4.2
(13)

সুমন আহমেদ দরজার মৃদু ভাবে ধাক্কা দিলো ।
-আসবো স্যার ?

SCIB এর ডিরেক্টর হায়াত জামিল সামনে বসা একজনের সাথে কথা বলছে । চেহারা না দেখেও সুমনের বুঝতে কষ্ট হল না সামনে বসা মানুষটাকে ! ডিরেক্টরের রুমে নুশরাত সারমিন বসে আছে । সুমন নিজের কাছেই একটু অস্বস্থি বোধ করলো । মেয়েটা আসে পাশে থাকলেই এমন মনে হয় সব সময় । এটা এমন একটা অস্বস্থি যে কাউকে সহজে বলাও যায় না, না এতো সহজে এটা কাটানো যায় ।
হায়াত জামিল হাসি মুখে বলল
-এসো । তোমার জন্যই অপেক্ষা করছি, এসো ।

সুমন মনের ভেতরে আরও একটু দ্বিধা নিয়ে ঘরে ভেতরে ঢুকে পড়লো । তারপর নুশরাতের পাশের চেয়ারে বসে পড়লো কোন কথা না বলে । বসা পর্যন্ত একবারও তাকায় নি মেয়েটার দিকে । খুব ভাল করেই জানে তাকালেই অস্বস্থিটা আরও একটু বেড়ে যাবে, মেয়েটার চোখে অন্য কিছু একটা আছে । প্রথম যেদিন মেয়েটা SCIB তে যোগ দিয়েছে সেদিন থেকেই সুমন ব্যাপারটা জানে । সেদিন থেকেই সুমনের অস্বস্থি শুরু ।

চেয়ারে বসতে বসতে আরেকবার চারিদিকে তাকালো ভাল করে । এর আগেও অনেকবার এখানে এসেছে কিন্তু আজকে অন্য রকম লাগছে । এখনও ঠিক মত কারন খুজে পাচ্ছে না কেন তাকে ডাকা হয়েছে । খোশ গল্প করতে নিশ্চয়ই ডাকা হয় নি ।

-সুমন ! এখন তো তোমার হাতে কোন কেস নেই, তাই না ?
-জি না স্যার !
-তাহলে তোমাকে একটু দরকার হবে নুশরাতের !
-আমাকে !

সুমন এবার তাকালো নুশরাতের দিকে । নুশরাতও ঠিক সেই সময়ে সুমনের দিকে ফিরে তাকালো । একটু হাসলো । মেয়েটা দিন দিন যেন আগুন হচ্ছে । এতো সুন্দরী একটা মেয়ে পুলিশে কেন যোগ দিয়েছে সুমন এখনও ঠিক বুঝতে পারে না । এর তো কোন ইউনিভার্সিটির লেকচারার কিংবা ডাক্তার হওয়া দরকার ছিল । রোগী নুশরাতের হাসি দেখলে অর্ধেকটা এমনিতেই ভাল হয়ে যাবে । কিন্তু তা না, সে চলে এসেছে এখানে, চোর ডাকাত ধরতে ।

নুশরাত SCIB এ যোগ দেওয়ার পরপরই ওদের এখানের সব অফিসারই মোটামুটি সব সময় নুশরাতের আশে পাশে ঘোরা ঘুরিঘুরি শুরু করে দেয় । কিন্তু সুমন নুশরাতের কাছ থেকে একটু দুরুত্ব বজায় রাখে সব সময় । কারনটা এমন না যে নুশরাত কে পছন্দ করে না, কিংবা তার সঙ্গ পেতে চায় না । অন্য সবার মত সুমনের মনের ভাবও একই রকম । তবে সমস্যাটা অন্য জায়গায় !

হায়াত জামিল বলল
-মিলি রহমানের কেসটার কথা তো তুমি শুনেছো, তাই না ?
-জি স্যার ! ওটা তো মিস নুশরাত সামলাচ্ছে বলে জানতাম ?
-হুম !

মিলি রহমানের কেসটা নিয়ে গত কয়েকদিন থেকে কথা শোনা যাচ্ছে । এমন কোন আহমরি কিছু নয় কেসটা তবুও একটু আলোচনা হচ্ছে কারন মেয়েটার ফ্যামিলি ব্যকগ্রাউন্ড বেশ ভাল । মেয়েটা এক সময়ে মডেলিং করতো তার উপর তার বাবা দেশের নাম করা শিল্পপতিদের একজন । মৃত্যুটা ঠিক স্বাভাবিক হয় নি কিন্তু সেটা যে SCIB এ চলে আসবে এমনও নয়, অন্তত এতো জলদি তো নয়ই । কিন্তু এদেশে সব কিছু আর নিয়ম মত হয় ? মেয়ের পরিবারের ক্ষমতা আছেই বলে তারা সর্বোচ্চ জিনিসটা বেঁছে নিয়েছে । একেবারে সোজাসুজি পুলিস ডিবি বাদ দিয়ে একেবারে SCIB । অন্য কেস গুলোর বেলাতে স্বাধারন এতো সহজে জলদি কেস গুলো এখানে আসে না। ডিরেক্টর সাহবে প্রথমে কেসটা নিতে চান নি তবে উপরের চাপ তিনি ফেলেও দিতে পারেন নি ।

নুশরাত বলল
-কিন্তু এখনও ঠিক বুঝে উঠতে পারছি না আসলে কি ঘটছিলো । আমরা এখনও বলতে পারছি না যে ওটা আদৌও মার্ডার নাকি কোন কিছু দেখে সে ভয় পেয়েছিলো । আসলে কিভাবে মৃত্য হয়েছে সেটা বের করতে পারলেই মোটামুটি সব কিছু বোঝা যাবে মনে করছি ।

সুমন বলল
-আমাকে কি করতে বলছেন ?

কথাটা বলল হায়াত জামিলের দিকে তাকিয়ে ।
হায়াত জামিল বলল
-আসলে নুশরাত চাচ্ছে ওর কেইসটা তুমি একটু স্টাডি কর । ও একেবারেই নতুন । তার উপরে এটা ওর জন্য প্রথম কেস । আর এখন যেহেতু তুমি ফাঁকা আছো ওকে একটু হেল্প কর !

সুমন নুশরাতের দিকে তাকালো আবার । সুমনের কেন জানি মনে হল মেয়েটা নিজ থেকেই সুমনের সাহায্য চাচ্ছে । এমনটা ভাবার কোন কারন নেই তবুও সুমনের কেন জানি এমনই মনে হল । সেই সাথে মনের ভেতরের সেই অস্বস্থিটা আরও একটু যেন বৃদ্ধি পেল ।

সুমন বললাম
-আচ্ছা সমস্যা নেই । কবে থেকে শুরু কর করবো ?
নুশরাত বলল
-আপত্তি না থাকলে আজ থেকেই । আমি আপনার কেবিনে আসতেছি সব কাগজ পত্র নিয়ে ?
-আচ্ছা !

দুই

হায়াত জামিলের কেবিন থেকে বের হয়েই সুমন নিজের কেবিনে গিয়ে বসেছে । ঠিক তার কিছু সময় পরেই নুশরাত এসে এসে হাজির । হাতে একটা মাঝারি সাইজের ফাইল । মুখে সেই হাসিটা এখনও লেগে আছে । সুমনের একবার মনে হয়েছিলো কেসটার সাথে যুক্ত হওয়াটা ঠিক হচ্ছে কি না ! মেয়েটার সাথে সারাটা সময় থাকতে হবে এটা মনে হতে একটু যে আনন্দ অনুভব হচ্ছে না তা না, তবে একটা অস্বস্থি লাগছেই । এমনটা ওর ছোট বেলা থেকেই হয়ে আসছে । অন্য সবার সাথে ভাল ভাবে মিশতে পারলেও কিছু কিছু মানুষের সাথে ঠিক মত মিশতে পারে না ! কথা বলতে গিয়ে কথা আটকে যায় !

সুমন আরেকবার নুশরাতের দিকে ভাল করে তাকালো । আজকে নুশরাতের পরনে কাল আটসাট জিন্স । গায়ে সাদা টি-শার্ট তার উপর আবার কালো শার্ট । মেয়েটার গলায় টি-শার্টের উপর থেকে একটা কালো সানগ্লাস ঝুলছে । যদিও SCIB এর অফিসারদের পুলিশের ইউনিফর্ম পরার কথা, তবুও তাদের বেশির ভাগই সিভিল পোষাকেই অফিস করে । এটা নিয়ে অবশ্য কারো কোন অভিযোগ নেই ।

নুশরাত ফাইলটা টেবিলের উপর রাখতে রাখতে সুমনের দিকে তাকিয়ে হাসলো । সুমনের ঠিক সেই আগের কথাটাই আবার মনে হল । এই মেয়ে কেন খুন-খারাবী আর চোর পুলিশ কে ধরতে এসেছে কে জানে !
-সরি আপনাকে কষ্ট দেওয়া জন্য । আসলে আমি আমার প্রথম কেসটাতেই বিফল হতে চাই না ।
-কোন সমস্যা নেই । আর আমি কেস সমাধান করে মজাই পাই । তো শুরু করা যাক !
-কেস নিয়ে আলোচনা করার আগে একটা কথা জানতে চাই ?
-কি কথা ?
সুমনের তখনই মনে হল মেয়েটা ঠিক ঠিক ঐ প্রশ্নটাই করবে । এবং হলও তাই । নুশরাত বলল
-আপনি আমাকে ঠিক পছন্দ করেন না ?
-কে-কে বলল ? নাহ এমন কোন ব্যাপার না তো ?
-না ! আমার কেন জানি তাই মনে হয়েছে বারবার । তাহলে আমাকে এড়িয়ে চলেন কেন ?

সুমনের কেবল মনে হল মেঝেটা যেন এখন একটু ফাঁকা হয়ে যাক । সে নিচে চলে যায় । মনে মনে বলল যে এই কেসের সাথে যুক্ট হওয়াটা মোটেই উচিৎ হয় নি । মেয়েটা এমন প্রশ্ন করতে পারে তার আগেই ভাবা উচিৎ ছিল । এমন ভাবে তো ঠিক কাজ করতে পারবে না ! এখনই কি বলবে সে পারবে না সাহায্য করতে ।

নুশরাত এতোক্ষন তাকিয়ে ছিল ওর দিকে । ওর চেহারার অনুভুতিটা দেখলো ভাল করে । তারপর বলল,
-আচ্ছা আন অফিশিয়াল কথা বার্তা বাদ থাকুক আপাতত ।
সুমন কোন মতে বলল
-হুম !
-শুরু করা যাক !
-হুম !

নুশরাত বলতে শুরু করলো
-ঘটনা কিভাবে ঘটছে এখনও বলা যাচ্ছে না । মেয়েটাকে সন্ধ্যাবেলা মৃত অবস্থায় পাওয়া যায়, ভেতর থেকে দরজা বন্ধ ছিল । তার স্বামী চট্টগ্রাম ছিল । স্বামী-স্ত্রীর সংসার । ওরা দুজনেই থাকতো ফ্ল্যাটে । একটা ছুটা বুয়া আসতো দুবেলা !

সকাল বেলা বুয়া তাকে জীবিত দেখে গেছে । ইনফ্যাক্ট বুয়া চলে যাওয়ার পরেও ইন্টারকমে এপার্টমেন্টের কেয়ারটেকারের সাথে কথা হয়েছে । পরে সন্ধ্যা বেলা যখন বুয়া আবার আসে তখন অনেকবার দরজা ধাক্কানোর পরেও যখন মিলি দরজা খুলছিলো না তখন বুয়া প্রথমে এপার্টমেন্টের দারোয়ান এবং পরে ম্যানেজারকে ডাকতে দেয় । তারপর দরজার মাস্টার কি দিয়ে ভেতরে ঢোকা হয় । কয়েকবার ডাক দেওয়ার পরেও কারো সাড়া পাওয়া না গেলে ভেতরে ঢুকে খোজ করা হয় । পরে দেখা যায় শোবার ঘরের দরজা বন্ধ ভেতর থেকে । সেটা অবশ্য মাস্টার কি দিয়ে খোলা যায় নি । সেটা ভাঙ্গতেই হয়েছে ।

পুলিশ লক্ষ্য করে দেখেছে শোবার ঘরের দরজার কি-হলে একটা চাবি ভাঙ্গা অবস্থায় ছিল । আর চাবির গোছাটা নিচে পড়ে ছিল ! বোঝা যায় যে তাড়াহুড়া করে দরজা খুলতে গিয়ে ভুল চাবি ঢুকিয়েছে এবং সেটা মোচড় দিতেই চাবি ভেঙ্গে ভেতরে ঢুকে গেছে ! আমি এখনও বুঝতে পারি নি যে কি এতো তাড়াহুড়া ছিল যে এতো দিনের পরিচিত চাবি ভুল ভাবে ঢুকানো হল ।

একটানে এতো গুলো কথা বলে নুশরাত থামলো । তারপর ফাইল থেকে বেশ কিছু ছবি বাড়িয়ে দিলো সুমনের দিকে । ঘটনার পরে শোবার ঘরের বিভিন্ন জায়গার ছবি । ঘরটা বেশ বড় হলেও আসবারপত্র বলতে কেবল একটা খাট আর ড্রেসিং টেবিল । একটা ওয়াল-আলমারি । ওয়াল-আলমারির ডোর খোলা অবস্থায় পড়ে আছে । সেখান মেয়েদের জামা কাপড় সাজানো অবস্থায় দেখা যাচ্ছে । বোঝা যাচ্ছে এটা কেবল মিলিই ব্যবহার করতো । সেখানে কেবল মেয়েদের কাপড়ই সাজানো রয়েছে ।
সুমন এতোক্ষন চুপ করে শুনছিলো নুশরাতের কথা । আসলে ও নিজেকে সামলে নিচ্ছিলো । মেয়েটা ওকে এভাবে আক্রমন করবে ভাবতে পারে নি । অবশ্য নুশরাতকে এড়িয়ে যাওয়ার ব্যাপারটা অনেকেরই চোখে পড়েছে । নুশরাতের নিজেরও চোখে পড়ারই কথা ।
মনযোগ আবারও ছবির দিকে দিল ! খোলা ডোরটার দিকে আরেকটু ভাল করে তাকালো ।
মনে হচ্ছে যা ঘটেছে সেটা মোটামুটি এখানেই । ওয়াল আরমারীর একটা কপাট পুরোপুরি খোলা । সেখান থেকে মেয়েটার কিছু পোষাক স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে । অন্য দিকে পাশের কপাট টা একটু আধ খোলা । তার গায়ে দুইটা বেশ বড় সাইজের টিকটিকি ঝুলে আছে । অন্যান্য ছবি গুলো থেকেও তেমন কিছু আর চোখে পড়লো না ।

নুশরাত আবারও বলতে শুরু করলো

-শরীরে কোন আঘাতের চিহ্ন নেই । কোন কিছু নেই । কেবল চোখে মুখে খুব ভয়ের একটা ছাপ আছে । এমন একটা ভাব যেন খুব ভয়ের কিছু দেখেছে সে ! আমরা ডাক্তারি রিপোর্টে বলছে, মারা গেছে বেলা একটা থেকে তিনটার ভেতরে, নরমাল হার্ট-ফেইলে মারা গেছে । কিন্তু সেটা হয়েছে সম্ভবত কোন কিছুর ভয়ে । এখন প্রশ্ন হচ্ছে কিসের ভয়ে ! দিনের বেলা একটা মেয়ে কি দেখে ভয় পেতে পারে যে একেবারে হার্ট ফেইল করে মারা যাবে ! আমার আসলে এই জিনিস টা ঠিক মত ভাল ঠেকছে না । কিছু একটা অস্বাভাবিক এই কেসের ভেতরে আছেই ।
সুমন ততক্ষনে নিজেকে ভাল ভাবেই সামনে নিয়েছে । আরও কিছুটা সময় ছবি আর ডাক্তারি রিপোর্টের দিকে তাকিয়ে রইলো । কিছু একটা ভাবছে মনে মনে । আপত দৃষ্টিতে কোন ভাবেই এটা মার্ডার কেস মনে হচ্ছে না । কোন দুর্ঘটনাই মনে হচ্ছে কিন্তু ওর নিজেও ঠিক একই কথা মনে হল । তবুও বলল
-তেমন কিছু তো বোঝা যাচ্ছে না । মনে হচ্ছে দুর্ঘটনাই ।
-কিন্তু কি দেখে ভয় পেয়েছে বলেন ! এতো বড় একটা মেয়ে এভাবে ভয় পেয়ে মারা যাবে ?
-ওর পরিবার মানে স্বামীর কাছ থেকে কি জানা গেল ।
-স্বামী বলছে মিলির নাকি খুব ভুতের ভয় ছিল । ও রাতে প্রায়ই ভুতের ভয় পেত । এই জন্য রাতে ওকে একা কোথায় রেখে যেত না সে । ব্যবসার কাজে বাইরে গেলেও মিলির বাসা থেকে কেউ এসে থাকতো !
-আর কিছু ? ফিঙ্গার প্রিন্ট ?
-পরিচিত লোকজন ছাড়া আর কারো ছাপ পাওয়া যায় নি !

সুমন বলল
-স্বামীর কি আগের কোন সমস্যা কিংবা কোন পারিবারিক গন্ডগোল ?
-এমন কিছু খুজে পাওয়া যায় নি । অবশ্য খোজ চলছে এখনও । মিলি আর আফসাল একই ভার্সিটিতে পড়তো, একই ক্লাসে । প্রেমের বিয়ে । যদিও শুরুতে মিলির পরিবার ব্যাপারটা মেনে নিতে পারে নি তবে এখন সব কিছু ঠিক আছে । আফজাল এখন যে ব্যবসা নিয়ে ব্যস্ত ওটা মিলির বাবার সাহায্য নিয়েই করেছে ।
-সে যে চট্রগ্রামে ছিল সেটার অ্যালিবাই আছে ?
-জি আছে । কঠিন অ্যালিবাই আছে । ঘটনার দিন সকালে মেয়েটার স্বামী ব্যবসার কাজে চট্টগ্রামে গেছে, তার সাথে তার সেক্রেটারিও ছিল । সেখানে যে হোটেলে ছিল সেই হোটেলে ম্যানেজারের সাথে আমাদের কথাও হয়েছে । তারাও নিশ্চিত করেছে । এয়ারপোর্ট থেকেও নিশ্চিত খবর পাওয়া গেছে । সে সকালেই প্লেনে চড়েছে ।
-তার মানে সে ক্লিন !
-জি ! তাই মনে হচ্ছে ।

নুশরাত জি বললেও সুমনের মনে হল এই জি এর ভেতরে কেমন একটা সন্দেহ আছে ।
সুমন বলল
-আপনার কাছে এটা ঠিক মনে হচ্ছে না ।
-আসলে সুমন সাহেব আমার কেন জানি এই আফজালকেই খুনী মনে হচ্ছে ।
-আপনি কি এখনই কি এটা কে খুন বলে ধরে নিচ্ছেন ?

নুশরাতর কথা বলতে গিয়েও থেমে গেল । আসলেই সে মনে মনে ধরেই নিয়েছিল যে এটা আসলেই একটা খুন ।ছোট বেলা থেকে ডিটেকটিভ গল্প পড়েই নুশরাত বড় হয়েছে । রহস্য তার খুব ভাল লাগে । হয়তো ভেবেই বসেছে যে গল্পের মত বাস্তবেও প্রত্যেকটা মৃত্যুর পেছনেই কোন না কোন রহস্য লুকিয়ে আছে ।
সুমন কোন কথা না বলে নুশরাতের দিকে তাকিয়ে রইলো । মেয়েটার অভিজ্ঞতা কম । তার উপর প্রথম কেস । এমন টা মনে হতেই পারে । অথচ দেখা যাবে ঘটনা আসলে তেমন কিছুই না । মেয়েটা আসলেই এমন কিছু দেখে ভয় পেয়েছে । তারপর মারা গেছে । স্বামী বেচারা জানেই না হয়তো । যে কোন কারনেই ভয় পেতে পারে ।

-আচ্ছা ঠিক আছে । তবে আমার কেন জানি মনে হচ্ছে এটা একটা সাধারন দুর্ঘটনার কেসই । কেবল একটা জিনিসই আমাদের বের করতে হবে সেটা হল মেয়েটা কি দেখে ভয় পেয়েছে ।
-ঐটা বের করতে পারলে মনে হয় কিছু একটা হয় ।
-সবাইকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে ?
-হুম ! স্বামী, বুয়া, দারোয়ান ম্যানেজার সবাইকে !
-চলেন আরেকবার ঘুরে আসি !

তিন

সুমন বড় বিল্ডিংটার সামনে দাড়িয়ে আছে । এখনও ভেতরে ঢুকে নি । উপরে তাকিয়ে গোনার চেষ্টা করলো মোট কয়টা তালা আছে এখানে । ২০ তলার কম হবে না । মিলিদের ফ্ল্যাটটা ১২ তলায় । আর রিসিপশনের অবস্থাও বেশ ভাল । খোজ নিয়ে জেনেছে এখান দিয়ে ভেতরে যাওয়ার কেবল একটাই পথ । মেইন গেইট । অন্য দিক দিয়ে ১২ তলায় উঠতে হল খুনী কে স্পাইডার ম্যান হতে হবে । নুশরাত একটা জনকে সাথে নিয়ে এল ।
-সুমন সাহেব, এই হচ্ছে মনজুর ! এর সাথেই মিলির সর্বশেষ কথা হয়েছে ।
সুমন মনজুরের দিকে তাকিয়ে বলল
-কখন ফোন দিয়েছিলো ?
মনজুরকে কেমন একটু ভীত মনে হল । সম্ভবত এর আগেও তাকে জেরা করা হয়েছে এবং সেটা বেশ ভাল ভাবেই করা হয়েছে । চোখে মুখে একটা ভীতি দেখা গেল ।
-স্যার এই বেলা ১১টার দিকে ।
-কি বলেছিলো ফোন করে ?
-বলেছিলো তার শোবার ঘরের লকটা কাজ করছে না ! ওটা বদলাতে হবে !

সুমন কিছুটা সময় মনজুরের দিকে তাকিয়ে থেকে বলল
-তুমি কি বললে ?
-বলে ছিলাম যে বিকেলে গিয়ে দেখে আসবো !
-এর আগে যাও নাই তো ?
-না স্যার । বিশ্বাস করেন স্যার যাই নাই । সবাই কেবল এই কথাই আমাকে বলতেছে । আমার কথা বিশ্বাস নাই হইলে সিসিটিভি ফুটেজ আছে । সেইখানে দেখেন স্যার !
-আচ্ছা ঠিক আছে, ঠিক আছে ।

মনজুর চলে যেতেই নুশরাত বলল
-ওকে এর আগেরবার একটু কঠিন ভাবেই জেরা করেছিল কর্তব্যরত পুলিশ । দু একটা চড় ও মেড়ে ছিল । তাই ভয় পেয়েছে ।
-হুম ! আচ্ছা চল উপরে যাওয়া যাক ! দেখা যাক আফজাল সাহেবের কি বলে ।

দরজায় কলিংবের চাপতেই ভেতর থেকে দরজা খুলে গেল । সুমন ভেবেছিলো একজন পুরুষকে দেখতে পাবে কিন্তু তার বদলে একটা মেয়ে দরজা খুলে দিলো ।

নুশরাত মেয়েটাকে চেনে । মেয়েটা আফজালের অফিসে কাজ করে । আফজালের সেক্রেটারী । মেয়েটার নাম নিনা । মেয়েটাকেও জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে । নুশরাতদের দেখে নিনার চোখে একটা সুক্ষ ভয় এবং অস্বস্থির ছায়া সুমন কিংবা নুশরাতের চোখ এড়ালো না । তাদের এখন এখানে দেশে যে সে খুশি হয় নি সেটা স্পষ্টই বোঝা গেল ।
নুশরাত বলল
-আপনি এখানে ?
-স্যার খুব একা হয়ে আছেন তো । তাই ভাবলাম যে ….।
-আপনার স্যার কোথায় ?
-শুয়ে আছেন !

সুমন মেয়েটার দিকে আরও ভাল করে তাকালো । নিনার চোখ সুমনের চোখে পড়তে সে সেটা সরিয়ে নিল । সুমনের ঠোঁটে একটা সুক্ষ হাসি রেখা দেখা দিল মুহুর্ত । কিন্তু সেটা মুছে ফেলল সাথে সাথেই ।
সুমন বলল
-আচ্ছা সে শুয়েই থাকুক ! আমরা কেবল শোবার ঘরটা আরেকবার দেখবো !

শোবার ঘরের দিকে এগিয়ে যেতেই পাশের ঘর থেকে ৩২/৩৩ বছরের একজন সুদর্শন যুবক বেরিয়ে এল । ওদের দিকে তাকিয়ে খানিক সময় অবাক চোখে তাকিয়ে থেকে বলল
-আপনারা ! আবার ?
-আসতে হল । কিছু প্রশ্নের উত্তর দরকার !
-কি প্রশ্ন ?
-দেখা যাক । আগে সেগুলো খুজি !

কথা গুলো বলতে বলতেই সুমন শোবার ঘরের দরজায় লকে হাত দিল । নব ঘোরাতেই সেটা খুব চমচৎকার ভাবেই খুলে গেল । সুমন আশা করেছিল যে সেটা নষ্ট হবে । কিন্তু এরই ভেতরেই আফজাল সাহেব সেটা ঠিক করিয়ে নিয়েছে ।
এতো জলদি !

সুমন বলল
-দরজার লকটা না নষ্ট ছিল ! ঠিক হল কিভাবে ?
আফজাল একবার তাকালো তার সেক্রেটারির দিকে । তারপর তাকালো সুমনের দিকে ।
-আজই ঠিক করিয়েছি !
-ও ! কোথায় সেটা ?
-কেন ?
-কোথায় সেটা ?
-মনজুর নিয়ে গেছে । এপার্টমেন্টের সব কিছু সেই দেখাশুনা করে । কিছু ঠিক করলে সে নষ্ট জিনিস নিয়ে যায় । গরীব মানুষ । বিক্রি করে টুকটাক টাকা আয় করে ।
-ও আচ্ছা !

সুমন দরজা দিয়ে ভেতরে ঢুকলো । ঠিক তার পেছনেই নুশরাত । সবার পেছনে আফজাল । নিনা এখনও দরজার বাইরেই দাড়িয়ে আছে । সুমন এদিক ওদিক তাকাতে লাগলো । কিছু একটা খুজছে । এমন কোন কিছু যেটা ঠিক স্বাভাবিক না ! কিন্তু ওকে হতাশ হতে হল । তেমন কিছুই পাওয়া গেল না । সুমনের মনে হল যে আসলে এখানে তেমন কিছুই নেই । কেসটাতেও তেমন কিছু নেই ।

এমন সময় হঠাৎ নুশরাত “আআ…..” বলে চিৎকার করে উঠলো মৃদ্যু ভাবে !
সুমন জিজ্ঞাসু চোখে তাকালো । তারপর নুশরাতের দৃষ্টি অনুসরন করে তাকিয়ে দেখলো নুশরাত থেকে একটু দুরে একটা তেলাপোকা দাড়িয়ে আছে । একটু একটু নড়ছে । নুশরাতের দিকে তাকালো আবার । মেয়েটা ততক্ষণে নিজেকে সামলে নিয়েছে ।
সুমন মুখে না বললেও চোখের দৃষ্টিতে বলল তোমার এভাবে আচরন করাটা মানায় না ! নুশরাতও নিজের এরকম আচরনে খানিকটা লজ্জিত মনে হল ।
সুমন আরও কিছুটা সময় নুশরাতের দিকে তাকিয়েই রইলো । কিছু যেন একটা হঠাৎ করেই সুমনের মনে পড়তে গিয়ে পড়ছে না । কিছু একটা মনে করার চেষ্টা করছে । তারপর সুমন আরেকবার চারিপাশে তাকিয়ে দেখলো । ছবি দেখে যেমন টা মনে হয়েছিল ঘরটা সেরকমই । আলাদা করে দেখার কিছু নেই ।

সুমন ওয়ালডোরের কাছে গিয়ে বলল
-মাইন্ড ইফ আই ওপেন
আফজাল সাহেব বলল
-না না সমস্যা নেই । দেখুন । কিছুই নেই ওখানে !

সুমন দরজা খুলেই যা দেখবে তাই দেখলো । ছবির মত করেই কাপড় গুলো সাজানো রয়েছে । এর আগেও যে এখানে তল্লাশি চালানো হয়েছে সেটা বুঝতে কষ্ট হল না । ভেতরে তেমন কিছু নেই তবে নাকে কিছু একটার গন্ধ এসে লাগলো । সেটা বুঝতে কয়েক সেকেন্ড সমসয় লাগলো । পুরো ঘরেই সেকরম একটা অস্পষ্ট গন্ধ ঘরে বেড়াচ্ছে । তারপর দরজা বন্ধ করে দিল । নুশরাতের দিকে তাকিয়ে বলল
-মিস নুশরাত । চলুন আমাদের যা দেখার দেখা হয়ে গেছে ।

নুশরাত ভেবে ছিলো সুমন আফজালকে কিছু প্রশ্ন করবে কিন্তু কিছু প্রশ্ন না করাতে একটু অবাকই হল । তবে নিজের মনের কাছে হল ওর ওরকম ছেলেমানুষী আচরন দেখে হয়তো সুমন কিছুটা বিরক্ত হয়েছে কিংবা বিব্রত হয়েছে । তাই কিছু না জানতে চেয়েই চলে যাচ্ছে !

লিফটের দরজা খুলতে না খুলতে ভেতরে ঢুকে পড়লো টুপ করে সুমন । নুশরাত তার পেছনে পেছন ঢুকে তাকালো সুমনের দিকে । তারপর বলল
-সরি !
সুমন অবাক হয়ে বলল
-কেন ?
-আসলে ওভাবে চিৎকার দেওয়াটা আমার ঠিক হয় নি । আমি স্কুলের পড়া বাচ্চা মেয়ে না !
-হাহাহাহা ! আচ্ছে সমস্যা নেই !
নুশরাত আবার বলল
-আপনি কিছু মনে করেন নি তো !
-আরে না ! বাদ দেন !
-তো কি বুঝলেন ?
-এখনও কিছু বুঝছি না তবে একটা জিনিস বুঝার জন্য আরও কয়েকটা জিনিস জানা দরকার । দেখা যাক ।

নিচে নেমে আবারও মনজুরকে ডাকা হল
-নষ্ট লকটা কোথায় ? খবরদার বলবা না যে তোমার কাছে সেটা নেই ।
-আছে স্যার ।
-গুড ! নিয়ে এসো ।

মনজুর যেন দৌড় চলে গেল । ফিরে এল প্রায় সাথে সাথেই । হাতে লকটা ধরা ।

নুশরাতকে নষ্ট লকরা দিয়ে সমুন বলল
-আপনি এটা নিয়ে ল্যাবে চলে যান । এটা পরীক্ষা করাবেন । দেখতে বলবেন এটা কিভাবে নষ্ট হয়েছে । তারপর আমাকে ফোন দিবেন !
-আপনি ?
-আমার আরও একটা কাজ আছে । সেটা সেরে আসি ।
তারপর নুশরাট কে অবাক করে দিয়ে সুমন ওর হাতে চেপে হ্যান্ডশেইক করে বলল
-মিশ নুশরাত যদি এই কেইস টা সল্ভ হয় তাহলে সেটা জন্য আপনার ক্রেডিটই সব থেকে বেশি থাকবে !
-মানে ?
-এখন বলবো না । পরে …
সুমন আর দাড়ালো না ! নুশরাত আর কিছু বলতে গিয়েও বলল না । সে সুমন সম্পর্কে ভাল করেই জানে ওর কাজ করার ধরন খানিকটা এরকমই । এই জন্য সবার পার্টনার থাকলেও সুমন একা একাই কাজ করে । তবে সুমন যে ওর হাতটা হঠাৎ করেই ধরলো সেটা সেটা নুশরাতের কাছে বেশ ভাল লেগেছে । মুখে মৃদ্যউ হাসি নিয়ে গাড়িতে উঠে পড়লো ।

SCIB এ এসে লকটা সোজা ল্যাবে পরীক্ষা করার জন্য পাঠিয়ে দিল । আর বলল এটা সবার আগে পরীক্ষা করতে । রিপোর্ট টা এখনই চাই ।

চার

আরও ঘন্টা তিনেক পরেই সুমনের ফোন এসে হাজির হল নুশরাতের ফোনে । ততক্ষনে নস্ট লকের রিপোর্টটাও হাতে চলে এসেছে ।
-কেমন আছেন মিস নুশরাত ?
সুমনের কন্ঠের আনন্ৎা নুশরাতের বুঝতে কষ্ট হল না ! বলল
-জি ভাল । আপনার খবর কি । সেই যে গেলেন আর তো কোন খবর নেই ।
-আছে আছে খবর ! দারুন খবর আছে ।
-বলুন !
-আগে আপনি বলুন ! লকটা ইচ্ছে করে নষ্ট করা হয়েছে তাই না ?
-জি !
-আমিও তাই ধারনা করেছিলাম ।
-একধরের সুপার গ্লু এর ভেতরে প্রবেশ করানো হয়েছিল । সেটাই আস্তে আস্তে লকটাকে নষ্ট করে দেয় ।
-যাক ভাল । এখন দুইয়ে দুইয়ে চার মিলে গেল ।
-মানে কি ! আপনি সমাধান করে ফেলেছেন ?
-মোটামুটি ।
-বলুন ! জলদি বলুন !
-আরে ধীরে কন্যা ধীরে । চলে আসুন এখানে । আমি আফজাল সাহেবের এপার্টমেন্টেই অপেক্ষা করছি ! সাথে করে ফোর্সও নিয়ে আসবেন ।


চার ঘন্টা পরে আবারও ওরা আফজাল সাহেবের ফ্ল্যাটে এসে হাজির । নুশরাত এখনও ঠিক মত বিশ্বাস করতে পারছে না যে এতো জলদি কেইসটা সমাধান হয়ে যাবে । যদিও এখনও ঠিক জানে না আসলেই কি হয়েছিল মিলির সাথে । মিলিকে কি আসল হত্যা করা হয়েছিল । সেই বিষয়ে কোন সন্দেহ নেই এখন । কিন্তু সেটা কিভাবে ?

সুমননে ঠিক সামনের সোফাতে আফজাল বসে আছে ! যদিও নুশরাত পুলিশ ফোর্স নিয়ে এসেছে, তারা অপেক্ষা করছে নিচে ।

সুমন একেবারে সরাসরি আফজালের চোখের দিকে তাকিয়ে বলল
-তাহলে মিলিকে হঠাৎ কেন মারার দরকার পড়লো আপনার ! সব কিছু তো ঠিক মতই চলছিল?

নুশরাত দেখলো আফজাল কথাটা শুনে চমকালো না । নুশরাত একটু আগে শুনেছে যে আফজাল সাহেব নাকি এই ফ্ল্যাট থেকে পালাতে চেষ্টা করেছিলো । ঠিক তখনই সুমন সাহেব এখানে এসে হাজির হয় । তাকে হাতে না হাতে পাকড়াও করে । তারপর ফোন করে নুশরাতকে । আর কিছু সময়ে পড়ে আসলে হয়তো তারা পালিয়েও যেত কোথায় । যদি কোন অন্যায় না করবে তাহলে পালাবে কেন ?

সুমন বলল
-আপনি বলবেন নাকি আমিই বলবো ? আপনার বউয়ের এন্টোমফোবিয়া ছিল তাই না ?
নুশরাত বলল
-আন্টোমোফোবিয়া ? মানে যাটা পোকা-মাকড় দেখে ভয় পায় ?
-হুম ! বিশেষ রকমের কিছু ক্ষুদ্র প্রাণী । সবার ভেতরেই এই রোগটা কম বেশি থাকে । কিন্তু কারো কারো একেবারে বাড়াবাড়ি পর্যায়ে থাকে । আমি আপনার কে অফিসে পাঠিয়ে দিয়ে মিলিদের বাসায় গিয়েছিলাম । সেখান থেকেই জানতে পারি যে মিলির কোন ভুতের ভয় ছিল না । ও ভুতে বিশ্বাসই করতো না । ওর বোন বলল যে ওর টিকটিক তেলাপোকা দেখে খুব বেশি ভয় পেত । টিকটিক থেকে তো কয়েকবার অজ্ঞানও হয়েছে !

আফজাল বলল
-মিলি টিকটিকি দেখে ভয় পেত খুব !
-এবং আপনি এই সুযোগটাই নিলেন । একটা প্লান বানালেন ওকে খুন করার । প্লান টা খুব সিম্পল । প্রথমে অনেক পরিমানে টিকটিকি সংগ্রহ করলেন ।
আফজাল সাহেব সুমনের দিকে তাকিয়ে আবার নিচের দিকে তাকালো ।
সুমন বলল
-আমি মনজুরের কাছে শুনেছি । কয়েক সপ্তাহ আগে আপনি ওকে বলেছিলেন বেশ কিছু টিকটিকি আর তেলাপকা জোগার করে দিতে । তাই না ?
আবারও আফজাল সাহেব কোন কথা বলল না !
সুমন বলে চলল
তারপর যখন মনজুর আপনাকে সেগুলো জোগার করে দিলো সেটা লুকিয়ে রাখলেন ওয়ালআলমারিতে। এরপর লকে গ্লু ঢেলে দিয়ে চলে গেলেন চট্রগ্রামে । কেউ আপনাকে সন্দেহ করতে পারবে না । খুনের সময় আপনি এখানে ছিলেন না !

কিছু সময় চুপ করে আফজাল বলল
-জানতাম সেদিন ওর শরীর খানিকটা খারাপ ছিল কিন্তু একট না একটা সময়ে না সময়ে ও ঠিকই ওয়াল আলমারিটা খুলবে । এবং সে ভয়ে পাবে । ওর এই ভয়টার ব্যাপারে আমি জানতাম খুব ভাল করে । একবার ওকে হাসপাতে পর্যন্ত নিয়ে যেতে হয়েছিল ।
এই লাইণ গুলো বলে আফজাল মাথা নিচু করে বসে রইলো ।

পরিশিষ্ট

নুশরাত খানিকটা অবাক হয়ে এখনও তাকিয়ে রইলো । ওর মাথায় এখনও ঠিক আসতেছে না এই ভাবে কাউকে খুন করা যেতে পারে ! এমন কিছু তো ওর মাথাতেই আসে নি ! নুশরাত বলল
-কেন মারলেন ওকে ? কি এমন দরকার ছিল ?
-আসলে ওর সাথে বনিবোনা হচ্ছিলো না । আমাদের মাঝে ভালবাসা যা ছিল সেটা অনেক আগেই শেষ হয়ে গেছিলো ।
-তাহলে ওকে ছেড়ে দিতে পারতেন । মেরে ফেলার দরকার ছিল না !
-ওকে ডিভোর্স দিলে ওর বাবার দেওয়া ব্যবসাটা আমার হাত ছাড়া হয়ে যেত । আমি আসলে তখন …….
এই কথা টুকু বলতে বলতে আফজাল সাহেব হাত দিয়ে মুখে চেপে ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠলো !

-আপনি না থাকলে আসলেই এই আফজাল ঠিক ঠিক বেরিয়ে যেত ।
-কিন্তু আপনিই কিন্তু আসল ক্লুটা বের করেছেন । আমি না !

ঐদিন বিকেল বেলা ওদের অফিসের ক্যান্টিনে বসে দুজন কথা বলছে । সুমনের সেই অস্বস্থিটা এখনও আছে তবে সেই সাথে ভাল লাগাটাও রয়েছে । কিন্তু মনে মনে ভয় করছে এই ভেবে যে নুশরাত আবারও কোন কথা বলবেই ।
নুশরাত ঠিক মত বুঝতে না পেরে বলল
-মানে ? আমি ঠিক বুঝলাম না !
-আরে, আপনি যদি তখন ঐ তেলাপোকা দেখে ভয় পেয়ে চিৎকার না করে উঠতেন তাহলে ব্যাপার টা আমার মাথায় আসতোই না । আমি যখন আলমারীর ভেতরে উকি দিলাম সেখানে কয়েকটা টিকটিকি আর তেলাপোকা দেখতে পেয়েছিলাম । সেই সাথে ন্যাফথলিনের একটা তীব্র গন্ধও ছিল । এটা আমি পুরো ঘরেই দেখেছি । ন্যাফথলিনের গন্ধে তো তেলাপোকা টিকটিকি দুরে চলে যায় তবুও আলমারীর ভেতরে এতো গুলো দেখে খানিকটা সন্দেহ হল । মনে হল যে কেউ ওদের কে ইচ্ছে করে এখানে রেখে গেছে ।
-তারপরই ব্যাপারটা আপনার মাথায় ঘুরতে থাকলো ?
-হুম ! আসলে আফজাল সাহেব যদি সঠিক সময়ে ঐ তেলাপোকা আর টিকটিকি গুলো সরিয়ে ফেলতো তাহলে হয়তো ধরা পড়তো না । কিন্তু অভিজ্ঞতা নেই ভেবেছিলো যে এই টিকটিকি দেখে কেউ কিছু বুঝতে পারবে না !

নুশরাত বলল
-সত্যি সত্যি আপনাকে ছাড়া এই কেস সল্ভ হত না । থ্যাঙ্কিউ ! আমি কি আপনাকে আরেকটা অনুরোধ করতে পারি !
সুমনের মনে হল এখনই মনে হল নুশরাত সেই কথাটা বলবে ! আবারও সেই অস্বস্থিটা ফিরে এঅ সাথে সাথেই । নুশরাট বলল
-আমি ভাবছিলাম যে এর পর থেকে কেস গুলো যদি আমরা এক সাথে সল্ভ করি, মানে এখানে অন্যেরা ঠিক যেভাবে দুজন মিলে কাজ করে সেভাবে, তাহলে আমিও কিছু শিখতে পারলাম আর আপনারও কিছুটা সাহায্য হল ! কি বলেন ?

সুমন একা একা কাজ করতে ভালবাসলেও নুশরাতের কাছ থেকে এমন একটা প্রস্তাব পেয়ে যেন খুশিই হল । কিছু না বলে কেবল হাসলো । মনে মনে বলল, অস্বস্থিটা মনে হয় এবার কেটেই যাবে ।


গল্পটা লেখার পেছনের গল্প আমার ছাত্রীদেরকে নিয়ে । আর চার জন্য ছাত্রীর, চার জনই এই টিকটিকি দেখে সেই লেভেলের ভয় পায় । কেবল মাত্র এক দেওয়ালে নিরীহ প্রাণীটাকে দেখা গেলেই হয়, চিৎকার চেঁচামিচি করে বাড়ি মাথায় করে ফেলে । সেখান থেকেই এই গল্পের উৎপত্তি !

পদাটিকাঃ
Entomophobia (also known as insectophobia) is a specific phobia characterized by an excessive or unrealistic fear of one or more classes of insects.

SCIB: স্পেশাল ক্রাইম ইনভেস্টিগেশন ব্যুরো

গল্পটি প্রথম প্রকাশ করি ১১ ই মার্চ, ২০১৬ বিকাল ৩:১৪ সামু ব্লগে

How useful was this post?

Click on a star to rate it!

Average rating 4.2 / 5. Vote count: 13

No votes so far! Be the first to rate this post.

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *