4.9
(22)

শেষ রিক্সাটা যখন আমার বাসার দিকে যেতে মানা করে দিল তখন একটু চিন্তিত বোধ করলাম । এতোটা পথ আমাকে এখন হেটে যেতে হবে । কদিন থেকেই এমন হচ্ছে । আমার এলাকার নাম শুনলেই কেউ ওদিকে যেতে চাইছে না । বড় ঝামেলাতে পড়েছি ।

অবশ্য ওদের ঠিক দোষ দিতেও পারি না । আমি হলে হয়তো আমিও যেতে চাইতাম না । গত এক মাস ধরে আমাদের এলাকাতে খুব বড় ধরনের ঝামেলা শুরু হয়েছে । গত এক মাসে আমার এলাকা এবং আসে পাশের এলাকাতে ৪টা ভয়ানক খুন হয়েছে । এমন যে পুরো শহরকে নাড়িয়ে দিয়েছে । প্রথম দুইটা খুনের পরে আমাদের এলাকাতে বাড়তি পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছিলো । ঠিক তার পরপরই যখন একটা পুলিশও ওভাবে খুন হল তখন সবাই একটু নড়ে চড়ে বসলো । সবাই বুঝতে পারলো এই খুনি যে কোন সাধারন খুনি নয় । এখন সবাই খুব সাবধান হয়ে গেছে । সন্ধ্যা হলেই কেউ আর বাইরে থাকছে না । থাকার সাহস হচ্ছে না ।

আমিও বাইরে না থাকার চেষ্টা করি কিন্তু মাঝে মাঝে ঝামেলা তো হয়েই যায় । যেমন আজকে হয়ে গেছে । অফিস থেকে বের হতে হতে দেরি হয়ে গেল । এখন বাসায় যাওয়ার জন্য কাউকে খুজে পাচ্ছি না ।

অনেক কষ্টে একজন রিক্সাওয়ালাকে পেলাম । তবে সে আমাদের এলাকাতে ঢুকবে না । বাইরে থেকে নামিয়ে চলে আসবে । তাতেই রাজী হয়ে গেলাম । মনে মনে একটু ভয় লাগছিল । ঐ চার জনের যা হয়েছে তেমন কিছু যদি আমার সাথে হয় তাহলে ? অবশ্য আমি মারা গেলে আমার জন্য কাঁদার জন্য কেউ নেই । বাবা মা মারা গেছে অনেক দিন আগেই । বড় মামার কাছে মানুষ হয়েছি তারাও যে আমাকে খুব একটা কাছের মানুষ ভাবে সেটাও না । আমার মত মানুষ মারা গেলে কার কি যায় আসে !

রিক্সাওয়ালা আমাকে আমাদের এলাকার ঠিক বাইরে নামিয়ে দিল । এখান থেকে আমার বাসায় যেতে মোটামুটি মিনিট ত্রিশেক সময় লাগবে । তার উপর আমার বাসাটা একেবারে নির্জন একটা জায়গাতে । সবার শেষের দিকের বাসা । নিরিবিলি থাকার জন্যই আমি বাসাটা ভাড়া নিয়েছিলাম তখন তো আর জানতাম না যে এই ঝামেলা আমার উপর এসে পড়বে ।

আমি উপরওয়ালার নাম নিয়ে হাটা দিলাম । ব্যাগের ভেতরে একটা কাটার আছে । মাঝে মাঝে অফিসের কাগজ কাটার জন্য দরকার হয় বলে ব্যাগেই একটা রেখেছিলাম । সেটা হাতে নিয়ে হাটতে লাগলাম । বুকের ভেতরে ভয় লাগছিলো সেটা অস্বীকার করবো না । কিন্তু ভয় লাগলেও কিছু করার নেই । আমি পুরো রাস্তার দিকে তাকিয়ে রইলাম । পুরো রাস্তায় আমি ছাড়া আর একটা মানুষ নেই । অধিকাংশ ল্যাম্পপোস্টই নষ্ট এদিককার রাস্তায় । এই জন্যই সম্ভবত খুনি খুন করার জন্য এই এলাকাটা বেছে নিয়েছে । দু একটা ল্যাম্পপোস্টের আলোতে অন্ধকার তো যায়ই নি বরং আর বেড়ে গেছে । আমি ভয়ে ভয়ে দ্রুত হাটতে লাগলাম । আমার লক্ষ্য কেবলই আমার বাসা ।

কয়েক মিনিট পরেই পাশ কাটিয়ে একটা পুলিশের গাড়ি চলে গেল । বুকে একটু বল পেলাম । কেউ তো একজন আছে । আমি একা নেই পথে । পুলিশের গাড়িটা একটু দুরেই থেমে গেল । আমি আরও দ্রুত এগোতে লাগলাম । পুলিশের গাড়ির কাছে আসতে একজন অফিসার আমাকে ডাক দিল । বলল

-আপনি কোথায় যাচ্ছেন ?

-বাসায় ?

-একা কেন ? আপনাদের না বলা হয়েছে একা না বের হতে ?

-কি করবো বলেন ? বস তো আর শুনে না এসব ?

-আসুন । আপনাকে পৌছে দেই ।

পুলিশের এতো ভাল আচরন দেখে সত্যিই মন ভাল হয়ে গেল । পুলিশের নাম জানতে পারলাম আব্দুল ওয়াদুত । এখানকার থানার এস আই । আমাকে বাড়ির সামনে নামিয়ে দিয়ে চলে গেল । আর বলে গেল সাবধানে থাকতে ।

আমি গেট খুলে ভেতরে প্রবেশ করলাম । প্রবেশের সাথে সাথেই আমার কাছে মনে হল কিছু একটা ঠিক নেই । তখনই তাকে দেখতে পেলাম । কি কারনে সামনের লাইটটা কেউ অফ করে রেখেছে । কিন্তু এমনটা হওয়ার কথা না । বাসার সামনের বাতিটা সব সন্ধ্যার পর থেকে জ্বালানোই থাকে । তাহলে বন্ধ করলো কে ?

আমার মনে পড়লো বাড়িওয়ালা স্ব-পরিবারে শ্বশুর বাড়ি বেড়াতে গেছে আসলে এই খুন খারাবী শুরুর পরপরই গেছে । খুনী ধরা না পরা পর্যন্ত তারা আর আসবে না । আমি পুরো বাসায় একা । এখন সেই খুনি যদি আমাকে এই বাসার ভেতরে একে আমাকে খুন করে রেখে চলে যায় তাহলে কেউ টেরই পাবে না । লাশ এভাবে এখানে পরে থাকবে । মোবাইলে আলো বের করে সামনে ফেলতেই কারো উপর শরীরে আলো পড়লো । আর আমি সাথে সাথেই চিৎকার করে উঠলাম ।

-আস্তে ! আমি !

একটা মেয়ে কন্ঠ !

আমার বাসায় মেয়ে !

আমি চুপ করে গেলাম । যত ভয়ের ব্যাপারই হোক না কেন একটা মেয়ের সামনে ভয়ে চিৎকার করাটা কেমন জানি লাগে । মান সম্মানের প্রশ্ন । তবে মেয়েটার কন্ঠ আমি তখনও চিনতে পারি নি । আর তার উপর আমি খুব কম মেয়েদেরকেই চিনি । তাহলে এই মেয়ে এতো রাতে আমার বাসায় সামনে দাড়িয়ে কি করে ?

হাটার আওয়াজ হল । একটু পরেই আমার বাড়ির সামনের লাইটটা জ্বলে উঠলো । বুঝতে পারলাম সেই মেয়েটাই গিয়ে জ্বালিয়েছে লাইটটা ! মেয়েটা যখন আবার আমার সামনে এল আমি এবার ছোট খাটো মত ধাক্কা খেলাম । প্রথমেই যে কথাটা মনে হল সেটা হচ্ছে “এই মেয়ে এখানে কি করছে ? আর আমার বাসার খবরই বা পেল কিভাবে ?”

আমার অবাক হওয়ার ভাবটা তখনও মুখে গেলেই রয়েছে । মেয়েটি আমার দিকে তাকিয়ে হাসলো একটু । তারপর বলল

-কেমন আছো ?

-তুমি এখানে ? আমার বাসা চিনলে কিভাবে ?

মেয়েটি আমার কথার জবাব না দিয়ে হাসলো । আমি আরও অবাক হয়ে মেয়েটির দিকে তাকিয়ে রইলাম । সবুজ চোখের মেয়েটিকে অসম্ভব সুন্দর লাগছে । যখন প্রথমবার মেয়েটিকে দেখেছিলাম তখন ওর চেহারার দিকে এতো ভাল করে তাকানোর অবস্থায় ছিলাম না ।

মেয়েটি বলল

-এখানেই দাড়িয়ে থাকবে ? ভেতরে আসতে বলবে না ?

আমি খানিকটা ইতস্ততঃ করে বললাম

-হ্যা চল । কিন্তু তুমি আমার বাসা চিনলে কিভাবে ?

-চিনেছি ! চিনে নিয়েছি !

আমি দরজার তালা খুলতে মেয়েটাকে দেখতে লাগলাম । আমার এখনও ঠিক বিশ্বাস হচ্ছে না এই মেয়েটা আমার সামনে দাড়িয়ে আছে । আমার তো কোন দিন ধারনাও ছিল না যে মেয়েটার সাথে আমার আবার কোন দিন দেখা হবে ।

দুই

আমার বরাবরই বেড়ানোর খুব বেশি শখ । একটু সময় পেলেই আমি কাধে ব্যাগ নিয়ে বেরিয়ে পড়ি । দু’মাস আগেও ঠিক এমন একটা সুযোগ এসেছিলো । হাতে একটু বেশি সময়ই ছিল তাই একটু দুরেই চলে গেছিলাম । বান্দরবানের রুমা থেকে আমার যাত্রা শুরু হয়েছিলো । ইচ্ছে ছিল রুমা হয়ে কেউকারাডাং, তাজিংডং হয়ে থানচি পৌছাবো ! আমি আগেও এই রাস্তা পার করেছি । তারও আবার বেশ কয়েকবার । সেখানে যাওয়ার জন্য একজন গাইড নেওয়া নিয়মের মধ্যে পড়ে কিন্তু এদেশে টাকা থাকলে কি না হয় । আমি একা একা জার্নি শুরু করে দিলাম । এর আগের বারও আমি একাই পার হয়েছিলাম এই পথ ।

সব কিছু ঠিকঠাকই চলছিলো । থানচি আসার ঠিক শেষ দিন সকালে আমি হাটা শুরু করেছি । সেই সময়েই একটা অদ্ভুত শব্দ শুনতে পেলাম । মনে হল কিছু মানুষ যেন দৌড়াদৌড়ি করছে, চিৎকার করছে । পাহাড় সব সময় শান্ত থাকে । মানুষ জনের চিৎকার চেঁচামিচি একদম নেই বললেই চলে । তাই এই পাহাড়েই আমি বারবার ফিরে আসি । শান্তিতে আর একান্তে কিছু সময় কাটাতে ।

আমি কয়েকবার পিছন ফিরে তাকাতে তাকাতে সামনে এগিয়ে চলছি । পেছনের আওয়াজটা তখনও হয়ে চলেছে । কমছে তো নাই বরং আরও বেড়ে চলেছে । মনে মনে ভাবতে লাগলাম আসলে কি হতে পারে ! মাঝে মাঝে পাহাড় অশান্ত হয়ে ওঠে ওরকম কিছু নাকি !

আমি একটু সাবধান হয়ে গেলাম । বলা যায় না কোন দিন দিয়ে কি বিপদ আসে ! চোখ কান খোলা রেখে সামনে এগিয়ে চলছি আপন মনে ! সেই সময়ে পাশের ঝোপ থেকে একজন এসে সোজাসুজি আমার সাথে ধাক্কা খেল । কে আমাকে ধাক্কা মারলো সেটার দিকে ভাল করে তাকাতেই আমার চোখ কপালে উঠলো ।

একটা মেয়ে !

এই পাহাড়ে !

আমার অবাক হওয়ার আরো বড় কারন হচ্ছে মেয়েটা শরীরে বিন্দু মাত্র কাপড় নেই । ফর্সা শরীরের সব টুকু অনাবৃত্ত হয়ে আছে । মেয়েটার চোখে সেটার কোন লক্ষণ নেই বরং সেখানে একটা ভয়ের ছাপ দেখতে পাচ্ছি । আমার দিকে চোখ পড়াতেই মেয়েটার সেই ভয় যেন আরও বেড়ে গেল । দুরে সরে যেতে চাইলো । তবে দেখলাম উঠে দাড়াতেই মেয়েটা আবার পড়ে গেল । পায়ে সম্ভবত ব্যাথা পেয়েছে । আর হাটতে পারবে না ।

মেয়েটার সব থেকে লক্ষ্য করার মত দিক হচ্ছে মেয়েটার সবুজ চোখ । নীল চোখের মেয়ে আমি অনেক দেখেছি কিন্তু সবুজ চোখের মানুষ এই প্রথম দেখলাম ! মেয়েটা আমার দিকে ভীত চোখেই তাকিয়ে রইলো । আমার কাছ থেকে যেন কোন হামলার আশংকা করছে । আমাকে মেয়েটা এতো ভয় পাচ্ছে কেন ঠিক বুঝতে পারলাম না । তবে ওর কাছে গিয়ে বললাম

-ভয় নেই । আমি কিছু করবো না !

মেয়েটা আবারও ভয়ে দুরে সরে যেতে চাইলো । আমি আরও মোলায়েম কন্ঠে বললাম

-ভয় নেই । কি হয়েছে আমাকে বল ?

এই কথাতেই মনে হল একটু কাজ হল । তবে মেয়েটা কোন কথা বলল না । কেবল হাত দিয়ে ও যেদিক দিয়ে এসেছিলো সেদিকে নির্দেশ করলো । ওখান থেকে আমি সেই মানুষ জনের আওয়াজ পেলাম । ওরা এদিকেই আসছে । আমার বুঝতে কষ্ট হল না । এই মেয়েটাকে নিশ্চয়ই ঔ লোক গুলো আক্রমন করেছে । ওদের কাছ থেকেই মেয়েটা পালিয়ে আসছে ।

আমি বললাম

-হাটতে পারবে ?

মেয়েটার মুখ দেখে মনে হল সে সম্ভবত আমার কথা বুঝতে পারছে না । আমি ওর পায়ের দিকে নির্দেশ করে হাটার মত করে অভিনয় করে দেখালাম । ও কেমন অসহায়ের মত মাথা নাড়ালো ।

পারবে না !

কি করবো ঠিক বুঝতে পারছিলাম না । এক মন বলছে এসব ঝামেলার ভেতরে নিজেকে জড়ানোর কোন মানে নেই । সোজা কেটে পড়ি এখান থেকে । কিন্তু আমি খুব ভাল করেই জানি এই মনভাব আমার নিজের কাছে এক মুহুর্তও টিকবে না । আজকে যদি মেয়েটাকে আমি এখানে এভাবে একলা ফেলে চলে যাই তাহলে বাকি জীবনটা আমাকে এই ভেবে কাটাতে হবে যে আমি চাইলেই মেয়েটাকে বাঁচাতে পারতাম ।

আমি মেয়েটাকে হাত ধরে তুললাম । এরপর ওকে চলতে সাহায্য করলাম । পেছন থেকে সেই আওয়াজ আমার কানে আসছিলোই । আস্তে আস্তে তারা এগিয়েই আসছিলো । এক পর্যায়ে আমি আমার কাধের ব্যাগটা খুলে একটা ঝোপের ভেতরে লুকিয়ে রাখলাম । যদি আবার কোন দিন এই দিকে আসি তাহলে এটা নিয়ে আসা যাবে । সেখান থেকে আমার একটা গেঞ্জি আর থ্রিকোয়াটার বের করে মেয়েটাকে পরালাম । মেয়েটা এমন ভাবে সেগুলো পড়লো যেন এর আগে সে এগুলো কোন দিন পরেই নি ।

এরপর মেয়েটাকে কাধে নিয়ে দৌড়াতে শুরু করলাম । কত সময় দৌড়েছি আমি বলতে পারবো না তবে এক সময় আমার কেবল মনে হল আমরা এখন নিরাপদ । রাতে খোলা আকাশের নিচেই ঘুমিয়েছিলাম । আমি এর আগেও বেশ কয়েকবার পাহাড়ে এসেছি তাই জানি কোথায় খাবার পাওয়া যায় । কোন ফল গুলো খাওয়া নিরাপদ । সেগুলো খেয়েই আপাতত ক্ষুধা নিবারন করলাম কিন্তু মেয়েটা কিছুই খেল না । এমন কি আমার সাথে একটা কথাও বলল না । মেয়েটার নাম পর্যন্ত জানতে পারলাম না ।

সকালে উঠে দেখি মেয়েটা নেই । মনের ভেতরে কু ডেকে উঠলো । মেয়েটাকে সম্ভবত ওরাই ধরে নিয়ে গেছে যারা ওর পিছু নিয়েছিলো কিন্তু আমার ঘুম এতো পাতলা না যে মেয়েটাকে নিয়ে যাবো জোর করে আমি টের পাবো না । তার মানে মেয়েটা একা একাই চলে গেছে । নিজেকে খানিকটা বোকা বোকা মনে হল । যার জন্য এতো কষ্ট করলাম শেষে এসে দেখা গেল কিছুই হল না । তারপর আর ঐ পথে গেলাম না । বাসার দিকে ফিরে এলাম ।

সেদিনের পর থেকে মেয়েটাকে আমি আর দেখি নি । দেখছি এই আজকে ! আমারই বাসার সামনে আমার জন্য অপেক্ষা করছে ।

তিন

-এতোদিন কোথায় ছিলে ? আমার খোজ কিভাবে পেলে ! আজিব ! আমি তো কিছুই বুঝতে পারছি না । ঐদিন ওভাবে চলে গেলে কেন ? জানো আমি কত চিন্তা করছিলাম জানো ?

আমি এক নিঃশ্বাসে কথা গুলো বলে ফেললাম । মেয়েটা হাসলো । সবুজ চোখের মেয়েটার হাসি আসলেই অন্য রকম লাগছে ।

আমি বললাম

-এমন কি আমি তোমার নাম পর্যন্ত জানি না !

-আরে বাবা আস্তে আস্তে । এক সাথে এতো প্রশ্নের জবাব কিভাবে দিবো ?

-কিছু তো বল !

-আচ্ছা ! আমার নাম বলতে পারো “নিনেন”

-নিনেন ?

-কেন পছন্দ হয় নি ?

-না মানে এই নাম কোন দিন শুনি নি তো !

-শুনতে হবে না ! নাম তো জরুরী না ! মানুষ জরুরী !

আমি খানিকটা অবাক হয়ে বললাম

-আজকে এতো কথা । ঐদিন তো একটা কথাও বল নি !

নিনেন আবারও হাসলো । কোন জবাব দিল না । বুঝতে পারলাম ও ঐদিনকার কথা তুলতে চাচ্ছে না ! আমি বললাম

-আমার খোজ কিভাবে পেলে ?

-পেয়েছি । বলতে পারো গন্ধ শুকে শুকে চলে এসেছি !

-বটে ?

-হুম! এখন খুব ক্ষুধা লেগেছে । কিছু খেতে দাও দেখি !

ঐরাতে বেশ চমৎকার কাটলো । কিছু রান্না করা ছিল না, দুজন মিলে রান্না করলাম । মুরগির মাংসের ঝোল আর ভাত । বলতে গেলে ও নিজেই রান্না করলো । তরকারী মুখে দিয়ে সত্যিই অবাক হয়ে গেলাম । নিনেন চমৎকার রান্না করে । কোথা থেকে শিখলো কে জানে !

খাওয়া দাওয়ার পরে নিনের সাথে অনেক কথা হল । আমি এতো কথা বলতে পারি দেখে অবাকই লাগছিলো । আমার সব কিছু ও শুনতে লাগলো । কি করি কি করেছি আমার কে কে আছে ! সব কিছু । আমার বলতেও ভাল লাগছিলো কারন এর আগে আমার কথা এতো আগ্রহ নিয়ে কেউ শুনে নি । কিন্তু নিজের ব্যাপারে ও কিছুই বলল না । বলল যে বলার মত তেমনি কিছু নেইও ! ও খুব দুরের একটা জায়গা থেকে এসেছে । নিজের ব্যাপারে ওর কিছুই মনে নেই । ওর স্মৃতি বলতে ঐ দিনের পর থেকেই যেদিন আমাদের দেখা হয়েছিলো।

তবে আমার ওর ব্যাপারে একটু যে অদ্ভুত লাগছিলো না সেটা বলবো না । এতো দিন পরে মেয়েটা এরকম হঠাৎ করে আমার উদয় হল । আমার খোজ কিভাবে পেল কে জানে ? এমন যে চলতে ফিরতে হঠাৎ করেই দেখা হয়ে গেছে । রাতে ওকে গেস্ট রুমে ঘুমাতে দিলাম ।

সকাল বেলা উঠে দেখি ও নেই । চলে গেছে । আমাকে কিছু না বলে চলে গেছে । ভেবেছিলাম আবারও হয়তো দেখা হবে না অনেক দিন । কিন্তু রাতের বেলা আবারও আবারও এসে হাজির । এভাবে প্রত্যেকদিনই নিনেন আমার বাসায় আসতে লাগলো । প্রথম প্রথম একটু অন্য রকম লাগলেও পরে আমার কাছেও সব কিছু স্বাভাবিক মনে হতে লাগলো । একবার অবশ্য ওকে জিজ্ঞেস করেছিলাম যে ও কোথায় যায় এই সকাল বেলা । ও ঠিক মত জবাব দেয় নি । কেবল বলল যে দিনের আলো ওর কাছে ভাল লাগে না । আমি কথাটা অর্থ বুঝতে না পারলেও আর জানতে চাইলাম না ।

এভাবেই দিন যেতে লাগলো । আমার সময় কাটতে লাগলো বেশ ভাল । এতো দিনের সেই নিঃসঙ্গ ভাবটা আমার পুরোপুরি কেটে যেতে লাগলো । নিনেন কে আমি পছন্দ করতে শুরু করেছি সেটা বুঝতে কষ্ট হল না । ও নিজেও যে আমাকে পছন্দ করে সেটাও বুঝতে কষ্ট হল না । সারাটা সময় কেবল ওর কথাই ভাবতাম ।

একদিন রাতে খাওয়ার পরে আমরা এক সাথে টিভি দেখছিলাম । এমন সময় নিনেন আমাকে বলল

-আচ্ছা আমি যখন তোমার কাছে থাকি না তুমি আমার কথা অনেক ভাব, তাই না ?

-হ্যা ! সব সময় !

-আমিও ।

-আমার কেন জানি মনে হয় তুমি ভাব আমার কথা অনেক !

-ও আচ্ছা । ইউ ক্যান ফিল ইট টু !

-হুম !

-গত পরশুদিন তুমি অফিসে আমার কথা ভাবতে একটা বড় ভুল করে ফেলেছিলেন তাই না ? তোমার বস তোমাকে এই জন্য বেশ ঝাড়িও দিয়েছিল !

আমি অবাক হয়ে তাকিয়ে রইলাম ওর দিকে কিছু সময় । আমি সত্যিই ভুল করেছিলাম এবং সেটা অন্যমনস্ক থাকার জন্যই ।

-তুমি কিভাবে জানলে ?

নিনেন আমার কথার জবাব দিল না । সবুজ চোখে আমার দিকে একভাবে তাকিয়েই রইলো !

বুকে আরেকটু সাহস জাগলো । ওকে চুমু খেয়ে ফেললাম । মনের ভেতরে ভয় ছিল যে ও হয়তো রাগ করবে । কিন্তু ও রাগ তো করলোই না বরং আমার চুমুতে আরও ভাল ভাবে সারা দিল ।

সব কিছু ভালই চলছিলো । কিন্তু একদিন ছন্দ পতন হল । অফিসে দুজন মানুষ আমার সাথে দেখা করতে এল যাদের কে আমি চিনি না । এর আগে তাদের সাথে আমার যে কোন দিন দেখা হয় নি সেটা আমি নিশ্চিত করেই বলতে পারি । এদের একজন আবার বিদেশী ।

কিন্তু ওদের হাতে আমি যখন আমার বান্দরবনে ফেলে আসা ব্যাগ টা দেখতে পেলাম তখন একটু অবাক হতেই হল । অনেক কিছু মাথার ভেতরে ঘুর পাক খেতে লাগলো ।

প্রথম লোকটা নিজের পরিচয় দিল আজগর নামে । বিদেশী লোকটার নাম বলল ডেভিড ! আমি বললাম

-আমার কাছে কি কাজে এসেছেন জানতে পারি কি ?

-এই ব্যাগটা আপনার তো ?

একবার ভাবলাম মিথ্যা বলি । কিন্তু পরে মনে হল মিথ্যা বলার দরকার নেই । বললাম

-হ্যা ! আমারই ! মাস দুয়েক আগে আমি ট্যুরে গেছিলাম । ওখান থেকেই ব্যাগটা খাঁদে পরে যায় অসাবধানতাবসত ।

-কিন্তু আমরা কিন্তু এটা কোন খাদের ভেতরে পায় নি ।

-তাই নাকি ? তাহলে ?

-এটা একটা ঝোপের ভেতরে লুকানো ছিল !

-হয়তো কোন পাহাড়ি পেয়েছিলো ওটা । পেয়ে লুকিয়ে রেখেছে । কিন্তু আপনারা আমার কাছে এই ব্যাগটা ফেরৎ দেওয়ার জন্য নিশ্চয়ই আসেন নি । তাই না ?

আজগর আর ডেভিড দুইজনই আমার দিকে তাকালো ! ওদের চোখের ভাষা পড়তে আমার খুব একটা কষ্ট হল না । আমি বললাম

-না মানে, একটা ট্রাভেল ব্যাগ ফেরৎ দেওয়ার জন্য আপনারা আমার কাছে আসেন নি সেটা আমি পরিস্কার বুঝতে পারছি । আসল কাহিনী কি বলবেন প্লিজ !

আজগর আমার দিকে কিছু সময় তাকিয়ে থেকে বলল

-ঠিকই বলেছেন । আপনাকে বলতে পারেন আমরা খুজে বের করেছি । ঐ সময় বান্দরবানে কারা কারা ট্যুরে ছিল সব আমরা জোগার করেছি । তাদের গাইডদের সাথে কথা বলেছি । বিজিবির ডাটা থেকে জানতে পেরেছি কেবল মাত্র আপনিই একজন যে কোন গাইড না নিয়ে চলাচল করেছেন । তারপর আরও অনেক কিছু খুজে বের করতে হয়েছে !

-এটা নিশ্চয়ই একটা মাত্র ব্যাগ ফেরৎ দেওয়ার জন্য নয় ?

-বুঝতেই পারছেন সেটা নয় !

আজগর আমার দিকে ঠান্ডা স্বরে বলল । আমিও নিজেকে যথা সম্ভব ঠান্ডা কন্ঠে বললাম

-তাহলে কি সেটা ?

-আপনি ঐদিন কোন অস্বাভাবিকত্ব লক্ষ্য করেছেন ?

-কেবল আমার ব্যাগটা হারিয়েছিলো ! আর কিছু না !

-সত্যি কি তাই ? আর কিছু না ?

-জি না আর কিছু না ! ব্যাগটা হারানোর পরে আমি সোজা ফেরার পথ ধরি । আর কিছু হয় নি !

কিছু সময় দুজনই চুপ করে রইলাম । কেউ কোন কথা বলছি না ! হঠাৎ করেই পাশের বিদেশী লোকটা যার নাম ডেভিড আজগরের দিকে

তাকিয়ে বলল

-আমার বন্ধুর কথায় কিছু মনে করবেন না । তবে আমরা আপনার শত্রু নই । আমাদের কিছু তথ্য দরকার । যদি দয়া করে সাহায্য করতেন !

আমি এবার একটু শান্ত কন্ঠে বললাম

-তার আগে আমাকে জানতে হবে আপনারা সেটা কেন জানতে চাচ্ছেন ?

দুজনেই চুপ করে রইলো কিছু সময় । একে অন্যের সাথে বোঝাপরা করে নিল । তারপর আমার দিকে তাকিয়ে ডেভিড বলল

-আপনি কি অস্বাভাবিক কিছুতে বিশ্বাস করেন ? মানে যার কোন ব্যাখ্যা হয় না, এমন কিছুতে ?

-হ্যা । অবশ্যই । পৃথিবীতে অনেক কিছুই এমন আছে যার কোন ব্যাখ্যা নেই । থাকলেও আমরা যেটা জানি না ।

-এই ঘটনাও এমন একটা ঘটনা !

-আপনি আলমাইটি গডে বিশ্বাস করেন তো ?

-আমার বিশ্বাস আল্লাহর উপর !

-ঐতো । আমরা যেন অলমাইটি গডের অনুসারী ঠিক তেমনি অনেকে আছে ডিমন কিংবা লুসিফারের অনুসারী ! আপনাদের ধর্মে যাকে শয়তান নামে ডাকা হয় !

আমি কোন কথা না বলে বলে শুনে গেলাম । আমার মাথায় অবশ্য তেমন কিছু আসছে না । তবে এটা যেন নিনের সাথে সম্পর্কৃত সেটা বুঝতে আমার মোটেই কষ্ট হল না ।

-আসল কথা হচ্ছে জগতে একটা ভাল এবং একটা খারাপ শক্তি আছে । এটা এখনকার দুনিয়াতে অনেকে বিশ্বাস না করলেও আমরা করি ! আমরা করি যে আমাদের থেকেও একটা সুপিরিয়র শক্তি আছে । একটা পজেটিভ একটা নেগেটিভ ! আমরা যে প্রাণীটার পেছনে ছুটে বেড়াচ্ছি সেটা কোন ভাল কিছু নয় । এই লুসিফারের পাঠানো একটা ডিমোন ।

-আমি আসলে ঠিক বুঝতে পারছি না আপনারা কি বলতে চাচ্ছেন ?

এরপরে কথা গুলো শুরু করলো আজগর ।

-ঠিক এমন কিছু ডিমোন বিগত কয়েকশ বছর ধরে পৃথিবীতে পাঠাচ্ছে লুসিফার । তার অনুসারীদের পথ দেখানোর জন্য । এই ডিমোনটার নাম “নিনেন” । সবুজ চোখের ডিমোন !

আমার মেরুদন্ড বেয়ে সরু একটা ঠান্ডা প্রবাহ বয়ে গেল ! আমি তবুও নিজেকে যথাযত শান্ত রাখা চেষ্টা করলাম !

-আর আমাদের কাজ হচ্ছে সেই নিনেন টেনডারকে এইজেই মেরে ফেলা । কারন যত সময় যেতে থাকবে তত এটা শক্তিশালী হতে থাকবে । এদের আসে পাশে সব কিছু থেকে জ্ঞান আহরন করার ক্ষমতা অসাধারন । এরা খুব দ্রুত শিখতে পারে, শক্তিও অর্জন করতে পারে এবং এমন একটা সময় আসবে যখন আমরা হয়তো এটার আর কোন ক্ষতি করতে পারবো না । আমরা পুরো পৃথিবী ঘুরে বেরিয়েছি । যখন যেখানে যেতে হয়েছে সেখানেই গেছি । কিন্তু এইবার আমাদের একটু দেরি হয়ে গেছে । একটু দেরি হয়ে গেছে । সেখানে দুটা ডিমোনকে আমরা জায়গাতে শেষ করতে পারলেও তিন নম্বরটা আমাদের হাত ছুটে পালিয়ে যায় । এবং আমাদের বিশ্বাস ওটার সাথে আপনার দেখা হয়েছে । সাম হাউ আপনি ওটাকে সাহায্য করেছেন পালাতে !

আমি কোন কথা না বলে চুপ করে রইলাম ।

আজগর বলে চলল

-না আপনাকে আমরা দোষ দিচ্ছি না । আপনি যা করেছেন তা না জেনেই করেছেন । ওরা মানুষ্য রূপে ছিল তার উপর একটা মেয়ের রূপে । যে কেউ সাহায্য করবে !

আমি বললাম

-আপনাদের কেন মনে হল যে আমিই ওটাকে সাহায্য করেছি ?

-কারন একেবারে প্রথম অবস্থায় ওরা কিছুই জানে না । ওদের পক্ষে পালিয়ে থাকাটা সম্ভব হয় না । আত্মরক্ষা করাও । কিন্তু নিনেন সার্ভাইভ করেছে ! সেটার ফল আপনি দেখতে পাচ্ছেন !

-মানে ? আমি বুঝলাম না ।

-বুঝলেন না ?

আমি মাথা নাড়ালাম ।

-গত দুই মাস ধরে আপনাদের এলাকাতে কিছু অঘটন ঘটছে । নিশ্চয়ই খেয়াল করছেন ?

-হ্যা !

-কি অস্বাসাভবিক লাগছে সেটার ব্যাপারে ? লক্ষ্য করে দেখেছেন কি ওদের মৃত্যু গুলো সব একই ভাবে এবং একই রকম ভাবে হচ্ছে ?

আমার বুকের ভেতরটা কেমন লাফাতে লাগলো । মনে মনে কাল রাতের নিনের চেহারাটা মনে করার চেষ্টা করলাম গতকাল রাতে নিনের সাথে আমার সম্পর্কটা আরও একটু অন্য দিকে চলে গেছে । আমি সেটা মনে করার চেষ্টা করলাম । কেবল চুমুর ভেতরেই সেটা সীমাবদ্ধ থাকে নি । আরও অনেক বেশি কিছু হয়েছে আমাদের ভেতরে !

আজগর বলেই চলল

-খবর রিপোর্টে কি মনে হচ্ছে ? কি মিল আছে খুন গুলোর মধ্যে ?

আমি রিপোস্ট গুলো পরেছি । এটা কে পুলিশ সিরিয়াল কিলিং বলছে । কারন প্রত্যেকটা খুনের ধরন একই রকম । প্রথমে ভিকটিমের ঘাড়টা ভাঙ্গা হয় তারপর ধারালো কোন অস্ত্র দিয়ে বুকে টা চিরে ফেলে খুনি । এরপর সেখান থেকে হৃদপিন্ডটা তুলে নেয় ! যে ছয়টা খুন হয়েছে সব গুলোই একই ভাবে !

আমি বললাম

-প্রত্যকটা বডি থেকে হৃদপিন্ড নিয়ে নেওয়া হয়েছে ।

ডেভিড হাসলো । তারপর বলল

-এই নিনেনদের প্রধান এবং পছন্দের খাদ্যই হচ্ছে মানুষের হৃদপিন্ড ! আর এই এলাকাই বেছে নিয়েছে কেন জানেন ? বলতে পারেন আপনার জন্যই । সে প্রথম অবস্থায় আপনাকে দেখেছে আপনি তাকে সাহায্য করেছেন এটা ও মনে রেখেছে । ও আপনার শরীরে একটা নিরাপদ গন্ধ পেয়েছে এই জন্যই আপনার কাছেই ও ছুটে এসেছে ।

আমি কি বলবো খুজে পেলাম না । চুপ করে তাকিয়ে রইলাম । একবার মনে সব সত্য টুকু ওদের বলে দেই । তারপর ওদের সাথে করে নিয়ে যাই আমার বাসায় নিনেন কে ধরিয়ে দেই ! কিন্তু মন সায় দিল না । আমাকে আগে নিনেনের সাথে কথা বলতে হবে ।

ডেভিড বলল

-নিনেন এখন আপনাদের এলাকাতেই রয়েছে । আশে পাশে । তার কাজ কর্মে সেটার বোঝা যাচ্ছে । বুঝেছেন । এই জন্য প্লিজ আমাদের সাহায্য করুন ! আপনি যা জানুন আমাদের কে বলুন !

আমি সত্যটা বলেই দিলাম । বলে দিলাম যে আমার সাথে ওমন একটা মেয়ের দেখা হয়েছিলো । এবং আমি ওকে সাহায্য করেছিলাম ! সব কিছু বললাম কেবল ও আমার বাসায় এসে হাজির হচ্ছে প্রতি রাতে সেটা বললাম না !

আগজর বলল

-গুড এটা একটা ভাল সংবাদ !

-ভাল দিক ?

-নিনেনরা এটা একটা বৈশিষ্ট বলতে পারেন । ও আপনাকে চিনেছে এবং আপনার খোজেই এখানে এসেছে । আশা করি কদিনের ভেতরেই ও আপনার সামনে আসবে । এটা আমাদের জন্য প্লাস পয়েন্ট ! আর আরেকটা বড় খবর হচ্ছে ওরা আলো ভয় পায় । ঠিক ভয় না আলোতে ওদের শক্তি কমে যায় ! এটা মাথায় রাখবেন ! অবশ্য আপনার মাথায় রাখার খুব একটা দরকার নেই । ওটা আপনার কোন ক্ষতি ততক্ষন পর্যন্ত করবে না যতক্ষন আপনি ওটার ক্ষতি করেন !

আরও অনেক কথা হল আমাদের মাঝে । কিন্তু আমার কেন জানি সেগুলো শুনতে মন চাইছিলো না । পাছে তারা কিছু বুঝে ফেলে এই জন্য শোনার আগ্রহ করে আমি সেদিকে তাকিয়ে রইলাম । যাওয়ার আগে তারা আমাকে তাদের মোবাইল নাম্বার দিয়ে গেল । আর বলে গেল যেন সে দেখা দেওয়ার সাথে সাথে আমি যেন ওদের সাথে যোগাযোগ করি ।

চার

রাতের বেলা নিনেন নিজ থেকেই আমার কাছে এল । খাওয়ার পর যখন ওকে জড়িয়ে শুয়ে ছিলাম তখনও আমার ঠিক বিশ্বাস করতে কষ্ট হচ্ছিলো । মনে হচ্ছিলো ওরা যা বলেছে তা মিথ্যা বলেছে । এটা কোন ভাবেই সত্য হতে পারে না ।কিন্তু ওদের কথা সত্য হবে এটা জানি । কারন এটা সব কিছুর ব্যাখ্যা পাওয়া যায় । সব উত্তর মিলে যায় !

কিভাবে ও আমার খোজ পেয়ে চলে এল এখানে । কিভাবে আমার সব কিছু জেনে যায় আমি কি ভাবি সেটা বুঝতে পারে সব কিছুরই ব্যাখ্যা পাওয়া যায় ।

যখন একটু একটু ঘুম আসবে তখনই নিনেন উঠে বসলো । ওর পরিস্কার ফর্সা পিঠটা আমার দিকে মুখ করে বসলো । তারপর বলল

-তুমি সব জানো তাই না ? সব জেনে গেছ ?

আমি চুপ করে রইলাম । এই সত্যটা ওকে বলতে ইচ্ছে হল না ।

-আজকে আমি তোমার মন অনুভব করতে পারছি ! তুমি জেনে গেছো আমি কে ? আমি কি !

আমি কোন কথা না বলে চুপ করে রইলাম । নিনেন বলল

-আমি যখন নিজের আসল ষত্যটা বুঝতে পারলাম সত্য বলতে সেটা মেনে নিতে পারি নি । কেন পারি নি আমি জানি না । আমার কেবল তোমার কথা মনে ছিল । তোমার গায়ের গন্ধ, তোমার শরীরের উত্তাপ । তুমি যখন আমাকে কাধে করে নিয়ে দৌড়াচ্ছিলে তখন তোমার অনেক কাছে আমি চলে গিয়েছিলাম, অনেক ভিতরে । এটা আমাদের বৈশিষ্ট বলতে পারো ! আমার সব জ্ঞান তোমার থেকেই শুরু বলতে পারো ! এই পৃথিবীতে আমার অস্তিত্ব তোমার থেকে শুরু !

আমি বললাম

-আমার কাছ থেকে চলে যাওয়ার পর তুমি কোথায় গেছিলে ?ত

-আরেকটা পরিবারের কাছে গিয়ে হাজির হই, ফরেস্ট অফিসারের বাংলো ছিল সেটা । ওরা আমার সাথে খুব ভাল ব্যবহার করে । তুমি যেমন করেছিলে ! আমার ভেতরে এই বোধটা আসে যে আমি মানুষের কোন ক্ষতি করতে পারবো না । প্রতি রাতে আমার স্বপ্নে সে আসতো ! আমাকে ওদের খুন করতে বলতো আমার আসল দিকটা দেখাতো কিন্তু আমি সেগুলো অস্বীকার করি আমাকে ভয় দেখায় তবুও আমি আমি রাজি হই নি ! আমি অন্য নিনেনদের মত নই !

-তাহলে এতো গুলো মানুষ কে মেরেছে ?

-আমি মারি নি । কাউকে মারি নি ! বিশ্বাস কর !

-তাহলে কে মেরেছে ?

-আমি জানি না ! তবে আমি এই টুকু জানি যে আমি তোমার কোন ক্ষতি করতে পারবো না কোন দিন ।

আমি কি বলব বুঝতে পারলাম না । চুপ করে রইলাম । নিনেন আবার বলল

-তবে জানি এই কথা হয়তো তুমি বিশ্বাস করবে না । কেউ করবে না ! তাই আমার মনে হয় এখানে আর আসা ঠিক হবে না । চলে যেতে হবে । তোমাকে ছেড়ে অনেক দুরে । সেটা তোমার আর আমার দুজনের জন্যই ভাল ।

আমাকে আর কিছু বলার সুযোগ না দিয়েই নিনেন উঠে দাড়ালো । ওর চলে যাওয়া পথের দিকে তাকিয়ে রইলাম । ওকে বলতে ইচ্ছে হল যে আমি বিশ্বাস করি যে ও কাউকে মারে নি । কিন্তু সেটার বলার আগেই নিনেন চলে গেল ! আমি ওর চলে যাওয়া পথের দিকে তাকিয়েই রইলাম ।

পাঁচ

তারপর আরও সপ্তাহ দুয়েক কেটে গেছে । এবং এই সপ্তাহের ভেতরে এলাকাতে কোন খুন হয় নি । ভয়টা একটু কেটে গেছে সবার । পুলিশও ঐ রকম ট হল কমিয়ে দিয়েছে । নিনেন এই দুই সপ্তাহের মাঝে একবারও আমার কাছে আসে নি । আর সম্ভবত আমাদের দেখা হবে না কোন দিন । হয়তো ঐ লোক গুলোর হাতে নিনেন কোন মারা পরবে । আমি হয়তো জানতেও পারবো না !

আজকেও অফিস থেকে বের হতে একটু দেরী হয়ে গেল । তবে আজকে খুব একটা ভয় ছিল না । রিক্সাও পাওয়া গেল বড় রাস্তা পর্যন্ত । রিক্সা এই পর্যন্তই আষে অবশ্য । এখানে থেকে আমার বাসা আর একটু হাটার পথ । তবে এই দিকটাতে আর বাড়ি নেই । রাস্তার এক পাশে একটা ছোট খোলা মাঠ । তারপরেই ঝোপ জঙ্গল । রাস্তাার শেষ গিয়ে ঠেকেছে আমার বাসার গেটে !

আমি আপন মনে হাটতে থাকি । এদিককার বেশি ভাগ ল্যাম্প পোস্টই নষ্ট । মাঝে মাঝে কয়েকটা জ্বলছে । সেগুলো আগের মতই অন্ধকার দুর করার থেকে আরও যেন বাড়িয়ে দিচ্ছে ।

-মিস্টার অপু হাসান !

আমি থেমে গেলাম । আমার পেছন থেকে কেউ ডাক দিয়েছে আমাকে ! আমি পেছন ফিরে তাকিয়ে দেখি কেউ নেই । একটু ভয় পেয়ে গেলাম । কে ডাকলো ? কোন পুরুষের কন্ঠই মনে গল ।

আরও কয়েক কদম এগোতেই সেই একই শব্দ !

আমার নাম ধরে কেউ ডাকছে । এবার আমি ঠিক ঠিকই ভয় পেয়ে গেলাম । মনে হল কেউ আমাকে দেখতে পাচ্ছে । আমি আরেক পা ফেলতেই মানুষটাকে দেখতে পেলাম । অন্ধকারের ভেতরে অবয়বটা পরিস্কার হয়ে উঠলো ।

মানুষটা আমার সামনে এসে থামলো ! সব থেকে অবাক করার বিষয় যে এই অন্ধকারের ভেতরেও আমি লোকটার সবুজ চোখ দেখতে পেলাম । জ্বলজ্বল করছে ।

মাই গড !

নিনেন !

নাহ ! এটা হতে পারে না !

সামনের কন্ঠটা বলে উঠলো

-আমার মনে হয় আপনি আমাকে চিনতে পেরেছেন ?

আমার বুকের ভেতর তখন দুরু দুরু করছে । আমাকে ওমন ভাবে বিচৎষ ভাবে মরতে হবে ! বুকটা শুকিয়ে গেল !

সে আরও কাছে চলে এল । একদম আমার কাছে । আমি বললাম

-তুমি কেন এমন করছো ?

আমার কথা শুনে যেন সে খুব মজা পেল । হোহো করে হেসে উঠে বলল

-কেন তোমরা মাছ খাওয়া না ? মুরগি ছাগল গরু মেরে খাওয়া না ? আমিও এখানে তাই করছি । আমাকে খেয়ে বাঁচতে হবে । আমি তাই করছি ।

আমার বুকের ভেতর তখন কেবল একটা কথাই চলছে কিভাবে আমি দৌড়ে পালাবো । আমার বাসা এখন থেকে আর খুব বেশি দুরে না । দৌড় দিলে হয়তো ঠিক সময়ে পৌছে যেতেও পারি । আমার মনের কথা যেন ওটা বুঝতে পারলো । ওটার সবুজ চোখ যেন আরও একটু জ্বলে উঠলো । বলল

-দৌড় দিলে চার কদমের ভেতরেই তোমাকে আমি ধরে ফেলবো । লাভ হবে না !

আমি তবুও দৌড় দেওয়ার জন্য প্রস্তুতি নিলাম । সামনে দাড়ানো শয়তানের সাগরেত বলল

-তবে তোমাকে আমি খাওয়ার জন্য মারবো না জানো ?

-মানে ? তাহলে কেন মারবে ?

-তোমাকে মারবো আমি আমার নিনেনকে আমার কাছ থেকে দুরে নিয়ে যাওয়ার জন্য ! তাকে বদলে ফেলার জন্য ! সে আর আমাদের মত নেই । দূষিত হয়ে গেছে ।

আমি ওটার কোন কথার মাথা মন্ডু বুঝতে পারছিলাম না ।

-আমি বুঝতে পারছি না ।

-তুমি বুঝতে তো পারবেই না । এই জগতে আমার সাথী হিসাবেই নিনেনকে পাঠানো হয়েছিলো । ওর আমার সাথে থাকার কথা ছিল । আমাকে চুমু খাওয়ার কথা ছিল আর আমার সাথে পর মিলিত হওয়ার কথা ছিল কিন্তু সেটা ও করেছে তোমার সাথে । তুই যতদিন বেঁচে থাকবি ততদিন আমার শান্তি হবে না ! তোকে আমি……

এই বলে ও আমাকে জোড়ে একটা ধাক্কা দিল । আমি ছিটকে রাস্তা থেকে পাশের মাঠে গিয়ে পড়লাম । খুব বেশি জোরে সে ধাক্কা মারে নি তবে আমার মনে হল বুকের হাড় ভেঙ্গে গেছে ।

আমি উঠে দাড়ালাম । ওটাকে আমার দিকে ছুটে আসতে দেখলাম । আমি চোখ বন্ধ করে ফেললাম কিন্তু আমার কাছে পৌছার আগেই একটা ঢুপ আওয়াজ শুনতে পেলাম । কেউ যেন কাউকে ধাক্কা মেরেছে । চোখে মেলে দেখি আমার ঠিক সামনেই নিনেন দাড়িয়ে আছে ।

আমার নিনেন !

আর সামনে মাটিতে পড়ে আছে পুরুষ নিনেন টা !

নিনেন আমার দিকে তাকিয়ে বলল

-তুমি বাসায় যাও এখনও । ওদেরকে ফোন দাও । আমি একে আটকে রাখছি !

-কেউ কোথাও যাবে না ।

লাইনটা বলে পুরুষ নিনেনটা উঠে দাড়াতে লাগলো ।

এরপরেই আমি অদ্ভুত কিছু দেখতে পেলাম । দুজনেই তাদের মানুষ্য রূপের খোলস ছেড়ে আসল রূপ নিতে লাগলাম । নিনেনের গলাটা একটু বেশি লম্বা হয়ে গেল । তারপর দুই হাতের ঠিক নিচেই আরও দুটো হাত সেই সাথে গুলো আরও বেশি লম্বা হয়ে উঠলো । মাথার পাশে কান গুলো আরো একটু লম্বা এল অনেকটা বাদুরের মত । সেই সাথে ঠোট দুটো ঈগলের ঠোটের মত । পা দুটো ক্যাঙ্গারুর মত লম্বা হয়ে ভাজ হয়ে এল । এরপরও ওর একে ওপরের উপর ঝাপিয়ে পরলো ।

আমি কেবল তাকিয়ে রইলাম । আমার কিছু করার ছিল না । কেবল তাকিয়ে তাকিয়ে দেখা ছাড়া । তবে একটা পর্যায়ে মনে হল পুরুষ নিনেনের সাথে ও পারবে না । আসলই ও পারবে না । আমার কথা সত্য করে দিয়ে নিনেনকে পুরুষটা মাটিতে ফেলে দিল ।

নিনেনের দিকে তাকিয়ে মনে ও বেশ আহত হয়ে গেছে । আমি আর কিছু ভাবলাম না সোজা ওর দিকে দৌড়ে গেলাম । পুরুষটার এক হাতের একটা অংশ বেশ চোখা হয়ে উঠেছে, সেটাও ও নিনের শরীরে ঢুকিয়ে দিতে গেল কিন্তু আমার দৌড়ে যাওয়ার ফলে যেন একটু থামলো । ওটার চেহারা দেখে আমার কেন জানি মনে হল ওটা হাসছে । আমার অবস্থা দেখে হাসছে । কি এক অদ্ভুত ভাষায় কি যেন বলল । আমি বুঝতে পারলাম না কিছু । কিন্তু মনে হল আমাদের মৃত্যু আসলেই আসন্ন । সামনের প্রাণীটাকে মোবাবেলা করার মত ক্ষমতা আমার নেই । নিনেনকে হয়তো বাঁচাতে পারবো না । তবে ওর সাথে মরতে তো পারবো ! ও হতে পারে অন্য জগতের মানুষ তবে ওর প্রতি আমার অনুভুতিটা তো মিথ্যা নয় !

কিন্তু তখনও হয়তো আরও কিছু বাকি ছিল । হঠাৎ করেই চারিদিকে একসাথে অনেক গুলো আলো জ্বলে উঠলো । কোথা থেকে ছুটে এলে বেশ কয়েকটা গাড়ি । গাড়ির মাথাতেই আলো ফ্লাড লাইট বসানো হয়েছে । আলো পড়তেই একটা জিনিস লক্ষ্য করলাম যে সামনের পুরুষ নিনেনটা চিৎকার করে উঠলো । পালিয়ে যেতে চাইলো কিন্তু চারিদিক থেকে হরপুনের মত তীর এসে সোজা লাগলো সেটার বুকের ভেতরে । মুহুর্তের ভেতরেই ঘায়েল করে ফেলল ওটাকে !

সেই সাথে আরও আরো কয়েকটা হরপুন এসে বিঁধলো ওটার বুকে । আস্তে আস্তে ওটা মানুষের রূমে ফিরে এল । কালচে রংয়ের রক্তে ভেসে যাচ্ছে ওটার বুক । আরও কিছু সময় এদিক ওদিক নড়া চড়া করার চেষ্টা করে মাটিতে লুটিয়ে পড়লো । শরীরে তীব্র আলো পড়ার সাথে সাথে ওদের শরীর থেকে শক্তি চলে গেছে ।

ততক্ষনে নিনেনও আবার আগের রূপে ফেরৎ এসেছে । আবারও সেই প্রথম দিন দেখার মত করে । আমি আমার শরীরের অফিস কোর্ট টা ওর গায়ে চাপিয়ে দিলাম । তারপর ওকে আড়াল করে দাড়ালাম । আমি জানতাম কারা এটা করেছে ।

ভারি বন্দুক তাক করে কয়েকজন কালো পোষাক পরা মানুষ আমাদের দিকে এগিয়ে এল । সবার বন্ধুক নিনেনের দিকে । ওকে আমি তখনও আড়াল করেই রাখার চেষ্টা করছি ! ডেভিডকে আসতে দেখলাম ।

আমার দিকে সরাসরি তাকিয়ে বলল

-আমার সন্দেহ ছিল তুমি সত্য কথা বলছো না । তাই তোমার উপর চোখ রাখছিলাম । আর আমাদের হিসাবে একটু ভুল ছিল । একটা নয় দুটা নিনেন ছুটে গিয়েছিলো আমার হাত থেকে !

-ওকে তোমরা নিয়ে যেতে পারবে না ।

-অপু আমি চাই না তোমাকে আঘাত করতে !

-কিন্তু ও আমাকে বাঁচাতে লড়েছে ওটার সাথে ! অন্য সবার মত নয় ! ও একটা মানুষকেও হত্যা করে নি এই কয় দিনে । বিশ্বাস করুন !

-আমরা কোন রিস্ক নিতে পারি না !

নিনেন আমার পেছন থেকে বলল

-অপু আমাকে যেতে দাও !

-চুপ । কোন কথা না !

আমি ডেভিডের দিকে তাকিয়ে বললাম

-একটু আগে কি হয়েছে দেখেছেন আপনি ? নিনেন ওটার সাথে পারবে না জেনেও আমাকে বাঁচাতে ঠিকই ওটার সাথে লড়াই করেছে । দেখেছেন নিশ্চয়ই ?

-হ্যা ! কিন্তু এটা ওর বেঁচে থাকার জন্য যথেষ্ঠ কারন হতে পারে না !

-ওয়েল ও যদি আমাকে বাঁচানোর জন্য এমন করতে পারে আমি কেন পারবো না ? আপনারা যদি ওকে মারতেই চান তাহলে আগে আমাকে গুলো করতে হবে !

লাইনটা বলেই আমি নিনেন সামনে দিকে চেপে ধরে দৌড় দিলাম । ওকে এমন ভাবে সামনে ধরে রেখেছে যে পেছনে বন্দুক ধারীরা যদি গুলো করে সেটা সবার আগে আমার শরীরে লাগবে ।

লাগুক !

ঐ আরেকটু দুরে ! ফ্লাড লাইটের তীব্র আলো পার হয়ে গেলেই নিনেন বাকিটা নিজেই সামনে নিতে পারবে ! আলো যে ওকে দুর্বল করে দেয় সেটা আর হবে না !

-মিস্টার অপু ! থামুন বলছি ! আমি কিন্তু গুলি করবো ! থামুন বলছি !

আমি সেদিকে কান দিলাম না !

আমি প্রতি মুহুর্তে গুলির অপেক্ষাতেই দৌড়াচ্ছি । মনে হচ্ছে এই বুঝি একটা গুলি এসে লাগলো আমার বুকের ভেতরে । ঐ তো অন্ধকার দেখা যাচ্ছে । নিনেন দিকে তাকিয়ে দেখি ও সবুজ চোখে আমার দিকে অবাক হয়ে তাকিয়ে আছে । বিন্দু বিন্দু অশ্রু যেন ঝড়ে পরছে ওর চোখ দিয়ে !

সেই দৃষ্টিতে, সেই অশ্রুতে কোন হিংস্রতা নেই ।

কেবল ভালবাসা রয়েছে !

আমি দৌড়াতে থাকি ! আমাকে ঐ অন্ধকারের পৌছাতেই হবে !

(সমাপ্ত)

How useful was this post?

Click on a star to rate it!

Average rating 4.9 / 5. Vote count: 22

No votes so far! Be the first to rate this post.

Related Posts

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *