4
(13)

ছোট একটা ছেলে একা একা নদীর ধার দিয়ে হাটছে আপন মনে । এমন সময়ে সে শুনতে পেল একটা কান্নার আওয়াজ । কাছে পিঠেই কেউ কাঁদছে । ছেলেটা কৌতুহলী হয়ে উঠলো । কান্নার আওয়াজ লক্ষ্য করে এগিয়ে যেতে শুরু করলো । যতই এগিয়ে যেতে শুরু করলো ততই কান্নাটা আরও স্পষ্ট আকারে শুনতে পেল সে । একটা মেয়ের কান্নার আওয়াজ । কিছুদুর যেতেই সে দেখতে পেল তাকে । সাদা পোশাক পরা এক মেয়ে পানির পাশে বসে রয়েছে মাথা নীচু করে । ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদছে । ছেলেটি আরও কাছে এগিয়ে গেল । তখনই সাদা পোশাক পরা মেয়েটি খপ করে ছেলেটির হাত চেপে ধরলো । তার ভয়ংকর চেহারা দেখে ছেলেটি ভয়ে চিৎকার করে উঠলো । নিজেকে ছাড়িয়ে নেওয়ার চেষ্টা করলো কিন্তু কোন লাভ হল না । সাদা পোশাকের মেয়েটি ছেলেটিকে টেনে পানির ভেতরে নিয়ে গেল । এই সাদা পোশাকের মেয়েটি লা ইয়ারোনা নামে পরিচিত । এটি মেক্সিকোর একটা আরবান লেজেন্ড ।

source: deadline.com

পুরো পৃথিবী জুড়ে কত রকম মিথ আর লেজেন্ড যে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে তার কোন ঠিক নেই । আমাদের দেশের মেছো ভুত গেছো ভুতও সেই লেজেন্ডের ভেতরে পরে। নানান সময়ে এই সব লেজেন্ড আর মিথ মানুষের মুখে মুখে প্রচলিত হয়ে আসে বছরের পর বছর, যুগের পর যুগ । এরই কিছু অংশ খুজে পাওয়া যায় বিভিন্ন গল্প উপন্যাস মুভি কিংবা নাটকে । মানুষ এসব গল্প ব্যবহার করে নিজেদের বিনোদনের জন্য। এগুলোই সেই অঞ্চলের কালচারের একটা অংশ । লা ইয়ারোনা আরবান লেজেন্ডটি মেক্সিকো, সাউথ টেক্সাস এবং ল্যাটিন আমেরিকা্র দেশ গুলো কয়েকশ বছর ধরে টিকে আছে । লা ইয়ারোনা শব্দের অর্থ হচ্ছে দ্য উইপিং ওম্যান । নদীর ধারে কাঁদতে থাকা মেয়েটি ।

লেজেন্ড অনুযায়ী, মেক্সিকোর কোন এক গ্রামে মারিয়া নামের এক চমৎকার মেয়ের বসবাস ছিল । মেয়েটি দেখতে যেমন সুন্দর ছিল তেমনি ছিল আকর্ষনীয় । একদিন মেয়েটি নিজের বাসার সামনে বসে ছিল । সেই সময়ে এক সম্ভ্রান্ত শহুরে পুরুক (মতান্তরে বড়লোক এক স্প্যানিশ) সেই রাস্তা দিয়ে যাচ্ছিলো । মারিয়াকে প্রথম দেখেই তার ভাল লেগে যায় । এবং সে নিয়মিত মারিয়ার সাথে দেখা করতে আসে । এক সময়ে তাদের প্রেম হয় এবং তাদের বিয়ে হয় । এভাবেই বেশ কিছু বছর চলে যায় । মারিয়া ততদিনে দুটো ছেলে সন্তানের জন্ম দিয়েছে । কিন্তু মারিয়া এক সময়ে আবিস্কার করে যে তার স্বামী ঠিক আগের মত আর নেই । আগের মত তাকে ভালোবাসে না, তাকে সময় দেয় না । মাঝে মাঝে সে মাসের পর মাস থাকে শহরে । মারিয়ার কাছে কম আসে । এমন একদিন মারিয়ার স্বামী ফিরে এসে জানায় যে সে আর মারিয়ার সাথে থাকবে না । তা তাকে ছেড়ে চলে যাবে এবং তার নিজের সম্ভ্রান্ত গোত্রের এক মেয়েকে বিয়ে করবে । সে তার ছেলেদের নিতে এই কথা শুনে মারিয়ার মাথায় যেন আকাশ ভেঙ্গে পড়ে । সে অনেক অনুনয় বিনয় করে কিন্তু তার স্বামীর মন গলে না । শেষে এক সময়ে মারিয়া তার স্বামীর কাছে অনুরোধ করে যাতে শেষ বারের মত সে তার দুই ছেলের সাথে খেলা করতে পারে । স্বামীর মনে দয়া হয় এবং তাকে সুযোগ দেয় ।

মারিয়া তার দুই ছেলেকে নদীর ধারে নিয়ে যায় এবং স্বামীর উপরে ক্রোধ জন্ম নেয় । সে ভাবে যে কিভাবে সে স্বামীকে আঘাত দিতে পারবে যেমন ভাবে তার স্বামী তাকে আঘাত দিয়েছে। তখনই সে তার স্বামীকে আঘাত দেওয়ার জন্য তার দুই ছেলেকে নদীতে ডুবিয়ে মেরে ফেলে । মেরে ফেলার পরেই সে বুঝতে পারে কি ভুল সে করেছে । কিন্তু ততক্ষণে যা হবার হয়ে গেছে । এই দুঃখ সইতে না পেরে সে নিজেও নদীতে ঝাপ দিয়ে আত্মহত্যা করে । কিন্তু পরজীবনে তাকে ঢুকতে দেওয়া হয় না । তাকে বলা হয় সে নিজের দুই ছেলে ছাড়া সে হেভেনের দরজা দিয়ে ঢুকতে পারবে না । তারপর থেকেই মারিয়া বারবার ফিরে আসে । কাঁদতে কাঁদতে তার দুই ছেলে কে খুজে ফেরে । যে বাচ্চারাই তার কান্না শুনতে পায় এবং তার দিকে এগিয়ে যায় সেই বাচ্চাদেরই সে পানির ভেতরে নিয়ে যায় । অনেক স্থানে আবার এই কথাও আছে যে কেবল বাচ্চারাই নয় যে তার কান্না শুনতে পায় তাকেই সে পানিতে নিয়ে গিয়ে মেরে ফেলে ।

এর আরও একটা ভার্শন রয়েছে । এনসিয়ান্ট গ্রিক টেল অনুযায়ি জিউস স্ত্রী হেরার অগোচরে এক ডেমি-গডেস লামিয়ার সাথে প্রণয় করে এবং এক সময়ে তাদের কয়েকটা সন্তান জন্ম নেয় । এই খবর যখন হেরা জানতে পারে তখন সে লামিয়ার ঐ সন্তান গুলোকে মেরে ফেলে । এরপর লামিয়া হিংসাত্বক হয়ে অন্য সব মেয়েদের সন্তানদের মেরে ফেলতে থাকে ।

মূলত এই লা ইয়ারোনার লেজেন্ডটা মায়েরা তাদের সন্তানদের ভয় দেখাতে ব্যবহার করে থাকে । তাদেরকে বলে যে যেখানে সেখানে একা একা যেন তারা ঘুরে না বেড়ায়, সব সময় যে বাসায় থাকে । এই রকম অনেক গল্প আমাদের দেশেও আছে । তার ভেতরে একটা হচ্ছে জুজু । আামদের দেশের মায়েরা এমন ভাবে তাদের বাচ্চাদের জুজুর ভয় দেখায় । এটা করো না জুজু চলে আসবে, ওখানে যেও না জুজু চলে আসবে ।

লা ইয়ারোনার কাহিনী নানান সময়ে মুভি কিংবা গল্পে দেখা গেছে । ১৯৩৩ সাথে মেক্সিকোর লা ইয়ারোনা নামে একটা মুভি তৈরি হয় যার কাহিনী এই আরবান লেজেন্ড থেকে নেওয়া । এছাড়া ১৯৬০ সালেও একই নামে আরেকটা মুভি তৈরি হয় সেখানে । ১৯৬৩ সালের দ্য কার্স অব ক্রায়িং ওম্যান, ২০০৬ সালের কিলোমিটার মুভির কাহিনী লা ইয়ারোনার লেজেন্ড থেকে অনুপ্রাণীত । অতি সম্প্রতি, ২০১৯ সালে আমেরিকাতে দ্য কার্স অব লা ইয়ারোনা মুক্তি পেয়েছে । মুভিটাও একই কাহিনী নিয়ে তৈরি । এছাড়া থিয়েটার নাটক, গান এবং গল্পেও লা ইয়ারোনার উপস্থিতি এসেছে ।

How useful was this post?

Click on a star to rate it!

Average rating 4 / 5. Vote count: 13

No votes so far! Be the first to rate this post.

Related Posts

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *