0
(0)

ইরার এখনও ঠিক বিশ্বাস হচ্ছে না যে রেহান ওর সামনে হাটু গেড়ে বসে আছে । পুরো অফিসের সামনে ছেলেটা ওকে প্রোপোজ করছে ! চোখ বড় বড় করে কেবল তাকিয়ে রয়েছে সামনের দিকে । রেহানের চোখের দিকে । ইরার মনে হল যে আশে পাশে আর কেউ নেই । কেবল ওরা দুজন রয়েছে । আর কেউ নেই ।

রেহান আবারও বলল, আই এম নট গুড এট টকিং । ইউ নো দ্যাট ! কি কি বলতে হয় কিভাবে বলতে হয় জানি না । সরাসরি কথা বলতে ভালোবাসি আমি । ইরা হাসান, উইল ইউ ম্যারি মি !

ইরার এখন কি বলা উচিৎ ?

হ্যা বলবে?

অবশ্যই হ্যা বলা উচিৎ । এমন একটা মানুষ সে আর কোন দিন খুজে পাবে? পাওয়া কি সম্ভব? না কোন দিন সম্ভব না । কিন্তু মানুষটার আগে একবার বিয়ে হয়েছিলো । এটা অফিসের সবাই জানে । সেই মেয়েটা মারা গিয়েছিলো । কত মানুষেরই তো বউ মারা যায়. জন্ম মৃত্যুর উপর কি মানুষের কোন হাত আছে?

ইরা বলল, ইয়েস !

ইয়েস শব্দটা কিভাবে বলল সেটা ও নিজেও জানে না । কেবল মনে হল যে কেউ যেন ওকে দিয়ে ইয়েস বলিয়ে নিল । নিজের কাছেই অবাক হয়ে গেল । ইরা দেখলো রেহান এগিয়ে আসছে । ওর হাত ধরে হাতে আংটিটা পরিয়ে দিল । সাথে সাথেই হাত তালির আওয়াজ শুনতে পেল ও । তখনই মনে হল ও অফিসেই দাড়িয়ে রয়েছে । সবাই দেখছে ওকে । হাতের ভেতরে আংটিটার দিকে তাকিয়ে রইলো কিছু সময় ধরে । কেমন একটা অদ্ভুত আকর্ষন সৃষ্টি হল ওর নিজের ভেতরেই ।

রেহানকে ও চেনে যেদিন অফিসে জয়েন করেছে সেদিনই । অফিসের সব থেকে জনপ্রিয় এপ্লোয়ী সে । তবে ও যেদিন অফিসে জয়েন করে ঠিক তার পরের দিনই রেহানের স্ত্রী মারা যায় । আত্মহত্যা করেছিলো সে । রেহান অফিসেই ছিল যখন খবরটা আসে । তারপর ধীরে মানুষটাকে সে দেখেছে একেবারে চুপসে যেতে । সবার কাছে শুনেছে যে রেহান নাকি খুব হাসিখুশি মানুষ ছিল । সবার সাথে খুব মিশুক ছিল । বিশেষ করে মেয়েদের কাছে সে ছিল খুব বেশি জনপ্রিয় । সেই মানুষটা একেবারে চুপচাপ হয়ে গিয়েছিলো বেশ কিছুদিন ।

আরেকটা ব্যাপার ইরা খেয়াল করেছিলো ওর স্ত্রী মারা যাওয়াতে অফিসের কয়েকজন যেন একটু খুশিই হয়েছিলো । এবং তারা রেহানের পেছনে লেগেছিলো তারপর থেকেই যাতে রেহান ওদের দিকে ঝুকে পড়ে । কিন্তু এই ছেলেটা যেন নিজের মৃত স্ত্রীকে ফেলে অন্য কাউকে নতুন করে নিজের জীবনের সাথে যুক্ত করতে চাইছিলো না । একটা বছর এভাবেই কেটে গেল । তারপর থেকেই ইরা লক্ষ্য করতে শুরু করলো যে রেহান আবার সবার সাথে মিশতে শুরু করেছে এবং সেই মেলামেশার ভেতরে ইরার দিকে যেন একটু আলাদা লক্ষ্য দেওয়া শুরু করেছে । ব্যাপারটা একই সাথে ইরাকে খানিকটা অস্বস্তিতে এবং খানিকটা আনন্দিত করে তুলছিলো । তারপর একটা সময়ে ইরা বুঝতে পারলো যে রেহান ওকে পছন্দ করতে শুরু করেছে । এবং আজকে ওকে প্রোপোজ করে ফেলল । ইরা তাতে রাজিও হয়ে গেল ।

তারপরের ঘটনা সব ঘটলো খুব দ্রুত । এক মাসের ভেতরে ইরার বিয়ে হয়ে গেল রেহানের সাথে । পাত্র হিসাবে রেহানকে না বলার কোন কারণ ছিল না । খুব ভাল চাকরি করে সে । এছাড়াও তাদের পারিবারিক সম্পত্তি রয়েছে অনেক । শহর থেকে একটু দুরে বিশাল বাড়িতে যে থাকে । বেশ কয়েকটা ফ্ল্যাট বাড়ি রয়েছে । দোকান রয়েছে । কেবল একটাই সমস্যা রেহানের এই জগতে কেউ নেই । ও একদম একা । এটা নিয়ে ইরার বাবা একটু ইতস্তর করছিলো তবে ইরার ইচ্ছের কাছে সেটা টিকলো না । ইরা মাঝে মাঝে নিজের উপরেই অবাক হয়ে গেল । রেহানের উপর এতোটা আসক্ত সে কবে হয়ে গেল । এমন তো হওয়ার কথা ছিল না । কিন্তু হয়েছে । যেদিন থেকে রেহান ওকে বিয়ের জন্য প্রস্তাব দিয়েছে এবং যেদিন থেকে রেহানের দেওয়া আংটিটা ও হাতে পরেছে সেদিন থেকে রেহানের প্রতি একটা আলাদা আকর্ষণ অনুভব করছে । এই আকর্ষণের ব্যাখ্যা ইরার কাছে নেই । সুতরাং বিয়ে হয়ে গেল ওদের ।

বিয়ের পরপরই ইরা প্রথম যে ধাক্কাটা খেল সেটা হচ্ছে শহরের বাইরের বিশাল একটা বাড়িতে ও আর রেহান পুরোপরি একা থাকে । দুইতলা দুর্গের মত বাড়ি । কম করে হলেও ত্রিশ চল্লিশটা ঘর রয়েছে যার বেশির ভাগই তালা মারা । কয়েকটা ঘর ওদের ব্যবহারের জন্য । পুরো বাড়িতে দিনের বেলা দুজন কাজের লোক থাকে আর একজন রান্নার মানুষ । তবে তারা সন্ধ্যা হলেই চলে যায় । সন্ধ্যার পর থেকে পুরো বাসায় তারা কেবল দুজন মানুষ থাকবে । ইরার প্রথম দিনই মনে হল এই পুরো বাড়ির ভেতরে কোন একটা অস্বাভবিকতা রয়েছে । যে ঘোরের ভেতরে সে ছিল সেটাও যেন কেটে গেল বিয়ের পরদিনই ।

দুই

লম্বা করিডোরটার এক মাথায় দাড়ালো অন্য মাথাটা পরিস্কার ভাবে দেখা যায় না । কোন বাড়ির এতো লম্বা করিডোর হতে পারে সেটা নিজ চোখে না দেখলে ইরার মোটেও বিশ্বাস হত না । নিজেকে ওর কোন ভৌতিক উপন্যাস কিংবা মুভির চরিত্র মনে হচ্ছে এখন । দোতলায় নিজের ঘরের দরজার সামনে দাড়িয়ে রয়েছে সে । তাকিয়ে রয়েছে করিডোরের শেষের দিকে । এই দিনের বেলাতেও কেমন অন্ধকার হয়ে আছে । ওদিকের প্রায় সব ঘর গুলোই বন্ধ । দোতলায়তে সব মিলিয়ে চারটা ঘর ওরা ব্যবহার করে । একটা ওর আর রেহানের শোবার ঘর যেটার সামনে ও দাড়িয়ে রয়েছে । ঠিক তার পাশেরটা হচ্ছে রেহানের স্টাডি কাম লাইব্রেরী । তার পাশেরটা জিম হিসাবে ব্যবহার করে । তার পাশের রুমটাতে ওদের ব্যবহারের জিনিস পত্র রয়েছে । জামা কাপড়ের জন্য আলমারি ওয়্যারড্রফ আর দরকার কিছু জিনিস পত্র রাখা । এর পরের রুম সব রুম গুলো তালা মারা ।

নিচ তলাতে কয়েকটা রুম রয়েছে ব্যবহারের জন্য । বসার ঘর, তার সাথেই বড় ডাইনিং স্পেশ। রান্না ঘর, কাজের লোকদের দিনের বেলা থাকার জন্য ঘর । পুরো দিন ইরা নিচের তলাতেই বসে থাকে । সেখানে টিভি দেখে নয়তো কাজের মানুষদের সাথে কথা বার্তা বলে । সন্ধ্যার আযানের আগেই ওরা সবাই চলে যায় । কেউ বাসায় থাকে না । রেহানের আস্তে আস্তে এশার আযান দিয়ে দেয়। মাঝের এই ঘন্টা দেড় দুইয়ের সময় ইরাকে একদম একা থাকতে হয় ।

অনেক বার রেহানকে বলেছে কাজের লোক গুলোকে যে থাকতে বলে ওর আসার সময় পর্যন্ত কিন্তু রেহান শুনে নি । বলেছে ওদের থাকতে বলা যাবে না । আর ওরা থাকবেও না । বারবার কারণ জানতে চেয়েও রেহান জবাব দেয় নি । বিয়ের মাত্র মাস ছয়েক সময় কেটেছে কিন্তু এখন ইরার কাছে মনে হয়েছে যেন সেদিন বিয়েতে চট করে হা বলাটা হটকারী সিদ্ধান্ত ছিল । হ্যা অর্থ বিত্তের কোন অভাব নেই কিন্তু তবুও ইরার কাছের মনে হচ্ছে নিজেকে সে ধীরে ধীরে হারিয়ে ফেলেছে ।

বিয়ের প্রথম কদিন সময় গুলো ওর দারুন কেটেছে । সকালে দুজন এক সাথে অফিস যেত আর এক সাথে ফিরে আসতো । প্রায় দিনই বাইরে ঘোরাঘুরি বাইে ডিনার । ইরার কাছে মনে হত যেন সব কিছু একটা স্বপ্ন । তবে সেই স্বপ্ন ভাঙ্গতে দেরি না খুব একটা । মাস দুয়েক যেতে না যেতেই রেহান চাকরি ছেড়ে দিল । অন্য একটা কোম্পানীতে ভাল আরেকটা চাকরি পেয়ে গেছে সে । সেখানেই জয়েন করলো । এবং ধামেলা বাঁধলো রেহানের নতুন অফিসটা শহরের একেবারে উল্টোদিকে । আরও ভাল করে বললে ওদের আগের অফিসের উল্টোদিকে । আগে তো দুজন একসাথে অফিস যেত সেটা বন্ধ হয়ে গেল । তারপরেও দুজনই সকালে অফিসের জন্য বের হত সকালে। কিন্তু যেদিন থেকে ইরা কনসিভ করলো সেদিন থেকে ইরার বাইরে যাওয়া রেহান বন্ধ করে দিল ।

ইরা প্রথমে একটু সময় তর্ক করার চেষ্টা করেছিলো । বলার চেষ্টা করেছিলো যে সবে তো মাত্র ছয় সপ্তাহ । এখনই চাকরি ছাড়ার কি দরকার শুনি ! তখন রেহান ওকে বলল, কয় সপ্তাহ এটা বড় কথা নয়, বড় কথা হচ্ছে যদি কোন ঝামেলা হয় তখন? তাও আমার সাথে যদি তুমি যেতে আমি মানা করতাম না । একা একা যাবে আর আমি সারা দিন চিন্তা করবো । এটা মোটেও হবে না । আমি শান্তি পাবো না । আমি বলছি না যে চাকরি করবে না । অবশ্যই করবে । বাবু টা হয়ে যাক । তখন ন্যানি রেখে দিবো । তুমি অফিস করে আসতে পারবে নিশ্চিন্তে ! ঠিক আছে ?

এর উপরে আর কোন তর্ক চলে না । ইরা মেনে নিয়েছে । তারপর থেকেই সে একেবারে বাসায় বসা । সময় যেন ওর কাটতে চায় না । রাতের সময় টুকু অবশ্য কাটতে সমস্যা হয় না। রেহান অফিস থেকে ফিরে আসার পরের সময় টুকু যেন হাওয়ার বেগে চলে যায় । ছুটির দিন গুলো রেহনারের সময় কাটে । এখন সত্যিকারের অর্থে ইরার জীবনে রেহান আর ওদের অনাগত বাচ্চা আর কিছু নেই ।

ইরা দরজার সামনে করিডোর দাড়িয়ে রয়েছে । কি মনে হল ওর করিডোর দিয়ে হাটা দিল । এই কাজটা আগে একদিন করতে গিয়েছিলো তবে মাঝ পথে রেহান ওকে আটকে দিয়েছিলো । বলেছিলো যে ওদিকে অনেক দিন পরিস্কার করা হয় না । যাওয়ার দরকার নেই । যদিও ইরার কাছে সেটা মনে হয় নি । ইরার কেবল মনে হয়েছে রেহান বুঝি চায় না ওদিকে সে যাক । আজকে রেহান আশে পাশে নেই । বাসায় আসতে এখনও অনেকটা সময় বাকি । আজকে একেবারে শেষ মাথা পর্যন্ত যাওয়া যাক ।

ইরা আস্তে আস্তে হাটতে শুরু করলো । চার নম্বর ঘরটা পার করে পাঁচ নম্বর ঘরের সামনে আসতেই ইরার কাছে মনে যেন একটা অধিক ঠান্ডা স্থানে সে ঢুকে পড়েছে । এখন সময়টা শরৎ কাল । কিন্তু ইরার কাছে মনে হল সময়টা এখন হেমন্তের শেষের দিক । ঠান্ডা ঠান্ডা আবহাওয়া ! ছয় নম্বর ঘরটার সামনে যখন এল তখন ইরা তীব্র বিস্ময় নিয়ে লক্ষ্য করলো যে ওর রীতিমত শীত লাগছে । এমন কেন হচ্ছে ! এমন কি হওয়ার কথা ।

ইরা এখন সামনে কিছু দেখতে পাচ্ছে না । পেছনে তাকিয়ে দেখতে পেল আলো দেখা যাচ্ছে বটে তবে ইরার কাছে মনে হচ্ছে যেন অনেক দুর থেকে সেই আলোটা আসছে । এতো দুরে সে চলে এসেছে? এমন তো না ! সব কিছু কেমন উল্টোপাল্টা মনে হচ্ছে ওর কাছে । সব কিছু গুলিয়ে যাচ্ছে !

ইরার এখন কি করা উচিৎ ? সামনে যাবে ? নাকি পেছনে ফিরে আসবে?

ইরার মনের এক পাশ বলছে আর সামনে যাওয়ার কোন দরকার নেই । কি দরকার সামনে যাওয়ার ! এখনই ফেরৎ যাওয়া দরকার ! কিন্তু ইরার মনের অন্য দিকটা ওকে বলছে সামনে দেখা দরকার কি আছে ? অবশ্যই দেখা দরকার । এমন রয়েছে যা ওর দেখা দরকার । রেহানের জীবনে যে কিছু রহস্য রয়েছে সেটা ও এরই ভেতরে টের পেয়েছে ।

অফিসে রেহান বেশ জনপ্রিয় ছিল । খোজ নিয়ে জেনেছে নতুন অফিসেও রেহান অনেক বেশি জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে এরই ভেতরে । মানুষ ওর দিকে সহজেই আকর্ষিত হয় । রেহান যত সময় ওর সামনে থাকে তত সময় ইরা অন্য কিছু ভাবতে পারে না । কেমন একটা আকর্ষন বোধ করে । কিন্তু মানুষ জন এই বাড়িটাকে কেমন ভয় পায় । শহর থেকে একটু দুরে রেহানদের এই বাড়িটা । এই বাড়ি থেকে দুরে বসতি রয়েছে। রয়েছে বাজার । ইরা কয়েকবার সেই বাজারে গিয়েছে কেনা কাটা করতে । কোন রিক্সা এই বাড়ি পর্যন্ত আসতে চায় না । এমন কি বাজারে যারাই শুনেছে ইরা এই বাড়িতে থাকে তারাই কেমন যেন অদ্ভুত চোখে ওর দিকে তাকিয়েছে । এই ব্যাপারটা ইরার চোখ এড়িয়ে যায় নি । কোন একটা গোপন কিছু রয়েছে এই বাড়ির ব্যাপারে এবং রেহানের ব্যাপারে সেটা ওকে একটু ভাবাচ্ছে ।

আউ !

আপনা আপনিই মুখ থেকে আর্তনাদ বের হয়ে এল । ইরার পায়ে কিছু একটা বিধেছে । অন্ধকারে করিডোরের মেঝেতে কিছু ছিল যার উপরে সে পা দিয়ে ফেলেছে । তবে বুঝতে পারছে সেটা কাটা জাতীয় কিছু না । কেমন যেন হাড়ের মত !

রক্ত না বের হলেও বেশ ব্যাথা করছে । নিচু হয়ে সেই জিনিসটা তুলে নিল সে !

কেবল যেন ঠেকলো হাতে !

কি এটা ! গাছের ডাল কিংবা ইট নয় । তাহলে কি জিনিস !

একটু গোল মত। তবে শরীরটা অমশৃন । অমশৃন জায়গাতে হাত বোলালো অন্ধের মত । তখনই বুঝতে পারলো জিনিসটা কি !

এটা একটা চোয়ালের হাড় । দাঁত সমেত । তবে মাত্র দুইটা দাঁত । সেই দাঁতেই পা আটকেছে ওর ।

বুকের ভেতরে একটা কু ডেঁকে উঠলো । এখানে এটা কোন প্রাণীর চোয়ালের হাড় রয়েছে । সামনে কি যাবে ? নাকি ফিরে যাবে ?

আর কয়েকটা ঘর রয়েছে । তারপরই দেওয়া পাওয়া যাবে । এই ঘর গুলোর মাধে কি রয়েছে ?

এই কথাটা মনে হতেই একটা ধুপ করে শব্দ হল ! সাথে সাথেই চমকে উঠলো ইরা । ও ঠিক যে ঘরটার সামনে দাড়িয়ে রয়েছে সেই ঘরের ভেতর থেকে আওয়াজটা আসছে । কেউ দরজাতে ধাক্কা দিচ্ছে ভারি দরজার ওপাশ থেকে কেউ যেন জোরে জোরে ধাক্কা দিচ্ছে !

ইরা এবার সত্যিই ভয় পেয়ে গেল । ভয় পেলে মানুষের সাধারনত দুইটা কাজথয় । এক, সে সর্ব শক্তি দিয়ে দৌড় দেয় দিক বেদিক চিন্তা না করে আর দুই, সে একেবারে জমে যায় । ভয়ের কারণে তার হাত পা অবস হয়ে যায় । এমন কি মুখ দিয়ে একটা আওয়াজ করতে পারে না । ইরার সাথে দ্বিতীয় ঘটনা ঘটলো । মুখ দিয়ে একটা আওয়াজ পর্যন্ত করতে পারলো না । হাত পা অবশ হয়ে গেছে । বারবার মনে হচ্ছে যেন দরজার ওপাশে ভয়ংকর কিছু রয়েছে । এখনই দরজা খুলে ওর দিকে এগিয়ে আসবে ।

তখনই ইরার ও কাধে কারো স্পর্শ পেল ! ভয়ে মনে হল ওর বুকের ভেতর থেকে হৃদপিণ্ডটা বের হয়ে আসবে । বারবার মনে হল যে যেন কোন ভাবে দরজার ওপাশের আওয়াজকারীই ওর পেছনে এসে ওর কাধে হাত দিয়েছে !

তিন

ইরা যখন চোখ মেলে তাকালো নিজেকে নিজের বিছানায় পেল । চোখের সামনে মিনুকে দেখতে পেল । খানিকটা চিন্তিত চোখে সে ইরার দিকে তাকিয়ে রয়েছে। প্রথমে কিছু সময় মনে করার চেষ্টা করলো কি হয়েছিলো । মনে পরে গেল সাথে সাথে । করিডোর দিয়ে হাটছিলো । সেই সময়েই সে ভয় পেয়েছিলো । একটা দরজার ওপাশে শব্দ শুনতে পায় । শব্দটা আসছিলো দরজার ওপাশ থেকে । ইরার মোটেও শুনতে ভুল হয় নি । নিশ্চিত ভাবেই টের পেয়েছিলো কিছু একটা ঠিক দরজার ওপাশে রয়েছে । এবং সেই জিনিসটা ওর উপস্থিতি টের পেয়েছে । টের পেয়েই শব্দ করছিলো । ইরার কেবল মনে হয়েছিলো ভয়ংকর কিছু রয়েছে দরজার ওপাশে । এবং সেটা এখনই বের হয়ে আসবে । ভয়ে জমে গিয়েছিলো সে । তাই যখন পেছনে কারো স্পর্শ পেল সাথে সাথেই মনে হল যেন দরজার ওপাশের মানুষটা এসে দাড়িয়েছে পেছনে । কিন্তু যখন পেছন ফিরে তাকায় তখন দেখে মিনু দাড়িয়ে রয়েছে । এতো ভয়ে পেয়েছিলো যে পরিচিত মুখটা দেখে দেহটা একেবারে ভার ছেড়ে দিলো । সাথে সাথেই জ্ঞান হারালো সে । চোখ মেলে দেখলো মিনু ওর মুখের সামনে দাড়িয়ে রয়েছে ।

-আপু এখন কেমন লাগছে?

ইরা উঠে বসলো । মিনু ওকে উঠে বসতে সাহায্য করলো । ইরা বলল, এখন একটু ভাল লাগছে ।

-আচ্ছা তাহলে আমি যাই ।

-এখনও যেও না । বস একটু !

-না আপু । ভাইজান চলে আসবে । সবাই চলে গেছে । কেবল আমি রয়েছি । ভাইয়া এসে যদি আমাকে এখানে দেখে খুব রাগ করবে ।

এই কথাটা ইরা নিজেও জানে । দোতলাতে কাজের মানুষদের উঠার অনুমুতি নেই । কেবল সকাল বেলা আর বিকেল বেলা ঘর পরিস্কার করার জন্য একজন ওঠে উপরে । তাছাড়া আর কেউ উঠতে পারে না । ঘর পরিস্কার করেই চলে যাওয়ার নিয়ম । মিনু তো অনেক সময় ধরেই রয়েছে ।

কিন্তু এই সময়ে মিনুকে ছেড়ে দিতে ইরার মোটেই ইচ্ছে করলো না । সে মিনুর দিকে তাকিয়ে বলল, চল নিচে চল । ওখানে গিয়ে বসি । আমি একা একা এখানে থাকতে পারবো না । আর তোমার ভাইজান কিছু বলবে না । সেটা আমি দেখবো।

মিনু যেন অনিচ্ছা স্বত্ত্বেও রাজি হল ।

বসার ঘরে টিভি ছেড়ে দিয়ে বসলো দুজন । মিনু চুপ করে বসে রয়েছে এক পাশে । ইরা বলল, তুমি ঘরের ঐ দিকে গিয়েছো এর আগে?

-না যাই নি !

মিনু এমন ভাবে কথাটা বলল যে ইরা নিশ্চিত হয়ে গেল যে মিনু মিথ্যা বলছে । ইরা আবারও বলল, তাহলে তুমি কিভাবে পৌছালে ওখানে ? তুমি কিভাবে জানলে যে আমি ওখানে যাবো? এমনি এমনি তো যাওয়ার কথা না । সত্যিই করে বল ।

মিনু কি বলবে ঠিক বুঝতে পারছিলো না । তবে মুখ দেখে মনে হচ্ছিলো যে সে কিছু বলতে চায় কিন্তু বলতে ঠিক সাহস পাচ্ছে না ।

ইরা আবার বলল, বল । ভয় নেই । আমি কাউকে বলবো না । তোমার ভাইজানকে তো নাই ।

মিনু এবার ইরার চোখের দিকে তাকালো । কিছু বলতে যাবে তখনই বাইরে আওয়াজ হল ।

রেহান চলে এসেছে । মিনু তাড়াতাড়ি বলল, আমি আসি আপু । ভাইজান চলে এসেছে ।

রেহানের ঘরের ঢোকার সাথে সাথেই মিনু যেন একটু ভয় পেয়ে উঠে দাড়ালো । রেহান কেবল কিছুটা শান্ত চোখে তাকিয়ে রইলো মিনুর দিকে । ওকে এখানে সে আশা করে নি । ইরা তাড়াতাড়ি বলল, ওকে আমি যেতে দেই নি । বিকেল থেকে শরীরটা কেমন যেন লাগছিলো । আমার মাথা টিপে দিচ্ছিলো ও !

রেহান আরও কিছু সময় তাকিয়ে রইলো মিনুর দিকে । তারপর নিজের মানিব্যাগ বের করে একটা এক হাজার টাকার নোট বের করে বাড়িয়ে দিলো মিনুর দিকে । তারপর বলল, তোমার বাবার ঔষধের জন্য ।

মিনু মাথা নিচু করে নোট টা নিয়ে দ্রুত বেরিয়ে গেল ঘর থেকে ।

মিনু বেরিয়ে যেতেই ইরার দিকে ফিরলো রেহান । এতো সময়ে চেহারাতে যে গম্ভীর ভাবটা ছিল সেটা কেটে গেল মুহুর্তের ভেতরে । তারপর সেখানে একটা চিন্তিত ভাব ফুটে উঠলো । ইরার কাছে এসে বলল, হঠাৎ শরীর খারাপ করলো! চল কালকেই তোমাকে ডাক্তারের কাছে নিয়ে যাবো ।

ইরা বলল, আরে না না । ডাক্তারের কাছে যাওয়ার মত খারাপ হয় নি । প্রেগনেন্সীর সময়ে মেয়দের আসলে এমন একটু আধটু হয় । মাথা ঘুরিয়ে ওঠে । ঝিমঝিম করে । এই সময়ে কাছে একজন থাকলে ভাল লাগে । এই জন্য মিনুকে রেখে দিয়েছিলাম ।

রেহান ইরার কাছে এসে ওকে খানিকটা জড়িয়ে ধরলো । সাথেই সাথেই ইরার মনের ভেতর থেকে সকল দুঃচিন্তা সব দুর্ভাবনা দুর হয়ে গেল একেবারে । মনে হল যেন এই মানুষটার কাছেই সে সব থেকে বেশি নিরাপদ । ওর কোন ভয় নেই আর !

রাতের বেলা সেদিন একটু তাড়াতাড়িই খেয়ে শুয়ে পড়লো ওরা । কিন্তু ঘুম ভেঙ্গে গেল মাঝ রাতের দিকে । চোখ মেলে তাকিয়ে দেখলো পুরো ঘর আলোকিত হয়ে আছে আলোতে । জানালা খোলা রেখেই ঘুমায় ওরা সব সময় । এদিকে চোর ডাকাতের খুব একটা ভয় নেই । আর ওদের বাসায় চোর আসবে না । এই বাড়ির থেকে সবাই দুরে থাকে । জানালা খোলা রেখে ঘুমালে খুব একটা সমস্যা নেই ।

ইরা কিছু সময় বিছানাতেই পড়ে রইলো । ভেবেছিলো যে হয়তো আবার আপনা আপনিই ঘুম চলে আসবে । কিন্তু একটা সময় বুঝতে পারলো যে ঘুম আসবে না । তখন উঠে বসলো সাবধানে । পাশেই রেহান ঘুমিয়ে রয়েছে নিশ্চিন্তে । ওকে পাশ কাটিয়ে উঠে জানালার কাছে গিয়ে দাড়ালো । একবার ভাবলো রেহানকে ডাকবে কিনা । তবে সেটা আর করলো না ।

পুরো এলাকাটা কেমন শান্ত আর নিস্তব্ধ হয়ে আছে । আজীবনই ইরা শহরে থেকে এসেছে । রাত যত গভীরই হোক পুরোপুরি নিস্তব্ধ কখনই হত না । কিন্তু এখানে একেবারে নিস্তব্ধ সব কিছু । এমন কি রাতের বেলা ঝিঝি পোকার একটা ডাক পর্যন্ত শোনা যাচ্ছে না । এই ব্যাপারটা ইরার কাছে সব সময়ই একটু অবাক লেগেছে । এমন তো হওয়ার কথা না । রাতে ঝিঝি পোঁকার ডাক কিংবা অন্য কোন পোকার ডাক শোনা যায় না । একেবারে নিস্তব্ধ সব কিছু । কিছু সময় তাকিয়ে থেকে যখন আবারও বিছানাতে ফিরে যেতে যাবে তখন ছায়াটাকে দেখতে পেল সে । চাঁদের আলোতে সব কিছু পরিস্কার দেখা যাচ্ছে । এমন আলোতে যদি কেউ সামনে এসে দাড়ায় তাহলে তাকে পরিস্কার দেখতে পাওয়ার কথা কিন্তু ইরা সেই ছায়াটাকে পরিস্কার দেখতে পেল না । ওর কাছে মনে হল কোন মানুষ নয় বরং একটা ছায়াই আস্তে আস্তে এগিয়ে আসছে বাড়ির দিকে ।

রেহানদের বাসাটা এলাকার একেবারে শেষ মাথায় । সরকারি রাস্তা পার করে কিছুটা রাস্তাটা নিজেরা বানিয়ে নেওয়া । পুরো রাস্তাটা জুড়ে বেশ গাছ গাছালিতে ভর্তি। তারপরে একটু জায়গা ফাঁকা । এরপর থেকে বাড়ির প্রধান গেট শুরু । পুরো বাড়িটা উচু পাচিল দিয়ে ঘেরা । ইরা তাকিয়ে ছিল পাচিল পেরিয়া গাছ পালার দিকে । তাকিয়ে দেখলো সেই ছায়াটা গাছের ছায়া থেকে বের হয়ে এল । এরপর পালিয়ের কাছে এসে থামলো একটু ।

ইরা দম বন্ধ করে সেদিকে তাকিয়ে রইলো । ছায়া টার চলন ভঙ্গি দেখে মনে হচ্ছে না যে সে খুব একটা চিন্তিত । চোর হলে খুব সাবধানে বাড়ির ভেতরে ঢুকবে । কিন্তু এই ছায়ামূর্তিটা এমন ভাবে হাটছে যেন কেউ দেখে ফেললেও খুব একটা চিন্তার কারণ নেই । মনে হচ্ছিলো যেন এই বাড়ি বাড়ির আশে পাশের সব কিছু তার খুব করে পরিচিত ।

ছায়ামূর্তি দেওয়ালের কাছে এসে থামলো কয়েক মুহুর্ত । এরপর এক লাফ দিয়ে সেটা উপরে উঠে দাড়ালো । ইরা আবারও চোখ বড় বড় সেদিকে তাকিয়ে রইলো । এতো সহজে এতো উচু দেওয়ালের উপরে কেউ উঠতে পারে সেটা নিচ চোখ না দেখলে ইরার মোটেই বিশ্বাস হত না । ইরা যেন দম নিতে ভুলে গেছে । ছায়া মুর্তিটা এবার বাড়ির ভেতরের দিকে লাফিয়ে পড়লো । তারপর ধিরে ধিরে ডান দিকে সরে গেল । ইরা তাকিয়ে দেখলো সেটা বিল্ডিংয়ের শেষের দিকে যাচ্ছে । ইরা জানালার গ্রিলে মুকখ ঠেকিয়া দেখার চেষ্টা করলো । দেখলো সেটা বিল্ডিংয়ের শেষ ঘরের সামনে গিয়ে দাড়ালো । তারপর এক লাফ দিয়ে দোতলার একটা জানালার গ্রিল ধরে ফেলল । জানালা খোলাই ছিল । এরপর সেই গ্রিল গলে ভেতরে ঢুকে পড়লো ।

ইরাকে বলে দিতে হল না কিন্তু সে নিশ্চিত ভাবে জানে যে আজকে যে ঘরের সামনে দাড়িয়ে সে আওয়াজ শুনেছিলো ছায়া মুর্তিটা সেই ঘরের গ্রিলের ভেতরে ঢুকেছে । বুকের মাঝে একটা তীব্র ভয় জেগে বসলো । বুক ধরফর করতে শুরু করলো ওর ।

এখন ওর কি করা উচিৎ? রেহানকে বলবে কি দেখেছে?

আজকে যে ঐ করিডোরের শেষ মাথায় গিয়েছিলো সেটা কি বলবে?

সব শুনলে সে কি বলবে?

রাগ করবে কি?

ইরা কোন সিদ্ধান্ত নিতে পারছে না । কেবলই মনে হচ্ছে যে খুব খারাপ কিছু হতে চলেছে । এই বাড়িতে কিছু একটা রয়েছে যা ভাল কিছু নয় ! এই বাড়িতে থাকা যাবে না । এখান থেকে চলে যেতে হবে ।

-ইরা !!

ইরা চমকে উঠলো । পেছন ফিরে তাকিয়ে দেখলো রেহান বিছানায় উঠে বসেছে । ওর দিকে তাকিয়ে রয়েছে । ইরার চেহারাতে যে একটা ভয় ফুটে উঠেছে সেটা সে দেখছে পাচ্ছে পরিস্কার !

-কি হয়েছে?

ইরা কোন মতে বলার চেষ্টা করলো যে ওখানে কিছু একটা সে দেখেছে । তবে কোন কথাই ওর মুখ দিয়ে বের হল না । তার আগেই রেহান এগিয়ে এল । তারপর ওকে জড়িয়ে ধরে বলল, তুমি কিছু দেখো নি । বুঝেছো । কিছু না । কেবল তোমার মনের কল্পনা । কিছু দেখো নি !

চার 

মিনু একটু অস্বস্তি নিয়ে তাকিয়ে রয়েছে ইরার দিকে । ইরার নিজের বিছানার উপরে বসে রয়েছে । বিছানার পাশেই একটা ছোট টি টেবিলে দুই কাপ চা রাখা । টি টেবিলের পাশেই একটা চেয়ারে বসে রয়েছে মিনু। মিনুর চেহারা দেখেই মনে হচ্ছে যে এই ঘরে এভাবে সে এর আগে কোন দিন বসে নি । আজকে রেহান অফিসে বের হয়ে যাওয়ার পরপরই মিনুকে সে ডেকে নিয়ে এসেছে উপরে । মিনু আসতে চায় প্রথমে । কিন্তু শেষ পর্যন্ত মানাও করতে পারে নি ।

ইরাই প্রথমে মুখ খুলল । চায়ের কাপটা হাতে নিতে নিতে বলল, চা ঠান্ডা হয়ে যাচ্ছে। চা নাও । ভয় নেই তোমার ভাইজান জানবে না !

মিনু আস্তে করে চায়ের কাপটা হাতে নিল । ইরা বলল, আমি জানি এই এলাকার মানুষ এই বাড়িটাকে ভয় পায় । এর ধারে কাছে আসতে চায় না । কেন চায় না সেটা আমি ঠিক জানি না । তুমিও ভয় পাও । তার পরেও আসো । তার কারণ টা আমি জানি । তোমার বাবার শরীর খুব বেশি খারাপ । চিকিৎসার জন্য টাকা দরকার । আর রেহান বেশ ভাল পরিমান বেতন দেয় তোমাকে । তাই না ?

মিনু মাথা ঝাকালো । ইরা আবারও বলল, কেবল তোমাকেই না এই বাসায় যারা যারা কাজ করে সবাইকে ভাল টাকা দেয়। তোমরা সবাই এই বাসাটাকে ভয় পাও । আমার কাছেও ঠিক স্বাভাবিক মনে হয় না এই বাসাটা । আমি জানতে চাই সবাই কেন ভয় পায় !

মিনু একটু চোখ তুলে তাকালো । তারপর আবারও চোখ নামিয়ে নিল । ইরা এবার একটু বিরক্ত হল । তারপর খানিকটা কঠিন কন্ঠেই বলল, শোন মিনু আমি জানতে চাই । গতকাল রাতে আমি ভয়ংকর কিছু দেখেছি । যেটা দেখার পর আমার আর এখানে থাকতে মন চাইছে না । আর আমি যদি এখান থেকে চলে যাই, রেহানকে জোর করি এই বাসা ছেড়ে দেওয়ার জন্য তাহলে কিন্তু সে চলে যাবে । আর সে চলে গেলে তোমাদের কি হবে বুঝতে পারছো তুমি?

এমন করে কথাটা ইরা মোটেই বলতে চায় নি কিন্তু বলতে হল । নয়তো এদের মুখ থেকে কথা বের করা যাবে না । আর ইরার ব্যাপারটা জানতেই হবে । বিশেষ করে গত রাতে সে যে ছায়া মুর্তিটাকে দেখেছে সেটা কি না জানতে পারলে ওর মনে শান্তি নেই । মিনু হঠাৎ বলল, ভাইজান আপনাকে যেতে দিবে না ।

-কি বললে ?

-ভাইজান আপনাকে যেতে দিবে না ।

-কেন ? আমি যদি থাকতে না চাই সে আমাকে আটকে রেখে দিবে ।

-আগের আপুও বলছিলো যে সে চলে যাবে । কিন্তু পারে নাই ।

ইরা তীব্র বিস্ময় নিয়ে বলল, মানে ! কি বলছো?

মিনু এবার ইরার দিকে চোখ তুলে তাকালো । তারপর বলল, ভাইজান জানলে আমাকে মেরে ফেলবে ।

-তোমার ভাইজান জানবে না । আমাকে বল । প্লিজ বল । আমি সব কিছু জানতে চাই ।

এবার ইরার কন্ঠে একটু অনুনয় শোনা গেল । ওর মনে হঠাৎ করেই আবার সেই ভয়টা ফিরে এসেছে ।

মিনু আবারও এদিক ওদিক তাকালো । মনে হল যেন অদৃশ্য কাউকে সে ভয় পাচ্ছে । মিনু তারপর বলা শুরু করলো, আগের আপুও আপনার মত বউ হয়ে এসেছিলো । সব কিছু চমৎকার চলছিলো তাদের ভেতরে । তারপর যেদিন থেকে আপু পোয়াতি হল সেদিন থেকে আপু যেন কাকে দেখতে পেত । একটা ছায়ার মত । আমাকে বলেছিলো প্রথমে সে বাইরে দেখেছিলো ছায়াটাকে । তারপর সেটাকে আস্তে আস্তে ঘরের ভেতরে দেখতে পায় । সেটা নাকি তার পেটের দিকেই এক ভাবে তাকিয়ে থাকতো ।

-এরপর?

-আপু ভাইজানকে বারবার বলতো এই বাসা ছেড়ে দিতে কিন্তু ভাইজান কিছুতেই রাজি হত না । কিভাবে যেন ভাইজান ঠিকই আপুকে বুঝিয়ে শুনিয়ে রেখে দিতো । আপুও রাজি হয়ে যেত বারবার । আবার রাতে ভয় পেত ।

মিনু একটু থামলো । তারপর বলল, এরপর আপুর বাচ্চাটা নষ্ট হয়ে যায় । তবে আপু বারবার বলতো যে তার বাচ্চা নাকি নষ্ট হয় নি । ঐ ছায়াটা নাকি সেটা খেয়ে ফেলেছে । ডাক্তার এসেছিলো । বলল যে বাচ্চা নষ্ট হয়ে যাওয়ার কারণে আপুর মাথায় সমস্যা দেখা দিয়েছে ।

-তারপর ?

-আপুকে খানিকটা ঘরে বন্দী করেই রাখা হত । একদিন কিভাবে যেন নিজের ঘর থেকে বের হয়ে যায় । তারপর ছাদের উপর থেকে ঝাপ দিয়ে নিচে পড়ে । দুই তলা থেকে পড়ে মানুষ খুব একটা মরে না । তবে আপু এমন ভাবে পরেছিলো যে সাথে সাথে মারা পড়ে । মাথাটা নিচের দিকে পড়েছিলো ।

ইরা কি বলবে খুজে পেল না । ওর মনের ভেতরে হঠাৎ করেই যেন ভয় জমা হতে শুরু হয়েছে । হয়তো ভয় পাওয়ার কোন কারণ নেই । হয়তো সত্যিই রেহানের আগের স্ত্রীর বাচ্চা নষ্ট হয়ে গিয়েছিলো কোন কারণে । আর বাচ্চা নষ্ট হয়ে যাওয়ার কারণে তার মাথায় কিছু সমস্যা দেখা দিয়েছে । সব কিছুরই হয়তো কোন স্বাভাবিক ব্যাখ্যা রয়েছে । কিন্তু সে যে গতকাল ঐ ছায়া মূর্তিটা দেখলো এটার কি ব্যাখ্যা থাকতে পারে ।

ইরার হঠাৎ কিছু মনে পড়তেই ইরা বলল, গতদিন তুমি কিভাবে ঐ করিডোরে পৌছালে ? তোমার তো তখন উপরে আসার কথা না !

মিনুর চোখে আবারও একটা অস্বস্তি দেখতে পেল সে । ইরা আবারও বলল, বল কিভাবে এল ?

-আপু আপনি চিৎকার করে ছিলেন । সেটা শুনেই উঠে এসেছিলাম ।

-মিথ্যা কথা । আমি চিৎকার করি নি । আরও ভাল করে বললে চিৎকার করতে পারি নি । সত্যিই করে বল

-না আপু আপনি….

কিছু বলতে গিয়েও যেন থেমে গেল মিনু । তারপর কিছু সময় ইরার দিকে তাকিয়ে রইলো । এরপর বলল, আসলে আপু ঐ ঘরে কিছু আছে ! আপনি ঐ ঘরের সামনে চলে গিয়েছিলেন । নিচে যে আমাদের থাকার ঘরটা রয়েছে ঐ ঘরের নিচেই । কালকে আপনি যখন ওখানে গিয়েছিলেন তখন ঐ টা আওয়াজ করছিলো । এমনিতে শান্ত থাকে । যখন কেউ ওর ঘরের সামনে সামনে যায় তখন ঐটা আওয়াজ করে । নিচ থেকে ঐ আওয়াজ শুনেই আমি গিয়েছিলাম !

-কি ওটা ?

-আমি জানি না । জানতে চাই ও না । আগের আপুও গিয়েছিলো । এমন কি ঘরে পর্যন্ত ঢুকেছিলো ।

-তারপর?

-তারপর কি হয়েছে আমি জানি না । সে সেখানে কি দেখেছে না দেখেছে সেসব আমি কিছুই জানি না। সত্যি জানি না । আমাকে আর কিছু জিজ্ঞেস করবেন না আপু । আমার যদি চাকরিটা চলে যায় তাহলে আমার বাবা বিনা চিকিৎসায় মারা যাবে । দয়া করেন আমার উপর ।

মিনু আর দাড়ালো না । নিচে চলে গেল । ইরা কিছু সময় একেবারে চুপ করে বসে রইলো । কি করবে তার মাথায় ঢুকলো না । কি করা উচিৎ ওর এখন?

রাতের বেলা ঠিক একই ভাবে ওর ঘুম ভেঙ্গে গেল, একই সময়ে। তাকিয়ে দেখলো পাশে রেহান শুয়ে রয়েছে । গতদিনের মত আজও সে উঠে পড়লো । যন্ত্রের মত সে বিছানা ছেড়ে উঠে গেল জানালার দিকে । গতদিনের মত আজও বাইরে জোঁছনার আলো থইথই করছে । ইরা সেদিকে একভাবে তাকিয়ে রইলো কেবল । সে জানে কি দেখতে যাচ্ছে । এবং সত্যিই হল তাই । দেখতে পেল গাছপালার ভেতর থেকে সেই ছায়াটা বের হয়ে এল । আজকে ছায়াটা একটা অদ্ভুত কাজ করলো । ফাঁকা স্থানেই দাড়িয়ে রইলো বেশ কিছু সময় । তারপর সোজা ইরাদের জানালার দিকে তাকালো । যেন সেটা জানে যে ইরা ঠিক ওর দিকেই তাকিয়ে রয়েছে । ইরা যেন একেবারে জমে গেল । ছায়াটার কোন চেহারা দেখা যাচ্ছে না তবে ইরার বুঝতে মোটেও কষ্ট হল না যে সেটা ওর দিকেই তাকিয়ে রয়েছে ।

তারপর যথারীতি তাই হল গতদিন যা হয়েছিলো । সেটা সোজা দেওয়াল টপকালো এবং গতদিনের মত করেই সেই ঘরটার জানলার উপরে ঝাপ দিয়ে উঠে গেল । জানালা গলে ভেতরে ঢুকে পড়লো ।

পরপর সাত দিন একই ঘটনা ঘটলো । এই কদিনে ইরা বেশ কয়েকবার রেহানকে বলার চেষ্টা করেছে যে ও কিছু একটা দেখেছে । একদিন রেহানকে ডেকে উঠালো ঘুম থেকে কিন্তু সেদিন আর ছায়াটা এল না । যেন রেহানের সামনে আসবে না বলেই ঠিক করেছে সেটা. এবং একদিন সাহস করে সেই করিডোর দিয়ে শেষ মাথায় পর্যন্ত গিয়েছিলো রেহানের সাথে ।

রেহান ওকে নিয়েও গিয়েছিলো। সেই দরজার সামনে দাড়িয়েও ছিল দুজন বেশ কিছুটা সময় । কিন্তু কোন আওয়াজ শুনতে পায় নি ওরা । ঘরের দরজা খুলে দেখে নি ভেতরে । রেহানের কাছে নাকি চাবি নেই । চাবি কোথাও আছে তবে কোথায় আছে সেটা নাকি রেহান নিজেও জানে না । তাই দরজাটা আপাতত খুলে দেখাতে পারছে না । নয়তো ওকে খুলেই দেখাতো যে ঘরের ভেতরে আসলে কিছু নেই ।

দশম রাতের দিন ইরা একদিন ভয়ানক সাহসের কাজ করে ফেলল । সেদিন রাতে ঘুম ভাঙ্গার পর ইরা আর জানালর কাছে দাড়িয়ে রইলো না । কেবল অপেক্ষা করতে লাগলো কখন সেটা এসে হাজির হয় । গাছ পালার ভেতর থেকে বের হতে দেখলো । অন্য দিনের মত ইরা সেদিন অপেক্ষা করলো না । রেহানের ঘুমন্ত চেহারার দিকে আরেকবার তাকিয়ে দরজার দিকে পা বাড়ালো । আজকে সে আগে থেকে থেকেই খানিকটা প্রস্তুতি নিয়েই রেখেছিলো । শোবার ঘর থেকে বের হয়েই সে লাইব্রেরীতে ঢুকলো । সেখানে একটা টর্চ লাইট আর একটা মাস্টার কি রয়েছে । মাস্টার কি দিয়ে যে কোন তালা খোলা যাওয়ার কথা ।

টর্চটা জ্বেলে সে সোজাসুজি সামনের করিডোরের দিকে তাক করলো । সরাসরি সামনের দিকে । পুরো করিডোরটা কেমন যেন ভুতুড়ে মনে হল । একটু ভয়ভয় করতে লাগলো । একবার মনে হল এসবের কোন দরকার নেই । আবার গিয়ে শুয়ে পড়ুক রেহানের পাশেই । কিন্তু তারপর মনে হল, না । এটা ওকে করতেই হবে । নয়তো ওর মনে শান্তি আসবে না । ইরা আলো জ্বালিয়ে সামনের দিকে আস্তে আস্তে হাটতে লাগলো । প্রতিটা ঘরের দরজা পার হচ্ছে আর বুকের ভেতরে একটা ভয় জাকিয়ে বসছে । বারবার মনে হচ্ছে ফিরে চলে যেতে ।

সেই কাঙ্খিত দরজার সামনে এসে দাড়ালো সে । দরজার উপরে আলো ফেলতেই অবাক হয়ে গেল সে। দরজায় কোন তালা মারা নেই । সেটা খোলা রয়েছে । কিন্তু এমন তো হওয়ার কথা না । দরজা তো বন্ধ থাকার কথা । দুদিন আগেই সে রেহানের সাথে এখানে এসেছিলো । তখন দরজাতে তালা মারা ছিল । সেটা কে খুললো?

রেহান?

ও ছাড়া অন্য কেউ তো এ দরজা খুলতে পারার কথা না । কিন্তু ও কেন বলল যে দরজার চাবি ওর কাছে নেই । মিথ্যা কেন বলল ?

ইরা দরজা লকটা খুলে আস্তে করে ঠেলা দিল । সেটা খুলে গেল কোন রকম আওয়াজ না করেই ।

টর্চের আলো ফেলল ভেতরে । ভেবেছিলো ময়লা আবর্জনা আর ধূলাবালি ভর্তি কোন ঘর দেখবে । হয়তো দেখবে পুরোনো কোন স্টোর রুম । কিন্তু ভেতরের ঘরটা দেখে সে একেবারে অবাক হয়ে গেল । ঘরের বড় জানালাটা খোলা । সেই জানাল দিয়ে ঘরে আলো আসছে । এছাড়া ওর নিজের হাতে টর্চ রয়েছে । সেটা থেকেও আলো বের হয়ে পুরো ঘরটাকে আলোকিত করে রেখেছে ।

ঘরের ঠিক মাঝে একটা বড় কফিন জাতীয় জিনিস বক্স রয়েছে । সেই বক্সের উপরে অদ্ভুত এক ডিজাইন করা । কফিনের বক্সটা একটু খোলা । এছাড়া পুরো ঘরে আর কিছু নেই । পুরো ঘরটা একেবারে পরিস্কার পরিছন্দ । একটু ময়লাও নেই সেখানে । কয়েক সেকেন্ড সে বোকার মত দরজার কাছেই দাড়িয়ে রইলো । কি করবে ঠিক বুঝতে পারছে না । ঠিক সেই সময়ে জানালার কাছে একটা আওয়াজ হল । যেন কেউ সেটা ধরেছে এমন । এবং তার পরই সেই ছায়াটাকে দেখতে পেল সে । ইরা চাঁদের আলোতে পরিস্কার দেখতে পেল । জানালার সিক গলিয়ে সেটা খুব সহজেই ঘরের ভেতরে ঢুকে পড়লো ।

ইরা নিজের চোখ সরাতে পারছে না মোটেও । একভাবে সেই ছায়া মূর্তির দিকেই তাকিয়ে রয়েছে । ওদের মাঝে কেবল মাত্র সেই কফিন বক্সটাই রয়েছে ।

ইরা কি বলবে কি করবে কিছুই বুঝতে পারলো না । বুকের ভেতরে একটা অচেনা অনুভূতি হচ্ছে । একভাবে মূর্তিটার দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে হঠাৎই ইরার মনে হল যে এই ছায়া মূর্তিটাকে সে চেনে ।

ইরার মনে হল ছায়া মূর্তিটা হাসছে । ওর দিকে তাকিয়ে হাসছে ।

-হাই ইরা !

কন্ঠটা শুনে বড় ধাক্কা খেল । রেহানের কন্ঠটা চিনতে মোটেই ভুল না । সামনে দাড়ানো এই ছায়ার মত জিনিসটা রেহান ।

কিন্তু রেহানতো বিছানাতে ঘুমিয়ে রয়েছে !

 পাঁচ

রেহান ইমারজেন্সীর রুমের সামনে পায়চারি করছে ব্যাকুল ভাবে । ওর শার্টে এখনও রক্ত লেগে রয়েছে খানিকটা । বারবার সেই দৃশ্যটা চোখের সামনে ভেসে উঠছে । কিছুতেই মন থেকে মুছে ফেলতে পারছে না । এসব কিছুর জন্য নিজেকে দোষী মনে হচ্ছে । আরও একটু সাবধান যদি হত তাহলে এমন টা হত না ইরার সাথে ।

এভাবে ইরা যে বোকার মত ঐ ঘরে চলে যাবে সেটা রেহান ভাবতেও পারে নি । এতো জলদিই যে সব হয়ে যাবে সেটাও সে আশা করে নি । ইচ্ছে করছিলো তখনই অর্টিরাসকে খুন করে ফেলে । কিন্তু রেহান খুব ভাল করেই জানে যে সেটা ওর দ্বারা সম্ভব না কিছুতেই । অর্টিরাসকে মেরে ফেলা মানে নিজেকেই মেরে ফেলা। কিন্তু ইরার এই অবস্থার জন্য কিছুতেই অর্টিরাসকে ক্ষমা করতে পারছে না সে । চোখের সামনে ইরা রক্তাক্ত দেহটাকে দেখে ওর মনটা কেমন যেন করছে । মনে হচ্ছে সব কিছু শেষ করে দেওয়ার বুঝি সময় চলে এসেছে ।

ডাক্তার নিলয় ইমার্জেন্সী অপারেশন রুম থেকে বের হয়ে এল । রেহান চট জলদি তার সামনে গিয়ে হাজির হল । চোখে এক রাশ জিজ্ঞাসা । নিলয় মুখ থেকে মাস্ক খুলতে খুলতে বলল, কিভাবে হল এসব ?

-আসলে….

-দেখুন মিথ্যা বলবেন না । আমি দেখেছি কি হয়েছে । মিসক্যারেজ স্বাভাবিক ঘটনা । যে কোন সময় হতে পারে । কিন্তু এটা মিসক্যারেজ না । আপনি আসুন আমার সাথে ….

-ইরার কি অবস্থা ?

-অবস্থা কেমন আমি বলতে পারছি না । কোন মতে বাঁচিয়েছি আমি । তবে এখনও কিছু বলতে পারছি না । ২৪ ঘন্টা পার হৌক আগে । তারপর কিছু বলতে পারবো । আর আপনি আসুন আমার সাথে । আমার মনে হয় পুলিশে খবর দিতে হবে !

পুলিশের নাম শুনে রেহান একটু থমকালো । পুলিশ যদি জেনে যায় তাহলে ও খুব বড় রকমের ঝামেলাতে পড়বে । রেহান তকনই ডা. নিলয়ের হাত চেপে ধরলো । তারপর বলল, একটু বোঝার চেষ্টা করুন প্লিজ । একটু ঝামেলা হয়েছে । তবে বিশ্বাস করুন, আমার এতে কোন হাত নেই । কিন্তু কেমন করে এটা হয়েছে সেটা আমি আপনাকে বোঝাতে পারবো না । আপনি বিশ্বাস করবেনও না ।

-আচ্ছা ?

-আমার মত মনে হচ্ছে আপনি নিজে কোন ভাবে বাচ্চাটা পেট থেকে বের করার চেষ্টা করেছেন । কী ভয়ংকর একটা কাজ করেছেন জানেন আপনি ?

-আমি কিছু করি নি বিশ্বাস করুন । আর ইরা সাক্ষী দেবে। ও জানে আমি কিছু করি নি । ওর জ্ঞান ফিরে আসুক । ওর কাছে জানতে চাইবেন । ও যদি বলে যে আমি করেছি কাজটা তাহলে তখন পুলিশ ডাকবেন । আমি নিজে ধরা দিবো তখন।

ডাক্তার নিলয় কিছু সময় রেহানের চোখের দিকে তাকিয়ে রইলো । বুঝতে পারলো যে রেহান মিথ্যা কথা বলছে না । নিলয় বলল, ওকে ! আপনার স্ত্রীর জ্ঞান ফিরুক । যে যদি এই কাজ আপনি করেছেন তাহলে আপনাকে আমি পুলিশে দিবো । কথাটা মনে রাখবেন। আপনি কোথায় থাকেন আমি জানি । সো পালানোর চেষ্টা করবেন না ।

রেহান একটু দুঃখের হাসি হাসলো । ডাক্তার যদি তার ব্যাপারে সব কিছু জানতো তাহলে বুঝতে পারতো যে রেহান চাইলেও পালাতে পারবে না । তার কোথাও যাওয়ার জায়গা নেই । ঐ বাড়ি ছেড়ে আর কোথাও সে যেতে পারবে না । তার যাওয়ার কোন জায়গাও নেই ।

কয়েক ঘন্টা দুয়েক আগে ঘরে যাওয়া ঘটনার কথা এখনও রেহানের চোখের সামনে ভাসছে । কদিন থেকেই ইরা কেমন করছিলো । রেহান বুঝতে পারছিলো অর্টিরাস ওর সামনে আসা শুরু করেছে । এতো জলদি সে কখনই আসে না । ইরার পেটের বাচ্চাটা সবে মাত্র তিন মাস রয়েছে । এতো জলদি সব কিছু ঘটে যাবে সেটা রেহান ভাবতে পারে নি কিছুতেই । ইরা বারণ সত্ত্বেও ঐ ঘরের সামনে গিয়ে হাজির হয়েছিলো । এই কারণেই অর্সিরাস ওকে খুজে পেয়েছে । তারপর বেরিয়ে এসেছি নিজের কফিন থেকে । ইরা দোষ দিতে গিয়েও সে দিতে পারলো না । কারণ যে ঘটনাটা আজকে ঘটেছে সেটা আর কদিন পরে ঘটতোই ।

ইরার জ্ঞান ফিরলো আরও বারো ঘন্টার পরে । এর মাঝে রেহান একটা বারের জন্য ওর সাথে কথা বলার সুযোগ পেল না । ডাক্তার নিলয় সেই সুযোগ দিলেন না । যখন ইরার অবস্থা একটু ভাল হল তখন সে নিজে আগে কথা বলার জন্য ঢুকলো । রেহান বাইরে অপেক্ষা করতে লাগলো । যখন ইরার সাথে কথা বলে ডাক্তার নিয়ল বের হয়ে এল তখন রেহান মনে মনে একটু ভয়ই পেয়েছিলো । ইরা যা ইচ্ছে বলতে পারে ডাক্তারকে । এবং এখানে রেহানের কিছুই করার থাকবে না । তবে রেহানকে অবাক করে দিয়ে ডাক্তার নিলয় বলল, যান ভেতরে যান । আপনার স্ত্রী বলেছে যে আপনি তাকে রক্ষা করতে চেয়েছেন । কোন অশরীরি নাকি তার অবস্থা করেছে । সম্ভবত সে মানসিক ভারসাম্য নষ্ট হয়েছে তার। আমি এখনও খানিকটা নিশ্চিত না । তবে মনে হচ্ছে যে আপনি দোষী না । যাই হোক, আমি আপনার এবং আপনার স্ত্রীর উপর খোজ খবর করবো । আপাতত পুলিশে রিপোর্ট করছি না । আপনি আপনার স্ত্রীর কাছে যান ।

হাসপাতাল থেকে বাসায় আসতে আসতে আরও এক সপ্তাহ লেগে গেল । তবে ইরা আর রেহানের বাসায় ফিরে এল না । ওর বাবার বাসায় গিয়ে থাকা শুরু করলো । যদিও ইরার বাবা মা কেবল জানতে পারলো যে ইরার মিসক্যারেজ হয়েছে । অন্য কিছুই তারা জানেন না । তাদেরকে জানানোও হয় নি । ইরাও আশ্চর্যজনক ভাবে একেবারে চুপ গেছে । এটা নিয়ে কোন কথাই সে মুখ দিয়ে বের করে নি । রেহান যখনই ইরাকে ওর বাবার বাসায় দেখতে গেছে ইরা এমন আচরন করেছে যে ওটা একটা দুর্ঘটনা ছিল এবং সেটার ব্যাপারে সে কথা বলতে চায় না ।

আরও মাস দুয়েক পরে ইরা রেহানের বাসায় ফিরে এল । অবশ্য ফিরে আসার পেছনে ইরার নিজেস্ব একটা কারণ রয়েছে । সেদিনের সেই স্মৃতি সে কোনদিনই ভুলতে পারবে না । প্রতিরাতেই সেই ঘটনাটা যেন ওর চোখের সামনে ভেসে ওঠে । জানালা দিয়ে সেই ছায়া মূর্তিটা যখন ঘরের ভেতরে এসে দাড়িয়েছিলো তখন ভয়ে একেবারে জমে গিয়েছিলো সে । কেন সে ঐ রাতের বেলা ঐ ঘরে গিয়েছিলো সে । ওর কাছে মনে হচ্ছিলো যেন কি এক আকর্ষন অনুভব করছিলো সে । বারবার মনে হচ্ছিলো ঐ ঘরে কি আছে সেটা জানতেই হবে ওকে । নয়তো মনে শান্তি পাবে না । সেই কৌতুহলের ফল মোটেও ভাল হয় নি ।

ছায়া মূর্তিটা অদ্ভুত ভাবে রেহানের কন্ঠস্বরে কথা বলছিলো । অবাক হয়ে গিয়েছিলো সে । তারপর হঠাৎই ছায়া মূর্টিটা ওকে আক্রমন করে বসে । ঠিক কফিনের উপর থেকে লাফ দিয়ে ওর শরীরের উপরে এসে পড়ে । খানিকটা ধাক্কাট মত খেয়ে ইরা মেঝেতে পরে যায় । তারপর অবাক হয়ে লক্ষ্য করে সেই ছায়াটা ওর শরীরের উপরে উঠে বসেছে । এরপর কি ঘটেছে সেটা ইরা নিজেও বলতে পারবে না । তলপেটে একটা তীব্র ব্যাথা অনুভব করে সে । ওর কেবল মনে হয়েছিলো কিছু একটা ওর ভেতরে ঢুকে যাচ্ছে । এই টুকুই মনে আছে তার । তারপর যখন একটু একটু জ্ঞান ফেরে বুঝতে পারে কেউ ওকে কোলে করে নিয়ে নামছে সিড়ি দিয়ে । রেহানকে সে চিনতে পারে সে । তারপর আবারও জ্ঞান হারায় ।

ইরার বাসায় ফেরৎ আসার পর রেহান অফিস থেকে সন্ধ্যা হওয়ার আগে আগেই ফিরে আসতে লাগলো । দুইদিন ইরা কোন কথাই বলল না ঐদিনের ব্যাপারে । তিন নম্বর দিন রাতের খাবার পর ইরা রেহানকে সরাসরি কথাটা জিজ্ঞেস করলো ।

-ঐ ঘরে কি আছে রেহান?

-কোন ঘরে?

-তুমি খুব ভাল করেই জানো কোন ঘরের কথা বলছি । কিছু একটা আছে ঐ ঘরে । আমি জানতে চাই ওটা কি?

-তুমি ভুল বুঝছো ! ওখানে ক…

ইরা ওকে লাইনটা শেষ করতে দিল না । রেহান তখনই লক্ষ্য করলো ইরার হাতে ওর দেওয়া আংটিটা নেই । সর্বনাশ । ইরাকে এখন তো আর আগের মত নিয়ন্ত্রন করতে পারবে না । এই আংটির সাহায্যেই ইরাকে যাই বলতো ইরা সেটা বুঝে যেত সহজেই । কোন তর্ক করতো না । কিন্তু এখন সেটা না থাকার কারণে ইরার উপরে কোন প্রভাবই কাজে দিবে না । ইরা শান্ত কন্ঠে বলল, তুমি কি নিজে বলবে নাকি আমি চলে যাবো । যদি সব কিছু আমাকে সত্যিই সত্যিই না বল তাহলে কালই আমি তোমার এই বাসা ছেড়ে চলে যাবো । আমার সাথে যা হয়েছে তোমার আগের স্ত্রীর সাথেও একই কাজ হয়েছিলো । সে আত্মহত্যা করার আগে এটাই বারবার বলতো যে ঐ ছাড়াটা ওর বাবুকে খেয়ে ফেলেছে । আই গেস আমার সাথেও একই ঘটনা ঘটেছে । ঐরাতে আমার পেটের বাচ্চাকে সেটা আমার পেট থেকে টেনে বের করেছে । কিভাবে করেছে আমি জানি না । বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যাও হয়তো নেই কিন্তু সে করেছে আমি জানি । এবং আমি জানি এটাও তুমিও বিশ্বাস কর । তাই না ?

রেহান কোন কথা না বলে চুপ করে রইলো । ইরা আরও কিছু সময় অপেক্ষা করলো । তারপর খাবার টেবিল থেকে উঠে দাড়ালো । বলল, আই গেস আমি যদি এখানে থাকি আমার সাথে আবারও একই ঘটনা ঘটবে । আমি তাই চলে যাবো । তুমি যেহেতু সত্য বলবে না, তাহলে আমার এখানে থাকার কোন মানে নেই ।

ইরা চলে যেতে গেলে রেহান উঠে গিয়ে ওকে ঠেকালো । তারপর বলল, প্লিজ যেও না । আমি তোমাকে সব বলবো । কিন্তু তুমি বিশ্বাস করবে না জানি ।

-ঐ রাতে যা ঘটেছে তারপর আমি সব কিছুই বিশ্বাস করবো ।

-আজ রাতেই আমি তোমাকে সব কিছু বলবো । আমি জানি না এরপর তুমি আমাকে ভালবাসবে কিনা আমার কাছে থাকবে কিনা তবে বলে দিবো সব । আজ রাতেই ।

এই এলাকাতে রাত খুব জলদি নামে । ধুপ করে সব কিছু নিরব হয়ে যায় । আজও তার ব্যতীক্রম হল না । ইরাকে সাথে নিয়ে রেহান ঐ ঘরটার সামনে গিয়ে হাজির হল । হাতে একটা চার্যার লাইট । ইরা চুপচাপ রেহানের পেছন পেছনে এসে হাজির হল । রেহান চাবি দিয়ে দরজা খুলল।

আলো নিয়ে ঘরের ভেতরে ঢুকে পড়লো । ইরাও ওর পেছন পেছন ঢুকে পড়লো ভেতরে । সেই কফিনটার সামনে এসে দাড়ালো । কিছু সময় তাকিয়ে রইলো কফিনটার দিকে ।

তারপর সেটা আস্তে করে সরালো । ইরা কফিনের ভেতরে তাকিয়ে দেখলো । প্রথম দৃষ্টিতে কিছু না দেখা গেলেও আলোটা আরও ভাল করে ধরলো আবছায়া অয়বয়টা পরিস্কার বুঝতে পারলো । ইরার কাছে কেবল মনে হল যে রেহানের একটা ধোয়াশা ভার্শন কফিনের ভেতরে শুয়ে রয়েছে ।

রেহান সেদিকে তাকিয়ে রইলো কিছুটা সময় । তারপর বলল, ছোট বেলায় ভোমর আর দৈত্যের গল্প শুনেছো না । শক্তিশালী দৈত্যের প্রাণ লুকিয়ে রয়েছে ভোমরার ভেতরে । ভোমরকে মেরেো ফেলো তো দৈত্যও মরে যাবে!

ইরা এই রূপ কথা শুনেছে । কিন্তু রেহান এই গল্প কেন বলছে সেটা নিজেও জানে না । রেহান বলল, আমার পূর্বপুরুষদের উপরে এক অদ্ভুত অভিশাপ রয়েছে । আমাদের পরিবারের কেউই খুব বেশি দিন বাঁচে না । খুব জলদিই মারা যায় । এই অভিশাপের হাত থেকে বাঁচতে এবং বংশ বাঁচাতেই তারা একে একে অনেক বিয়ে করতে শুরু করে এবং ছোট বয়সেই তাদের বিয়ে দিয়ে দেওয়া হত কিন্তু দেখা যেত বিশ পঁচিশের ভেতরেই সবাই মারা পড়তো । সেই অভিশাপের হাত হাত থেকে বাঁচতেই আমার দাদা অর্রিরাসের সাহায্য নেয় ।

ইরা বলল, অর্টিরাস এক প্রাচীন দেবতা । অনেক আগে যখন অন্য কোন ধর্ম ছিল না তখন মানুষ এই অর্টিরাসের আরাধনা করতো । অর্টিরাস মানুষকে দীর্ঘদিন বেঁচে থাকার সুযোগ করে দিত ।

রেহান একটু থামলো । তারপর আবারও বলা শুরু করলো, আমার বয়স যখন এগারো বছর তখন আমার শরীর হঠাৎ করেই খারাপ হয়ে যায় । কোন ডাক্তার পথ্যেই কাজ হচ্ছিলো না কোন । আমার বাবা তখন আমাকে এই কফিনে ঢুকিয়ে দেয় । এই কফিনটাই হচ্ছে অর্টিরাসের আবার স্থল । আমাকে এখানে ঢুকিয়ে দেওয়ার আগে আগের অর্টিরাসকে মেরে ফেলতে হয়েছে । এটাই নিয়ম । আমার বাবার জন্য যে অর্টিরাস ছিল সেটাকে মেরে ফেলতে হয়েছে ।

ইরা বলল, কেন? মেরে ফেলতে কেন হয়েছে?

-নিয়ম হচ্ছে একটা পরিবারের একবারে একজনকেই অর্টিরাস সুরক্ষা দিতে থাকে । যখন কেউ এই কফিনের ভেতরে ঢুকবে তখন তারই একটা অর্টিরাস তৈরি হবে যেটা মূলত তারই প্রতিচ্ছবি । তার নিজের একটা অংশ । আরও ভাল করে বললে এটা তার প্রাণ বায়ু । এই প্রাণবায়ু এই কফিনের ভেতরে থাকা মানে হচ্ছে মৃত্যু তাকে স্পর্শ করবে না । তারপর অন্য কাউকে সুরক্ষা দিতে হবে তখন আগের অর্টিরাসকে সরিয়ে নতুন কাউকে জায়গা দিতে হবে ।

-তা তোমার বাবা কতদিন বেঁচে ছিলেন তারপর ?

-বেশি দিন না । তার দেহে ক্যান্সার ধরা পরে বছর খানেক পরেই ।

-এরসাথে ঐ রাতের কি সস্পর্ক?

রেহান একটু চুপ করে রইলো । তারপর বলল, প্রত্যেক দেবতার যেমন ভোগ দিতে হয় তেমন অর্টিরাসকেও ভোগ দিতে হয় । কফিনের ভেতরে এই অর্টিরাস যাতে সুস্থ থাকে এই জন্য তাকে অনাগত সন্তান উৎসর্গ করতে হয় । মানে নিজ থেকে কিছু করতে হয় না । অর্টিরাস নিজেই খুজে নেয় তার ভোগ ।

ইরা কথাটা ঠিক যেন বিশ্বাস করতে পারলো না । তীব্র কন্ঠে বলল, তার মানে তুমি নিজে বেঁচে থাকার জন্য আমার সন্তানকে উৎসর্গ করেছো ?

রেহান জানতো এমন একটা কথাই ওকে শুনতে হবে । কিন্তু এটাই এক মাত্র উপায় । এমন কাজ যদি না করা হয় তাহলে ওদের বংশ কবেই শেষ হয়ে যেত । ওর মায়ের কাছ থেকে শুনেছে রেহান হওয়ার আগে ও পরে কম করে হলেও ছয়বার রেহানের মায়ের পেটে সন্তান এসেছিল এবং সেসব নষ্ট হয়ে গেছে জন্মের আগেই ।

তার মানে হচ্ছে আমি যদি আবারও প্রেগনেন্ট হই তাহলে আবারও তোমার ঐ অর্টিরাস আবারও আমাদের বাচ্চাকে নিয়ে যাবে?

রেহান কিছু বলল না । কেবল মাথা ঝাকালো ।

-তাহলে তুমি কিভাবে বেঁচে আছো? তোমাকেও নিয়ে যাওয়ার কথা । তাই না?

-সাধারনত এক ভোগের পর এক হাজার দিন পর্যন্ত নতুন ভোগ না দিলেও চলে । এই পুরোটা সময় অর্টিরাস ঘুমিয়েই থাকে ।

ইরা কিছু সময় চুপ করে রইলো । কিছু যেন হিসাব করছে । তারপর বলল, তোমার আগের স্ত্রীর বাবুটা মিসক্যারেজ হয়েছিল বছর দুয়েক আগে । হিসাব মত তো এক হাজার দিন হয় নি । তাহলে আমার সাথে এমন কেন হল?

রেহান ইরার দিকে তাকিয়ে বলল, কারনটা সম্ভবত তুমি প্রেগনেন্ট অবস্থাতে গিয়েছিলে ঐ দরজার কাছে । এমন হতে পারে এ কারণেই অর্টিরাস জেগে গিয়েছিলো । এমন টা আগেও হয়েছে । আমি এই জন্য বারবার তোমাকে ঐদিকে যেতে মানা করতাম ।

ইরা কোন কথা না বলে কেবল রেহানের দিকে তাকিয়ে আছে । ওর এক মন বলছে যে রেহান কে ক্ষমা করে দিতে আবার অন্য আরেক মন বলছে রেহানকে মাফ না করতে । ওর সাথে যা হয়েছে সব কিছুর জন্য দায়ী এই রেহানই । নিজে বেঁচে থাকার জন্যই সে এমন একটা কাজ করেছে । কিভাবে এমন একটা কাজ সে করতে পারলো !

পরিশিষ্ট

কেরোসিন আর লবনের প্যাকেটটা কফিনটার পাশে এনে রাখলো ইরা । পকেট থেকে কাগজটা বের করলো । কাগজে বেশ কিছু চিহ্ন আঁকা রয়েছে । তার ঠিক নিচে কয়েকটা লাইন লেখা রয়েছে । ইরা খুব ভাল করেই জানে ওকে কি করতে হবে ।

-আপু

পেছনে তাকিয়ে দেখলো মিনু এসে দাড়িয়েছে । মিনুর হাতে দুটো শুকনো বাঁশের লাঠি । লম্বায় ঠিক ছয়ফুট । এটা রেহানের উচ্চতার সমান ।

ইরা বলল, মাপ ঠিক আছে তো?

-জি আপু।

-এদিকে নিয়ে এসো ।

মিনু তাই করলো।

ইরা লাঠি দুটো হাতে নিয়ে তাতে কেরিসিন মাখালো । তারপর কফিনের ডালাটা এক পাশে সরিয়ে লাঠি দুটো সেখানে ভরে দিল । চারিদিকে লবন ছড়িয়ে দিল । এরপর সব আসল কাজটা করলো সে । কাগজে লেখা সাইণ গুলো দেখে দেখে খুব সাবধানে কফিনের চারিদিকে লিখলো সে ।

এরপর কেরিসিন মাখা লাঠিটাতে আগুন ধরিয়ে কফিন আটকে দিল ।

ইরা এই দিনের বেলা কফিনের ভেতরে কিছু দেখে নি । তাই ভেবেছিলো হয়তো কিছুই হবে না । কিন্তু অবাক হয়ে দেখলো কফিনটা একটু একটু যেন নড়ছে । কেউ যেন ভেতরে রয়েছে এবং সে বের হওয়ার চেষ্টা করছে । ঠিক তারপরই একটা চিৎকার করা শুনতে পেল ইরা । মিনু ঠিক পেছনেই দাড়িয়ে ছিল । ইরা পেছনে তাকিয়ে দেখকলো মিনু একটু ভীত চোখে তাকিয়ে রয়েছে কফিনটার দিকে । বুঝতে পারলো যে ইরা কেবল একটাই দেখছে না ওটা । মিনুও দেখতে পাচ্ছে ।

ইরার ভয় পাওয়ার কথা কিন্তু সে মোটেও ভয় পাচ্ছে না । ইরার মন থেকে সেদিনই সব ভয় কেটে গেছে । এই ঘরে তারপর প্রায়ই আসতো । বারবার তাকিয়ে দেখতো কফিনটার দিকে । তীব্র একটা রাগ অনুভূত হত মনে । কেবল দেখেই যেত । কিন্তু যখনই আবার ইরা কনসিভ করলো তকখন মনে মনে সিদ্ধান্ত নিয়েই নিল । দ্বিতীয়বার এই অর্টিরাসকে আর ওর সন্তান পর্যন্ত আসতে দিবে না ।

How useful was this post?

Click on a star to rate it!

Average rating 0 / 5. Vote count: 0

No votes so far! Be the first to rate this post.

Related Posts

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *