4.5
(13)

দরজাতে টোকার শব্দ শুনে আমার চোখ আপনা আপনি ঘড়ির দিকে চলে গেল । তাকিয়ে দেখি রাত এগারোটা পার হয়ে গেছে কিছু সময় আগেই । রাত এগারোটা ঢাকার মানুষ গুলোর জন্য কোন রাত না হতে পারে, কিন্তু এই গ্রামে রাত এগারোটা মানে হচ্ছে গভীর রাত । সারাদিন আমাদের এই বাসাতে মানুষের বেশ ভীড় থাকলেও সন্ধ্যা হতে না হতেই সেই ভীড় একেবারে ফাঁকা হয়ে যায় । এই এলাকার মানুষ রাতের বেলায় বাড়ির বাইরে থাকতে পছন্দ করে না ।

এত রাতে এখানে কে এল ?

আব্দুলের কি কোন দরকার হল ?

আব্দুল হচ্ছে আমাদের কেয়ারটেকার । সন্ধ্যা হতেই সে বাড়ির গেট বন্ধ করে দিয়ে নাক ডাকতে থাকে । আমাদের রাতের খাবার, পানি সব সন্ধ্যা হতে না হতেই ডাইনিং টেবিলে সাজিয়ে রেখে চলে যায় । আব্দুল একদমই রাত জাগতে পারে না । সন্ধ্যা হতেই বউ মেয়েকে নিয়ে ঘুমিয়ে পড়ে ।

এতো রাত পর্যন্ত আব্দুলের জেগে থাকার কথা না । আর সে ডাকলেও এতো মৃদু স্বরে ডাকবে না । বাড়ি মাথায় তুলে ডাকাডাকি করতে থাকবে । আমি আরেকবার ঘড়িটার দিকে তাকালাম । তারপর হাতের বইটা পাশে রেখে আমি উঠে গেলাম দরজার কাছে ।

দরজাটা খোলার আগে আরেকবার মনে হল চোর ডাকাত আসবে না তো ! কিন্তু সাথে সাথেই চিন্তাটা বাদ দিয়ে দিলাম । এই এলাকাতে তৃষাদের এই বাসাতে চোর কিংবা ডাকাত এসে হাজির হবে এমনটা বিশ্বাস করা যায় না । সৈয়দ বাড়িতে আর যাই হোক কোন দিন চোর ডাকাতের উৎপাত হয় নি । এতো বড় সাহস এখনও কারো হয়ে ওঠে নি ।

আমি গিয়ে দরজা খুলে দিলাম । এবং সাথে সাথেই ঘরের আলো চলে গেল । বুঝতে কষ্ট হল না যে বিদ্যুৎ চলে গেছে । প্রত্যন্ত এই একালাতে প্রায়ই বিদ্যুৎ চলে যায় । গ্রামের বেশির ভাগ বাড়িতে এখনও বিদ্যুতের সংযোগ নেই । অল্প কয়েক বাড়িতে কেবল আছে । তাও সব সময় থাকে না ।

আমি বাইরে তাকানোর চেষ্টা করলাম । অন্ধকারের মধ্যে কাউকে দেখতে পেলাম না প্রথমে । তারপর আরেকটু ভাল করে তাকাতেই দেখতে পেলাম যে দরজার ডান দিকে একটা অবয়ব দেখা যাচ্ছে । একটা মেয়ে !

আমি এবার সত্যিই অবাক হয়ে গেলাম । এই এলাকাটা এখনও বেশ সেকেলেই রয়ে গেছে । দিনের বেলাতেও এখানে মেয়েরা একা একা খুব একটা বাড়ির বাইরে বের হয় না । আর রাতের বেলা একা একটা মেয়ে এতো দূরে এসে হাজির হয়েছে, এটা ভাবতে সত্যিই একটু অবাক লাগলো । এতো দূরে বলছি কারন তৃষাদের এই বাড়িটা গ্রামের একেবারেই শেষ মাথায় । তৃষাদের এই বাড়ি ছাড়িয়ে আরও বেশ কিছুটা পথ ভেতরে গেলে তারপর গ্রাম শুরু হয় ।

আমি মেয়েটির দিকে তাকিয়ে বললাম,

-এতো রাতে কি চাই ?

-আপু আছে ?

মেয়েটার কন্ঠস্বর এতোই মৃদু যে আমি প্রথমে ঠিক মত শুনতেই পেলাম না । তবে আমার বুঝতে কষ্ট হল না যে মেয়েটা তৃষাকেই খুঁজতে এসেছে । এই গ্রামে মানুষজন তৃষার কাছেই আসে কেবল । এখানে আমার কোন কাজ নেই । আমি কেবল তৃষার সাথে আসি ।

আমি বললাম,

-ও তো ঘুমুচ্ছে ! আসলে সারাদিন ঘরে রোগী দেখেছে । ও একটু ক্লান্ত …

আমি পেছনে তাকিয়ে দেখি তৃষা হাতে মোবাইলের ফ্ল্যাশ নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে,

-কে, অপু ?

আমি বললাম,

-একজন তোমার সাথে দেখা করতে এসেছে !

-এতো রাতে ?

-হুম !

-আর ঘর অন্ধকার কেন ?

-কারেন্ট চলে গেছে !

-অপু !!

যদিও ওর চোখটা আমি ভাল করে দেখতে পাচ্ছি না কিন্তু ঠিকই জানি যে ও চোখ গরম করে আমার দিকে তাকিয়ে আছে । কারেন্ট চলে গেছে এই কথাটা ও একদমই পছন্দ করে না । ওর কথা হচ্ছে, হয় বলতে হবে বিদ্যুৎ চলে গেছে নয়তো ইলেক্ট্রিসিটি চলে গেছে । কারেন্ট শব্দটা বলা যাবে না । এটা একটা ভুল শব্দ।

আমি আবার সঠিক ভাবে বললাম,

-বিদ্যুৎ চলে গেছে ।

-জেনারেটর !

আরে তাই তো। বিদ্যুৎ চলে যাওয়াটা এখানে খুবই স্বাভাবিক একটা ব্যাপার । তাই এখানে জেনারেটরের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে । বিদ্যুৎ চলে যাওয়ার সাথে সাথেই সেটা অটোমেটিকভাবে চালু হয়ে যায় কিন্তু এখনও সেটা চালু হয় নি ।

তৃষা আরও কাছে চলে এল । আমার পাশে দাঁঁড়িয়েই মেয়েটার দিকে তাকিয়ে রইলো । তারপর বলল,

-আমাকে দরকার ?

মেয়েটা আবারও মৃদু স্বরে বলল,

-জি !

তৃষা বলল,

-বল !

মেয়েটা কিছু বলতে গিয়েও বলল না । যেন কিছু একটা ওকে বলতে বাধাগ্রস্ত করছে । তৃষার বুঝতে কষ্ট হল না । সে আমার দিকে তাকিয়ে বলল,

-অপু একটা কাজ কর তো দেখি । দেখো তো জেনারেটরটা চালু হচ্ছে না কেন ? আমি ততক্ষণে বরং ওর সাথে কথা বলি!

আমি বুঝতে পারলাম কোন মেয়েলী সমস্যা । এই জন্যই হয়তো মেয়েটা এতো রাতে একা একা এসেছে বলতে । আমার সামনেও বলতে পারছে না । আমি বললাম,

-আচ্ছা, আমি দেখি কি সমস্যা !

আর কিছু না বলে তৃষার হাত থেকে মোবাইলটা নিয়ে দরজা দিয়ে বের হলাম । একবার পেছনে তাকিয়ে দেখলাম মেয়েটা দরজা দিয়ে ভেতরে ঢুকছে ।

জেনারেটর রুমটা বাসার ডান দিকে । এটা বাড়ির সীমানার একেবার কোনায় করা হয়েছে যাতে করে আওয়াজটা কম আসে । আমি জেনারেটর রুমে ঢুকে জেনারেটরটা একটু দেখার চেষ্টা করলাম । যদি কোন কারনে জেনারেটরটা অটোমেটিক ভাবে চালু না হয় তাহলে ম্যানুয়্যালভাবেও এটা চালু করার একটা সিস্টেম আছে । আমি সেটাই করতে চেষ্টা করলাম ।

একবার, দুবার, তিনবার চেষ্টা করেও কোন কাজ হল না ।

আরেকবার চেষ্টা করতে যাবো তখনই ঘরে আলো এসে পড়লো । খোলা দরজা দিয়ে তাকিয়ে দেখি উঠানে জ্বালানো আলোটা জ্বলে উঠেছে । তার মানে বিদ্যুৎ চলে এসেছে । যাক এখন আর জেনারেটর চালু করতে হবে না । আমি দরজা বন্ধ করে ঘরের দিকে রওনা দিবো ঠিক তখনই আমার চোখ গেল প্রধান গেটটার কাছে । সাথে সাথেই একটা চিন্তা আমার মাথায় ধাক্কা মারলো জোরে । এতো সময় চিন্তাটা আমার মাথায় কেন আসে নি সেটাই আমি বুঝতে পারছি না ।

আমি ঘরের দিকে দৌড় দিলাম । গিয়ে দেখি তৃষা খাটের উপর বসে আছে চুপ করে । কি যেন ভাবছে !

আমাকে দৌড়ে আসতে দেখে বলল,

-কি ব্যাপার ? এভাবে দৌড়াচ্ছো কেন ?

-ঐ মেয়েটা কোথায় ?

-চলে গেল ।

-কখন ?

-এই তো একটু আগেই ।

-তুমি ঠিক আছো তো ?

তৃষা আমার দিকে কেমন চোখে যেন তাকালো । তারপর বলল,

-তোমার কি হয়েছে বলবা একটু ? এমন কেন করছো ?

আমি তৃষার দিকে কিছু সময় চুপ করে তাকিয়ে থেকে বললাম,

-আব্দুলের ঘরের দরজা বন্ধ । আর গেটেও তালা দেওয়া । মেয়েটা কিভাবে বাড়ির ভেতরে ঢুকলো ? তারপর মেয়েটা আসার সাথে সাথে কারেন্ট মানে বিদ্যুৎ চলে গেল !

তৃষা আমার কথা শুনে যেন পাত্তাই দিল না । বলল,

-তার মানে তুমি বলতে চাও আমি একটা ভুতের সাথে বসে বসে গল্প করেছি এতো সময় ? ও সরি, ভুত না । পেত্নী । তাই না ?

আমি আমতা আমতা করে বললাম,

-আমি তা বলছি না ।

-শুনো আমাদের বাড়ির দেওয়াল এমনিতে খুব বেশি উচু না । যে কেউ চাইলেই টপকাতে পারে । ভুত এফ এম শুনে শুনে তোমার মাথা খারাপ হয়ে গেছে ।

আমি বললাম,

-কিন্তু ….

-আচ্ছা বাদ দাও । চল ঘুমুবে !

-মেয়েটা কি বলল ?

তৃষা বলল,

-মেয়েটাও তোমার মতই কথা বলে চলে গেল ।

-মানে ?

তৃষা কিছুটা সময় চুপ করে রইলো । তারপর বলল,

-তুমি তো জানোই গ্রামে একটা অদ্ভুত রোগ দেখা দিয়েছে । মানুষগুলো হঠাৎ করেই রক্ত শূন্যতায় ভোগা শুরু করেছে । কিছুতেই কিছু বুঝতে পারছি না । একবার মনে হচ্ছে জন্ডিস, আরেকবার মনে হচ্ছে থ্যালাসেমিয়া । লিউকোমিয়া হতে পারে কিন্তু মানুষগুলো একেবারে চোখের পলকে মারা যাচ্ছে । দিব্যি সুস্থ মানুষ কিন্তু সাত দিনের ভেতরে শরীর একেবারে ফ্যাকাশে হয়ে যাচ্ছে । মনে হচ্ছে কেউ তার শরীর থেকে সব রক্ত বের করে নিচ্ছে ।

আমি তৃষার দিকে তাকিয়ে রইলাম । তৃষা যেন আর কিছু খুঁঁজে পাচ্ছে না কিংবা যে কথাটা বলতে চাচ্ছে সেটা বলতে গিয়ে খানিকটা দ্বিধাবোধ করছে । তারপর বলল,

-এখানকার মানুষ মনে করে এমনটা হচ্ছে ভুতের কারনে ! এমন একটা ভুত যে মানুষের রক্ত খায় !

আমি জানি এখানকার মানুষ এমন অনেক কিছুই বিশ্বাস করে । সন্ধ্যা হতে না হতেই সবাই যে ঘরের দরজা জানালা বন্ধ করে ঘুমিয়ে পড়ে, এটাও তার পেছনে একটা কারন ।

এলাকাটা শহর থেকে অনেক ভেতরে । লোকগুলো একটু বেশি সহজ সরল । নিত্য প্রয়োজনীয় অনেক কিছুই এখানে নেই । কাছের সরকারি হাসপাতালখানাও প্রায় ২০/২২ কিলোমিটার দূরে । আমরা যখন এখানে আসতাম তখনই তৃষার ইচ্ছে ছিল যে ডাক্তারী শেষ করে অন্তত মাসে কিংবা সপ্তাহে একটা দিন এখানে এসে রোগী দেখবে । এখন এই কাজটাই নিয়মিত করে ও । প্রথম প্রথম মাসে একবার আসলেও এখন সে মাসে দুইবার এখানে আসে । আমিও আসি ওর সাথে। বাসার এক পাশে আলাদাভাবে ওর জন্য একটা চেম্বার খোলা হয়েছে । সেখানে ছোট খাটো একটা হাসপাতালই তৈরি করে নিয়েছে । কয়েক মাসের মধ্যেই তৃষা পুরো গ্রামের মধ্যে প্রিয় মুখ হয়ে উঠেছে । সবাই ওকে আপু বলে ডাকে ।

আমি তৃৃষার দিকে তাকিয়ে বললাম,

-মেয়েটা আমাকে কি বলল জানো ?

-কি ?

-মেয়েটা বলল এই যে রক্ত শূন্যতা দেখা দিয়ে মানুষ মারা যাচ্ছে, এটা হচ্ছে এনা গোমেজের জন্য ।

-এনা গোমেজ ! মানে ঐ খ্রিষ্টান ফ্যামিলি !

-হুম !

আমি এই গল্পটা অনেক আগে থেকেই জানি ।

তৃষার বাবার মুখে শুনেছিলাম । রিচার্ড গোমেজ তার ফ্যামিলি নিয়ে থাকতো এই গ্রামেই । গ্রামের ঠিক উল্টো দিকে ওদের বাসা ছিল । একদিন হাটতে হাটতে আমি আর তৃষা চলে গিয়েছিলাম ঐদিকে । বাড়িটা অনেকটাই ভেঙ্গে পড়ে । পুরোটার সীমানা জুড়ে জংলাতে ভরে গেছে । এখন আর কিছুই নেই সেই আগের মত । তবে একটা সময়ে এখানে অনেক কিছুই ছিল । তৃষার বাবা বলেছিলো যে এই এলাকার সব কিছুই নাকি আগে এই গোমেজ পরিবারের ছিল । ব্রিটিশ আমল থেকেই গোমেজ ফ্যামিলির মানুষের বাস এখানে । তারপর আস্তে আস্তে জমিদারি পড়ে এসেছে । ক’বছর আগে গোমজ পরিবার এই এলাকা ছেড়ে চলে গেছে । তবে এখনও যখন তাদের পরিবারের কেউ মারা যায়, তাকে কবর দিতে তারা এখানেই আসে । ওদের জমিদার বাড়ির পাশেই একটা সিমেন্ট্রি আছে । খ্রিস্টানদের কবর খানাটা অনেক দিন থেকেই ওখানে আছে । এই রকম কবরখানার জন্যই ওদিকে মানুষজন ঠিক যায় না । ভয় পায় যেতে । আমি আর তৃষা হাটতে হাটতে ওখানেই চলে গিয়েছিলাম ।

এই গ্রামের মানুষ এই গোমেজ পরিবারের ব্যাপারে কথা বলতে ভয় পেত । তারা এই ফ্যামিলির ধারে কাছে যেত না । ওরাও আসতো না । তবে গ্রামের মানুষের ধারনা ছিল যে এই পরিবারের মানুষজন স্বাভাবিক ভাবে বুড়ো হয় না । তারা স্বাভাবিক মানুষের থেকেও অনেক বেশি দিন বাঁচে । গ্রামের লোকেরা বিশ্বাস করতো যে তারা নাকি মানুষের রক্ত খেয়ে বেঁচে থাকে । যদিও কেউ তাদের এরকম কোন কাজ করতে দেখে নি ।

তৃষা বলল,

-মেয়েটা বলল যে মাস ছয়েক আগে এনা গোমেজ মারা গিয়েছে । তাকে এখানে এনে ঐ কবরখানাতেই কবর দেওয়া হয়েছে । এবং তারপর থেকেই নাকি এই ঝামেলাটা শুরু হয়েছে। ঝামেলা মানে এই ফ্যাকাশে রক্ত শূন্যতার রোগটা শুরু হয়েছে তারপর থেকেই ।

আমি কি বলবো ঠিক বুঝতে পারলাম না । তৃষা বলল,

-তারপর সে কি বলল জানো ?

-কি বলেছে ?

-বলেছে যে গোমেজদের ঐ সিমেট্রিতে গিয়ে এনার লাশ যে কফিনে আছে সেটা খুঁঁজে বের করতে । এবং সেই লাশের হৃদপিন্ডটা তুলে তুলে এনে পুড়িয়ে ফেলতে । তাহলেই নাকি এই রোগটা দূর হবে !

তৃষা তারপর বলল,

-মানে তুমি বুঝতে পারছো এদের চিন্তা ভাবনা কোথায় গেছে ?

-বোঝার চেষ্টা করছি । তারপর কি বললে তুমি ?

-তা ওরা যখন জানেই যে ঐ এনা গোমজই যা করার করছে, তাহলে কাজটা ওরা নিজেরা করছে না কেন, এই প্রশ্নও আমি মেয়েটাকে করেছিলাম । মেয়েটা বলল যে গ্রামের লোকজনের এ সাহস হবে না । তাই সে আমার কাছে এসেছে ।

তৃষা একটা তাচ্ছিল্যের ভাব করে উঠে দাঁঁড়ালো । আমাদের কাল সকালেই আবার ফিরে যেতে হবে ঢাকাতে । তাই আজকে সকাল সকাল ঘুমিয়ে পড়া দরকার । আমিও ওর পেছন পেছন উঠে দাঁঁড়ালাম । তবে মনের মাঝে সেই একটা খটকা লেগেই রইলো । বাড়ির সব গেট বন্ধই থাকে সব সময় । একটা ছেলে হলেও আমি তৃষার যুক্তিটা ঠিক মত বিশ্বাস করে নিতাম, কিন্তু একটা মেয়ের পক্ষে এভাবে দেওয়াল টপকে আসাটা আমার কাছে ঠিক স্বাভাবিক মনে হল না । তবে এখন আর কিছু বললাম না । শোবার ঘরের দিকে পা বাড়ালাম ।

পরদিন সকালেই আমরা ফিরে গেলাম ঢাকাতে । দুই সপ্তাহ পরে আবার যখন ফিরে এলাম তখন আমাদের জন্য আরেকটা বড় ধাক্কা অপেক্ষা করছিলো । আমাদের কেয়ারটেকার আব্দুলের মেয়েটা অসুস্থ হয়ে পড়লো । সেই ফ্যাকাশে হওয়ার রোগ । তৃষা আর আমি মিলে ওকে সদর হাসপাতালে নিয়ে গেলাম । আব্দুলের অবস্থা পাগলপ্রায় । তৃষার পা ধরে হাউমাউ করে কান্না করছে । যে কোন ভাবে তার মেয়েকে ঠিক করে দিতে বলছে । আব্দুলের মেয়েকে হাসপাতাল থেকেই ঢাকাতে পাঠানো হল । কিন্তু আমার কেন জানি মনে হল ওখানে নিয়ে গিয়ে কোন লাভ হবে না । যখন বাসায় ফিরে এলাম তখন সন্ধ্যা হয়ে গেছে ।

আমার মাথায় কেবল সেদিনের সেই কথাটাই ঘুরতে লাগলো । হঠাৎ কি মনে হল আমি জানি না, আমি ঠিক করে ফেললাম আমাকে কি করতে হবে । আমি সরাসরি তৃষার কাছে গিয়ে বললাম,

-আমি সিমেট্রিতে যাচ্ছি !

তৃষাকে কেন জানি আমি চমকাতে দেখলাম না । ও যেন জানতোই যে আমি ঠিক এই কথাটাই বলবো ! আমার চোখের দিকে তাকিয়ে থেকে বলল,

-তুমি ছেলে মানুষই রয়ে গেলে !!

-থাকি ! তবুও কাজটা করতেই হবে !

-তার মানে এখন তুমি কবব খুঁঁড়বে ?

-দরকার হলে তাই !

তৃষা আরও কিছু সময় আমার দিকে তাকিয়ে থেকে বলল,

-ওয়েল তোমার জন্য সুসংবাদ । কবর খোঁঁড়া লাগবে না ।

-মানে ?

-মানে হচ্ছে এনা গোমেজদের কফিনটা কবরের ভেতরে নেই ।

-তাহলে কোথায় আছে ?

তৃষা ওর ওয়াল আলমারি থেকে একটা কালো রংয়ের শার্ট বের করে বিছানার উপর রাখলো । তারপর একটা কালো জিন্স বের করলো । আমার এবার সত্যি সত্যিই মনে হল যে ও আসলেই জানতো যে আমি এই কাজটা করতে যাচ্ছি । অবশ্য আমার মন মানসিকতা ওর থেকে ভাল করে আর কেউ বোঝে না । তৃষা পোষাক বদলাতে বদলাতে বলল,

-আগে পারিবারের সব সদস্যদের কাছাকাছি রাখার জন্য সমাধি কক্ষ বানানো হত । সিমেট্রির পাশেই থাকতো এমন সমাধিকক্ষ । দেওয়ালের ভেতরে ফাঁকা স্থানে কফিন ঢুকিয়ে দেওয়া হত । তারপর দরজাটাকে সিল করে দেওয়া হত ।

আমি বললাম

-গোমেজদের এরকম একটা সমাধিকক্ষ -গোমেজদের এরকম একটা সমাধিকক্ষ আছে ?

-হুম ! ছয় মাস আগে ওটা শেষ বারের মত খোলা হয়েছিলো । এনা গোমেজকে সমাহিত করার জন্য ।

দুই

ঘন্টা খানেক পরেই আমরা রওনা দিয়ে দিলাম । তবে আমরা কেবল একা নই, আমাদের সাথে আরও দুইজন ছিল । তাদের একজন আব্দুল । অন্য জন গ্রামের একজন জোয়ান ছেলে । গ্রামে তৃষার একটা জনপ্রিয়তা রয়েছে । তারপরেও যখন আসল কথাটা ওরা দুজন জানতে পারলো, তখন কেউই ঠিক মত যেতে চাইলো না । তৃষা তখন বলল যে এটা আমরা করছি ওদের ভালোর জন্যই । আর বলল যে ওদের কিছুই করা লাগবে না । যা করার আমরা দুজনে মিলেই করবো । ওরা কেবল আমাদেরকে দরজা ভাঙ্গতে সাহায্য করবে । সমাধিকক্ষে যে ওরা ঢুকবে না সেটা আমরা আগে থেকেই জানতাম ।

যখন আমরা সিমেট্রিতে এসে থেমেছি তখন বেশ খানিকটা রাত হয়ে গেছে । চারিদিকে সুনশান নিরবতা । আমরা চারজন টর্চ লাইটের আলো নিয়ে এগিয়ে চলছি ।

চারিদিকের পরিবেশটা এমনই যে মনের ভেতরে ভয়ের অনুভুতি আসতে বাধ্য। আমার মনেও তেমন কিছুই হচ্ছে। তৃষা আমার হাত ধরেই আছে। আমরা সিমেট্রির ভেতরে ঢুকে পড়লাম। এখানে কোন পাহারাদার নেই। অনেক দিনের পরিচর্যার অভাবে চারিদিকে বড় বড় ঘাস জন্মেছে৷ তবুও সিমেন্টের রাস্তাটা এখনও খানিকটা দেখা যাচ্ছে টর্চের আলোতে ৷ আমরা সেই রাস্তা ধরেই এগিয়ে চললাম। চারিপাশে টর্চ মেরে দেখতে লাগলাম। এপিটাফের ফলকগুলো দেখা যাচ্ছে। কত মানুষ এখানে শুয়ে আছে।

আমরা চারজন অনেকটা সময় ধরে হাটতে লাগলাম। কবর খানাতে প্রবেশের সময়ও আমরা একে অন্যের সাথে কথা বলছিলাম, তবে প্রবেশের পর আর কারো মুখে কোন কথা নেই। তৃষা তো আসার আগে বারবার বলছিল যে এখানে আসার কোন মানে নেই। তবুও আমার মনের শান্তির জন্য নাকি আসছে। সেই তৃষাও একদম চুপ হয়ে গিয়েছে৷ আমাদের কেবল মনে হল আমরা অন্য কোন পৃথিবীতে চলে এসেছি। এখানে কেবল একটানা ঝিঝি পোকার ডাক ছাড়া আর কিছুই নেই।

একেবারে শেষ মাথায় চলে এলাম আমরা। সেখানেই দেখতে পেলাম সমাধিকক্ষের দরজাটা। একটা বড় তালা ঝুলছে। আমার ইশারা পেতেই আমাদের সাথে আসা লোকদুটো কাজে নেমে গেল। হাতুড়ি আর বাটালি নিয়ে তালা ভাঙ্গতে শুরু করলো।

যখন তালা ভাঙ্গা শেষ হল, আব্দুল বলল,

-আমি আইতাম ?

তৃষা ওদেরকে অভয় দিয়ে বলল,

-তোমাদের নিচে যেতে হবে না। এখানে বসে থাকো চুপ করে।

তারপর আমার দিকে তাকিয়ে বলল,

-চল যাওয়া যাক। আমি জানি এখানে আসার কোন ফল হবে না। খামোখা সময় নষ্ট।

আমি কথা বাড়ালাম না। টেনে দরজা খুলতেই একটা বিশ্রি গন্ধ এসে নাকে নাগলো। এরকম বিদঘুটে গন্ধ আমি এর আগে কোনদিন অনুভব করেছি বলে মনে হয় না৷ তৃষাকে সেই তুলনাতে অনেক স্বাভাবিক মনে হল। আমার দিকে তাকিয়ে তৃষা বলল,

-বদ্ধ ঘর আর পঁচা লাশের গন্ধ। আমাদের মেডিকেলে এসব গন্ধ শুকে অভ্যাস আছে৷ এখানে কিছু সময় অপেক্ষা কর। ভেতরের গন্ধটা বেরিয়ে যাক।

আরও কিছু সময় পরে গন্ধ কিছুটা সহনীয় হয়ে এল। আমরা দুজনেই মুখে এয়ার ডাস্ট মাস্ক পরে নিলাম। এতে ভেতরের ধূলা বালি কিছু নাকে লাগবে না। তার উপর এই দুর্গন্ধও কিছুটা কম লাগবে। দরজা দিয়ে ভেতরে ঢুকলাম। সাথে সাথেই ভেতরের আরেকটা বদ্ধ আবহাওয়া আমাদের দুজনকেই স্পর্শ করলো। সত্যিই আমাদের মনে হল আমরা কোন মৃত্যুপুরিতে প্রবেশ করেছি।

দরজা দিয়ে কিছুদূর হেটে গেলাম দুজনে। সরু একটা প্যাসেজ৷ তারপরেই সিঁঁড়ি নিচে নেমে গেছে। আমরা সিঁঁড়ি দিয়ে নিচে নেমে এলাম। সিঁড়ির মুখটা একটা বড় চারকোনা ঘরে এসে থেমেছে। টর্চের আলোতে পুরো ঘরটা একবার ভাল করে দেখলাম। বেশ বড় ঘর। দেওয়ালে চারকোনা ফোকড় সৃষ্টি করা আছে। তার ভেতরে কফিন ঢোকানো। গুণে দেখলাম চারটা দেওয়ালে মোট ১৫ টা চারকোনা ফোকড় রয়েছে। এর ভেতরে ১১ টা ফোকড়ে কফিন রয়েছে। আর দুইটা এখনও ফাঁকা।

তৃষা বলল,

-এখন কি সব কফিনই নামিয়ে দেখতে হবে নাকি?

-আরে না। নিশ্চয়ই কফিনের গায়ে নাম তারিখ কিছু লেখা আছে৷

আমি বাঁ দিকের দুটো ফাঁকা ফোকড়ের দিকে নির্দেশ করে বললাম,

-যেহেতু ঐ দিকে ফাঁকা রয়েছে, আমার মনে হয় ডান দিক থেকে ফোঁকরগুলো ভর্তি করতে করতে এসেছে। বাঁ দিকের শেষটাই হবে সম্ভবত।

তৃষাকে দেখলাম ডান দিকের দেওয়ালে গিয়ে হাজির হল। তারপর আলো ফেলে কিছু একটা দেখার চেষ্টা করলো। তারপর আরেকটা কফিনের দিকে গেল। বলল,

-হ্যা, তোমার ধারনাই ঠিক। ডান দিকের এই কফিনটা ১৭৭৮ সালে সমাহিত। মেরি গোমেজের। এরপরেরটা ১৮০৪ সালে, জোসেফ গোমেজের।

এরপর আমরা দুজনেই বাঁ দিকের শেষ কফিনের ফোকড়েরর কাছে গেলাম।

এনা গোমেজ, মৃত্যু ২০১৮।

তৃষা খানিকটা চিন্তা করে বলল,

-একটা ব্যাপার কি লক্ষ্য করেছ?

-কি?

-১৭৭৮ সাল থেকে ২০১৮। এই প্রায় আড়াইশ বছরে গোমেজদের মাত্র ১১ জন মারা গেছে। এক জেনারেশন থেকে আরেক জেনারেশনের বয়সের পার্থক্য মোটামুটিভাবে ৩০ বছর, সেই হিসাবে আড়াইশ বছরে আট জেনারেশন হওয়ার কথা। প্রত্যেকের যদি মাত্র একজন ছেলে হয়, সেই হিসাব অন্তত ১৬ জন মারা যাওয়ার কথা৷ কিন্তু এখানে মাত্র ১১টা৷

আমি তৃষার দিকে তাকিয়ে বললাম,

-তার মানে তুমি বলতে চাও লোকজন যা বলে তা আসলেই সত্য। ওরা অনেকদিন বেঁচে থাকতো৷

-জানি না। অবাক করা ব্যাপার দেখো, কারোর কফিনেই জন্ম সালটা ঠিক মত লেখা নেই। কেবল মৃত্যুর সময়টা লেখা।

আমি তাই দেখলাম। কবর ফলকে জন্ম মৃত্যুর দুটো তারিখই লেখা থাকে, কিন্তু এখানে নেই। তাহলে কি ওরা জন্ম সালটা কাউকে জানতে দিতে চায় না?

আমি বললাম,

-আসো কফিন নামানো যাক। দেখি ভেতরে কি আছে।

তৃষা আবার আমার দিকে তাকিয়ে বলল,

-আরেকবার ভেবে দেখ। কাজটা কি ভাল হচ্ছে ? মানে এরকম মৃত একটা মানুষের কফিন খোলা কি ঠিক হবে?

-দেখ, এখন এসব ভেবে লাভ নেই৷ ঐদিনের ঐ মেয়েটার ওভাবে আসাটা আমার কাছে সত্যিই স্বাভাবিক মনে হয় নি। আর এতোদুর এসে কিছু না দেখে গেলে আফসোস থেকে যাবে। আমি আফসোস করতে রাজি নই। দেখি একটু সাহায্য কর তো।

আমি কফিনের সামনের ধুলো বালি পরিস্কার করলাম৷ এমন ধুলোর আস্তরণ দেখেই মনে হচ্ছে সমাহিত হওয়ার পরে ডালাটা আর কেউ খোলে নি৷ আমি আস্তে আস্তে কফিনটা টানতে লাগলাম। তৃষাও আমার সাথে হাত লাগালো। একটু ভারি হলেও দুজন মিলে নিচে নামাতে আমাদের খুব একটা কষ্ট হল না। এবার কফিনের ডালা খোলার পালা।

আমি তৃষার দিকে তাকিয়ে বললাম,

-তুমি তৈরি?

তৃষা আমার দিকে তাকিয়ে বলল,

-আমার এসব দেখে অভ্যাস আছে৷ তুমি প্রস্তুত তো?

আমি নিজে প্রস্তুত কি না আমি নিজেই বলতে পারবো না। তবে এখন আর পেছনে ফেরার উপায় নেই। কাজটা শেষ করতেই হবে। মনে মনে উপরওয়ালার নাম নিয়ে আমি কফিনের ডালাটা খুলে ফেললাম।

তৃষা সেদিকে আলো ফেলেই রেখেছিল। আলো পড়তেই আমার বুকের ভেতর ধক করে উঠলো। তৃষা খানিকটা চিৎকার দিয়ে উঠলো ৷ আমি কেবল চোখ বড় বড় করে তাকিয়ে রইলাম কফিনে শুয়ে থাকা এনা গোমেজের দিকে। আমার কিছুতেই বিশ্বাস হচ্ছিলো না। এটা কি সম্ভব?

আমি তৃষাকে বললাম,

-আমি যা দেখছি৷ তুমিও কি তাই দেখছো?

তৃষার বিস্ময় তখনও কাটে নি। সে একভাবে কফিনের ভেতরে শোয়া এনাকে দেখেই চলেছে।

এনা গোমেজ ছয় মাস আগে মারা গেছে। সেই হিসাবে ওর লাশটা একেবারে পঁচে গলে নষ্ট হয়ে যাওয়ার কথা ছিল কিন্তু সেরকম কিছুই হয় নি। বরং কফিনে একেবারে তাজা একজন মানুষের লাশ রয়েছে। দেখে মনে হচ্ছে মেয়েটা এই একটু আগেই মারা গেছে। এখনও শরীরটা টাটকা রয়েছে। এটা কিভাবে সম্ভব?

আমি নিজের চোখে না দেখলে হয়তো সত্যিই বিশ্বাস করতে পারতাম না। তৃষা যেমনভাবে এনা গোমেজের দিকে তাকিয়ে আছে তাতে বুঝতে কষ্ট হচ্ছে না যে শকটা সেও কাটিয়ে উঠতে পারছে না। চোখের সামনে যা দেখছে তার কোন ব্যাখ্যা তার নিজের কাছেও নেই ।

আমি বললাম,

-তৃষা!

-হুম।

-এবার দেখলে তো ! আসো, আসল কাজটা করা যাক৷

এই বলে আমি ওর দিকে সার্জারি নাইফটা এগিয়ে দিলাম। কাটাকুটিতে আমার বরাবরই সমস্যা৷ আর তৃষা যেহেতু ডাক্তার, সেহেতু ও ভাল জানে কোথায় কাটতে হবে।

আরেকটা বিস্ময় যেন আমাদের জন্য অপেক্ষা করছিল। তৃষা যখনই ওর মেডিক্যাল নাইফটা এনা গোমেজের হৃদপিণ্ড বরাবর চালালো, সেখান থেকে তাজা রক্ত বের হয়ে এল। আমার কেবলই বারবার মনে হতে লাগলো যে এখনই হয়তো এনা চিৎকার দিয়ে জেগে উঠবে। তবে তেমন কিছুই হল না।

তৃষা ওর দেহ থেকে হৃদপিণ্ডটা আলাদা করে ফেলল। তারপর একটা জারে সেটা আমরা রেখে দিলাম।

তারপর আবারও কফিনের ডালা আটকে সেটা যথাস্থানে তুলে রাখলাম৷ দুজনে পা বাড়ালাম বাইরের সিড়ির দিকে। যখনই সিড়ির মাঝ বরাবর এসেছি তখনই একটা শিরশিরে বাতাস অনুভব করলাম। বাতাসটা আসছে ভেতর থেকে। তারপরই চিকন কন্ঠে কেউ যেন হেসে উঠলো। আমরা দুজনেই চমকে গেলাম। জমে গেলাম সাথে সাথেই৷

কেউ যেন পেছন থেকে আমাদের দিকে এগিয়ে আসছে ধীরে ধীরে। মনে হচ্ছে, এখনই পেছন থেকে কেউ এসে আমাদের কাধ স্পর্শ করবে। তারপর আমরা যা নিয়ে এসেছি সেটা ফেরত চাইবে।

আমার মনে হল এখানে কোন ভাবেই বসে থাকা যাবে না। এখান থেকে বের হতেই হবে।

আমি তৃষার হাত ধরে জোরে একটা টান দিলাম। তারপর এক প্রকার টেনেই নিয়ে এলাম সিঁঁড়ির উপরে। সরু প্যাসেজ পেরিয়ে যখন বাইরে বের হয়ে এলাম তখন আমরা দুজনেই দরদর করে ঘামছি। আমাদের বেরিয়ে আসতে দেখেই গ্রামের ঐ দুইজন এগিয়ে দৌড়ে এল৷ ওদের সাথে নিয়েই দরজাটা বন্ধ করে দিলাম। নতুন তালাও মেরে দিলাম৷

তারপর ঐ সমাধিঘরের সামনেই কেরোসিন ঢেলে এনা গোমেজের হৃদপিণ্ডটা জ্বালিয়ে দিলাম৷ তীব্র একটা মাংস পঁচা গন্ধ ছড়িয়ে পড়লো চারিদিকে। তবে আমার কেন জানি এই মাংস পচা গন্ধে মনে হল যে খারাপ কোন আবহাওয়া কেটে গিয়েছে । আমার কেন জানি মনে হল এই গ্রামে যে সমস্যাটা চলছিলো সেটা শেষ হয়ে গিয়েছে । এমনটা মনে হওয়ার কোন কারন নেই, তবুও আমার মনে হল ।

পরিশিষ্টঃ

বাসায় এসেও তৃষা খানিকটা সময় গম্ভীর হয়ে বসে রইলো । বাথরুমে ঢুকে বেশ কিছুটা সময় দুজন শাওয়ার নিলাম । তারপর দুজনেই এসে বসলাম বারান্দায় । এখন অনেক রাত হয়ে গেছে । আজকে আর ঘুম আসবে না । বাকি রাতটা গল্প করে কাটিয়ে দেওয়া যাক । আর সিমেট্রির ব্যাপারটা এখনও আমার মাথায় ঠিক মত ঢুকছে না । এনা গোমেজের লাশটা এতো তাজা ছিল কিভাব ? এটা তো বলতে গেলে অসম্ভব !

আমি তৃষার দিকে তাকিয়ে বললাম,

-এটা কি হল বলতে পারো ? এনা গোমেজের লাশটা এতো তাজা ছিল কিভাবে ?

তৃষা বলল,

-আমি জানি না । তবে এই ঘটনাই কিন্তু প্রথম না ।

-মানে ?

তৃষা নিজের মোবাইল বের করে কিছু টেপাটেপি করলো কিছুটা সময় । এখানে নেটওয়ার্কের অবস্থা বেশ খারাপ । একটু সময় লাগলো । তবে একটা আর্টিকেল সামনে এল । তৃষা সেদিকে তাকিয়ে বলল,

-১৮৯২ সালে Exeter, Rhode Island এ এমন একটা ঘটনা ঘটেছিলো । মার্সি ব্রাউন নামে একজনকে কবর দেওয়ার দুই মাস পরে তোলা হয় । সেখানে অবাক হয়ে লক্ষ্য করা যায় যে মেয়েটার দেহ একদমই ডিকম্পোজ হয় নি । মনে হচ্ছিলো যেন মেয়েটাকে একটু আগেই কবর দেওয়া হয়েছে।

-এটা কি সম্ভব ?

-সম্ভব তো হয়েছে । হয়তো মার্সি ব্রাউনের কোন রোগ ছিল । তখন তো আর এতো উন্নত চিকিৎসা ছিল না, তাই কিছুই জানা যায় না । হয়তো এনা গোমেজেরও এমন কোন সমস্যা ছিল । হতে পারে না ?

আমি কোন কথা না বলে মাথা ঝাকালাম । তৃষা তখনও কিছু না বলে চুপ করে রইলো । সামনের অন্ধকারের দিকে তাকিয়ে রইলো । তারপর হঠাৎ তৃষা বলল,

-তোমাকে একটা ব্যাপার বলা হয় নি ।

-কি ?

-আমি এনা গোমেজের লাশ দেখে বেশ খানিকটা অবাক হয়েছিলাম । মেয়েটার লাশটা পঁচে নি এটা যেমন একটা কারন…. আরেকটা কারন ……

এই পর্যন্ত এসে তৃষা চুপ করে রইলো কিছুটা সময় ! আমি বললাম,

-আরেকটা কারন কি ?

-আরেকটা কারন হচ্ছে ঐদিন যে মেয়েটা আমার সাথে দেখা করতে এসেছিলো তার চেহারা কি তুমি দেখেছিলে ?

-নাহ । অন্ধকারের ভেতরে আমি দেখতে পারি নি ।

তৃষা আমার দিকে তাকিয়ে বলল,

-আমার হাতে মোবাইলের আলো ছিল । আমি দেখেছিলাম । মেয়েটার চেহারা একদমই ঐ কফিনে শুয়ে থাকা লাশটার মত ছিল !

আমি অবাক হয়ে তাকিয়ে রইলাম তৃষার দিকে । কি বলবো ঠিক বুঝতে পারছিলাম না । তারপর হঠাৎই আবারও সেদিনের মত বিদ্যুৎ চলে গেল । বেশ কিছু সময় অপেক্ষা করার পরেও জেনারেটর চালু হল না । তারপরই আমি দরজায় মৃদু আওয়াজ শুনতে পেলাম । কেউ যেন দরজা ধাক্কাচ্ছে !

অন্ধকারের মধ্যেই তৃষা আমার দিকে এগিয়ে এল । আমার হাতটা শক্ত করে ধরলো । আমাদের দুজনের চোখ দরজার দিকে ।

(সমাপ্ত)

(গল্পটির মুল থিম আমার নয় । সায়ক আমানের লেখা একটি গল্প অবলম্বনে এই গল্পটি লেখা হয়েছে)

How useful was this post?

Click on a star to rate it!

Average rating 4.5 / 5. Vote count: 13

No votes so far! Be the first to rate this post.

Related Posts

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *