4.7
(15)

কথায় আছে যা হয় ভালোর জন্য হয় । সত্যিই কি ভালোর জন্য হয়?
সত্য মিথ্যা জানি না তবে আমার সাথে যা হচ্ছে সেটা ভাল কি খারাপের জন্য হয়েছে সেটা এখনও বুঝতে পারছি না । আপাতত আমি এখন চৌধুরী গ্রুপের হেড অফিসে বসে আছি । আমার থেকে একটু দুরে আনিকাকে দেখতে পাচ্ছি । আমি জানতাম আনিকা এই চৌধুরী গ্রুপেই চাকরি করে কিন্তু আজকে আমার সাথে যে দেখা হয়ে যাবে সেটা আমি মোটেও ভাবতে পারি নি।

আনিকা আমার দিকে এগিয়ে এল । তারপর কঠিন কন্ঠে বলল, অপু তোমাকে আমি বলেছি আমার পিছু না নিতে ! আমি এখানে চাকরি করি । আমি তো তোমাকে বলেছি আমাদের মাঝে যা ছিল সব শেষ হয়ে গেছে । এখন আর কিছু হবে না । তুমি এখনই চলে যাও এখান থেকে । নয়তো আমি গার্ড ডাকবো !

আমি আনিকার দিকে কিছু সময় তাকিয়ে রইলাম । ওকে অবশ্য দোষ দিতে পারি না আমি । যখন আনিকা আমার সাথে ব্রেক আপ করেছিলো তখন ওর পেছন পেছন খুব ঘুরেছি আমি । অনেক বার ফোন করেছি । এখন এখানে আমাকে দেখে ওর ধরে নেওয়া স্বাভাবিক যে আমি বুঝি ওর জন্যই এখানে এসেছি । আমি কিছু সময় ওর দিকে তাকিয়ে রইলাম । তারপর বললাম, ডাক গার্ডকে । আমি এখানে তোমার কাছে আসি নি ।
-মানে ?
-মানে হচ্ছে আমি এখানে জয়েন করতে এসেছি ।
আনিকার চেহারাটা যেন ঝুলে পড়লো । আমার দিকে অবিশ্বাসের চোখে তাকিয়ে রইলো কিছু সময় । তারপর বলল, মানে যে নতুন এসিস্ট্যান্ট ম্যানেজার ! ওটা তুমি?
-হ্যা আমি !

আনিকা চোখ বড় বর করে আমার দিকে কিছু সময় তাকিয়ে রইলো । আমি জানি এই ব্যাপারটা হজম করতে ওর একটু কষ্ট হচ্ছে । হওয়ারই কথা । ঠিক যে জিনিসটা না থাকার কারণে আনিকা আমার সাথে ব্রেক আপ করেছিলো আজকে সেই ব্যাপারটাই ওর সামনে নিয়ে আমি হাজির হয়েছি । আবারও উপরওয়ালার খেলা ঠিক বুঝতে পারলাম না । তাই বলে একেবারে আনিকার অফিসেই আমার চাকরি হবে সেটা আমি কোন দিন ভাবতেও পারি নি । এমন কি এই চাকরিটা হবে সেটাও আমি বিশ্বাস করতে পারি নি ।

মাস খানেক আগের কথা । আনিকা আমাকে ছেড়ে গিয়েছে তখন । নিজের ভেতরেই খুব বেশি ভেঙ্গে পড়েছি । কারণ আপন বলতে কেবল মাত্র আনিকাই ছিল আমার । বাবা তো মারা গেছে অনেক আগেই । মাও আমাকে ছেড়ে চলে গেছে বছর দুয়েক আগে । তাই আনিকার উপরে আমি বেশ নির্ভরশীল হয়ে পড়েছিলাম । সেই আনিকা যখন আমাকে ছেড়ে চলে গেল তখন মনে হচ্ছিলো বুঝি জীবন রেখে আর লাভ কি ! সেদিনই ভেবেছিলাম মরে যাবো । নিজের ফ্ল্যাটে মরে পরে থাকলে হয়তো কেউ জানতেও পারবে না যতক্ষণ না গন্ধ ছড়াবে । তবে মরতে যে সাহস লাগে সেটা সম্ভবত আমার ছিল না ।

ঐদিন বিকেল বেলা আমার কাছে ফোন আসলো । আমার কাছে জানতে চাইলো যে আমি চৌধুরী গ্রুপে যে চাকরির জন্য এপ্লাই করেছিলাম সেটার জন্য আমাকে ইনটারভিউতে ডাকছে ওরা । সময় এবং ঠিকানা আামর মেইলে মেইল করা হয়েছে । আমি চাকরির জন্য বেশ চেষ্টা করছিলাম । কত স্থানে এপ্লাই করেছিলাম সেটা আমার নিজেরও মনে নেই । চৌধুরী গ্রুপেও করেছিলাম নিশ্চয়ই । মেইল খুলে দেখলাম সত্যিই একটা মেইল এসেছে । ধানমণ্ডির ওদের ব্রাঞ্চে আমাকে ডাকা হয়েছে ইন্টারভিউয়ের জন্য । যথা সময়ে আমি হাজির হয়েও গেলাম । আমার সাথে আরও কয়েকজন ছিল । ইন্টারভিউতে স্বয়ং এমডি বসে ছিল আমি যতদুর জানি । কারণ আসার আগে চৌধুরী গ্রুপের ওয়েবসাইট আমি ঘুরে এসেছিলাম । স্বয়ং এমডি আমার ইন্টারভিউ নিলেন । কাজের প্রশ্ন কিছুই করলেন না । কি করি কোথায় থাকি, পরিবারে কে কে আছে এই সব জানতে চাইলেন কেবল । আমার বাবা মা নেই জেনে একটু দুঃখ প্রকাশ করলেন । আমি ভাবি নি চাকরিটা আামর হয়ে যাবে । যখন এপোয়েন্টমেন্ট লেটার হাতে এল তখনও না । আমি জুনিয়র অফিসারের জন্য ইন্টারভিউ দিয়েছিলাম । আমাকে দেখি একেবারে এসিস্ট্যান্ট ম্যানেজার বানিয়ে দিয়েছে । এমনও হয় নাকি !

আনিকা আমার দিকে তখন অবাক হয়েই তাকিয়ে রয়েছে । ওর যেন একদমই বিশ্বাস হচ্ছে না আমার কথা বার্তা । অবশ্য ওকে এখন আর পাত্তা দিতে ইচ্ছে করছে না । আমার কেন জানি মনে হচ্ছে আনিকাই আমার জীবনের কাল ছিল । ওর থেকে আলাদা হওয়ার পরপরই সব কিছু ভাল ভাল হওয়ার শুরু করেছে ।

জয়েন করার পর সবার সাথে পরিচিত হলাম । কাজ কর্ম শুরু হল । বিকেল বেলাই এমডির রুমে ডাক পড়লো । এমডির নাম আযাদ আহমেদ চৌধুরী । মূলত এই গ্রুপটার মালিকের নাম আফসার আহমেদ চৌধুরী । উনি কোম্পানির চেয়ারম্যান । তবে বয়স হয়ে যাওয়ার কারণে এখন অফিসে নিয়মিত আসেন না । আমি এমডির রুমে গিয়ে হাজির হলাম । আজও তিনি আমার সাথে খুব চমৎকার ভাবে কথা বললেন । এমন ভাবে সব কিছু জিজ্ঞেস করলেন যেন আমার তার নিকট আত্মীয় । আমার কাছে একটু যেন কেমন লাগলো ব্যাপারটা । কোন কোম্পানীর এমবি কি তার এম্প্লোয়ীর সাথে এমন আচরন করে? না আমি বলছি না যে তারা খারাপ ব্যবহার করে কিন্তু এমডির আচরন আমার কাছে একটু অস্বাভাবিক লাগলো । এতো মোলায়েম কেন !

আযাদ স্যার বললেন, তুমি আরিয়ানার সাথে পরিচিত হয়েছো?
বললাম, জি না । উনার সাথে এখনও পরিচিত হই নি ।

তখনই পেছন থেকে আওয়াজ শুনলাম না ।
-তুমি নিশ্চিত আমাকে চিনো না?
আমি পেছন ঘুরে তাকালা । আরেকবার ধাক্কার মত খেলাম ! মনে মনে বললাম, এই মেয়ে এখানে কি করছে? আচ্ছা তাহলে কি এই মেয়ের কারণেই আমি আজকে এখানে এসেছি ! এই তাহলে আরিয়ানা আহমেদ চৌধুরী । এই কোম্পানীর উত্তরাধিকারিনী !

দুই

সকালের নাস্তা আমি সাধারনত বাইরে থেকেই করি । বাসায় রান্তা করতে ইচ্ছে করে না । তবে আজকে কেন জানি নিজ হাতে নাস্তা বানাতে ইচ্ছে করলো । অবশ্য এর পেছনে একটা কারণ রয়েছে । আজকে জীবনের প্রথম বারের মত আমি একটা কাজ করেছি। অন্য কোন সময় হলে ব্যাপারটা আমার কাছে খারাপ লাগতো কিন্তু এখন মোটেও খারাপ লাগছে না । খারাপ না লাগার কারণ হচ্ছে এখন আমি আর আনিকার বয়ফ্রেন্ড নই । ওর সাথে সব ধরনের সম্পর্কে শেষ হয়ে গেছে । আনিকা নিজ থেকেই সব সম্পর্ক নষ্ট করে দিয়েছে । আমমি তারপরেও বেশ কয়েকবার গিয়েছি ওর কাছে । ওকে ফিরিয়ে নিয়ে আসার চেষ্টা করেছি কিন্তু লাভ হয় নি । ও আমার সাথে দেখা করতেই ঠিক রাজি হয় নি । এই কারণেই হয়তো নিজের মধ্যে আমি খুব হতাশায় ভুগছিলাম । সেই হতাশা থেকেই আমি গতরাতে হাজির হয়েছিলাম বাসার কাছেই নাইট ক্লাবে । এই ক্লাবে আমি খুব একটা আসি নি এর আগে । তবে কাল কি মনে হল চলে এলাম । কয়েক পেগ পেটে যাওয়ার পরে কেমন একটা অদ্ভুত অনুভূতি হল মনের ভেতরে । সেখানেই মেয়েটার সাথে পরিচয় । তারপর কিভাবে মেয়েটাকে নিয়ে আমার বাসায় এসে হাজির হলাম আমি নিজেও জানি না । জীবনে প্রথম বারের মত আমি এই কাজটা করলাম ।

সকাল বেলা যখন ঘুম ভাঙ্গলো তখন দেখি মেয়েটা আমার পাশেই ঘুমিয়ে রয়েছে । আমার কেন জানি মোটেই মন খারাপ হল না কিংবা মনের ভেতরে কোন অপরাধ বোধ জাগলো না । বরং মনে হল মেয়েটাকে সকালের নাস্তা খাওয়ানো যাক । সেই চিন্তা থেকে নাস্তা বানাতে বসলাম । অবশ্য নাস্তার পরিমান খুব বেশি উন্নত না । ডিম দিয়ে পাউরুরি ভাজলাম । রাতে মাংশ ছিল সেগুলো ভেজে একেবারে শুকনো শুকনো করে ফেললাম । সাথে জেলি আর কফি । ব

নাস্তা যখন প্রায় রেডি তখনই দেখতে পেলাম মেয়েটা রুম থেকে বেরিয়ে এল । এরই ভেতরে ফ্রেশ হয়ে গেছে । পোশাক পরে বাইরে বের হওয়ার জন্য প্রস্তুত । আমাকে দেখে হাসলো একটু । তাপরর টেবিলে বসে পড়লো ।
পাউরুটি মুখে দিতে দিতে মেয়েটা বলল, তুমি বাসায় একা থাকো ?
-হ্যা ।
-বাবা মা কোথায় ? বাইরে থাকে বুঝি?
-না । তারা নেই ।
-নেই মানে?
-মানে মারা গেছে ।
-ওহ ! সরি । মানে তুমি একদমই একা থাকো?
-হ্যা । আম্মু নেই বছর দুয়েক । তারপর থেকে একাই ।
-কোন আত্মীয় স্বজন ? মামা খালা চাচা?
-নেই।
-কেউ নেই?
-উহু । কেউ না ।
সত্যিই আমার কেউ নেই । ছোট বেলা থেকে দেখেছি আমাদের বাসায় কখনই কোন আত্মীয় স্বজন বেড়াতে আসে নি । কিংবা আমরা কোন দিন কারো বাসায় বেড়াতে যাই নি । পরে অবশ্য আমি কারণটা জানতে পেরেছিলাম ।

মেয়েটা নাস্তা শেষ করে উঠে পড়লো । আমার দিকে তাকিয়ে বলল, ওকে আমি এখন যাই ।
দরজা পর্যন্ত গিয়ে তাকে বললাম, আবার কি দেখা হবে ?
-না হওয়াই ভাল । এই রাত যেভাবে কেটেছে যাক । রাত গেই বাত গেই ।
আমি হাসলাম । তারপর বললাম, অন্তত তোমার নামটা বলে যাও ।
-কেন নাম জেনে কি করবে শুনি?
-না মানে জীবনে প্রথমে কারো এতো কাছে এসেছি । নামটা অন্তত জানি ।
মেয়েটা আমার দিকে অবিশ্বাসের চোখে তাকালো । তারপর বলল, মিথ্যুক ।
-সত্যি । ইয়েসটারডে ওয়াজ মাই ফার্স্ট টাইম ।
-রিয়েলি ! প্রথম পারফরমেন্স হিসাবে নট ব্যাড !

মেয়েটা চলে গেল । নাম বলল না । সেটা মাস খানেক আগের ঘটনা । আর আজকে আমি যখন এই অফিসে জয়েন করছি তখন জানতে পারলাম যে মেয়েটার নাম আরিয়ানা আহমেদ চৌধুরী !

তিন
কাকতালাীয় ব্যাপার তো হতে পারে না মোটেই । আমার এখানে চাকরির পেছনে মেয়েটার হাত নিশ্চিত ভাবেই আছ।
এমডি স্যার বললেন, তুমি আরিয়ানার সাথে যাও । আপাতত আরিয়ানা তোমাকে সব কিছু বুঝিয়ে শুনিয়ে দিবে ।

আমি আরিয়ানার সাথে বের হয়ে এলাম কেবিন থেকে । বের হওয়ার মুখে আনিকার সাথে দেখা হয়ে গেল । আনিকা আমার দিকে এখনও কেমন অদ্ভুত চোখেই তাকিয়ে রয়েছে । ওর সম্ভবত এখনও বিশ্বাস হচ্ছে না যে আমি এই অফিসে চাকরি করছি । ওর বিশ্বাস হবে কি, আমার নিজেরই তো বিশ্বাস হচ্ছে না ।

আমার জন্য আলাদা কেবিনের ব্যবস্থা করা হয়েছে । আরিয়ানা আমার সাথেই প্রবেশ করলো কেবিনে । আমার দিকে তাকিয়ে বলল, তা অফিস কেমন লাগছে ?
-ভাল । মানে ভাল বললে কম বলা হবে ! আই গেস এসবের পেছনে তোমার হাত রয়েছে ।

আরিয়ানা হাসলো । তারপর বলল, বলতে পারো । আর এখন আমাদের একজনকে দরকার ছিল । সাম ওয়ান ইউ ক্যান ট্রাস্ট !
-একদিনের পরিচয়েই আমার উপরে এতো বিশ্বাস স্থাপন করে ফেললে !

আমার এই প্রশ্নের জবাব আরিয়ানা দিলো না । কেবল মুখ টিপে হাসলো ।

একটা মাস কিভাবে কেটে গেল কিছুই বুঝতে পারলাম না । সারাদিন অফিসে ব্যস্ত থাকি । রাতে এসে ঘুমাই । সময় যে কখন কিভাবে কেটে যায় টেরই পাই না । তবে সময় কাটে ভাল । বিশেষ করে আরিয়ানার সাথে আমার সময় বেশ ভাল কাটে । কাজ যেহেতু এক সাথেই করি । এর ফাঁকে আরও একটা ব্যাপার আমি আবিস্কার করেছি । সেটা হচ্ছছে আনিকা আমাকে এই জন্য ছেড়ে যায় নি আমি চাকরি বাকরি কিছু করি না, ওফ ফ্যামিলিকে কি বলবে এই সব রবং ও আমাকে এই জন্য ছেড়ে গেছে যে নতুন কাউকে সে পেয়েছে। এ অফিসেই চাকরি করে সে । সব সময় আমি ওদের দুজনকে এক সাথে দেখি ।

আরিয়ানাকে বলতেই আরিয়ানা বলল, হ্যা ওরা সেই কবে থেকেই এক সাথে । মানে প্রায়ই দেখি অফিসের পর এক সাথে বের হয় । লাঞ্চ আওয়ারে এক সাথে গল্প করে ।
-কবে থেকে এই কাজ করে ।
-তাও বছর খানেক । মানে আনিকা জয়েন করার পরপরই । কেন?
-কারণ গত দুই বছর ধরে এই মেয়ে আমার গার্লফ্রেন্ড ছিল ।
আরিয়ানা চোখ বড় বড় করে বলল, রিয়্যালি?
-ইয়েস । তোমার সাথে যেদিন দেখা হল তার মাস খানেক আগে ও আমার সাথে ব্রেক আপ করেছে।

আরিয়ানা কিছু সময় আমার দিকে তাকিয়ে থেকে বলল, দেখো ব্রেক আপের নতুন সম্পর্কে জড়ালে কোন কথা নেই । কিন্তু একজনের সাথে প্রেম থাকা অবস্থায় অন্য কারো সাথে সম্পর্ক স্থাপন করাটা চিটিং । এই মেয়েকে একটা শিক্ষা দিতে হবে ।

আরিয়ানা কি শিক্ষা দিব ঠিক করেছে সেটা টের পেলাম দুই দিন পরেই । ঠিক দুইদিন পরে আনিকা আমার কেবিনে এসে হাজির । আমি ওর দিকে তাকিয়ে বললাম, কি ব্যাপার কোন দরকার ছিল ?
-তুমি আমার সাথে এই কাজটা করতে পারলে?
আমি খানিকটা অবাক হয়ে বললাম, কোন কাজটা?
-তুমি নাফিকে ট্রান্সফার করিয়েছো?

আমি প্রথমে কিছু বুঝতে পারলাম না । বললাম, নাফিটা কে?
আমার কথা শুনে আনিকাও যেন একটু অবাক হল । বলল, তুমি চেনো না নাফিকে?
-না । আমার কি চেনার কথা ?
-ও সেলসে রয়েছে ।
-তো আমি করবো বলতো ? আমি আসলেই বুঝতে পারছি না তুমি কি বলতে চাইছো?

আনিকাও কি বলবে সেটা যেন বুঝতে পারলো না । যে কথা বলতে এসেছিলো সম্ভবত সেটা বলতে পারছে না এখন । অবশ্য আর সেটা বলার সুযোগ পেল না । এমন সময়ই আরিয়ানা ঢুকলো ঘরে । আনিকার দিকে তাকিয়ে বলল, মিস আনিকা ।
-ইয়েস ম্যাম ।
-আপনার পজিশন কি অফিসে?
-আমি ম্যাম ফ্রন্ট ডেস্ক ম্যানেজার ।
-আর মিস্টার আহমেদের পজিশন কি কোম্পানিতে ?
-এসিস্ট্যান্ট ম্যানেজার ।
-তাহলে আপনি তাকে তুমি করে কেন সম্মোধন করছন?

আনিকা একটু যেন থতমত খেয়ে গেল । আমি নিজেও একটু অবাক হলাম । এমন একটা কথা যে আরিয়ানা বলতে পারে সেটা আমি নিজেও বুঝতে পারি নি । আনিকা কোন মতে বলল, আসলে ম্যাম আপরা আগে থেকে পরিচিত ।
-ব্যক্তিগত পরিচয় অফিসের বাইরে । অফিসের ভেতর প্রোপার ম্যানার দেখতে চাই আমি । আজকে থেকে তাকে স্যার বলে সম্মোধন করবেন । মনে থাকবে কি?
-ইয়েস ম্যাম ।
-গুড । আপনি এখন যেতে পারেন ।

আনিকা চলে যাওয়ার পরপরই আমি একটু ভয়েভয়ে আরিয়ানার দিকে তাকালাম । এখন আমাকেও আনিকাকে ম্যাম বলে ডাকতে হবে !
আরিয়ানা আমার দিকে তাকিয়ে বলল, কী ব্যাপার ? এমন চোখে তাকিয়ে কেন আছো?
-না মানে আমাকে কি এখন ম্যাম বলে ডাকতে হবে ?
-ডাকতে পারো !
বলে হাসলো সে ।
আমি বললাম, আচ্ছা নাফিটাকে ?
-কেন?
-আনিকা কি যেন বলল আমাকে ! নাফির ব্যাপারে । অথচ আমি এই নাফিকে চিনিই না ।
আরিয়ানা মিটি মিটি হাসলো । তারপর বলল, এই নাফিই হচ্ছে সেই জন যার সাথে তোমার এক্সের এক বছর ধরে ….
-ও ! তো কি হয়েছে ! তুমি আবার চাকরি থেকে নট করে দাও নি তো !
-আরে না । চাকরি থেকে নট করে দিলে তো আমার আয়ত্তের বাইরে চলে যাবে । এটা তো করা যাবে না মোটেও ।
-তাহলে কী করেছো?
-কেবল বদলি করে দিয়েছি । এখন সে যাবে চট্রগ্রাম । দুজন আলাদা । এবং আমি নিশ্চিত তোমার ঐ প্রেমিকা আবারও তোমার কাছে ফিরে আসতে চাইবে।

আমি আরিয়ানার দিকে তাকিয়ে রইলাম । এই মেয়ে দেখি খুব আত্মবিশ্বাসের সাথে বলছে । অবশ্য আমি আনিকাকে যতদুর চিনি আনিকা এমন কিছু হয়তো করবে না । আর এছাড়া চক্ষু লজ্জা বলে তো একটা ব্যাপার আছে । ও আমার সাথে যে আচরণ করেছে যদি ও নিজের লজ্জা থাকে তাহলে আমার কাছে অন্তত আর ফিরে আসতে চাইবে না। আমি বললাম, নাহ ও আসবে না ।
-আসো বাজি ধরা যাক ।
-ওকে । কি বাজি ধরবা ?
-যদি আমি জিতি তাহলে আমি যা বলবো তোমাকে শুনতে হবে । আর যদি তুমি জেতো তাহলে তুমি যা চাও তাই দেব ।
-আমি যা চাইবো তাই দিবে ?
-হ্যা । তাই দিবো ।
-মনে থাকে যেন ।

চার

যদিও বললাম তবে কেন জানি মনে আরিয়ানা জিতে যাবে । এবং হলও তাই । নাফি সাহেবকে বদলি করার সপ্তাহ খানেক যাওয়ার পরপরই ব্যাপারটা আমি অনুভব করতে পারলাম । কেউ যদি আপনাকে ইম্প্রেস করতে চায় আপনি সেটা ঠিকই বুঝতে পারেন । আর আমি কি পছন্দ করি না করি সেটা আনিকা খুব ভাল করেই জানে । আমি আস্তে আস্তে লক্ষ্য করা শুরু করলাম আনিকা ঠিক সেই কাজ গুলোই করতে শুরু করেছে । রিলেশনে থাকার অবস্থায় আমি ওকে ঠিক যে ধরনের পোশাক পরতে বলতাম, হাতে মেহেদী কিংবা চোখে কাজল দেওয়া চুল ছাড়া এই সব ব্যাপার গুলো লক্ষ্য করতে শুরু করলাম । বুঝতে কষ্ট হল না যে আনিকা আমার নজরে পড়তে চাইছে । তবুও আমি এসব এড়িয়ে চলেই যেতাম কিন্তু যখন আনিকা আমার জন্য ভুনা খিচুড়ি রান্না করে নিয়ে এল তখন ব্যাপারটা একেবারে পরিস্কার হয়ে গেল । গরুর ভূনা খিচুড়ি আমার খুব পছন্দ ।

খিচুড়ি বক্সটা আমি টেবিলে রেখে আরিয়ানার জন্য অপেক্ষা করতে লাগলাম । ও লাঞ্চ আওয়ারে এল আমার কেবিনে । আমি ওর দিকে তাকিয়ে বললাম, ইউ উইন ।
-মানে ?
আমি খিচুড়ির বাক্স টা দেখলাম ওকে ।
তারপর এই কদিনে আনিকা কি কি করেছে সেটা বললাম। আরিয়া মুচকি হাসতে হাসতে বললাম, কি বলেছিলাম না !
-হুম ! এখন বল কি করতে হবে!
-এখন না । পরে বলব । আগে চল তোমার এক্সকে একটু ধাক্কা দিয়ে আসি ।
-ধাক্কা মানে ?
-আরে চল তো …

এই বলে আরিয়ানা এক প্রকার আমাকে টেনেই নিয়ে গেল । লিফটে করে আমাকে ছাদে নিয়ে গেল সে । এখানে লাঞ্চ আওয়ারে অনেকেই আসে ছাদের কিছুটা অংশ ছাউনি দেওয়া। সেখানে চেয়ার পাতা রয়েছে কিছু। আমিও মাঝে মাঝে আসি নয়তো ক্যান্টিনে যাই । ছাদে এসে দেখি আনিকা একটা চেয়ারে বসে মোবাইল টিপছে । তবে আজকে এখানে বেশি মানুষ নেই । আরিয়ানা আমাকে এমন ভাবে ছাদের কোনার দিকে নিয়ে গেল যাতে আনিকা ভাল করে দেখতে পারে আমাদেরকে । ছাদের এক পাশে নিয়ে গেল আমাকে । আমি জানি আনিকা আমাদের কে দেখতে পাচ্ছে । আরিয়ানা চাচ্ছে যেন আনিকা আমাদেরকে দেখুন ।
তখনই আরিয়ানা একটা ভয়ংকর কাজ করে ফেলল । ছাদে আমরা ছাড়াও আরও কয়েকজন কর্মী ছিল । তাদের মুখ পর্যন্ত হা হয়ে গেল । আমি কখনও ভাবতেও পারি নি যে আরিয়ানা এমন একটা কাজ করতে পারে । সবার সামনে আরিয়ানা এভাবে আমাকে চুমু খাবে আমি ভাবতেও পারি নি ।
চুমু খাওয়া শেষ করে আরিয়ানা আমার দিকে এমন ভাবে তাকালো যেন খুবই স্বাভাবিক একটা কাজ সে করেছে । লিফট দিয়ে যখন নিচে নামছি তখন ওকে বললাম, কি করবে আগে থেকে একটু বলবা তো !
আরিয়ানা কেবল হাসলো ।
আমি বললাম, ওকে দেখানোর জন্য এই কাজটা যে করলে অন্য সবাই যে দেখলো । সবাইকে দেখানোর দরকার কি!
আরিয়ানা বলল, কেবল তো আনিকা দেখানোর জন্য কাজটা করি নি ।
-তাহলে?
-সবাইকে দেখানোর জন্যই করেছি । যাই হোক। টের পাবে।
-মানে কি?
আরিয়ানা রহস্যময় হাসি দিয়ে বলল, সময় হোক টের পাবে সব !

চলবে……

চাইনিজ/কোরিয়ান নভেল এপস গুলোতে এই ধরনের থিম খুব কমন । এই থিমটাও তেমনই একটা থিম থেকে এডোপ্ট করা।

How useful was this post?

Click on a star to rate it!

Average rating 4.7 / 5. Vote count: 15

No votes so far! Be the first to rate this post.

Related Posts

7 thoughts on “উত্তরাধিকার

  1. ভাই দয়া করে চলবে মার্কা গল্প দিয়েন না।
    গল্প যতই বড় হউক একবারে দিবেন।
    এত ভালো লাগার বিষয়ের জন্য অপেক্ষা করতে ইচ্ছে হয় না
    পর্ব আকারে দিলেও একসাথে দিয়েন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *