ভাঙ্গা ও গড়ার গল্প

oputanvir
4.6
(35)

নোভা কোর্টের বারান্দার এক কোনে বসে রয়েছে বেশ কিছুটা সময় । ওদের কেস কোর্টে ওঠার কথা বারোটার সময় । এখন সবে মাত্র সাড়ে দশটা বাজে । সকালে জ্যাম থাকে এই রাস্তায় । তাই তারা আগে আগেই বের হয়েছিল বাসা থেকে । একটু বেশি আগে চলে এসেছে । ওদের সময় আসতে এখনও বেশ খানিকটা সময় বাকি। এখন এই বারান্দায় হাটাহাটি করা ছাড়া আর কোন কাজ নেই।
নোভা তার বাবা মা আর বোনের দিকে তাকাল । তারা এক কোনে দাঁড়িয়ে কথা বলছে ।
কী বিষয় নিয়ে কথা বলছে সেটা নোভা জানে । সেই ব্যাপার নিয়ে নোভার কথা বলতে ভাল লাগছে না। সে তার বাবা মা আর বোনের ব্যাপারটা এখনও ঠিক বুঝতে পারছে না । তার একটা সম্পর্ক নষ্ট হয়ে যাচ্ছে । আর তারা এখন এই নিয়ে চিন্তা করছে যে ডিভোর্সের পরে তারা আর কী করবে? কিভাবে তার প্রাক্তন স্বামী উপরে প্রতিশোধ নেওয়া যায় আর কী কী বাগিয়ে নেওয়া যায় !
প্রাক্তন স্বামী!
নোভা কথাটা আরেকবার ভাবল !
রাশেদ এখনও ওর স্বামীই আছে ! এখনও প্রাক্তন হয় নি । আজকের সই করার পরেই সে প্রাক্তন হয়ে যাবে !
কিভাবে স্বামী থেকে প্রাক্তন স্বামী হয়ে যাবে !
কথা ভাবতেই নোভার কেমন যেন লাগছে ! মনের ভেতরের একটা অংশ বারবার বলছে যেন এই কাজটা মোটেই ঠিক হচ্ছে না ! একটু চেষ্টা করলে ওদের সম্পর্কটা ঠিক হলেও হতে পারত ! একটু চেষ্টা করলে কী হত না?
রাশেদের কথা মনে আসতেই রাশেদকে দেখতে পেল সে । বারান্দা দিয়ে ওর দিকে হেটে আসছে। একেবারে ওর সামনে এসে থামল। নোভা দেখতে পেল ওর বাবাও রাশেদকে দেখতে পেয়েছে। সে একেবারে নোভার সামনে এসে দাড়াল ।
নোভার সাথে রাশেদকে কথা বলতে দেওয়ার কোন ইচ্ছে তার নেই । রাশেদকে থামতে হল । সে নোভার বাবার দিকে তাকিয়ে বলল, আমি নোভার সাথে একটু কথা বলতে চাই।
নোভার বাবা বেশ শক্ত ভাবেই বলল, ওর সাথে কীসের কথা?
রাশেদ এবার নোভার দিকে সরাসরি তাকিয়ে বলল, নোভা ! প্লিজ । অল্প কয়েকটা !
রাশেদ সব সময়ই নরম স্বরে কথা বলে । বেশি উত্তেজিত হতে দেখে নি কখন । আজকেও শান্ত কন্ঠেই সে নোভার দিকে তাকিয়ে আছে। নোভা ওর বাবার কাধে হাত দিল । তারপর বলল, বাবা, ঠিক আছে।
নোভা রাশেদেরর সাথে কোর্ট চট্টরে হাটতে লাগল । রাশেদ সামনে সামনে হাটছে। নোভা পেছন পেছন হাটছে। এক সময় নোভা ওদের নীল রংয়ের গাড়িটা দেখতে পেল। বিয়ের মাস খানেক পরেই রাশেদ গাড়িটা কিনেছিল । নোভাকে নিয়ে গিয়েছিল শোরুমে । নোভার পছন্দেই এই রঙয়ের গাড়িটা কেনা হয়েছিল। এই গাড়িতে করে ওরা কত দিন রাতে ঘুরতে গেছে।
রাদেশ বলল, গাড়ির ভেতরে বসি একটু !
নোভা কোন আপত্তি করল না। দুজন গিয়ে ঢুকল গাড়ির ভেতরে । নোভার মনটা আবার কেন জানি সিক্ত হয়ে উঠল । ওদের ভেতরে ঝামেলা শুরুর পর থেকে এই গাড়িতে সে এতোদিন আর ওঠে নি । আজকে আবার অনেক দিন পরে উঠল।
গাড়িতে ওঠার পরে রাশে একটা প্যাকেট তুলে দিল ওর দিকে ।
-কী এটা ?
-এটা কাবিনের টাকা !
-এটা দেওয়ার জন্য আমাকে ডাকলে?
রাশেদ বলল, উহু ! এটা তো দিতেই হবে । তাই দিলাম । ডেকেছি অন্য কারণে?
নোভা প্যাকেটটা নিল । তারপর সেটা গাড়ির সামনের রেখে দিল । তারপর আবারও তাকাল রাদেশের দিকে। রাশেদ ওর দিকে কেমন গভীর চোখে তাকিয়ে রয়েছে। তারপর বলল, আর হয়তো আমাদের এভাবে বসা হবে না । আজকের পরেই সব সম্পর্ক শেষ হয়ে যাবে!
নোভা খেয়াল করল রাশেদের কন্ঠে একটা বিষাদের ছায়া । রাশেদ তাহলে কষ্ট পাচ্ছে?
কিন্তু এই ডিভোর্সের প্রথম কথা তো রাশেদই বলেছিল। নোভা তো বলে নি !
তারপর নোভাকে অবাক করে দিয়েই রাশেদ নোভার হাত ধরল । উষ্ণ স্পর্শ নোভার হাত থেকে পুরো শরীরে ছড়িয়ে পরল মুহুর্তেই । নোভা নিজেই অবাক হয়ে গেল ! রাশেদের উপর তার নিজের অনুভূতি এখনও এতো তীব্র সে ভাবতে পারে নি ।
কত সময় ওরা ওভাবেই বসে রইল হাত ধরে । এক সময়ে নোভা খানিকটা অভিমানের স্বরে বলল, এখন এতো প্রেম দেখাচ্ছো কেন ? আলাদা হতে চেয়েছিলে তো তুমি নিজেই !
রাশেদ কিছু সময় নোভার দিকে তাকিয়ে থেকে বলল, আমি শান্তির জন্য বলেছিলাম । তুমি জানো আমি সব সময় শান্তি চাই।
-আচ্ছা তাহলে আমি তোমার অশান্তির কারণ? তাহলে তো ভালই । আমি তাহলে যাই !
এই বলে সে বের হতে চাইল তবে রাশেদ ওকে ছেড়ে দিল না । হাতটা একটু শক্ত করে ধরে রইল । রাশেদ বলল, যেও না প্লিজ ! আজকে অন্তত না । প্লিজ !
নোভা থামল । রাশেদ বলল, তোমার প্রতি আমার অভিযোগ ছিল যে তুমি তোমার বাবা মা আর বোনের কথা মত সংসারে অশান্তি করতে ! দেখ নোভা সব সংসারে অশান্তি হয় । সেটা নিজেদের ভেতরেই সমাধান করতে হয় । আমি সেটাই চেষ্টা করেছি সব সময় । কিন্তু তুমি তোমার বাবা মা আর বোনকে নিয়ে আসতে । সত্যি বলতে আমি তাদের কোন দিন পছন্দ করি নি । বিশেষ করে তোমার বড় বোনকে আমি দুই চোখে দেখতে পারি না । আজকে ওরা না থাকলে আমাদের এই পর্যন্ত আসতে হত না !
নোভা এই কথার প্রতিবাদ করতে গিয়েও করতে পারল না । কারণ রাশেদের এই অভিযোগ আসলেই মিথ্যা না । আজকে তার বাবা মা এবং বিশেষ করে বড়বোন শোভা যদি না আসতো ওদের সম্পর্কের ভেতরে তাহলে আজকে হয়তো এই পর্যন্ত ঘটনা আসত না ।
নোভার মনে আছে এই ঘটনার শুরুটা কবে ! সেদিন শোভার বিবাহ বার্ষিকী ছিল । নোভাদের দাওয়াত দিয়েছিল । নোভা বিয়ের পরে রাশের অনেক কিছুই বুঝতে পেরেছিল । এর ভেতরে একটা হচ্ছে রাশের সামাজিক অনুষ্ঠানে যেতে একদম পছন্দ করে না। মানুষের ভীড় ও একদম পছন্দ করে না। শোভার ঐ দাওয়াতে রাশেদ যায় নি। নোভা একাই গিয়েছিল। সেই অনুষ্ঠানে না যাওয়ার কারণে অশান্তির শুরু । ঐদিন শোভা নানান কথা শুনিয়েছিল নোভাকে । এবং এটা দিনকে দিন বাড়তেই থাকল । নোভা একটা ব্যাপার এখন খুব ভাল করে বুঝতে পারে যে তার বড়বোন এই আগুন নেভানোর বদলে সেটাতে ঘি ঢেলে চলেছিল ।
নোভার দৃষ্টি তখন হঠাৎ রাশেদের দিকে গেল । সে খানিকটা অবাক হয়ে দেখল রাশেদের চোখটা সিক্ত । নোভার মনের ভেতরে একটা তীব্র অনুভূতি হল। ছেলেটা ওকে হারিয়ে কাঁদছে !
সত্যিই কাঁদছে !
নোভার সেই অনুভূতিটা আবার ফিরে এল । কাজটা মোটেই ঠিক হচ্ছে না । যে কাজটা এখনও ঠিক হচ্ছে না ।
রাশেদের কাছ থেকে আলাদা হওয়া ঠিক হচ্ছে না। কিন্তু এখন তো অনেক দেরি হয়ে গেছে !
আসলে কি দেরি হয়ে গেছে?
নোভা বলল, চল তো একটু বিউটির লাচ্চি খাব!
রাশেদ বলল, কী !
-বললাম বিউটির লাচ্চি খাব । কাছেই তো না?
-হ্যা কাছেই । আমরা একবার একবার এসেছিলাম।
-চল । আবার সুযোগ আসবে না !
রাশেদের চোখের দিকে তাকিয়ে নোভার মনে হল সে যেনে একটু যেন অবাক হয়েছে । যে মেয়ের একটু পরে স্বামীর সাথে ডিভোর্স হবে সেই মেয়ে এখন লাচ্চি খেতে চাচ্ছে তাও আবার সেই স্বামীর সাথেই!
তবে রাশেদ মানা করল না। গাড়িটা সেদিকেই নিয়ে গেল !
বেশি সময় লাগল না । এর মাঝে নোভার ফোনে বেশ কয়েকবার ফোন এল তার বাবা আর মায়ের কাছ থেকে । নোভা একবারও ধরল না। রাশেদ এই ব্যাপারটা দেখল যে ফোন আসছে কিন্তু নোভা ধরছে না ।
-ফোন কেন ধরছো না?
-ভাল লাগছে না। আগে লাচ্চি খাই। তারপর !
লাচ্চি খাওয়ার পরে নোভা এবার রাশেদ বলল, চল যাওয়া যাক !
-তুমি দেখি আমাকে ছেড়ে দেওয়ার জন্য উতলা হয়ে আছ!
-আরে এটা কী বলছ?
-তাহলে যাওয়ার জন্য এতো উতলা হচ্ছো কেন?
-আচ্ছা ! যাব না তাহলে?
-না ।
-তোমার বাবা মা আর বোন কী ভাব্বে?
-যা ভাবার ভাবুক ! জীবন তো তাদের না । আমার !
-এই কথাটা আগে ভাবলে তো এসব হত না !
-হ্যা আমারই তো দোষ !
রাশেদ দ্রুত বলল, আচ্ছা যা হয়েছে ! এখন ওসব বাদ । আমি আর কখনই আগের কথা তুলব না । ঠিক আছে ? আজ থেকে আবার নতুন করে শুরু করি ?
নোভা যেন একটু শান্ত হল । তারপর বলল, এখন বাসায় যাওয়া যাবে না । চল অন্য কোথাও যাই ।
-কোথায় যাবে?
-চল গাজীপুরে যাই । মনে আছে একটা রিসোর্টে গিয়েছিলাম। ওখানে যাই ?
-চল !
গাড়িটা ছুটে চলে গাজীপুরের দিকে । ভেঙ্গে যাওয়া একটা সম্পর্ক আবারও নতুন ভাবে জোড়া লেগেছে । এটা এবার আর এতো সহজে ভেঙ্গে যাবে না ।

এই থিমে আরও একটা গল্প আগেও লিখেছিলাম । আজকে আবারও লিখতে ইচ্ছে হল ।

ফেসবুকের অর্গানিক রিচ কমে যাওয়ার কারনে অনেক পোস্ট সবার হোম পেইজে যাচ্ছে না। সরাসরি গল্পের লিংক পেতে আমার হোয়াটসএপ বা টেলিগ্রামে যুক্ত হতে পারেন। এছাড়া যাদের এসব নেই তারা ফেসবুক ব্রডকাস্ট চ্যানেলেও জয়েন হতে পারেন।

How useful was this post?

Click on a star to rate it!

Average rating 4.6 / 5. Vote count: 35

No votes so far! Be the first to rate this post.

About অপু তানভীর

আমি অতি ভাল একজন ছেলে।

View all posts by অপু তানভীর →