4.6
(25)

শরীফকে কেবিনে ঢুকতে দেখে একে একে সবাই কেবিন ছেড়ে বের হয়ে গেল । গত দুই দিনে শরীফ একবারও মিমির সামনে আসে নি । মিমি জানে শরীফ ওর সামনে না আসলেও আশে পাশেই ছিল । অবশ্য মিমির জ্ঞান ছিল না ঠিকঠাক মত । আজকে মিমির শরীর একটু ভাল । উঠে বসতে পারছে । বালিশ দিয়ে খাটের রেলিংয়ের উপরে হেলান দিয়ে বসেছে ।
শরীফ ওর বেডের কাছে এসে বসলো । একটু এদিক ওদিক তাকিয়ে তারপর ওর চোখের দিকে তাকালো ।
মিমির মনে হল শরীফ হয়তো কান্নাকাটি করেছে । ছেলে মানুষের কান্নাকাটি নাকি করতে হয় না । কিন্তু মিমি কোন দিন বুঝতে পারে নি কেন করতে হয় না । শরীফের চোখ একটু যেন অন্য রকম লাগছে ।
কার জন্য?
মিমির জন্য?
নাকি যে সন্তানটা পৃথিবীর মুখ দেখার আগেই মারা গেছে তার জন্য?

শরীফ বলল, কেমন আছো?
মিমি সেই প্রশ্নের জবাব দিল না । শরীফের দিকে তাকিয়ে বলল, আম্মা বলছিলো তোমাকে নাকি আরেকটা বিয়ে করাবে !
শরীফ বলল, আচ্ছা, মেয়ে কে খুজবে? তুমি বরং খুজে দিও । তুমি তো আমার পছন্দ ভাল করে জানো । তুমিই পার্ফেক্ট বউ খুজে আনতে পারবে !

মিমি শরীফের কন্ঠ শুনেই বুঝতে পারলো যে সে ঠোট্টা করছে । এমন একটা সময়ে একজন মানুষ কিভাবে হাসি ঠোট্টা করতে পারে কে জানে ! মিমি একটু মুখ গম্ভীর করে বলল, আমি সিরিয়াস। একবার তো না । পরপর তিনবার । এই বার এতো সাবধান ছিলাম । তারপরেও …

বলতে বলতে মিমির চোখ পানি চলে এল । শরীফ এক ভাবে সেদিকে তাকিয়ে রইলো । তারপর বলল, ডাক্তারের সাথে কথা বলেছি আমি । আসলে সমস্যাটা, ডাক্তার বলছে এখনও নাকি তোমার দেহ ম্যাচিউর না । আরেকটা দেহ ধারন করতে পারছে না । ১৮/১৯ হলেই মেয়েদের দেহ ম্যাচিউর হয়ে যায় বাচ্চা জন্মদানের জন্য । তোমার বেলাতে কি হচ্ছে কে জানে ! তাই আমি ঠিক করেছি আগামী চার পাঁচ বছর আমরা বাচ্চা নেওয়ার চেষ্টা করবো না ।
মিমি বলল, তারপর?
-তারপর সব যদি ঠিক থাকে এবং তোমার শরীর যদি ঠিক থাকে তাহলে আরেকবার চেষ্টা করে দেখা যেতে পারে।
-তারপরেও যদি নষ্ট হয়ে যায় ।
-তাহলে আর কি ! উপরওয়ালার ইচ্ছের উপর কার জোর আছে বল !
-আম্মা তো হার্টফেইল করবে !
-মা প্রতিদিনই চার পাঁচ বার করে হার্টফেইল করে । টেনশন নিও না ।

মিমি কি বলবে খুজে পেল না । কেন জানি ওর খুব কান্না আসছে । বাচ্চা নষ্ট হয়ে যাওয়া একজন মেয়ের জন্য কতটা কষ্টের সেটা কেউ কোন দিন বুঝতে পারবে না । কিন্তু মিমির কান্না আসছে অন্য কারণে । শরীফ বলল, আচার খাবা?
-আচার !
-চালতার আচার !

চালতার আচার মিমির খুব পছন্দ । শরীর যখনই সুযোগ পেত সে কিনে নিয়ে আসতো মিমির জন্য । বাইরের খাবার খেতে দেখলে শরীফের আম্মা খুব রাগা রাগি করে । অনেক বার বলেছে বাইরের খাবারের সাথেই নাকি জ্বীন ভুত চলে আসে । পেটে গিয়ে বাচ্চা নষ্ট করে দেয়। এইবার তাই বাচ্চা পেটে আসার পর থেকে বাইরের কিছু খায় নি । এতো সাবধান ছিল, তবুও শেষ রক্ষা হল না।

মিমি দেখলো শরীফ পকেট থেকে একটা পলিথিন ব্যাগ বের করলো । মিমির কাছে গিয়ে বসলো । চালতার আচারের দিকে হঠাৎ মিমির কি হল সে একটু উঠে বসলো এবং শরীফ কে জড়িয়ে ধরে হুহু করে কেঁদে উঠলো । শরীফ পরম মমতায় মিমির মাথায় হাত বুলাতে বুলাতে বলল, বোকা মেয়ে কাঁদছো কেন শুনি?
-জানি না ।
-কান্না বন্ধ কর । কান্নাকাটি আমার পছন্দ না । এভাবে কান্নাকাটি করলে কিন্তু সত্যি সত্যিই আরেকটা বিয়ে করে ফেলবো !
-শরীফ ….
-আরে বাবা কান্না থামাও প্লিজ । এই নাও আচার খাও । বেশ ভাল বানিয়েছে ।

মিমি অনেক কষ্টে নিজেকে সামলে নিল । নিজ হাতে অবশ্য খেতে হল না । শরীফ নিজ হাতেই ওকে আচার মুখে তুলে দিচ্ছিলো । মিমির কাছে সত্যিই মনে হল যে এমন স্বাধের আচার সে আর কোন দিন খায় নি । এতো বড় একটা দুঃখের পরে এই আনন্দটুকু ওর খুব বেশি দরকার ছিল ।

How useful was this post?

Click on a star to rate it!

Average rating 4.6 / 5. Vote count: 25

No votes so far! Be the first to rate this post.

Related Posts

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *