মিতুর সংসার

oputanvir
4.8
(66)

একটু বিরক্ত হয়েই বললাম, তুমি কেন ওকে বলতে গেছো যে আমার জ্বর এসেছে !
ওপাশ থেকে মা কিছু বলল না । আমি আবার বললাম, ও যে একা একা ঢাকার গাড়িতে উঠে পড়েছে, পথে যদি কিছু হয় ! আমি বারবার করে বললাম যে কিছু না বলতে তারপরেও কেন বলেছো !
মা বলল, আমি বলতে চাই নি । আমার মুখ দিয়ে বের হয়ে গেছে ।

আমার সত্যিই খুব বিরক্ত লাগছে । সবার উপরেই বিরক্ত লাগছে । এমনিতেই আমার জ্বর খুব একটা আসে না । বছরে একবার কী দুইবার আসে তবে এই বছর এটা নিয়ে তিনবার জ্বর এল । জ্বর এলে খেতে ভাল লাগে না, শরীর ব্যাথা করে আর সব থেকে বড় কথা ঢাকায় একা থাকার কারণে দেখা শোনার কেউ নেই । আমি অবশ্য সারা জীবনই একা একা থেকেছি । সব কাজ নিজেই করেছি । যে কোন কাজের জন্য অন্যের উপর নির্ভর করাটা আমার কাছে বিরক্তির একটা ব্যাপার । এমন কি সেটা নিজের বউয়ের উপরেও । এই কারণে আমি একটা দীর্ঘ সময় পর্যন্ত বিয়ে করি নি । যদিও বিয়ে না করার পেছনে আরো কারণ ছিল । তবে মিতুকে আমার বিয়ে করতে হয়েছে । আমার নিজের কারণে না । আমার পরিবারের কারণে ।

আমার বাবা যখন বলল যে তার ৪৭ লাখ টাকার ঋণ হয়েছে তখন আমি কেবল বিস্ময় নিয়ে তাকিয়ে রইলাম তার দিকে । আমার দিকে তাকিয়ে এমন স্বাভাবিক ভাবে কথাটা বলল যেন এটা খুবই স্বাভাবিক । কিন্তু তারপরে সে যা বলল তা শুনে আমার মাথায় আকাশ ভেঙ্গে বলল । সে জানালো যে আমাকে এই ঋণ শোধের জন্য আমাকে বিয়ে করতে হবে । এক লোক তার মেয়েকে আমার সাথে বিয়ে দিতে রাজি হয়েছে বিনিমনে সে বাবাকে ৪০ লাখ টাকা দিবে।

কপালে থাকলে বিয়ে করবো এমন একটা ভাবনা আমার মনে ছিল । কিন্তু কোন দিন আমি ভাবতেও পারি নি যে এই ভাবে টাকা নিয়ে বিয়ে করবো । তাও আবার চল্লিশ লাখ টাকা নিয়ে। তবে বাবার ছেলে হিসাবে এটাই নাকি আমার দায়িত্ব । আমাকে বিয়ে করতেই হবে।

আমার মাথায় এটা এলো না যে এতো টাকা দিয়ে কোন মেয়ের বাবা আমার সাথে নিজের মেয়েকে আমার সাথে কেন বিয়ে দিতে রাজি হবে ! আমি তো মোটেই প্রিন্স চার্মিং না । কোন মেয়ের মনের রাজাও না । চাকরি একটা করি তবে সেটা খুব আহামরিও না । খেয়ে পরে কোন মতে টিকে আছি । এমন একজন ছেলের পেছনে এতো টাকা কেন খরচ করবে কেউ !

অবশ্য পরদিনই সব খবরাখবর আমার কাছে এল । মা এই বিয়েতে রাজি ছিল না মোটেও । তবে এতো টাকার ঋণটা কাটানোর এর থেকে সহজ পথ আর নেই বলে মাও কিছু বলছে না । মেয়ের আগে এক স্থানে বিয়ে হয়েছিলো । এবং বিয়ের পরে সেখান থেকে ছাড়াছাড়ি হয়ে গেছে কোন কারণে । কী সে কারণ সেটা অবশ্য মা এখনও জানতে পারে নি । প্রাথমিক ভাবে জানা গেছে যে স্বামী নাকি তাকে অনেকটা মারই ধোর করতো । ওর বাবার কাছ থেকে বার বার টাকা নিয়ে আসতে বলতো । একবার নাকি মেরে মেয়েটার হাত ভেঙ্গে দিয়েছিল ।

আমার অবশ্য এসব ব্যাপারে খুব একটা আগ্রহ ছিল না । আগে বিয়ে হলেই বা কি আর না হলেই বা কি ! আমার আসলে তাতে কোন কিছুই যায় আসে না । আমি নিরস মুছে মিতুকে বিয়ে করে ফেললাম । অফিসের ছুটি ছিল না । শুক্রবার শনিবার মিলে বিয়ে হল । ঘরোয়া ভাবেই । ঠিক হল যে পরবর্তিতে সময় ছুটি পেলে আমি এসে অনুষ্ঠান করা যাবে । বিয়ের আগে আমার মিতুর সাথে দেখা হল না একবারও । বিয়ের সময় একবার তাকে দেখলাম । একটা নীল রংয়ের জামদানি পরে আছে । মাথা নিচু করে বসে রয়েছে । ঠিক আমার মতই । বিয়েতে আমার কেবল মনে হচ্ছে আমি টাকা নিয়ে বিয়ে করেছি । নিজেকে এতো ছোট লাগছে । অথচ এদিকে আমার পরিবারের এমন ভাবে চলছে যেন এটা খুবই স্বাভাবিক একটা ব্যাপার ।

পরের দিন আমি ঢাকা চলে আসি । তবে কেন জানি আমার মিতুর সেদিনের চেহারাটা ঠিকই চোখে লেগে থাকে । এই মেয়েটা আমার বিয়ে করা বউ হয়ে গেছে ব্যাপারটা ভাবতেই কেমন যেন ভাল লাগার একটা অনুভূতি কাজ করতে শুরু করে । তবে যতবারই আমি মিতুর কথা ভাবি তত বারই আমার মনে হয় যে ওর কাছ থেকে টানা নিয়ে আমি বিয়ে করেছি ।

তবে মিতুর সাথে তারপর থেকে প্রতিদিনই কথা হত । অফিস ছুটির পরে বাসা ফেরার পরে ও ফোন করতো আমাকে । টুকটা কথা আমাদের মাঝে হত । এভাবে মাস ছয় কেটে গেল । আমি অফিসের কয়েকটা প্রেজক্ট নিয়ে খুব বেশি ব্যস্ত থাকার কারণে বাসায় যাওয়ার সুযোগ হল না । সেই প্রজেক্টের একটা কাজে বৃষ্টির ভেতরে ছাতা মাথায় নিয়ে দেখাশোনা করতে গিয়ে জ্বর বাঁধালাম । এর আগেও আমি অনেকবারই বৃষ্টিতে ভিজেছি । জ্বর তো আসে নি । তাহলে এবার কেন আসলো কে জানে ।
আর সব থেকে বড় কথা মিতু প্রায় চলে এসেছে ঢাকায় । মেয়েটা এভাবে একা একা চলে আসবে আমি ভাবতেও পারি নি । অবশ্য এখন পদ্মা সেতুর কারণে ঢাকা আসাটা সহজ আর কম সময় লাগে । দিনে এসে আবার দিনে ফেরৎ চলে যাওয়া যায় !

মিতু আমার এলাকাতে এসে ফোন দিল । বলল সে ও কলেজটার সামনে চলে এসেছে । ওখানেই দাড়িয়ে আছে । আমাকে বাসার ঠিকানা বলতে বলল । আর বলল যে আমাকে নামতে হবে না । তবে আমি নেমে এলাম । বাসার গেট দিয়ে বের হতেই দেখতে পেলাম মিতুকে ।

মিতুকে দেখে একটু চমকেই গেলাম । মিতু একটা কালো রংয়ের জিন্স পরেছে । তার উপরে একটা সাদা কুর্তা । পায়ে একটা কালো স্নিকার্স । ওকে প্রথম যেদিন দেখেছিলাম সেদিন গ্রামের শান্ত স্নিগ্ধ মেয়ে মনে হয়েছিলো অথচ এখন ওকে শহরের মর্ডান মেয়েদের মত মনে হচ্ছে । ওর কাধে একটা কালো রংয়ের স্কুল ব্যাগ । আর হাতে একটা টিফিন ক্যারিয়ার । আমার সামনে এসে বলল, আপনাকে না বললাম যে নিচে না নামতে !
আমি হাসলাম । তারপর বলল, আরে আমি সব সময়ই নামি ! আর তুমি এমন করে কেন চলে এলে !
মিতু সে প্রশ্নের জবাব দিলো না । আমি আবার বললাম, এভাবে কেউ চলে আসে একা একা ? যদি রাস্তায় কিছু হয়ে যেত !
-আপনি এর আগেও একা একা অনেকবারই ঢাকা এসেছি ।
-তাই নাকি?
-হ্যা । এখন চলুন । আপনার দাড়িয়ে থাকতে কষ্ট হচ্ছে ।

সত্যিই আমার দাড়িয়ে থাকতে একটু কষ্টই হচ্ছে । মিতুর সাথেই উঠে এলাম উপরে । আমি বর্তমানে একটা ফ্যামিলির সাথে আলাদা একটা রুম নিয়ে থাকি । মিতুকে ঢুকতে দেখে ওরা একটু অবাক হল । বিশেষ করে আমি কখনই আমার ঘরে কোন গেস্ট নিয়ে আসি নি । মেয়ে তো আনা অনেক পরের ব্যাপার । যখন বললাম যে মিতু আমার বউ তখন ওরা যেন আকাশ থেকে পড়লো ।

আমার ঘরে ঢুকে মিতু চারিদিকে তাকিয়ে বলল, বাহ আপনি তো দেখি বেশ গোছালো ! এতো পরিস্কার হবে ভাবি নি ।
আমি হাসলাম । মিতু তখনই কাজে লেগে গেল । যতই গোছালো হোক মিতু চট করে আরেকবার ঘরটা পরিস্কার নিয়ে নিল । আমি খাটে শুয়ে পড়লাম । আমার দাড়িয়ে তঃাকতে ভাল লাগছিলো না !

এরপরের কয়েকটা দিন আমি সত্যি অনুভব করলাম যে মানুষের আদর আর যত্ন পাওয়াটা কতটা মধুর হতে পারে । এই অল্প সময়েই মিতুর প্রতি টানটা যেন বেড়ে গেল অনেক বেশি । তবে সেই অস্বস্তিটা আমার ঠিকই মনের ভেতরে রয়ে গেল । বারবারই কেবল মনে হতে লাগল যে মিতু ঠিকই জানে যে ওর বাবার কাছ থেকে টাকা নিয়ে আমি বিয়ে করেছি ওকে ।

আমার কেন জানি মনে হচ্ছিলো যে আমার শরীর যাতে দ্রুত ভাল না হয় । ভাল হলেই তো মিতুর আদর যত্ন পাওয়া বন্ধ হয়ে যাবে । তবে শরীর ভাল হয়ে গেল । আমি অফিস যাওয়ার জন্য প্রস্তুত হয়ে গেলাম । যদিও মিতু বলছিলো যে আরো কয়েকটা দিন বিশ্রাম নিয়ে আমি যেন অফিস যাই । তবে এর থেকে বেশি ছুটি কাটানোর উপায় ছিল না । অফিস যাওয়ার সময় বারবার করে বলে গেলাম যে কোন দরকারেই যেন আমাকে ফোন দেয় । এছাড়া ওর ফোনে নতুন করে ফুড পান্ডার এপ ডাউনলোড করে দিলাম । এমন দারোয়ানকেও বলে দিলাম যে যেকোন দরকারে যেন মিতুকে সাহায্য করে । মিতুর প্রতি এতো কেয়ার দেখে আমার নিজেরই অবাক লাগছিলো ।

অফিস থেকে ফিরে মিতুকে বললাম, সামনের শুক্রবার তোমাকে বাসায় দিয়ে আসি । এখন তো আমি সুস্থ হয়ে গেছি ।
দেখলাম মিতুর মুখটা কেমন যেন কালো হয়ে গেল । সে মাথা নিচু করে বলল, আমি থাকলে কি আপনার খুব সমস্যা হচ্ছে ? মা বলছিলেন যে আপনি একা থাকতে পছন্দ করেন ।
-আরে সেটার জন্য না । আমি সারা দিন অফিসে থাকি । আমি এই একটা ঘরের ভেতরে আটকা থাকো ।
-আমার সমস্যা হচ্ছে না ।

আমি মিতুর দিকে তাকিয়ে বললাম, তুমি থাকতে চাও?
মিতু মাথা নিচু করেই মাথা ঝাকালো । ঠিক তখনই আমার মনের ভেতরে একটা তীব্র অনুভূতি এসে ধাক্কা দিল । একজন আমার সাথে থাকার জন্য কী আকুল হয়েই না আমাকে অনুরোধ করছে । এই অনুভূতিটা আমার কাছে নতুন ছিল খুব ।

রাতের বেলা খাওয়া শেষ করে যখন শুলাম মিতু আমার পাশেই গুটিশুটি মেরে শুয়ে পড়লো । খাটটা খুব বেশি বড় না । তবে দুজনের শোয়ায় সমস্যা হয় না খুব একটা । মিতু আমার কাছে একটু এগিয়ে এসে বলল, আপনি সব সময় আমার কাছ থেকে এমন দুরে দুরে কেন থাকেন? আমি কি এতো খারাপ?
আমি কী বলবো প্রথমে ঠিক বুঝতে পারলাম না । কিছু সময় চুপ থেকে বললাম, তুমি খারাপ না । আমি আসলে তোমার অযোগ্য !
-কেন এই কথা কেন বলছেন?
-তুমি জানো না আমি কী করেছি?
-কী করেছেন?
-তোমার বাবার কাছ থেকে কত টাকা নেওয়া হয়েছে জানো না । জীবনে আমি এই কাজটা কোন দিন করবো ভাবতেই পারি নি । নিজেকে এতো ছোট লাগে তোমার কাছে !

কিছু সময় কেউ কোন কথা বললাম না আমরা । তারপরেই আমি অনুভব করলাম মিতু একেবারে আমার শরীরের উপরে উঠে এসেছে । আমার ওর নিঃশ্বাসের গরম বাতাস আমি অনুভব করতে পারছিলাম । মিতু বলল, আপনি আর কখনো এই কথাটা বলবেন না । কখনো না । যদি বলেন তাহলে আমি মরে যাবো !

কী তীব্র অভিমান আর ভালোবাসা মিতুর কন্ঠস্বর । এই ভালোবাসা উপেক্ষা করা পৃৃথিবীর কোন পুরুষের পক্ষে সম্ভব না । এতো তীব্র ভাবে একে অন্যকে ভালোবাসতে শুরু করলাম যে আমাদের কাছে অন্য সব কিছু তুচ্ছ হয়ে গেল ।

পরদিন অফিসে গিয়ে একটা সুসংবাদ পেলাম । স্বয়ং এমডি আমাকে তার রুমে ডেকে নিয়ে আমার প্রমোশন লেটার দিল । বলল, আপনি যে কষ্ট করেছেন গত কয়েক বছর আমার মনে হয় এটা কম করা হচ্ছে । শেষে জ্বর পর্যন্ত বাঁধয়ে ফেললেন এই কাজের জন্য ।
প্রমোশনের চিঠি নিয়ে নিজের ডেস্কে আসতেই কেন জানি মনে হল যে মিতু এসেছে বলেই যেন এটা হয়েছে । সত্যি মিতুর সাথে বিয়ের পরপরই আমার কাজের চাপ বেড়েছে অনেক গুণে । যে প্রোজেক্টে কাজের কারণে আমার প্রোমশন হল সেগুলো সব আমার হওয়ার কথা ছিল না । মনে মনে একটা সিদ্ধান্ত নিয়ে নিলাম।

অফিস থেকে একটু আগে আগে বের হলাম । কাজটা শেষ করে যখন বাসায় ফিরলাম তখন একটু রাত হয়ে গেছে । রুমে ঢুকে দেখি মিতু বই পড়ছে । আমার বেশ কিছু গল্পের বই আছে । আমার দিকে তাকিয়ে বলল, এতো দেরি হল ?
-একটু কাজ ছিল ।
-ও । কিছু খাবেন ।
-নাহ । আগে গোসল করে নিই ।

আমি গোসল করে ফিরে দেখলাম খাবার রেডি একদম । খেতে খেতেই বললাম, তোমাকে আর এখানে থাকতে হবে না ।
তাকিয়ে দেখি মিতুর মুখটা আবার কালো হয়ে গেছে । আমি বললাম, মন কেন করছো? এখানে থাকতে হবে না। তার মানে ঢাকা ছাড়তে বলছি না ।
-মানে?
-মানে হচ্ছে আজকে একটা বাসা দেখে এলাম । এই জন্যই আজকে একটু দেরি হল ! দুটো রুম । ড্রয়িং ডাইনিং । একটা বারান্দা । আমার অফিসের একদম কাছেই । দুপুরে প্রতি এসে লাঞ্চ করে যেতে পারবো !

আমি একমনে কথা বলে যাচ্ছিলাম । তাকিয়ে দেখি মিতু আমার দিকে তাকিয়ে রয়েছে একভাবে । ওর চোখে পানি টলমল করছে । এটা আনন্দের পানি । আমারও কেন জানি চোখ সিক্ত হয়ে এল । আমাদের দুজনের চোখেই সামনের জীবনের আনন্দময় স্বপ্ন !

এই গল্পের কাছাকাছি থিমের আরেকটা গল্প লেখা হচ্ছে । খুব জলদিই প্রকাশ হবে। গল্প সরাসরি পেতে হোয়াটসএপগ্রুপ কিংবা টেলিগ্রাম চেনেলে জয়েন করুন।

How useful was this post?

Click on a star to rate it!

Average rating 4.8 / 5. Vote count: 66

No votes so far! Be the first to rate this post.

About অপু তানভীর

আমি অতি ভাল একজন ছেলে।

View all posts by অপু তানভীর →