শেষ যাত্রার শুরু…..

4.5
(31)

কত সময় ধরে আকাশের দিকে তাকিয়ে রয়েছি আমার নিজেরই মনে নেই । লক্ষ কোটি তারার দিকে তাকিয়ে থাকতে ভাল লাগছে । মনে হচ্ছে যেন আমি যেন এই মহাশূন্যের ভেতরেই হারিয়ে গিয়েছি । সময় যেন থেমে গেছে । পাহাড়ের বুকে এমন ভাবে রাত কাটানোর সুযোগ পাবো আমি কোনদিন ভাবি নি । আসফিমাকে যে কিভাবে ধন্যবাদ দিবো বুঝতে পারছি না । ও না থাকলে হয়তো এমন একটা সুযোগ আসতোই না কোন দিন ।

আসফিমার কথা মনে হতেই আমি পাশ ফিরে শুলাম । সন্ধ্যার সময় ও বের হয়েছে । আমাকে কী একটা জুস খেতে দিতে বলল যে ও কাছের একটা ঝর্ণাতে যাচ্ছে গোসল করতে । ফিরে এসে রান্না বসাবে । আমি বললাম, আমিও তো গোসল করি নি, আমিও আসি । আসফিমা বলল, শুনো আমি কাপড় ভেজাবো না । এই কাপড় এখন ভেজালে কালকে ঝামেলাতে পড়বো ।
আমি বললাম, তাহলে আমি ডেফিনেটলি আসবো ।
আসফিমা এবার চোখ গরম করে বলল, দুষ্ট হয়েছো খুব না ! চুপচাপ শুয়ে থাকো । আমি এসে রান্না বসাবো ।

এই বলে সে হাটা দিল । একবার মনে হল ওর পেছন পেছন যাই কিন্তু পরক্ষণেই মনে হল থাকুক । এখনও সময় আসি নি । একটা সময়ে এই মেয়ে নিজেই আমার কাছে ধরা দিবে । অবশ্য ধরা সে দিয়েই দিয়েছে । নয়তো এই এমন দুর্গম পাহাড়ে সে আমার সাথে একা একা চলে আসে কোন দিন ?

আমার পাহাড়ে ঘুরে বেড়ানোর স্বভাব অনেক আগে থেকেই । অনেক স্থানে ঘুরে বেড়িয়েছি । সব গুলোই গ্রুপ ট্যুর । এরকম একটা গ্রুপ ট্যুরেই আমার আসফিমার সাথে পরিচয় । আসফিমাও অনেক জায়গাতে ঘুরেছে । পাহাড়ে নাকি সে প্রতি মাসেই একবার করে আসে । এই ভাবেই মেয়েটার সাথে পরিচয় । আস্তে কথা বার্তা থেকে ঘনিষ্ঠতা । যদিও সে আমাকে নিজের প্রেমিক বলে এখনও স্বীকার করে নি তবে আমার মনে হয়েছে মেয়েটা আমাকে পছন্দ করতে শুরু করেছে । নয়তো এভাবে আমার একা একা আসতে চাইতো কি?

এবারের ট্যুরটা অন্য সব ট্যুর থেকেই আলাদা । পাহাড়ে ট্যুরে আসতে গেলে আর্মি ক্যাম্পে বেশ কয়েকবার এন্ট্রি করে যেতে হয় । প্রতিবার এমনই করেছি । কিন্তু এইবার তেমন কিছু করা হয় নি । থানচি যাওয়ার পরে হঠাৎই আমরা মাঝ পথে বাস থেকে নেমে পড়লাম । এরপর পাহাড়ের ভেতর দিয়ে হাটতে শুরু করলাম । আমাদের সাথে কিছু খাবার আগে থেকেই ছিল এবং ক্যাম্প করার জিনিস পত্রও ছিল । সেসব দুজন মিলে বহন করছিলাম । আসফিমা যেমন করে হাটছিলো তাতে বুঝতে পারছিলাম এই রাস্তাতে সে আগেও এসেছে । সে পথখাট চেনে । এভাবে লুকিয়ে নাকি মাঝে মধ্যে সে আসে ।

আমার ব্যাপারটা বেশ ভালই লাগছিলো । সারাদিন একভাবে হেটে আমরা বিকেলের দিকে একটা উচু পাহাড়ের গোড়াতে এসে হাজির হলাম। জায়গাটা একটু ফাঁকা মত । এবং দেখে মনে হয় যে আগেও এখানে মানুষ ক্যাম্প করেছে । এবং খেয়াল করলাম এক কোনার দিকে কিছু আলগা মাটি । মনে হল যেন কিছু এখানে মাটি চাপা দেওয়া হয়েছে । কেউ এখানে কিছু গেড়ে রেখেছে কি?
আসফিমা ব্যাগ নামাতে নামাতে বলল, এটাই আপাতত আমাদের ক্যাম্প । কাছেই একটা ঝরণা রয়েছে । পানির অভাব হবে না । এছাড়া ছোট একটা ওয়াশরুমের ব্যবস্থা করা আছে । আজকের রাতটা এখানে কাটিয়ে আমরা কাল আবারও হাটা দিবো ।
আমি বললাম, ওখানে এমন মাটি চাপা দেওয়া কেন?
আসফিমা সেদিকে তাকালো । তারপর বলল, আরে ওখানে কয়েকটা গাছ ছিল । সেগুলোর গুড়ি বের করা হয়েছে, তারপর আবার মাটি চাপা দেওয়া হয়েছে । এই জন্য এমন মনে হচ্ছে ।
আমি সেগুলোর কাছে গিয়ে দাড়ালাম। গুনে দেখি মোট ছয় স্থানে মাটি চাপা দেওয়ার চিহ্ন রয়েছে । মনের ভেতরে কেমন যেন একটা কু ডেকে উঠলো । আসফিমা ডাক দিলো আমাকে । চিন্তাটা এক পাশে সরিয়ে রেখে আবার ফিরে গেলাম ।

দুজন মিলে একটা তাবু খাটিয়ে ফেললাম । যদিও এখনই শোয়ার কোন ইচ্ছেই নেই আমার । শরীর বেশ ক্লান্ত ছিল । দেখলাম আসফিমা খাবারের ব্যবস্থা করলো । সাথে করে শুকনো খাবার এনেছিলাম । সেগুলো দুজন মিলে খেলাম । আমাকে একটা ফলের জুস বানিয়ে দিয়ে আসফিমা গোসল করতে চলে গেল । আমি বিছানাতে শুয়ে পড়লাম । সত্যিই বলতে কী শরীর বেশ ক্লান্ত ছিল । তাই কখন যে চোখ লেগে এসেছিলো সেটা টের পাই নি । যখন চোখ খুললাম তখন আকাশে তারার মেলা দেখতে পেলাম । একভাবে তাকিয়ে রইলাম সেদিকেই কিছু সময় ।

আমি ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখি সেটা ছয়টা সময় দেখাচ্ছে । একটু অবাক লাগলো। এখন তো মোটেও ছয়টা বাজার কথা না । যখন সন্ধ্যা হয় তখন প্রায় ছয়টা বেজে গিয়েছিলো । আমি জুসটা খাওয়ার সময় ঘড়ির দিকে চোখ দিয়েছিলাম । তখনও আকাশে ভাল আলো ছিল। এখন আকাশের তারার দিকে তাকিয়ে মনে হচ্ছে কম করে হলেও আট টা বাজে । আমি আরও ভাল করে তাকিয়ে দেখি ঘড়িটা বন্ধ হয়ে আছে । কী ব্যাপার ঘড়িটা বন্ধ হয়ে গেল কেন ? এমন তো হওয়ার কথা না ।
আচ্ছা আসফিমা কই ? এতো রাত পর্যন্ত সে কোথায় ? এখনও গোসল করে আসে নি?
নাকি এসেছিলো? আমাকে ঘুমিয়ে থাকতে দেখে আবার বের হয়েছে
কোথায় বের হবে?
আর রান্না করলে তো আশে পাশেই আগুন জ্বালবে? কোন আগুনের চিহ্ন তো দেখতে পাচ্ছি না । মেয়েটা গেল কই । আমি বিছানা থেকে উঠে পড়লাম । কিছুই বুঝতে পারছি না । এদিক ওদিক তাকাতে লাগলাম । চারিদিকে অন্ধকার হলেও আকাশে তারার মেলা । সম্ভবত একটু পরে চাঁদ উঠবে । এমনিতেও পাশে পাসটা দেখা যাচ্ছে বেশ ।
আমি এদিক ওদিক দেখতে শুরু করলাম । আসফিমা যে কোন দিকে গিয়েছিলো ঝরণার খোজে সেটা চিনতে পারলাম না ।
মেয়েটার কি কোন বিপদ হল?
খুজতে বের হব? কিন্তু দেখা গেল আমি এদিক দিয়ে বের হলাম আর ও অন্য দিক দিয়ে ফিরে এল । আমাকে না দেখতে পেয়ে সে তখন আবার চিন্তিত হবে । কী করবো?

তখনই মনে হল চিৎকার করে ডাক দেই বরং । এখন পাহাড়টা নিস্তব্ধ হয়ে আছে । অনেক দুর পর্যন্ত ডাক শোনা যাবে । আমি ডাক দিতে যাবো তখনই কাছেই কারো কথার আওয়াজা শুনলাম । এই তো আসফিমা আসছে । আমি আওয়াজ লক্ষ্য করে হাটতে যাবো তখনই আমার শরীর খানিকটা কেঁপে উঠলো । কারণ আসফিমার আওয়াজ ছাপিয়ে আরও দুইটা আওয়াজ শুনতে পেলাম আমি । আরও দুইটা ছেলে !

ছেলে !
কারা এরা?
ওদের মত ক্যাম্প করতে এসেছে?
হতে পারে ! আবার নাও হতে পারে । আমার মনের ভেতরে কেমন যেন একটা অদ্ভুত চিন্তার উদয় হল । আমি কি কোন বিপদে পড়েছি?

আসফিমাকে আমি প্রায় ছয় মাসের বেশি সময় ধরে চিনি । মেয়েটার সাথে তিনবার ট্যুরেও গিয়েছি । আমি যে ট্যুর গ্রুপের সাথে ট্যুর করি তাদের সাথে আসফিমার বেশ ভাল সম্পর্ক । তাকে অনেকেই চিনে । মেয়েটা চাবিতে পড়াশুনা করে । এছাড়া এই ছয় মাসে আমরা অনেক কয়বার দেখা করেছি। রেস্টরেন্টে খেয়েছি । মুভি দেখেছি ।

এখন আমার কী করা উচিৎ?
আমার ভেতর থেকে কেউ যেন বলে উঠলো কোথাও লুকিয়ে পড়ি । আগে ওরা সামনে আসুক । তারপর দেখা যাবে !

আমি এদিক ওদিক দেখে একটা বড় ঢিবির আড়ালে লুকিয়ে পড়লাম । তারপর অপেক্ষা করতে লাগলাম ওদের আসার ।

আসফিমা বেরিয়ে এল সবার আগে । তার পেছনে দুইজন । বয়সে আমার সমানই হবে । আমি চোখ বড় বড় করে তাকিয়ে রইলাম । পেছনে দুইজন একটা লম্বা গাছের গুড়ি জাতীয় কিছু বহন করে নিয়ে আসছে । সেটা কালো পলিথিন দিয়ে মোড়া । কিন্তু পরক্ষণেই আমার ভুল ভাঙ্গলো । যেটা ঐ ছেলে দুটো বহন করে নিয়ে আসছে সেটা কোন গাছের গুড়ি না । সেটা একটা মানুষের দেহ । আর যেভাবে পলিথিনে মুড়ে নিয়ে আসছে তাতে কোন সন্দেহ নেই যে ওটা একটা মৃতদেহ ।
সর্বনাশ !
এখন কি হবে ? আমাকে দেখে ফেললে এরা তো আমাকেও মেরে ফেলবে? নাকি অন্য কিছু করবে ? আমার কেবল মনে হল এখান থেকে পালাতা হবে । ওরা দেখে ফেললে বিপদে পড়বো, মহা বিপদে পড়বো !

আসফিমা বলল, এবার কাজ হবে আশা করি !
-তুই নিশ্চিত তো ?
এই কথা বলতে না বলতেই লাশ ধরে রাখা দুজনের একজন একটা গাছের গুড়িতে হোচট খেলে । তার হাত থেকে লাশটা পড়ে গেল । সাথে সাথেই আসফিমা ধরকে উঠলো, সাবধানে । এভাবে ফেল না বডি টা !
অন্য জন বলল, আরে মরেই তো গেছে ।
-যাক তবুও বেচারা জানতোই না সে মরবে।
-টেরও পাই নি হয়তো । তাই না?
-তা ঠিক । সে যে মারা গেছে সেটা টের পাই নি । যে ওষুধটা খাইয়েছি ঘুমের ভেতরেই মৃত্যু হয়েছে । অন্তত এই টুকু তো করতেই পারি নাকি !
-আহ ! আমার দয়ার দেবী !
বলেই ছেলে দুটো হেসে উঠলো । আসফিমাও হাসিতে যোগ দিল । আমার চোখ তখন গিয়েছে লাশটার দিকে । পরে যাওয়ার কারণে তার মুখের কাছের একটু কাপড় সরে গেছে । সেই মুখটা দেখে আমি ভয়ানক চমকে উঠলাম ।
কারণ মুখটা আমার !

সাথে সাথেই আমার কাছে সব কিছু পরিস্কার হয়ে উঠলো । আসফিমা যে জুসটা আমাকে খেতে দিয়েছিলো সেটা খেয়েই আমার মৃত্যু হয়েছে । আমি ঘুমের মধ্যেই মারা গেছি । ওদের কথা শুনে এটাই মনে হল । আমার ঘড়িটা ছয়টার সময়ে বন্ধ হয়ে আছে । এর মানে হচ্ছে আমার মৃত্যু হয়েছে ঐ সময়ে। আমি এখন আর জীবিত নই । হয়তো ঘুমের গোরে মৃত্যু হয়েছে বলেই আমার আত্মা টের পাই নি যে আমি মারা গেছি !
আমার পুরো শরীর যেন দুলে উঠলো । আমার কি এক অদ্ভুত অনুভূতি যে হতে শুরু করলো সেটা আমি বলে বোঝাতে পারবো না । তাহলে এর নামই মৃত্যু । এভাবেই মরনের দেখা পেলাম আমি ! চোখ দিয়ে কখন পানি বের হয়ে এল টের পেলাম না । আসলেই সে সেটা পানি কিনা সেটাও আমি নিশ্চিত করে বলতে পারি না ।
আমি যদি মরেই যাই তাহলে আমাকে ওরা দেখতে পাবে না । পাওয়ার কথা না ।

আমি আড়াল থেকে বের হয়ে এলাম । ঠিক গিয়ে হাজির হলাম ওদের সামনে । কিন্তু ওরা আমাকে লক্ষ্য করলো না। নিজেদের কাজ করতে ব্যস্ত । দেখলাম একজন সেই ছয় মাটি চাপা দেওয়ার স্থানে এক জায়গাতে মাটি খুড়ছে । আমার সন্দেহ তাহলে ঠিকই ছিল! ঐ স্থানে মোট ছয়জনকে মাটি চাপা দেওয়া হয়েছে । আমি সহ সাত জন !
কিন্তু এরা কি করছে? কেন করছে এসব?

আমি তখনই অনুভব করলাম যে আমার দেহটা যেন আস্তে আস্তে উপরে উঠছে । মাটি থেকে উপরের দিকে যাচ্ছে । কয়েকবার চেষ্টা করেও আমি মাটিতে নিজের পা ধরে রাখতে পারলাম না । আমি মাটি থেকে উপরে উঠতে শুরু করলাম ।
আস্তে আস্তে আসফিমা আর ঐ দুই ছেলে অনেক ছোট হয়ে এল । হঠাৎই অন্ধকার আকাশে একটা তীব্র আলোর ঝলকানি দেখতে পেলাম । পেছন ঘুরে তাকিয়ে দেখি আমি সেই আলোর দিকে এগিয়ে চলেছি । এটাই তাহলে শেষ যাত্রা ! শেষ বারের মত পৃথিবীর দিকে তাকালাম আমি ! মায়ের মুখটা চোখের সামনে ভেসে উঠলো । হয়তো কোন দিন জানতেও পারবে না যে আমার লাশ কোথায় আছে !
আলোটার অনেক কাছে চলে এসেছি । এখনই হয়তো সব কিছু শেষ যাবে । আমা শেষ যাত্রার শুরুটা এখন থেকেই ….

How useful was this post?

Click on a star to rate it!

Average rating 4.5 / 5. Vote count: 31

No votes so far! Be the first to rate this post.

Related Posts

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *