রায়হানের সাথে বিয়ে হয়েছে মাত্র সতের দিন। এই সতের দিনের ভেতরে আমি অন্তত বুঝতে পেরেছি যে ওকে বিয়ে করার সিদ্ধান্তটা নিয়ে আমি কোন ভুল করি নি। মনের ভেতর থেকে একটা অনুভূতি এসে হাজির হয়েছে যে জীবনে সব চাওয়া পূরণ হয় না। সব চাওয়া পূরণ হওয়া উচিত না। সবার ভালোবাসা পুরণ হওয়ার ঠিকও না। বরং কিছু কিছু ভালোবাসা পুরণ হলেই সেটা ভয়ংকর পরিণতির দিকে যায়।
টাইটানিকের রোজ আর জ্যাকের কথাই ধরা যাক। আমরা যদি ধরেই নিই যে সেই দূর্ঘটনায় জ্যাক বেঁচে গেল তারপর রোজের সাথে জ্যাকের বিয়ে হল। একবার ভেবে দেখুন তো দৃশ্যটা। বড় লোকের আদুরের দুলালী যখন জ্যাকের সাথে সংসার শুরু করত এক সপ্তাহের ভেতরে প্রেম ভালোবাসা সব জানলা দিয়ে পালাত। বাস্তব জীবনে আসলে এমনইটাই হয়। মানুষ যখন ভালোবাসে তখন তার মনের সামনে একটা বিভ্রান্তির পর্দা ঘিরে থাকে। সেই পর্দা ভেদ করে বাস্তবতা দেখা যায় না। বিয়ে করে ঘর সংসার শুরুর সাথে সাথে সেই পর্দা উঠতে শুরু করে। যখন পুরোপুরি পর্দা উঠে যায় তখন শুরু হয় আসল সমস্যা।
রায়হানকে আমি শুভর ব্যাপারে সব কিছুই খুলে বলেছি। শুভর সাথে যে আমার দীর্ঘদিনের প্রেম ছিল সেটা রায়হান জানত। সে জেনে শুনেই আমার দিকে এগিয়ে এসেছে। আমার মনে আছে প্রথম যেদিন আমাদের দেখা হয়েছিল সেদিন আমি সবে মাত্র শুভর সাথে ঝগড়া করে উদ্দেশ্যহীন ভাবে হাটছিলাম। মেজাজটা সেদিন এতোই খারাপ ছিল যে হাটতে হাটতে আমি একেবারে একটা গর্তে পরে গেলাম। গর্তটা যদিও বড় ছিল না খুব একটা তবে আমার জামা কাপড়ে ময়লা লেগে গেল। মেজাজটা আরও খারাপ হয়ে এল যখন দেখতে পেলাম আশে পাশের মানুষ দাঁত বের করে হাসছে। কারো চোখে বিন্দু মাত্র সহানুভূতির কোন চিহ্ন ছিল না। কেবল একজন মানুষ বাদ দিয়ে। সেই মানুষটা ছিল রায়হান।
আমি জামার ধূলা পরিষ্কার করতে যখন উঠে দাড়ালাম তখন অনুভব করলাম যে আমার পা কেটে গেছে এবং সেখান দিয়ে রক্ত বের হচ্ছে। আমার মেজাজটা তখন আরও খারাপ হয়ে গেল। কিছু সময় বোকার মত দাঁড়িয়ে রইলাম আমি। তারপরই দেখলাম একজন এগিয়ে এল আমার দিকে। তার চোখ আমার পায়ের দিকে। সে আমার দিকে তাকিয়ে বলল, বেশ খানিকটা কেটে গেছে!
আমি জবাব দিলাম না। সে আমার দিকে তাকিয়ে বলল, এদিকে আসুন তো, এইখানে বসুন!
আমি বিরক্ত হয়ে বললাম, আপনাকে চিন্তা করতে হবে না।
আমার কথায় বিন্দু মাত্র ভ্রুক্ষেপ না করে সে খুব স্বাভাবিক ভাবেই আমার হাত ধরে আমাকে পাশের ফুটপাতে বসিয়ে দিল। তারপর নিজের কাধ থেকে ব্যাগটা নামিয়ে সেখান থেকে একটা বোতল রতল বের করল। সেটা দিয়ে আমার পায়ের কাঁটা স্থানে পরিষ্কার করে দিয়ে তারপর ব্যান্ড এইড বেধে দিল। আমি কিছু সময় অবাক হয়ে ছেলেটার দিকে তাকিয়ে রইলাম কেবল। তারপর বলল, আপনি কি ব্যাগে এসব নিয়েই ঘোরেন সব সময়।
ছেলেটা বলল, কী করবো বলুন আমার কাজই হচ্ছে এসব?
-আপনি ডাক্তার ?
-জ্বী কপালের দোষে। তাই চাইলেই চোখের সামনে কাউকে আহত দেখলে চুপ করে থাকতে পারি না।
আমি বুঝতে পারলাম যে কেন সে আমার দিকে এগিয়ে এসেছিল। সে আমার দিকে তাকিয়ে বলল, বাসায় যেতে পারবেন তো?
আমার একটু মনটা নরম হয়ে এল। তারপর বললাম, সরি আমি আসলে একটা ব্যাপার নিয়ে খুব ডিস্টার্ব ছিলাম। তাই খেয়াল করি নি। এই জন্য আপনার সাথে আগে রুড ব্যবহার করেছি।
ছেলেটা একটু হাসল। তারপর বলল, আমি দেখেছি। আপনি সম্ভবত আপনার বন্ধুর সাথে ঝগড়া করছিলেন। আমি পেছনেই ছিলাম। আপনাকে চলে যেতে দেখলাম।
লাইনটা বলে সে একটু থামল। তারপর বলল, দয়া করে ভাববেন না যে আমি আবার পিছু নিয়েছি আপনার। আসলে আপনি যে পথে যাচ্ছিলেন আমার পথটাও সেটাই। এই যে আর মিনিত দশেক হাটলেই আমার বাসা। আমি সেখানেই যাচ্ছি।
আমি হাসলাম। বললাম, ভয় নেই আপনার চেহারায় ভদ্র একটা ভাব আছে। মেয়েদের পিছু নেওয়ার মত মনে হয় না।
-শুনে খুশি হলাম। আপনাকে উবার ডেকে দিবো?
-না ধন্যবাদ। আমি আরও কিছু সময় থাকব। তারপর বাসায় যাব।
ছেলেটা আর কিছু না বলেই নিজের পথ ধরল। আমি ছেলেটার চলে যাওয়া দেখলাম। ছেলেটা নিজের নাম পর্যন্ত বলল না। আমার ব্যাপারে অন্য কিছু জিজ্ঞেসও করল না। একেবারে মোড় ঘোরার আগে একবার পেছনে ফিরে তাকাল। আমার দিকে তাকিয়ে একটু হাই দিয়ে চলে গেল।
তারপর রায়হানের সাথে আমার আবারও দেখা হল সপ্তাহ খানেক পরে। মায়ের সাথে তার বান্ধবীর দাওয়াত খেয়ে গিয়েছি। সেখানেই রায়হানের সাথে পরিচয়। রায়হান হল সেই বান্ধবীর কোন এক দিক দিয়ে আত্মীয় হয়। নিজ থেকে আমার দিকে এগিয়ে এসে বলল, আপনার পায়ের অবস্থা কেমন এখন?
প্রথমে আমি চিনতে পারি নি। তবে একটু পরেই চিনতে পারলাম। সেদিন রায়হান নিজের পরিচয় দিল। কোথায় থাকে না থাকে সব জানতে চাইল। এমন কি আমরা ফেসবুকেও যুক্ত হয়ে গেলাম।
আমার কেন জানি শুভর কাছ থেকে দুরত্ব সৃষ্টির জন্য অন্য কাউকে দরকার ছিল। সত্যি বলতে কি প্রথমে আমি রায়হানের সাথে সম্পর্ক করার কথা ভাবিও নি। কেমন কার সাথে কথা বলতে ইচ্ছে করছিল।
শুভর কাছ থেকে আমি অনেক আগে থেকেই মুক্তি চাচ্ছিলাম। আমাদের সম্পর্কটা খুব বেশি তিক্ত হয়ে উঠেছিল কিন্তু কোন একটা কারণে আমি শুভকে ছেড়ে যেতে পারছিলাম না। একতা সুক্ষ অপরাধবোধ আমার ভেতরে কাজ করত এই কারণেই আমি শুভকে ছেড়ে যেতে পারতাম না। শুভ নিজেও ব্যাপারটা জানত যে আমি ওকে ছেড়ে যেতে পারব না। তাই সে আমার সাথে যেমন ইচ্ছে তেমন ব্যবহার করত। আমাকে নিয়ে খেলতে তার ভাল লাগত। তারপরেই আসল সেই সময় টা।
কোভিট মহামারি।
সেই সময়ে দেশে বেশ ভাল রকমের ভয় ছড়িয়ে পড়েছে। অবশ্য শুভ সেই সময়ে হাসপাতালে ভর্তি হইয়েছিল অন্য কারণে। গাজা আর মদ খেয়ে ওর শরীরের আর ছিল না। আমি ওর হাসপাতলের ভর্তির খবর শুনে ওকে দেখতে গেলাম। যদিও আমাকে প্রথমে ঢুকতে দিচ্ছিল না। যখন চলে যাবো তখনই রায়হান এসে হাজির হল, আমি ওকে খুলে বললাম। রায়হান চিনতে পারল। সে বলল যে শুভ অবস্থা ভাল না। তবে এখনও কোভিট ধরা পরে নি। কোভিট রোগীদের অন্য জায়গাতে রাখা হচ্ছে। আমি শুভর বেডের সামনে গিয়ে বসলাম। ওকে কিছু বকাঝকা করলাম। শুভ অবশ্য গা করল না। সে কোন দিনই গা করে না। উল্টো আমার কাছে কিছু টাকা চাইল। আমি টাকা দিয়ে চলে এলাম।
আসার সময় রায়হানের কেবিনে এসে একটু ঢু মেরে গেলাম। রায়হানই জানতে চাইল। আমি খুলে বললাম যে শুভর সাথে আমার কী সম্পর্ক। আমি বুঝতে পারছিলাম যে শুভর ব্যাপারে শুনে রায়হানের ভাল লাগল না। রায়হান যে ধীরে ধীরে আমাকে পছন্দ করছে সেটা আমার বুঝতে কষ্ট হল না। আমি কিছু না বলে সেদিন চলে এলাম। ঠিক দুইদিন পরে রায়হান ফোন করে আমাকে জানাল।
শুভ কোভিট ধরা পরেছে। এবং অবস্থা খারাপের দিকে। আমিও যেন আমার কোভিট টেস্ট করিয়ে নিই যেহেতু আমি শুভর কাছে গিয়েছিলাম।
আমার অবস্থা ঠিক একই রকম। কাশি আর জ্বর ছিল। আমি বাসাতেই ছিলাম। আমি যদিও টেস্ট করায় নি তবে আমিও যে আক্রান্ত সেটা বুঝতে কষ্ট হচ্ছিল না। আমি আমার কথা জানালে রায়হান আমাকে নানান পরামর্শ দিল। সব কিছু মেনে চলতে বলল।
ঠিক চারদিন পরে শুভ মারা গেল। আমার অবস্থা যদিও খুব বেশি খারাপ হল না। একটা কথা সত্যি করে বললে শুভর মৃত্যুতে আমি কষ্ট পেয়েছিলাম সত্যি তবে নিজেকে আমার কেমন যেন মুক্ত মনে হচ্ছিল। আমি যেন শুভর কাছ থেকে মুক্তি পেয়েছি। কী অদ্ভুত যে এক অনুভূতি সেটা বলে বোঝানো যাবে না।
এরপরের গল্পটা অনুমেয় ছিল। রায়হানের সাথে আমার মেলামেশা বাড়তে লাগল। এক সময়ে লকডাউন শেষ হল। সব কিছু একটু একটু স্বাভাবিক হয়ে আসতে লাগল। একদিন রায়হানদের বাসা থেকে বিয়ের প্রস্তাব এল। আমার আসলে মানা করার কোনো কারণ ছিল না। এরপর আরও কিছু সময় আমাদের বিয়ে হয়ে গেল। তবে বিয়ের পর থেকে রায়হানের চেহারায় মাঝে মাঝে আমি একটা চিন্তার ছাপ দেখতে পাই। ও যেন কিছু নিয়ে কী যেন ভাবে।
রাতের বেলা ঘুম থেকে ভেঙ্গে দেখি রায়হান পাশে নেই। বারান্দায় চেহারের উপরে বসে রয়েছে। আমি উঠে গিয়ে পাশে দাড়ালাম ওর। তারপর বলল, কী ব্যাপার, নতুন বউয়ের উপর থেকে এখনই মন উঠে গেল?
রায়হান হাত ধরে টেনে আমাকে ওর কোলের উপরে বসাল। তারপর বলল, তোমার উপর থেকে আমার মন উঠবে না কোনো দিন। বুঝেছো? কোনো দিন না।
রায়হানের কন্ঠে আসলে এমন কিছু ছিল যে আমি টের পেলাম যে রায়হান সত্যি কথা বলছে। আমি বললাম, আমি জানি সেটা।
-তোমাকে প্রথম যেদিন দেখলাম সেদিনই মনের ভেতরে একটা চেহারা গেথে গেছে। যখন দ্বিতীয়বার দেখা হল তখন বারবার মনে হচ্ছিল তোমাকে কীভাবে নিজের করে পাবো!
আমি চুপ করে রইলাম। রায়হানের চেহারায় একটা অপরাধবোধ ফুটে উঠল। রায়হান বলল, তবে একটা কথা তোমার কাছে স্বীকার করতে চাই। আমি জানি এটা জানার পরে তোমার মনের ভাবটা কী হবে!
-কী কথা!
-মনে আছে শুভ যখন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিল!
-হ্যা।
-যখন ওর কোভিট ধরা পরল, সত্যি বলতে কি আমি চেয়েছিলাম ও যেন না রিকোভার করে। আমি ডাক্তার হিসাবে কোন দিন কোনো রোগীর ব্যাপারে এই মনভাব পেষণ করি নি। কিন্তু আমার তখন কেবল তোমার কথা মনে হচ্ছিল। তুমি যখন ওর হাত ধরলে ওর পাশে বসে কথা বলছিলে আমার সেটা দেখে সহ্য হয় নি। আমার বারবার মনে হচ্ছিল যে ও মরে যাক! আমি নিজের দায়িত্ব অবহেলা করি নি কিন্তু মন থেকে এটাই চাইছিলাম আমি!
আমি রায়হানের কন্ঠ স্বরের ভেতরে সে অপরাধবোধটা অনুভব করতে পারছিলাম। আমি ওকে জড়িয়ে ধরলাম। তারপর বলল, শুভর শারীরিক অবস্থা আগে থেকেই ভাল ছিল না। তুমি না চাইলেই ও মারা যেতই। দরা করে নিজেকে দোষী ভেবো না। কেমন?
-তুমি আমাকে ঘৃণা করবে না তো?
-না করব না।
-সত্যি!
-একদম সত্যি। এখন চল ঘুমাতে যাই। সকালে আবার ডিউটি আছে।
রায়হান আমাকে উঠতে দিল না। গাঢ় করে আমাকে একটা চুমু খেল। তারপর আমাকে একপ্রকার কোলে করে নিয়ে বিছানাতে এল শুতে। একটু আদরের পর যখন রায়হান আমাকে জড়িয়ে ঘুমিয়ে পড়ল আমি তখন নির্ঘুম ভাবে শুয়ে রইলাম। মনের ভেতর একটা অস্বস্তির অনুভূতি আমাকে কুড়ে কুড়ে খেতে লাগল।
রায়হানের ধারণা আমার সেদিন শুভ কাছ থেকে কোভিট ধরেছিল। কিন্তু বাস্তবতা আসলে ছিল উল্টো। শুভোর কাছ থেকে আমার কোভিট হয় নি, আমার কোভিট ধরেছিল আমার ছোট মামার কাছ থেকে। আমি সেটা টের পেয়েছিলাম আগেই। যদিও শতভাগ নিশ্চিত ছিল না যে ভাইরাসটা আমার দেহে এসেছে তবে আমি অনুভব করতে পারছিলাম যে কোভিট হয়েছে। নিজের শারীরিক অবস্থার প্রতি আমার আস্থা ছিল। আমার খুব বেশি কিছু হবে না সেটাও আমি জানতাম। ঠিক একই ভাবে আমি জানতাম যে শুভর যে শারীরিক অবস্থা তাতে শুভর কোভিট হলে সে কিছুটেই টিকবে না। এটা মনে হতে আমি সেদিন ইচ্ছে করেই শুভর সাথে দেখা করতে গিয়েছিলাম। ইচ্ছে করে ওর হাত ধরেছিলাম। ইচ্ছে করেই শুভ ঠোটে চুমু খেয়েছিয়াম, যেন আমার কাছ থেকে শুভর কোভিট ছড়িয়ে পড়ে। হয়েছিলও তাই।
আচ্ছা আমি কি তাহলে শুভকে খুন করেছি?
হয়তো আমিই খুনী। আমিই ওকে খুন করেছি। শুভ যতদিন বেঁচে থাকত ততদিন আমি কখনই ওকে ছেড়ে আসতে পারতাম না। শুভ আমার জীবনটা জাহান্নাম বানিয়ে রেখেছিল। আমি এমন এক জেলে বন্দী ছিলাম যেখান থেকে আমি কোনদিন মুক্তি পেতাম না যদি না শুভ মারা না যেত! আমাকে এটা করতেই হত। মুক্তি পেতে শুভকে খুন করতেই হত!
এই একই থিমে আমি আগে আরও একটা গল্প লিখেছিলাম আজকে মনে একটু অন্য ভাবে গল্পটা লেখা যাক।


সম্পর্ক যখন গলা টিপে ধরে তখন কতই না অদ্ভুত কাজ করতে ইচ্ছে হয়! কিন্তু বাস্তবে সেসব করা হয়ে উঠে না।
বরাবরের মতই গল্প ভালো লেগেছে। শুভকামনা জানবেন।
না, এই রকম অনেক ঘটনা ঘটে। সম্পর্কে বের হতে মানুষ কত কিছুই যে করে!
ভাল থাকুন এই কামনা করি।