4.9
(26)

ওয়েট মেশিনটার দিকে মায়ার মনটা খারাপ হয়ে গেল । ৮৯ কেজি দুইশ গ্রাম । এর মানে হচ্ছে গত এক মাসের পরিশ্রমে মাত্র নয়শ গ্রাম কমেছে ! মন খারাপ নিয়ে বসে পড়লো সে ! মায়ার কিছু ভাল লাগছে না । ডাক্তারের কাছে যাওয়া বৃথা মনে হচ্ছে । অবশ্য এর আগেও এমনটা হয়েছে । ওজন কমাতে নিউট্রিশনিস্টের কাছে যাওয়া ওর এই প্রথম না । আগেও বেশ কয়েকবারই গিয়েছে কিন্তু কোন কাজ হয় নি । মায়ার ওজন মোটেও কমে নি । বরং আরও বেড়েছে কোন কোন ক্ষেত্রে ।

তখন ব্যাপার গুলো অন্য রকম ছিল । নিজের ওজন নিয়ে খুব একটা চিন্তিত ছিল না সে । কিন্তু এখন ব্যাপারটা মোটেও আগের মত নেই ।আগে সে সিঙ্গেল ছিল কিন্তু এখন বিবাহিত । ইমনের সাথে কোথাও বাইরে বের হতে পারে না লজ্জার কারণে । ইমন দেখতে কী সুন্দর । ইমনের পাশে ওকে কেমন যেন লাগে । নিজের কাছে এতো খারাপ লাগে ওর । মনে হয় যেন সব কিছু ছেড়ে ছুড়ে দিতে !

তখনই কলিংবেল বেজে উঠলো । মায়া ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখে সবে মাত্র বিকেল পাঁচটা ! ইমনের অফিস থেকে আসতে আসতে সাতটা বাজে । এখন আবার কে এল । ধীর পায়ে দরজার কাছে এগিয়ে গিয়ে কী হোলে চোখ রাখলো । ইমনকে দাড়িয়ে থাকতে দেখে একটু অবাকই হল । দ্রুত দরজা খুলে দিল । ইমন ওর দিকে তাকিয়ে একটু হেসে বলল, ঘুমিয়ে পড়েছিলে নাকি?
মায়া সেই প্রশ্নের জবাব না দিয়ে বলল, তুমি এতো জ্বলদি । শরীর ভালো আছে তো !
-না ঠিক আছি । আসলে শশুর মশাইয়ের অফিসে চাকরি করার এই এক সুবিধা । একটু আগে আগে বের হলেও সমস্যা নেই ।
মায়া এই কথা শুনে কি খুশি হওয়া উচিৎ নাকি দুঃখিত হওয়া উচিৎ সেটা মায়া বুঝতে পারলো না । ইমনের দিকে তাকিয়ে বলল, তুমি গোসল করবে? পানি গরম দিবো?
-নাহ ! পরে করবো গোসল । এই প্যাকেট টা নাও । তোমার জন্য !

মায়া তখনই দেখতে পেল ইনের হাতে একটা প্যাকেট । সেটা মায়ার হাতে দিয়ে সে শোবার ঘরের দিকে চলে গেল । মায়া প্যাকেট টা খুলতেই অনেক গুলো চকলেট বের হয়ে এল । এতো আনন্দ লাগলো ওর । কিন্তু সাথে সাথে আবার মন খারাপ হয়ে গেল । চকলেট ওর খুব বেশি পছন্দ । ওর শরীর ভারী হওয়ার পেছনে বেশি চকলেট খাওয়া অন্যতম কারণ । কিন্তু বিয়ের পর থেকে ও একদম চকলেট খাওয়া বন্ধ করে দিয়েছে । আজকে চকলেট গুলো দেখে খুব ইচ্ছে করছে খেতে কিন্তু খুব ভাল করেই জানে যে নয়শ গ্রাম ওজন কমেছে সেটা আবার বেড়ে যাবে ।

ইমনকে ফিরে আসতে দেখলো একটু পরে । খানিকটা অবাক হয়েই দেখলো এরই ভেতরে ইমন পোশাক বদলে দুই কাপ কফিও বানিয়ে নিয়ে এসেছে । অবশ্য ফ্লাক্সে পানি গরমই ছিল । কফির কাপটা টি টেবিলের সামনে রাখতে রাখতে ইমন বলল, গিগট পছন্দ হয় নি?
-হয়েছে। কিন্তু এই চকলেট খেলে আবার মোটা হয়ে যাবো !
-তো !
-মানে? মোটা হে বাজে দেখায় ! তোমার পাশে কেমন যেন লাগে !
-এই জন্যই সকালে উঠে এতো পরিশ্রম করছো?

কথা বলেই ইমন সোজা তাকালো মায়ার চোখের দিকে । মায়ার মনে হল যে ইমনের চোখের কোনে একটা অপরাধবোধের চিহ্ন দেখতে পেল । কফিতে একটা চুমুক দিয়ে ইমন ওর মুখোমুখি বসলো । তারপর বলল, আমি জানি তুমি জানো যে আমি তোমাকে কেন বিয়ে করেছি ! জানো না?
মায়া ঠিক বুঝতে পারলো না ইমন আসলে কি বলতে চাইছে ।
ইমন আবার বলল, তোমার বাবা অফিসে চাকরির বদলে তোমাকে বিয়ে করেছি । তোমাকে পছন্দ করে না । এটাই তো ভাবো তুমি । তাই না?
মায়া বলল, আমি কি তাই বলেছি?
-না । তবে এটা সত্য ।

ইমন কিছু সময় নিচের দিকে তাকিয়ে রইলো । তারপর মায়ার দিকে আবার ফিরে তাকালো । বলল, জানো মায়া আমার জন্য পৃথিবীতে কখনও আলাদা করে কিছু করে নি । কিছু না । অবশ্য তাদের দোষ দেই কিভাবে ! আমার ভেতরে আসলে কিছু নেই । কেবল এই সুন্দর চেহারার ব্যাপারটা আছে যা উপরওয়ালা দিয়েছে । আর কিছু নেই আমার ভেতরে । কিচ্ছু না । পড়াশুনাতে ভালো ছিলাম না । স্মার্টও না তেমন একটা । বাপের টাকাও নেই । মেয়েরা হয়তো কিছুদিন পাত্তা দিয়েছে তবে সরে গেছে একটু পরেই ।

মায়া কিছুই বুঝতে পারছে না ইমন কেন এই কথা গুলো বলছে । ইমন আবার বলল, তোমাকে বিয়ে করার কারণ সত্যিই ছিল তোমার বাবার ঐ চাকরি । কিন্তু কয়েক দিন ধরে আমার একটু আগে ঘুম ভেঙ্গে যেত সকালে । ঘুম থেকে উঠে দেখতাম যে তুমি পাশে নেই । ভাবলাম হয়তো রান্না ঘরে । কিন্তু হঠাৎ করে তোমার অস্ফুটে চিৎকার পেয়ে সচকিত হয়ে পাশের গিয়ে হাজির হলাম । তুমি তখন ব্যাথা সামলাতে ব্যস্ত । একটু পরেই বুঝতে পারি যে ব্যায়াম করছিলো । ব্যাথা পেয়েছো । আড়াল থেকে দেখতে লাগলাম তোমার কাজ । ব্যাথা সামলে আবারও ব্যায়াম করতে ব্যস্ত । ঘাম ছিলে জোড়ে নিঃশ্বাস নিচ্ছিলে । একটু চিকন হতে ! আমার পাশে যেন তোমাকে ভাল মানায় ! আমাকে যেন লজ্জিত হতে না হয় !

মায়া চুপ করে রইলো । দেখতে পেল ইমনের চোখের কোনে এক বিন্দু অশ্রু চিকচিক করছে । ইমন বলল, জানো মায়া এরপর এই কয়েকদিন আমি শান্তিমত ঘুমাতেই পারি নি । একটা মেয়ে আমার জন্য কষ্ট করছে, পছন্দের খাবার খাচ্ছে না, না খেয়ে থাকতে, যে পরিশ্রম পারছে না তবুও করে যাচ্ছে ! আমার জন্য যাতে আমার চোখে তাকে ভাল লাগে । এই অনুভূতি আমার জন্য নতুন একদম নতুন ! আমি কেবল অনুভব করতে পারছি যে আমি তোমাকে আমার মাথার ভেতর বের করতে পারছি না । বারবার তোমার ঐ পরিশ্রান্ত মুখ আমার চোখের সামনে ভেসে উঠছে । আমি শান্তি পাচ্ছি না । কিছুতেই শান্তি পাচ্ছি না ।
মায়া একদম চুপ হয়ে তাকিয়ে রইলো ইমনের দিকে । ইমনের চোখ দিয়ে তখন এক বিন্দ্রু অশ্রু গড়িয়ে পড়েছে । মায়া এক ভাবে সেই অশ্রুর দিকে তাকিয়ে রয়েছে । মায়া আরও একটু এগিয়ে বসলো ইমনের । তারপর ইমনের হাতটা ধরে বলল, তুমি নিজেকে কেন দোষী ভাবছো? বিয়ের ব্যাপারটা আসলে কারো হাত নেই । তোমার আমার জুটি উপর থেকে ঠিক করা । উছিলা যাই হোক না কেন ! আর কে বললে যে তোমার কোন গুণ নেই ! আসুক দেখি বলতে ! একেবারে মাথা ফাটিয়ে দেব !

ইমন হেসে ফেলল । ওর চোখে তখনও অশ্রু খেলা করছে । মায়া আবারও কিছু সময় সেই দিকে মুগ্ধ চোখে তাকিয়ে রইলো । ইমন বলল, আজ থেকে আর ওয়ার্কআউট করতে হবে না । না খেয়ে তো থাকাই যাবে না । প্রতিদিন ভোরে আমরা দুজন এক সাথে হাটতে বের হব । রাতে খাবার পরে হাটবো এক সাথে । আর খাওয়া দাওয়ার ব্যাপারে একটু সাবধান হবে । লাইখ তেল জাতীয় খাবার কম খাবো আমরা . ব্যাস । আর কোন বাড়তি পরিশ্রম না । ঠিক আছে !
মায়া একটু হেসে বলল, ওকে ! তোমার যদি মটু বউ নিয়ে সমস্যা না থাকে আমার তো কোন সমস্যা নেই ।

পরিশিষ্টঃ

এরপর থেকে প্রতিদিন ভোর বেলা ওরা দুজন হাটতে বের হত । প্রতিদিন সকালবেলা এক সাথে শুরু হত ওদের । মায়ার এতো চমৎকার লাগতো । রাতের বেলাতেও একই ভাবে দুজন হাটতো এক সাথে । মাত্র ছয় মাসের ভেতরে মায়ার শরীর কমে গেল । না একেবারে স্লিম হয়ে গেল না সে তবে আগের সেই স্থুলতাও ছিল না ।
নিউট্রিশনিস্টের কাছে গিয়েছিলো । সেও নিজেও খানিকটা অবাক হয়েছিলো । কোন ব্যাখ্যা দিতে পারে নি । কোন কিছু সাজেস্টও করে নি । বলেছে যেমন ভাবে চলছে তেমনই চলুক । হয়তো সামনে আরও কমে যাবে । আসলে মনের সাথে মানুষের দেহের একটা বিরাট সংযোগ রয়েছে । মানসিক শান্তি অনেক বড় একটা ব্যাপার । মানসিক শান্তির কারণে শরীরের অনেক সমস্যা এমনিতেই গায়েব হয়ে যায় অন্য দিকে মনের শান্তি না থাকলে সেরা স্বাস্থ্য সেবার পরেও শরীর খারাপ হয় । মায়ার যা রয়েছে তা হচ্ছে মনের শান্তি । এই যে ও যেমন আছে তেমন ভাবেই ইমন ওকে ভালোবাসতে এই শান্তির থেকে বড় কিছু আসলে আর কিছু নেই ।

How useful was this post?

Click on a star to rate it!

Average rating 4.9 / 5. Vote count: 26

No votes so far! Be the first to rate this post.

Related Posts

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *