেয়ে রক্ত পড়তে শুরু করেছে । বেড়ালট থাবা দিয়ে লাফ দিয়ে দুরে সরে গেছে । অন্যান্য বেড়াল গুলো একটু যেন স্থির হয়ে দাড়িয়ে রয়েছে । সবাই যেন মজা দেখছে এমন একটা ব্যাপার । এরপর কালো বেড়ালটা একের পর এক আমার উপর হামলা করতেই লাগলো । এতো তীব্র আর দ্রুত যে আমি বিন্দু মাত্র কোন প্রতিরোধ করতে পারলাম না । আমার পুরো শরীরে বেয়ে রক্ত ঝড়তে শুরু করলো । শেষ আঘাতটা পায়ের কাছে এমন ভাবে দিয়েছে মনে হল পায়ের অর্ধেক মাংশ উঠে গেছে । আমি হাটু গেড়ে বসে পড়লাম কেবল ।

পেছনে তাকিয়ে দেখি মিউ কেমন নিস্তেজ হয়ে গেছে । ওর পুরো শরীর রক্তাক্ত !

আমার কেবল মনে হল এখন আমার মরার সময় হয়ে গেছে । আজকে সকালেই কি আমি জানতাম যে আমার সাথে এই রকম কিছু হটে চলেছে । এই ভাবে মরে যাবো !!

শেষ একটা চেষ্টা করে দেখি ! মরলে মরবো ! বেটা রিভুকে নিয়েই মরবো !

আমি এবার তরবারিটা শক্ত করে চেপে ধরলাম । তাকিয়ে দেখি কালো বেড়ালটা আস্তে আস্তে এগিয়ে আসছে । ওর চোখ মুখে একটা তাচ্ছিল্যের ভাব । সেই সাথে বেপোয়ারা । এমন একটা ভাব যেন আমার উপরে সে পরিপূর্ণ কর্তৃত্ব পেয়ে গেছে । এইটাই আমাকে সুযোগ করে দিল । বেটা যখন শূন্যে, আমার থেকে আর কয়েক মুহুর্তের দুরুত্ব, আমার দিকে এগিয়ে আসছে তখনই আমি তরবারিটা ঠিক বেটাকে লক্ষ্য করে তুলে ধরলাম ।
কাল হল এতেই । বেটা সোজা এসে ঢুকলো ফলার ভেতরে ! ঢুকে গেল অর্ধেক । এবার শরীরের সব শক্তি একত্রে করে তরবারিটা উল্টে মাটিতে চেপে ধরলাম । বেশ পুরো টুকু ঢুকে গেল ভেতরে । কিছু অংশ মাটিতেও পুতে গেল !

আমি সরে এলাম । বেটা এখানেই শেষ । যেভাবে গেথেছে বের হতে পারবে না আর !
তবে আর দরকার পরলো না । কিছু সময় চিৎকার করতে করতে নিস্তেজ হয়ে গেল । আমার শরীর থেকে রক্ত বের হয়েছে অনেক । কেমন মাথা ঘুরে উঠলো । তবে তখন বিপদ কাটে নি । আরও কত গুলো বেড়াল রয়ে গেছে । মিউকে রক্ষা করতে হবে !

আমি দ্রুত মিউয়ের কাছে গিয়ে হাজির হলাম । এরপর নিজের শরীর দিয়ে গোল কোরে ওকে জড়িয়ে ধরলাম । বাইরে যতই আক্রমন আসুক মিউ পর্যন্ত আসবে না । এভাবে জড়িয়ে ধরেই কখন যে জ্ঞান হারালাম আমার মনে নেই ! হয়তো আর জ্ঞান ফিরবে না আমার । তবে একটা কাজ তো অন্তত করতে পেরেছি !

তাজা রক্তের গন্ধ আসতে লাগলো আমার নাকে । তবে সেই সব ছাপিয়ে মিউয়ের শরীরের সেই অদ্ভুত চমৎকার গন্ধটা আমার নাকে লাগলো ! গতকাল রাতে মিউয়ের সাথে ঘুমানো হয় নি । আজকে শেষ ঘুমটা হোক !

পরিশিষ্টঃ

চোখ মেলে কিছু সময় তাকিয়ে রইলাম সাদা সিলিংয়ের দিকে । একটু নড়তে গিয়েই টের পেলাম সারা শরীরে ব্যাথা ।
-এই নড়বে না !

আমি একটু মাথা কাত করতে পারলাম । তাকিয়ে দেখি বেডের ঠিক পাশেই রিয়ানা বসে রয়েছে । আমার দিকে একভাবে তাকিয়ে রয়েছে । বলল, কি লাগবে ?
কোন মতে বললাম, কিছু না ।
-তাহলে নড়ছো কেন ? আগে সুস্থ হও । তারপর তোমাকে আমি মজা দেখা্চ্ছি । হিরো সাজতে গেছে, না ?
আমি রিয়ানার চোখে হঠাৎ কেন জানি চিকচিক অশ্রু দেখতে পেলাম ! কিভাবে এখানে চলে এলাম সেটা পড়ে শোনা যাবে । আপাতত যে বেঁচে আছি আর রিয়ানাও ঠিক রয়েছে সেটাই হচ্ছে সব থেকে আনন্দের ব্যাপার !

How useful was this post?

Click on a star to rate it!

Average rating 4.7 / 5. Vote count: 38

No votes so far! Be the first to rate this post.

Related Posts

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *