প্রিয়ন্তির মন ভাল নেই ২.০

oputanvir
4.6
(55)

প্রিয়ন্তি মনে মনে ঠিক করেই নিয়েছে আবিদের সাথে সম্পর্কটা আর সে রাখবে না । সিদ্ধান্তটা নেওয়ার পরে একটু সুস্থির লাগছে । তবে সেই সাথে একটু মনও খারাপ লাগছে ওর । আবিদের সাথে ওর সম্পর্কটা খুবই চমৎকার ছিল । প্রায় প্রতিদিন ক্লাসের শেষে দুজনের দেখা হত কথা হত । সব কিছু খুব সুন্দর ভাবে চলছিলো । সব থেকে বেশি যে ব্যাপারটা প্রিয়ন্তির মনে এসে বাঁধছে তা হচ্ছে আবিদ যে ওকে ভালোবাসে সেটা প্রিয়ন্তি খুব ভাল করেই বুঝতে পেরেছিলো । কিন্তু এতো কিছুর পরেও আবিদের প্রতি ওর বিশ্বাসে চিড় ধরেছে । বিশেষ করে যখন আবিদের সরাসরি মিথ্যা বলাটা যখন ওর কাছে প্রমাণিত হল তখন প্রিয়ন্তির মনে আর অন্য কিছু আসে নি । ওর সাথে কিভাবে সরাসরি মিথ্যা বলতে পারলো ও ! এখানেই ওর কষ্ট লাগছে !

বেশ কয়েকদিন ধরেই আবিদের আচরণ ওর কাছে কেমন যেন মনে হচ্ছিলো । আগের মত ছিল না সে । এড়িয়ে চলছিলো প্রিয়ন্তিকে । তারপর শেষে প্রিয়ন্তি গত সোমবার আবিদকে দেখতে পেল অন্য একটা মেয়ের সাথে রেস্টুরেন্টে বসে গল্প কথা বলছে । প্রিয়ন্ত যখন আবিদকে ফোন দিলো আবিদ তখন সরাসরি মিথ্যাই বলল যে ও টিউশনীতে । তখনই ইচ্ছে করছিলো সরাসরি ওর সামনে গিয়ে ধরে ওকে । কিন্তু সেটা করলো না । চোখের কোনে পানি চলে এসেছিলো । সেটা আটকে সেখান থেকে বের হয়ে এল । বাসায় আসার পরেই কিছু সময় কাঁদলো । তারপর এই দুদিন ঢরে সিদ্ধান্ত নিলো যে আর সম্পর্কে সে রাখবে না । এমন ভাবে মানসিক কষ্ট পাওয়ার কোন মানে নেই ।

ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখলো প্রায় এগারোটা বাজে । ভাবলো যে এখনই সে আবিদকে ফোন দিবে । তারপর ফোন দিয়েই নিজের সিদ্ধান্তের কথা জানিয়ে দিবে । কিন্তু ওকে খানিকটা অবাক করে দিয়ে আবিদের ফোন এসে হাজির হল । একবার ফোনটা বাজতে দিলো সে । ফোন ধরলো না । পরের বার যখন ফোন এল তখন প্রিয়ন্তি ফোনটা ধরলো । বলল, বল ।
ফোনের ওপাশ থেকে কিছু সময় কোন কথা শোনা গেল না । প্রিয়ন্তি কিছু সময় চুপ করে থেকে বলল, চুপ করে থাকবে নাকি কিছু বলবে?
আবিদ বলল, একটু নিচে আসবে?
প্রিয়ন্তি একটু অবাক হল । আবিদ মাঝে মাঝে মাঝেই ওর বাসার সামনে আসে রাতে । আবিদের বাসা ওদের বাসার কাছেই। ওর বারান্দা থেকে রাস্তাটা পরিস্কার দেখা যায় । প্রিয়ন্তি তখন বারান্দায় আসে । প্রিয়ন্তির দিকে তাকিয়ে আবিদ কিছু করে কথা বলে চলে যায় । আগে প্রায়ই এই কাজটা করতো আবিদ । তবে কিছুদিন এই কাজটা করা বাদ দিয়েছে !

প্রিয়ন্তি বলল, নিচে আসতে পারবো না এখন ।
-প্লিজ । খুব দরকার ।
-ফোনে বল ।
-না ফোনে বলা যাবে না । সরাসরি বলতে হবে । বেশি সময় লাগবে না । পনের মিনিট ।

প্রিয়ন্তির একবার মনে হল যে ওকে বলে কোন দেখা হবে না । এখনই আবিদকে বলে দেয় যে ওর সাথে আর সম্পর্ক রাখতে আগ্রহী নয় সে । কিন্তু কোথায় যেন আটকে গেল সে । মুখ দিয়ে এতো কঠিন কথা কি আবিদকে সে বলতে পারবে? প্রিয়ন্তি বলল, আচ্ছা তুমি উপরে আসো । ছাদে চলে যাও । আমি দারোয়ানকে বলে দিচ্ছি । সে ঢুকতে দিবে !

ফোন রেখে সে দারোয়ানকে ফোন দিয়ে বলল যে ওর একজন বন্ধু আসছে । তারপর নিজে দাড়ালো আয়নার সামনে । চেহারা ঠিকঠাকই মনে হচ্ছে । রাতের বেলা একটা টিশার্ট আর প্লাজো পরে আছে । প্লাজোটা পরিবর্তন করে একটা লেগিংস পরলো । আবিদ ওর প্লাজো পরা একদম পছন্দ করে না । পারতপক্ষে প্লাজো করে আবিদের সামনে যায়ও না । আজকে কী মনে করে লেগিংসটা পরলো । তারপর ফোনটা হাতে নিয়ে ড্রয়িং রুমের দিকে হাটা দিল ।

প্রিয়ন্তর বাবা ওকে দেখলো বের হতে । বাবার দিকে তাকিয়ে বলল, বাবা একটু ছাদে যাচ্ছি চলে আসবো এখনই ।
ওর বাবা কিছু বলল না । প্রিয়ন্তি সিড়ি দিয়ে ছাদে উঠে এল । ছাদের এককোনে আবিদকে দেখতে পেল। ছাদের বসার বেশ কয়েকটা বেঞ্চ আছে । সেগুলোর একটাতে বসে আছে আবিদ । আকাশে বেশ বড় চাঁদ উঠেছে । সেই আলোতেই সব কিছু পরিস্কার দেখা যাচ্ছে
আবিদ ওর দিকে একভাবে তাকিয়ে রইলো কিছু সময় । সেই চোখে যে মুগ্ধতা আছে সেটা বুঝতে প্রিয়ন্তির মোটেই কষ্ট হল না । প্রতিবার এই মুগ্ধ চোখেই আবিদ ওকে দেখে ।
প্রিয়ন্তি আরও একটু কাছে আসতেই ওকে খানিকটা অবাক করে দিয়েই আবিদ ওকে জড়িয়ে ধরলো । ব্যাপারটা এতো জলদি হল যে প্রিয়ন্তি কোন প্রতিক্রিয়া দেখানোর সুযোগ পেল না । কিছু সময় কেবল বিস্ময়ে কেটে গেল । তারপরই অনুভব করলো আবিদের পুরো শরীর যেন কাঁপছে । প্রিয়ন্তির মনে হল আবিদ যেন কাঁদছে । প্রিয়ন্তির মন এবার একটু দ্রবীভূত হল । বলল, কী হয়েছে আবিদ? বল আমাকে !
আবিদ আরও বেশ কিছুটা সময় প্রিয়ন্তিকে জড়িয়ে ধরে রইলো । তারপর ওকে ছেড়ে দিয়ে আবারও বেঞ্চের উপরে বসলো । প্রিয়ন্তি বসলো আবিদের খুব কাছে । তারপর আবারও বলল, বল আমাকে কী হয়েছে?
আবিদ এবার বলল, আমি তোমাকে মিথ্যা বলেছি ।
-মিথ্যা ?
-হুম । মনে আছে গত সোমবার তুমি আমাকে বলেছিলে যে আমি কোথায়? মনে আছে ?
-হুম । বলেছিলে টিউশনীতে ।
-হ্যা । আমি তখন টিউশনীতে ছিলাম না । আমি ছিলাম একজনের সাথে ।

প্রিয়ন্তি শান্ত চোখে আবিদের দিকে তাকিয়ে রইলো । প্রিয়ন্তি এখনও ঠিক বুঝতে পারছে না যে ওর এখন কেমন আচরণ করা উচিৎ। ও যে ব্যাপারটা আগেই জানে সেটা কি আবিদকে বলে দিবে ? না থাকুক । আগে শুনে নিক যে আবিদের কী বলার আছে । যদি সত্য বলে সব তবে আজকে নেওয়া সিদ্ধান্ত থেকে হয়তো ফিরেও আসতে পারে ও ।
আবিদ বলল, আমি আসলে আমার এক্স গার্লফ্রেন্ডের সাথে ছিলাম । মেয়েটা কদিন থেকে আমার পিছনে লেগে আছে !
প্রিয়ন্তি বলল, ওকে ! তুমি কী বলতে চাও, বল !
আবিদ বলল, আমার সব টুকু ঘটনা শোনো । তারপর তুমি যা বলবে তাই । আমি কী করবো বুঝতে পারছি না । তোমার কাছে কেনই বা মিথ্যা বললাম সেটাও আমি জানি না । কিন্তু এখন নিজের কাছে বড় অপরাধী মনে হচ্ছে । মনে হয় তোমার সব জানা দরকার !
প্রিয়ন্তি বলল, ওকে বল শুনি ।

আবিদ লম্বা করে একটা দম নিল । তারপর বলতে শুরু করলো ।

”লিন্ডার সাথে আমার স্কুলে থাকতে পরিচয় হয় । ক্লাস নাইন থেকে । আমি নতুন যে স্কুলে ভর্তি হলাম বাবার ভর্তির কারণে লিন্ডা সেই স্কুলের হেড স্যারের মেয়ে ছিল । আমি পড়াশুনার ভাল ছিলাম বিধায় স্যার আমাকে শুরু থেকে খেয়াল করেছিলেন । স্যারের কাছেই আমি প্রাইভেট পরতাম । সেখান থেকেই লিন্ডার সাথে পরিচয় । ক্লাস টেনে উঠলে একদিন বৃষ্টির ভেতরে ওদের বাসায় পড়তে গিয়ে দেখি সেদিন কেউ আসে নি । লিন্ডা আমাকে সেদিন জড়িয়ে ধরে চুমু খেয়েছিলো । তারপর থেকেই আমাদের প্রেম শুরু হয় । বেশ কয়েক মাস চলল বেশ ভাল করে । কিন্তু তারপর …”
-তারপর ?’
-তারপর আমি জানতে পারি যে লিন্ডা কেবল আমার সাথেই নয় আরও কয়েকজনের সাথেই সম্পর্ক করেছে । তখনও একজনের সাথে সম্পর্কে আছে ওর । আমি আমার এক বন্ধুর কাছ থেকে খবর পেয়েছিলাম । পরে ওকে জিজ্ঞেস করতে ও ওস্বীকার তো করলোই না বরং সেটা এমন ভাবে আমার সামনে বলল যেন আমি ওর সেই প্রেমিকের কাছে অতি নগন্য কেউ। সত্যি বলছি সেদিক এতো কষ্ট পেয়েছিলাম আমি । জীবনের প্রথম ভালোবাসার মানুষের কাছ থেকে এমন ভাবে প্রতারিত হয়ে আমি একেবারে ভেঙ্গে পড়েছিলাম । পরীক্ষা খারাপ হল । বাবার বদলি হয়ে গেল নতুন জায়গায় । আমার অনেক সময় লেগেছিলো । তারপর থেকে আমি আর কোন দিন কোন মেয়ের প্রতি বিশ্বাস নিয়ে আনতে পারি নি। কিন্তু তোমার সাথে যখন পরিচয় হল তখন আবার কেমন যেন সব বদলে গেল । মনে হল যেন তোমার কাছ থেকে আমি কষ্ট পাবো না ।

আবিদ থামলো একটু । তারপর আবিদ আবারও বলতে শুরু করলো, তারপর কিছু দিন আগে আবারও লিন্ডার সাথে আমার দেখা হল । আমাদেরই ক্যাম্পাসে । ওর কথা বার্তা শুনে শুনে মনে হল যে আমার ব্যাপারে ও সব খোজ খবর নিয়ে এসেছে । বলল যে আবারও আমার কাছে ফেরৎ আসতে চায় । জীবনে ও অনেক ভুল করেছে । সবাই ওকে ছেড়ে গেছে । আমি তোমার কথা বললাম । ও কিছুতেই সেটা মানবে না । শেষে কেমন যেন ভয় দেখালো যে তোমাকে বলে দিবে সব কথা । ওর সাথে আমি কী না কী করেছি সব । অথচ আমি কিছুই করি নি কোন দিন । মনের ভেতরে ভয় হল তুমি জানতে পারলে কী ভাববে । যদি আমাকে ছেড়ে চলে যাও । তাই তোমাকে এড়িয়ে ওকে বোঝাতে লাগলাম । রিকোয়েস্ট করতে লাগলাম । কেন যে করতে গেলাম আমি নিজেও জানি না । শেষে গতদিন তোমাকে মিথ্যা বললাম । লিন্ডা আমাকে বারবার ডিস্টার্ব করছে । বলছে যে তোমাকে বলে দিবে। বলবে যে এখনও আমি ওর সাথে যোগাযোগ রাখি ওর শারীরিক সম্পর্ক করি !

আবিদ থামতেই প্রিয়ন্তি বলল, এই কথাটা সোজাসুজি আমাকে প্রথমে বলা যেত না ?
-বলা উচিৎ ছিল আমি জানি । আমার তখন কী হয়েছিলো আমি জানি না । বিশ্বাস করে এই টুকু ছাড়া আমি আর কিছুই করি নি । আমি তোমাকে হারাতে চাই না !

আবিদের শেষ লাইনটা ”আমি তোমাকে হারাতে চাই না” শুনেই প্রিয়ন্তির সব রাগ একেবারে পানি হয়ে গেল । ছেলেটা ওকে হারানোর কী এক ভয় করছে । প্রিয়ন্তি বলল, ঠিক আছে এতো টেনশন করতে হবে না । কেবল এরপর থেকে আমাকে মিথ্যা বলবে না । আমার আর কিছুই চাওয়ার নেই । ঠিক আছে ?
-তুমি আমাকে ছেড়ে যাবে না তো ?
-না বাবা । তোমাকে ছেড়ে কেন যাবো শুনি ? তোমার মত এতো কিউট একটা বয়ফ্রেন্ড আমি কোথায় পাবো বল !

আবিদ আরও কিছু বলতে যাচ্ছিলো তখনই ওর ফোনটা বেজে উঠলো । ফোন হাতে নিতেই ওর মুখটা বিরক্তিতে ভরে উঠলো । প্রিয়ন্তি বলল, কি হয়েছে ?
-লিন্ডা ফোন দিয়েছে হোয়াটসএপে !
-ভিডিও কল ?
-হ্যা ।
-রিসিভ কর !
-কেন ?
-কর বলছি ।

আবিদ প্রিয়ন্তির কথা মত ফোনটা রিসিভ করলো । প্রিয়ন্তি ফোন স্ক্রিনে দেখতে পেল লিন্ডার চেহারা । লিন্ডা বলল, হেই বেইবি কোথায় তুমি ?
আবিদ বিরক্ত কণ্ঠে বলল, তোমাকে না বলেছি আমি তোমার বেবি না । আমাকে বেবি ডাকবে না ।
-আরে বাবাটা রাগ করে করছো ! আমি না বললে কে বলবে ?
প্রিয়ন্তি এবার স্ক্রিনটা নিজের দিকে একটু সরিয়ে নিয়ে বলল, কেন আমি বলবো ! আমি তো আছি ।
তারপর আবিদের দিকে তাকিয়ে বলল, তাই বাবু । তা এইটা তোমার এক্স ?
আবিদ কোন কথা বলল না । প্রিয়ন্তিকে এভাবে দেখবে সেটা সম্ভবত লিন্ডা আশা করে নি । প্রিয়ন্তি ফোনের স্ক্রিনটা আরও কাছে নিয়ে এসে বলল, অন্যের জিনিসের দিকে নজর দিতে নেই । ঠিক আছে, এই দেখো আবিদ কেবলই আমার ।
এই বলে ফোনটা ধরেই প্রথমে আবিদের গালে একটা চুমু খেল । তারপর ঠোঁটে । বেশ গাঢ় করেই । আবিদ নিজেও অবাক হয়ে গেল প্রিয়ন্তির কাজ কর্ম দেখে ।

প্রিয়ন্তি ঠিকই দেখতে পাচ্ছিলো ফোনের ওপাশে লিন্ডার ঈর্ষান্বিত চোখ । প্রিয়ন্তি এবার ফোনটা নামিয়ে রেখে আরও একটু গভীর ভাবে আবিদকে চুমু খেল । চুমু পর্ব শেষ করে যখন ফোনটা আবার হাতে নিল তখন লিন্ডা ফোন কেটে দিয়েছে । আবিদ বলল, এটা কী হল?
-কেন ভাল লাগে নি ?
-না লেগেছে । কিন্তু এভাবে?
-তোমার এক্সকে একটু টাইট দিলাম আর কি ! ঐ যে তোমাকে কষ্ট দিয়েছিলো । এখন বাসায় যাও । রাত হয়ে যাচ্ছে । আজকে রাতে তোমার ঐ এক্সের আর ঘুম আসবে না ।
-আমারও তো রাতে ঘুম আসবে না ।

প্রিয়ন্তি হেসে ফেলল । বলল, আজকে তোমার সাথে এক সাথে জেগে থাকবো । ঠিক আছে !
-আচ্ছা !

ছাদ থেকে নামার আগে আবিদ আরেকবার শক্ত করে প্রিয়ন্তিকে জড়িয়ে ধরলো । প্রিয়ন্তি ঠিক করেই রেখেছিলো আজকেই আবিদের সাথে সকল সম্পর্ক শেষ করে দিবে অথচ আজকে ওদের সম্পর্কেটা যেন আরও এক ধাপ গভীরে চলে গেল । চাইলেই কী ভালোবাসা শেষ করা যায় !!

How useful was this post?

Click on a star to rate it!

Average rating 4.6 / 5. Vote count: 55

No votes so far! Be the first to rate this post.

About অপু তানভীর

আমি অতি ভাল একজন ছেলে।

View all posts by অপু তানভীর →