সুখী মানব

oputanvir
4.7
(62)

বৃষ্টি পড়লে আমার মন খানিকটা উদাস হয়ে ওঠে । মন খারাপ হয় । নিজেকে বড় দুঃখী মনে হয় তখন। বৃষ্টির দিনে কোন কাজ কর্ম করতে ইচ্ছে করে না । ইচ্ছে হয় প্রিয় মানুষটির সাথে চুপচাপ শুয়ে থাকি । তার সাথে শুয়ে থাকা মানে আমি অবশ্যই অন্য কিছু বোঝাই নি । আমি জানি আপনারা চোখ বড় বড় করে তাকিয়েছেন লেখার দিকে তাকিয়ে । মিমিও এমন ভাবে চোখ বড় করে তাকিয়েছিলো । আমি যে এমন কোন কথা বলতে পারি সেই সম্ভবত তার বিশ্বাস হচ্ছিলো না । তখনও মিমির সাথে আমার খুব ভাল সম্পর্ক তৈরি হয় নি । সবে মাত্র পরিচয় হয়ে একটু একটু ভালর দিকে এগোচ্ছে ।
মিমি যে অফিসে কাজ করে সেই অফিসের সাথে একটা কন্ট্রাক্ট বেসিসে কাজ করেছিলাম মাস খানেক । ওদের প্রোডাক্টের জন্য কিছু গ্রাফিক্স তৈরি করে দিতে হয়েছিলো । পুরো সময়ই মিমির সাথেই আমার যোগাযোগ হয়েছে । ও ব্যাপারটা সামলে ছিল । সেখান থেকেই আমাদের পরিচয় । এরপর আস্তে আস্তে আমাদের দেখা সাক্ষাত হতে থাকে ।
এমন একদিন মিমিকে কথা টা বলেছিলাম । আমরা রেস্টুরেন্টে বসে গল্প করছি আর খাবার খাচ্ছি । এমন সময় মিমি হঠাৎ জানতে চাইলো যে আমার পছন্দের এমন কি কাজ আছে যা আমি করতে চাই কিন্তু এখনও করতে পারি নি । তখন বললাম, কোন অলস বিকেলে কাছের মানুষটার সাথে শুয়ে থাকা ।
কথাটা বলেই মনে হল যে কী বললাম ! বলা ঠিক হল কিনা !
মিমির দিকে চোখ পড়তেই বুঝলাম যে ওর গালটা খানিকটা লাল হয়ে উঠেছে । আমি দ্রুত বললাম, মানে প্লিজ অন্য কিছু মনে কর না । শুয়ে থাকা মানে আমি কেবল শুয়ে থাকাই বুঝেছি । অন্য কিছু না ।

মিমি দেখলাম তখনও আমার দিকে কেমন চোখে তাকিয়ে রয়েছে । আমি বললাম, ধর কোন অলস বিকেল । বাইরে বৃষ্টি হচ্ছে । আমার আসলে এমন সময়টাতে মন খারাপ হয় খুব । কোন কারণ ছাড়াই মন খারাপ লাগে । তখন কাউকে ইচ্ছে করে জড়িয়ে ধরে চুপচাপ শুয়ে থাকি । তেমন কোন মন খারাপের বিকেলে তোমাকে জড়িয়ে ধরে শুয়ে থাকবো । বাইরে একটু একটু ঠান্ডা পড়বে । তাই একে অন্যের শরীরের খুব কাছাকাছি থাকবো । একেবারে কাছাকাছি । একই বালিশে মাথা দিয়ে । একেবারে মুখোমুখি না । সে মনে কর তুমি আমার দিকে …….

তখন মনে হল ভুলটা কোথায় হয়েছে । আসলে তখনও আমাদের সম্পর্কে এমন হয় নি যে ওকে নিয়ে এমন ভাবে কিছু বলতে পারি । ভুল করে আমি তুমি করে বলে ফেলেছি । সেদিন মিমি খুব বেশি লজ্জা পেয়েছিলো । আর ঠিকঠাক মত কথা বলতে পারি নি আমরা দুজনের কেউই । পরের কয়েকটা দিন মিমি যোগাযোগ কমিয়ে দিয়েছিলো । আমি ভেবেছিলাম যে হয়তো সম্পর্কটা নষ্ট হয়ে গেল । তবে আশার কথা যে সেটা নষ্ট হয় নি । বরং তারপর আস্তে আস্তে আরও ভালর দিকে গেছে । যদিও এখনও ওকে বিয়ের কথা ভাবছি না । তবে নিশ্চিত যে সব কিছু ঠিক থাকলে ওকেই বিয়ে করবো ।

এই সব ভাবতে ভাবতেই বাইরে তাকালম আবার । অনেকটা সময় ধরে বৃষ্টি পড়ছে । সন্ধ্যা হতে অনেক টা সময় বাকী তবুও চারিদিক কেমন অন্ধকার হয়ে এসেছে । এই বৃষ্টি সহজে থামবে বলে মনে হয় না । সন্ধ্যার দিকে একটা কাজ ছিল । ঠিক করলাম যে বাইরে আর বের হব না আজকে ! আজকে আমার বৃষ্টি বিলাশ করার দিন ।
একবার মনে হল মিমিকে ফোন দিয়ে কিছু সময় কথা বলি । কিন্তু সেই চিন্তা বাদ দিয়ে দিলাম । এখন সে সম্ভবত অফিসে রয়েছে । তাকে বিরক্ত করার কোন মানে নেই । মন খারাপ থাকলে আমার কোন কিছু ভাল লাগে না । এই সময়ে কেবল শুয়ে থাকতে মন চায় । ল্যাপটপটা বন্ধ করে দিয়ে নিজের ঘরের দিকে হাটা দিলাম । দরজার কাছে যেতেই কলিংবেল বেজে উঠলো ।
এমন সময়ে কে এল?
কে আসতে পারে ?
কারো আসার কথা আছে কি !
মনে করার চেষ্টা করলাম বটে কিন্তু মনে পড়লো না । একটু বিরক্ত হলাম । এই সময়ে যে কারো সাথে প্যাচাল পড়তে মোটেই ভাল লাগবে না । বরং মেজাজ গরম হবে ।

কিন্তু যখন দরজা খুললাম তখন আমাকে অবাক হতেই হল । মিমি দাড়িয়ে আছে দরজার সামনে । অনেকটাই ভিজে গেছে সে । আমি বললাম, তুমি?
-হু !
মিমি কেবল হাসলো ।
-এই সময়ে !
-হ্যা । শুনো ভিজে গেছি । নতুন কাপড় দাও দেখি । তার আগে ভেতরে আসতে দাও তো !
আমি সরে দাড়ালাম । মিমি ভেতরে ঢুকলো । আমি ভাবতে লাগলাম যে ওকে কোন পোশাক দেওয়া যায় । আসলে আমি সত্যিই ঠিক বুঝতে পারছি না যে মিমি হঠাৎ করে আজকে এখানে এসে হাজির হওয়ার কারণটা সত্যিই বুঝতে পারছি না । এখন ওর অফিসে থাকার কথা । আর আসার আগে একটা মেসেজ কিংবা ফোন কল দিয়ে আসতে পারতো ।

তোয়ালে দিয়ে দিয়ে শরীর মুছতে মুছতে বলল, যাক অন্তত চুল টা ভেজে নি । চুল ভিজলে কত প্যারা খেতে হয় জানো ! এতো লম্বা চুল কেটে ফেলবো ভাবছি !
আমি আঁতকে উঠলাম। বললাম, খবরদার চুল কাটবে না একদম । তাহলে কিন্তু তোমার সাথে কথা বলবো না আর ।
আমার বলার ভঙ্গি দেখে মিমি হেসে ফেলল । তারপর বলল, ইস ঢং । বড় সামলানো কত ঝামেলার সেটা জানো ? নিজে তো বলেই খালাস !
-হোক । চুল কাটা যাবে না। এটাই হচ্ছে কথা !
-হ্যা এসেছে !

একটু থেমে মিমি আবার বলল, কিছু পরতে না দিতে বললাম! এভাবে ভেজা কাপড়ে থাকবো ?
আমি একটু ইতস্তত করে বললাম, কী দেব পরতে ! তোমার পরার মত কিছু নেই । সবই তো আমার পোশাক ! তুমিই বরং ওয়ার্ডড্রোফে যাও, নিজের পছন্দমত কিছু পরে নাও । আর কফি খাবে? কিংবা অন্য কিছু?

মিমি আমার দিকে তাকিয়ে বলল, না এখন কিছু খাবো না । সন্ধ্যার সময় খাবো নে । এখন গল্প করতে এলাম !

এরপর মিমি আমার বেড রুমের দিকে পা বাড়ালো । আমি বসার ঘরে চুপ করে বসে রইলাম । মনের ভেতরে কেমন যে অনুভূতি হচ্ছে । আমি মিমির আচরন ঠিক বুঝতে পারছি না । এই বৃষ্টির দিনে মিমি কেবল গল্প করার জন্য এসেছে !

কিছু সময় পার হয়ে গেলেও দেখলাম মিমি ঘর থেকে বের হল না । এতো সময় লাগছে কেন ? একবার কি যাবো ঘরের দিকে?
একবার মনে হল যাই আবার মনে হচ্ছে না থাক যাওয়ার দরকার নেই । দেখা যাবে মিমি কাপড় বদলাচ্ছে । শোবার ঘরের দরজাটা খোলাই রয়েছে । মিমি সেটা বন্ধ করে নি ।
আজকে মিমির আচরণ আমার কাছে একটু যেন কেমন মনে হচ্ছে ! আমাদের মাঝে সম্পর্ক এক বছরেের বেশি সময় হতে চলল । এরমাঝে ওর হাত ধরেছি অনেকবার । রিক্সার ভেতরে হুড তুলে দুইবার চুমুও খাওয়া হয়েছে ওর গালে । তবে এর বেশি আমি এগোই নি । আমার বাসায় এর আগে ও এসেছে ।

আমাকে মিমি খুব ভাল করে চিনে গেছে । বিশেষ করে আমি একটু অলস টাইপের আর ঘর কুনো ধরনের । আমার ছুটির দিন গুলোতে বাইরে ঘুরে বেড়ানোর চেয়ে ঘরে শুয়ে বসে টিভি মুভি দেখে কাটাতে ভাল লাগে । মিমি তাই মাঝে মাঝে আমার বাসায় আসে ছুটির দিনে । আমরা দিনভর গল্প করি একসাথে রান্না করি কিংবা অর্ডার দেই । মুভি দেখি । কিন্তু তারপরও মিমি সব সময় একটা দুরত্ব বজায় রেখেছে । কিছু কিছু ব্যাপারে এই দুরত্ব রাখা দরকারও । আর আমি যেহেতু ওর ব্যাপারে বেশ সিরিয়াস তাই আমিও সেটা সম্মান করেই চলি। কিন্তু আজকে মিমিকে একটু অগোছালো লাগছে যেন !

আমি এবার দেরি দেখে এই ঘর থেকেই বলল, কী হল জামা কাপড় পাও নি কিছু ?
মিমি বলল, পেয়েছি । এঘরে এসো !

আমি আস্তে আস্তে ঘরের দিকে পা বাড়ালাম । দরজার পা দিয়ে সত্যিই অবাক হলাম । দেখলাম মিমি আমার বিছানাতে শুয়ে আছে চাদর গায়ে দিয়ে । ঠিক আমার দিকে তাকিয়ে নেই । জানালার দিকে তাকিয়ে আছে !
আমার বুকের ভেতরে কেমন যেন করে উঠলো । অনুভব করলাম যে সেটা বেশ জোরেই দৌড়াতে শুরু করেছে ।
মিমি আমার দিকে না তাকিয়ে আবার বলল, এমন একটা দিনের জন্য আমি অনেকটা সময় অপেক্ষা করেছি ।
আমি আরও কিছু সময় চুপ করে দাড়িয়ে রইলাম । একবার মনে হল যে আমি হয়তো স্বপ্ন দেখছি । মিমি হয়তো সত্যিই আসে নি । আমি নিজের ঘরে শুয়ে শুনে স্বপ্ন দেখছি আর সাজাচ্ছি এসব । যদি স্বপ্নও হয় তাহলে সেটা সব থেকে মধুর স্বপ্ন !

আমি বিছানার এগিয়ে গেলাম । চাদরের নিচে ঢোকার সময় অনুভব করলাম যে আমার শরীর যেন একটু একটু কাঁপছে । মিমি যে বালিশে মাথা দিয়েছিলো সেখানেই মাথা দিলাম । মিমি আমার দিকে পিঠ করে শুয়ে আছে । আমি নিজের একটা হাত মিমির কাধের কাছ দিয়ে গলিয়ে আরেকটা উপর দিকে বাড়িয়ে ধরে ওকে জড়িয়ে ধরলাম । তারপর নিজের শরীরটা আরও কাছাকাছি নিয়ে গেলাম !

হঠাৎ করেই অনুভব করলাম আমার চোখ যেন সিক্ত হয়ে উঠলো । কতদিন ধরে এমন একটা দিনের জন্য অপেক্ষা করেছি আমি । এভাবে কাছাকাছি আসার !
মিমি মৃদু স্বরে বলল, খুশি ?
-হুম !
-এখন শুয়ে থাকো চুপচাপ ! অন্য কিছু না একদম !
-তোমার কন্ঠস্বর শুনে মনে হচ্ছে তুমি চাও যেন আমি অন্য কিছু করি !
-তাই না ! একদম না । খবরদার বললাম !

আমি মিমির ঘাড়ের কাছে মৃদু ভাবে চুমু খেলাম ! মিমির পুরো শরীর যেন দুলে উঠলো । আমি অবশ্য আর এগোলাম না । তারপর ওকে আরও একটু শক্ত করে জড়িয়ে ধরে চোখ বন্ধ করলাম । বাইরের বৃষ্টির আওয়াজ যেন আরও বেড়েছে । একটানা বৃষ্টি আওয়াজ যেন আমার মনকরে অন্য কোন জগতে নিয়ে গেলাম । কোথাও যেন হারিয়ে গেলাম আমি । অনুভব করলাম যে আমার মনের সেই সিক্তভাবটা চোখ এক কোনে মৃদু পানির আগমন ঘটিয়েছে । আমি সেটা মুছবার কোন চেষ্টা করলাম না অবশ্য । হঠাৎ করেই আমার মনে হল এই জগতে আমার থেকে সুখী মানুষ বুঝি আর কেউ নেই ।

How useful was this post?

Click on a star to rate it!

Average rating 4.7 / 5. Vote count: 62

No votes so far! Be the first to rate this post.

About অপু তানভীর

আমি অতি ভাল একজন ছেলে।

View all posts by অপু তানভীর →

One Comment on “সুখী মানব”

Comments are closed.