ভয়ংকর ভালোবাসা

oputanvir
4.7
(66)

নওরিনের মনের ভেতরে আজকে বেশ আনন্দ লাগছে । বিশেষ করে গতকাল রাতেই সে সিদ্ধান্ত টা নিয়েছে । বেচারা শাফায়েতকে অনেক ঘোরানো হয়েছে । এবার তাকে একটু শান্তি দেওয়া যাক । আজকে সে বলে দিবে যে সেও তার ব্যাপারে আসলে অনেক আগ্রহী । সেই শুরু থেকেই আগ্রহী ছিল । এই কয়েকটা দিন কেবল নওরিন একটু মজা নিয়েছে । দেখতে চেয়েছে যে শাফায়েত তার জন্য কতখানি উতলা আর অস্থির হয়ে ওঠে । 

বিশেষ করে গত সপ্তাহে শাফায়েত একদম সরাসরিই নওরিনকে নিজের মনের কথাটা । সেদিন ক্লাস শেষ করেই দেখতে পেল শাফায়েতের গাড়িটা । দেখলো কলেজ বিল্ডিংয়ের পাশে শাফায়েত দাঁড়িয়ে আছে । নওরিন ওকে দেখেও না দেখার ভান করে অফিস রুমের দিকে হাটতে লাগলো । তখনই শাফায়েত এগিয়ে এসে ডাক দিলো ওকে । 

-মিস নওরিন !

নওরিন হাসলো একটু । তারপর ঘুরে দাড়ালো । শাফায়েতকে দেখে একটু অবাক হওয়ার ভাণ করে বলল, আরে এসি সাহেব যে ! এখানে ? কোন দরকারে এসেছেন ?

শাফায়েত শান্তি গলায় বলল, আপনার সাথে কয়েকটা কথা বলার ছিল ।

-জ্বী বলুন । 

-এখানে ?

-কেন সমস্যা কোন ? স্টাফ রুমে চলুন?

-না মানে একটু নিরিবিলি দরকার ছিল । 

-ও আচ্ছা । তাহলে ঐ বট গাছটার নিচে চলুন । ওটা কাপল জোন হিয়াবে পরিচিত । চলুন ।

বড় বট গাছের নিচে ইট দিয়ে বাঁধানো রয়েছে । সেখানেই বসলো দুজন । বসতে বসতেই নওরিন বলল, বলুন এবার আপনার দরকারী কথা ।

কিছু সময় স্থির থেকে শাফায়েত বলল, দেখুন আমি ঘুরিয়ে পেঁচিয়ে কথা বলতে পারি না আসলে । সরাসরিই বলি । আম আপনাকে ভয়ংকর ভালোবাসি । 

-ভয়ংকর !

হেসে ফেলল নওরিন । মনে মনে ভাবলো, যেমন হয়েছে পুলিশ তার মনের কথা। ভয়ংকর ভালোবাসি ! কী সব কথা । নওরিন খুব স্বাভাবিক কন্ঠে বলল, দেখুন আমি এখনই এসব নিয়ে ভাবছি না । আর বিয়ের ব্যাপারটা আমার বাবা মায়ের উপরেই আমি ছেড়ে দিয়েছি । তারা সেখানে বলবেন আমি সেখানেই বিয়ে করবো !

নওরিন কথা বলেই শাফায়েতের দিকে তাকালো । সেখানে একটা কষ্টের রেখা দেখতে পেল । আরে বোকা ছেলে আমার বাবার কাছে সোজা বললেই তো হয় ! নওরিন খুব ভাল করে জানে যে শাফায়েত এমন একজন ছেলে তাকে কোন মেয়ের বাবাই না করবে না । সরকারী বিসিএস চাকরি তাও আবার এএসপি । এই ছেলেকে কেউ হাত ছাড়া করে । 

শাফায়েত আরও কিছু সময় বোকার মত সেখানেই দাড়িয়ে রইলো । তারপর আসি বলে হাটা দিল । নওরিন হাসি মুখে শাফাতের চলে যাওয়া দেখল । মনে মনে বলল তোমাক আরও একটু ঘোরাই, তারপর হ্যা বলবো । 

আজ সে হ্যা বলার দিন । কলেজের কাজ শেষ করে সরাসরি শাফায়েতের অফিসেই সে এসে হাজির । যদিও ভেবেছিল যে শাফায়ের আরও কয়েকবার তার কাছে যাবে । তবে শাফায়েত যায় নি । অবশ্য পুলিশের চাকরির চাপ অনেক । হয়তো সময় পায় নি। তাই নওরিন নিজেই চলে এসেছে অফিসে । 

অফিসের সামনে সামনে কামালকে দেখতে পেল সে । কামাল শাফায়ের অধিনস্ত একজন অফিসার । সব সময় শাফায়েতের সাথেই থাকতো । নওরিন কামালের দিকে তাকিয়ে বলল, কামাল সাহেব, আপনার স্যার কোথায়? 

কামালের চোখে একটু বিরক্ত দেখতে পেল নওরিন । একটু অবাক হল সে । কামাল তো এমন আচরণ করে না তার সাথে । বিশেষ করে শাফায়েত যে নওরিনকে পছন্দ করে সেটা খুব ভাল করেই জানে । 

কামাল শান্ত মুখে বলল, স্যার নেই । 

-কোথায় গেছে ।

কামাল বলল, স্যার চলে গেছেন। 

নওরিন একটু যে ধাক্কার মত খেল । তারপর অবাক হয়ে বলল, চলে গেছেন মানে ? কোথায় গেছেন?

-স্যার গত পরশু এখান থেকে ট্রান্সফার নিয়ে চলে গেছেন । 

নওরিন এটা শোনার জন্য মোটেই প্রস্তুর ছিল না । কামালের দিকে অবাক হয়ে কেবল তাকিয়ে রইলো । সে যেন কিছুতেই কথাটা ঠিক হজম করতে পারছে না । এমন একটা কথা ঠিক হজম হওয়ার মতও না । এমন কি কোন ভাবে হতে পারে?

নওরিনের মনেও হয় নি হতে পারে ।

কামাল বলল, আপনার কাছ থেকে অপমানিত হয়ে সে আর এখানে থাকতে পারে নি ।

নওরিন অবাক হয়ে বলল, অপমান ! আমি তো অপমান করি নি তাকে ।

-আমি সেদিক ছিলাম গাড়িতেই । স্যার আপনাকে নিজের মনের কথা বলেছিলেন । একদম অসহায়ের মত  করেই বলেছিলেন । এই দুই বছরে স্যারের সাথে চাকরিতে আমি তাকে কোন দিন এমন অস্থির আর অসহায় দেখি নি । বড় বড় সন্ত্রাসী এমন কি মন্ত্রী এমপিদেরকেও ছাড় কোন দিন বিন্দু মাত্র ছাড় দেন নি, মাথা নত করেন নি, তাদের কাছে আর আপনার কাছে স্বেচ্চায় নত হয়েছেন অথচ আপনি কী করলেন ! 

নওরিন কী বলবে খুজে পেল না । কেবল কামালের দিকে তাকিয়ে রইলো অবাক হয়ে । কামাল আবার বলল, আমি নিশ্চিত বুঝতে পেরেছিলাম যে স্যার আসলে যা বলেছিলেন আপনি তাতে সায় দেন কিংবা তাকে রিজেক্ট করেছেন । কাজটা ঠিক করেন নি ম্যাম !

-আপনার স্যার কোথায় গেছে ?

-সেটা আমি জানি না । স্যার আমাকে বলেন নি । ইভেন আমি জানলেও আপনাকে বলতাম না । এখন আপানি আসুন । আমার কাজ আছে ।

নওরিন কিছু সময় বোকার মত সেখানেই দাঁড়িয়ে রইলো । কী করবে ঠিক বুঝতে পারছিল না তবে মনের ভেতরে একটা অদ্ভুত আর অচেনা অনুভূতি হচ্ছে সেটা খুব ভাল করেই বুঝতে পারছে । বুঝতে পারছে যে কোথায় কিছু একটা যেন পরিবর্তন হয়েছে । কিছু একটা যেন ঠিক আগের মত আর নেই । 

পরের দুই দিন নওরিনের কিভাবে কাটলো সেটা নওরিন বলতে পারবে না । কলেজে গেল না । কারো ফোন ধরলো না, কারো সাথে কোন কথা পর্যন্ত বলল না । যেন নওরিনের সব কিছুর উপর থেকে মন উঠে গেছে । বারবার শাফায়েতের বলা সেই লাইনটাই মাথার ভেতরে ঘুরতে লাগলো । আমি আপনাকে ভয়ংকর ভাবে ভালোবাসি । দুইদিন পরে নওরিন নিজে বুঝতে পারলো যে সে শাফায়েতের প্রেমে পড়েছে । সেই ভয়ংকর প্রেম । যে প্রেমে শাফায়েতকে অসহায় করে দিয়েছিল, কারো সামনে যে ছেলে মাথা নত করে নি কোন দিন সেই শাফায়েত যেমন করে ওর কাছে ছুটে এসেছিল নওরিনও ঠিক সেই একই ভাবে শাফায়েতের প্রেমে পড়লো । 

বাসায় নওরিনের বিয়ের কথা বার্তা চলছিল অনেক ধরেই । বিশেষ করে বিসিএসে কলেজে শিক্ষিকা হওয়ার পর থেকেই ওর বাবা যেন ওর বিয়ে দেওয়ার জন্য উঠে পড়ে লেগেছিল কিন্তু মেয়ে বেশি শিক্ষিত হয়ে গেলে তার জন্য যুতসই পাত্র পাওয়া যায় না । মেয়ে যেখানে বিসিএস পাশ করা, জামাইও তেমন হতে হবে । 

নওরিন নিজ থেকেই যখন শাফায়েতের কথা বলল, তখন ওর বাবা মা দুজনের আনন্দিত হল । ছেলে এএসপি, এর থেকে ভাল পাত্র আর কী হতে পারে ! কিন্তু নওরিন এর পরে যা বলল তা শুনে দুজনের চোখ কপালে উঠলো । বিশেষ করে ছেলে নিজ মুখে নওরিনকে বিয়ের কথা বলেছিল এবং নওরিন তখন কিছু বলে নি । এই জন্য ছেলে এখান থেকে বদলি নিয়ে চলে গেছে । এবং নওরিন তাকে বিয়ে করতে চায় এই সব শুনে নওরিন মা খুব চিৎকার চেঁচামিচি করলো । আজকালকার ছেলে মেয়েদের ঢং বেশি এটাই বারবার বলতে লাগলেন । কিন্তু নওরিনের বাবা মেয়ের মুখের দিকে তাকিয়ে ছিলেন । তিনি আসলে বুঝতে পারলেন যে তার মেয়ের মনের অবস্থা । তাই তিনি আলাদা ভাবে কিছুই বললেন না নওরিনকে । 

দুই

শাফায়েতের এখন দিন প্রায় ঝামেলাহীণ ভাবেই কেটে যায় । ছোট এই মফস্বল শহরে খুব বেশি দৌড়ঝাপ নেই । আগের দিন নেই রাত নেই সব সময় অফিসে দৌড়াদৌড়ি চলতেই থাকতো তবে এখন সেটা কম । সময় করে অফিস যাওয়া তারপর চলে আসা । অবসর পাওয়া যায়।  আজও অফিস থেকে ফিরে এসে একটু ঘুমিয়েছিল সে । এমন সময় ফোনটা এল । ফোন করেছেন এসপি সাহেব । 

-স্যার গুড আফটার নুন ।

-কোথায় তুমি?

-স্যার বাসায় !

-শুনো বশির একটা কাজে গেছে রইস নগর । তুমি একটু বিনদপুরে যাও দেখি । ওখানে নাকি একটা চুরির ঘটনা ঘটেছে ।

শাফায়েত একটু বিরক্ত হল । সামান্য একটা চুরির ঘটনাতে ওকে পাঠানোর কোন দরকার আছে কি? এর জন্য তো একজন এস আই কে পাঠালেই হত । ওকে পাঠানোর কী হল ! তারপরেও এসপি স্যার যখন বলেছেন তখন তো শুনতেই হবে । জ্বী বলে সে ফোন কেটে দিল । তারপর তৈরি হয়ে নিল । কোয়াটার থেকে বাইরে বের হতেই গাড়ি এসে হাজির । গাড়িতে উঠে বলতেই গাড়ি চলতে শুরু করলো । 

১৫ মিনিট পরে গাড়িটা একটা বাসার সামনে এসে থামলো। শাফাতে দিকে তাকিয়ে পাশে বসা ড্রাইভার বলল, এই বাসা । দুই তলায় । 

শাফায়েত গাড়ির বাইরে বের হয়ে দেখলো । বিকেলে হয়ে এসেছে । তবে পাশে পাশে সব কিছুই স্বাভাবিক । কোন চাঞ্চল্য নেই । মনের ভেতরে আবারও সেই বিরক্তিটা ফুটে উঠলো । সামান্য এই কাজের জন্য ওকে এখানে পাঠানোর কোন মানে আছে !

সিড়ি ভেঙ্গে দুইতলাতে উঠে গেল শাফায়েত । দুই তলায় একটাই ইউনিট । দরজাটা হাট করে খোলাই রয়েছে । দরজার সামনে দাঁড়িয়ে ভেতরে তাকিয়ে দেখলো সে । ভেতরে তাকিয়ে দেখলো অনেক জিনিস পত্র এখনও আনপ্যাক করা হয় নি । সম্ভব নতুন এসেছে এখানে । এর ভেতরে চুরি হয়ে গেছে । 

দরজাটায় টোকা দিল সে । 

-কেউ আছেন?

ঠিক তার পরপরই ভেতরের দরজা দিয়ে একজন সামনে বের হয়ে এল । শাফায়েত চমকে উঠলো তাকে দেখে !

নওরিন !

ওর দিকে তাকিয়ে হাসলো । একটুও অবাক হয় নি ওকে এভাবে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে । তার মানে ও যে এখানে আসবে সেটা নওরিন জানতো । 

নওরিন খুব স্বাভাবিক কন্ঠে বলল, কই ভেতরে এও ।

দ্বিধা নিয়ে নওরিনের বাসার ভেতরে ঢুকলো  । ওর মাথায় এখনও ঠিক কিছু ঢুকছে না । কী হচ্ছে ওর সাথে । নওরিন ওকে আপনি করে না, তুমি করে বলছে । কি হচ্ছে এসব !

-তুমি পুলিশে খবর দিয়েছো? এসপি স্যারের কাছে !

-হ্যা । উনি আমার বাবার পরিচিত ! এখানে যে সরকারি কলেজটা আছে না, ওখানে পোস্টিং নিয়ে এসেছি । 

শাফায়েত একটু চমকালো । এটা ওর কাছে নতুন ছিল । নওরিন ওর শহরে এসেছে !

নওরিন বলল, ভেতরের ঘরে এসো তো, একটা বাল্ব লাগাতে হবে । 

-কী !

-আরে এসো তো । 

আবারও খানিকটা দ্বিধা নিয়ে সে নওরিনের সাথেই ভেতরের ঘরের দিকে রওয়ানা দিল । ঘরের ভেতরে ঢুকতেই আরেকবার অবাক হতে হল শাফায়েত কে । নওরিন শক্ত করে জড়িয়ে ধরলো শাফায়েতকে । এমন ভাবে জড়িয়ে ধরলো যেন কতদিনের পরে এই অপেক্ষায় সমাপ্তি হল ! শাফায়েত প্রথমে ঠিক বুঝতে না পারলেও পরে সব কিছু আস্তে আস্তে ওর কাছে পরিস্কার হয়ে এল । 

নওরিনের কাছ থেকে চলে আসার পরে নওরিন ওর খোজে গিয়েছিল, এই তথ্য সে কামালের কাছ থেকে শুনেছে । একবার ইচ্ছে হয়েছিল যে কামালকে বলতে যেন নওরিনকে ওর নতুন ঠিকানা দিয়ে দিতে । তবে সে বলে নি । নিজের কাছেই কোথায় যেন আটকে গিয়েছিল। ভেবেছিল সব কিছু এখানেই শেষ হয়ে যাবে । এখান এসে নওরিনকে মনে পড়েছে । নিজের কাছে অস্থির লেগেছে ঠিকই তবে এবার আর সে নিজের মনের উপর নিয়ন্ত্রন হারায় নি । তবে এখন এই ভাবে নওরিন ওকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে আছে, এখন সব কিছু, সব নিয়ন্ত্রন আবারো হারিয়ে গেল শাফায়েতের । নওরিনের আকুলতাও যেন ওকে পেয়ে বসলো । যে ভয়ংকর ভাবে নওরিনকে সে ভালোবেসেছিল সেটা মুহুর্তেই আবারস শাফায়েতকে আচ্ছন্ন করে ফেলল । শাফায়েতের কেবল মনে হল দুনিয়ার সব কিছু ওর কাছ থেকে গায়েব গেছে । এই জগতে কেবল ও আছে আর ওকে জড়িয়ে ধরে এই মেয়েটি আছে । আর কোন কিছু এখন ওর কাছে জরূরী নয় !

!

How useful was this post?

Click on a star to rate it!

Average rating 4.7 / 5. Vote count: 66

No votes so far! Be the first to rate this post.

About অপু তানভীর

আমি অতি ভাল একজন ছেলে।

View all posts by অপু তানভীর →

One Comment on “ভয়ংকর ভালোবাসা”

Comments are closed.